কেন বাংলাদেশীরা রাশিয়ান বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করছে? জীবিকার তাগিদ নাকি প্রতারণা?

একদিকে বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ, অন্যদিকে মাইনের শব্দ, শূন্যে উড়তে থাকা ড্রোন আর কামানের গোলার গর্জন। হাজার হাজার মাইল দূরের বরফে ঢাকা ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে আজ প্রতিদিন জীবনবাজি রাখছেন একদল প্রবাসী বাংলাদেশী যুবক। কোনো দেশের পক্ষে আদর্শিক লড়াই নয়, বরং ভালো জীবনের স্বপ্ন, উচ্চ উপার্জনের লোভ, কিংবা প্রতারণার ফাঁদে পড়ে তারা আজ রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর হয়ে 'ফ্রন্টলাইনে' বা সম্মুখসমরে লড়াই করছেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া মাদারীপুরের যুবক মোহাম্মদ সোহেল সর্দার নিরবের গল্পটি এই বাস্তবতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তবে সোহেলের মতো যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় সেনাপদক পাওয়ার গল্প দেখাচ্ছেন, তাদের আড়ালে রয়ে গেছে আরও শত শত প্রবাসীর কান্নার ইতিহাস যারা দালালের প্রতারণায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা ডেলিভারি ম্যানের চাকরি পেয়ে রাশিয়ায় গিয়ে আজ কফিনে বন্দী হয়ে দেশে ফিরছেন।
কিন্তু কেন এবং কীভাবে আন্তর্জাতিক এই ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ছেন বাংলাদেশী যুবকেরা? কীভাবে রুশ বাহিনীর 'মার্সেনারি' বা ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে কিংবা চুক্তিভিত্তিক নিয়মিত সৈনিক হিসেবে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে? এই সম্পূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
মাদারীপুরের সোহেল সর্দার নিরব: রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে এক বীরত্বের চিত্রনাট্য
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ভয়াবহ ফ্রন্টলাইন থেকে নিয়মিত ভিডিও আপলোড করে ফেসবুক ও টিকটকে এক রক্তহিম করা বাস্তবতার মুখোমুখি করেছেন মোহাম্মদ সোহেল সর্দার নিরব। তাঁর গ্রামের বাড়ি বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলায়। সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারের এই সন্তান জীবিকার সন্ধানে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন।
সাধারণ শ্রমিক থেকে রাশিয়ার নিয়মিত সৈন্য
পরিবারের স্বজনেরা জানতেন সোহেল রাশিয়ায় অন্যান্য সাধারণ প্রবাসীদের মতোই কোনো ড্রাইভিং বা ক্লিনিং পেশায় কাজ করছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি যুক্ত হন রাশিয়ান সশস্ত্র বাহিনীতে। সেখানে প্রয়োজনীয় সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি সরাসরি ইউক্রেন সীমান্তে যুদ্ধের সম্মুখসমরে (Frontline) প্রেরিত হন।
আজ তিনি কেবল একজন চুক্তিভিত্তিক সৈনিক নন, বরং রাশিয়ান নাগরিকদের সমকক্ষ সামরিক মর্যাদাপ্রাপ্ত একজন সেনা।
Dynamic ভিডিওগুলোতে ফ্রন্টলাইনের শরীর শিহরে ওঠা দৃশ্য
সোহেল সর্দারের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আপলোড করা ভিডিওগুলো দেখলে মনে হবে যেন কোনো রোমাঞ্চকর হলিউড অ্যাকশন সিনেমা চলছে কিন্তু এর প্রতিটি দৃশ্যই শতভাগ সত্যি ও নির্মম।
মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়ার অলৌকিক গল্প: একটি ভিডিওতে তিনি তাঁর পরা লাইফ জ্যাকেট বা বুলেটপ্রুফ ভেস্ট খুলে দেখান। ইউক্রেনীয় বাহিনীর দিকে থেকে আসা একটি তপ্ত গুলি কীভাবে তাঁর প্রথম জ্যাকেটটি ফুটো করে দ্বিতীয় জ্যাকেটের গায়ে এসে আটকে যায়। মাত্র কয়েক মিলিমিটারের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান তিনি।
ড্রোন শিকার ও প্রযুক্তি যুদ্ধ: আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হলো ড্রোন। সোহেলের হাতে থাকা স্বয়ংক্রিয় একে-৪৭ (AK-47) রাইফেল এবং অ্যান্টেনাযুক্ত বিশেষ অ্যান্টি-ড্রোন গান (Anti-Drone Gun) দিয়ে আক্রমণ করতে আসা বিশাল আকৃতির এক ইউক্রেনীয় ড্রোনকে গুলি করে ভূপাতিত করার দৃশ্য তিনি সরাসরি ক্যামেরায় ধারণ করেন।
সহযোদ্ধাদের লাশ ও মাইনের ভয়: আরেকটি হৃদয়বিদারক ভিডিওতে দেখা যায়, ইউক্রেনীয় বাহিনীর গুলিতে তাঁর চারজন সহযোদ্ধা ঘটনাস্থলেই নিহত হন। শত্রুর কামানের গোলার মুখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিহত সহযোদ্ধাদের রক্তাক্ত লাশ টেনে হিঁচড়ে নিরাপদ ব্যঙ্কারে নিয়ে আসছেন তিনি। চারপাশে পুঁতে রাখা সজীব মাইনের (Landmines) মাঝ দিয়েই তিনি হেঁটে চলেন নির্দ্বিধায়।
রুশ কমান্ডারের 'হাই' বার্তা: যুদ্ধের চরম মানসিক চাপের মাঝেও এক ভিডিওতে তাঁর রাশিয়ান সেনা কমান্ডারকে বাংলাদেশী সমর্থকদের উদ্দেশ্যে হাসিমুখে 'Hi' জানাতে দেখা যায়, যা বাংলাদেশীদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সেনাপদক লাভ ও রাশিয়ার নাগরিকত্ব
সম্প্রতি এক আবেগঘন ভিডিওতে দেখা যায়, যুদ্ধের ময়দানে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর এক জমকালো কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে সোহেলকে বিশেষ military সম্মাননা বা 'সেনাপদক' (Military Medal of Valor) প্রদান করা হচ্ছে।
বুকে পদক জড়িয়ে, মুখে গর্বের হাসি নিয়ে তিনি বলেন: "আলহামদুলিল্লাহ, সবাই দোয়া করবেন। একজন বিদেশী হিসেবে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর এই সম্মান পাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা।"
তিনি আরও জানান, তাঁকে কেবল সাময়িক ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে দেখা হয়নি, বরং রাশিয়ার একজন বীর সেনা হিসেবেই এই পদক দেওয়া হয়েছে। এই বীরত্বের দরুন তিনি ইতিমধ্যে রাশিয়ার স্থায়ী নাগরিকত্ব (Russian Citizenship) লাভ করেছেন।
পর্দার পেছনের অন্ধকার: প্রতারণার ফাঁদে রক্তে ভেজা চুক্তি
সোহেল সর্দারের গল্পটি শুনে আপাতদৃষ্টিতে এটিকে অনেক যুবকের কাছে 'অ্যাডভেঞ্চার' বা 'উচ্চ উপার্জনের দারুণ সুযোগ' মনে হতে পারে। কিন্তু এর পেছনের বাস্তবতা অত্যন্ত অন্ধকার ও বিভীষিকাময়। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে এক রোমহর্ষক মানবপাচার ও প্রতারণার কাহিনী।
কীভাবে কাজ করে পাচারকারী দালাল চক্র?
বাংলাদেশ ও রাশিয়ায় সক্রিয় একশ্রেণীর অসাধু দালাল চক্র অনলাইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এজেন্সির মাধ্যমে তরুণদের আকর্ষণীয় চাকরির অফার দেয়।
ভুয়া নিয়োগপত্র: মস্কো বা সেন্ট পিটার্সবার্গে হোটেল নিরাপত্তা কর্মী, ক্যাফে ওয়েটার, নির্মাণ শ্রমিক কিংবা ফুড ডেলিভারি ম্যান হিসেবে মাসে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা বেতনের লোভ দেখানো হয়।
রাশিয়ান ভাষার চুক্তিপত্র: রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তরুণদের হাতে রাশিয়ান ভাষায় লেখা কয়েকটি চুক্তিপত্র তুলে দেওয়া হয়। রুশ ভাষা না জানার কারণে যুবকেরা ভাবেন এগুলো সাধারণ কাজের পারমিট। কিন্তু মূলত সেগুলো ছিল 'রাশিয়ান আর্মড ফোর্সেসে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক যোগদানের সম্মতিপত্র'।
পাসপোর্ট জব্দকরণ: বিমানে ওঠার পরপরই বা মস্কো পৌঁছানোর পর তাদের মূল পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। ফলে তারা আইনিভাবে পুরোপুরি আটকা পড়ে যান।
সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ ও 'ক্যানন ফডার'
সামরিক বিজ্ঞানে 'ক্যানন ফডার' বলতে এমন সৈন্যদের বোঝানো হয় যাদের শুধুমাত্র শত্রুর গোলাবর্ষণ ও মাইনফিল্ড চিহ্নিত করার জন্য সামনের সারিতে 'বলির পাঠা' হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সাধারণ তরুণদের যাদের কোনো দিন বন্দুক স্পর্শ করার অভিজ্ঞতাও ছিল না, তাদের মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহের এক নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি ডনবাস, বাহমুত বা কুর্স্ক অঞ্চলের কঠিন ফ্রন্টলাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সম্মুখসমরে পা দেওয়া মাত্রই শত শত বিদেশী নাগরিক ড্রোন হামলা ও মিসাইল হানায় প্রাণ হারাচ্ছেন।
কেন বাংলাদেশী যুবকেরা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্ত হচ্ছেন?
বাংলাদেশী তরুণদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো জীবনঘাতী ময়দানে যোগ দেওয়ার পেছনে একাধিক জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক কারণ সক্রিয় রয়েছে।
আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও বেকারত্ব: বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অভাব এবং তরুণদের একটি বড় অংশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসার দরুন তারা যেকোনো মূল্যে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে চান। স্বজনদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং ঋণের বোঝা মেটাতে তারা জীবন বাজি রাখতে দ্বিধা করেন না।
রাশিয়ার নতুন নাগরিকত্ব আইন (Decree on Citizenship): ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ সেনা ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়ে ২০২৩-২০২৪ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক নতুন অধ্যাদেশ জারি করেন। এই আইন অনুযায়ী:
কোনো বিদেশী নাগরিক যদি রাশিয়ান সশস্ত্র বাহিনীর সাথে অন্তত ১ বছরের জন্য সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন, তবে তিনি এবং তাঁর পরিবার অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে রাশিয়ার স্থায়ী নাগরিকত্ব বা পাসপোর্ট পাবেন।
সাথে থাকবে প্রতি মাসে বিশাল অংকের বেতন (প্রায় ২,০০০ থেকে ৩,০০০ মার্কিন ডলার) এবং যুদ্ধক্ষেত্রে আহত বা নিহত হলে মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ।
ইউরোপে প্রবেশের স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশী তরুণদের কাছে রাশিয়ান পাসপোর্ট পাওয়া এক বিশাল সুযোগ হিসেবে ধরা দেয়।
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব ও 'গ্ল্যামারাইজেশন': সোহেল সর্দারের মতো তরুণদের পোস্ট করা অ্যাকশন-প্যাকড ভিডিও দেখে দেশের অনেক তরুণ এটিকে কোনো রোমাঞ্চকর কাজ বা ভিডিও গেমের মতো ভেবে ভুল করছেন। যুদ্ধের মানসিক যন্ত্রণা, সহযোদ্ধার অঙ্গচ্ছেদ বা নির্মম মৃত্যুর চিত্র সোশ্যাল মিডিয়ার ছোট রিলসে ফুটে ওঠে না, যা তরুণদের ভুল পথে চালিত করছে।
বাংলাদেশী প্রবাসীদের রাশিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণের চিত্র
বিষয় / ক্ষেত্র | প্রামাণ্য বিবরণ ও বাস্তবতা |
আক্রান্ত মূল অঞ্চলসমূহ | মাদারীপুর, কুমিল্লা, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও টাঙ্গাইল এলাকা। |
আকর্ষণের মূল উপাদান | রাশিয়ার পাসপোর্ট/নাগরিকত্ব লাভ। যুদ্ধে আহত/নিহত হলে বিশাল বীমা সুবিধা। |
দালাল চক্রের মূল ধোঁকা | সিভিল ড্রাইভার, হেলপার বা ক্লিনার বানানোর কথা বলে রাশিয়ান ভাষায় সেনা চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো। |
সামরিক প্রশিক্ষণের মেয়াদ | মাত্র ১৫ দিন থেকে ৩ সপ্তাহ (যা ফ্রন্টলাইনের জন্য একেবারেই অপ্রতুল)। |
ফ্রন্টলাইনে প্রধান ঝুঁকি | আত্মঘাতী ইউক্রেনীয় ফার্স্ট-পারসন ভিউ (FPV) ড্রোন আক্রমণ। অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইনের উপস্থিতি। অতিমাত্রায় বরফ ও মাইনাস ডিগ্রির তাপমাত্রা। |
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান | ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বাংলাদেশী নাগরিকদের অংশগ্রহণ বেআইনি ঘোষণা এবং রাশিয়ায় গমনে সতর্কতা জারি। |
আন্তর্জাতিক আইন ও পররাষ্ট্রনীতি | বাংলাদেশ 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়' নীতিতে বিশ্বাসী। রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করা জাতিসংঘের মার্সেনারি কনভেনশনের পরিপন্থী। |
মানবপাচার সিন্ডিকেটের বিস্তৃত রুট ও কর্মপদ্ধতি
রাশিয়ান বাহিনীতে বিদেশী নাগরিকদের যুক্ত করার পেছনে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক দালাল চক্র কাজ করছে, যার শিকড় ঢাকা থেকে শুরু করে দুবাই, তাসখন্দ এবং মস্কো পর্যন্ত বিস্তৃত।
ভুয়া ভিসার ফাঁদ: সাধারণত তরুণদের সরাসরি 'সামরিক ভিসা' দেওয়া হয় না। তাদের প্রথমে ট্যুরিস্ট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা কিংবা কৃষি/নির্মাণ শ্রমিকের ভিসা দিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।
ট্রানজিট রুট: সরাসরি ঢাকা থেকে মস্কোর ফ্লাইটের কঠোর তদারকি এড়াতে অনেক সময় তরুণদের প্রথমে দুবাই, ভারত বা মধ্য এশিয়ার কোনো দেশে (যেমন উজবেকিস্তান বা কির্গিজস্থান) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের রাশিয়ায় প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়।
টেলিগ্রাম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রলোভন: টেলিগ্রাম চ্যানেল, টিকটক এবং গোপন ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে "মস্কোয় সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি" বা "রুশ সেনাবাহিনীতে কায়িক শ্রমিকের কাজ" শিরোনামে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। যেখানে মাসিক ২-৩ লাখ টাকা বেতন এবং ১ বছর পর ইউরোপে প্রবেশের সুযোগের মতো প্রলোভন দেখানো হয়।
'স্টর্ম-জেড' ও 'স্টর্ম-ভি' (Storm-V) অ্যাসল্ট ইউনিট
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিদেশী চুক্তিভিত্তিক সৈন্য এবং কয়েদিদের মূলত বিশেষ অ্যাসল্ট ব্যাটালিয়নে পদায়ন করে থাকে, যেগুলোকে 'Storm-Z' বা 'Storm-V' ইউনিট বলা হয়।
ফ্রন্টলাইনের প্রথম সারি: এই ইউনিটগুলোর প্রধান কাজ হলো শত্রুর শক্ত ঘাঁটিগুলোতে প্রথম আক্রমণ চালানো বা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষার জন্য সামনে এগিয়ে যাওয়া।
প্রযুক্তিগত অসমতা: নিয়মিত পেশাদার রুশ সেনাদলকে আধুনিক সরঞ্জাম ও বিমান হামলার সুরক্ষা দেওয়া হলেও, এই চুক্তিভিত্তিক ও অ-অভিজ্ঞ বিদেশী ইউনিটগুলোকে তুলনামূলক কম সুরক্ষায় ড্রোন ও মিসাইল হামলার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।
উচ্চ মৃত্যুর হার: আধুনিক যুদ্ধে 'ফার্স্ট পারসন ভিউ' (FPV) ড্রোনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ট্রেঞ্চে বা উন্মুক্ত মাঠে থাকা এই আনকোরা সৈনিকদের টিকে থাকার হার অত্যন্ত কম।
দক্ষিণ এশীয় সংকট: নেপাল, ভারত ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কেবল বাংলাদেশী যুবকেরাই নন, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়া থেকেই শত শত তরুণ এই যুদ্ধের ভয়াবহতায় জড়িয়ে পড়েছেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এই সংকটের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তোলে:
নেপাল: নেপালের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন তরুণ রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্তত ৩০-৪০ জন মারা গেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেপাল সরকার তাদের নাগরিকদের রাশিয়া ও ইউক্রেনে কাজের জন্য গমনাগমন সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে এবং কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
ভারত: ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (CBI) একটি বড় মানবপাচার চক্রের সন্ধান পায়, যারা ভারতীয় তরুণদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাচ্ছিল। ভারত সরকারের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের পর বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিককে রাশিয়ান সেনাবাহিনী থেকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
শ্রীলঙ্কা: অর্থনৈতিক মন্দার শিকার শ্রীলঙ্কার অনেক প্রাক্তন সেনাসদস্যকেও ভালো বেতনের লোভে রাশিয়ান ও ইউক্রেনীয় উভয় পক্ষেই ভাড়াটে হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
জেনেভা কনভেনশন ও আইনি জটিলতা
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো বাংলাদেশী নাগরিক বন্দী হলে বা নিহত হলে আইনি ও কূটনৈতিক দিক থেকে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
কমব্যাট্যান্ট বনাম মার্সেনারি (Mercenary): আন্তর্জাতিক আইন বা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, যদি কোনো নাগরিক নিজ দেশের আনুষ্ঠানিক সম্মতি ছাড়া অন্য কোনো দেশের হয়ে টাকার বিনিময়ে যুদ্ধ করেন, তবে তাঁকে 'মার্সেনারি' বা ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। মার্সেনারিরা যুদ্ধবন্দী (POW - Prisoner of War) হিসেবে সাধারণ সৈন্যদের মতো সমস্ত আইনি সুরক্ষা পান না।
বন্দি বিনিময়ের সুযোগ না পাওয়া: রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে নিয়মিত বিরতিতে যুদ্ধবন্দি বিনিময় হলেও, বিদেশী চুক্তিভিত্তিক সৈন্যদের ক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ প্রায়শই তাদের কঠোর বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করে।
লাশ শনাক্তকরণ ও ফেরত আনার অসুবিধা: যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বিদেশী সৈন্যদের মরদেহ উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। উপরন্তু, সুনির্দিষ্ট কাগজপত্র না থাকায় পরিবারগুলো প্রিয়জনের মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক সনদ বা কোনো আর্থিক সহায়তা পায় না।
ভূ-রাজনৈতিক দ্বিধা ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান
বাংলাদেশ সরকারের জন্য এই সংকটটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ এনে দিয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক: রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে (যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প)। ফলে সরাসরি কোনো কূটনৈতিক টানাপোড়েন না তৈরি করে কীভাবে নিজ নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া যায়, তা নিয়ে সরকারকে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরদারি: বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মস্কোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সতর্ক করেছে যাতে কোনো বাংলাদেশী নাগরিক প্রলোভনে পড়ে রাশিয়ান সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ না হন। তবুও অনানুষ্ঠানিক রুট ও দালালদের দাপটের কারণে এটি পুরোপুরি রোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আর্থিক ও মানসিক ট্র্যাজেডি
যে তরুণরা জীবন বাজি রেখে বা ভালো চাকরির আশায় রাশিয়ায় যাচ্ছেন, তাদের পেছনে পরিবারগুলোকে চরম খেসারত দিতে হচ্ছে।
ঋণের বোঝা: দালালদের ৮ থেকে ১৫ লাখ টাকা দেওয়ার জন্য অধিকাংশ পরিবার জমিজমা বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নেয়।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার পর মোবাইল ফোন ও সমস্ত ডিজিটাল ডিভাইস জমা নিয়ে নেওয়া হয়। ফলে মাসের পর মাস পরিবারের সাথে কোনো যোগাযোগ থাকে না, যা পরিবারগুলোর মধ্যে চরম মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে।
ক্ষতিপূরণ না পাওয়া: চুক্তির শর্তে বিমার কথা বলা থাকলেও, নিখোঁজদের ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি: প্রবাসীদের আইনি ঝুঁকি
একজন বাংলাদেশী নাগরিকের জন্য অন্য কোনো দেশের হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে মার্সেনারি বা ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করা অত্যন্ত গুরুতর আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি ও আইনি বাধা: বাংলাদেশ সংবিধান ও আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী কোনো সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে বা পক্ষে ভাড়াটে সৈনিক পাঠানোর অনুমতি দেয় না। বাংলাদেশ 'জাতিসংঘ মার্সেনারি কনভেনশন (UN Mercenary Convention, 1989)' মেনে চলে। কোনো বাংলাদেশী নাগরিক যদি সরকারের কোনো প্রকার অনুমোদন ব্যতিরেকে কোনো দেশের সশস্ত্র বাহিনী বা প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানিতে (যেমন: ওয়াগনার গ্রুপ) যোগ দেয়, তবে দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতা ও মানবপাচার নিরোধ আইনে মামলা হতে পারে।
বাংলাদেশী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা: ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস একাধিক জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে, রাশিয়ার ভিসা পাওয়ার পর কোনোভাবেই যেন বিদেশী কোনো সশস্ত্র চুক্তিতে স্বাক্ষর করা না হয়। কিন্তু অনেক তরুণই আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও দালালদের খপ্পরে পড়ে আইনি জটিলতার তোয়াক্কা করছেন না।
যুদ্ধক্ষেত্রের মনস্তত্ত্ব: মেডেলের পেছনে ট্রাজেডির ছায়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওগুলোতে যখন কেবল রাইফেল উঁচিয়ে ধরার দৃশ্য কিংবা পদক পাওয়ার হাসি দেখা যায়, তখন তার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় আধুনিক যুদ্ধের অবর্ণনীয় মানসিক ট্রমা বা Post-Traumatic Stress Disorder (PTSD)।
পোড়া গন্ধ ও রক্তের ট্র্যাজেডি: ইউক্রেনের বরফে ঢাকা পরিখায় (Trench) দিন পার করা সৈনিকেরা জানেন প্রতিদিনের সূর্যোদয় মানেই নতুন মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। পাশে শুয়ে থাকা সহযোদ্ধার দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া দেখার পর একজন মানুষের স্বাভাবিক মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
পরিবারের কান্না: বাংলাদেশে থাকা পরিবারগুলো প্রতিদিন আতঙ্কে দিন কাটায়। অনেক পরিবার জানেই না যে তাদের সন্তান এখন বেঁচে আছে নাকি কোনো ড্রোনের আঘাতে মারা গেছে। নিহতদের লাশ ফেরত আনাও এক বিরাট আইনি ও ভৌগোলিক জটিলতা, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে লাশ পাওয়ার সুযোগ অনেক সময়ই থাকে না।
সমাধান ও সচেতনতা: কীভাবে বন্ধ হবে এই জীবনঘাতী স্রোত?
বাংলাদেশী যুবকদের বলির পাঠা হওয়া থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
রিসোর্সভিত্তিক আইনি পদক্ষেপ ও মনিটরিং: রাশিয়ায় কাজের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে জনশক্তি রপ্তানি সংস্থাগুলোর (BMET) কঠোর তদারকি বাড়াতে হবে। যেসব এজেন্সি বা দালাল মানুষকে মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে পাঠাচ্ছে, তাদের লাইসেন্স বাতিল ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা: সোহেল সর্দারের ভিডিও দেখে যারা অনুপ্রাণিত হচ্ছেন, তাদের সামনে এই যুদ্ধের আসল ভয়াবহতা ও মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরতে হবে।
অনুবাদ সহায়ক সেবা: রাশিয়াগামী বাংলাদেশী কর্মীদের কোনো চুক্তিতে সই করার আগে অনুবাদকের সাহায্য নেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে তারা বুঝতে পারেন তারা কাজের চুক্তিতে সই করছেন নাকি সেনা সার্ভিসের কাগজে।
শেষ কথা
মাদারীপুরের সোহেল সর্দার নিরবের গল্পটি হয়তো দুঃসাহসিকতা ও ভাগ্যের শিকে ছেড়ার এক অদ্ভুত উদাহরণ। সাধারণ এক শ্রমিক থেকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর বীরত্বসূচক সেনাপদক লাভ এবং রাশিয়ান নাগরিকত্ব অর্জন অনেকের কাছে গল্পের মতো রোমাঞ্চকর মনে হতে পারে।
কিন্তু এই মুদ্রার অপর পিঠটি অত্যন্ত করুণ ও নির্মম। সোহেল সর্দারের মতো একজন হয়তো অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়ে পদক পাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর পেছনে হারিয়ে গেছেন আরও বহু অনিচ্ছাসত্ত্বেও যুদ্ধে জড়ানো বাংলাদেশী তরুণ।
পাসপোর্ট কিংবা কিছু টাকার লোভে জীবনকে বারুদের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। ইউক্রেনের হিমশীতল ফ্রন্টলাইনে রক্ত ঝরার এই খেলা বন্ধ করতে প্রয়োজন সরকারের কঠোর নজরদারি এবং যুবসমাজের সচেতনতা। অন্য দেশের যুদ্ধক্ষেত্রে লাশ হওয়ার চেয়ে নিজ দেশে বা নিরাপদ প্রবাসে ঘাম ঝরিয়ে বেঁচে থাকা অনেক বেশি গৌরবের ও মর্যাদার।



















