হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) - কুমিল্লায় সুফি সাধকের অলৌকিক ও আধ্যাত্মিক জীবন

প্রাচীন সমতটের প্রাণকেন্দ্র এবং মেঘনা-গোমতী অববাহিকার উর্বর পলি দ্বারা ধন্য ঐতিহাসিক জনপদ কুমিল্লা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই গোমতী বিধৌত মাটি কেবল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং ইসলাম প্রচার, সুফি সাধনা ও তাসাউফের উর্বর ভূমি হিসেবে উপমহাদেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। হযরত শাহজালাল (রহ.), হযরত শাহ পরান (রহ.) কিংবা হযরত শাহ মখদুম (রহ.)-এর মতো ওলী-আউলিয়াদের মতো অসংখ্য সুফি-সাধক বিভিন্ন সময় সুদূর মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারত থেকে হিজরত করে বাংলায় আগমন করেছিলেন ইসলামের সত্য বাণী ও সুফিবাদের সুবাতাস ছড়িয়ে দিতে।
কুমিল্লার সুফি ঐতিহ্যের আকাশে এমনই এক উজ্জ্বল, প্রদীপ্ত ও অলৌকিক নক্ষত্রের নাম হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বা শেষভাগে ভারতের ঐতিহাসিক কানপুর ও গাজীপুর অঞ্চল থেকে আসা এই মহান সাধক কেবল ধর্ম প্রচারকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন অনন্য স্তরের 'মাজজুব' ও 'কামেল' ওলী, যাঁর স্পর্শে ও প্রার্থনায় হাজার হাজার বিভ্রান্ত মানুষ সত্যের পথ খুঁজে পেয়েছিল। সুদূর মিয়ানমার (তৎকালীন বার্মা বা আরাকান) যাওয়ার পথে সাময়িকভাবে কুমিল্লায় এসে বিশ্রাম নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই পলল ভূমির মানুষের ভক্তি, ভালোবাসা এবং ঐশ্বরিক ইঙ্গিতে তিনি এই কুমিল্লাকেই নিজের আধ্যাত্মিক আন্দোলনের স্থায়ী কেন্দ্রে পরিণত করেন।
কুমিল্লার উত্তর চর্থার ঐতিহাসিক ‘দারোগা বাড়ি’, ঐতিহাসিক তিন গম্বুজ বিশিষ্ট জামে মসজিদ, এবং চর্থার কোল ঘেঁষে উনাইসারের অলৌকিক মসজিদ নির্মাণ ও ঐতিহাসিক সাত দিনের চিল্লাহ সব মিলিয়ে হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর জীবন ইতিহাস যেন এক জীবন্ত আধ্যাত্মিক উপাখ্যান।
আজকের বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা এই মহান ওলীর প্রারম্ভিক পরিচয়, হিজরতের নেপথ্য কারণ, কর্মজীবন, অলৌকিক চিল্লাহর ঘটনা, উনাইসার ও চর্থার মসজিদের ইতিহাস, এবং তাঁর ওফাত ও বার্ষিক ওরশের আনুপূর্বিক ইতিহাস বিস্তারিত পর্যালোচনা করব।
বংশ পরিচয়, উৎস ও 'গাজীপুরী' নামকরণের নেপথ্য
হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর প্রারম্ভিক জীবন ও বংশীয় পরিচয় সম্পর্কে অধিকাংশ তথ্যই লিখিত দলিলের চেয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকা লোকায়ত ইতিহাস, মাজারের খাদেমদের প্রাপ্ত নথিপত্র এবং বয়োজ্যেষ্ঠ সুফি-সাধকদের স্মৃতিকথা থেকে প্রাপ্ত।
জন্ম ও ভৌগোলিক সূচনা: হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) আনুমানিক উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ বা মধ্যভাগে উত্তর ভারতের ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, তাঁর মূল শিকড় ছিল তৎকালীন ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুর এবং গাজীপুর এলাকায়। এই দুটি অঞ্চলই ছিল ভারতে সুফি সাধনা, ইসলামী শিক্ষা এবং সুফি তরিকাসমূহের (বিশেষ করে কাদেরিয়া, চিস্তিয়া ও নকশবন্দিয়া তরিকা) প্রধান কেন্দ্র।
'গাজীপুরী' নিসবত বা নামকরণের তাৎপর্য: ইসলামি সুফি ঐতিহ্যে কোনো আলেম বা সুফি সাধক যখন নিজ জন্মস্থান বা সাধনার মূল কেন্দ্র ছেড়ে অন্য দেশে হিজরত করেন, তখন তাঁর নামের শেষে জন্মস্থানের নাম যুক্ত করে 'নিসবত' বা উপাধি দেওয়া হয় (যেমন: হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া দেলভী, হযরত সুফিয়ান ছাওরী ইত্যাদি)।
একই ধারায়, হযরত শাহ আব্দুল্লাহর নামের সাথে ‘গাজীপুরী’ যুক্ত হয়েছিল তাঁর সুদূর ভারতের গাজীপুর অঞ্চলের অধিবাসী হওয়ার স্মারক হিসেবে। কানপুর ও গাজীপুরের দ্বীনি মাদরাসা ও খানকায় প্রারম্ভিক শরীয়ত ও মারেফাতের জ্ঞান অর্জন করার পর তিনি আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক ভ্রমণের (সায়র ফিল আল্লাহ) দিকে মনোযোগ দেন।
কুমিল্লায় আগমন: বার্মা (মিয়ানমার) যাত্রাপথের দৈব বিরতি
সুফি সাধকগণের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তারা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় বন্দি থাকেন না। দ্বীনের দাওয়াত, আত্মশুদ্ধির প্রচার এবং হেদায়েতের বার্তা পৌঁছে দিতে তারা জীবনের বড় অংশজুড়ে সফর বা হিজরত করেন। হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত গতিশীল ও প্রব্রজ্যামুখী। তিনি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে সফর করতেন।
হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর কুমিল্লায় আগমনের পেছনেও কাজ করেছিল এক চমৎকার ও দৈব ঘটনাপ্রবাহ।
আরাকান (মিয়ানমার) সফরের পরিকল্পনা
উনবিংশ শতাব্দীতে উত্তর ভারত থেকে অনেক সুফি সাধক আসাম, ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম হয়ে তৎকালীন বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার-এর আকিয়াব ও আরাকান অঞ্চল)-র দিকে হিজরত করতেন। সেখানে বিপুল সংখ্যক ব্যবসায়ী ও মুসলিম জনগোষ্ঠী বাস করত। হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর মূল লক্ষ্যও ছিল মিয়ানমারে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত প্রসারিত করা।
কানপুরের শিক্ষা ও মেহনত শেষে তিনি মিয়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) রাজধানী রেঙ্গুনে গমন করেন। সেখানকার প্রধান একটি জামে মসজিদে তিনি দীর্ঘ দিন সফলতার সাথে ইমামতি ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সুমিষ্ট কুরআন তিলাওয়াত এবং ইলমি খুতবায় রেঙ্গুনের শত শত মানুষ হেদায়েতের পথ খুঁজে পায়।
১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে তিনি রেঙ্গুনে পুনরায় গমনের উদ্দেশ্যে বা অন্য কোনো দ্বীনি সফরে ভারতে থেকে যাত্রা শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে দীর্ঘ দূরত্বের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নদীপথের নৌকা এবং স্থলপথের গরুর গাড়ি। তিনি দাউদকান্দি হয়ে তৎকালীন ত্রিপুরা (কুমিল্লা) শহরের বুক চিরে যাওয়া গোমতী নদীর তটরেখা ধরে অগ্রসর হচ্ছিলেন।
কুমিল্লায় সাময়িক বিশ্রাম ও ঐশ্বরিক ইশারা
উত্তর ভারত থেকে পদব্রজে ও নৌকাযোগে দীর্ঘ সফর করে তিনি প্রাচীন সমতটের প্রাণকেন্দ্র কুমিল্লা এসে পৌঁছান। দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে তিনি কুমিল্লার নিঝুম ও শান্ত পরিবেশ দেখে কিছুদিনের জন্য বিশ্রামের সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু সুফিদের বিশ্বাস অনুযায়ী ওলীদের কদম যেখানে পড়ে, তা আল্লাহর নির্ধারিত হুকুমেই ঘটে। সফরের ক্লান্তি দূর করার জন্য এবং সাময়িক বিশ্রামের উদ্দেশ্যে তিনি কুমিল্লা শহরের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক জনপদ উত্তর চর্থার দারোগাবাড়ি এলাকায় এসে থামেন।
কুমিল্লায় কয়েকদিন অবস্থান করার পর তিনি অনুধাবন করেন যে, তাঁর আধ্যাত্মিক দাওয়াতের আসল উর্বর জমিন বার্মা নয়; বরং এই কুমিল্লা। এখানকার সরলমনা মানুষ, গোমতীর শান্ত পরিবেশ এবং অভ্যন্তরীণ ‘ইলহাম’ বা ঐশ্বরিক ইঙ্গিতে তিনি তাঁর মিয়ানমার সফর স্থগিত করেন এবং চিরদিনের জন্য কুমিল্লাকে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।
মৌলভী আশরাফ উদ্দিন আহমদ (রহ.) এর দরখাস্ত ও স্থায়ীকরণ
দারোগাবাড়ি তৎকালীন সময়ে ছিল আলেম-ওলামা ও বিদ্যোৎসাহীদের অন্যতম কেন্দ্র। এই পরিবারের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন ফরাসি (ফার্সি) ভাষায় প্রখ্যাত সুপণ্ডিত, প্রজ্ঞাবান আলেম মৌলভী আশরাফ উদ্দিন আহমদ।
হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর সুমহান ব্যক্তিত্ব, সুমিষ্ট কুরআন তিলাওয়াত এবং গভীর ইলমি পরিপক্বতা দেখে মৌলভী আশরাফ উদ্দিন আহমদ মুগ্ধ হন। তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে অনুরোধ জানান যে, হযরত যেন সুদূর রেঙ্গুন বা কানপুরে না ফিরে এই কুমিল্লার মাটিতেই চিরতরে থেকে যান এবং এখানকার মানুষকে হেদায়েত ও আধ্যাত্মিক সুধা পান করান।
শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) আল্লাহর ইশারায় এই অনুনয় গ্রহণ করেন। এভাবে মিয়ানমারগামী পথিকের সাময়িক বিশ্রামাগার কুমিল্লার উত্তর চর্থার দারোগাবাড়িই পরিণত হয় তাঁর স্থায়ী নিবাসে।
উত্তর চর্থার 'দারোগা বাড়ি' ও সামাজিক-কর্মজীবন
কুমিল্লায় স্থায়ী হওয়ার পর হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) কোথায় অবস্থান নেবেন, তা নিয়ে এক চমৎকার সামাজিক সংযোগ তৈরি হয়। তখনকার সময়ে কুমিল্লার উত্তর চর্থার ‘দারোগা বাড়ি’ ছিল শহরের অন্যতম সম্ভ্রান্ত, বনেদি ও সুপরিচিত স্থান।
দারোগা বাড়ির সান্নিধ্য ও স্থায়ী আসন
উত্তর চর্থার দারোগা বাড়ির কর্তাগণ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর সাধারণ জীবনযাপন, প্রখর মেধা, বুজুর্গি এবং চেহারার নূর দেখে গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। তারা এই মহান সাধককে সাদরে গ্রহণ করেন এবং তাঁদের পারিবারিক চত্বরে স্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দেন।
কুমিল্লায় স্থায়ী হওয়ার পর শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর এবাদত, তাজকিয়ায়ে নফস (আত্মশুদ্ধি) এবং ওয়াজ-নসীহতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর জীবন ছিল সুন্নতে নববীর এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন।
দারোগা বাড়ির প্রাঙ্গণ থেকেই শুরু হয় শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর কর্মজীবন। অতি অল্প দিনের মধ্যেই এই বাড়িটি কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারিক বাসভবন নয়, বরং সমগ্র কুমিল্লা ও আশেপাশের অঞ্চলের মানুষের জন্য এক আধ্যাত্মিক আলোকবর্তিকায় পরিণত হয়।
সমাজসংস্কার ও ইসলাম প্রচারের রূপরেখা
হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) কোনো প্রথাগত বৈষয়িক চাকরি বা ব্যবসায়ে যুক্ত ছিলেন না। তাঁর কর্মজীবন ছিল সম্পূর্ণভাবে মানবকল্যাণ, আত্মশুদ্ধি, যিকর-আজকার এবং শরীয়ত ও মারেফাতের শিক্ষাদানে নিবেদিত:
জাহেলিয়াত ও বদরসম দূরীকরণ: তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে বিরাজমান কুসংস্কার ও অনাচার দূর করে সুন্নাহর আলো ছড়িয়ে দেওয়া।
তাকওয়া ও আখলাক শিক্ষা: সাধারণ মানুষকে হিংসা, বিদ্বেষ, মিথ্যা ও অহংকার ত্যাগ করে পরহেজগার জীবন গঠনে অনুপ্রাণিত করা।
দুস্থ ও পীড়িতদের সেবা: প্রতিদিন বহু দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর কাছে দোয়ার জন্য আসত। অসুস্থদের পানি পড়া, দোয়া এবং আত্মিক সান্ত্বনা দেওয়ার মাধ্যমে তিনি মানুষের অন্তরে স্থান করে নেন।
কুমিল্লা দারোগাবাড়ির নামকরণ কিভাবে হয়?
ব্রিটিশ বা ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে এই পরিবারের কোনো প্রভাবশালী বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তি পুলিশ বিভাগে 'দারোগা' বা সমমানের সরকারি উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন। তৎকালীন সমাজে সরকারি কর্মকর্তা বা দারোগাদের ব্যাপক প্রভাব ও সম্মান থাকত, যার কারণে সাধারণ মানুষ তাঁদের পুরো বাড়িকে 'দারোগা বাড়ি' হিসেবে ডাকতে শুরু করে।
আনুমানিক ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে (১২১১ হিজরি) স্থানীয় অভিজাত ব্যক্তিত্ব রিয়াজউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এই এলাকায় একটি সুদৃশ্য তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখন দারোগা বাড়ি মসজিদ নামে পরিচিত। রিয়াজউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এবং তাঁর পরবর্তী বংশধরদের আভিজাত্য ও সরকারি বিভিন্ন পদের কারণেও বাড়িটি লোকমুখে এই নাম লাভ করে।
এই বাড়ির আরেকজন অন্যতম কৃতি পুরুষ ছিলেন ফরাসি ভাষার সুপণ্ডিত, আলেম এবং তৎকালীন মুসলিম সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি মৌলভী আশরাফ উদ্দিন আহমদ। তাঁর আমন্ত্রণে বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) কানপুর থেকে এসে এই বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
উনাইসারের অলৌকিক মসজিদ, চিল্লাহ ও বজ্রধ্বনির ঐতিহাসিক উপাখ্যান
হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর জীবনের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী, বিস্ময়কর এবং ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল কুমিল্লার উনাইসার এলাকায়। এটি ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য নিদর্শন।
উনাইসারে স্বহস্তে মসজিদ নির্মাণ: কুমিল্লার চর্থার কাছেই অবস্থিত উনাইসার এলাকাটিতে তখন নামমাত্র লোকবসতি ছিল। স্থানীয় মানুষের এবাদত-বন্দেগির সুবিধার্থে হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) সম্পূর্ণ নিজ হাতে একটি ছোট্ট মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও নির্মাণ করেন। মাটি, বাঁশ ও কাঁচা দ্রব্যাদি দিয়ে নিজের পরিশ্রমে তৈরি এই মসজিদটি ছিল তাঁর ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ।
সাত দিনের চিল্লাহ (নির্জন ধ্যান সাধনা): মসজিদ নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি সাধারণ মানুষকে সেখানে অবিলম্বে নামাজ পড়তে বারণ করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে এই ঘরকে আল্লাহর এবাদতের জন্য উৎসর্গ ও পবিত্র করার নিমিত্তে তিনি সেখানে সাত দিনের বিশেষ ‘চিল্লাহ’ (নির্জন ধ্যান-সাধনা ও অনশনতুল্য এবাদত) করবেন।
এই সাত দিন ও সাত রাত ধরে তিনি অনাহার ও স্বল্পাহারে দরজাবন্ধ মসজিদে একটানা আল্লাহর ধ্যান, রিয়াজাত ও জিকিরে মগ্ন থাকেন। এই সময়ে তিনি আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে কেবল মাবুদের প্রেমে নিমজ্জিত ছিলেন। বাইরে অবস্থানরত অনুসারী ও গ্রামবাসীরা এই অলৌকিক সাধনা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে।
সপ্তম রাতের বজ্রধ্বনি ও গায়েবী জ্যোতির বিকাশ
চিল্লার শেষ অর্থাৎ সপ্তম দিনের রাতে এক অভাবনীয় ও অলৌকিক ঘটনা ঘটে। হঠাৎ করে পুরো উনাইসার এলাকা কেঁপে ওঠে এক প্রচণ্ড বজ্রধ্বনির মতো শব্দে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গভীর রাতে উনাইসার মসজিদের ওপর আকাশ থেকে এক বিকট বজ্রধ্বনির মতো (Thunderous sound) আওয়াজ সৃষ্টি হয় এবং পুরো এলাকা এক অনির্বচনীয় অপরূপ গায়েবী জ্যোতিতে (Divine Light) উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
আকাশ মেঘাচ্ছন্ন না থাকা সত্ত্বেও সেই ঐশ্বরিক শব্দে মাটি পর্যন্ত থরথর করে কেঁপে উঠেছিল। আর তার পরপরই স্থানীয় মানুষ দেখতে পান হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর স্বহস্তে নির্মিত সেই কাঁচা মসজিদের ছাদ থেকে আসমানের দিকে ধাবিত হচ্ছে এক অপরূপ নূরানী জ্যোতি বা আলোর দ্যুতি। পুরো উনাইসার গ্রাম সেই রাতে ঐশ্বরিক আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিল।
প্রথম নামাজের ইমামতি ও মর্যাদা লাভ
পরদিন ভোরে চিল্লাহ শেষ করে হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) মসজিদ থেকে বের হন। তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল তখন নূরের আলোয় জ্বলজ্বল করছিল। তিনি গ্রামবাসীকে ডেকে জানান যে, মহান আল্লাহ এই মসজিদকে কবুল করেছেন এবং আজ থেকে এখানে নিয়মিত সালাত আদায়ের আদেশ হয়েছে।
পরদিন সকাল থেকে গায়েবী নির্দেশে সেই মসজিদে নিয়মিতভাবে পাঞ্জেগানা সালাতের আদেশ হয়। হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) নিজে সেই মসজিদে প্রথম ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই ঘটনার পর তাঁর আধ্যাত্মিক মাকাম ও বুজুর্গির কথা চারদিকে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সেই থেকে উনাইসারের এই মসজিদটি অলৌকিক ও বরকতময় স্থান হিসেবে রূপ লাভ করে, যা আজ দেড়শ বছর পরও সুফি অনুরাগী মানুষের কাছে এক অতি পবিত্র স্মৃতি।

উত্তর চর্থার তিন গম্বুজ বিশিষ্ট ঐতিহাসিক মসজিদ
উনাইসারের পাশাপাশি হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর স্মৃতির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে কুমিল্লার উত্তর চর্থার দারোগা বাড়ি সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি। এটি কুমিল্লার মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো স্থাপত্য নিদর্শন
উত্তর চর্থার দারোগা বাড়ি চত্বরে অবস্থিত এই তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি প্রায় দেড়শ (১৫০) বছরের পুরনো। প্রাচীন মোগল এবং স্থানীয় বাংলা স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায় এই মসজিদে।
মসজিদের ছাদে সুদৃশ্য তিনটি প্রধান গম্বুজ রয়েছে, যা দূর থেকে যেকোনো পথিকের নজর কাড়ে। দেয়ালের পলেস্তারা, মেহরাব এবং মিনারের কারুকাজে প্রাচীনকালের নির্মাণকুশলতা স্পষ্ট।
মারেফাত ও শরীয়তের মেলবন্ধন কেন্দ্র
হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) কেবল চিল্লাহ বা আধ্যাত্মিক সাধনায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি উত্তর চর্থার এই মসজিদে নিয়মিত খুতবা দিতেন, নামাজে ইমামতি করতেন এবং স্থানীয় শিশু-কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের কুরআন-হাদীস ও তাসাউফের পাঠ দান করতেন। ফলে এই তিন গম্বুজ মসজিদটি তৎকালীন কুমিল্লার অন্যতম প্রধান দ্বীনি শিক্ষা ও সুফি চর্চা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
দুই মহান অলি-আল্লাহর জানাজায় গায়েবী নির্দেশ ও ইমামতি
হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর এবং আধ্যাত্মিক কারামত ছিল গায়েবী নির্দেশের মাধ্যমে তৎকালীন কুমিল্লার দুই বিখ্যাত অলি-আল্লাহর ওফাতের পর তাঁদের জানাজার নামাজে ইমামতি করা। এই দুটি ঘটনা তাঁর আধ্যাত্মিক বুজুর্গির ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করে।
প্রথম ঘটনা: ময়নামতির হযরত হিলাল শাহ (রহ.)-এর জানাজা
কুমিল্লার বিখ্যাত সেনানিবাশের কাছে ময়নামতি অঞ্চলে বাস করতেন জবরদস্ত সুফিসাধক হযরত হিলাল শাহ (রহ.)। ওফাতের পূর্বে হযরত হিলাল শাহ (রহ.) তাঁর মুরিদ ও স্থানীয়দের কাছে অছিয়ত করে যান:
"আমার ইন্তেকালের পর তোমরা জানাজার জন্য তাড়াহুড়া করবে না। ভারত (হিন্দুস্থান) থেকে একজন জবরদস্ত আলেম ও অলি-আল্লাহ আসবেন; তিনিই যেন আমার জানাজার ইমামতি করেন।"
হিলাল শাহ (রহ.)-এর ইন্তেকালের পরদিন ভোরে শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) গায়েবী ইঙ্গিত পান। তিনি তৎক্ষণাৎ কুমিল্লার দক্ষিণ চর্থার প্রখ্যাত জমিদার নবাব সৈয়দ হোচ্ছাম হায়দার চৌধুরীর কাছে খবর পাঠান যে তাঁর ঘোড়ার টমটম গাড়িটি যেন দ্রুত দারোগাবাড়িতে পাঠানো হয়।
কোচম্যান টমটম নিয়ে হাজির হলে শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) বলেন, "ময়নামতি চল।" ময়নামতি পৌঁছানোর পর তিনি দেখতে পান বিশাল মানুষের ভিড়। তিনি মৃত হিলাল শাহ (রহ.)-এর মুখাবরণ তুলে একনজর দেখে পরম আবেগে বলে উঠেন:
"তিনি একজন জবরদস্ত অলি-আল্লাহ ছিলেন!"
উপস্থিত সকলের অনুরোধে এবং মৃত অলির অছিয়ত মোতাবেক শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) মহাসমারোহে সেই জানাজার ইমামতি করেন।
দ্বিতীয় ঘটনা: চৌদ্দগ্রাম চাঁন্দশ্রীর হযরত শাহ ফয়জন মিঞা (রহ.)-এর জানাজা
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মিয়ারবাজার সংলগ্ন চাঁন্দশ্রী গ্রামের বিখ্যাত সাধক হযরত শাহ ফয়জন মিঞা (রহ.) ওফাতের পূর্বে অছিয়ত করে যান:
"আমার জানাজা এখনই পড়বে না। দক্ষিণ দিক থেকে পশ্চিম দেশের এক মেহমান আলেম আসবেন। তিনি আমার জানাজা পড়াবেন।"
শাহ ফয়জন মিঞা (রহ.) যখন ইন্তেকাল করেন, তখন শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) চৌদ্দগ্রামের শিতলিয়া গ্রামে এক দ্বীনি মাহফিলে অবস্থান করছিলেন। গ্রামের সমস্ত পুরুষ মানুষ ফয়জন মিঞা (রহ.)-এর জানাজায় অংশ নিতে চাঁন্দশ্রী চলে যান।
শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) হুজরা শরিফ থেকে বের হয়ে অত্যন্ত ব্যাকুল ও অস্থির হয়ে পড়েন। বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ না থাকায় তিনি এক বৃদ্ধ লোকের কাছে উর্দু ভাষায় জানতে চান "চাঁন্দশ্রী কোন দিকে?" বৃদ্ধ লোকটি ইশারায় রাস্তা দেখিয়ে দিলে তিনি দ্রুত পায়ে চাঁন্দশ্রী পৌঁছান।
সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন হাজার হাজার মানুষ কাতারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষমাণ। তিনি কাতার চিরে সামনে গিয়ে শাহ ফয়জন মিঞা (রহ.)-এর মুখের কাপড় সরিয়ে দেখতে পান মৃত অলির মুখাবয়ব এক অনাবিল জান্নাতী হাসিতে ভরে উঠেছে!
শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) পরম মমতায় নিজের হাত দিয়ে মৃত অলির হাসিমুখের ঠোঁট চেপে ধরে স্বাভাবিক করেন। এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ স্তব্ধ হয়ে যান। কোনো পূর্বানুমতি ছাড়াই তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে জানাজার তাকবীর দেন এবং জানাজা সম্পন্ন করেন।
ওফাত, দাফন স্থান নিয়ে দ্বিমত ও অন্তিম ইচ্ছার বাস্তবায়ন
জীবনের সায়াহ্নে উপনীত হয়ে হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) যখন অনুধাবন করলেন তাঁর এই ধরা dham ত্যাগের সময় সমাগত, তখন তাঁর অন্তিম ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে এক আবেগঘন ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ জীবনজুড়ে আত্মিক সাধনা ও ত্যাগের পর পরকালের ডাক অনুধাবন করে তিনি নিজের দাফনের স্থান সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন।
হযরতের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর তাঁকে যেন উনাইসারে সমাহিত করা হয়। উনাইসারের ভূমি কেবল একটি স্থান ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর কঠোর রিয়াজত ও আত্মসাধনার নীরব সাক্ষী। নিজ হাতে তিনি সেখানে একটি অলৌকিক মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন এবং সেখানেই সম্পন্ন করেছিলেন টানা সাত দিনের এক ঐতিহাসিক চিল্লাহ (নিবিড় আত্মিক সাধনা)। সেই পবিত্র স্থানটির সাথে তাঁর রুহানি সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর, যার কারণে তিনি তাঁর নশ্বর দেহটিকে উনাইসারের সেই মসজিদের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত রাখার অন্তিম ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
উনাইসার বনাম উত্তর চর্থার আবেগ
হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর তাঁকে যেন তাঁর প্রিয় উনাইসারের সেই অলৌকিক মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়, যেটি তিনি স্বহস্তে তৈরি করেছিলেন এবং যেখানে তিনি সাত দিনের ঐতিহাসিক চিল্লাহ করেছিলেন।
হযরতের অন্তিম ইচ্ছা উনাইসারের স্মৃতিবিজড়িত ভূমির সাথে যুক্ত থাকলেও উত্তর চর্থার অধিবাসীদের প্রগাঢ় অনুরাগের কারণে এক অভূতপূর্ব দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উত্তর চর্থার ঐতিহাসিক দারোগা বাড়ির সম্ভ্রান্ত পরিবার এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এই খবরে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। দারোগা বাড়ি ছিল সেই প্রাঙ্গণ, যেখানে হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ সময় অতিবাহিত করেছিলেন এবং যাদের সান্নিধ্যে থেকেছেন।
এই বাড়িতে অবস্থান করেই তিনি হাজার হাজার মানুষকে হেদায়েতের আলো দেখিয়েছিলেন এবং পথভোলা মানুষকে সুপথের দিশা দিয়েছিলেন। দারোগা বাড়ির সম্ভ্রান্ত সদস্যরা এবং উত্তর চর্থার সর্বস্তরের হাজার হাজার অধিবাসী এক বাক্যে দাবি তোলেন যে মহামানব তাঁদের মাঝে থেকে আত্মিক সংস্কার করেছেন, যাঁকে ঘিরে তাঁদের জীবনের পরম সৌভাগ্য রচিত হয়েছে, তাঁর পবিত্র অস্তিত্বকে কিছুতেই চর্থার মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হতে দেওয়া যাবে না। ফলে উনাইসারের প্রতি হযরতের আত্মিক আকর্ষণের বিপরীতে উত্তর চর্থাবাসীর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
ভালোবাসার জয় ও উত্তর চর্থার দারোগা বাড়িতে চিরনিদ্রা
স্থানীয় ভক্তকুল, মুরিদান ও দারোগা বাড়ির বাসিন্দাদের পরম ব্যাকুলতা, প্রগাঢ় মহব্বত এবং নিরন্তর অনুরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) তাঁর ভক্তদের অন্তহীন আকুলতা ও ভালোবাসাকে প্রাধান্য দেন। মুরিদান ও এলাকাবাসীর পরম শ্রদ্ধাবোধ এবং চোখের জলের মূল্যায়নে হযরতের উনাইসারে সমাহিত হওয়ার প্রাথমিক ইচ্ছাটি ভক্তদের মহব্বতের কাছে নতি স্বীকার করে।
ওফাতের পর পরম ভাবগাম্ভীর্য ও গভীর শ্রদ্ধার সাথে হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-কে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উত্তর চর্থার দারোগা বাড়ি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট জামে মসজিদের একেবারেই পাশটিতে সমাহিত করা হয়। ভক্তদের আকুল দাবির এই বাস্তবায়ন উত্তর চর্থার মাটিকে ধন্য ও বরকতময় করে তোলে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে ঐতিহাসিক দারোগা বাড়ি তিন গম্বুজ জামে মসজিদ এবং হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর পবিত্র মাজার শরিফ এক অভিন্ন, পবিত্র ও রুহানি কম্পাউন্ডে রূপ লাভ করে। স্থাপত্য ও আধ্যাত্মিকতার এই মেলবন্ধন আজও পাশাপাশি বিদ্যমান থেকে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থীকে আত্মিক শান্তি ও অনুপ্রেরণা জুগিয়ে আসছে।
অন্তর্ধানের গায়েবী ভবিষ্যৎবাণী ও কবর ফাঁকা হওয়ার মহাকারামত
হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর জীবনের শেষ অধ্যায় এবং মৃত্যুর পরবর্তী ঘটনা সুফি ইতিহাসের এক মহা বিস্ময়।
উর্দু বয়ান ও শেষ উক্তি: ইন্তেকালের কিছু দিন পূর্বে তিনি ভক্ত ও মুরিদদের উদ্দেশ্যে উর্দু ভাষায় এক ঐতিহাসিক ভবিষ্যৎবাণী করে বলেছিলেন:
আন্ধার গোর মে কোন রাহে গা, হাম তো কাভি নেহী রাহে গা
অর্থ: "অন্ধকার কবরের ভেতর কে পড়ে থাকবে? আমি (আবদুল্লাহ গাজীপুরী) তো কখনোই কবরে পড়ে থাকব না!"
তৎকালে উপস্থিত সাধারণ মানুষ এই গায়েবী কথার অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করতে পারেননি। তারা মনে করেছিলেন হুজুর হয়তো রূপক অর্থে কিছু বলছেন।
১৯০৩ সালের ১৫ জানুয়ারি: ওফাত ও দাফন
১৯০৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি (বাংলা মাঘ মাস), বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটায় এই মহান আধ্যাত্মিক সাধক কুমিল্লার উত্তর চর্থার দারোগাবাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর ইচ্ছা ছিল স্বহস্তে নির্মিত উনাইসার মসজিদের পাশে সমাহিত হওয়ার, কিন্তু দারোগাবাড়ির সর্বস্তরের মানুষ ও আশরাফ উদ্দিন পরিবারের গভীর ভালোবাসার কারণে তাঁকে ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে (১২১১ হিজরি) রিয়াজ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক দারোগাবাড়ি মসজিদ প্রাঙ্গণেই পূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
শূন্য কবরের লোমহর্ষক কারামত
দাফন সম্পন্ন হওয়ার অল্প কিছুদিন পর, দারোগাবাড়ি মাজার শরিফটি ইট-সিমেন্ট দিয়ে পাকা করার কাজ শুরু হয়। রাজমিস্ত্রিরা যখন কবরের চারপাশের মাটি খুড়ছিল, তখন অসাবধানতাবশত মাজার শরীফের একটি কোণের মাটি ধ্বসে ভেতরের দিকে পড়ে যায়।
কৌতূহলবশত রাজমিস্ত্রি ও উপস্থিত খাদেমরা ছিদ্র দিয়ে কবরের ভেতরে তাকাতেই আতঙ্কে ও বিস্ময়ে শিহরিত হয়ে ওঠেন! কবরের ভেতরে কোনো মানবদেহ নেই! নেই কোনো হাড়গোড়, এমনকি মৃতদেহের কোনো দুর্গন্ধ বা অস্তিত্বও নেই!
কেবল কবরের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে, যেখানে পা থাকার কথা ছিল, সেখানে পড়ে রয়েছে কাফনের কাপড়ের এক টুকরো ধবধবে সাদা অংশ!
তৎক্ষণাৎ উপস্থিত মানুষ বুঝতে পারেন জীবদ্দশায় শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) যে বলে গিয়েছিলেন "আন্ধার গোর মে হাম তো কাভি নেহী রাহে গা", তা কোনো সাধারণ কথা ছিল না; এটি ছিল আল্লাহর খাস অলিদের প্রতি প্রদত্ত বিশেষ কারামত, যেখানে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের শরীরকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয় বা গায়েব করে দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর তাঁর খ্যাতি সমগ্র উপমহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
ঐতিহাসিক দারোগাবাড়ি তিন গম্বুজ মসজিদ ও মাজার
কুমিল্লা নগরীর উত্তর চর্থায় অবস্থিত দারোগাবাড়ি মসজিদ ও মাজার শরিফ কেবল একটি ইবাদতগাহ নয়, এটি কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য নিদর্শন। আজ দেড়শ বছর অতিক্রম হলেও হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর স্মৃতি ও সুফি প্রবাহ একটুও ম্লান হয়নি। উত্তর চর্থার দারোগা বাড়ি সংলগ্ন মাজার শরিফটি আজ দেশ-বিদেশের হাজার হাজার সুফি অনুরাগী, আশেকান ও ভক্তদের জন্য এক পরম শান্তির নীড়।
প্রাচীন স্থাপত্য ও দারোগাবাড়ি মসজিদ
রাজগঞ্জের ইউসুফ স্কুলের পাশ ঘেঁষে যাওয়া সড়ক ধরে সামনে এগোলেই চোখে পড়ে প্রাচীন ও দৃষ্টিনন্দন দারোগাবাড়ি মসজিদ। প্রতিদিন কুমিল্লা ও দেশের দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ দারোগাবাড়ি মাজার শরিফে এসে উপস্থিত হন।
প্রতি শুক্রবার এবং বিশেষ করে পবিত্র শবে-বরাতের রাতে দারোগাবাড়ি মসজিদ, মাজার চত্বর এবং সংলগ্ন পুকুরের তিন পাড়ে লাখো মুসল্লির ঢল নামে। তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না পুরো এলাকায়।
প্রতিষ্ঠাকাল: ধারণা করা হয়, ১২১৪ হিজরিতে (১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দ) স্থানীয় দানবীর ও জমিদার রিয়াজ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
গম্বুজ ও মিনার: মসজিদটি নিখুঁত মোগল ও সুলতানি স্থাপত্যরীতির মিশ্রণে তৈরি। এতে রয়েছে সুন্দর তিনটি গম্বুজ এবং চারকোণায় ও চারপাশ ঘিরে রয়েছে ১২টি দৃষ্টিনন্দন মিনার।
দেয়ালের পুরুত্ব: প্রাচীন প্রযুক্তিতে তৈরি এই মসজিদের প্রতিটি দেয়ালের পুরুত্ব ৩ ফুটেরও বেশি, যা গ্রীষ্মকালেও মসজিদের ভেতরকে অত্যন্ত শীতল ও প্রশান্ত রাখে।
বার্ষিক ওরশ মোবারকের সময়সূচি
প্রতি বছর হিজরি ও বাংলা পঞ্জিকা মেনে বাংলা মাঘ মাসের প্রথম জুমাবারে (শুক্রবার) হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে বার্ষিক ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়।
মাঘ মাসের প্রথম জুমাবার উপলক্ষে উত্তর চর্থার দারোগা বাড়ি প্রাঙ্গণ উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে:
জুমার বিশাল জামাত: বহু দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা এসে ঐতিহাসিক তিন গম্বুজ মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন।
খতমুল কুরআন ও খতমুল বুখারী: সকাল থেকেই মাজার ও মসজিদ চত্বরে চলে পবিত্র কুরআন ও হাদীস গ্রন্থের খতম।
জিকির ও সামা মাহফিল: রাতভর ভক্তদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় জিকিরে জলিল এবং বিশ্বনবী (সা.)-এর শানে দরূদ ও মিলাদ।
শিরনি ও তাবাররুক বিতরণ: ওরশ উপলক্ষে বিশাল তাবাররুকের আয়োজন করা হয়। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ এক সাথে বসে সেই বরকতময় খানা গ্রহণ করেন।
আখেরি মোনাজাত: মধ্যরাতে বা শেষ প্রহরে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর শান্তি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি এবং ভক্তদের আত্মিক মুক্তি কামনা করে অনুষ্ঠিত হয় আবেগঘন আখেরি মোনাজাত।
একনজরে হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)
হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর জীবনী, আধ্যাত্মিক পরিক্রমা ও ঐতিহাসিক তথ্যাবলী সংক্ষেপে অবলোকন করার জন্য একটি সমন্বিত প্রামাণিক সারসংক্ষেপ তথ্যসারণী নিচে তুলে ধরা হলো:
বিষয় ও মানদণ্ড | হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর বিস্তৃত বিবরণ |
মূল নাম ও লকব | হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) [সুফি সাধক ও কামেল ওলী]। |
উৎস ও মূল ভূখণ্ড | ভারত (উত্তর প্রদেশের কানপুর ও গাজীপুর অঞ্চল)। |
কুমিল্লায় আগমনের মূল কারণ | ভারতের কানপুর থেকে মিয়ানমার (বার্মা/আরাকান) সফরে যাওয়ার পথে কুমিল্লায় সাময়িক বিরতি ও স্থায়ীকরণ। |
কুমিল্লার প্রধান কেন্দ্রস্থলী | কুমিল্লার উত্তর চর্থার ঐতিহ্যবাহী দারোগা বাড়ি এলাকা। |
স্বহস্তে নির্মিত ঐতিহাসিক মসজিদ | কুমিল্লার উনাইসার এলাকায় স্বহস্তে নির্মিত ঐতিহাসিক মসজিদ। |
অলৌকিক চিল্লাহর ঘটনা | উনাইসার মসজিদে টানা ৭ দিন চিল্লাহর পর সপ্তম রাতে প্রচণ্ড বজ্রধ্বনি ও আকাশচুম্বী আলোর জ্যোতি প্রত্যক্ষ। |
স্থাপত্য স্মৃতি চিহ্ন | উত্তর চর্থার দারোগা বাড়ির প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো তিন গম্বুজ বিশিষ্ট ঐতিহাসিক মসজিদ। |
দাফনের চূড়ান্ত স্থান | ভক্ত ও দারোগা বাড়ির অধিবাসীদের আকুলতায় উত্তর চর্থার দারোগা বাড়ি মসজিদের পাশে সমাহিত। |
বার্ষিক ওরশ মোবারকের সময় | প্রতি বছর বাংলা মাঘ মাসের প্রথম জুমাবারে (শুক্রবার) ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। |
আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার | অহিংসা, তাকওয়া, চিল্লাহ ও তাসাউফের মাধ্যমে কুমিল্লা অঞ্চলে সুফি ভাবধারা লালন। |
সুফি সাধনার শিক্ষা ও বর্তমান সমাজে শাহ গাজীপুরী (রহ.)
বর্তমান অস্থির, বস্তুवादी ও হিংসাবিদ্বেষে ভরা বিশ্বে হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর মতো ওলী-আউলিয়াদের জীবনী ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি।
আত্মশুদ্ধি ও খোদাভীতি: শাহ গাজীপুরী (রহ.) আমাদের শেখান যে বাইরের বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের পরিশুদ্ধতা (তাজকিয়া-ই-নাফস) পরম প্রয়োজনীয়। উনাইসারে সাত দিনের কঠোর চিল্লাহ আমাদের শিক্ষা দেয় দুনিয়াবী লোভ-লালসা থেকে মুক্ত হয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রেমে নিজেকে মগ্ন করার গুরুত্ব।
পরম সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা: সুফি সাধকগণ কখনোই মানুষকে বর্ণ, গোত্র বা সামাজিক পদের ভিত্তিতে বিচার করেননি। শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) উত্তর ভারতের কানপুর থেকে এসে কুমিল্লার চর্থার সাধারণ মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন। তাঁর মাজারের দুয়ার আজো ধনী-দরিদ্র, সর্বস্তরের মানুষের জন্য অবারিত।
আধ্যাত্মিক ধারাক্রম (সিলসিলা) ও 'মাজজুব' অবস্থা
সুফি পরিভাষায় সাধকদের প্রধানত দুটি ধারায় বিভক্ত করা হয় ‘সালেক’ (যাঁরা কঠোর নিয়ম-কানুন ও আনুষ্ঠানিক পাঠের মাধ্যমে ধাপে ধাপে আত্মশুদ্ধি অর্জন করেন) এবং ‘মাজজুব’ (যাঁরা খোদাপ্রেমে আত্মহারা ও নিমজ্জিত থাকেন)।
তরিকত সংযোগ: হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) প্রধানত কাদেরিয়া ও চিস্তিয়া তরিকতের আত্মশুদ্ধির ভাবধারায় অনুপ্রাণিত ছিলেন। উত্তর ভারতের কানপুর ও গাজীপুর অঞ্চলে অবস্থানকালে তিনি কাদেরিয়া সিলসিলার মহান সাধকদের সান্নিধ্য লাভ করেন।
মাজজুবিয়াত ও খোদাপ্রেম: কুমিল্লায় অবস্থানকালে তাঁর মধ্যে ‘মাজজুব’ বা গভীর খোদাপ্রেমের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যেত। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিভৃতে জিকির ও ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। দুনিয়াবী কোন ধন-সম্পদ বা বিলাসবহুল পোশাকের প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র মোহ ছিল না; অত্যন্ত সাধারণ একটি জুব্বা ও চাদর পরিধান করেই তিনি জীবন কাটিয়েছেন।
জনশ্রুতি ও অলৌকিক ঘটনাবলী (কারামাত)
কুমিল্লা ও এর আশপাশের অঞ্চলে শতাব্দী ধরে হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর একাধিক কারামাত বা অলৌকিক ঘটনার বিবরণ বংশপরম্পরায় মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে:
ব্যাধি মুক্তি ও পানি পড়া (শেফা): তৎকালীন সময়ে কুমিল্লায় যখন কলেরা, বসন্ত বা মহামারী দেখা দিত, তখন দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে মানুষ তাঁর কাছে আসত। তিনি সামান্য পানি পড়া বা দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে আরোগ্যের আবেদন করতেন। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, তাঁর দেওয়া পানি পড়া পান করে বহু শয্যাশায়ী রোগী সুস্থ হয়ে উঠতেন।
কাশফ বা মনের কথা অনুধাবন: মাজারের খাদেম ও প্রবীণ ভক্তদের বর্ণিত ইতিহাস অনুযায়ী, কেউ যদি কোনো জটিল সাংসারিক বা আধ্যাত্মিক সমস্যা নিয়ে মনে মনে কোনো প্রশ্ন চেপে তাঁর দরবারে আসত, তবে তিনি সেই ব্যক্তি কিছু বলার আগেই তার সমস্যার সমাধান বাতলে দিতেন। সুফি পরিভাষায় একে ‘কাশফ’ বা অন্তর্দৃষ্টি বলা হয়।
অনশনরত অভুক্তদের আহার সংস্থান: উত্তর চর্থার দারোগা বাড়িতে অবস্থানকালে তিনি নিজের জন্য রান্না করা খাবার প্রায়শই অভুক্ত ও দুস্থদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, অনেক সময় সামান্য খাবার দিয়েও অলৌকিকভাবে বহু মানুষের আহারের সংস্থান হয়ে যেত।
উত্তর চর্থার 'দারোগা বাড়ি'র নাম ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
কুমিল্লার উত্তর চর্থার দারোগা বাড়ি কেবল একটি সাধারণ পারিবারিক প্রাঙ্গণ ছিল না; ঔপনিবেশিক এবং তৎপরবর্তী আমলে এর একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও প্রশাসনিক পরিচয় ছিল।
নামকরণের কারণ: ব্রিটিশ আমলে এই বনেদি পরিবারের কর্তাব্যক্তিরা তৎকালীন পুলিশ ও প্রশাসনিক বিভাগে ‘দারোগা’ (ইন্সপেক্টর) বা উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। সেই থেকে এলাকাটি এবং পরিবারটি ‘দারোগা বাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়।
খানকায় রূপান্তর: সম্ভ্রান্ত ও প্রশাসনিক প্রভাবশালী পরিবার হওয়া সত্ত্বেও দারোগা বাড়ির সদস্যরা ছিলেন চরম ধর্মপ্রাণ ও সুফি-অনুরাগী। শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর মতো মহান ওলী এই বাড়িতে স্থায়ী আসন নেওয়ার পর দারোগা বাড়ির চত্বরটি মূলত একটি উন্মুক্ত আস্তানা ও খানকায় রূপান্তরিত হয়, যেখানে ধনী-দরিদ্রের কোনো পার্থক্য ছিল না।
উনাইসারের অলৌকিক মসজিদ ও চিল্লাহখানার বর্তমান অবস্থা
হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) কুমিল্লার উনাইসারে নিজের হাতে যে কাঁচা মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন এবং যেখানে ৭ দিনের চিল্লাহ সম্পন্ন করেছিলেন, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম:
ঐতিহাসিক স্মারক: স্বহস্তে মসজিদ নির্মাণ করা সুফিদের একটি চরম বিনয় (تواضع) ও ‘নফস’ (অহংকার) দমনের প্রতীক। দেড়শ বছর আগের সেই কাঁচা কাঠামোটি পরবর্তীতে স্থানীয় এলাকাবাসী পাকা ইমারতে রূপান্তর করেন। তবে আজও সেই স্থানটিকে একটি পবিত্র স্থান এবং শাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত চিল্লাহখানা হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
তিন গম্বুজ বিশিষ্ট দারোগা বাড়ি মসজিদের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য
উত্তর চর্থায় হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন তিন গম্বুজ বিশিষ্ট প্রাচীন মসজিদটি কুমিল্লার অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় নিদর্শনের দাবিদার:
নির্মাণ কৌশল: দেড়শ বছর আগের তৈরি এই মসজিদটির দেয়াল অত্যন্ত পুরু, যা চুন-সুরকি ও ইটের সমন্বয়ে তৈরি। ফলে চরম গরমের দিনেও মসজিদের অভ্যন্তর শান্ত ও শীতল থাকে।
তিন গম্বুজের জ্যামিতি: মসজিদের ছাদের উপর অবস্থিত তিনটি গম্বুজের মধ্যখানের গম্বুজটি আকারে অপেক্ষাকৃত বড় এবং পাশের দুটি ছোট। এটি বাংলার চিরায়ত সুলতানি ও মোগল গম্বুজ শৈলীর অনুকরণে নির্মিত।
চিরভাস্বর আধ্যাত্মিক প্রদীপ
হযরত শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) কেবল দেড়শ বছর আগের কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নন; তিনি কুমিল্লার মানুষের অন্তরে আধ্যাত্মিক ভালোবাসার এক চিরন্তন নাম। কানপুরের মাটি থেকে শুরু হওয়া তাঁর জীবনপ্রবাহ মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে শেষ পর্যন্ত কুমিল্লার মাটিকেই ধন্য করেছে।
উনাইসারের সেই অলৌকিক বজ্রধ্বনি ও নূরানী আলো কিংবা উত্তর চর্থার তিন গম্বুজ বিশিষ্ট দারোগা বাড়ি মসজিদের স্নিগ্ধ মেহরাব সবই আজো সাক্ষী দিচ্ছে এই মহান সাধকের অসামান্য আধ্যাত্মিক ক্ষমতার। প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম জুমাবারে যখন লাখো আশেকানের কণ্ঠে 'আল্লাহু আল্লাহু' জিকির ধ্বনিত হয়, তখন মনে হয় শাহ আব্দুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) যেন আজও তাঁর রুহানী ফয়েজ ও বরকত দিয়ে কুমিল্লাবাসীকে আগলে রেখেছেন।
আল্লাহ তাআলা এই মহান সুফি সাধকের দারাজাত বুলন্দ করুন এবং তাঁর দেখান তাকওয়া, মানবসেবা ও আত্মশুদ্ধির পথে আমাদের চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।





















