জ্যাক ডরসির গ্যারান্টিড ইনকাম উদ্যোগ ও আমেরিকার নতুন পরীক্ষা
করোনা মহামারীর পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন ধরনের সামাজিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে, যা ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (ইউবিআই) বা গ্যারান্টিড ইনকাম নামে পরিচিত। এই উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য টুইটারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও বিলিয়নিয়ার জ্যাক ডরসি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তিনি এই প্রকল্পে ৩ মিলিয়ন ডলার দান করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে গ্যারান্টিড ইনকাম প্রোগ্রামের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে আমরা জ্যাক ডরসির গ্যারান্টিড ইনকাম উদ্যোগ প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য, এর প্রভাব, সমর্থক ও সমালোচকদের মতামত এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আমেরিকায় গ্যারান্টিড ইনকাম প্রোগ্রাম
ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম বা গ্যারান্টিড ইনকাম এমন একটি সামাজিক নীতি, যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিয়মিতভাবে ব্যক্তিদের কাছে প্রদান করা হয়, যাতে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এই ধারণাটি বিশেষ করে করোনা মহামারীর সময় জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, যখন লকডাউন এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে লাখো মানুষ তাদের চাকরি হারিয়েছেন এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজন শহরের মেয়রদের একটি জোট, যারা মেয়রস ফর আ গ্যারান্টিড ইনকাম নামে পরিচিত, এই প্রোগ্রামটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। এই জোটের মধ্যে রয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস, আটলান্টা, নিউয়ার্ক, জ্যাকসন এবং স্টকটনের মতো শহর। জোটের দাবি, এই প্রোগ্রামটি প্রায় ৭ মিলিয়ন আমেরিকানের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাদের মতে, এই গ্যারান্টিড ইনকাম দারিদ্র্য দূরীকরণে এবং মহামারী-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
জ্যাক ডরসির দান ৩ মিলিয়ন ডলার
টুইটারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং স্কয়ারের প্রধান নির্বাহী জ্যাক ডরসি এই প্রোগ্রামে ৩ মিলিয়ন ডলার দান করেছেন। এই অর্থ অলাভজনকভাবে ব্যবহৃত হবে এবং বিভিন্ন শহরে গ্যারান্টিড ইনকাম প্রোগ্রাম পরিচালনার জন্য ব্যয় করা হবে। এর আগে, ২০২০ সালের এপ্রিলে, ডরসি তার ব্যক্তিগত সম্পদের ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের স্কয়ার শেয়ার দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা স্টার্ট স্মল নামে তার অলাভজনক সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই দানের একটি বড় অংশ ইউবিআই পরীক্ষার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
ডরসি বিশ্বাস করেন, গ্যারান্টিড ইনকাম অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করতে সাহায্য করবে। তিনি বলেন, “এই প্রোগ্রামটি মানুষকে তাদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ দেবে এবং তাদের জীবনে স্থিতিশীলতা আনবে।” তার এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি নতুন ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিনিধিত্ব করে।
প্রোগ্রামের বর্তমান অবস্থা
গ্যারান্টিড ইনকাম প্রোগ্রামটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। শিকাগো, নিউয়ার্ক এবং আটলান্টায় এই প্রোগ্রামের পাইলট প্রকল্প চলছে, যেখানে সীমিত সংখ্যক ব্যক্তিকে নিয়মিত অর্থ প্রদান করা হচ্ছে। অন্যদিকে, জ্যাকসন (মিসিসিপি) এবং স্টকটন (ক্যালিফোর্নিয়া) শহরে এই প্রোগ্রাম ইতোমধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হয়েছে।
স্টকটন শহরে, যেখানে প্রাক্তন মেয়র মাইকেল টাবসের নেতৃত্বে প্রোগ্রামটি শুরু হয়েছিল, ১২৫ জন বাসিন্দাকে প্রতি মাসে ৫০০ ডলার করে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের প্রাথমিক ফলাফল ইতিবাচক বলে জানা গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অর্থ প্রাপকরা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে, ঋণ পরিশোধ করতে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে ব্যবহার করছেন।
তবে, এই প্রোগ্রামটি কে সুবিধাভোগী হবেন এবং কী পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হবে, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। জোটের একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা বিদ্যমান সামাজিক কল্যাণ প্রোগ্রামগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নমনীয়ভাবে কাজ করবে। এই অস্পষ্টতা সমালোচকদের মধ্যে কিছুটা সন্দেহ তৈরি করেছে।
সমর্থকদের যুক্তি
ইউবিআই-এর সমর্থকরা মনে করেন, এই প্রোগ্রামটি ধনী ও দরিদ্র জনগণের মধ্যে সম্পদের বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। গবেষণায় দেখা গেছে, করোনা মহামারীর সময় ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সম্পদের ব্যবধান আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তিরা দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৩২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করেন, যেখানে নিম্ন ৫০ শতাংশ জনগণের হাতে মাত্র ২ শতাংশ সম্পদ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, গ্যারান্টিড ইনকাম দারিদ্র্য দূরীকরণে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করতে পারে।
সমর্থকদের মতে, এই প্রোগ্রামটি শুধু আর্থিক সহায়তাই দেয় না, বরং মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং উদ্যোক্তা মনোভাব বাড়ায়। স্টকটনের পাইলট প্রোগ্রামে দেখা গেছে, অর্থ প্রাপকদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ তাদের পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করেছেন, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক।
সমালোচকদের উদ্বেগ
যদিও গ্যারান্টিড ইনকামের সমর্থকরা এর সুবিধার কথা বলছেন, সমালোচকরা এই প্রোগ্রামের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই ধরনের প্রোগ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সরকারের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া, কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে নিয়মিত অর্থ প্রদান মানুষকে কাজের প্রতি নিরুৎসাহিত করতে পারে। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ফিনল্যান্ডে পরিচালিত একটি ইউবিআই পাইলট প্রোগ্রামে কর্মসংস্থানের উপর কোনো উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
এছাড়া, সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই প্রোগ্রামটি কীভাবে টেকসইভাবে পরিচালিত হবে। জ্যাক ডরসির মতো ব্যক্তিগত দাতাদের উপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়। তারা মনে করেন, এই প্রোগ্রামের জন্য সরকারি নীতি এবং কর ব্যবস্থার পুনর্গঠন প্রয়োজন, যা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হতে পারে।
অ্যান্ড্রু ইয়াং-এর ভূমিকা
জ্যাক ডরসি ছাড়াও, আরেকজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব অ্যান্ড্রু ইয়াং এই ইউবিআই আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার। প্রাক্তন ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্রপতি প্রার্থী এবং সফল উদ্যোক্তা ইয়াং তার ফ্রিডম ডিভিডেন্ড প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানদের প্রতি মাসে ১০০০ ডলার প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ২০২০ সালে তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল এই ইউবিআই।
ইয়াং ২০২০ সালের মে মাসে ঘোষণা দেন যে, তার অলাভজনক সংস্থা হিউম্যানিটি ফরওয়ার্ড নিউইয়র্কের ২০ জন বাসিন্দাকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য প্রতি মাসে ৫০০ ডলার করে দেবে। তিনি মনে করেন, এই ধরনের প্রোগ্রাম অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে এবং প্রযুক্তিগত অটোমেশনের কারণে চাকরি হ্রাসের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে গ্যারান্টিড ইনকামের প্রভাব
গ্যারান্টিড ইনকাম প্রোগ্রামটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং সমাজের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে, প্রাথমিক ফলাফল ইতিবাচক বলে মনে হচ্ছে। স্টকটনের প্রোগ্রামে দেখা গেছে, অর্থ প্রাপকরা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়া, এই প্রোগ্রামটি মানসিক চাপ কমাতে এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
তবে, এই প্রোগ্রামটি জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হলে আরও বড় পরিসরে গবেষণা এবং অর্থায়ন প্রয়োজন। জ্যাক ডরসি এবং অ্যান্ড্রু ইয়াং-এর মতো ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত দান এই প্রোগ্রামের পাইলট পর্যায়ে সফল হলেও, দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সমাধানের জন্য সরকারি নীতি এবং জনসমর্থন অপরিহার্য।
জ্যাক ডরসির ৩ মিলিয়ন ডলার দান এবং গ্যারান্টিড ইনকাম প্রোগ্রামের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন ধরনের সামাজিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এই প্রোগ্রামটি দারিদ্র্য দূরীকরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং মহামারী-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে, এর দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক নীতি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের সমর্থনের উপর। ডরসি এবং ইয়াং-এর মতো ব্যক্তিদের উদ্যোগ এই পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে আশার আলো দেখাচ্ছে, তবে এটি জনগণের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।





















