ব্রক লেসনার ‘দ্যা বিস্ট’ - রেসলিং, ডাব্লিউডাব্লিউই ও ইউএফসির কিংবদন্তি

ব্রক লেসনার ‘দ্যা বিস্ট’ - রেসলিং, ডাব্লিউডাব্লিউই ও ইউএফসির কিংবদন্তি

পেশাদার রেসলিং (Professional Wrestling) এবং মিক্সড মার্শাল আর্টস (MMA) দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার প্রফেশনাল কমব্যাট স্পোর্টসে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী হাতে গোনা কয়েকজন অ্যাথলেটের মধ্যে ব্রক লেসনার (Brock Lesnar) শীর্ষে অবস্থান করছেন। একদিকে যেখানে পেশাদার রেসলিং স্ক্রিপ্টভিত্তিক শারীরিক কসরত ও বিনোদনের ক্যানভাস, অন্যদিকে মিক্সড মার্শাল আর্টস হলো রিং বা কেজের ভেতর রক্তক্ষয়ী ও অকৃত্রিম লড়াইয়ের ময়দান। এই দুই বিপরীতধর্মী জগতে একই সাথে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঐতিহাসিক নজির পুরো বিশ্বে কেবল একজনেরই রয়েছে তিনি ব্রক লেসনার।

অসাধারণ শারীরিক শক্তি, ক্ষিপ্র গতি, সুগঠিত শরীর ও আগ্রাসী অ্যাথলেটিসিজমের কারণে ক্রীড়া বিশ্বে তিনি ‘দ্য বিস্ট ইনকারনেট’ (The Beast Incarnate) বা সংক্ষেপে ‘দ্য বিস্ট’ নামে পরিচিত। তিনি কোনো সাধারণ মল্লযোদ্ধা বা বিনোদনদাতা নন; বরং তিনি ক্রীড়া ইতিহাসের এমন এক বিরল জিনেটিক বিস্ময়, যিনি রিংয়ে নামলেই বদলে যায় আবহাওয়া, স্তব্ধ হয়ে যায় গ্যালারি।

শৈশব ও অ্যামেচার রেসলিংয়ের স্বর্ণযুগ: ডেইরি ফার্ম থেকে রিংয়ের যাত্রা

১৯৭৭ সালের ১২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার ওয়েবস্টারে জন্মগ্রহণ করেন ব্রক এডওয়ার্ড লেসনার। তাঁর শৈশব কেটেছে বাবা-মায়ের ডেইরি ফার্মে। ছোটবেলা থেকেই কঠিন শারীরিক পরিশ্রম, ডেইরি ফার্মের হেভি লিফটিং এবং গ্রামীণ জীবনযাপন তাঁর শারীরিক সক্ষমতার মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি শারীরিক শক্তির দিক দিয়ে সমবয়সীদের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিলেন।

হাই স্কুল ও জুনিয়র কলেজ রেকর্ড

ওয়েবস্টার হাই স্কুলে পড়ার সময় লেসনার ফ্রি-স্টাইল অ্যামেচার রেসলিং এবং আমেরিকান ফুটবলে দারুণ দক্ষতা দেখান। হাই স্কুলে তাঁর অ্যামেচার রেসলিং রেকর্ড ছিল ৩৩টি জয়ের বিপরীতে শূন্য হার। পরবর্তীতে তিনি বিসমার্ক স্টেট কলেজে (Bismarck State College) ভর্তি হন এবং ১৯৯৮ সালে হেভিওয়েট বিভাগে ন্যাশনাল জুনিয়র কলেজ অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশন (NJCAA) অল-আমেরিকান ও ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ খেতাব অর্জন করেন।

ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা ও এনসিএএ (NCAA) জয়

বিসমার্ক স্টেট কলেজের সাফল্যের পর লেসনার ফুল রেসলিং স্কলারশিপ নিয়ে ঐতিহ্যবাহী 'ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা'-তে স্থানান্তরিত হন। এখানে তাঁর সত্যিকারের অ্যাথলেটিক সক্ষমতার বিকাশ ঘটে।

১৯৯৯ সালে তিনি NCAA Division I Heavyweight রানার্স-আপ হন। কিন্তু ২০০০ সালে তিনি স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে ফাইনাল ম্যাচে পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রতিপক্ষকে হারিয়ে NCAA Division I Heavyweight National Champion হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। অ্যামেচার ফ্রি-স্টাইল রেসলিংয়ে দুই বছরের কলেজ কেরিয়ারে তিনি পরপর দুইবার 'অল-আমেরিকান' নির্বাচিত হন।

তিনি অ্যামেচার কেরিয়ার শেষ করেন ১০৬টি জয়ের বিপরীতে মাত্র ৫টি হারের এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড নিয়ে। তাঁর এই অলিম্পিক-স্তরের অ্যামেচার রেসলিং ব্যাকগ্রাউন্ডই পরবর্তীতে পেশাদার রেসলিং ও এমএমএ-তে তাঁর সাফল্যের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

ওহাইও ভ্যালি রেসলিং (OVW) ও ডাব্লিউডাব্লিউই-তে প্রথম পর্ব (২০০২–২০০৪)

অ্যামেচার রেসলিংয়ে জাতীয় খেতাব জেতার পর বিশ্বের তৎকালীন বৃহত্তম পেশাদার রেসলিং প্রমোশন ওয়ার্ল্ড রেসলিং ফেডারেশন (WWF, যা বর্তমানে WWE) নজর দেয় লেসনারের ওপর। ২০০০ সালে তৎকালীন ডাব্লিউডাব্লিউই প্রধান ভিন্স ম্যাকম্যান লেসনারের সাথে এক বড় অঙ্কের চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

ওহাইও ভ্যালি রেসলিংয়ের 'সোনালী ব্যাচ'

লেসনারকে সরাসরি মূল রিংয়ে না পাঠিয়ে ডাব্লিউডাব্লিউই-এর ডেভেলপমেন্টাল টেরিটরি 'ওহাইও ভ্যালি রেসলিং' (OVW)-এ পাঠানো হয় প্রফেশনাল রেসলিংয়ের খুঁটিনাটি শেখার জন্য। সেখানে তাঁর সাথে ছিলেন তৎকালীন নতুন চার তরুণ অ্যাথলেট জন সিনা, র‍্যান্ডি অরটন এবং বাটিস্টা। ইতিহাসবিদরা এই ব্যাচটিকে ডাব্লিউডাব্লিউই ইতিহাসের সবচেয়ে সফল 'OVW Class of 2002' বলে থাকেন। সেখানে শেলটন বেঞ্জামিনের সাথে জোট বেঁধে লেসনার 'মিনেসোটা রেকিন ক্রু' নামে তিনবার OVW সাদার্ন ট্যাগ টিম চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেন।

মূল রিংয়ে আত্মপ্রকাশ ও 'দ্য নেক্সট বিগ থিং'

২০০২ সালের ১৮ মার্চ, রেসলম্যানিয়া ১৮-এর ঠিক পরের রাতে 'Monday Night RAW'-তে ধ্বংসাত্মক ভঙ্গিতে অভিষেক ঘটে ব্রক লেসনারের। রিংসাইডে তাঁর সাথে ম্যানেজার ও অ্যাডভোকেট হিসেবে হাজির হন অভিজ্ঞ পল হেইম্যান (Paul Heyman)।

পল হেইম্যান রিংয়ে লেসনারকে পরিচয় করিয়ে দেন 'দ্য নেক্সট বিগ থিং' (The Next Big Thing) হিসেবে। অভিষেকেই স্পাইক ডাডলি, আল স্নো এবং মেভেনের মতো রেসলারদের রিংয়ের ভেতর পিষে ফেলে নিজের আগমন বার্তা ঘোষণা করেন লেসনার।

রেকর্ড গড়ে কনিষ্ঠতম চ্যাম্পিয়ন ও আনস্টপেবল রান

অভিষেকের মাত্র চার মাসের মাথায় জুন ২০০২-এ লেসনার 'কিং অব দ্য রিং' টুর্নামেন্ট জয় করেন। এর ফলে তিনি সরাসরি আগস্টের সামারস্ল্যামে তৎকালীন গ্লোবাল আইকন 'দ্য রক' (The Rock)-এর মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান।

২০০২ সালের সামারস্ল্যামে মাত্র ২৫ বছর ৪৪ দিন বয়সে দ্য রককে তাঁর ট্রেডমার্ক ফিনিশার 'F-5' মেরে হারিয়ে দেন লেসনার। এর মাধ্যমে তিনি ডাব্লিউডাব্লিউই ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ WWE Undisputed Champion হওয়ার অভূতপূর্ব রেকর্ড গড়েন (যে রেকর্ডটি আজ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ রয়েছে)।

পরবর্তী দেড় বছরে লেসনার তৎকালীন সব শীর্ষ তারকাদের ওপর ছড়ি ঘোরান:

দ্য আন্ডারটেকার: নো মার্সি ২০০২-এ কুখ্যাত 'হেল ইন এ সেল' (Hell in a Cell) খাঁচার ভেতর রক্তক্ষয়ী ম্যাচে আন্ডারটেকারকে পরাজিত করেন।

রয়্যাল রাম্বল ২০০৩: ৩০ জনের রয়্যাল রাম্বল ম্যাচে জয়লাভ করে রেসলম্যানিয়ার টিকিট পান।

রেসলম্যানিয়া ১৯ (WrestleMania XIX): কুর্ট অ্যাঙ্গেলের (Kurt Angle) বিরুদ্ধে মেইন ইভেন্টে মুখোমুখি হন। ম্যাচের শেষভাগে প্রায় ৩০০ পাউন্ড ওজনের শরীর নিয়ে রিংয়ের ওপরের রশি থেকে এক মারাত্মক 'শুটিং স্টার প্রেস' (Shooting Star Press) দিতে গিয়ে ঘাড়ের ওপর পড়েন এবং মারাত্মক বোটচ (Botch) হওয়া সত্ত্বেও অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তিতে উঠে দাঁড়িয়ে অ্যাঙ্গেলকে F-5 মেরে দ্বিতীয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন।

২০০৪ সালে ডাব্লিউডাব্লিউই ত্যাগ ও ব্যাকল্যাশ

টানা ভ্রমণ, মদের নেশা, ব্যথানাশক ওষুধের ওপর নির্ভরতা এবং মানসিক ক্লান্তি লেসনারকে গ্রাস করতে শুরু করে। পেশাদার রেসলিংয়ের নিরবচ্ছিন্ন ট্যুর শিডিউল সহ্য করতে না পেরে ২০০৪ সালের রেসলম্যানিয়া ২০-এর পর তিনি হঠাৎ ডাব্লিউডাব্লিউই ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে গোল্ডবার্গের (Goldberg) বিরুদ্ধে তাঁর বিদায়ী ম্যাচটিতে ভক্তরা জেনেই গিয়েছিল যে দুজনই কোম্পানি ছেড়ে যাচ্ছেন, যার ফলে পুরো গ্যালারি দুজনকে উদ্দেশ্য করে ভুয়া ভুয়া ধ্বনি (Boo) দেয়।

এনএফএল (NFL) চেষ্টা ও জাপানের রিংয়ে অভিজ্ঞতা (২০০৪–২০০৭)

ডাব্লিউডাব্লিউই ছাড়ার পর লেসনার তাঁর শৈশবের আরেক স্বপ্ন আমেরিকান ফুটবল লিগে (NFL) খেলার সিদ্ধান্ত নেন।

মিনেসোটা ভাইকিংসের ট্রায়াল

২০০৪ সালে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি এনএফএল দল 'মিনেসোটা ভাইকিংস' (Minnesota Vikings)-এর সাথে ডিফেন্সিভ ট্যাকল হিসেবে ট্রায়ালে অংশ নেন। প্রাক-মৌসুম ক্যাম্প শুরুর আগে এক মারাত্মক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়ে তাঁর পাঁজরের হাড় ভেঙে যায় এবং কুঁচকিতে আঘাত পান।

তীব্র যন্ত্রণা সত্ত্বেও তিনি এনএফএল-এর প্রি-সিজন ম্যাচে ভাইকিংসের হয়ে অংশ নেন। তবে চূড়ান্ত মরশুম শুরুর আগে তাকে মূল স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয়। দল তাঁকে ইউরোপিয়ান লিগে পাঠানোর প্রস্তাব দিলে তিনি পরিবার ছেড়ে যেতে রাজি না হয়ে এনএফএল ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।

নিউ জাপান প্রো-রেসলিং (NJPW)

ডাব্লিউডাব্লিউই-এর সাথে একটি 'নন-কম্পিট' আইনি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও লেসনার ২০০৫ সালে জাপানের শীর্ষ প্রমোশন 'নিউ জাপান প্রো-রেসলিং'-এ যোগ দেন। ২০০৫ সালের অক্টোবরে টোকিও ডোমে নিজের প্রথম ম্যাচেই কাজুয়ুকি ফুজিতা ও মাসাহিরো চোনোকে হারিয়ে তিনি IWGP Heavyweight Championship অর্জন করেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি জাপানে কন্টাক্ট রেসলিং চালিয়ে যান।

মিক্সড মার্শাল আর্টস (MMA) ও ইউএফসি-তে ইতিহাস সৃষ্টি (২০০৭–২০১১)

পেশাদার রেসলিংয়ের ভুয়া বা স্ক্রিপ্টেড তকমা ভেঙে সত্যিকারের রিয়েল ফাইট বা মিক্সড মার্শাল আর্টসে আত্মপ্রকাশ করা ছিল লেসনারের জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়া। কারণ, ডাব্লিউডাব্লিউই থেকে যাওয়া রেসলারদের এমএমএ ফাইটাররা 'প্লাস্টিকের অ্যাথলেট' বলে ব্যঙ্গ করতেন। কিন্তু লেসনার প্রমাণ করে দেন তিনি শুধুই বিনোদনদাতা নন, তিনি একজন সত্যিকারের ধ্বংসকারী।

কেজ ফাইটিংয়ে অভিষেক ও ইউএফসি-তে চুক্তি

২০০৭ সালের জুনে 'Dynamite!! USA' ইভেন্টে কে-ওয়ান (K-1) প্রমোশনের অধীনে দক্ষিণ কোরিয়ার মিন-সু কিমকে মাত্র ৬৯ সেকেন্ডে গ্রাউন্ড-অ্যান্ড-পাউন্ডে সাবমিট করে এমএমএ অভিষেক ঘটান লেসনার। এর পরপরই বিশ্বের সবচেয়ে বড় এমএমএ প্রমোশন 'আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ' (UFC)-এর প্রেসিডেন্ট ড্যানা হোয়াইট লেসনারকে ইউএফসি-তে সাইন করান।

ইউএফসি হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হওয়া (UFC 91)

UFC 81 (২০০৮): ইউএফসি-তে তাঁর প্রথম ম্যাচেই মুখোমুখি হন সাবেক ইউএফসি হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন প্রখ্যাত সাবমিশন বিশেষজ্ঞ ফ্র্যাঙ্ক মীর (Frank Mir)-এর। ম্যাচটিতে লেসনার পুরো আধিপত্য বিস্তার করলেও এক অস সতর্কতায় ফ্র্যাঙ্ক মীরের 'নি-বার' (Kneebar) সাবমিশনে হেরে যান।

UFC 87: পরবর্তী ম্যাচে প্রবীণ ফাইটার হিথ হ্যারিংকে ৩ রাউন্ড ধরে চরম প্রহার করে সর্বসম্মতিক্রমে জয়লাভ করেন।

UFC 91 (১৫ নভেম্বর, ২০০৮): নিজের ক্যারিয়ারের মাত্র চতুর্থ পেশাদার এমএমএ লড়াইয়ে লেসনার মুখোমুখি হন ইউএফসি কিংবদন্তি র্যান্ডি কোটিউর (Randy Couture)-এর। ম্যাচের দ্বিতীয় রাউন্ডে এক শক্তিশালী ডানহাটের পাঞ্চে কোটিউরকে নকডাউন করে টেকনিক্যাল নকআউটে (TKO) হারিয়ে UFC Heavyweight Championship খেতাব জিতে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেন।

ইউএফসি ১০০ ও রেকর্ড পে-পার-ভিউ

২০০৯ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক UFC 100 ইভেন্টে লেসনার মুখোমুখি হন তাঁর পুরোনো শত্রু ফ্র্যাঙ্ক মীরের। এই রি-ম্যাচে মীরকে গ্রাউন্ডে আটকে রেখে চেহারার নকশা বদলে দেন লেসনার এবং ২য় রাউন্ডে টিকেও-তে জয়লাভ করে নিজের টাইটেল ডিফেন্ড করেন।

UFC 100 সে সময় পে-পার-ভিউ (PPV) বিক্রিতে ১.৬ মিলিয়ন ক্রয়ের ইতিহাস গড়ে, যার পেছনে মূল আকর্ষক ছিলেন ব্রক লেসনার।

ডাইভারটিকুলাইটিস রোগের সাথে যুদ্ধ ও পতন

শীর্ষে থাকা অবস্থায়ই লেসনার অন্ত্রের এক অতি মারাত্মক ও জীবনঘাতী রোগ 'ডাইভারটিকুলাইটিস' (Diverticulitis)-এ আক্রান্ত হন। এই রোগের কারণে তাঁর পাকস্থলী ও অন্ত্রের একটি বড় অংশ অস্ত্রোপচার করে কেটে বাদ দিতে হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তিনি ২০১০ সালে UFC 116-এ ফিরে এসে শেইন কারউইনকে (Shane Carwin) হারিয়ে টাইটেল ধরে রাখেন।

তবে ডাইভারটিকুলাইটিসের কারণে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা ও পাঞ্চ সহ্য করার ক্ষমতা অনেকাংশে কমে যায়। এর ফলে পরবর্তীতে কেইন ভেলাস্কেজ (UFC 121) এবং অ্যালিস্টার ওভারিম (UFC 141)-এর কাছে হেরে ২০১১ সালে তিনি এমএমএ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

ডাব্লিউডাব্লিউই-তে রূপকথার প্রত্যাবর্তন ও 'সুপ্লেক্স সিটি' যুগ (২০১২–২০২০)

এমএমএ ছেড়ে দেওয়ার পর ২০১২ সালের ২ এপ্রিল, রেসলম্যানিয়া ২৮-এর ঠিক পরের রাতে সোমবারের RAW-তে দীর্ঘ ৮ বছর পর পুনরায় ডাব্লিউডাব্লিউই-তে পদার্পণ করেন ব্রক লেসনার। রিংয়ে এসেই তিনি তৎকালীন কোম্পানির মুখ জন সিনাকে (John Cena) তাঁর সিগনেচার মুভ F-5 মেরে নিজের রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের জানান দেন।

এবার তিনি আসেন এক 'বিশেষ আকর্ষণ' বা পার্ট-টাইম মেগাস্টার হিসেবে, যিনি কেবল বছরের বড় বড় পে-পার-ভিউ ইভেন্টগুলোতে ম্যাচ খেলবেন।

আন্ডারটেকারের ঐতিহাসিক 'স্ট্রিক' ভঙ্গ (২০১৪)

ডাব্লিউডাব্লিউই এবং রেসলিং ইতিহাসের সবচেয়ে স্তম্ভিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ঘটে ২০১৪ সালের ৬ এপ্রিল, নিউ অরলিন্সের মের্সিডিজ-বেঞ্জ সুপারডোমে অনুষ্ঠিত রেসলম্যানিয়া ৩০ (WrestleMania XXX)-এ।

সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে রেসলম্যানিয়ার মঞ্চে দ্য আন্ডারটেকার ছিলেন অপরাজিত (২১-০ রেকর্ড)। সেই রাতে আন্ডারটেকারকে তিনটি বীভৎস F-5 মেরে ম্যাচের পিনফল অর্জন করেন ব্রক লেসনার। আন্ডারটেকারের ২১-০ জয়ের ঐতিহাসিক ধারার ইতি ঘটিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন "The One in 21-1"। এই জয়ের পর পুরো গ্যালারিতে নেমে এসেছিল শ্মশানের নীরবতা, যা আজ অবধি প্রফেশনাল রেসলিংয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শকিং মোমেন্ট হিসেবে বিবেচিত।

'সুপ্লেক্স সিটি'র জন্ম ও চ্যাম্পিয়নশিপ আধিপত্য

২০১৪ সালের সামারস্ল্যামে ডাব্লিউডাব্লিউই ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে জন সিনার মুখোমুখি হন লেসনার। পুরো ম্যাচে সিনাকে কোনো আক্রমণের সুযোগ না দিয়ে একতরফাভাবে ১৬টি নির্মম জার্মান সুপ্লেক্স (German Suplex) মারেন লেসনার। এই ম্যাচটির মাধ্যমেই জন্ম নেয় আধুনিক রেসলিংয়ের বিখ্যাত ক্যাচফ্রেজ "Suplex City, Bitch!"

পরবর্তী বছরগুলোতে লেসনার ডাব্লিউডাব্লিউই রিংয়ে একচ্ছত্র রাজত্ব চালান:

ইউনিভার্সাল চ্যাম্পিয়ন: ২০১৭ সালের রেসলম্যানিয়া ৩৩-এ গোল্ডবার্গকে হারিয়ে তিনি ইউনিভার্সাল চ্যাম্পিয়ন হন এবং সুদীর্ঘ ৫০৪ দিন সেই খেতাব ধরে রাখেন, যা আধুনিক যুগের দীর্ঘতম টাইটেল রেইনের একটি।

ইউএফসি ২০০-এ অংশগ্রহণ: ডাব্লিউডাব্লিউই চুক্তিতে থাকা অবস্থাতেই ড্যানা হোয়াইটের বিশেষ অনুরোধে ২০১৬ সালে UFC 200-এ মার্ক হান্টের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়লাভ করেন লেসনার (যদিও পরবর্তীতে ড্রাগ টেস্টের বিতর্কে ম্যাচটি বাতিল হয়)।

অন্যান্য দ্বৈরথ: রোমান রেইন্স, সেথ রলিন্স, এজে স্টাইলস, ড্যানিয়েল ব্রায়ান, ড্রু ম্যাকইনটায়ারের সাথে তাঁর একাধিক ক্লাসিক ম্যাচ রেসলিং ভক্তদের উন্মাদনায় ভাসায়।

'কাউবয়' ব্রক ও আধুনিক পর্ব (২০২১–২০২৩)

২০২০ সালের রেসলম্যানিয়া ৩৬-এ ড্রু ম্যাকইনটায়ারের কাছে হেরে যাওয়ার পর ডাব্লিউডাব্লিউই-এর সাথে চুক্তি শেষ হয়ে যায় লেসনারের। দীর্ঘ দেড় বছর কোনো ধরণের রেসলিংয়ে অংশ না নিয়ে তিনি নিঃশব্দে আত্মগোপনে ছিলেন।

নতুন অবতার: 'কাউবয়' ব্রক লেসনার

২০২১ সালের সামারস্ল্যামে চমকপ্রদভাবে ফের রিংয়ে প্রবেশ করেন লেসনার। তবে এবার আর পুরোনো ছোট চুলের হিংস্র বিস্ট নয়; বড় চুল, পনিটেল, দাড়ি, কাউবয় হ্যাট, জিন্স ও বুট জুতো পরা এক সম্পূর্ণ নতুন 'হেভিওয়েট কাউবয়' রূপে ধরা দেন তিনি। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো পল হেইম্যানকে ছাড়া সম্পূর্ণ বেবিফেস (নায়ক) চরিত্রে তিনি ভক্তদের বিপুল ভালোবাসা পান।

রোমান রেইন্স ও ট্র্যাক্টর কাণ্ড

২০২১ ও ২০২২ সাল জুড়ে রোমান রেইন্স এবং সাবেক ম্যানেজার পল হেইম্যানের সাথে লেসনারের ঐতিহাসিক সামার ট্রিলজি চলে।

সামারস্ল্যাম ২০২২-এর ল্যাস্ট ম্যান স্ট্যান্ডিং ম্যাচ: এটি ছিল লেসনারের কেরিয়ারের অন্যতম সেরা বিনোদনমূলক ম্যাচ। লেসনার সরাসরি একটি বিশাল কৃষি কাজের ট্র্যাক্টর চালিয়ে রিংয়ের পাশে হাজির হন। ম্যাচের এক পর্যায়ে ট্র্যাক্টরের সামনের বকেটের ধাক্কায় পুরো রেসলিং রিংটিকে উল্টে একপাশে খাড়া করে দেন তিনি! রিং উল্টে যাওয়ার দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তোলে।

কোডি রোডসের সাথে দ্বৈরথ ও মশাল হস্তান্তর (২০২৩)

২০২৩ সালে ব্রক লেসনার এক কুখ্যাত ভিলেন (Heel) রূপে ফিরে এসে উদীয়মান মেগাস্টার কোডি রোডসের (Cody Rhodes) সাথে এক দীর্ঘ বৈরীতায় জড়ান। ব্যাকল্যাশ, নাইট অব চ্যাম্পিয়নস এবং অবশেষে সামারস্ল্যাম ২০২৩-এ তাঁদের তিনটি মুখোমুখি লড়াই অনুষ্ঠিত হয়।

সামারস্ল্যামে কোডি রোডসের কাছে হারার পর, লেসনার ক্যারেক্টারের বাইরে এসে নিজের গ্লাভস খুলে কোডি রোডসকে জড়িয়ে ধরেন এবং তাঁর হাত উঁচিয়ে ধরেন। এটিকে রেসলিংয়ের ভাষায় 'মশাল হস্তান্তর' (Passing the Torch) বলে গণ্য করা হয়, যেখানে লেসনার পরবর্তী প্রজন্মের শীর্ষ তারকা হিসেবে কোডিকে স্বীকৃতি দেন।

আড়ালে চলে যাওয়া ও সাম্প্রতিক বিতর্ক

২০২৩ সালের সামারস্ল্যামের পর থেকে ব্রক লেসনার ডাব্লিউডাব্লিউই-এর টেলিভিশন প্রোগ্রামিং থেকে সম্পূর্ণ বিরতিতে চলে যান। ২০২৪ সালের রয়্যাল রাম্বলে তাঁর রিংয়ে ফেরার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি এক বড় আইনি ও করপোরেট বিতর্কের কারণে।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে ডাব্লিউডাব্লিউই-এর প্রতিষ্ঠাতা ভিন্স ম্যাকম্যানের বিরুদ্ধে জনৈক সাবেক নারী কর্মী জেনেল গ্রান্ট যৌন হেনস্থা ও পাচারের যে গুরুতর দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন, সেখানে এক 'সাবেক ইউএফসি ও ডাব্লিউডাব্লিউই হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন'-এর নাম অপ্রকাশিতভাবে উল্লেখ করা হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করে যে সেই ব্যক্তিটি ব্রক লেসনার।

এই ঘটনার পর ডাব্লিউডাব্লিউই-এর প্যারেন্ট কোম্পানি TKO Group Holdings অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেয়। তারা লেসনারকে ডাব্লিউডাব্লিউই intro ভিডিও, 'WWE 2K24' ভিডিও গেমের কভার আর্ট এবং লাইভ টিভি প্রোগ্রামিং থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে রাখে। বর্তমানে লেসনার একজন ফ্রি-এজেন্ট হিসেবে নেভাদা ও কানাডার Saskatchewan-এর নিজস্ব খামারবাড়িতে নির্জন জীবনযাপন করছেন।

এক নজরে ‘দ্য বিস্ট’ ব্রক লেসনার

বিষয় / ক্ষেত্র

তথ্য ও পরিসংখ্যান

পূর্ণ নাম

ব্রক এডওয়ার্ড লেসনার (Brock Edward Lesnar)

রিং নেম ও ডাকনাম

দ্য বিস্ট (The Beast), দ্য নেক্সট বিগ থিং, দ্য কনকোয়েরার

জন্ম তারিখ ও স্থান

১২ জুলাই, ১৯৭৭ (ওয়েবস্টার, সাউথ ডাকোটা, যুক্তরাষ্ট্র)

শারীরিক মাপজোখ

উচ্চতা: ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি (১৯১ সেমি), ওজন: ১৩০ কেজি (২৮৬ পাউন্ড)

অ্যামেচার রেসলিং রেকর্ড

NCAA Division I Heavyweight Champion (২০০০), ১০৬ জয় - ৫ হার

ডাব্লিউডাব্লিউই অভিষেক

১৮ মার্চ, ২০০২ (RAW-এর রিংয়ে মূল রস্টার)

ডাব্লিউডাব্লিউই খেতাবসমূহ

৭ বার WWE Champion, ৩ বার Universal Champion, Royal Rumble (২০০৩, ২০২২), King of the Ring (২০০২)

ইউএফসি (UFC) খেতাব ও রেকর্ড

UFC Heavyweight Champion (১ বার, ২টি সফল টাইটেল ডিফেন্স), MMA রেকর্ড: ৫ জয় - ৩ হার (১ নো-কনটেস্ট)

ঐতিহাসিক মাইলফলক

২০১৪ সালে রেসলম্যানিয়া ৩০-এ আন্ডারটেকারের ঐতিহাসিক ২১-০ জয়ের ধারা (Streak) ভঙ্গ

প্রধান ফিনিশিং মুভ

F-5 (এফ-ফাইভ), কিমুরা লক (Kimura Lock), জার্মান সুপ্লেক্স

কেন ব্রক লেসনার অনন্য: রিং স্টাইল ও পল হেইম্যান ম্যাজিক

পেশাদার রেসলিং বা এমএমএ জগতে ব্রক লেসনারের মতো সাফল্য আর কেউ অর্জন করতে পারেনি। তাঁর এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে প্রধান তিনটি উপাদান কাজ করেছে:

পল হেইম্যানের সাথে আইকনিক জুটি

ব্রক লেসনারের পেশাদার রেসলিং কেরিয়ার পল হেইম্যান ছাড়া অসম্পূর্ণ। লেসনারের প্রথাগত মাইক স্কিল বা প্রোমো দেওয়ার দক্ষতা খুব বেশি প্রকাশ করার প্রয়োজন পড়েনি, কারণ রিংয়ের বাইরে মাইক হাতে পল হেইম্যানের ডায়ালগ "Ladies and Gentlemen, my name is Paul Heyman, and I am the advocate for the reigning, defending, undisputed heavyweight champion of the world... BROCK LESNAR!" গ্যালারিতে উন্মাদনা তৈরির জন্য যথেষ্ট ছিল। হেইম্যান ছিলেন মুখপাত্র, আর লেসনার ছিলেন কেবলই ধ্বংসের অস্ত্র।

রিং স্টাইল ও শারীরিক রাজত্ব

লেসনার রেসলিং রিংকে থিয়েটার থেকে অকৃত্রিম যুদ্ধের ময়দানে রূপান্তর করতে পারতেন। তাঁর 'জার্মান সুপ্লেক্স' খাওয়ার পর প্রতিপক্ষের শারীরিক অবস্থা এবং কানের ভেতর থেকে রক্ত বের হওয়া বা রিংয়ের বাইরে আছড়ে পড়ার দৃশ্যগুলো দর্শকদের সত্যতার অভিজ্ঞতা দিত। তাঁর ফিনিশার 'F-5' (যেখানে প্রতিপক্ষকে কাঁধে তুলে হেলিকপ্টারের মতো ঘুরিয়ে ফেস-ফাস্ট আছড়ে ফেলা হয়) রেসলিং জগতের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও জনপ্রিয় মুভগুলোর একটি।

রিয়েল কমব্যাট ও বিনোদনের সেতু

লেসনার সাধারণ রেসলারদের মতো বছরের ৩৬৫ দিন কাজ করতেন না। তিনি ছিলেন 'বক্স অফিস ড্র' (Box Office Draw)। তাঁর প্রতি ম্যাচে আসার অর্থই ছিল বিশেষ কিছু ঘটতে যাওয়া। সাধারণ দর্শকরা জানতেন, এনসিএএ ও ইউএফসি হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন হিসেবে লেসনার চাইলে যেকোনো মানুষকে আসল ফাইটেই কয়েক সেকেন্ডে কুপোকাত করে দিতে পারেন। এই বিশ্বাসযোগ্যতাই তাঁকে অন্যান্য সমস্ত প্রফেশনাল রেসলারদের থেকে এক আলাদা উচ্চতায় বসিয়েছিল।

ব্রক লেসনার কেবল একজন পেশাদার রেসলার বা মিক্সড মার্শাল আর্টিস্ট নন; তিনি ক্রীড়া বিনোদন জগতের অন্যতম রহস্যময় এবং ব্যবসায়িক দিক থেকে সফল এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর রিং কেরিয়ারের সাফল্য সর্বজনবিদিত হলেও, রিংয়ের বাইরের জীবন, শারীরিক গঠনশৈলী, ব্যাকস্টেজের নানা বিতর্ক এবং ব্যক্তিগত জীবনধারা সম্পর্কে বহু তথ্যই সাধারণ ক্রীড়াপ্রেমীদের অজানা। ব্রক লেসনারের জীবনের সেই গভীর ও বিস্তৃত দিকগুলো নিচে বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।

ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও লাইফস্টাইল

তারকাদের সাধারণ প্রবণতা থাকে লাইমলাইটে থাকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকা এবং ভক্তদের মাঝে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া। কিন্তু ব্রক লেসনার এই ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।

লেসনার অত্যন্ত গোপনীয়তা পছন্দ করেন। তিনি নিজেকে আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া থেকে পুরোপুরি দূরে রেখেছেন। তাঁর কোনো নিজস্ব ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট নেই। বর্তমানে তিনি কানাডার সাসকাচোয়ান (Saskatchewan) অঙ্গরাজ্যের এক বিশাল খামারবাড়িতে (Farmhouse) পরিবার নিয়ে নির্জন জীবনযাপন করেন। শিকার করা (Hunting), জমি চাষ করা এবং নিজস্ব খামারের তদারকি করাই তাঁর প্রধান শখ।

"আমি এমন এক জায়গায় থাকতে পছন্দ করি যেখানে আমার আশেপাশের মানুষজন আমাকে একজন সাধারণ কৃষক বা প্রতিবেশী ছাড়া অন্য কিছু ভাবে না।" - ব্রক লেসনার

পরিবার ও বিবাহিত জীবন

২০০৬ সালে লেসনার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ডাব্লিউডাব্লিউই-এর নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নারী তারকা সেবল (Sable - আসল নাম রেনা গ্রীক)-এর সাথে। সেবল লেসনারের চেয়ে বয়সে প্রায় ১০ বছরের বড়। এই দম্পতির দুই পুত্র সন্তান রয়েছে টার্ক (Turk) এবং ডিউক (Duke)। এছাড়া লেসনারের পূর্ববর্তী বাগদত্তা নিকোল ম্যাকক্লেইনের ঘরে তাঁর দুই জমজ সন্তান রয়েছে লুক (Luke) এবং মায়া লিন (Mya Lynn)।

মেয়ে মায়া লিনের স্পোর্টস রেকর্ড

লেসনারের রক্তে যে অ্যাথলেটিসিজম লুকিয়ে আছে, তার বড় প্রমাণ তাঁর কন্যা মায়া লিন লেসনার। মায়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির হয়ে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে শট-পুট (Shot Put) এবং হ্যামার থ্রোয়ার হিসেবে খেলছেন। তিনি NCAA Division I-এ শট-পুটে জাতীয় রেকর্ড গড়ে অল-আমেরিকান খেতাব অর্জন করেছেন এবং দেখতে অবিকল তাঁর বাবার মতো শারীরিক গঠনের অধিকারী।

অবিশ্বাস্য শারীরিক সামর্থ্য ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য

ব্রক লেসনারকে প্রায়ই বিজ্ঞান ও মানব শারীরবিদ্যার 'জিনগত বিস্ময়' (Genetic Freak) বলা হয়। তাঁর শরীরের আকার এবং সেই অনুপাতে ক্ষিপ্রতা অত্যন্ত দুর্লভ।

দানবীয় অ্যাথলেটিসিজম ও গ্লাভসের সাইজ

গ্লাভসের সাইজ (4XL): ইউএফসি-র ইতিহাসে হাতে গোনা দু-একজনের গ্লাভস বিশেষ অর্ডারে তৈরি করতে হতো। লেসনারের হাত এত বড় ছিল যে তাঁকে 4XL সাইজের গ্লাভস পরতে হতো। সাধারণ ফাইটারদের 2XL গ্লাভসও তাঁর হাতে ঢুকত না।

৪-ইয়ার্ড ড্যাশ ও শারীরিক শক্তি: ২০০৪ সালে এনএফএল ট্রায়ালের সময় প্রায় ২৯০ পাউন্ড (১৩০ কেজি) ওজন নিয়ে তিনি ৪০ গজ (40-yard dash) দৌড়েছিলেন মাত্র ৪.৭ সেকেন্ডে, যা সাধারণ ২০০ পাউন্ডের স্প্রিন্টারদের সমকক্ষ।

হেভি লিফটিং রেকর্ড: তাঁর কলেজের সময়ে লেসনারের র ফ্রি-ওয়েট বেঞ্চ প্রেস ছিল ৬০০ পাউন্ডের (২৭২ কেজি) বেশি এবং স্কোয়াট করার সামর্থ্য ছিল ৭০০ পাউন্ডের (৩১৭ কেজি) ওপরে।

ডাইভারটিকুলাইটিস ও খাদ্যাভ্যাসের খেসারত

লেসনারের ডাইভারটিকুলাইটিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ ছিল তাঁর খাদ্যাভ্যাস। তরুণ বয়সে ও কেরিয়ারের মধ্যগগনে তিনি প্রচুর পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত লাল মাংস (Red Meat) খেতেন এবং শাকসবজি বা ফাইবার-জাতীয় খাবার একেবারেই ছুঁয়ে দেখতেন না।

ফাইবারবিহীন খাদ্য তালিকার কারণে তাঁর পাচনতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ২০০৯ সালে তাঁর বৃহদন্ত্র (Colon) ছিদ্র হয়ে জীবন সংশয় দেখা দেয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর অন্ত্রের প্রায় ১২ ইঞ্চি কেটে ফেলে দিতে হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, তিনি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারলে সেটাই হবে বড় অলৌকিক ঘটনা; রিংয়ে ফেরা তো অনেক দূরের কথা। কিন্তু সেই মারাত্মক সার্জারির মাত্র এক বছরের মাথায় তিনি পুনরায় রিংয়ে ফিরে চ্যাম্পিয়নশিপ ডিফেন্ড করেছিলেন।

রিংয়ের পেছনের নাটকীয়তা ও বাস্তব বিতর্ক

পেশাদার রেসলিং ও এমএমএ কেরিয়ারজুড়ে বহুবার বাস্তব বিতর্কে জড়িয়েছেন ব্রক লেসনার। রিংয়ের স্ক্রিপ্টের বাইরে গিয়ে তাঁর নেওয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্ত কোম্পানি প্রধানদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল।

দ্য প্লেন রাইড ফ্রম হেল (Plane Ride from Hell - ২০০২)

২০০২ সালের মে মাসে ইউরোপ ট্যুর শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ফেরার পথে ডাব্লিউডাব্লিউই তারকাদের নিয়ে চার্টার্ড বিমানে ঘটে যায় ঐতিহাসিক 'প্লেন রাইড ফ্রম হেল' ঘটনা। বিমানে প্রচুর মদ খাওয়ার পর তরুণ ব্রক লেসনার এবং সাবেক অ্যামেচার রেসলিং কিংবদন্তি Curt Hennig (Mr. Perfect)-এর মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়।

দুজন বিমানের সরু গলির ভেতরেই সত্যিকার অ্যামেচার রেসলিং শুরু করে দেন। মারামারির একপর্যায়ে তাঁরা বিমানের জরুরি দরজার (Emergency Exit Gate) ওপর গিয়ে আছড়ে পড়েন, যা আকাশে থাকা বিমানের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছিল। পরবর্তীতে অন্যান্য সিনিয়র রেসলাররা এসে তাঁদের আলাদা করেন।

রেসলম্যানিয়া ১৯-এর মারাত্মক বোটচ (Botch)

২০০৩ সালের রেসলম্যানিয়া ১৯-এর মেইন ইভেন্টে কুর্ট অ্যাঙ্গেলের বিরুদ্ধে ম্যাচ চলাকালীন লেসনার রিংয়ের শীর্ষ রশি থেকে 'শুটিং স্টার প্রেস' (Shooting Star Press) মুভটি দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর আগে ওহাইও ভ্যালি রেসলিংয়ে তিনি এটি অনায়াসে দিতেন। কিন্তু ম্যাচের শেষভাগে ক্লান্ত থাকার কারণে এবং দূরত্বের ভুল হিসেব করায় লেসনারের শরীর শূন্যে পুরোপুরি না ঘুরে সরাসরি ঘাড়ে ও মাথায় আছড়ে পড়ে।

ভয়াবহ কনকাশন (Concussion) সত্ত্বেও তিনি উঠে দাঁড়িয়ে কুর্ট অ্যাঙ্গেলকে F-5 মেরে ম্যাচ জিতেন। ব্যাকস্টেজে যাওয়ার পর তিনি চিকিৎসকদের অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে অস্বীকৃতি জানান এবং তীব্র যন্ত্রণায় তোলপাড় সৃষ্টি করেন।

রেসলম্যানিয়া ৩৪ এবং ভিন্স ম্যাকম্যানের দিকে বেল্ট নিক্ষেপ (২০১৮)

২০১৮ সালের রেসলম্যানিয়া ৩৪-এ রোমান রেইন্সের সাথে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচের ফল ও ম্যাচ বুকিং নিয়ে ব্যাকস্টেজে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। রিংয়ে রোমান রেইন্সকে রক্তাক্ত করে হারিয়ে ম্যাচ জিতার পর ব্যাকস্টেজে আসেন লেসনার। ব্যাকস্টেজে দাঁড়িয়ে থাকা ডাব্লিউডাব্লিউই মালিক ভিন্স ম্যাকম্যানের মুখ লক্ষ্য করে সরাসরি নিজের ইউনিভার্সাল চ্যাম্পিয়নশিপ বেল্টটি সজোরে ছুঁড়ে মারেন লেসনার। ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দী না হলেও ব্যাকস্টেজ ডকুমেন্টারিতে এর সত্যতা প্রকাশ পায়।

ইউএফসি ২০০ ড্রাগ টেস্ট কেলেঙ্কারি

২০১৬ সালে ডাব্লিউডাব্লিউই-এর সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকা অবস্থাতেই লেসনারকে বিশেষ শর্তে ইউএফসি-র শততম ঐতিহাসিক ইভেন্ট UFC 200-এ খেলার অনুমতি দেওয়া হয়। প্রতিপক্ষ ছিলেন কিউই নকআউট আর্টিস্ট মার্ক হান্ট (Mark Hunt)।

ম্যাচে লেসনার তাঁর কুখ্যাত টেকডাউন ও গ্রাউন্ড-অ্যান্ড-পাউন্ড কৌশলে ৩ রাউন্ড শেষে সর্বসম্মতিক্রমে পয়েন্টের ব্যবধানে বিজয়ী হন। কিন্তু ম্যাচের কয়েকদিন পর নেভাদা স্টেট অ্যাথলেটিক কমিশন এবং ইউএসএডিএ (USADA) জানায়, লড়াইয়ের আগের ও লড়াইয়ের দিনের অ্যান্টি-ডোপিং টেস্টে লেসনার ব্যর্থ হয়েছেন।

তাঁর শরীরে নিষিদ্ধ 'ক্লোমিফেন' (Clomiphene) নামক ইস্ট্রোজেন ব্লকার পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা সাধারণত স্টেরয়েড ব্যবহারের পর শরীরের হরমোন স্বাভাবিক করতে ব্যবহৃত হয়।

পরিণতি: ইউএফসি তাঁর জয় বাতিল করে ম্যাচটিকে 'No Contest' ঘোষণা করে।

জরিমানা: লেসনারকে ২৫০,০০০ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয় এবং ১ বছরের জন্য এমএমএ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। এই ঘটনার পর মার্ক হান্ট ইউএফসি ও লেসনারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও ঠুকে দিয়েছিলেন।

ডাব্লিউডাব্লিউই-তে 'ছোটদের সাথে মহাকাব্যিক লড়াই' (David vs. Goliath)

অনেকের ধারণা লেসনার কেবল ভারী ও বড় চেহারার রেসলারদের সাথেই ভালো ম্যাচ উপহার দিতে পারেন। কিন্তু রেসলিং বিশ্লেষকদের মতে, লেসনার যখন অনুপ্রাণিত থাকেন, তখন ছোট ও ক্ষিপ্রগতির রেসলারদের (Cruiserweights/High-flyers) শট ও প্রভাব ফুটিয়ে তুলতে (Selling Process) তাঁর চেয়ে দক্ষ আর কেউ হতে পারেন না।

রেসলিং ইতিহাসের সেরা কিছু "ডেভিড বনাম গোলাইয়াত" (David vs. Goliath) ক্লাসিক ম্যাচে লেসনারের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো:

ব্রক লেসনার বনাম সিএম পাঙ্ক (SummerSlam 2013): নো-ডিসকোয়ালিফিকেশন ম্যাচে সিএম পাঙ্কের ছোট শরীরকে লেসনার রিংয়ের চারপাশে যেভাবে আছড়ে ফেলেছিলেন এবং একই সাথে পাঙ্কের প্রতিটি সাবমিশন মুভ যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা ম্যাচটিকে ওই বছরের সেরা ম্যাচের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ব্রক লেসনার বনাম এজে স্টাইলস (Survivor Series 2017): তৎকালীন ডাব্লিউডাব্লিউই চ্যাম্পিয়ন এজে স্টাইলসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লেসনারের একের পর এক জার্মানি সুপ্লেক্স এবং স্টাইলসের আকস্মিক কাউন্টার অ্যাটাক ভক্তদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।

ব্রক লেসনার বনাম ড্যানিয়েল ব্রায়ান (Survivor Series 2018): ম্যাচের প্রথমার্ধে ড্যানিয়েল ব্রায়ানকে সুপ্লেক্স সিটিতে ধ্বংস করার পর, দ্বিতীয়ার্ধে ব্রায়ানের লো-কিক এবং 'ইয়েস লক' (Yes Lock)-এ লেসনারের যন্ত্রণাক্লিষ্ট অভিনয় ম্যাচটিতে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার জন্ম দিয়েছিল।

ব্রক লেসনার বনাম ফিন ব্যালর (Royal Rumble 2019): ছোট পদের ফিন ব্যালরের দ্রুতগতি ও কুঁচকিতে আঘাত করার চালগুলোর সামনে লেসনার যেভাবে নিজেকে দুর্বল হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, তা তাঁর রিং-সাইকোলজির অনন্য প্রমাণ।

পেশাদার মনোভাব ও ‘মার্সেনারি’ মানসিকতা

ক্রীড়া জগতে খেলোয়াড়দের প্রায়ই "খেলার প্রতি ভালোবাসা" বা "ভক্তদের ভালোবাসার" কথা বলতে শোনা যায়। কিন্তু ব্রক লেসনার এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সৎ ও অকপট। তিনি পেশাদার রেসলিং ও কমব্যাট স্পোর্টসকে শুধুই একটি ব্যবসায়িক চাকরি (Business Job) হিসেবে দেখেন।

'আই ডু দিস ফর মানি'

লেসনার বহু সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, তিনি রিংয়ে নামেন মোটা অঙ্কের পে-চেকের (Paycheck) বিনিময়ে।

সবচেয়ে দামি পার্ট-টাইমার: তিনি ডাব্লিউডাব্লিউই-এর সাথে এমনভাবে চুক্তি নবায়ন করতেন যাতে বছরে তাঁকে ১৫ থেকে ২০টির বেশি ইভেন্টে অংশ নিতে না হয়, অথচ তিনি মূল তারকাদের চেয়েও বেশি বেতন (বছরে আনুমানিক ১২ Million+ USD) পেতেন।

বিজনেসম্যান লেসনার: ভিন্স ম্যাকম্যান এবং পরবর্তীতে TKO গ্রুপিংয়ের সাথে আলোচনার টেবিলে লেসনার ছিলেন কঠিন এক ব্যবসায়ী। চুক্তির মেয়াদ বা টাকার অঙ্কে সামান্য হেরফের হলে তিনি ম্যাচ না খেলেই এরেনা ত্যাগ করার হুমকি দিতে দ্বিধা করতেন না।

পল হেইম্যানের সাথে বাস্তব বন্ধুত্ব

স্ক্রিনের বাইরে বাস্তব জীবনে ব্রক লেসনার অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক হলেও, পল হেইম্যানের সাথে তাঁর দীর্ঘ ২২ বছরের গভীর ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব রয়েছে। লেসনারের পরিবারের যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত কিংবা চুক্তির বিষয়ে হেইম্যান ছিলেন তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা। পল হেইম্যান বহুবার বলেছেন, "ব্রক কাউকে বিশ্বাস করে না, কিন্তু সে আমাকে ও আমার পরিবারকে নিজের পরিবারের মতোই ভালোবাসে।"

বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

২০২৪ সালের শুরুর দিকে টিকেও (TKO Group Holdings) ভিন্স ম্যাকম্যানের আইনি কেলেঙ্কারিতে লেসনারের নাম জড়িয়ে পড়ার পর থেকে তাঁকে ডাব্লিউডাব্লিউই প্রোগ্রামিং থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

লেসনারের বয়স বর্তমানে ৪৮ ছুঁইছুঁই। তিনি তাঁর কানাডার খামারবাড়িতেই জীবন উপভোগ করছেন। ডাব্লিউডাব্লিউই বা অন্য কোনো কমব্যাট স্পোর্টসে তাঁর আর নতুন করে কিছু প্রমাণের বাকি নেই।

তবে রেসলিং জগতের ইতিহাস বলে ব্রক লেসনার এমন এক নাম, যা চিরতরে মুছে ফেলা অসম্ভব। ভবিষ্যতে যদি তিনি কখনো শেষবারের মতো হল অব ফেমে (Hall of Fame) অন্তর্ভুক্ত হতে বা একটি বিদায়ী ম্যাচ (One Last Match) খেলতে রিংয়ে ফেরেন, তবে সেটি আবারও ক্রীড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংবাদে পরিণত হবে।

পেশাদার ক্রীড়া জগতে ‘দ্য বিস্ট’-এর চিরস্থায়ী লেগ্যাসি

ব্রক লেসনার কেবল একজন রেসলার বা ফাইটার নন; তিনি আধুনিক স্পোর্টস এন্টারটেইনমেন্ট ও কমব্যাট স্পোর্টসের এক অনন্য উদাহরণ।

তিনি প্রমাণ করেছেন যে, কঠোর অ্যামেচার ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে স্ক্রিপ্টেড রেসলিং থেকে এসেও পৃথিবীর সবচেয়ে রিয়েল এবং ডেঞ্জারাস লড়াইয়ের কেজ (UFC)-তে চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব। আবার সেখান থেকে ফিরে এসে ডাব্লিউডাব্লিউই-এর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় ইভেন্টগুলোর পিপিভি সেল রেকর্ড ভেঙে দেওয়া সম্ভব।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা তারকাখ্যাতির প্রতি লেসনারের কখনোই কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি সাক্ষাৎকার দিতে পছন্দ করেন না, রেড কার্পেটে হাঁটেন না, কিংবা ভক্তদের মাঝে অহেতুক দেখা দেন না। রিংয়ে আসবেন, প্রতিপক্ষকে চূর্ণবিচূর্ণ করবেন, কোটি টাকার চেক পকেটে পুরবেন এবং নিজের খামারবাড়িতে ফিরে যাবেন এই ছিল তাঁর জীবনের সরল কিন্তু নিদারুণ মূলমন্ত্র।

বিতর্ক বা অনিয়মিত উপস্থিতি সত্ত্বেও, যখনই কোনো অ্যারেনায় ব্রক লেসনারের প্রবেশের সূচনা সঙ্গীত (Theme Song) ’Next Big Thing’-এর সেই চিরচেনা ইলেকট্রিক গিটারের ধুন বেজে ওঠে, পুরো গ্যালারি এখনো গর্জে ওঠে একই সাথে ভীতি ও শ্রদ্ধায়। ব্রক লেসনার পেশাদার কমব্যাট স্পোর্টসের ইতিহাসের বইয়ে চিরকাল লিপিবদ্ধ থাকবেন এমন এক অদম্য অনুঘটক হিসেবে, যাকে কোনো ছকে ফেলা যায় না তিনি শুধুই এক ও অদ্বিতীয়, ‘দ্য বিস্ট ইনকারনেট’

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.