জ্যাক ডরসির গ্যারান্টিড ইনকাম উদ্যোগ ও আমেরিকার নতুন পরীক্ষা

বিশ্ব অর্থনীতি যখন করোনা মহামারীর ধাক্কা সামলে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক ঐতিহাসিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষার নতুন অধ্যায় রচিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদের চারণভূমি হিসেবে পরিচিত আমেরিকায় হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে একটি সামাজিক নিরাপত্তা নীতি ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (ইউবিআই) বা গ্যারান্টিড ইনকাম (নিশ্চিত আয়)।
এই যুগান্তকারী সামাজিক পরীক্ষায় অন্যতম অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হন টুইটার (বর্তমানে 'এক্স') ও স্কয়ারের (বর্তমানে 'ব্লক') সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ধনকুবের জ্যাক ডরসি। তিনি এই উদ্যোগের জন্য ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান প্রদান করেন, যা আমেরিকার বিভিন্ন নগরে পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত 'গ্যারান্টিড ইনকাম' প্রোগ্রাম ত্বরান্বিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সমতা আনয়ন এবং প্রযুক্তিগত অটোমেশনের যুগে মানুষের অর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর? এটি কি কেবল ধনকুবেরদের দাতব্য উদ্যোগ নাকি একটি দীর্ঘমেয়াদী টেকসই অর্থনৈতিক মডেলের সূচনা? এই নিবন্ধে আমরা জ্যাক ডরসির এই ৩ মিলিয়ন ডলারের অনুদান, 'মেয়রস ফর আ গ্যারান্টিড ইনকাম' জোটের ভূমিকা, স্টকটনের সফল কেস স্টাডি, অ্যান্ড্রু ইয়াং-এর রাজনৈতিক প্রভাব, এবং সমর্থকদের যুক্তি ও সমালোচকদের উদ্বেগের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করব।
ইউবিআই (UBI) ও গ্যারান্টিড ইনকাম: ধারণাগত পার্থক্য ও বিবর্তন
আমেরিকায় চলমান এই আন্দোলনকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে সর্বপ্রথমে 'ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম' (ইউবিআই) এবং 'গ্যারান্টিড ইনকাম'-এর মৌলিক ও সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো বোঝা প্রয়োজন।
সার্বজনীন মৌলিক আয় বা UBI কী?
সার্বজনীন মৌলিক আয় (Universal Basic Income) হলো একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি, যেখানে কোনো দেশের বা অঞ্চলের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে তার আর্থিক অবস্থা, কর্মসংস্থান বা সম্পদের পরিমাণ নির্বিশেষে সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট সংস্থা থেকে নিয়মিতভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। এর মূল কথা হলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার, যা কোনো শর্তের অধীন হওয়া উচিত নয়।
গ্যারান্টিড ইনকাম (Guaranteed Income) কী?
অন্যদিকে, 'গ্যারান্টিড ইনকাম' হলো ইউবিআই-এর একটি নির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী সংস্করণ। এটি পুরোপুরি সার্বজনীন নয়; বরং এটি সমাজের নির্দিষ্ট নিম্ন আয়ের বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ করা হয়। এই ব্যবস্থায় সুবিধাভোগীরা নিয়মিত এবং শর্তহীনভাবে একটি ন্যূনতম আয় লাভ করেন, যাতে তারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে জ্যাক ডরসি ও বিভিন্ন শহরের মেয়ররা মূলত এই 'গ্যারান্টিড ইনকাম' মডেলটিকেই বাস্তবায়িত করছেন।
ধারণার ঐতিহাসিক শিকড়
ইউবিআই বা নিশ্চিত আয়ের ধারণা কিন্তু একেবারে নতুন নয়।
১৭৯৭ সালে আমেরিকান চিন্তাবিদ থমাস পেইন তাঁর 'আগ্রারিয়ান জাস্টিস' নিবন্ধে ভূমির মালিকানার বিপরীতে প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয় ফান্ড থেকে নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন।
১৯৬০-এর দশকে আমেরিকার প্রখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দারিদ্র্য উচ্ছেদে সরাসরি 'গ্যারান্টিড ইনকাম'-এর জোর দাবি তুলেছিলেন।
এমনকি নোবেলজয়ী মুক্তবাজার অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান দারিদ্র্য বিমোচনে 'নেগেটিভ ইনকাম ট্যাক্স' (Negative Income Tax)-এর পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা নিশ্চিত আয়েরই এক বৈজ্ঞানিক রূপ।
মহামারী-পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই পুরনো ধারণাই এক নতুন কার্যকর সামাজিক ড্রাইভ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
'মেয়রস ফর আ গ্যারান্টিড ইনকাম' (MGI): স্থানীয় নেতাদের এক অভূতপূর্ব জোট
আমেরিকায় গ্যারান্টিড ইনকাম নীতিকে রাজ্য ও জাতীয় নীতিতে পরিণত করার সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস হলো 'মেয়রস ফর আ গ্যারান্টিড ইনকাম' (Mayors for a Guaranteed Income - MGI)।
জোটের গঠন ও উদ্দেশ্য
২০২০ সালের জুন মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার স্টকটন শহরের তৎকালীন তরুণ ও প্রগতিশীল মেয়র মাইকেল টাবস (Michael Tubbs)-এর নেতৃত্বে আমেরিকার এক ডজন শহরের মেয়র মিলে এই জোট গঠন করেন। এই জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল:
১. নির্দিষ্ট পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি নাগরিকদের অ্যাকাউন্টে নগদ অর্থ পাঠানো।
২. সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে নিশ্চিত আয়ের কার্যকারিতা প্রমাণ করা।
৩. ক্যাপিটল হিলে কেন্দ্রীয়ভাবে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের ওপর নীতিগত চাপ সৃষ্টি করা।
অন্তর্ভুক্ত প্রধান শহর ও কভারেজ
বর্তমানে এই জোটে আমেরিকার বহু বড় ও মাঝারি শহরের মেয়র যুক্ত হয়েছেন। লস অ্যাঞ্জেলেস, আটলান্টা, নিউয়ার্ক (নিউ জার্সি), জ্যাকসন (মিসিসিপি), শিকাগো, এবং স্টকটনের মতো শহরগুলো এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। MGI জোটের হিসেব অনুযায়ী, এই শহরগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উদ্যোগ প্রায় ৭ মিলিয়ন আমেরিকানদের জীবনে ইতিবাচক আর্থিক নিরাপত্তা ও টেকসই প্রভাব ফেলবে।
জ্যাক ডরসি এবং 'স্টার্ট স্মল' (Start Small): প্রযুক্তির মুনাফা থেকে সামাজিক ইনসাফ
টুইটারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম 'স্কয়ার' (বর্তমান নাম 'ব্লক')-এর সিইও জ্যাক ডরসি আমেরিকান প্রযুক্তিশিল্পে এক স্বতন্ত্র ও প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। নিশ্চিত আয়ের আন্দোলনকে বেগবান করতে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩ মিলিয়ন ডলারের সরাসরি অনুদান
জ্যাক ডরসি 'মেয়রস ফর আ গ্যারান্টিড ইনকাম' (MGI) জোটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিভিন্ন শহরে পাইলট প্রজেক্ট চালুর জন্য ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান প্রদান করেন। এই অর্থ সরাসরি অলাভজনক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন শহরের নির্দিষ্ট পরিবারগুলোকে নগদ অর্থ সহায়তার অংশ হিসেবে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
'স্টার্ট স্মল' (Start Small) ফান্ডের দর্শন
এই ৩ মিলিয়ন ডলার মূলত ডরসির বিশাল দাতব্য ফান্ড 'স্টার্ট স্মল' (Start Small)-এর অংশ। ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে মহামারী যখন তুঙ্গে, তখন ডরসি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের প্রায় ২৮ শতাংশ যার মূল্য ছিল ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (স্কয়ারের শেয়ার) সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের জন্য উৎসর্গ করার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।
ডরসির এই দাতব্য দর্শনের মূল ভিত্তি হলো তিন তিনটি বিশ্ব সংকট মোকাবিলা করা:
১. মহামারী ও জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলা।
২. মেয়েদের শিক্ষা ও প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষা।
৩. ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম (ইউবিআই) পরীক্ষার মাধ্যমে বৈশ্বিক দারিদ্র্য বিমোচন।
ডরসির দৃষ্টিভঙ্গি ও সিলিকন ভ্যালি কালচার
জ্যাক ডরসি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও অটোমেশনের ফলে ভবিষ্যতে লাখ লাখ প্রচলিত চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই চরম প্রযুক্তিগত রূপান্তরের দিনে মানুষের ন্যূনতম বেঁচে থাকার গ্যারান্টি দিতে পারে কেবল 'ইউবিআই'। ডরসি তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন:
"এই গ্যারান্টিড ইনকাম প্রোগ্রাম মানুষকে কেবল সাহায্যই করবে না; বরং এটি তাদের নিজস্ব সম্ভাবনাকে বিকাশের স্বাধীন সুযোগ দেবে এবং পরিবারে স্থিতিশীলতা এনে দেবে।"
কেস স্টাডি: স্টকটন ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্ট ডেমোনস্ট্রেশন (SEED)
যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক গ্যারান্টিড ইনকামের সবচেয়ে সফল ও আলোচিত গবেষণাগার বলা হয় ক্যালিফোর্নিয়ার স্টকটন শহরকে। সেখানকার 'স্টকটন ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্ট ডেমোনস্ট্রেশন' (SEED) প্রকল্পটি বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদদের কাছে এক মডেল টেস্টে পরিণত হয়েছে।
প্রকল্পের গঠন ও অর্থায়ন
স্টকটন শহরের দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা ১২৫ জন বাসিন্দাকে দ্বৈবচয়ন (Random selection) পদ্ধতিতে বাছাই করা হয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে টানা ২৪ মাস পর্যন্ত তাদের প্রতি মাসে কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই ৫০০ ডলার করে প্রদান করা হয়।
নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক গবেষণার চাঞ্চল্যকর ফলাফল
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার অর্থনীতিবিদরা এই ১২৫ জনের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করে যে তথ্য প্রকাশ করেন, তা সমালোচকদের অনেক ধারণাকেই মিথ্যা প্রমাণিত করেছে:
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি (Employment Surge): সমালোচকরা দাবি করেছিলেন যে বিনামূল্যে টাকা পেলে মানুষ কাজ করা ছেড়ে দেবে। কিন্তু ফলাফলে দেখা যায়, প্রকল্প চালুর এক বছরের মাথায় অনুদানপ্রাপ্তদের মধ্যে পূর্ণকালীন কাজ (Full-time employment) করার হার ২৮% থেকে বেড়ে ৪০%-এ উন্নীত হয়!
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ঋণ হ্রাস: সুবিধাভোগীরা এই টাকা দিয়ে তাদের জরুরি মেডিকেল বিল, ঋণের কিস্তি এবং জরুরি গাড়ি মেরামতের কাজ সম্পন্ন করেছেন যা তাদের কাজে যাতায়াত অব্যাহত রাখতে সাহায্য করেছিল।
মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি: নিয়মিত আয়ের নিশ্চিন্ততায় অনুদানপ্রাপ্তদের মধ্যে তীব্র বিষণ্নতা, উৎকণ্ঠা ও মানসিক চাপের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।
শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ: সমীক্ষায় জানা গেছে, অর্থ প্রাপকদের ৩৭ শতাংশ এই টাকার একটি অংশ নতুন কোনো প্রশিক্ষণ বা পড়াশোনায় বিনিয়োগ করেছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের উচ্চ আয়ের কাজের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
ইউবিআই সমর্থক ও অর্থনীতিবিদদের মূল শক্ত যুক্তিগুলো
আমেরিকায় গ্যারান্টিড ইনকাম নীতির পক্ষে যারা কথা বলছেন, তারা কেবল মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়; বরং চরম অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পরিসংখ্যান দিয়ে তাদের দাবি উত্থাপন করছেন।
চরম ধনবৈষম্য হ্রাস ও সম্পদের পুনর্বন্টন
যুক্তরাষ্ট্রে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যবর্তী ব্যবধান দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের উপাত্ত অনুযায়ী, আমেরিকার শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তি দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৩২ শতাংশের মালিক। অন্যদিকে, দেশের নিম্ন ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মাত্র ২ শতাংশ সম্পদ!
মহামারীকালে এই ব্যবধান আরও তীব্র হয়েছে। গ্যারান্টিড ইনকাম নীতি নিচের স্তরের মানুষের হাতে সরাসরি ক্রয়ক্ষমতা তুলে দিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল করে এবং বৈষম্য কমায়।
আমলাতান্ত্রিক অপচয় রোধ ও মানবিক মর্যাদা
ঐতিহ্যগত সরকারি ওয়েলফেয়ার প্রোগ্রামগুলোতে (যেমন খাদ্য সহায়তা বা ফুড স্ট্যাম্প, আবাসন ভাতা) প্রচুর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নজরদারি থাকে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের বড় অংশ প্রশাসনিক কাজেই অপচয় হয়। গ্যারান্টিড ইনকাম অনুদানগ্রহীতাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেয় কারণ একজন দরিদ্র মানুষ নিজেই সবচেয়ে ভালো বোঝেন যে তাঁর এই মুহূর্তে ওষুধের প্রয়োজন, নাকি সন্তানের স্কুলের ফি দেওয়া দরকার।
প্রযুক্তি ও অটোমেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে আগামী দুই দশকে আমেরিকার লক্ষ লক্ষ ম্যানুফ্যাকচারিং, কাস্টমার সার্ভিস ও লজিস্টিকস খাতের চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়বে। ইউবিআই এই সম্ভাব্য গণ-বেকারত্বের বিরুদ্ধে একটি সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করবে।
সমালোচকদের তীব্র উদ্বেগ ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা
যদিও গ্যারান্টিড ইনকামের ধারণা শুনতে চমৎকার ও মানবিক, কিন্তু ডানপন্থী অর্থনীতিবিদ, নীতি নির্ধারক এবং অনেক রাজস্ব বিশ্লেষক এর দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
রাজকোষ বা বাজেটের ওপর বিশাল অর্থনৈতিক চাপ
জাতীয় পর্যায়ে ৩০০ মিলিয়ন আমেরিকানদের প্রতি মাসে ১,০০০ ডলার করে ইউবিআই দিতে হলে বছরে প্রায় ৩.৫ ট্রিলিয়ন (Trillion) ডলার প্রয়োজন! এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমগ্র বার্ষিক বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি। এতো বিপুল অর্থ যোগান দিতে হলে জনগণকে অতিরিক্ত করের বোঝা বইতে হবে অথবা বিশাল রাষ্ট্রীয় ঋণের সাগরে ডুবতে হবে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে (Inflation) উসকে দিতে পারে।
কর্মবিমুখতা ও সামাজিক অলসতার আশঙ্কা
অনেক সমালোচক মনে করেন, কাজ না করেও যদি একটি নির্দিষ্ট আয় নিশ্চিত থাকে, তবে কম বেতনের জরুরি কাজগুলোতে (যেমন- পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ক্রু) শ্রমিক সংকট দেখা দেবে।
আন্তর্জাতিক পরীক্ষার অভিজ্ঞতা: ফিনল্যান্ডের কেস
২০১৭-২০১৮ সালে ফিনল্যান্ড সরকার ২,০০০ জন বেকার নাগরিককে নিয়ে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ইউবিআই পরীক্ষা চালিয়েছিল। এতে প্রতি মাসে ৬৩০ ইউরো করে শর্তহীনভাবে দেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা যায়:
অনুদান প্রাপ্তদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুখের সূচক উন্নত হয়েছিল।
কিন্তু কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে এই অর্থ কোনো উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেনি। তারা আগের মতোই বেকার ছিলেন।
ব্যক্তি-দাতাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
জ্যাক ডরসি ৩ মিলিয়ন বা ১ বিলিয়ন ডলার দিতে পারেন, কিন্তু সরকারি নীতি ছাড়া বেসরকারি দাতাদের অর্থে দিনের পর দিন ৩০০ মিলিয়ন মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। তাই এটি কেবল পাইলট প্রজেক্টেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
রাজনৈতিক আন্দোলন: অ্যান্ড্রু ইয়াং এবং 'ফ্রিডম ডিভিডেন্ড'
মার্কিন মূলধারার রাজনীতিতে ইউবিআই-কে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান যে মানুষটির, তিনি হলেন সফল প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও সাবেক ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী অ্যান্ড্রু ইয়াং (Andrew Yang)।
ফ্রিডম ডিভিডেন্ড (Freedom Dividend) প্রস্তাবনা
২০২০ সালের ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাইমারিতে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে অ্যান্ড্রু ইয়াং তাঁর প্রচারণার মূল স্তম্ভ করেছিলেন 'ফ্রিডম ডিভিডেন্ড'-কে। তাঁর প্রস্তাব ছিল:
১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতিটি আমেরিকান নাগরিককে প্রতি মাসে ১,০০০ ডলার (বছরে ১২,০০০ ডলার) শর্তহীনভাবে প্রদান করা হবে। এটি অর্থায়ন করা হবে মূলত একটি প্রযুক্তি সংগ্রাহক মূল্য সংযোজন কর (Value-Added Tax - VAT) আরোপের মাধ্যমে, যা গুগল, আমাজন ও ফেসবুকের মতো টেক জায়ান্টদের স্বয়ংক্রিয় মুনাফার ওপর ধার্য করা হবে।
হিউম্যানিটি ফরওয়ার্ড (Humanity Forward)-এর উদ্যোগ
নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর পরও ইয়াং তাঁর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে গঠন করেন অলাভজনক সংস্থা 'হিউম্যানিটি ফরওয়ার্ড'। ২০২০ সালের মে মাসে তিনি ঘোষণা দেন যে, তাঁর সংস্থা নিউইয়র্ক সিটির ২০ জন সুবিধাবঞ্চিত বাসিন্দাকে আগামী ৫ বছরের জন্য প্রতি মাসে ৫০০ ডলার করে প্রদান করবে। এই ধরনের উদ্যোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে নিশ্চিত আয়ের দাবিকে এক নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রদান করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইউবিআই ও গ্যারান্টিড ইনকাম প্রকল্পের তুলনামূলক সারণী
নিচে আমেরিকায় পরিচালিত প্রধান প্রধান গ্যারান্টিড ইনকাম ও ইউবিআই পাইলট প্রকল্পগুলোর তথ্যবহুল তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
প্রকল্পের নাম / শহর | মূল অর্থায়নকারী / উদ্যোক্তা | সুবিধাভোগী সংখ্যা | মাসিক অনুদানের পরিমাণ | মেয়াদকাল | প্রধান অর্জিত ফলাফল ও আপডেট |
স্টকটন (SEED), ক্যালিফোর্নিয়া | মাইকেল টাবস ও দাতব্য সংস্থা | ১২৫ জন অধিবাসী | $৫০০ | ২৪ মাস | পূর্ণকালীন চাকরি পরিধি ১২% বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য উন্নতি |
MGI জোট প্রজেক্টস (মাল্টি-সিটি) | জ্যাক ডরসি ($৩M) ও MGI | হাজার হাজার পরিবার | $৫০০ - $১,০০০ | ১ থেকে ২ বছর | খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, প্রাথমিক ঋণের বোঝা লাঘব |
কম্প্যাশনেট আটলান্টা, জর্জিয়া | আটলান্টা সিটি মেয়র ও MGI | ২৫০ জন কৃষ্ণাঙ্গ নারী | $৮৫০ | ২৪ মাস | নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, খুচরা ব্যবসায় বিনিয়োগ |
হিউম্যানিটি ফরওয়ার্ড, নিউইয়র্ক | অ্যান্ড্রু ইয়াং ও ব্যক্তিগত অনুদান | ২০ জন অধিবাসী | $৫০০ | ৫ বছর | দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক স্থিতিশীলতার ট্রায়াল অব্যাহত |
শিকাগো রেজিলিয়েন্স ফান্ড, ইলিনয় | শিকাগো সিটি মেয়র ও সরকারি বাজেট | ৫,০০০ পরিবার | $৫০০ | ১২ মাস | মহামারী পরবর্তী ক্ষতি কাটিয়ে ওঠায় বিশাল সমর্থন |
ফিনল্যান্ড ইউবিআই ট্রায়াল (আন্তর্জাতিক) | ফিনল্যান্ড সরকার | ২,০০০ জন বেকার | €৬৩০ (ইউরো) | ২৪ মাস | মানসিক চাপ কমলেও কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন আসেনি |
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও জাতীয় পলিসিতে উত্তরণের নীতিগত রোডম্যাপ
জ্যাক ডরসির অনুদান কিংবা স্থানীয় শহরগুলোর পাইলট প্রকল্প প্রমাণ করেছে যে দরিদ্র মানুষের হাতে সরাসরি টাকা দিলে তারা তা নষ্ট করে না; বরং নিজেদের জীবনের সুরক্ষায় বুদ্ধিমানের মতো ব্যয় করে। কিন্তু এই পাইলট প্রকল্পগুলোকে কীভাবে একটি স্থায়ী জাতীয় আইনি কাঠামোয় রূপান্তরিত করা সম্ভব?
প্রচলিত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
আমেরিকায় বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা ফুড স্ট্যাম্প (SNAP), গৃহহীনদের ভাতা এবং শিশু ভাতা প্রদান সংক্রান্ত ডজনখানেক জটিল সংস্থা চালু রয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এই জটিল সংস্থাগুলোর বিশাল বাজেট ও আমলাতন্ত্রকে বিলুপ্ত করে সব টাকা এক ছাতার নিচে এনে সরাসরি 'গ্যারান্টিড ইনকাম' হিসেবে নাগরিকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হলে রাষ্ট্রের হাজার কোটি ডলার সাশ্রয় হবে।
অর্থায়নের জন্য টেকসই কর কাঠামোর মডেল
জাতীয় পর্যায়ে ইউবিআই বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে কয়েকটি বিশেষ রাজস্ব উৎসের ওপর নির্ভর করতে হবে:
ভ্যালু এডেড ট্যাক্স (VAT): ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো যুক্তরাষ্ট্রে একটি নির্দিষ্ট ভ্যাট চালু করা, যা প্রযুক্তি পণ্যের লেনদেনে প্রযুক্ত হবে।
কার্বন ট্যাক্স (Carbon Tax): পরিবেশ দূষণকারী জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপর ট্যাক্স বসিয়ে প্রাপ্ত অর্থ সরাসরি নাগরিকদের 'কার্বন লভ্যাংশ' হিসেবে বণ্টন করা।
ডাটা লভ্যাংশ (Data Dividend): আমাজন, মেটা ও গুগলের মতো প্রকাণ্ড প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত উপাত্ত বা ডাটা ব্যবহার করে যে বিলিয়ন ডলার ব্যবসা করে, তার একটি অংশ সার্বজনীন নাগরিক ফান্ডে জমা দেওয়া।
রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা
আমেরিকান ক্যাপিটালিজমে 'বিনা শ্রমে টাকা দেওয়া'-কে ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক অপরাধ বা অলসতার উৎসাহক হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু জ্যাক ডরসি ও অ্যান্ড্রু ইয়াং-এর আন্দোলনের ফলে এই চিন্তা চেতনায় বড় পরিবর্তন এসেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট রাজনীতিকরা এখন বুঝতে পারছেন যে, মধ্যবিত্তের সামাজিক পতন থামাতে হলে নগদ অর্থ সহায়তার বিকল্প নেই।
উপসংহার
আমেরিকায় দারিদ্র্য নিরসন ও অর্থনৈতিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জ্যাক ডরসির ৩ মিলিয়ন ডলারের অনুদান এবং 'মেয়রস ফর আ গ্যারান্টিড ইনকাম'-এর প্রয়াস কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আর্থিক সাহায্য নয়; এটি মূলত ২৫ শতকের নতুন অর্থনৈতিক সমাজদর্শনের এক ঐতিহাসিক মহড়া।
গ্যারান্টিড ইনকাম কোনো অলৌকিক যাদুকাঠি নয় যা রাতারাতি সব সামাজিক সমস্যা দূর করে দেবে। এর পেছনে বিশাল রাজস্বের চাপ, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং কর্মবিমুখতার মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকি বিদ্যমান। তবে স্টকটন কিংবা নিউইয়র্কের পরীক্ষামূলক ফল স্পষ্টভাবে আমাদের শেখায় যে দারিদ্র্য মূলত মানুষের চরিত্রের বা যোগ্যতার ভুল নয়; দারিদ্র্য হলো নিছকই 'অর্থের অভাব'।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়জয়কারের এই যুগে, যেখানে যন্ত্র মানুষের কাজ কেড়ে নিচ্ছে, সেখানে মানুষকে স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য টিকে থাকার ইঁদুর দৌড়ে না ফেলে একটি ন্যূনতম আয়ের নিরাপত্তা দেওয়া মানবিক সভ্যতারই এক চরম দায়িত্ব। জ্যাক ডরসি, অ্যান্ড্রু ইয়াং এবং আমেরিকার প্রগতিশীল মেয়ররা যে পথ দেখাচ্ছেন, তা যদি সফল হয়, তবে এটি কেবল আমেরিকায় নয়, বরং পুরো বিশ্বের দরবারে একটি নতুন ন্যায়ভিত্তিক মানবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।























