ঢালিউড কুইন পূর্ণিমার তিন বিয়ে ও ভাঙাগড়া প্রেম বিতর্কের ক্যানভাস

ঢালিউড কুইন পূর্ণিমার তিন বিয়ে ও ভাঙাগড়া প্রেম বিতর্কের ক্যানভাস

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের রূপালী পর্দায় যাঁদের সৌন্দর্য, সাবলীল অভিনয় এবং ভুবনভোলা হাসি দিয়ে কয়েক দশক ধরে দর্শকদের হৃদয়ে রাজত্ব করছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র দিলরারা হান্নান পূর্ণিমা যাঁকে এক নামে সবাই চেনেন 'পূর্ণিমা' বলে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ অবধি ঢালিউডের এই প্রথম সারির চিত্রনায়িকা নিজের রূপ ও অভিনয় নৈপুণ্যে মুগ্ধ করে রেখেছেন কোটি ভক্তকে।

তবে রূপালী পর্দার ঝলমলে আলোর পেছনে পূর্ণিমার ব্যক্তিগত জীবন, বিশেষ করে তাঁর প্রেম, বিয়ে এবং ভাঙাগড়ার গল্প সবসময়ই ছিল গণমাধ্যম ও ভক্তদের তুমুল কৌতুহল ও আলোচনার কেন্দ্রে। ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থায় প্রথম বিয়ে, দীর্ঘ ১৪ বছরের দ্বিতীয় দাম্পত্য জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত অবসান এবং পরবর্তীতে নতুন করে জীবন শুরু করার সাহস পূর্ণিমার ব্যক্তিগত জীবন যেন কোনো নাটকীয় চলচ্চিত্রের কাহিনীর চেয়ে কম নয়।

একজন সাধারণ তরুণী থেকে ঢালিউডের শীর্ষ নায়িকা হয়ে ওঠার গল্প, চিত্রনায়ক রিয়াজ ও রুবেলের সাথে প্রেমের গুঞ্জন, তিন-তিনটি বিয়ের নেপথ্য কারণ, মাতৃত্বের রূপান্তর এবং নতুন জীবনে থিতু হওয়ার পুরো ইতিহাস নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

পূর্ণিমার শুভ সূচনা ও রূপালী পর্দায় রাজত্ব

১৯৮১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করা দিলরারা হান্নান পূর্ণিমার চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটেছিল অত্যন্ত কম বয়সে। ১৯৯৮ সালে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক জাকির হোসেন রাজুর 'এ জীবন তোমার আমার' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মাত্র ১৭ বছর বয়সে চিত্রনায়ক রিয়াজের বিপরীতে তাঁর রূপালী পর্দায় যাত্রা শুরু হয়।

প্রথম চলচ্চিত্রেই নিজের নিষ্পাপ সৌন্দর্য ও অভিনয় দক্ষতা দিয়ে নজর কেড়েছিলেন তিনি। এরপর ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া 'মনের মাঝে তুমি' এবং ২০০৬ সালে 'হৃদয়ের কথা' চলচ্চিত্রের সাফল্য পূর্ণিমাকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত শিখরে। ২০১০ সালে 'ওরা আমাকে ভালো হতে দিল না' চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

কিন্তু রূপালী পর্দার এই অভূতপূর্ব সাফল্যের আড়ালে পূর্ণিমার ব্যক্তিগত জীবন ছিল বেশ ঝড়ঝাপ্টাপূর্ণ।

রূপালী জগতের প্রেম ও কাল্পনিক গুঞ্জন: রিয়াজ ও রুবেল প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে সফল যেকোনো অনস্ক্রিন জুটিকে কেন্দ্র করে প্রেম ও সম্পর্কের গুঞ্জন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। পূর্ণিমার ক্যারিয়ারেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

চিত্রনায়ক রিয়াজ: অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি ও বাস্তবের রসায়ন

ঢালিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি হলো রিয়াজ-পূর্ণিমা জুটি। একের পর এক সুপারহিট রোমান্টিক সিনেমা উপহার দেওয়ার কারণে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে ২০০০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিনোদন সাংবাদিক ও ভক্তদের মধ্যে প্রবল গুঞ্জন ছিল যে, রিয়াজ ও পূর্ণিমা বাস্তবেও একে অপরের প্রেমে মগ্ন।

বিশেষ করে ২০০৩ সালের 'মনের মাঝে তুমি' সিনেমার গান এবং আবেগঘন দৃশ্যগুলো দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন তাঁদের এই অনস্ক্রিন প্রেম হয়তো বাস্তবে রূপ নেবে। তবে এই গুঞ্জন নিয়ে পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে পূর্ণিমা স্পষ্ট করে বলেছিলেন:

"রিয়াজ ভাই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাপোর্ট ছিলেন। আমরা একসাথে এত বেশি কাজ করেছি যে আমাদের মধ্যে চমৎকার একটি বোঝাপড়া ছিল। কিন্তু এটা কখনোই প্রেমের দিকে যায়নি; আমাদের সম্পর্কটা স্রেফ গভীর বন্ধুত্ব ও পেশাদারিত্বের।"

চিত্রনায়ক রুবেল: ক্যারিয়ারের শুরুর গুঞ্জন

পূর্ণিমার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মার্শাল আর্ট হিরো রুবেল-এর সাথে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করার সূত্রে তাঁদের প্রেমের গুঞ্জন বিনোদন পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল। সে সময় পূর্ণিমা ছিলেন উদীয়মান ও নতুন মুখ, আর রুবেল ছিলেন প্রতিষ্ঠিত তারকা। তবে সেই গুঞ্জন বেশিদিন টেকেনি এবং পূর্ণিমা বা রুবেল কেউই তা নিয়ে কখনো বিশেষ মাথা ঘামাননি।

প্রথম বিয়ে: মোশতাক কিবরিয়ার সাথে স্বল্পস্থায়ী দাম্পত্য (২০০৫–২০০৭)

পূর্ণিমার ব্যক্তিগত জীবনের প্রথম বড় চমক বা ধামাকা আসে ২০০৫ সালে। ক্যারিয়ারের একদম সুবর্ণ সময়ে, যখন তিনি একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিচ্ছেন, তখন তিনি গোপনেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ব্যবসায়ী মোশতাক কিবরিয়া-র সাথে।

বিচ্ছেদের কারণ ও বিশ্লেষণ

মোশতাক কিবরিয়া ছিলেন বিনোদন জগতের বাইরের একজন ব্যবসায়ী। তাঁদের বিয়ের খবর শুরুতে বেশ কিছুদিন গোপন রাখা হলেও পরবর্তীতে তা প্রকাশ্যে আসে। কিন্তু এই শুভ পরিণয় বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি।

মানসিক অমিল: বিনোদন জগতের তারকাসুলভ ব্যস্ততা এবং সাধারণ ব্যবসায়িক জীবনের মানসিকতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে।

পেশাগত জীবনের টানাপোড়েন: পূর্ণিমার ব্যস্ত শুটিং শিডিউল এবং রঙিন জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সমস্যার সৃষ্টি হয়।

স্বল্পস্থায়ী মেয়াদ: মাত্র দুই বছর দাম্পত্য জীবন কাটানোর পর ২০০৭ সালে পূর্ণিমা ও মোশতাক কিবরিয়া পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদের (Divorce) পথ বেছে নেন। এই দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না।

দ্বিতীয় বিয়ে: আহমেদ ফাহাদ জামালের সাথে দীর্ঘ দাম্পত্য ও মাতৃত্ব (২০০৭–২০২১)

প্রথম বিয়ের তেতো অভিজ্ঞতা ভুলে না উঠতেই পূর্ণিমার জীবনে আসেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আহমেদ ফাহাদ জামাল। প্রথম বিচ্ছেদের বছরই অর্থাৎ ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর পূর্ণিমা ও ফাহাদ জামাল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

দীর্ঘ ১৪ বছরের সংসার ও মিডিয়া থেকে বিরতি

আহমেদ ফাহাদ জামাল ছিলেন পূর্ণিমার চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোট। চট্টগ্রামেই মূলত এই দম্পতির বেশিরভাগ সময় কাটত। ফাহাদকে বিয়ের পর পূর্ণিমা তাঁর অভিনয় জীবনের গতি অনেকটাই কমিয়ে দেন এবং সংসারমুখী হয়ে পড়েন।

মাতৃত্ব ও কন্যাসন্তান আরশিয়া: ২০১৪ সালে এই দম্পতির কোল আলো করে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান আরশিয়া উমাইজা। সন্তান জন্মের পর পূর্ণিমা একজন নিবেদিতপ্রাণ মা হিসেবে দীর্ঘ সময় চলচ্চিত্র থেকে দূরে ছিলেন।

টেলিভিশনে প্রত্যাবর্তন: কন্যা কিছুটা বড় হওয়ার পর পূর্ণিমা আবার চলচ্চিত্রে না ফিরে টেলিভিশনে উপস্থাপনা ও নাটকে ফিরে আসেন। রিয়্যালিটি শো 'সেরাকণ্ঠ' বা বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড শো-তে তাঁর চমৎকার উপস্থাপনা ও রসবোধ দর্শকদের মুগ্ধ করে।

দীর্ঘ ১৪ বছর পর কেন ঘটল ভাঙন?

২০২১ সালে যখন খবর আসে যে পূর্ণিমা ও ফাহাদ জামালের বিচ্ছেদ ঘটে গেছে, তখন মিডিয়া পাড়ায় বিশাল ধাক্কা লাগে। কারণ ১৪ বছরের এই দীর্ঘ দাম্পত্যকে সবাই অত্যন্ত স্থিতিশীল ও সফল মনে করত। বিচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট কারণগুলো তাঁরা ব্যক্তিগত রাখলেও জানা যায়:

দীর্ঘ বৈবাহিক জীবনেও তাঁদের ব্যক্তিগত কিছু মানসিক অমিল ও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল।
দাম্পত্য জীবনের শেষ কয়েক বছর ধরে তাঁরা আলাদা থাকছিলেন।
সন্তান আরশিয়ার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবেই ২০২১ সালে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছান। বিচ্ছেদের পরও কন্যা আরশিয়ার অভিভাবকত্ব ও দেখাশোনার বিষয়টি দুজনে যৌথভাবেই পরিচালনা করছেন।

তৃতীয় বিয়ে: আশফাকুর রহমান রবিনের সাথে নতুন জীবনের সূচনা (২০২২–বর্তমান)

দ্বিতীয় বিচ্ছেদের পর পূর্ণিমা আবার নিজের কাজ এবং কন্যা আরশিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু জীবনের মোড়ে আবার নতুন আলোর সঞ্চার ঘটে যখন তাঁর পরিচয় হয় আশফাকুর রহমান রবিন-এর সাথে।

আশফাকুর রহমান রবিনের পরিচয়

আশফাকুর রহমান রবিন বিনোদন জগতের মানুষ নন। তিনি সিডনির ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (সিনিয়র এক্সিকিউটিভ) হিসেবে কর্মরত।

কীভাবে শুরু হলো এই নতুন প্রেম?

রবিনের সাথে পূর্ণিমার প্রথম পরিচয় ঘটেছিল ২০১৮ সালে, একটি বহুজাতিক ব্র্যান্ডের কাজের সূত্রে।

চার বছরের বন্ধুত্ব: শুরুতেই তাঁদের মধ্যে প্রেম হয়নি। প্রথমে পেশাগত কাজ, তারপর সেখান থেকে গড়ে ওঠে এক সুদৃঢ় বন্ধুত্ব।

মানসিক স্বস্তি ও বোঝাপড়া: পূর্ণিমার জীবনের কঠিন সময়ে রবিন ছিলেন একজন সৎ ও সহানুভূতিশীল বন্ধু। রবিনের ব্যক্তিত্ব ও পরিণত চিন্তাভাবনা পূর্ণিমাকে মুগ্ধ করে।

পরিবারের সম্মতি: দীর্ঘ চার বছরের বন্ধুত্ব ও প্রেমের পর তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার। এতে পূর্ণিমার কন্যা আরশিয়া এবং দুই পরিবারের পূর্ণ সম্মতি ছিল।

২০২২ সালের শুভ পরিণয় ও নতুন সূচনা

২০২২ সালের ২৭ মে দুই পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের উপস্থিতিতে পূর্ণিমা ও রবিন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে বিয়ের খবরটি তাঁরা গণমাধ্যমে প্রকাশ করেন প্রায় দুই মাস পর, ২০২২ সালের জুলাই মাসে।

নতুন সংসার নিয়ে পূর্ণিমা গণমাধ্যমে বলেন:

"রবিনের সাথে আমার কাজের সূত্র ধরেই পরিচয়। চার বছর আমরা কেবল বন্ধু ছিলাম। রবিন মানুষ হিসেবে অত্যন্ত চমৎকার, কেয়ারিং এবং আমার মেয়ে আরশিয়াকে খুব ভালোবাসে। পরিবারের সম্মতিতে আমরা নতুন জীবন শুরু করেছি।"

গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও পূর্ণিমার সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে একজন নারী তারকার একাধিক বিয়ে বা বিচ্ছেদকে ঘিরে প্রায়শই চটকদার খবর ও সামাজিক সমালোচনা তৈরি হয়। তবে পূর্ণিমা এই সমস্ত প্রতিকূলতাকে অত্যন্ত পরিণত ও সাহসের সাথে মোকাবেলা করেছেন।

মানসিক সুস্থতা ও সাহসিকতা

অনেক নারী বা তারকা সমাজে সমালোচনার ভয়ে বিষাক্ত বা অমিল হওয়া দাম্পত্য জোর করে টেনে নিয়ে যান। কিন্তু পূর্ণিমা প্রমাণ করেছেন যে, লোকলজ্জার চেয়ে জীবনের শান্তি ও সন্তানের ভবিষ্যৎ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা না থাকলে বা মনের মিল না হলে জোর করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেয়ে সম্মানের সাথে আলাদা হওয়া এবং নতুন করে বাঁচার অধিকার সবার রয়েছে।

কন্যাসন্তান আরশিয়ার ভূমিকা

পূর্ণিমার প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিল তাঁর কন্যা আরশিয়া। রবিনকে বিয়ের আগে পূর্ণিমা সুনিশ্চিত করেছিলেন যে রবিনের সাথে আরশিয়ার সম্পর্কটা যেন বন্ধুর মতো হয়। বর্তমানে আরশিয়া তাঁর মা পূর্ণিমা ও সৎ বাবা রবিনের সাথে সুখে দিন কাটাচ্ছে।

বর্তমান জীবন ও উপস্থাপনায় পূর্ণিমার দ্বিতীয় ইনিংস

বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজও যেন দিন দিন তরুণী হয়ে উঠছেন পূর্ণিমা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর ছবি ও ভিডিও পোস্ট হওয়া মাত্রই নেটিজেনরা মন্তব্য করেন: "পূর্ণিমার বয়স কি কেবল কমছেই?"

বর্তমানে পূর্ণিমা চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রে নিয়মিত না হলেও বিভিন্ন টিভি শো, রিয়্যালিটি শো, মেগা ইভেন্ট এবং কর্পোরেট শো-তে উপস্থাপিকা হিসেবে বাংলাদেশের এক নম্বর স্থানে রয়েছেন। তাঁর তীক্ষ্ণ রসিকতা, সাবলীল কথা বলার ধরন এবং উপস্থিতি যেকোনো অনুষ্ঠানকে জীবন্ত করে তোলে। স্বামী রবিন ও কন্যা আরশিয়াকে নিয়ে তিনি এখন এক চমৎকার ও শান্তিময় পারিবারিক জীবন উপভোগ করছেন।

এক নজরে চিত্রনায়িকা পূর্ণিমার বৈবাহিক জীবন ও সম্পর্কের বিবরণ

স্বামীর নাম ও পরিচয়

বিয়ের তারিখ/সাল

বিচ্ছেদের সময়

দাম্পত্যের মেয়াদ

সন্তান

বর্তমান অবস্থা

মোশতাক কিবরিয়া

(ব্যবসায়ী)

২০০৫ সাল

২০০৭ সাল

প্রায় ২ বছর

নেই

আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।

আহমেদ ফাহাদ জামাল

(চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী)

২৭ ডিসেম্বর, ২০০৭

২০২১ সাল

দীর্ঘ ১৪ বছর

১ কন্যাসন্তান

(আরশিয়া উমাইজা)

বিচ্ছেদের পর যৌথভাবে সন্তানের অভিভাবকত্ব।

আশফাকুর রহমান রবিন

(বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ)

২৭ মে, ২০২২

২০২২ হতে বর্তমান

(চলমান)

নেই

সুখে-শান্তিতে বৈবাহিক জীবন যাপন করছেন।

চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা কেবল একজন সফল বাণিজ্যিক অভিনেত্রী নন; তিনি ঢালিউডের সেই গুটিকয়েক অভিনয়শিল্পীদের একজন যারা বাণিজ্যিক বিনোদন মূলক সিনেমার পাশাপাশি সাহিত্যনির্ভর ও ধারাবহিক ধারার চলচ্চিত্রেও সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন। ১৯৯৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিনোদন জগতে পা রাখা থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম প্রতিটি মাধ্যমেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র স্বাক্ষর রেখেছেন।

সাহিত্যনির্ভর ও কালজয়ী চলচ্চিত্র: অভিনয়ের ভিন্ন রূপ

কেবল নাচ-গান বা গ্ল্যামারাস চরিত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে পূর্ণিমা বেশ কিছু সাহিত্যভিত্তিক ও সংবেদনশীল চরিত্রে অভিনয় করে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

'শাস্তি' (২০০৪): বিশ্বকবির বিখ্যাত ছোটগল্প 'শাস্তি' অবলম্বনে নির্মিত চাষী নজরুল ইসলামের এই চলচ্চিত্রে 'চন্দরা' চরিত্রে পূর্ণিমার অভিনয় ছিল অবিশ্বাস্য। অভিমানী, আত্মমর্যাদাশীল ও ট্র্যাজিক এক গ্রামীণ নারীর রূপ ফুটিয়ে তুলে তিনি প্রমাণ করেন যে তিনি কেবল গ্ল্যামার কুইন নন, একজন শক্তিশালী অভিনেত্রী।

'সুভা' (২০০৬): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সুভাসিনী' বা 'সুভা' গল্প অবলম্বনে তৈরি এই চলচ্চিত্রে পূর্ণিমা একজন বাকপ্রতিবন্ধী গ্রামীণ তরুণীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। কোনো সংলাপ ছাড়া কেবল চোখের ভাষা, মুখের অভিব্যক্তি ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সুভার যন্ত্রণা ও আবেগ যেভাবে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

'মেঘের পরে মেঘ' (২০০৪): প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমানের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে পূর্ণিমার অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়। যুদ্ধপরবর্তী নারীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্দায় তুলে ধরেন।

'ওরা আমাকে ভালো হতে দিল না' (২০১০): কাজী হায়াৎ পরিচালিত এই সামাজিক ডার্ক-ড্রামা চলচ্চিত্রে চরম শোষণের শিকার এক নারীর মানসিক রূপান্তর ও প্রতিশোধের গল্প ফুটে ওঠে। এই চলচ্চিত্রে অনবদ্য পারফর্ম্যান্সের জন্যই পূর্ণিমা তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

ঢালিউডের অপরাপর অনস্ক্রিন জুটি ও রসায়ন

যদিও রিয়াজের সাথে পূর্ণিমার জুটিকে ঢালিউডের অন্যতম সেরা রোমান্টিক জুটি ধরা হয়, তবে ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে তিনি অন্যান্য শীর্ষ নায়কদের সাথেও একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন।

মান্না ও পূর্ণিমা: মান্নার অ্যাকশন ইমেজের পাশে পূর্ণিমার গ্ল্যামার ও আবেগঘন অভিনয় এক দারুণ বৈচিত্র্য এনে দিয়েছিল। 'স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ' এবং 'আব্বাজান'-এর মতো ছবিগুলো বক্স অফিসে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।

ফেরদৌস ও পূর্ণিমা: পর্দার বাইরে ফেরদৌস ও পূর্ণিমা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই বাস্তব বন্ধুত্বের রসায়ন পর্দাতেও স্পষ্ট ছিল। 'এক কাপ চা', 'মেঘের পরে মেঘ'সহ একাধিক ছবিতে এই জুটি দর্শক প্রশংসা পায়।

শাকিব খান ও পূর্ণিমা: শাকিব খানের সাথে পূর্ণিমা উপহার দিয়েছেন বেশ কিছু ব্যবসাসফল সিনেমা। 'জজ ব্যারিস্টার ৫৪ নম্বর প্যাসেঞ্জার', 'বাধা' এবং 'সুভা'-র মতো বৈচিত্র্যময় ছবিতে তাঁদের রসায়ন ছিল চোখে পড়ার মতো।

উপস্থাপনা ও ছোট পর্দায় 'দ্বিতীয় ইনিংস'

চলচ্চিত্রের প্রধান নায়িকা হিসেবে নিয়মিত কাজ কমানোর পর পূর্ণিমা ছোট পর্দা ও টিভি উপস্থাপনায় আত্মপ্রকাশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের বিনোদন জগতের এক নম্বর নারী উপস্থাপক (Female Anchor) হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

'এবং পূর্ণিমা' টক শো: আরটিভিতে সম্প্রচারিত এই সেলিব্রিটি টক শো-তে পূর্ণিমার হাস্যরসাত্মক, তীক্ষ্ণ অথচ খোলামেলা প্রশ্ন করার ধরণ দর্শকদের ভীষণ পছন্দ হয়। তারকাদের জীবনের গোপন বা মজার তথ্য তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে বের করে আনতেন।

মেগা ইভেন্ট সঞ্চালনা: 'মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার', 'জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠান' কিংবা বিভিন্ন কর্পোরেট শো-তে পূর্ণিমা ও ফেরদৌস জুটির সঞ্চালনা এক আলাদা মাত্রা যোগ করে। তাঁদের উপস্থিতির বুদ্ধিমত্তা ও রসবোধ যেকোনো বড় আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

টিভি নাটক: নাটকে খুব বেশি কাজ না করলেও হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত 'কাগজের ফুল' বা 'ল্যাবরেটরি'-র মতো মানসম্মত নাটকে তিনি নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।

ওটিটি (OTT) মাধ্যমে পদার্পণ ও নতুন যুগের সূচনা

প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে পূর্ণিমা নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন আধুনিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজের সাথেও।

'হোটেল রিলাক্স' (২০২৩): কাজল আরেফীন অমি পরিচালিত এই তুমুল জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজে এক বিশেষ পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেন পূর্ণিমা। কমিক স্টাইলের সেই চরিত্রে তাঁর অ্যাকশন ও সংলাপ বলা নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে দারুণভাবে সমাদৃত হয়।

আহবায়ক ও অন্যান্য প্রজেক্ট: ওটিটিতে তিনি প্রথাগত 'নায়িকা' ইমেজের বাইরে গিয়ে চরিত্রভিত্তিক (Character-driven) এবং ধূসর (Grey shade) চরিত্রে অভিনয় করতে আগ্রহী হয়েছেন।

পপ কালচারে 'এজলেস পূর্ণিমা' এবং সামাজিক মিডিয়া ফিগার

বাংলাদেশের পপ কালচারে পূর্ণিমাকে ঘিরে একটি বিশেষ ফেনোমেনন বা ধারণা চালু আছে তা হলো 'এজলেস বিউটি' (Ageless Beauty) বা 'বয়স না বাড়ার রহস্য'।

সৌন্দর্য ও ফিটনেস ধরে রাখা: গত আড়াই দশকে ঢালিউডের বহু তারকা সময়ের সাথে সাথে রূপালী পর্দা থেকে হারিয়ে গেলেও পূর্ণিমা নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সমানভাবে ফিট রেখেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন: ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে পূর্ণিমার যেকোনো নতুন ছবি বা ভিডিও পোস্ট হওয়া মাত্রই তা ভাইরাল হয়ে যায়। নেটিজেনদের কাছে তিনি 'চিরতরুণী'র এক বাস্তব প্রতীক।

ট্রল ও বিতর্কের রাজকীয় মোকাবিলা: সামাজিক মাধ্যমে কোনো ট্রল বা সমালোচনার মুখোমুখি হলে পূর্ণিমা কখনোই উত্তেজিত হন না; বরং নিজের স্বভাবজাত রসবোধ ও বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্যের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতিকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসেন।

ব্যক্তিগত দর্শন ও জীবনবোধ

বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পূর্ণিমা তাঁর জীবনের কিছু মৌলিক দর্শন প্রকাশ করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় গ্ল্যামার জগতের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ হিসেবে তিনি কতটা মাটির কাছাকাছি:

পেশা ও ব্যক্তিগত জীবনের দূরত্ব: পূর্ণিমা সবসময় রূপালী পর্দার 'স্টারডম'-কে নিজের ঘরের দরজার বাইরে রেখে এসেছেন। ঘরে তিনি কেবলই একজন মা, স্ত্রী এবং সাধারণ গৃহিনী।

মানসিক শান্তি ও আত্মতৃপ্তি: ইঁদুর দৌড়ে (Rat race) সামিল হয়ে একের পর এক নিম্নমানের কাজ করার চেয়ে কম কাজ করে মান ধরে রাখা এবং মানসিক শান্তিতে থাকাকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন।

নতুনকে মেনে নেওয়া: নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের ঈর্ষা না করে বরং তাদের কাজকে উৎসাহিত করা এবং তাদের সাথে মিশে যাওয়ার মানসিকতাই পূর্ণিমাকে সব প্রজন্মের কাছে সমান জনপ্রিয় করে রেখেছে।

সব মিলিয়ে, দিলরারা হান্নান পূর্ণিমা কেবল ঢালিউডের সোনালী অতীতের এক সুন্দর স্মৃতি নন; তিনি বর্তমান সময়েরও এক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, প্রাণবন্ত এবং স্বাবলম্বী নারী ব্যক্তিত্ব।

জীবনের ঝড়ে বিজয়ী এক চিরসবুজ নায়িকা

চিত্রনায়িকা পূর্ণিমার জীবনের গল্পটি কেবল একজন তারকার রোমান্স বা বিয়ের হিসাব-নিকাশ নয়; এটি হলো একজন নারীর জীবনসংগ্রাম, ভুল থেকে শেখা এবং বারবার নতুন করে জেগে ওঠার এক চমৎকার ইতিহাস।

প্রথম বিয়ের ব্যর্থতা কিংবা দীর্ঘ ১৪ বছরের দ্বিতীয় সংসারের হঠাৎ ভাঙন কোনো কিছুই পূর্ণিমাকে ভেঙে ফেলতে পারেনি। তিনি আবার দাঁড়িয়েছেন, নতুন করে ভালোবেসেছেন এবং নিজের শর্তে বাঁচতে শিখেছেন।

রূপালী পর্দার সেই নিষ্পাপ হাসির 'মনের মাঝে তুমি'-র পূর্ণিমা আজ জীবনের বহু চড়াই-উৎরাই পার করে আসা এক পরিপক্ক ও স্বাবলম্বী নারী। আশফাকুর রহমান রবিনের সাথে তাঁর বর্তমান সংসার সুখে ও শান্তিতে ভরপুর থাকুক এটাই তাঁর কোটি ভক্তের একমাত্র প্রত্যাশা।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.