১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা ‘গ্রেট কলকাতা কিলিং’ - সাম্প্রদায়িকতার নির্মম ট্রাজেডি

ব্রিটিশ ভারতের মানচিত্রে ১৯৪০-এর দশক ছিল চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তিম মুহূর্ত এবং এক ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনের যুগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ যখন ভারত ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে একদিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অখণ্ড ভারত গঠনের দাবি, অন্যদিকে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র 'পাকিস্তান' অর্জনের সংগ্রাম।
এই চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে কলকাতার রাজপথে যে ভয়াবহ রক্তের বন্যা ভেসে গিয়েছিল, তা 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং' (Great Calcutta Killing) বা 'দ্য উইক অব দ্য লং নাইভস' (The Week of the Long Knives) নামে ইতিহাসে পরিচিত। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতা শহরে অনুষ্ঠিত এই দাঙ্গা কেবল একটি আঞ্চলিক গণহত্যা ছিল না; এটি ছিল এমন এক ঐতিহাসিক অশুভ মোড়, যা ১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান বিভাগকে সুনিশ্চিত এবং অনিবার্য করে তুলেছিল।
তবে কলকাতার দাঙ্গার এই মূল স্রোতের সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং তৎকালীন বিপ্লবী দলগুলোর রাজনৈতিক দর্শনের একটি জটিল আন্তঃসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবীদের দৃষ্টিভঙ্গি, অনুশীলনী ও যুগান্তর সমিতির হিন্দুয়ানি জাতীয়তাবাদী ধারা এবং পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় কলকাতার অসহায় মুসলিমদের ওপর ঘটে যাওয়া গণহত্যা সব মিলিয়ে এটি ছিল ঔপনিবেশিক ভারতের এক গভীর সামাজিক ও সামাজিক-রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। এই বিস্তৃত নিবন্ধে ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গার নেপথ্য কারণ, সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের পটভূমি, দাঙ্গার ভয়াবহ রূপ এবং পরবর্তীতে এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
সূর্য সেন, অনুশীলন সমিতি ও সশস্ত্র বিপ্লবীদের মুসলিম-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি
উপমহাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন এবং বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতি’ ও ‘যুগান্তর দল’ স্মরণীয় নাম। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁদের ত্যাগ ও বীরত্ব সর্বজনবিদিত হলেও, বিশ শতকের প্রথমার্ধে এই সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠনগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক গঠন নিয়ে অনেক ঐতিহাসিক বিশদ গবেষণা ও সমালোচনা তুলে ধরেছেন।
অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মতাদর্শ ও হিন্দু পুনর্জাগরণবাদ
১৯০২ সালে প্রমথনাথ মিত্র, সতীশচন্দ্র বসু ও অরবিন্দ ঘোষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘অনুশীলন সমিতি’ এবং পরবর্তীতে বারীন্দ্রকুমার ঘোষের নেতৃত্বে গঠিত ‘যুগান্তর দল’ ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের অন্যতম অগ্রদূত। তবে এই সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক দর্শন কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; এর একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছিল উনিশ শতকের হিন্দু পুনর্জাগরণবাদী দর্শনের ওপর।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' উপন্যাস, 'অনুশীলন তত্ত্ব' এবং 'বন্দে মাতরম্' সঙ্গীত বিপ্লবীদের কাছে দেশপ্রেমের প্রধান মন্ত্রে পরিণত হয়। অরবিন্দ ঘোষ তাঁর রাজনৈতিক পুস্তিকা 'ভবানী মন্দির' এ বিপ্লবীদের মূলত দেবী ভবানীর উপাসক এবং শক্তিপূজার মাধ্যমে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার আহ্বান জানান। এছাড়া স্বামী বিবেকানন্দের বীর্যবত্তা ও কর্মযোগের বাণী তাঁদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। জাতীয়তাবাদকে এভাবে ধর্মীয় আচারের সাথে অভিন্ন করে ফেলার ফলে বিপ্লবী আন্দোলনের চরিত্রটি সার্বজনীন ভারতীয় রূপ নেওয়ার বদলে বিশিষ্টভাবে হিন্দু ধর্মীয়-সংস্কৃতিক রূপ পরিগ্রহ করে।
গীতা, কালীপ্রতিমা ও ধর্মীয় শপথ গ্রহণ: অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের সংগঠন কাঠামোর প্রধান শর্ত ছিল গোপনীয়তা ও আনুগত্য, যা রক্ষার জন্য অত্যন্ত কঠোর ধর্মীয় আচার পালন করা হতো। ঢাকা অনুশীলন সমিতির সংগঠক পুলিন বিহারী দাসের অধীনে নতুন সদস্যদের সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করার সময় হাতে বা মাথায় 'শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা' রেখে, দেবী কালীর প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে কিংবা হাতে তলোয়ার নিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে শপথ গ্রহণ করতে হতো।
সদস্যরা 'সন্ন্যাসী' (যাঁরা সংসার ত্যাগ করে সার্বক্ষণিক বৈপ্লবিক কাজে নিয়োজিত থাকতেন) ও 'গৃহী' এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিলেন। বৈদিক স্তোত্র পাঠ ও ধর্মীয় প্রতীকবাদের ওপর ভিত্তি করে গঠিত এই শপথ গ্রহণ প্রক্রিয়ার কারণে অ-হিন্দু বা মুসলিম যুবকদের পক্ষে এই গুপ্ত সমিতিতে যোগদান করা মানসিকভাবে কঠিন ছিল। এমনকি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ নীতিমালায়ও অ-হিন্দুদের প্রবেশাধিকারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
মুসলিমদের অন্তর্ভূক্তিতে অনীহা: বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ (প্রায় ৫২-৫৫ শতাংশ) অংশ হওয়া সত্ত্বেও বিপ্লবী দলগুলোতে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত নগণ্য। বিপ্লবী নেতৃত্বের মধ্যে একটি সুসংগঠিত অনাস্থা কাজ করত যে, মুসলিম যুবকদের অন্তর্ভুক্ত করলে গোপনীয়তা রক্ষা করা কঠিন হতে পারে এবং তথ্য ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এর পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসও ভূমিকা রেখেছিল।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সময় বিপ্লবীরা বিলাতি পণ্য বয়কটের যে চরমপন্থী অবস্থান নেন, তা অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ দরিদ্র ও কৃষক মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থের বিপরীত ছিল। তাছাড়া, সশস্ত্র বিপ্লবীদের সামাজিক মূল ছিল মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দু 'ভদ্রলোক' শ্রেণীভুক্ত যুবকদের মধ্যে। ফলে সাধারণ মুসলিম সমাজ ও কৃষকদের সাথে বিপ্লবীদের কোনো নিবিড় সামাজিক বা সাংগঠনিক জনসংযোগ গড়ে ওঠেনি।

খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ হত্যাকাণ্ড: ১৯৩১ সালের ৩০শে আগস্ট চট্টগ্রামের প্যারেড গ্রাউন্ডে একটি ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন মাস্টারদা সূর্য সেনের দলীয় বিপ্লবী হরিপদ ভট্টাচার্য প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেন তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার খান বাহাদুর আহসানউল্লাহকে। আহসানউল্লাহ ছিলেন একজন দায়িত্বশীল ভারতীয় মুসলিম কর্মকর্তা, যিনি ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে থেকে বিপ্লবীদের তৎপরতা দমনে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং তৎকালীন সরকার ও স্থানীয় কতিপয় গোষ্ঠীর ইন্ধনে পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটে। সাধারণ মুসলিম মানসে এই ঘটনার মাধ্যমে একটি বার্তা পৌঁছায় যে, বিপ্লবীরা কেবল ইউরোপীয় বা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য বানাচ্ছে না, বরং সরকারি দায়িত্বে থাকা উচ্চপদস্থ ভারতীয় মুসলিমদের ওপরও চড়াও হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক মতাদর্শগত লড়াইটি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে বহুলাংশে সাম্প্রদায়িক বা গোষ্ঠীগত সঙ্ঘাতের রূপ ধারণ করে।
বিপ্লবীদের চোখে 'বহিরাগত' ও প্যান-ইসলামিজম ধারণা
তৎকালীন অনেক বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী নেতার লেখায় ও চিন্তায় মুসলিম সমাজকে ভারতের প্রাচীন ঐতিহাসিক ধারার অংশ হিসেবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব পরিলক্ষিত হতো। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা হিসেবে বিপ্লবীরা প্রায়শই মারাঠা নেতা ছত্রপতি শিবাজী, মেবারের রানা প্রতাপ কিংবা সিখ ইতিহাসের মুঘলবিরোধী সংগ্রামকে পুনর্জীবিত করতেন। এই ইতিহাসচর্চায় মধ্যযুগীয় মুসলিম শাসনকে অনেক সময় 'বিদেশী শাসন' হিসেবে চিত্রিত করা হতো, যা মুসলিম সমাজকে মানসিকভাবে দূরে ঠেলে দেয়।
অন্যদিকে, একই সময়ে মুসলিম সমাজের একটি অংশের মধ্যে খিলাফত আন্দোলন ও প্যান-ইসলামিজমের প্রভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডের বাইরে ধর্মীয় কেন্দ্রের প্রতি আনুগত্যের প্রবণতা দেখা যায়। বিপ্লবীরা মনে করতেন, ভারতীয় মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অনুভূতি ভারতের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি বেশি অনুগত। দুই পক্ষের এই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও জাতীয়তাবাদের ভিন্ন সংজ্ঞায়ন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগের মধ্যকার রাজনৈতিক ব্যবধানকে আরো গভীর করে তোলে, যা পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গা এবং ১৯৪৭ সালের বাংলা ও ভারত ভাগের ত্বরান্বিত পটভূমি তৈরি করেছিল।

'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের পটভূমি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভারতের শাসনক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ সরকার তিন সদস্যের 'ক্যাবিনেট মিশন' (লর্ড প্যালিক লরেন্স, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস ও এ. ভি. অ্যালেনজান্ডার) ভারতে পাঠায়। মিশন অখণ্ড ভারতের অধীনে 'এ', 'বি' এবং 'সি' এই তিনটি বিভাগে প্রদেশগুলোকে বিভক্ত করে একটি ত্রি-স্তরীয় ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামোর প্রস্তাব দেয়। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থা রেখে বাকি সব আঞ্চলিক ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন প্রদেশগুলোর হাতে অর্পণ করার প্রস্তাব করা হয়, যা মূলত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দিয়েছিল।
কংগ্রেসের ভূমিকা ও জওহরলাল নেহেরুর বিতর্কিত অবস্থান
১৯৪৬ সালের জুনে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে কংগ্রেস এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ উভয় পক্ষই প্রাথমিক অবস্থায় ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা মেনে নিয়েছিল। জওহরলাল নেহেরু কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই বোম্বেতে এক সংবাদ সম্মেলনে এক অসংলগ্ন বক্তব্য দেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, গণপরিষদে প্রবেশ করার পর কংগ্রেস ক্যাবিনেট মিশনের কোনো পূর্বনির্ধারিত শর্ত বা 'গ্রুপিং' বা বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ থাকবে না এবং তারা বহুদলীয় ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো পরিকল্পনা পরিবর্তন বা সংশোধন করার সার্বভৌম অধিকার রাখবে।
নেহেরুর এই মন্তব্যকে তৎকালীন কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তীব্র সমালোচনা করেন এবং এটিকে ভারতের ঐক্য বিনষ্টকারী ও দেশভাগের দিকে ঠেলে দেওয়ার এক বড় ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে চিহ্নিত করেন।
জিন্নাহর প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক
নেহেরুর বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। জিন্নাহ মনে করেন, ব্রিটিশরা চলে গেলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেস গণপরিষদে নিজেদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মুসলিমদের জন্য প্রস্তাবিত স্বায়ত্তশাসন ও অধিকার সম্পূর্ণ বাতিল করবে। এর ফলে সাংবিধানিক আলোচনার মাধ্যমে অধিকার আদায়ের ওপর জিন্নাহর বিশ্বাস উঠে যায়।
২৯ জুলাইয়ের বোম্বে প্রস্তাব ও ঐতিহাসিক ঘোষণা: ১৯৪৬ সালের ২৭-২৯ জুলাই বোম্বেতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের কাউন্সিল মিটিংয়ে জিন্নাহ ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। সাংবিধানিক আন্দোলনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে দাবি করে জিন্নাহ এক সংবাদ সম্মেলনে ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন:
“আমরা হয় একটি 'বিভক্ত ভারত' চাই, না হয় একটি 'ধ্বংসপ্রাপ্ত ভারত' চাই। আজ আমরা সাংবিধানিক পথকে বিদায় জানালাম”
তিনি আরও যোগ করেন যে, “আজ আমরা পিস্তল তৈরি করেছি এবং তা ব্যবহার করার মতো অবস্থায় আছি।”
পৃথক পাকিস্তান অর্জনের উদ্দেশ্যে মুসলিম লীগ ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ তারিখে সমগ্র ভারতজুড়ে 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস' বা 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' পালনের ঘোষণা দেয় এবং রাজপ্রদত্ত উপাধি ও পদবী ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়।


১৬ আগস্ট ১৯৪৬ কলকাতার রক্তঝরা 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে'
১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ছিল শুক্রবার। ব্রিটিশশাসিত ভারতে ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর, পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবিতে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ ১৬ আগস্টকে 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস' (Direct Action Day) হিসেবে পালনের ডাক দেয়। মুসলিম লীগ নেতৃত্বের লক্ষ্য ছিল সমগ্র ভারতজুড়ে এক শান্তিপূর্ণ সাধারণ ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করা।
অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। দাঙ্গা ও জনঅসন্তোষ এড়ানোর আনুষ্ঠানিক যুক্তি দেখিয়ে সোহরাওয়ার্দী সরকার ওই দিন পুরো বাংলায় সাধারণ সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। তবে এই সিদ্ধান্তকে হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের একটি অংশ নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের কৌশলগত চাল হিসেবে গ্রহণ করে। সরকারের এই পদক্ষেপে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়, যা সহিংসতার প্রাথমিক সলতেয় আগুন জ্বেলে দেয়।
গড়ের মাঠের সমাবেশ ও উত্তেজনার সূচনা
১৬ আগস্ট সকাল থেকেই কলকাতার রাস্তায় থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দুপুরের দিকে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিশালাকার মিছিল এসে জমা হতে থাকে কলকাতার গড়ের মাঠে (বর্তমান ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড)। অক্টারলোনি মনুমেন্টের (বর্তমান শহীদ মিনার) পাদদেশে আয়োজিত এই জনসমাবেশে প্রায় এক লক্ষাধিক মানুষ অংশ নেন। প্রধান বক্তা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সেখানে ভাষণ প্রদান করেন।
কিন্তু সমাবেশ পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ হওয়ার আগেই এবং ময়দান থেকে মিছিল নিয়ে ফেরার পথে কলকাতার বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বিশেষ করে রাজাবাজার, কেসি দাস মোড়, বৌবাজার, কলেজ স্ট্রিট এবং ক্যালিফোর্নিয়া স্ট্রিট এলাকায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
দোকানপাট বন্ধের বিতর্ক ও দাঙ্গার বিস্ফোরণ
হরতাল চলাকালে জোরপূর্বক দোকানপাট বন্ধ করা এবং যানবাহন চলাচলে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের উগ্র যুবকদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা থেকে শুরু হয় ইটপাটকেল ও সোডার বোতল নিক্ষেপ। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই এই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ধারালো অস্ত্র, লাঠি ও পেট্রোল বোমায় সজ্জিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর চরম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নেয়।
পুলিশ প্রশাসনের প্রাথমিক নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতার সুযোগে অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতা পুরো শহরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নিমেষেই পরিণত হয় ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ে, যা ইতিহাসে 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস' বা কলকাতার রক্তঝরা 'ব্ল্যাক ফ্রাইডে' নামে পরিচিত।

দাঙ্গায় উভয় পক্ষের সুসংগঠিত প্রস্তুতি ও ভয়াবহতা
১৬ আগস্ট ১৯৪৬-এর ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ (Direct Action Day) কোনো আকস্মিক মোহের ফল বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল না। তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, ধর্মীয় বিভাজন এবং উভয় পক্ষের দীর্ঘদিনের চাপা উত্তেজনা এই সংঘাতকে এক পূর্ব-পরিকল্পিত রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের রূপ দিয়েছিল। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে উভয় সম্প্রদায়ই নিজ নিজ এলাকায় আগে থেকেই বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র জমা করেছিল, যার ফলে অতি অল্প সময়েই পুরো কলকাতা শহর এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
মুসলিম লীগের প্রশাসনিক শিথিলতা ও আক্রমণ
দাঙ্গার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় মুসলিম লীগের ক্যাডার, বন্দর এলাকার শ্রমিক ও সমর্থকরা কলকাতার প্রধান প্রধান মোড় দখল করে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করে। মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঘোষিত সরকারি ছুটির কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথম থেকেই নিষ্ক্রিয় ভাব প্রদর্শন করে। সোহরাওয়ার্দী নিজে লালবাজারের কেন্দ্রীয় পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান করেছিলেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি লালবাজারে অবস্থান করে পুলিশ প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধা দিয়েছিলেন, যাতে মুসলিম লীগ রাজপথে একচ্ছত্র শক্তি প্রদর্শন করতে পারে।

গোপাল পাঁঠা, মাড়োয়াড়ি অর্থায়ন ও হিন্দুদের পাল্টা প্রতিরোধ
প্রথম দিনের আক্রমণের পর ১৭ই আগস্ট থেকে দাঙ্গার গতিপথ নাটকীয়ভাবে মোড় নেয়। কলকাতার শক্তিশালী মারোয়ারি ও গুজরাটি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, কংগ্রেসের কিছু স্থানীয় নেতা এবং হিন্দু মহাসভার সমন্বয়ে এক শক্তিশালী প্রতি-প্রতিরোধ ফ্রন্ট গঠিত হয়।
গোপাল পাঁঠা ও 'জাতীয় হেলা দল': এই পাল্টা প্রতিরোধের মূল নেতৃত্ব নেন বৌবাজারের মাংস ব্যবসায়ী গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যিনি 'গোপাল পাঁঠা' নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা মিলে গঠন করেন 'জাতীয় হেলা দল' বা 'ভারত জাতীয় বাহিনী'। গোপাল পাঁঠার সাথে যোগ দেন আজাদ হিন্দ ফৌজের (INA) কয়েকজন প্রাক্তন সদস্য ও স্থানীয় ক্লাবগুলোর কুস্তিগীর ও যুবকরা।
অস্ত্রের সংস্থান ও মারোয়ারি অর্থায়ন: হিন্দু প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অর্থায়ন করেছিল মধ্য কলকাতার প্রভাবশালী মারোয়ারি ব্যবসায়ী সমাজ। এই অর্থের সাহায্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অল্ড উইন অবিক্রিত সামরিক উদ্বৃত্ত (Military Surplus) থেকে ব্রিটিশ সৈন্যদের মাধ্যমে সংগৃহীত আধুনিক আমেরিকান পিস্তল, ৩০৩ রাইফেল, গ্রেনেড ও এসিড বোমা কেনা হয়। এছাড়া স্থানীয় কামারশালাগুলোতে রাতারাতি রামদা, বল্লম, এবং কৃপাণ তৈরি করে সশস্ত্র দলগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
মুসলিম এলাকায় পাল্টা তাণ্ডব: ১৭ থেকে ১৯শে আগস্ট পর্যন্ত গোপাল পাঁঠার অনুসারী, সিকিম ও নেপাল থেকে আনা গোর্খা পাহারাদার এবং হিন্দু মহাসভার সশস্ত্র কর্মীরা পার্ক সার্কাস, মেটিয়াবুরুজ ও মল্লিকবাজার সংলগ্ন মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পাল্টা আক্রমণ চালায়। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে নিহতের সংখ্যায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় এবং বহু সাধারণ মুসলিম পরিবার নৃশংসতার শিকার হয়।
নজিরবিহীন কৌশল, এসিড বোমা ও পরিবহনের অপব্যবহার
এই দাঙ্গার অন্যতম ভয়াবহ দিক ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অপব্যবহার ও আধুনিক নগর যুদ্ধের মতো কৌশল অবলম্বন:
ছদ্মবেশ ও অ্যাম্বুলেন্সের অপব্যবহার: উভয় পক্ষের সশস্ত্র ক্যাডাররা প্রতিপক্ষের এলাকায় প্রবেশ করতে এবং পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে মাথায় 'রেড ক্রস' (Red Cross) ব্যাজ ও টুপি পরিধান করত। এমনকি রোগী বহনের ছদ্মবেশে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে অস্ত্র, এসিড এবং সশস্ত্র লোক এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পাঠাত।
মালগাড়ি ও ট্রাকে লুটপাট: কলকাতার পরিবহন ব্যবস্থাকে দাঙ্গার কাজে সরাসরি ব্যবহার করা হয়। বড়বাজার ও পোস্তা অঞ্চলের লুণ্ঠিত মালামাল এবং অস্ত্রশস্ত্র পরিবহনের জন্য লরি ও রেলওয়ের মালগাড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল। শহরের বিভিন্ন স্থানে লাশ গুম করতে এবং নদীতে ফেলার কাজেও এই যানবাহনগুলো ব্যবহৃত হয়।
এসিড বোমার শিল্পায়ন: দাঙ্গার কয়েক মাস আগে থেকেই উত্তর ও মধ্য কলকাতার বেশ কয়েকটি হিন্দু মালিকানাধীন কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি ও ল্যাবরেটরিতে এসিড বোমা তৈরি করা শুরু হয়। বাল্ব ও কাচের বোতলে নাইট্রিক ও সালফিউরিক এসিড ভরে তা শত শত দাঙ্গাকারীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যা ঘনবসতিপূর্ণ গলিতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে।
১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গার পরিসংখ্যান ও পর্যালোচনা
১৯৪৬ সালের ১৬ থেকে১৯ আগস্টের মধ্যবর্তী সময়ে কলকাতায় ঘটে যাওয়া ধ্বংসযজ্ঞ ও ক্ষয়ক্ষতির একটি বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক চিত্র নিচে সারণীবদ্ধ করা হলো:
পরিমাপের ক্ষেত্র | ঐতিহাসিক বিবরণ ও তথ্য | ঐতিহাসিক উৎস ও প্রাসঙ্গিক তথ্য |
দাঙ্গার সময়কাল | ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ – ১৯ আগস্ট ১৯৪৬ (প্রধান দাঙ্গা), রেশ চলেছিল পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ। | 'দ্য উইক অব দ্য লং নাইভস' বা দীর্ঘ ছুরিকার সপ্তাহ নামে পরিচিত। |
আনুমানিক নিহতের সংখ্যা | ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ জন (বেসরকারি হিসাব)। সরকারি হিসেবে ৪,০০০ – ৫,০০০ জন। | নিহতদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ছিলেন রিকশাচালক, কুলি ও দিনমজুর মুসলিম। |
আহতের সংখ্যা | ২০,০০০ জনেরও বেশি নাগরিক মারাত্মকভাবে আহত হন। | শহরের সকল হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পূর্ণ হয়ে যায়। |
গৃহহীন মানুষের সংখ্যা | ১,০০,০০০ (এক লক্ষ) বা তারও বেশি মানুষ রাতারাতি গৃহহীন হন। | কলকাতার ইতিহাসে এটিই ছিল একক ঘটনায় সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট। |
নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তি | পুরো শহরের ৬০ লাখ মানুষের বিপরীতে মাত্র ১,২০০ পুলিশ সদস্য ছিল। | সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ ও নিষ্ক্রিয় ছিল। |
প্রধান নেতৃত্ব ও কুশীলব | এইচ এস সোহরাওয়ার্দী (মুসলিম লীগ), গোপাল পাঁঠা ও হিন্দু মহাসভা নেতৃত্ব। | উভয় পক্ষই দাঙ্গায় অত্যন্ত সংগঠিত বলপ্রয়োগ ও সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। |
প্রান্তিক মুসলিমদের ট্র্যাজেডি এবং লাশের মিছিল
১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গার সবচেয়ে কালো এবং নির্মম সত্যটি হলো এই ভয়াবহ দাঙ্গায় রাজনৈতিক নেতাদের স্বার্থ ও উদ্দেশ্য পূরণ হলেও, রক্তের সাগরে ভেসে এর শেষ মূল্য চুকিয়েছিল চরম দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে জীবনের বিনিময়ে মাশুল গুনেছিল শহরের মেহনতী খালাসি, ফেরিওয়ালা, দর্জি, রিকশাচালক, পোর্টার এবং কুলি মুসলিমরা। রাজনীতির কূটকৌশল বা ক্ষমতার সমীকরণ বোঝার মতো সুযোগ বা ইচ্ছা কোনোটিই এদের ছিল না; তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল দিনশেষে মেহনত করে পরিবারের জন্য দু-মুঠো অন্নসংস্থান করা। অথচ হিংস্রতার প্রথম আঘাতটি এসে পড়েছিল এই সবচেয়ে অরক্ষিত ও মেহনতী মানুষগুলোর ওপরই।
রাজাবাজার, মেটিয়াবুরুজ, পার্ক সার্কাস, জাকারিয়া স্ট্রিট, কসাইপাড়া ও এন্টালির অতি-ঘনবসতিপূর্ণ ঘিঞ্জি বস্তিগুলোতে তারা বাস করত। তারা প্রধানত রিকশাচালক, বন্দরের কুলি ও খালাসি, দর্জি, টমটম চালক, মাংস ও ফল বিক্রেতা কিংবা চামড়া ও বিড়ি কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। কোনো রাজনৈতিক সুরক্ষা বা স্থানীয় সশস্ত্র দলবদ্ধতা না থাকায় দাঙ্গার প্রথম প্রহরেই উন্মত্ত ঘাতক চক্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এই অরক্ষিত মানুষগুলো।
হাওড়া ব্রিজ ও গঙ্গার ভয়াবহ দৃশ্য
দাঙ্গার দিনগুলোতে কলকাতার ঘিঞ্জি বস্তি এলাকা এবং প্রধান রাজপথগুলো রূপ নিয়েছিল একেকটি রক্তস্নাত নরককুণ্ডে। ঘাতকদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি নারী বা শিশুরাও; হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও হত্যা করা হয়। সহিংসতার মাত্রা এতটাই বিভৎস ছিল যে, নিহতদের লাশ দাফন বা শেষকৃত্যের সুযোগ পর্যন্ত ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
পশু-পাখির খাদ্যে রূপান্তর: রাজপথে দিনের পর দিন পড়ে ছিল শত শত মানুষের মরদেহ। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দাফন বা সৎকার করার মতো কোনো পরিবেশ ছিল না। উন্মুক্ত সড়কে পড়ে থাকা সেই লাশগুলোর ওপর নেমে এসেছিল শকুন, কাক ও বেওয়ারিশ কুকুরের দল। রাজপথের ধুলোয় মিশে গিয়েছিল মানুষের পচা-গলিত মাংস ও রক্ত, যা সভ্যতার ইতিহাসে এক চরম লজ্জা ও নির্মমতার প্রতীক।
গঙ্গার ভাসমান লাশের মিছিল: হাওড়া ব্রিজ ও শিয়ালদহ সেতুর মতো কৌশলগত স্থানগুলোকে ঘাতকেরা ব্যবহার করেছিল নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের মঞ্চ হিসেবে। সেতুগুলোর ওপর থেকে মানুষকে হত্যা করে সরাসরি নিচে গঙ্গার তীব্র স্রোতে ফেলে দেওয়া হতো। দাঙ্গার পরবর্তী বেশ কয়েক দিন ধরে গঙ্গার ঘোলা জলে ভেসে গেছে হাজার হাজার মানুষের পচা-গলিত দেহ। নদীর দুই কূলের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল লাশের তীব্র দুর্গন্ধে।
কলকাতার তৎকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তি ছিল এই বিশাল শ্রমজীবী শ্রেণী, যারা নোয়াখালী, বিহার বা যুক্তপ্রদেশ (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) থেকে একটু ভালোভাবে বাঁচার আশায় কলকাতায় এসেছিল। তারা শহরের অর্থনীতি সচল রাখলেও নিজেদের নিরাপত্তার কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক ভিত্তি তাদের ছিল না। কোনো রাজনৈতিক নিরাপত্তা বা আশ্রয় না থাকায়, দাঙ্গার দাবানলে এই অসহায় শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষগুলোই সবচেয়ে সহজে বলির পাঁঠা হয়েছিল যাদের অধিকাংশই ইতিহাসের পাতায় কেবল সংখ্যা হয়েই থেকে গেছে, নামটুকুও আর কেউ মনে রাখেনি।

দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাবানলে প্রতিক্রিয়া
কলকাতার এই ভয়াবহ গণহত্যার প্রতিক্রিয়া কেবল মহানগরের চারদেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সংবাদপত্র, শরণার্থী আগমন এবং নানা অতিরঞ্জিত গুজবের ওপর ভর করে এই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভারত উপমহাদেশে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা পাশাপাশি বসবাসের সংস্কৃতি এবং সামাজিক সংহতি এক লহমায় চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।
নোয়াখালী ও টিপ্পেরা দাঙ্গা (অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৪৬)
১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতায় 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে'-তে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ রক্তপাতের গুজবের জের ধরে ওই বছরের ১০ই অক্টোবর পূর্ববঙ্গের নোয়াখালী ও টিপ্পেরা (বর্তমান কুমিল্লা) জেলায় ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়। স্থানীয় প্রজা আন্দোলন ও রাজনৈতিক নেতা গোলাম সারোয়ার হোসাইনির উসকানিমূলক বক্তব্য এবং অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রামগঞ্জ, রায়পুর, বেগমগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ও চাটখিল এলাকায় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামগুলোতে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
আক্রমণ, ধর্মান্তর ও লুণ্ঠন: এই হামলায় রায়পুরের জমিদার বাড়িসহ অসংখ্য বসতবাড়ি, মন্দির ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ধারণা করা হয় প্রায় ৫,০০০ হিন্দু প্রাণ হারান এবং বিপুলসংখ্যক নারী নির্যাতনের শিকার হন। অনেক পরিবারকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয় এবং তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি বর্জন করতে বাধ্য করা হয়।
গান্ধীজির শান্তি পদযাত্রা: এই মানবিক বিপর্যয় থামাতে মহাত্মা গান্ধী ১৯৪৬ সালের ৭ই নভেম্বর থেকে ১৯৪৭ সালের ২রা মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ চার মাস নোয়াখালীর প্রত্যন্ত চণ্ডীপুর, শ্রীরামপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে খালি পায়ে পদযাত্রা করেন। তিনি 'একলা চলো রে' নীতি গ্রহণ করে মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা চালান এবং ভীতসন্ত্রস্ত পরিবারগুলোকে নিজ ভিটেমাটিতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন।
বিহার ও যুক্তপ্রদেশের গণহত্যা (অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৪৬)
নোয়াখালীর ঘটনাবলীর অতিরঞ্জিত খবর ও গুজব স্থানীয় পত্রপত্রিকায় প্রচারিত হলে বিহারের ছাপরা, পটনা, মুঙ্গের, ভাগলপুর ও গয়া জেলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে বিহারের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর নজিরবিহীন সশস্ত্র প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করে।
প্রাণহানি ও শরণার্থী সংকট: ঐতিহাসিকদের হিসাব অনুযায়ী, বিহারের এই গণহত্যায় প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ মুসলিম প্রাণ হারান। দেড় লক্ষাধিক বিহারি মুসলিম ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হন, যাদের একটি বড় অংশ পরবর্তীতে বেঙ্গলে আশ্রয় নেন এবং দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসিত হন। একই সময়ে যুক্তপ্রদেশের (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) গারহমুক্তেশ্বরেও অনুরূপ দাঙ্গায় বিপুলসংখ্যক মুসলিম নিহত হন।
রাজনৈতিক পদক্ষেপ: ভারতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান জওহরলাল নেহেরু দাঙ্গা দমনে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখান এবং উপদ্রুত এলাকায় আকাশপথে বিমান থেকে বোমা ফেলার হুঁশিয়ারি দিয়ে নিজে বিহার সফরে যান। এছাড়া খান আবদুল গাফফার খান (সীমান্ত গান্ধী) বিহারে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরাসরি অংশ নেন।
ভারত বিভাগ এবং 'পাকিস্তান' সৃষ্টি
১৯৪৬ সালের দাঙ্গার পূর্বে জওহরলাল নেহেরু, সরদার বল্লভভাই প্যাটেল এবং মহাত্মা গান্ধী অখণ্ড ভারতের নীতিতে অনড় ছিলেন। তাঁরা ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানের অধীনে একটি শিথিল কেন্দ্রভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতের চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু কলকাতা, নোয়াখালী ও বিহারের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা তাঁদের বোঝায় যে দুই সম্প্রদায়কে রাজনৈতিকভাবে এক ছাদের নিচে রাখা গৃহযুদ্ধের জন্ম দেবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে মুসলিম লীগের প্রতিনিধি লিয়াকত আলী খানের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে গৃহীত বিভিন্ন নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সৃষ্ট বাধা কংগ্রেস নেতাদের হতাশ করে। প্যাটেল ও নেহেরু উপলব্ধি করেন যে যৌথ সরকারব্যবস্থা কার্যকরের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
সরদার প্যাটেল ও কংগ্রেসের অবস্থান পরিবর্তন
কলকাতার দাঙ্গার পূর্বে সরদার বল্লভভাই প্যাটেল অখণ্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন এবং দেশভাগের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু কলকাতার রাস্তায় লাশের স্তূপ এবং পরবর্তী দেশজোড়া গৃহযুদ্ধসদৃশ পরিস্থিতি দেখে তিনি বুঝতে পারেন, বলপূর্বক দুটি সম্প্রদায়কে একসাথে রাখলে পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোই পঙ্গু হয়ে যাবে। তিনি অনুধাবন করেন যে গৃহযুদ্ধ ঠেকানোর জন্য বিভাজনই একমাত্র পথ।
প্যাটেল অত্যন্ত কঠোর ও বাস্তবমুখী অবস্থান থেকে মন্তব্য করেছিলেন:
“যদি একটি শরীরে ক্যান্সার হয়, তবে পুরো শরীরকে বাঁচানোর জন্য সেই পচা অংশ কেটে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। গৃহযুদ্ধের চেয়ে দেশভাগ অনেক ভালো।”
১৯৪৭ সালের আগস্টের বিভাজন এবং রক্তস্নাত স্বাধীনতা
১৯৪৭ সালের মার্চে ভারতের শেষ ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেন দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা করেন। ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন তিনি জিন্নাহ, নেহেরু ও বলদেব সিংকে সাথে নিয়ে '৩ জুন পরিকল্পনা' ঘোষণা করেন। এতে বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশ দুটিকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনের অনুমোদন দেওয়া হয়।
ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফকে বাংলা ও পাঞ্জাব বিভাজনের জন্য গঠিত সীমানা কমিশনের প্রধান করা হয়। অতি অল্প সময়ে ভৌগোলিক ও জনসংখ্যার বিন্যাস বিবেচনা করে সীমান্ত রেখা নির্ধারণ করায় বহু অঞ্চল ও মানুষ আকস্মিক সীমানা সংকটে নিপতিত হয়।
স্বাধীনতার রক্তাক্ত মূল্য ও ট্র্যাজেডি: ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথেই শুরু হয় ভয়াবহ শরণার্থী সংকট। প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ বাধ্য হয়ে স্থানান্তরিত হয় এবং দাঙ্গায় বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতার রাজপথে যে সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত উপমহাদেশের বুকে ১৯৪৭ সালের বিভাগ ও রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে চূলান্ত রূপ নেয়।
উপসংহার
১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা বা 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়। এটি একদিকে যেমন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা ও নিরপেক্ষতার মুখোশ উন্মোচন করেছিল, অন্যদিকে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অন্ধত্ব ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে রাজপথে নামিয়ে এনেছিল।
সশস্ত্র বিপ্লবীদের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু করে জিন্নাহর 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম', সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক প্রশাসনিক ভুল, আর গোপাল পাঁঠাদের অস্ত্র হাতে পাল্টা হত্যা সব মিলিয়ে বলির পাঁঠা হয়েছিল সাধারণ নিরীহ হিন্দু ও মুসলিম জনগণ। হাজার হাজার মুসলিম ও হিন্দুর লাশের ওপর দাঁড়িয়ে যে স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, তার খেসারত আজ পর্যন্ত এই উপমহাদেশের মানুষকে দিতে হচ্ছে। ১৯৪৬ সালের ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য সাম্প্রদায়িক উন্মাদনাকে উসকে দিলে শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই জয়ী হয় না; পরাজিত হয় কেবল মানবিকতা।






















