ভারতের সবচেয়ে বেশি মুসলিম যে ১০টি প্রদেশে - জনসংখ্যা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ ভারত তার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিচারে ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ইউনিয়ন। ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রধানত ২৮টি রাজ্য (States) এবং ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (Union Territories) এই মোট ৩৬টি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত।
ধর্মভিত্তিক জনমিতি (Demographics) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হিন্দুধর্মের পর ইসলাম হলো ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম অনুসৃত ধর্ম। ভারতের ২০১১ সালের সর্বশেষ সরকারি আদমশুমারি (Census 2011) অনুযায়ী, দেশটির মোট মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৭.২২ কোটি (১৭২.২ মিলিয়ন), যা ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৪.২৩%। জনসংখ্যার পরিমাণের নিরিখে ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পরই ভারতে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী বসবাস করে।
তবে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে এই মুসলিম জনসংখ্যার ভৌগোলিক বণ্টন বা ঘনত্ব সব অঞ্চলে একরকম নয়। কোনো রাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায় মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ, আবার কোনো রাজ্যে তারা আনুপাতিক হারে কম হলেও মোট সংখ্যার (Absolute Number) বিচারে অনেক বিশাল।
এই প্রবন্ধে ভারতের ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে সর্বাধিক মুসলিম জনসংখ্যা বিশিষ্ট ১০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিস্তারিত জনমিতি, ঐতিহাসিক পটভূমি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক অবদান নিয়ে একটি বিস্তৃত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
'মোট জনসংখ্যা' বনাম 'জনসংখ্যার শতাংশ'
ভারতের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনমিতিক গুরুত্ব অনুধাবন করার জন্য দুটি সূচক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন: মোট জনসংখ্যা (Absolute Population) এবং জনসংখ্যার শতকরা হার (Percentage Share)। এই দুই সূচকের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
মোট জনসংখ্যা (Absolute Population): যেসব রাজ্যের সামগ্রিক আয়তন ও মোট জনসংখ্যা বিশাল, সেখানে আনুপাতিক হার কম থাকা সত্ত্বেও মুসলিম জনসংখ্যার প্রকৃত সংখ্যা অত্যন্ত বড় হয়। যেমন উত্তর প্রদেশ রাজ্যটিতে সামগ্রিক মুসলিম জনসংখ্যার হার প্রায় ১৯% হলেও, এটি ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য হওয়ায় এখানে প্রায় ৪ কোটিরও বেশি মুসলিম বসবাস করেন। আবার পশ্চিমবঙ্গ ও মহারাষ্ট্র রাজ্যগুলোতেও মোট সংখ্যার বিচারে বিপুল সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
জনসংখ্যার শতকরা হার (Percentage Share): এটি নির্দেশ করে কোনো নির্দিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ঠিক কত শতাংশ মুসলিম ধর্মাবলম্বী। যেমন কেন্দ্রশাসিত লাক্ষাদ্বীপ অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৬.৫%, যা এখানকার জনমিতির প্রধান চালিকাশক্তি। আবার জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অন্যতম মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল (প্রায় ৬৮.৩%)। অসাম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য দুটিতে যথাক্রমে প্রায় ৩৪% এবং ২৭% মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, যা সেখানকার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বিন্যাসে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
শীর্ষ ১০টি রাজ্যের বিস্তারিত ও গভীর জনমিতিক বিশ্লেষণ
১. উত্তর প্রদেশ (Uttar Pradesh): ভারতের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাস্থল
উত্তর প্রদেশ ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য। স্বাভাবিকভাবেই মোট সংখ্যার বিচারে এটি ভারতের সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার কেন্দ্রস্থল। ভারতের মোট মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় ২২% এককভাবে এই একটি রাজ্যেই বসবাস করেন।
"উত্তর প্রদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় মানচিত্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো পশ্চিম উত্তর প্রদেশ (Western UP)। এখানকার একাধিক জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৩০% থেকে ৫০%-এরও বেশি।"
প্রধান জেলাসমূহ: রামপুর: ৫০.৫৭%, মোরাদাবাদ: ৪৭.১২%, বিজনৌর: ৪৩.০৪%, সাহারানপুর: ৪১.৯৫%, মুজাফফরনগর: ৪১.১১%, আলিগড়: ৩২.৮৮%। এছাড়া শ্যমলী, সংভল এবং বেরেলি জেলাতেও বড় আকারের মুসলিম উপস্থিতি রয়েছে।
শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান: উত্তর প্রদেশ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামী শিক্ষা, সংস্কার ও আধুনিক শিক্ষার মেলবন্ধন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে।
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (AMU): ১৮৭৫ সালে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু ভারতেই নয়, পুরো বিশ্বে আধুনিক মুসলিম শিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে পরিচিত। 'আলিগড় আন্দোলন' উপমহাদেশে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ও আধুনিকায়নে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল।
দারুল উলুম দেওবন্দ: সাহারানপুর জেলায় অবস্থিত এই মাদ্রাসাটি ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কেবল ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষার বৃহত্তম কেন্দ্রই নয়, বরং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে (যেমন: রেশমি রুমাল আন্দোলন) দেওবন্দী ওলামাদের ঐতিহাসিক অবদান ছিল।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠান: লখনউয়ের নদওয়াতুল উলামা এবং বেরেলির আলা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খানের প্রবর্তিত বেরেলভী আন্দোলনও এই রাজ্যের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চার মূল স্তম্ভ।
রন্ধন ও স্থাপত্য ঐতিহ্য: উত্তর প্রদেশের 'আওধি রন্ধনশৈলী' (যেমন: লখনউয়ের টুন্ডে কাবাব, নেহারি ও বিরিয়ানি) এবং মুঘল ও নবাবী যুগের স্থাপত্য (যেমন: আগ্রার তাজমহল, লখনউয়ের বড় ইমামবাড়া) বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
অর্থনৈতিক অবদান: উত্তর প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প ও কারুশিল্পে মুসলিমদের ভূমিকা অপরিসীম। মোরাদাবাদের বিশ্ববিখ্যাত পিতল শিল্প (Brassware), ফিরোজাবাদের কাঁচ ও চুড়ি শিল্প, বারাণসীর ঐতিহ্যবাহী রেশম/বেনারসি শাড়ি এবং লখনউয়ের 'চিকনকারী' ও 'জারদোজি' সূচিকর্মে এই সম্প্রদায়ের হাজার হাজার কারিগর যুক্ত।
২. পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal): দ্বিতীয় শীর্ষ মুসলিম জনসংখ্যার রাজ্য
পূর্ব ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২.৪৭ কোটি মুসলিম বাস করেন। জনসংখ্যার শতকরা হারের দিক থেকে (ছোট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বাদ দিলে) কাশ্মীরের পরই পশ্চিমবঙ্গের স্থান। রাজ্যটির মোট জনসংখ্যার ২৭.০১% মুসলিম।
সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাসমূহ: পশ্চিমবঙ্গের তিনটি প্রধান জেলায় মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। এগুলো হলো মুর্শিদাবাদ (৬৬.২৭%), মালদা (৫১.২৭%) এবং উত্তর দিনাজপুর (৪৯.৯২%)। এছাড়া বীরভূম (৩৭.০৬%), দক্ষিণ ২৪ পরগনা (৩৫.৫৭%) এবং নদিয়া (২৬.৭৬%) জেলায় তাঁদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। মুর্শিদাবাদ ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ মুসলিম ঘনবসতিপূর্ণ জেলা।
ঐতিহাসিক পটভূমি: বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময়কাল থেকেই মুর্শিদাবাদ ও তার সংলগ্ন অঞ্চলগুলো ইসলামিক স্থাপত্য, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল। সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রিক রাজনীতিতে পরিবর্তন এলেও এই অঞ্চলের ইসলামিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন ছিল। হাজারদুয়ারি প্যালেস, কতরা মসজিদ, মতিঝিল প্রভৃতি ঐতিহাসিক নিদর্শন আজও বাংলার সমৃদ্ধ অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন: পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁদের মূলধারাভিত্তিক বাঙালি পরিচয়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং পল্লিপ্রকৃতির কবি জসীম উদ্দীনের সাহিত্য ও গান উভয় বাংলার সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। এছাড়া সৈয়দ মুজতবা আলী, কাজি আবদুল ওদুদ, এবং আবুল মনসুর আহমদের মতো সাহিত্যিকদের প্রভাব অনস্বীকার্য। মারফতি, মুর্শিদি, বাউল ও গাজীর গানের মতো লোকজ ধারায় মুসলিম আধ্যাত্মিকতার প্রচ্ছন্ন প্রভাব রয়েছে।
আর্থ-সামাজিক জীবন ও পেশা: পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মুসলিম গ্রামীণ ও আধা-শহুরে অর্থনীতিতে সক্রিয়। কৃষি কাজ, পাট চাষ এবং মালদা-মুর্শিদাবাদের রেশম গুটি চাষ (Sericulture)। ফারাক্কা ও আওরঙ্গবাদ অঞ্চলের বিড়ি শিল্পে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। এছাড়া শান্তিপুর ও ফুলিয়ার তাঁত শিল্পে তাঁদের বিশেষ অবদান রয়েছে।নির্মাণ খাত, চামড়া শিল্প (কলকাতার ট্যানারি অঞ্চল) এবং দেশের বিভিন্ন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক (Migrant Workers) হিসেবে কাজের ব্যাপক প্রবণতা রয়েছে।
৩. বিহার (Bihar): 'সীমাঞ্চল' কেন্দ্রিক জনমিতিক ঘনত্ব
ভারতের মধ্যাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারে প্রায় ১.৭৬ কোটি মুসলিম বসবাস করেন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ১৬.৮৭%। ঐতিহাসিক কাল থেকেই বিহার ইসলামী শাসন, শিক্ষা ও সূফি সাধনার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
সীমাঞ্চল (Seemanchal): বিহারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় চার জেলা কিষাণগঞ্জ, কাটিহার, পূর্ণিয়া এবং আরারিয়াকে যৌথভাবে 'সীমাঞ্চল' বলা হয়। এর মধ্যে কিষাণগঞ্জ ভারতের অন্যতম উচ্চ মুসলিম ঘনবসতিপূর্ণ জেলা (প্রায় ৬৮% মুসলিম)।
বিহারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চারটি জেলা কিষাণগঞ্জ, কাটিহার, পূর্ণিয়া এবং আরারিয়াকে যৌথভাবে সীমাঞ্চল বলা হয়। এটি নেপাল ও পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের সন্নিকটে অবস্থিত। কিষাণগঞ্জ প্রায় ৬৮% মুসলিম জনসংখ্যা (পুরো ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ মুসলিম ঘনত্বের অন্যতম জেলা)। কাটিহার প্রায় ৪৩%, আরারিয়া: প্রায় ৪৩%, পূর্ণিয়া: প্রায় ৩৮%, এছাড়া দরভাঙ্গা, সিওয়ান, মধুবনী এবং পশ্চিম চম্পারণ জেলায় উল্লেখযোগ্য মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে।
সূফি ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র: বিহারে ইসলামের প্রসার মূলত রাজক্ষমতার চেয়েও সূফি সাধকদের ভালোবাসা ও মানবসেবার মাধ্যমে ঘটেছে। পাটনার কাছে অবস্থিত মখদুম শাহ দৌলতের মাজার মান্যের শরীফ (Maner Sharif) সুফি স্থাপত্য ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন। বিহারের ফুলওয়ারি শরীফ ও ফতুয়া খানকা ও আস্তানাগুলো শতাব্দী ধরে আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও সামাজিক ঐক্যের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। মুঙ্গেরের খানকাহ রহমানিয়া আধুনিক ভারতের রাজনীতি ও ইসলামিক আইনি গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা: এখানকার বেশিরভাগ মুসলিম প্রথাগত কৃষি এবং দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। ঐতিহাসিকভাবে বিহারের 'দরভাঙ্গা' শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। বিহার স্টেট মাদরাসা এডুকেশন বোর্ড অন্যতম প্রাচীন ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্ষদ যা ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটায়। বর্তমানে প্রথাগত কৃষিনির্ভরতা কাটিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিহারের মুসলিম যুবকদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, সিভিল সার্ভিস এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ দেশের প্রধান প্রধান মেট্রো শহরে (যেমন: দিল্লি, মুম্বাই) কর্মসংস্থানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
৪. মহারাষ্ট্র (Maharashtra): পশ্চিম ভারতের শিল্প ও নগরাঞ্চলীয় মুসলিম সমাজ
ভারতের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু মহারাষ্ট্রে প্রায় ১.৩০ কোটি মুসলিম বসবাস করেন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ১১.৫৪%। উত্তর ভারত কিংবা পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (যেমন পশ্চিমবঙ্গ বা বিহার) মতো এখানকার মুসলিম জনসংখ্যা প্রধানত গ্রামে ছড়িয়ে না থেকে শহর ও শিল্পাঞ্চলে ব্যাপকভাবে ঘনীভূত ও ঘনসংঘবদ্ধ।
ভৌগোলিক বিস্তার ও নগরকেন্দ্রিকতা: মহারাষ্ট্রের মুসলিম সমাজ মূলত নগরমুখী। রাজ্যের প্রধান অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে এদের বড় আকারের উপস্থিতি দেখা যায়।বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধার কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মুসলিমদের প্রধান গন্তব্য মুম্বাই মেট্রোপলিটন এলাকা (MMR) ও থানে। অন্যান্য প্রধান শহর যেমন পুনে, নাগপুর, নাসিক, আমরাবতী এবং ছত্রপতি সম্ভাজিনগর (সাবেক আওরঙ্গবাদ)।
শিল্প ও উৎপাদনের দুই স্তম্ভ - মালেগাঁও ও ভিওয়ান্ডি মডেল: নাসিক জেলার মালেগাঁও (Malegaon) শহরটি ভারতের অন্যতম একটি ব্যতিক্রমী নগরাঞ্চল, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৭৮%। শহরটি ভারতের 'পাওয়ারলুম' (যান্ত্রিক বস্ত্রশিল্প) শিল্পের অন্যতম প্রধান রাজধানী। থানে জেলার ভিওয়ান্ডি (Bhiwandi) শহরটিও পাওয়ারলুম শিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশের মোট সুতি ও কৃত্রিম কাপড়ের একটি বিশাল অংশ এই দুটি কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়। এই শিল্প শতশত বছর ধরে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবিকার প্রধান উৎস।
নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক বৈচিত্র্য: মহারাষ্ট্রের মুসলিম সমাজ প্রধানত তিনটি ধারায় বিভক্ত: ১. কোঙ্কণি মুসলিম (Konkani Muslims): আরব সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের আদিবাসী মুসলিম, যাদের সমুদ্র বাণিজ্য ও মৎস্যজীবনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২. ডেক্কানি মুসলিম (Deccani Muslims): বাহমানি সুলতানি ও নিজামশাহী আমল থেকে আসা সামাজিক গোষ্ঠী, যাদের ভাষা ও সংস্কৃতিতে হায়দরাবাদি প্রবাভ স্পষ্ট। ৩. অভিবাসী মুসলিম (Migrant Muslims): উত্তর প্রদেশ, বিহার এবং গুজরাট থেকে বাণিজ্য ও শ্রমসংস্থানের খোঁজে আসা জনগোষ্ঠী।
অর্থনৈতিক ও পেশাগত অবদান: ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইয়ের সার্বিক বৃদ্ধিতে এই সম্প্রদায়ের ভূমিকা অপরিসীম। টেক্সটাইল, চামড়া শিল্প (ধারাভভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ), গহনা তৈরি (সোনা ও হীরা কাটিং), রিঅ্যাল এস্টেট, অটোমোবাইল মেরামত ও পরিবহন। মুম্বাই ও জওহরলাল নেহেরু (JNPT) পোর্টের লজিস্টিকস ও পণ্য সরবরাহে বড় অবদান। ভারতের সর্ববৃহৎ বিনোদন শিল্প 'বলিউড'-এ অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা, সংগীত, চিত্রনাট্য রচনা ও কারিগরি ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যক্তিত্বদের অবদান সর্বজনবিদিত।
এক নজরে মহারাষ্ট্র: মহারাষ্ট্রের মুসলিম সমাজ মূলত উৎপাদন, বস্ত্রশিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল একটি শিল্পমুখী ও নগরাশ্রয়ী সমাজ।
৫. আসাম (Assam): ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ববহ এক জনমিতি
উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার আসামে মুসলিম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৩৪.২২% (প্রায় ১.০৭ কোটি)। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাক্ষাদ্বীপ এবং জম্মু-কাশ্মীরের পর আসামেই ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ আনুপাতিক মুসলিম জনসংখ্যা বাস করে। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এই জনমিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভৌগোলিক বিন্যাস ও জেলাভিত্তিক আধিপত্য: আসামের মোট ৩১টি জেলার মধ্যে অন্তত ৯ থেকে ১০টি জেলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বা নির্ণায়ক জনসংখ্যার ভূমিকা পালন করে।
বরাক উপত্যকা (Barak Valley): করিমগঞ্জ (৫৬.৩৬%), হাইলাকান্দি (৬০.৭৪%)।ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা (Brahmaputra Valley): ধুবড়ি (৭৯.৬৭%), বরপেটা (৭০.৭৪%), গোয়ালপাড়া (৫৭.৫২%), দরং (৬৪.৩৪%) ও নাগাঁও (৫৫.৩৬%)।
আসামের মুসলিম সমাজের ত্রিমুখী সাংস্কৃতিক ধারা: আসামের মুসলিম সমাজ একক কোনো সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী নয়; এটি প্রধানত তিনটি সুস্পষ্ট ধারায় বিভক্ত।
১. থানীয় আসামী মুসলিম (দেশি, গোরিয়া, মোরিয়া): যাদের শিকড় কামরূপ ও আহম রাজবংশের যুগের সাথে যুক্ত। গোরিয়ারা প্রধানত কারিগর ও প্রশাসনিক কাজে যুক্ত ছিলেন এবং মোরিয়ারা পিতল-কাঁসার কারিগর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এদের ভাষা, পোশাক ও রীতিনীতি পুরোপুরি আসামী মূলধারার সাথে একীভূত।
২. চর-চাপড়ি বা নদী অববাহিকার মুসলিম (উজানি/ভাটি অঞ্চল): ঔপনিবেশিক আমলে কৃষি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে অবিভক্ত বাংলার (প্রধানত ময়মনসিংহ, পাবনা ও ঢাকা বিভাগ) থেকে আসা পলিমাটি ও নদীগর্ভের চরাঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী কৃষক সমাজ। আসামের কৃষি অর্থনীতি, বিশেষ করে পাট, ধান ও শাকসবজি উৎপাদনে এদের অবদান অপরিসীম।
৩. বরাক উপত্যকার সিলেটিভাষী মুসলিম: তৎকালীন সুরমা উপত্যকার অংশ হওয়ায় ঐতিহাসিক ও সামাজিকভাবে এদের সামাজিক ও ভাষাগত যোগাযোগ পার্শ্ববর্তী সিলেটের সাথে গভীর।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: আসামের সামাজিক সংহতির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক প্রতীক হলেন সপ্তদশ শতকের সূফি সাধক হযরত আজান পীর (রহ.) (শাহ মীরান)। তিনি আসামী লোকসংগীতের শৈলীতে 'জিকির ও জারি গান' রচনা করেন, যা আসামী ভাষার লালিত্য ও ইসলামী ভাবধারার এক অনন্য সমন্বয়। জিকির গান আজও আসামী সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে শ্রদ্ধার সাথে গীত হয়।
এক নজরে আসাম: আসামের মুসলিম সমাজ কৃষি, ঐতিহাসিক হস্তশিল্প ও লোকসংগীতের এক অনন্য সংমিশ্রণ, যা রাজ্যের সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৬. কেরালা (Kerala): 'মাপ্পিলা' ঐতিহ্য, শিক্ষা ও গালফ রেমিট্যান্স
দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে প্রায় ৮৮.৭ লাখ মুসলিম বাস করেন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ২৬.৫৬%। কেরালা ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মানে অনেকটাই এগিয়ে এবং এখানকার মুসলিম সমাজ ঐতিহাসিকভাবে 'মাপ্পিলা' (Mappila) নামে পরিচিত।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও ইসলামের প্রথম আগমন: ভারতে ইসলামের প্রবর্তন উত্তর ভারতের স্থলপথের অভিযানের অনেক আগেই কেরালায় ঘটেছিল আরব সাগরের বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ ধরে।
ত্রিশূর জেলার কোডুঙ্গালুরে অবস্থিত কেরামন জুমা মসজিদ (Cheraman Juma Masjid) মসজিদটি ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়। এটি ভারতের প্রথম এবং ভারতীয় উপমহাদেশে নির্মিত প্রাচীনতম মসজিদগুলোর একটি। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই আরব বণিকদের মাধ্যমে কেরালায় ইসলামের শান্তিপূর্ণ আগমন ঘটে এবং স্থানীয় রাজাদের (চেরামন পেরুমাল) অনুকূল পরিবেশ লাভ করে।
আঞ্চলিক বিস্তার (মালাবার অঞ্চল): কেরালার মুসলিম জনসংখ্যার সিংহভাগই বাস করেন রাজ্যের উত্তর অংশ অর্থাৎ মালাবার (Malabar) অঞ্চলে। মালাপ্পুরম (Malappuram) ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর একটি, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা ৭০.২৪%। অন্যান্য প্রধান জেলায়ও মুসলিম বসবাস করে, যেমন কোঝিকোড় (৩৯.২৪%), কাসারগড় (৩৭.২৪%) এবং কান্নুর (২৯.৪৩%)।
সামাজিক ও শিক্ষাগত বিপ্লব: ভারতের অন্যান্য রাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার হার তুলনামূলক কম হলেও কেরালায় চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। কেরালায় মুসলিমদের মধ্যে সাক্ষরতার হার প্রায় ৯৫%-এর ওপরে, যা ভারতের যেকোনো রাজ্যের মুসলিম জনমিতির মধ্যে সর্বোচ্চ।
কেরালায় মুসলিম নারীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা এবং পেশাদার ডিগ্রির (চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং, শিক্ষকতা) হার অবিশ্বাস্যভাবে বেশি। 'মুসলিম এডুকেশনাল সোসাইটি' (MES) এবং বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় সংগঠন রাজ্যে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে এই শিক্ষা বিপ্লব ঘটিয়েছে।
গালফ রেমিট্যান্স ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: ১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া 'গালফ বুম' (Gulf Boom) কেরালা মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর চেহারা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। জিসিসি (GCC) বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে (সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ইত্যাদি) প্রবাসী কেরালাইদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স রাজ্যের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা, অত্যাধুনিক আবাসন, খুচরা ব্যবসা এবং মিডিয়া ও পাবলিশিং খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।
এক নজরে কেরালা: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আন্তর্জাতিক প্রবাস জীবন এবং সুপ্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্যের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ কেরালার 'মাপ্পিলা' সমাজ ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে সামাজিক উন্নয়নের একটি অনুকরণীয় মডেল।
৭. জম্মু ও কাশ্মীর (Jammu and Kashmir): ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল
জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য প্রশাসনিক অঞ্চল। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটিকে পুনর্গঠন করে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটানো হয়।
জনসংখ্যাগত চিত্র ও ভৌগোলিক বিন্যাস: ২০১১ সালের সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মোট জনসংখ্যা ছিল ১.২৫ কোটি। এর মধ্যে মুসলিম জনগোষ্ঠীর হার ছিল ৬৮.৩১% (প্রায় ৮৫.৭ লাখ)। তবে ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে জনসংখ্যার এই অনুপাতে সুস্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে।
কাশ্মীর উপত্যকা (Kashmir Valley): মুসলিম জনসংখ্যা ৯৬.৪%-এরও বেশি। শ্রীনগর, অনন্তনাগ, বারামুলা, কুপওয়ারা, পুলওয়ামা, বদগাম, শোপিয়ান, কুলগাম, বান্দিপোরা এবং গান্দারবল এই ১০টি জেলাই কাশ্মীর উপত্যকার জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু।
জম্মু বিভাগ (Jammu Division): এখানে সামগ্রিকভাবে মুসলিম জনসংখ্যা ৩৩.৫%। তবে জম্মুর পীর পাঞ্জাল এবং চেনাব উপত্যকা অঞ্চলের জেলাগুলোতে (যেমন: রাজৌরি, পুঞ্চ, ডোডা, কিশতওয়ার ও রামবান) মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বা উল্লেখযোগ্য অনুপাতে বসবাস করেন।
পীর ওয়ার ও সূফি ধারার ঐতিহাসিক আধ্যাত্মিকতা: কাশ্মীরকে ঐতিহ্যগতভাবে 'পীর ওয়ার' (সাধু-সন্ত ও পীরদের ভূমি) বলা হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়া ও পারস্য থেকে আসা সাধকদের মাধ্যমে এখানে ইসলামের প্রসার ঘটে। কাশ্মীরের ধর্মীয় সম্প্রীতির অন্যতম মূল ভিত্তি হলো স্থানীয় সূফি 'ঋষি সিলসিলা'। চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত নারী কবি ও সাধক লল্লা দেদ (Lalla Ded) এবং সূফি সাধক শেখ নূরউদ্দীন নূরানী (নন্দ ঋষি)-র দর্শনে কাশ্মীরের হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান বা 'কাশ্মীরিয়াত' (Kashmiriyat)-এর বিকাশ ঘটে।
প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র: শ্রীনগরের ডাল হ্রদের তীরে অবস্থিত হযরতবল মসজিদ (যেখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর পবিত্র কেশ মোবারক সংরক্ষিত রয়েছে), চরার-ই-শরীক দরগাহ (নন্দ ঋষির মাজার), খানকাহ-ই-মৌলা (মির সাইয়্যিদ আলী হামাদানী রহ.-এর স্মৃতি বিজড়িত) এবং মখদুম সাহেব দরগাহ অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক কেন্দ্র।
অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি: কাশ্মীরের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর ও ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকেন্দ্রিক। ফল ও কৃষি উৎপাদন: ভারতের মোট আপেল উৎপাদনের সিংহভাগ আসে কাশ্মীর থেকে। এছাড়া পাম্পোর (Pampore) অঞ্চল বিশ্ববিখ্যাত উচ্চমূল্যের কেশর (Saffron) উৎপাদনের জন্য স্বীকৃত।
হস্তশিল্প ও বস্ত্রশিল্প: কাশ্মিরি শাল, বিশ্বমানের পাশমিনা (Pashmina) ও শাতুশ শাল, হাতে বোনা গালিচা (Silk Carpets), আখরোট কাঠের সূক্ষ্ম খোদাই শিল্প এবং 'পেপার মাশে' (Paper Mache) বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। পর্যটন খাত: ডাল হ্রদের শিকারা, গুলমার্গ, পাহালগাম এবং ঐতিহাসিক মোগল গার্ডেনসমূহকে কেন্দ্র করে এখানকার অর্থনীতি ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের বড় অংশ পরিচালিত হয়।
৮. কর্ণাটক (Karnataka): দাক্ষিণাত্যের নওয়াবি ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তি
দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত হাব কর্ণাটকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী কর্ণাটকে প্রায় ৭৮.৯ লাখ মুসলিম বাস করেন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ১২.৯২%।
প্রধান অঞ্চল ও জনসংখ্যার বিন্যাস: কর্ণাটকের মুসলিম জনবসতি ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত। উত্তর কর্ণাটক (হাইদ্রাবাদ-কর্ণাটক অঞ্চল): কালবুরগি (গুলবার্গা), বিদর, রাইচুর, যাদগির এবং বেলগাম অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঘনত্ব সর্বাধিক। দক্ষিণ কন্নড় (ম্যাঙ্গালোর) ও উডুপি জেলায় বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায় 'বাইরি' (Beary) নামে পরিচিত, যাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও বাণিজ্যিক ঐতিহ্য রয়েছে। মহানগরী বেঙ্গালুরু: রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে ১৪ লাখেরও বেশি মুসলিম বসবাস করেন, যা শহরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩.৯%।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও স্থাপত্য ঐতিহ্য: কর্ণাটকের সামাজিক ও রাজনৈতিক গঠনে বেশ কয়েকটি রাজবংশ ও সূফি ধারার অবদান অপরিসীম। চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীতে বাহমানি সুলতানি এবং বিজাপুরের আদিল শাহী রাজবংশ শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্যের বিশাল ভিত্তি স্থাপন করে। বিজাপুরের গোল গুম্বুজ (Gol Gumbaz) ও ইব্রাহিম রউজা এবং বিদরের দুর্গ এর অনন্য নিদর্শন।
১৮শ শতাব্দীতে হায়দার আলী এবং তাঁর পুত্র টিপু সুলতান-এর শাসনামলে প্রযুক্তিগত ও সামরিক আধুনিকায়ন ঘটে। টিপু সুলতান কর্তৃক উদ্ভাবিত রকেট প্রযুক্তি এবং সিল্ক শিল্পের গোড়াপত্তন কর্ণাটকের ইতিহাসে যুগান্তকারী। কালবুরগিতে অবস্থিত চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত সূফি সাধক হযরত খাজা বন্দেনাওয়াজ গেসুদরাজ (রহ.)-এর দরগাহ সমগ্র দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রধান সূফি কেন্দ্র।
ভাষা, সংস্কৃতি ও আধুনিক অর্থনীতি: এখানকার মুসলিমরা দৈনন্দিন জীবনে মূলত 'দাক্ষিণী' (Dakhini Urdu) ভাষা ব্যবহার করেন, যা উর্দু, ফারসি, মারাঠি ও কান্নাড়া ভাষার একটি ঐতিহাসিক মিশ্রণ। এছাড়া উপকূলীয় বাইরি সম্প্রদায় বাইরি ভাষা এবং অনেকেই কান্নাড়া ভাষায় পারদর্শী।
বেঙ্গালুরুর ভারতের 'সিলিকন ভ্যালি' হিসেবে উত্থানের সাথে সাথে এখানকার মুসলিম তরুণ সমাজ আইটি (IT), তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, বায়োটেকনোলজি, ওষুধ শিল্প এবং কর্পোরেট খাতে উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রবাসী কর্ণাটকী মুসলিমদের প্রেরিত রেমিট্যান্স রাজ্যের গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
৯. রাজস্থান (Rajasthan): মরু সংস্কৃতির রঙিন মেলবন্ধন
ভারতের আয়তনের বিচারে বৃহত্তম রাজ্য রাজস্থানে মরুভূমির কঠোর প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যেও একটি বৈচিত্র্যময় ও সংমিশ্রিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। ২০১১ আদমশুমারি অনুযায়ী রাজস্থানে প্রায় ৬২.১৫ লাখ মুসলিম বাস করেন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৯.০৭%।
প্রধান অঞ্চল ও গোষ্ঠীগত বৈচিত্র্য: রাজস্থানের মুসলিম জনবসতি ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত। পূর্ব রাজস্থানের মেওয়াত অঞ্চল (Mewat) আলওয়ার ও ভরতপুর জেলায় মেও (Meo) মুসলিম সম্প্রদায় বসবাস করে। তারা মূলত কৃষিজীবী এবং তাদের সংস্কৃতিতে রাজপুত ও ইসলামিক ঐতিহ্যের চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। নগর ও মারোয়ার অঞ্চল তথা রাজধানী জয়পুর, যোধপুর, আজমির, নাগৌর, শিকার, ঝুনঝুনু এবং মরু সীমান্তবর্তী জেলা বারমের ও জেসালমিরে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সুদৃঢ় অবস্থান রয়েছে।
আজমির শরীফ - চিশতী ধারার প্রাণকেন্দ্র: রাজস্থানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত আজমির শরীফ দরগাহ সমগ্র বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দ্বাদশ শতাব্দীর মহান সূফি সাধক খাজা গরীবে নেওয়াজ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.)-এর মাজারকে ঘিরে এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। আজমির শরীফ কেবল মুসলিমদের ধর্মীয় কেন্দ্র নয়; বরং হিন্দু, শিখ ও অন্যান্য ধর্মের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন এখানে জিয়ারত করতে আসেন। বার্ষিক 'উরস' (Urs) উৎসবে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে।
"মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ সেবা হলো ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করা, আর্তের আর্জি শোনা এবং অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করা।" - হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহ.)
লোকসংগীত ও কারুশিল্পে অবদান: রাজস্থানের লোকসংস্কৃতি ও বিশ্বখ্যাত কারুশিল্পের সাথে মুসলিম কারিগরদের নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। থর মরুভূমির (জেসালমির ও বারমের) মাঙ্গানিয়ার (Manganiyar) এবং লাঙ্গা (Langa) সম্প্রদায়ের মুসলিম লোকসংগীতশিল্পীরা বিশ্বসঙ্গীতের মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। 'কামাইচা' (Kamaicha) ও 'সারঙ্গী' বাজিয়ে তারা বহু শতবর্ষ ধরে সুফি সাহিত্য ও রাজস্থানি লোকগাথা পরিবেশন করে আসছেন।
হস্তশিল্প ও জহুরি শিল্প: জয়পুরের বিশ্ববিখ্যাত মার্বেল পাথর খোদাই, মূল্যবান রত্ন পাথর কাটিং ও পলিশিং (Gem Cutting), নীল মৃৎশিল্প বা ব্লু পটরি (Blue Pottery) এবং কাপড়ের বাঁধাই ও ব্লক প্রিন্টিং (Bandhani & Block Print) শিল্পে মুসলিম কারিগরদের অবদান অনস্বীকার্য।
১০. গুজরাট (Gujarat): বাণিজ্যিক ও উদ্যোক্তা নির্ভর মুসলিম সমাজ
ভারতের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাজ্য গুজরাটে প্রায় ৫৮.৪৭ লাখ মুসলিম বসবাস করেন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৯.৬৭%। গুজরাটি মুসলিম সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ঐতিহাসিকভাবে তাদের বাণিজ্যিক মানসিকতা এবং বৈশ্বিক উদ্যোক্তা ঐতিহ্য।
জনমিতি ও প্রধান বাণিজ্যিক অঞ্চল: গুজরাটের উপকূলীয় এবং শিল্পাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।
প্রধান জেলাসমূহ: আহমেদাবাদ, সুরত, ভরুচ, আনন্দ, খেড়া, জামনগর, ভবেনগর এবং ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত ঘেঁষা বিস্তৃত অঞ্চল কচ্ছ (Kutch)।
শীর্ষ তিনটি ঐতিহ্যবাহী বণিক সম্প্রদায়: ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মুসলিমদের তুলনায় গুজরাটি মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ শিল্প, বাণিজ্য ও স্বকর্মসংস্থানে নিয়োজিত। মধ্যযুগ থেকে ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যে এরা নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
দাউদি বোহরা (Dawoodi Bohra) - অত্যন্ত সুসংগঠিত, সুশিক্ষিত ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, হার্ডওয়্যার, কেমিক্যাল এবং খুচরা নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবসা। খোজা (Khoja) - অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত অগ্রসর ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে পারদর্শী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। ব্যাংকিং, উৎপাদন শিল্প, রিয়েল এস্টেট ও আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি। মেমন (Memon) - সুন্নি হানাফি মতাবলম্বী ঐতিহাসিকভাবে সফল সওদাগর ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। বস্ত্র শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নৌ-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক রিয়েল এস্টেট।
গুজরাটের শিল্প অর্থনীতিতে অবদান: ১. ডায়মন্ড ও টেক্সটাইল (সুরত): সুরতের বিশ্বখ্যাত হীরা কাটিং, পলিশিং এবং বিশাল টেক্সটাইল বা বস্ত্র শিল্পের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় স্থানীয় মুসলিম উদ্যোক্তা ও কারিগরদের মাধ্যমে। ২. রাসায়নিক ও বন্দর বাণিজ্য (ভরুচ ও অঙ্কলেশ্বর): ভরুচ ও এর আশেপাশের কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি এবং ঐতিহ্যবাহী সামুদ্রিক বাণিজ্যে মুসলিম ব্যবসায়ীদের বিশেষ প্রাধান্য রয়েছে। ৩. কচ্ছের আজরাখ হস্তশিল্প: কচ্ছ অঞ্চলের 'অজরাখ' (Ajrakh) ব্লক প্রিন্টিং ও প্রাকৃতিক রঞ্জকভিত্তিক বস্ত্রশিল্প বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পেয়েছে, যার মূল কারিগর ও রক্ষক স্থানীয় খাতরী (Khatri) মুসলিম সম্প্রদায়।
ভারতের সর্বাধিক মুসলিম জনসংখ্যার ১০টি রাজ্য/অঞ্চল
রাজ্য / কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল | মুসলিম জনসংখ্যা (আদমশুমারি ২০১১) | রাজ্যের মোট জনসংখ্যার শতাংশ (%) | প্রধান সং কেন্দ্রীভূত অঞ্চল / জেলাসমূহ | প্রধান সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পটভূমি |
উত্তর প্রদেশ (Uttar Pradesh) | ৩,৮৪,৮৩,৯৬৭ (~৩.৮৫ কোটি) | ১৯.২৬% | মোরাদাবাদ, রামপুর, সাহারানপুর, বিজনৌর, আলিগড়, লখনউ | আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (AMU), দেওবন্দ মাদ্রাসা, পিতল ও হস্তশিল্প এবং মুঘল/অবধ সংস্কৃতি। |
পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) | ২,৪৬,৫৪,৮২৫ (~২.৪৭ কোটি) | ২৭.০১% | মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর, বীরভূম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা | নওয়াবি ইতিহাস, সিল্ক ও বস্ত্রশিল্প, কৃষি এবং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সুদৃঢ় অবদান। |
বিহার (Bihar) | ১,৭৫,৫৭,৮০৯ (~১.৭৬ কোটি) | ১৬.৮৭% | কিষাণগঞ্জ, কাটিহার, পূর্ণিয়া, আরারিয়া (সীমাঞ্চল) | কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, সূফি ঐতিহ্য, পুর্ণিয়া ও কিষাণগঞ্জের সীমান্ত কেন্দ্রিক শিক্ষা ও বাণিজ্য। |
মহারাষ্ট্র (Maharashtra) | ১,২৯,৭১,১৫২ (~১.৩০ কোটি) | ১১.৫৪% | মুম্বাই, থানে, আওরঙ্গবাদ (ছত্রপতি সম্ভাজিনগর), মালেগাঁও | পাওয়ারলুম বস্ত্রশিল্প, কেমিক্যাল ও মেকানিকাল ব্যবসা, চলচ্চিত্র শিল্প (বলিউড) ও প্রযুক্তি। |
আসাম (Assam) | ১,০৬,৭৯,৩৪৫ (~১.০৭ কোটি) | ৩৪.২২% | ধুবড়ি, বরপেটা, গোয়ালপাড়া, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি | ব্রহ্মপুত্র ও বরাক উপত্যকার কৃষি অর্থনীতি, জিকির ও জারি গান, হস্তশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র। |
কেরালা (Kerala) | ৮৮,৭৩,৪৭২ (~৮৮.৭ লাখ) | ২৬.৫৬% | মালাপ্পুরম, কোঝিকোড়, কান্নুর, কাসারগড় (মালাবার অঞ্চল) | 'মাপ্পিলা' সম্প্রদায়, প্রাচীন আরব সামুদ্রিক বাণিজ্য ঐতিহ্য, উচ্চ স্বাক্ষরতার হার ও জিসিসি (GCC) রেমিট্যান্স। |
জম্মু ও কাশ্মীর (UT) | ৮৫,৬৭,৪৮৫ (~৮৫.৭ লাখ) | ৬৮.৩১% | শ্রীনগর, অনন্তনাগ, বারামুলা, কুপওয়ারা, পুঞ্চ | ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল, ঋষি-সূফি ঐতিহ্য, গালিচা, শাল ও উদ্যানপালন (আপেল)। |
কর্ণাটক (Karnataka) | ৭৮,৯৩,০৬৫ (~৭৮.৯ লাখ) | ১২.৯২% | বেঙ্গালুরু, কালবুরগি (গুলবার্গা), বিদর, ধারওয়াদ | দাক্ষিণাত্যের সুলতানি ও টিপু সুলতানের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, দাক্ষিণী ভাষা, আইটি ও আধুনিক বাণিজ্য। |
রাজস্থান (Rajasthan) | ৬২,১৫,৩৭৭ (~৬২.১৫ লাখ) | ৯.০৭% | জয়পুর, যোধপুর, মেওয়াত (আলওয়ার-ভরতপুর), নাগৌর, বারমের | আজমির শরীফ দরগাহ, মেও সংস্কৃতি, মাঙ্গানিয়ার ও লাঙ্গা লোকসঙ্গীত, পাথর খোদাই ও ব্লক প্রিন্টিং। |
গুজরাট (Gujarat) | ৫৮,৪৬,৭৬১ (~৫৮.৪৭ লাখ) | ৯.৬৭% | আহমেদাবাদ, সুরত, ভরুচ, জামনগর, কচ্ছ | বোহরা, খোজা ও মেমন ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্য, ডায়মন্ড পলিশিং ও টেক্সটাইল। |
শতকরা হারের (Percentage Share) নিরিখে ভারতের শীর্ষ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও রাজ্য
যদি মোট জনসংখ্যার পরিমাণের বদলে আনুপাতিক হার বা শতকরা (%) বিচারে তালিকা করা হয়, তবে ভারতের শীর্ষ অঞ্চলগুলোর চিত্রটি ভিন্ন রূপ নেয়:
লাক্ষাদ্বীপ (UT) ██████████████████████████ 96.58%
জম্মু ও কাশ্মীর (UT) █████████████████ 68.31%
আসাম ██████████ 34.22%
পশ্চিমবঙ্গ ██████ 27.01%
কেরালা ██████ 26.56%
লাক্ষাদ্বীপ (Lakshadweep - UT): আরব সাগরে অবস্থিত এই ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জটি ভারতের সর্বাধিক মুসলিম অনুপাতের অঞ্চল। এখানকার ৯৬.৫৮% মানুষই মুসলিম (প্রধানত শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী)।
জম্মু ও কাশ্মীর (Jammu & Kashmir - UT): সামগ্রিকভাবে ৬৮.৩১% মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে এটি ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল।
আসাম (Assam): রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৩৪.২২% মুসলিম, যা ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal): রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ২৭.০১% মুসলিম।
কেরালা (Kerala): রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ২৬.৫৬% মুসলিম।
ভারতের জাতীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবদান
ভারতে মুসলিম সম্প্রদায় কেবল একটি জনমিতিক সংখ্যা নয়; বরং ভারতের হাজার বছরের ইতিহাস, স্থাপত্য, প্রযুক্তি ও শিল্পকলার সাথে এ সম্প্রদায় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।
স্থাপত্য ও নন্দনতত্ত্ব (Architecture & Heritage): ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যশৈলী ভারতের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটসহ ভারতের অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন মুসলিম স্থাপত্যের স্বাক্ষর বহন করে।তাজমহল (আগ্রা) বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম, যা ভারতের পর্যটন শিল্পের প্রধান আকর্ষণ। কুতুব মিনার ও লাল কেল্লা (দিল্লি) মধ্যযুগীয় প্রকৌশল ও রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক। লাল কেল্লায় প্রতি বছর ভারতের স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ফতেহপুর সিক্রি ও চারমিনার (হায়দ্রাবাদ) ইসলামী ও ভারতীয় শৈলীর অপূর্ব মিশ্রণ। বিশ্ববিখ্যাত গোল গুম্বুজ (বিজাপুর) তার প্রকাণ্ড গম্বুজ এবং অসাধারণ শাব্দিক প্রকৌশলের (echo acoustics) জন্য।
সংগীত, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিকাশ: ভারতীয় মার্গ সংগীত এবং লোকসংস্কৃতিতে ইসলামিক অনুরাগের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তৈরি হয়েছে কালজয়ী সব সৃষ্টি। খেয়াল, গজল ও কাওয়ালি পরিবেশনার মাধ্যমে ভারতীয় সঙ্গীত বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত হয়েছে। আমির খসরুকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বহু ধারার জনক মনে করা হয়। সেতার, তানপুরা ও তবলা বিকাশে মুসলিম শিল্পীদের অবদান অনস্বীকার্য।
ভারতরত্ন ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান (সানাই), ওস্তাদ আমজাদ আলী খান (সরোদ), ওস্তাদ জাকির হোসেন (তবলা) এবং আধুনিক যুগে এ. আর. রহমান ভারতীয় সঙ্গীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। মির্জা গালিব, আল্লামা ইকবাল, হাসরাত মোহানি এবং কাজী নজরুল ইসলামের মতো কবিরা ভারতের সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। ইকবাল রচিত "সারে জাঁহাসে আচ্ছা" আজও ভারতের অন্যতম প্রিয় জাতীয়তাবাদী গান।
শিক্ষা, বিজ্ঞান ও স্বাধীন ভারতের নির্মাণ: আধুনিক ভারতের সার্বভৌমত্ব, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিক্ষা নীতি গঠনে মুসলিম ব্যক্তিত্বদের অবদান অপরিসীম। 'ভারতের মিসাইল ম্যান' নামে পরিচিত সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ.পি.জে. আবদুল কালাম, যিনি ভারতের পারমাণবিক ও মহাকাশ কর্মসূচীকে (ISRO ও DRDO) আধুনিক রূপ দিয়েছিলেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর দূরদর্শিতাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল 'ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি' (IIT), ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (UGC) এবং সঙ্গীত নাটক অকাদেমি। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আসফাকউল্লা খান, খান আব্দুল গাফ্ফার খান (সীমান্ত গান্ধী) এবং বেগম হযরত মহলের মতো বীরেরা দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন।
আধুনিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কুটির শিল্প: প্রযুক্তি ও কর্পোরেট খাতে মুসলিমদের অনেক অবদান রয়েছে। বিশ্বখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান উইপ্রো (Wipro)-র প্রতিষ্ঠাতা আজিম প্রেমজি ভারতের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা ও দানবীর। সিপলা (Cipla)-র প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউসুফ হামিদ সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ তৈরি করে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবায় বিপ্লব এনেছেন। ঐতিহ্যবাহী শিল্প বেনারসী শাড়ি বুনন, লখনউয়ের চিকনকারি কাজ, মোরাদাবাদের পিতল শিল্প এবং কাশ্মীরি শাল ও কার্পেট শিল্পের মূল কারিগর ও চালিকাশক্তি প্রধানত মুসলিম সম্প্রদায়, যা ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যে বিপুল রাজস্ব যোগায়।
বিশ্ববরেণ্য রন্ধনশিল্প (Cuisine & Gastronomy): ভারতের রন্ধনশিল্পের বৈচিত্র্যে মুসলিম ঐতিহ্যের মোঘলাই ও আঞ্চলিক খাবারের ভূমিকা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী, যা দেশের পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে। হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি, লখনউই (অবধি), কলকাতা ও মালাবার শৈলীর বিরিয়ানি বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। কাবাব (গালৌটি, শিক), হালিম, নিহারী, কোরমা এবং দক্ষিণ ভারতের মালাবার পরাটা ভারতীয় রন্ধন সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
উপসংহার
ভারতের সর্বাধিক মুসলিম জনবসতিপূর্ণ ১০টি রাজ্যের পর্যালোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, ভারতের ভৌগোলিক ও সামাজিক মানচিত্রে এই সম্প্রদায়ের অবস্থান অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। উত্তর প্রদেশের বিপুল জনসংখ্যা থেকে শুরু করে কেরালার সমুদ্র-উপকূলীয় উন্নত শিক্ষা সংস্কৃতি, কিংবা কাশ্মীরের সূফি ঋষি ঐতিহ্য থেকে গুজরাটের উদ্যোক্তা ব্যবসায়িক মডেল প্রতিটি রাজ্যের মুসলিম সমাজের নিজস্ব সামাজিক, ভাষাগত ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
২০১১ সালের আদমশুমারির পর থেকে বর্তমানে ভারতে জনসংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনুমান করা হয় যে বর্তমান ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি অতিক্রম করেছে। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে একটি উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের যাত্রায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সুশিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় মূলধারায় সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

















