হিযবুত তাহরীর ও ‘নুসরাহ’ কৌশল - বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানের অপচেষ্টা

হিযবুত তাহরীর ও ‘নুসরাহ’ কৌশল - বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানের অপচেষ্টা

একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিজ্ঞানে রাজনৈতিক ইসলাম বা প্যান-ইসলামিজমের গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন উগ্রপন্থী বা ইসলামিস্ট সংগঠন রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পথ অবলম্বন করে থাকে কেউ আল-কায়েদা বা আইসিসের মতো সরাসরি সশস্ত্র ধ্বংসাত্মক পথে, আবার কেউ বা প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। তবে এদের মধ্য থেকে ১৯৫৩ সালে জেরুজালেমে তকীউদ্দীন আল-নাবহানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংগঠন হিযবুত তাহরীর (Hizb ut-Tahrir) একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ব্যতিক্রমী বিতর্কিত কৌশল অবলম্বন করে আসছে।

সংগঠনটি অন্যান্য সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর মতো সরাসরি বোমাবাজি বা গেরিলা যুদ্ধে লিপ্ত হয় না, আবার প্রচলিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনকেও 'অমুসলিম বা কুফরি পদ্ধতি' আখ্যা দিয়ে তারা বিশ্বাস করে না। এর পরিবর্তে তারা বেছে নিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের এক সুনির্দিষ্ট ও গোপন পদ্ধতি, যা ইসলামি পরিভাষায় ‘নুসরাহ’ (Nusrah) নামে পরিচিত।

বাংলাদেশে ২০০০-এর দশকের শুরুতে তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করলেও ২০০৯ সালে রাষ্ট্রবিরোধী ও উগ্রবাদী তৎপরতার দায়ে হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ করা হয়। নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তারা তাদের ক্যাডারভিত্তিক গোপন নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখে এবং সামরিক বাহিনীর কট্টরপন্থী কর্মকর্তাদের সংগঠিত করে ২০১১ সালের শেষভাগে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের ছক এঁকেছিল। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারি শৃঙ্খলার কারণে এবং গোয়েন্দা নজরদারিতে সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়।

এই নিবন্ধে হিযবুত তাহরীরের উৎপত্তি, তাদের ‘নুসরাহ’ কৌশল, তারা কি কেবল সেনাবাহিনীকেই টার্গেট করে কি না, ২০১১ সালের সেই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশে তাদের খেলাফত প্রতিষ্ঠার অলৌকিক বা অবাস্তব স্বপ্নের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো। আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রকাঠামো, বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনি অবস্থান এবং আধুনিক সুসংগঠিত বাহিনীর মুখে তাদের এই ধারণার বাস্তব ভিত্তি ও ঝুঁকিও এতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

হিযবুত তাহরীর ও তাদের রাজনৈতিক দর্শন

হিযবুত তাহরীর (আক্ষরিক অর্থে: মুক্তির দল) ১৯৫৩ সালে জেরুজালেমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত শরিয়াহ আদালতের বিচারক এবং আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত সুন্নি আলেম তাকীউদ্দীন আল-নাবহানী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার উদ্দেশ্যে তিনি এই রাজনৈতিক দল গঠন করেন।

রাজনৈতিক দর্শন ও মূল চেতনা

সংগঠনটির মূল আকিদা ও দর্শনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহকে একটি একক পতাকা ও একক খলিফার নেতৃত্বের অধীনে এনে ‘খেলাফত’ (Caliphate) পুনপ্রতিষ্ঠা করা। হিযবুত তাহরীরের মতে, ১৯২৪ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব তার প্রকৃত রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব ও সার্বভৌমত্ব হারিয়েছে।

তারা আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে 'কুফর' বা ইসলাম পরিপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, গণতন্ত্রে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকে, যা তাদের মতে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের (হাকিমিয়্যাহ) সরাসরি লঙ্ঘন। তাই বিদ্যমান সমস্ত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামো সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদ করে কেবল শরিয়াহ আইনভিত্তিক একটি খিলাফত রাষ্ট্র গড়ে তোলাই তাদের একমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।

ক্ষমতা দখলের তিন ধাপের কৌশল

হিযবুত তাহরীর নিজেদের সরাসরি সশস্ত্র বা সহিংস সংগঠন হিসেবে উপস্থাপন করে না, তবে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য তাকীউদ্দীন আল-নাবহানী প্রণীত একটি নির্দিষ্ট তিন ধাপের পদ্ধতি অনুসরণ করে:

প্রথম ধাপ (তাসকিফ বা শিক্ষাদান): গোপন স্টাডি সার্কেলের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তিসমূহকে সংগঠনের আদর্শে দীক্ষিত করা এবং একটি শক্ত রাজনৈতিক ক্যাডার তৈরি করা।

দ্বিতীয় ধাপ (তাফাউল বা মিথস্ক্রিয়া): সমাজের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত শ্রেণী ও সাধারণ জনগণের মাঝে আদর্শ ছড়ানো এবং বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসন্তোষ তৈরি করা।

তৃতীয় ধাপ (নুসরাহ বা সামরিক সমর্থন লাভ): সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের কাছ থেকে আনুগত্য বা সামরিক সমর্থন (নুসরাহ) অর্জন করা। এই সমর্থনের মাধ্যমে একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিদ্যমান সরকার উৎখাত করে খেলাফত ঘোষণার পরিকল্পনা করা হয়।

সদস্য সংগ্রহ পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিষেধাজ্ঞা

সদস্য সংগ্রহের কৌশল হিযবুত তাহরীরের সদস্য সংগ্রহ ও সংগঠনের কাঠামো সাধারণ উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর থেকে আলাদা। তারা নিরক্ষর বা আর্থিকভাবে অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর পরিবর্তে মূলত উচ্চশিক্ষিত তরুণ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, আমলা, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গোপন ও নেটওয়ার্কভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। গোপন স্টাডি সার্কেল, লিফলেট বিতরণ এবং সাইবার এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে তারা মেধাভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর মাঝে নিজেদের মতাদর্শ ছড়ায়।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিষেধাজ্ঞা: বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে হিযবুত তাহরীরের শাখা ছড়িয়ে রয়েছে। তরুণ সমাজকে চরমপন্থার দিকে ধাবিত করা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরোধিতা করা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টির অভিযোগে বিশ্বজুড়ে এটি ব্যাপকভাবে নিষিদ্ধ বা কঠোর নজরদারির অধীনে রাখা হয়েছে:

জার্মানি: ২০০৩ সালে দেশটিতে ইহুদিবিদ্বেষ ছড়ানো ও সংবিধানবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে একে নিষিদ্ধ করা হয়।

যুক্তরাজ্য: দীর্ঘদিন উন্মুক্ত কার্যক্রম চালানোর পর ২০২৪ সালে হিযবুত তাহরীরকে যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

ইন্দোনেশিয়া: ২০১৭ সালে দেশটিতে সংগঠনটির সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

রাশিয়া ও মধ্য এশিয়া: ২০০৩ সালে রাশিয়া একে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করে। এছাড়া উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তানসহ মধ্য এশিয়ার প্রায় সব দেশে এটি নিষিদ্ধ।

মধ্যপ্রাচ্য: মিশর, সৌদি আরব, জর্ডান এবং সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে এটি নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে ২০০০ থেকে ২০০১ সালের দিকে হিযবুত তাহরীর তাদের কার্যক্রম শুরু করে। প্রাথমিক অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর হাত ধরে এর সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আইইউবিসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে গোপন স্টাডি সার্কেল, সেমিনার ও অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে তারা নিজেদের ক্যাডার ভিত্তি তৈরি করে।

সংগঠনটি বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি, নির্বাচন বয়কটের আহ্বান এবং বিদ্যমান সংবিধানের বিরুদ্ধে লিফলেট ও পুস্তক বিতরণের মাধ্যমে প্রচারণা চালায়। পরবর্তীতে তারা দেশের সামরিক বাহিনীতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার সাথে হিযবুত তাহরীরের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে, যেখানে কতিপয় সেনাকর্মকর্তাকে বিভ্রান্ত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।

জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, চরমপন্থা ছড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিনাশের অভিযোগে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অ্যান্টি-টেররিজম আইনের আওতায় হিযবুত তাহরীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সংগঠনটি বিভিন্ন সময় অনলাইনে গোপন বার্তা আদান-প্রদান অ্যাপস, সোশ্যাল মিডিয়া, ঝটিকা মিছিল এবং বেনামী পোস্টার ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করেরে আসছে।

‘নুসরাহ’ (Nusrah) কৌশল ও সামরিক অভ্যুত্থানের তত্ত্ব

উগ্রপন্থী ও রাজনৈতিক ইসলামের ইতিহাসে হিযবুত তাহরীরের (Hizb ut-Tahrir) ক্ষমতা দখলের পদ্ধতিটি অত্যন্ত স্বতন্ত্র, তাত্ত্বিক এবং সুনির্দিষ্ট। ১৯৫৩ সালে জেরুজালেমে তাকিউদ্দিন আল-নাবহানি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি অন্যান্য সশস্ত্র বা গণতান্ত্রিক ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এক পথে চালিত হয়। তাদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রধান চাবিকাঠি হলো ‘নুসরাহ’ (Nusrah) কৌশল, যা কার্যত সামরিক বাহিনীর ভেতরে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত তত্ত্ব।

আল-কায়েদা, আইএস ও ব্রাদারহুড থেকে পার্থক্য

হিযবুত তাহরীরের রাজনৈতিক দর্শনকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে বিদ্যমান অন্যান্য ইসলামপন্থী ধারার সাথে এর আদর্শিক ও কৌশলগত বৈসাদৃশ্য বোঝা জরুরি:

আল-কায়েদা ও আইএস (ISIS) বনাম হিযবুত তাহরীর: আল-কায়েদা বা আইএসের মতো সশস্ত্র জিহাদি গোষ্ঠীগুলো সরাসরি সহিংসতা, সুইসাইড বোম্বিং, বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা, দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধ এবং ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে তথাকথিত রাষ্ট্র বা খেলাফত কায়েম করতে চায়। বিপরীতে, হিযবুত তাহরীর তার সাধারণ ক্যাডারদের দিয়ে সরাসরি সন্ত্রাসী হামলা বা অস্ত্রহাতে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে না। তারা মনে করে, সাধারণ জনগণকে দিয়ে সহিংসতা চালিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা অসম্ভব; বরং রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনী বা সামরিক শক্তিকে নিজেদের পক্ষে আনাই ক্ষমতা দখলের দ্রুততম ও কার্যকর পথ।

মুসলিম ব্রাদারহুড ও গণতান্ত্রিক ইসলামপন্থী বনাম হিযবুত তাহরীর: মুসলিম ব্রাদারহুড কিংবা বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক ইসলামপন্থী দলগুলো প্রচলিত রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং বিদ্যমান শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর থেকেই ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু হিযবুত তাহরীরের রাজনৈতিক আকীদা অনুযায়ী, ধর্মনিরপেক্ষ বা মানবরচিত সংবিধানের অধীনে নির্বাচন করা কিংবা গণতান্ত্রিক সংসদে অংশ নেওয়া সম্পূর্ণ ‘হারাম’ ও ‘শিরক’। তাদের মতে, গণতন্ত্রে সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে, যা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী; কারণ তাদের দৃষ্টিতে সার্বভৌমত্ব কেবল আল্লাহর।

নুসরাহের ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও কৌশলগত ভিত্তি

‘নুসরাহ’ (Nusrah) শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো সাহায্য, রাজনৈতিক নিরাপত্তা বা সশস্ত্র সমর্থন লাভ। হিযবুত তাহরীর তাদের এই কৌশলের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বৈধতা উপস্থাপন করে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াতী জীবনের মাক্কী যুগের শেষ পর্যায়ের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা থেকে।

মক্কায় যখন কুরাইশদের নির্যাতন চরম আকার ধারণ করে এবং ইসলাম প্রচার কঠিন হয়ে পড়ে, তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কার বাইরের বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়ে সামরিক সুরক্ষা ও রাজনৈতিক সমর্থন ('নুসরাহ') চেয়েছিলেন। অবশেষে মদিনার (তৎকালীন ইয়াসরিব) ক্ষমতাশালী আওস ও খাজরাজ গোত্রের নেতারা তাকে সুরক্ষা প্রদান এবং তাদের ভূখণ্ডে রাষ্ট্র গঠনের রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিতে সম্মত হন, যা ইতিহাসে ‘বায়াতে আকাবা’ নামে পরিচিত। এই নুসরাহের ফলেই মদিনায় প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

হিযবুত তাহরীর এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর ওপর অন্ধভাবে প্রয়োগ করে। তাদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আধুনিক রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীই হলো সমসাময়িক যুগের 'আওস ও খাজরাজ' গোত্র। তাই জনগণের কাছ থেকে ভোট চেয়ে বা রাস্তাঘাটে যুদ্ধ করে নয়, বরং রাষ্ট্রের মূল শক্তির উৎস সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের কাছ থেকে 'নুসরাহ' বা সমর্থন আদায় করেই খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

হিযবুত তাহরীরের নুসরাহর তিনটি ধাপ

রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং বৈশ্বিক খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হিযবুত তাহরীর একটি পর্যায়ক্রমিক ও সুসংগঠিত তিন ধাপের কৌশল অনুসরণ করে:

১. তাছকিফ (কৈশিক প্রশিক্ষণ ও ক্যাডার গঠন): এটি সংগঠনের শুরুর ধাপ, যেখানে গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করা হয়। ৫ থেকে ৭ জনের ছোট ছোট গোপন স্টাডি সার্কেল যাকে 'হালকা' (Halaqah) বলা হয় তৈরি করে বাছাইকৃত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা দেওয়া হয়। এতে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, আইনজীবী এবং সামরিক পরিবারের সম্ভাবনাময় তরুণদের টার্গেট করা হয়। এই ধাপে একজন সমর্থককে কট্টর অনুগত ও সুসংগঠিত ক্যাডারে রূপান্তর করা হয়, যারা আল-নাবহানির রচিত বই ও দলীয় ম্যানিফেস্টো গভীরভাবে অধ্যয়ন করে।

২. তফাউল (সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও জনমত গঠন): দ্বিতীয় ধাপে সংগঠনটি গোপনীয়তার গণ্ডি পেরিয়ে সমাজে ব্যাপকভাবে তাদের ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। লিফলেট বিতরণ, পোস্টারিং, প্রেস রিলিজ, সেমিনার, জুমার নামাজের পর প্রেস ব্রিফিং এবং বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমালোচনা প্রচার করে। এই ধাপের মূল উদ্দেশ্য তিনটি- বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা, গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি জনগণের মোহভঙ্গ ঘটানো। বিদ্যমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক সংকটকে তুলে ধরে রাষ্ট্রে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি করা। জনগণকে এটা বোঝানো যে, কেবল একটি একক 'খেলাফত' ব্যবস্থাই তাদের সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান।

৩. ইস্তিলাম আল-হুকম (নুসরাহের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল): এটি হিযবুত তাহরীরের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনাল ধাপ। জনমত গঠনের পাশাপাশি সংগঠনটি তাদের গোপন সেলের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু দেশের সামরিক বাহিনীতে (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) অনুপ্রবেশ ঘটায়। তারা সামরিক অফিসারদের মধ্যে আদর্শিক প্রভাব বিস্তার করে এবং অনুগত অফিসারদের নিয়ে বাহিনীর ভেতরে গোপন সেল বা নেটওয়ার্ক তৈরি করে।

সেনা অফিসারদের বোঝানো হয় যে, বিদ্যমান সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা পাপ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হিযবুত তাহরীরের হাতে তুলে দেওয়া তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব। উপযুক্ত সময়ে বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে এই সেনা অফিসারদের নির্দেশ দিয়ে একটি সামরিক অভ্যুত্থান (Military Coup) ঘটানো হয়। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ হিযবুত তাহরীরের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতে অর্পণ করা হয় এবং সাথে সাথে 'খেলাফত' ঘোষণা করা হয়।

বিভিন্ন দেশে হিযবুত তাহরীরের সেনা অভ্যুত্থানের ব্যর্থ প্রচেষ্টা

হিযবুত তাহরীর তাদের ‘নুসরাহ’ (সামরিক বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সহযোগিতায় ক্ষমতা গ্রহণ) তত্ত্ব কেবল আদর্শিক বই-পুস্তকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। গত কয়েক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অনুগত গোষ্ঠী তৈরি করে ক্ষমতা দখলের একাধিক সুনির্দিষ্ট ও প্রত্যক্ষ চেষ্টা চালিয়েছে সংগঠনটি।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রাথমিক সামরিক চক্রান্ত (১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশক)

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা তাকীউদ্দীন আন-নাবহানীর জীবদ্দশাতেই মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক রাষ্ট্রে শাসনক্ষমতা দখলের চেষ্টা করা হয়:

জর্ডান (১৯৬৮ ও ১৯৬৯): ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে জর্ডানি সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের মতাদর্শিকভাবে প্রভাবিত করে সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালায় হিযবুত তাহরীর। তৎকালীন জর্ডানি গোয়েন্দা সংস্থার সময়োপযোগী তৎপরতায় এই ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়, যার ফলে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বহিষ্কার ও সামরিক আদালতে দণ্ড প্রদান করা হয়।

সিরিয়া: ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে সিরিয়ার ক্ষমতাসীন বাথ পার্টিকে উৎখাত করে খেলাফত কায়েমের লক্ষ্যে সামরিক বাহিনীতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালানো হয়। তবে তৎকালীন সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও গোয়েন্দা নজরদারির কারণে চক্রান্তটি শুরুতেই নস্যাৎ করা হয়।

মিশর (১৯৭৪): ১৯৭৪ সালে মিশরের 'টেকনিক্যাল মিলিটারি একাডেমি' আক্রমণ এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে উৎখাত করার চেষ্টা চালানো হয়। এই চক্রান্তের পেছনে হিযবুত তাহরীরের নুসরাহ কৌশলের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল। মিশরীয় নিরাপত্তা বাহিনী এই অভ্যুত্থান চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করে এবং জড়িতদের মূল অংশকে গ্রেপ্তার করে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অনুপ্রবেশ ও ষড়যন্ত্র (২০১০-২০১১)

পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানে প্রভাব বিস্তারে হিযবুত তাহরীর দেশটির সামরিক বাহিনীতে বিশেষ নজর দেয়। ২০১১ সালের মে মাসে রাওয়ালপিন্ডির সেনাসদর দপ্তরে (GHQ) কর্মরত ব্রিগেডিয়ার আলী খানসহ চারজন সামরিক কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত তাহরীরের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন।

অভ্যুত্থানের নীলনকশা: এই গোষ্ঠীটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে শীর্ষ নেতৃত্বকে উৎখাত করা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ খেলাফতী শাসনকাঠামোর অধীনে নেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। পরবর্তীতে ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্সালের (FGCM) মাধ্যমে ২০১২ সালে ব্রিগেডিয়ার আলী খানসহ অভিযুক্তদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টা (২০১১-২০১২)

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে খেলাফত প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে হিযবুত তাহরীর সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা বিনষ্টের ষড়যন্ত্র করে। ২০১১ সালের ডিসেম্বর ও ২০১২ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে একটি ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র নস্যাতের ঘোষণা দেয়। সামরিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়, হিযবুত তাহরীরের মতাদর্শে চরমপন্থী হওয়া কিছু কর্মকর্তা গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করছিলেন।

মূল পরিকল্পনাকারী ও নেপথ্য ভূমিকা: এই চক্রান্তের প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন বরখাস্তকৃত মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (মেজর জিয়া) এবং অবসরপ্রাপ্ত সংকেত বাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এহসান ইউসুফ। হিযবুত তাহরীরের আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া নির্দেশনায় তারা সামরিক বাহিনীর ভেতরে লিফলেট বিতরণ এবং ইমেইলের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। সেনা গোয়েন্দা সংস্থা সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়ায় এই পুরো চক্রান্ত ব্যর্থ হয়।

হিযবুত তাহরীর কি শুধুমাত্র সেনাবাহিনীকেই টার্গেট করে?

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, হিযবুত তাহরীর কি কেবল সশস্ত্র বাহিনীতেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখে? উত্তর হচ্ছে: না, তারা কেবল সেনাবাহিনীকেই টার্গেট করে না; তবে চূড়ান্ত ক্ষমতা দখলের একমাত্র চাবিকাঠি হিসেবে তারা সেনাবাহিনীকেই ব্যবহার করে।

হিযবুত তাহরীর তাদের আদর্শিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নে কেবল সশস্ত্র বাহিনীতে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং সমাজের অন্যান্য প্রভাবশালী ও নীতি-নির্ধারণী স্তরেও সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রয়োগ করে। তবে আধুনিক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত চাবিকাঠি হিসেবে তারা সেনাবাহিনীকেই ব্যবহার করে। সংগঠনটির দীর্ঘমেয়াদী কৌশল মূলত তিনটি ধাপে বিভক্ত তাছকিফ (আদর্শিক শিক্ষা ও ক্যাডার গঠন), তফাউল (জনমত গঠন ও সমাজ সংস্কার) এবং নুসরাহ (সামরিক শক্তির সহায়তা গ্রহণ ও ক্ষমতা দখল)।

সংগঠনটির কৌশল পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে তাদের কাজের দুটি ভিন্ন স্তর রয়েছে:

বেসামরিক ক্ষেত্রে টার্গেট গ্রুপ (তাছকিফ ও তফাউল ধাপ)

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মেধাবী তরুণ সমাজ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, আইইউটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি, প্রকৌশল, সামাজিক বিজ্ঞান এবং ব্যবসা অনুষদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের তারা প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানায়। গোপন 'হালাকা' (অধ্যয়ন চক্র) ও এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তরুণদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রভাবিত করে আদর্শিক ক্যাডারে রূপান্তর করা হয়।

পেশাজীবী, আমলাতন্ত্র ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণী: ঐতিহ্যগত উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর বিপরীতে হিযবুত তাহরীর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চেয়ে সমাজের চালিকাশক্তিগুলোকে বেশি টার্গেট করে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, আইনজীবী এবং সিভিল প্রশাসনের নবীন ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের মাধ্যমে গোপন সেল গড়ে তোলা হয়, যারা সরাসরি রাজপথে না নেমেও সংগঠনকে আর্থিক সাহায্য, নীতিগত পরামর্শ ও আইনি ও প্রশাসনিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করে।

গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ: সাইবার স্পেসে প্রপাগান্ডা চালানো, গোপন অনলাইন সাময়িকী ও বুলেটিন তৈরি এবং তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ তরুণদের দলভুক্ত করা হয়। এরা ডার্ক ওয়েব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেনামী আইডি বা চ্যানেল ব্যবহার করে তাদের আদর্শের বার্তা ছড়িয়ে দেয়।

সামরিক বাহিনীর ওপর বিশেষ মনোযোগ (নুসরাহ ধাপ)

'নুসরাহ' ধারণা ও সামরিক অভ্যুত্থানের কৌশল: হিযবুত তাহরীরের মতাদর্শ অনুযায়ী, বেসামরিক সমাজের ক্যাডাররা কেবল খিলাফতের পথ সুগম করার মতো আদর্শিক জমি প্রস্তুত করতে পারে; কিন্তু সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থন ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল অসম্ভব। ইসলামের প্রাথমিক যুগের 'আনসারদের' উদাহরণ থেকে তারা সামরিক শক্তির কাছ থেকে 'নুসরাহ' (ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি ও সামরিক সাহায্য) আদায় করাকে তাদের বাধ্যতামূলক কৌশল মনে করে।

মিড-লেভেল অফিসারদের টার্গেট করা: তারা বিশেষ করে সেনাসদস্য ও সশস্ত্র বাহিনীর নবীন ও মধ্যম সারির অফিসারদের (ক্যাপ্টেন থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার) টার্গেট করে লিফলেট পৌঁছানো ও গোপন যোগাযোগ স্থাপন করে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে উদ্ঘাটিত ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পেছনে হিযবুত তাহরীরের নেটওয়ার্ক ও নুসরাহ কৌশলের সরাসরি সম্পৃক্ততা উন্মোচিত হয়েছিল।

ছায়া রাষ্ট্রকাঠামো (Shadow State) প্রস্তুত রাখা: অসামরিক সমাজের প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ ও প্রশাসনিক ক্যাডার এবং সামরিক অফিসার এই দুইয়ের সমন্বয়ে তারা একটি প্রস্তুত ‘ছায়াসরকার’ বজায় রাখে, যেন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতার পালাবদল ঘটার পরপরই তারা নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ‘নুসরাহ’ এবং ২০১১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থান

২০০৯ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রকাশ্যে লিফলেট বিতরণ বা মিছিল-সমাবেশ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সংগঠনটি সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে নুসরাহ বাস্তবায়নে পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করে। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে থাকা ধার্মিক বা অসন্তোষগ্রস্ত সেনা কর্মকর্তাদের আদর্শিকভাবে প্রভাবিত করা, একটি গোপন সামরিক সেল গড়ে তোলা এবং সুবিধাজনক সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা দখল করা।

পিলখানা ট্র্যাজেডির ক্ষত ও মনস্তাত্ত্বিক সুযোগ গ্রহণ

২০১১ সালের এই চক্রান্তের মূল পটভূমি বুঝতে হলে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় ঘটে যাওয়া বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) বিদ্রোহের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিলখানায় ৫৭ জন অত্যন্ত মেধাবী ও জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সমগ্র সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে নজিরবিহীন শোকাচ্ছন্নতা, গভীর ক্ষোভ এবং মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতার জন্ম দিয়েছিল। পিলখানা-পরবর্তী সময়ে সেনাসদস্যদের একটি অংশের মনে নিজস্ব নিরাপত্তা, দেশের সার্বভৌমত্ব এবং সরকারের প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়।

হিযবুত তাহরীর সুচতুরভাবে সেনাবাহিনীর এই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত এবং চাপা ক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তারা পিলখানার ঘটনাকে তৎকালীন সরকারের ব্যর্থতা ও বিদেশী শক্তির চক্রান্ত হিসেবে চিত্রায়িত করে "ও সেনাবাহিনীর জোয়ান ও কর্মকর্তারা" শিরোনামে বিশেষ উস্কানিমূলক লিফলেট ক্যান্টনমেন্ট ও সেনা আবাসন এলাকায় গোপনে প্রচার করতে শুরু করে।

অনুপ্রবেশ ও প্রপাগান্ডা কৌশল

হিযবুত তাহরীরের বেসামরিক সদস্যরা সেনা কর্মকর্তাদের নিকটবর্তী আত্মীয়, বন্ধু ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সাবেক সহপাঠীদের মাধ্যমে প্রাথমিক যোগাযোগ স্থাপন করত। পরবর্তীতে সেনাসদস্যদের কাছে ডাকযোগে পোস্টার, লিফলেট এবং এনক্রিপ্টেড ইমেলের মাধ্যমে গোপন বার্তা পাঠাতে শুরু করে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে তারা কর্মকর্তাদের মগজধোলাই করার চেষ্টা করে।

তারা সেনাসদস্যদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল করতে চায় যে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে অক্ষম এবং বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় সেনাবাহিনী তার প্রকৃত মর্যাদা পাচ্ছে না; তাই দেশের স্বাধীনতা রক্ষা ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য সেনা কর্মকর্তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। এই ভাবাদর্শ ছড়ানোর জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন গোপন আস্তানায় সেনাসদস্যদের নিয়ে ছোট ছোট পাঠচক্র বা ‘হালকা’ পরিচালনা করা হতো।

২০১১ সালের ব্যর্থ ক্যু ছক ও মূল কুশীলবগণ

চরমপন্থী এই ভাবাদর্শে প্রলুব্ধ হয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যম ও নিম্ন সারির কিছু কর্মকর্তা একটি গোপন সামরিক চক্রান্তে জড়িয়ে পড়েন। এই চক্রান্তের মূল নেতৃত্বে ছিলেন:

মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (মেজর জিয়া): তিনি ছিলেন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (MIST)-এর ইনফরমেশন টেকনোলজির গ্র্যাজুয়েট এবং কারিগরি ও যোগাযোগ বিদ্যায় অত্যন্ত দক্ষ একজন প্রকৌশলী কর্মকর্তা। তিনি এনক্রিপ্টেড সফটওয়্যার, স্যাটেলাইট সংযোগ এবং যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক হিযবুত তাহরীর নেতাদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন ঘাঁটিতে থাকা কর্মকর্তাদের সংগঠিত করেছিলেন।

লেফট্যানেন্ট কর্নেল এহসান ইউসুফ: তিনি ফিল্ড লেভেলে সেনাদল একত্রিত করা এবং সাভার ও ঢাকা সেনানিবাসের নির্দিষ্ট কিছু ইউনিটকে অভ্যুত্থানের পক্ষে নেয়ার মূল দায়িত্বে ছিলেন।

মেজর জাকির ও অন্যান্য সহযোগী: কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত মিলিয়ে প্রায় ১৬ জন মধ্যম সারির সেনা কর্মকর্তা এবং কয়েকজন প্রবাসী হিযবুত তাহরীর কর্মী এই গোপন নেটওয়ার্কে যুক্ত হন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে সাভার ও অন্যান্য ক্যান্টনমেন্ট থেকে সংকেত পেয়ে নির্দিষ্ট কিছু সেনাদল ঢাকায় প্রবেশ করার কথা ছিল। পরিকল্পনাটি ছিল ঢাকায় এসে বঙ্গভবন, প্রধান প্রশাসনিক ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং জাতীয় টিভি স্টেশন ঘেরাও করে সরকার উৎখাত করা এবং সামরিক শাসন জারি করে পরবর্তীতে খেলাফতি রাষ্ট্র ঘোষণা করা।

সেনাবাহিনীর নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা (ডিজিএফআই) এবং মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (এমআই)-এর ধারাবাহিক গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে এই ভয়াবহ ষড়যন্ত্র সময়মতো ধরা পড়ে যায়। মেজর জিয়া যখন সাভার সেনানিবাসের একজন জ্যেষ্ঠ ব্রিগেড কমান্ডারকে চক্রান্তে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান, তখন ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। ২০১১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতেই সেনা গোয়েন্দারা অভিযান চালিয়ে লেফট্যানেন্ট কর্নেল এহসান ইউসুফ ও মেজর জাকিরসহ মূল চক্রান্তকারীদের গ্রেফতার করে।

বাংলাদেশে হিযবুত তাহরীরের সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ ও সেনাগোয়েন্দাদের তৎপরতা

বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ২০১১ সালের ডিসেম্বরের পরিকল্পিত সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা। নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন 'হিযবুত তাহরীর' তাদের 'নাসরাহ' (সামরিক বাহিনীর সাহায্য নিয়ে ক্ষমতা দখল) কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ও সাবেক কিছু কট্টরপন্থী কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চক্রান্ত করে। এই প্রক্রিয়ায় মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (মেজর জিয়া নামে পরিচিত) মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করছিলেন।

চক্রান্তকারীদের কৌশলগত ভুল ও ভুল অনুমানের প্রধান জায়গাটি ছিল সেনা শৃঙ্খলার গভীরতা এবং অফিসারদের পেশাদারিত্ব বুঝতে না পারা। ২০১১ সালের ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে মেজর জিয়া একজন বিশ্বস্ত ও জ্যেষ্ঠ brigade commander-কে এই ষড়যন্ত্রে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং সরকার উৎখাতের মাধ্যমে উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তবে সেই দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক সেনাকর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টির ভয়াবহতা অনুধাবন করে সময় নষ্ট না করে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সেনাসদরকে (Army Headquarters) বিস্তারিত অবহিত করেন।

তথ্য পাওয়া মাত্রই সেনাবাহিনীর সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তর (Directorate of Military Intelligence - DMI) এবং কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স উইং সমন্বিত গোয়েন্দা অভিযান শুরু করে। কট্টরপন্থায় প্রলুব্ধ ও চিহ্নিত কর্মকর্তাদের সমস্ত ফোন রেকর্ড, ইমেইল বার্তা এবং গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা নজরদারির আওতায় আনা হয়। গোয়েন্দাদের সতর্ক পর্যবেক্ষণের ফলে অভ্যুত্থানকারীদের সম্ভাব্য প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যর্থ করে দেওয়া হয় এবং পরিকল্পনায় জড়িত বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। চক্রান্তের মূল হোতা মেজর জিয়া সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান (পরবর্তীতে তিনি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল-ইসলামের সাথে যুক্ত হন)।

পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার পর ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (ISPR) মিলনায়তনে এক অভূতপূর্ব ও জরুরি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করা হয়। তৎকালীন আইএসপিআর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ মাসুদ রাজ্জাক আনুষ্ঠানিকভাবে এই ষড়যন্ত্রের তথ্য দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রকাশ করেন:

"সেনাবাহিনীতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কিছু ধর্মীয় উগ্রপন্থী কর্মকর্তা সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করেছিল, যা সেনাবাহিনীর সময়োচিত ও পেশাদার পদক্ষেপের কারণে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করা হয়েছে। এতে মোট ১৬ জন বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, যার নেপথ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী রাজনৈতিক সংগঠন হিযবুত তাহরীর সরাসরি যুক্ত ছিল।"

আইএসপিআরের এই ঘোষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে সামরিক গোয়েন্দাদের সময়োপযোগী পদক্ষেপ না থাকলে সামরিক বাহিনী তথা দেশের রাজনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা এক গভীর সংকটের মুখে পড়তে পারত।

হিযবুত তাহরীর ও ২০১১ সালের অভ্যুত্থান সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত তথ্য

নিচে সংগঠনটির পরিচিতি, কৌশল এবং ২০১১ সালের ঘটনার সংক্ষিপ্ত চিত্র সম্বলিত সারণীটি প্রদান করা হলো:

বিষয়/দিক

মূল তথ্য ও বিবরণ

প্রতিষ্ঠা ও মূল প্রতিষ্ঠাতা

১৯৫৩ সালে জেরুজালেমে বিচারক তাকীউদ্দীন আল-নাবহানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত।

মূল রাজনৈতিক দর্শন

১৯২৪ সালে ধ্বংসপ্রাপ্ত উসমানীয় খেলাফতের আদলে বিশ্বজুড়ে একক ‘খেলাফত’ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশে অবস্থান

২০০০-২০০১ সালে যাত্রা শুরু; উগ্রপন্থা ছড়ানোর অপরাধে ২০০৯ সালের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিষিদ্ধ।

‘নুসরাহ’ কৌশল

সাধারণ সদস্যদের দিয়ে সহিংসতা না ঘটিয়ে, সেনাবাহিনীর ভেতরের উগ্রপন্থী কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে ক্যু ঘটানো।

তিনটি কৌশলগত পর্যায়

১. তাছকিফ (ক্যাডার গঠন), ২. তফাউল (জনমত গঠন) এবং ৩. ইস্তিলাম আল-হুকম (নুসরাহের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ)।

২০১১ সালের ক্যু চেষ্টা

পিলখানা ট্র্যাজেডির ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে প্রলুব্ধ ১৬ জন সেনাসদস্য কর্তৃক সরকার উৎখাতের ব্যর্থ চক্রান্ত।

মূল মাস্টারমাইন্ড

বরখাস্তকৃত ও পলাতক মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (মেজর জিয়া)।

অভ্যুত্থান উন্মোচন

২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি আইএসপিআরের সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন পরিচালক ব্রি. জে. মাসুদ রাজ্জাক কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ।

এই সেনা অভ্যুত্থান কি সফল হতে পারতো?

সামরিক বিজ্ঞান, রণকৌশল এবং বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের বিচারে ২০১১ সালের ডিসেম্বরের এই পরিকল্পিত অভ্যুত্থান সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল কার্যত শূন্য। সেনা অভ্যুত্থানের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেকোনো সফল অভ্যুত্থানের পেছনে নির্দিষ্ট কিছু সামরিক, কৌশলগত ও প্রশাসনিক উপাদানের প্রয়োজন হয়, যা এই চক্রান্তকারীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।

কেন এই অভ্যুত্থান সফল হওয়ার সুযোগ ছিল না, তার মূল সামরিক ও কৌশলগত কারণসমূহ:

চেইন অব কমান্ড এবং সেনা নেতৃত্বের ঘাটতি: সামরিক বাহিনী একটি কঠোর অনুক্রমিক বা হায়ারার্কিকাল কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। মধ্যম বা নিম্ন সারির কয়েকজন কর্মকর্তা (যেমন মেজর বা ক্যাপ্টেন) কখনোই ব্যাটালিয়ন বা ব্রিগেড স্তরের বিশাল সেনা দলকে তাদের নির্দেশমতো পরিচালনা করতে পারেন না। এই ষড়যন্ত্রে কোনো জেনারেল, ডিভিশনাল জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (GOC), কিংবা সেনাপ্রধানের সমর্থন বা পরোক্ষ সম্মতি ছিল না। সাভারের ৯ পদাতিক ডিভিশন বা ঢাকার ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর সেনাসদস্যরা শীর্ষ অধিনায়কের নির্দেশ বা প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড ছাড়া রাস্তায় নেমে আসবে এই চিন্তা ছিল সামরিক বিজ্ঞানের দিক থেকে সম্পূর্ণ অবাস্তব ও কল্পনানির্ভর।

শক্তিশালী ও আধুনিক কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই (DGFI) এবং সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (DMI) কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সুসংগঠিত। সেনানিবাসের অভ্যন্তরে অননুমোদিত যেকোনো চলাচল, গোপন বৈঠক বা অস্ত্রাগার (Armory) থেকে বেআইনিভাবে অস্ত্র বের করার চেষ্টা করা মাত্রই তা গোয়েন্দা নজরদারিতে ধরা পড়ে যায়। তৎকালীন সময়ে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি থাকায় ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিটি পদক্ষেপ আগেই চিহ্নিত করা সহজ হয়েছিল।

দেশপ্রেমিক অফিসার ও সৈনিকদের পেশাদার অবস্থান: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিংহভাগ অফিসার এবং সাধারণ সৈনিক পেশাদারিত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, দেশের সংবিধান এবং চেইন অব কমান্ডের প্রতি অবিচল অনুগত। বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালনকারী এই বাহিনী নিজেদের শৃঙ্খলা ও পেশাদার ভাবমূর্তির ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শে প্রলুব্ধ কতিপয় পথভ্রষ্ট কর্মকর্তার প্ররোচনায় পুরো পেশাদার বাহিনীকে বিভ্রান্ত বা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া চক্রান্তকারীদের জন্য অসম্ভব ছিল।

স্ট্র্যাটেজিক সাপোর্ট ও মূলধারার সমর্থনের অভাব: যেকোনো সামরিক অভ্যুত্থানে ভারী অস্ত্রশস্ত্র (আর্মার্ড কোর/ট্যাংক), সিগন্যাল যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিমান প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তার প্রয়োজন হয়। চক্রান্তকারীদের হাতে এর কিছুই ছিল না। হিজবুত তাহরীরের মতো উগ্রবাদী সংগঠনের প্রতি সাধারণ জনগণ বা কোনো রাজনৈতিক শক্তির কোনো সমর্থন ছিল না। ফলে সেনাসদস্যদের ক্ষুদ্র একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলেও সাঁজোয়া ইউনিট, র্যাব, পুলিশ ও অনুগত বাহিনীর সমন্বিত প্রতিরোধের মুখে তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হতে বাধ্য ছিল।

হিযবুত তাহরীর কি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ‘খেলাফত’ শাসন শুরু করতে পারতো?

যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয় যে চক্রান্তকারীরা সাময়িকভাবে কোনো একটি পয়েন্টে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পেরেছিল, তথাপি বাংলাদেশের মাটিতে হিযবুত তাহরীরের নেতৃত্বে ‘খেলাফত’ শাসন প্রতিষ্ঠা করা একেবারেই অসম্ভব একটি চিন্তা ছিল।

এর পেছনে বেশ কিছু সামাজিক, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কারণ কাজ করে:

জনগণের অগ্রহণযোগ্যতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ: বাংলাদেশের ইসলামি সংস্কৃতি মূলত সুফি-সাধক, পীর-আউলিয়াদের উদার ও সহনশীল ভাবধারায় লালিত। এদেশের সমাজব্যবস্থায় সুফি ঘরানার হানাফি মাজহাবের প্রভাব গভীরভাবে শিকড় গেড়ে আছে, যা মধ্যপন্থী ও পরমতসহিষ্ণু। অন্যদিকে হিযবুত তাহরীরের ভাবধারা ও লক্ষ্য আন্তর্জাতিক প্যান-ইসলামিজম এবং সালাফি-উগ্রপন্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা এদেশের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। সাধারণ ধর্মপ্রাণ জনগণ, আলেম-ওলামা, সুশীল সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি কেউই এই কঠোর চরমপন্থী আদর্শকে সমর্থন করে না। রাজনৈতিক জনভিত্তি ও মূলধারার সমর্থনহীন কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন গোপনে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসলে তা তাৎক্ষণিকভাবে দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ ও নজিরবিহীন সামাজিক প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে বাধ্য হতো।

ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা: দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশের তিন দিকে বিস্তৃত প্রতিবেশী ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমার। ভারতের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর স্থিতিশীলতার প্রশ্নে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কোনো চরমপন্থী বা প্যান-ইসলামিস্ট সরকারের উদ্ভবকে তারা তাদের প্রত্যক্ষ সার্বভৌম হুমকি হিসেবে বিবেচনা করবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভূ-রাজনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো উগ্রতাবাদী গোষ্ঠী সীমান্ত সংলগ্ন রাষ্ট্রে আধিপত্য বিস্তার করলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো কূটনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এ ধরনের শাসনব্যবস্থা উৎখাতে তাৎক্ষণিক ও সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করত।

বৈশ্বিক বিশ্বব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পতন: আধুনিক বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনা, কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতি বহুলাংশে বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রবাসী আয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG) খাত, বৈশ্বিক অর্থায়ন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে এদেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব গভীরভাবে যুক্ত। কোনো অসংবিধানিক উগ্রপন্থী গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকত না। জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর বাণিজ্যিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করত এবং আন্তর্জাতিক সুইফট (SWIFT) ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক থেকে দেশকে বিচ্ছিন্ন করে দিত। ফলে কাঁচামাল আমদানি ও পোশাক রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে জাতীয় অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতো এবং দেশ দুর্ভিক্ষ ও মুদ্রাস্ফীতির মুখে পড়ত।

সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, গোয়েন্দা নজরদারি: বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী একটি সুশৃঙ্খল, পেশাদার এবং দেশপ্রেমিক বাহিনী হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। হিযবুত তাহরীর আদর্শগতভাবে 'নুসরাহ' (সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের সহায়তা চাওয়া) কৌশলের ওপর ভর করে অভ্যুত্থানের যে তত্ত্বীয় পরিকল্পনা করে, তা পেশাদার সামরিক শৃঙ্খলার কাছে অবাস্তব। সেনাবাহিনীর শক্ত চেইন অব কমান্ড, উচ্চস্তরের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা নজরদারি এবং উগ্রপন্থা-বিরোধী শূন্য সহনশীলতার কারণে চরমপন্থী মতাদর্শের স্থায়িত্ব লাভ করা অসম্ভব। ২০১১ সালের ব্যর্থ চক্রান্তের ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাহিনীর নিজস্ব সতর্কতা ও পেশাদার গোয়েন্দা ব্যবস্থার কারণেই এই চক্রান্ত অংকুরেই বিনষ্ট করা সম্ভব হয়েছিল।

রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির অনুপস্থিতি: রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কেবল একটি উগ্রবাদী ঘোষণা বা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা এবং বিচার ব্যবস্থা পরিচালনার সক্ষমতা। হিযবুত তাহরীর একটি আন্ডারগ্রাউন্ড ও নিষিদ্ধ দল হওয়ায় তাদের কোনো কার্যকর প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা নেই। রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র, পুলিশ বাহিনী এবং সার্বিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কখনোই একটি চরমপন্থী গোষ্ঠীর বেআইনি নির্দেশ মানত না, যা যেকোনো অভ্যুত্থানের চেষ্টাকে শুরুতেই সম্পূর্ণ অকার্যকর ও ব্যর্থ করে দিত।

২০১১ সালের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান এবং হিযবুত তাহরীরের ‘নুসরাহ’ কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি ছিল একটি নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠনের অমূলক ও অবাস্তব স্বপ্নের প্রতিফলন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সতর্ক চোখ, নিজস্ব গোয়েন্দা নজরদারি এবং পেশাদার চেইন অব কমান্ডের সুদৃঢ় ভিত্তির কারণেই এই গভীর চক্রান্ত অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, যেকোনো উগ্রতাবাদী অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ধারা রক্ষায় বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী সর্বদা অটল ও প্রস্তুত।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.