বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় যে ১০টি স্থানে

Jul 23, 2025

“বৃষ্টি” কখনো আমাদের মনকে স্নিগ্ধ করে, আবার কখনো সৃষ্টি করে ভোগান্তি। কিন্তু আপনি কি জানেন, পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে প্রায় সারা বছরই বৃষ্টি হয়? বিশ্বের ক্রান্তীয় অঞ্চলের গহিন বন থেকে শুরু করে উচ্চভূমির পাহাড়ি এলাকা, প্রকৃতি সেখানে সাজিয়েছে অবিরাম বৃষ্টির রাজ্য! বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় এমন স্থানগুলো সাধারণত পাহাড়ি বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে আর্দ্র বায়ু, ভূ-প্রকৃতি এবং জলবায়ুর কারণে প্রচুর বৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মতো নাতিশীতোষ্ণ দেশেও বর্ষায় মেঘের গর্জনে ভিজে যায় শহর-গ্রাম। গ্রীষ্ম এবং বর্ষায় হয়ে থাকে ভারী বৃষ্টিপাত। কিন্তু যেসব জায়গায় বছরের ৩৬৫ দিনের বেশিরভাগ সময়ই বৃষ্টি নামে, সেখানে জীবনযাপন কেমন? এই আর্টিকেলে আমরা জানবো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় যে ১০টি স্থানে তা সম্পর্কে। যেখানে আকাশ যেন থেমেই থাকতে চায় না। পৃথিবীর এই ১০টি স্থানে প্রায় সারা বছরই বৃষ্টি হয়!

১. ললর (কলাম্বিয়া)

সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হওয়া অঞ্চলগুলোর মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার ললর। দেশটির টুটেন্ডু এলাকায় অবস্থিত পর্বত ঘেরা উপকূলীয় সমভূমির শহর এই ললর। সেখানে সারাবছর বৃষ্টি হয় ও বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১৩,৩০০ মিলিমিটার। অতিবৃষ্টির কারণে এই দেশের অনেক স্থানেই বন্যা হয়ে থাকে। তবে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সময় টানা ১১-১২ দিন ধরেও চলে বৃষ্টিপাত। কখনো টানা ২০ দিনও বৃষ্টিপাত হয়। অতিবৃষ্টি অঞ্চল হওয়ায় কলম্বিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অতুলনীয় ও চিরসবুজ গাছপালায় এই দেশটি পরিপূর্ণ।

২. মৌসিনরাম (ভারত)

কয়েক বছর আগেও জানতাম ভারতের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে। কিন্তু এখন আমরা জানি, চেরাপুঞ্জি নয় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় মেঘালয়েরই আরেক জায়গায়, তার নাম মৌসিনরাম। মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পার্বত্য জেলায় এটি অবস্থিত। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১১,৮৭২ মিলিমিটার। চেরাপুঞ্জিও একই জেলায়। বাংলাদেশের সিলেট ও ময়মনসিংহের সীমান্তের উত্তরেই মেঘালয়ের পাহাড় ও গারো পাহাড়। বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প নিয়ে মেঘ যায় উত্তর দিকে। পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ব্যাপক বৃষ্টিপাত ঘটায় এ মেঘমালা। বর্ষাকালে এখানে সূর্যের দেখা পাওয়া কঠিন।

৩. চেরাপুঞ্জি (ভারত)

বৃষ্টিবহুল স্থানের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চেরাপুঞ্জি। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পার্বত্য জেলার একটি শহর এটি। কিছুদিন আগেও চেরাপুঞ্জিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিপাত হওয়া স্থান হিসেবে ধরা হতো। এখানে সারাবছর তাপমাত্রা গড়ে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। বৃষ্টিপাত বেশি হয় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। এত বৃষ্টিপাতের কারণে তখন মেঘালয়ের ঢালু স্থানগুলোতে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১১,৭৭৭ মিলিমিটার। এ অঞ্চলে সর্বোচ্চ ২৬,৪৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ১৮৬১ সালে।

৪. মাউন্ট ওয়ালিয়ালো (হাওয়াই, আমেরিকা)

বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয় হাওয়াই দ্বীপের মাউন্ট ওয়ালিয়ালোয়। আমেরিকার হাওয়াই স্টেটের কুকুই দ্বীপে অবস্থিত একটি বিস্ময়কর প্রাকৃতিক স্থান। এই পর্বতটি তার অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই আবহাওয়া গবেষক, প্রকৃতিপ্রেমী এবং পর্যটকদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।

এখানকার উপকূলীয় নিম্নভূমিতে সবসময় তীব্রভাবে বয়ে যায় ঊর্ধ্বগতির বাতাস। বৃষ্টিপাতের কারণে সারা বছরই আর্দ্র থাকে এই এলাকা এবং প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হয়। তবে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় এপ্রিল মাসে। হাওয়াইয়ের অন্যতম একটি আকর্ষণীয় স্থান এই সবুজে ঘেরা মাউন্ট ওয়ালিয়ালো। শুধু বৃষ্টিভেজা সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর এখানে আসে কয়েক লাখ পর্যটক। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১১,৫০০ মিলিমিটার। এ অঞ্চলে সর্বোচ্চ ১৭,৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ১৯৮২ সালে।

৫. ডেবুনসা (ক্যামেরুন)

ক্যামেরুনের ডেবুনসা গ্রামটিতে হয় বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। আটলান্টিক মহাসাগরের কাছাকাছি হওয়ায় প্রচুর আর্দ্রতা জমে এখানে অনেক বৃষ্টি হয়। এ স্থানটিতে বছরে প্রায় ২০০ দিন বৃষ্টি হয়ে থাকে। দেশটির দক্ষিণ আটলান্টিক উপকূলের এ গ্রামে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১০,৩০০ মিলিমিটার। নিরক্ষরেখার কাছের এ গ্রামটির অবস্থান একেবারেই ক্যামেরুন পর্বতের ধার ঘেঁষে। এ অঞ্চলে সর্বোচ্চ ১৪,২৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ১৯৭২ সালে। এটি আফ্রিকার সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা।

৬. মাউন্ট বেল্লেন্দেন কের (অস্ট্রেলিয়া)

অস্ট্রেলিয়ার মাউন্ট বেল্লেন্দেন কের পর্বতটি বিশ্বের পঞ্চম বৃষ্টিবহুল স্থান। এটি অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। বর্ষা মৌসুম চলে এপ্রিল থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত। এসময় খুব ভারী বৃষ্টিপাত হয়। এই পর্বতের নামকরণ করা হয়েছে উদ্ভিদ বিজ্ঞানী বেল্লেন্দেন কোরের নামানুসারে। একদিকে প্রবাল প্রাচীর ঘেরা সমুদ্র উপকূল, অন্য তিন দিকে পর্বত ঘেরা এ এলাকায় যেন সব সময় কালো মেঘের ছায়া লেগে থাকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৬০০ মিটার উঁচু এলাকাটিতে বৃষ্টি একটি নিয়মিত ব্যাপার। মাউন্ট বেল্লেন্দেন কেরে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৮,৬৩৬ মিলিমিটার। সর্বোচ্চ ১২,৪৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ২০০০ সালে।

৭. ক্রপ নদী (নিউজিল্যান্ড)

নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ক্রপ নদী। নদীটি আকারে ছোট হলেও এখানে এর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এতটাই বেশি যে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ স্থানের মর্যাদা পেয়েছে। এখানে মহাসাগরীয় আর্দ্রতা এবং পর্বতের বাধা মিলিত হয়ে চরম মাত্রার বৃষ্টিপাত ঘটায়।

ক্রপ নদীতে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১১,৫০০ মিলিমিটার। সর্বোচ্চ ১৮,০৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ২০১৮ সালে। এই এলাকায় ঘন বন, নদী ও পাহাড়ের বাস্তুতন্ত্র প্রচুর বৃষ্টিপাতে সমৃদ্ধ ও জীববৈচিত্র্যময়। ভূমিধস ও নদীর প্লাবনের আশঙ্কা বেশি থাকায় এই এলাকা কম জনবসতিপূর্ণ।

৮. সান আন্তোনিও দেল উরেকা (ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আফ্রিকা)

এটি আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হওয়া স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। সান আন্তোনিও দেল উরেকা অবস্থিত বিয়োকো (Bioko) দ্বীপে, যা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির মূল ভূখণ্ড থেকে কিছুটা পশ্চিমে, আটলান্টিক মহাসাগরের কোলঘেঁষে অবস্থিত। দ্বীপটি আগ্নেয়গিরির উৎপত্তিজনিত এবং এটি জৈববৈচিত্র্য ও ঘনবন সমৃদ্ধ। গ্রামটি দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে অবস্থিত, যেখানে অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাত দেখা যায়। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১০,৪৫০ মিলিমিটার।

৯. হ্যানসন’স লেগুন (ভারত)

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য মেঘালয় বহুদিন ধরেই পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। হ্যানসন’স লেগুন অবস্থিত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গভীর পাহাড়ি বনাঞ্চলে, মাওসিনরাম ও চেরাপুঞ্জির কাছাকাছি কোনো অঞ্চলে। এই এলাকা ঘন জঙ্গলাচ্ছন্ন এবং চারপাশে উঁচু গারো-খাসি পাহাড়।

সমুদ্র থেকে মেঘ প্রবেশ করে সহজেই এখানে জমা হয়। উপত্যকার মতো নিচু অবস্থান হওয়ায় মেঘ আটকে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে বৃষ্টি হয়। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১০,২০০ মিলিমিটার। স্থানীয়রা বলেন, এখানে বছরে ২৫০ দিন এর বেশি বৃষ্টিপাত হয়। কখনো কখনো টানা এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টির কোনো বিরতি থাকে না।

১০. ইয়াকুশিমা দ্বীপ (জাপান)

জাপানের দক্ষিণাঞ্চলে কাগোশিমা প্রদেশের অন্তর্গত ইয়াকুশিমা দ্বীপ বিশ্বের অন্যতম বর্ষাপ্রবণ একটি অঞ্চল। ইয়াকুশিমা দ্বীপ ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত। বৃষ্টিপাত বছরের প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু বৃষ্টি হয় এই অঞ্চলে। সমুদ্র থেকে আসা জলীয় বাষ্প পর্বতের ঢালে ঠেকে মেঘ হয়ে ওঠে এবং ফলস্বরূপ এখানে ব্যাপক বৃষ্টি হয়। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ১০,০০০ মিলিমিটার।

এখানে বৃষ্টি উপভোগ করতে প্রচুর পর্যটক আসেন। বৃষ্টির মধ্যে ঘন বন হেঁটে দেখা, জলপ্রপাত উপভোগ করা, এবং মসযুক্ত জঙ্গল আবিষ্কার করা ইয়াকুশিমার অন্যতম আকর্ষণ।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.