বিশ্বের সবচেয়ে দামি ব্যয়বহুল ১০টি বিয়ে
বিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে জীবনের অন্যতম প্রধান একটি সামাজিক ও ব্যক্তিগত উৎসব। সাধারণ মানুষের কাছে বিয়ে মানে একটি সামাজিক বন্ধন আর প্রিয়জনদের মিলনমেলা। কিন্তু যখন বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেরদের ঘরের বিয়ের কথা আসে, তখন সেটি আর কেবল বিয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে আভিজাত্য, ক্ষমতা এবং ঐশ্বর্যের এক মহাকাব্যিক প্রদর্শনী। যখন সাধারণ মানুষ তাদের বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করেন, তখন বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা খরচ করেন কোটি কোটি ডলার। রাজকীয় আভিজাত্য থেকে শুরু করে ধনকুবেরদের বিশাল আয়োজন বিয়ের পিঁড়িতে বসা দম্পতিদের এই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের খবর যুগে যুগে মানুষকে চমকে দিয়েছে।
আজকের এই ব্লগে আমরা জানবো বিশ্বের ইতিহাসের এমন ১০টি বিয়ের গল্প, যেগুলোর ব্যয় শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। ১ বিলিয়ন ডলারের অবিশ্বাস্য খরচ থেকে শুরু করে কোটি কোটি টাকার রাজকীয় আয়োজন চলুন দেখে নিই বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ১০টি বিয়ের আদ্যোপান্ত।
সাঈদ গুতসেরেভ ও খাজিদ্যা উজাখোভা: ১ বিলিয়ন ডলারের অবিশ্বাস্য আয়োজন
বিশ্বের সবচেয়ে দামি বিয়ের তালিকায় বর্তমান সময়ে যে নামটি শীর্ষে অবস্থান করছে, সেটি হলো রাশিয়ার তেল সম্রাট মিখাইল গুতসেরেভ-এর ছেলে সাঈদ গুতসেরেভ এবং ২০ বছর বয়সী দন্তচিকিৎসার ছাত্রী খাজিদ্যা উজাখোভা-র বিয়ে। ২০১৬ সালে মস্কোতে অনুষ্ঠিত এই বিয়েটি আক্ষরিক অর্থেই ছিল বিলাসিতার এক নতুন মানদণ্ড। ধারণা করা হয়, এই একটি বিয়ের পেছনে খরচ হয়েছিল প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকার সমান।
সাজসজ্জা এবং রাজকীয় আভিজাত্য: মস্কোর অভিজাত ভেন্যু 'সাফিসা' (Safisa) কে এই বিয়ের জন্য পুরোপুরি বদলে ফেলা হয়েছিল। ভেন্যুর ভেতরে ঢুকলে মনে হতো কোনো এক রূপকথার বাগানে প্রবেশ করেছেন অতিথিরা। দেয়াল থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত কয়েক লাখ তাজা ফুল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। এই ফুলগুলো শুধু রাশিয়ার নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশেষ বিমানে করে উড়িয়ে আনা হয়েছিল। আলোকসজ্জা এবং ফুলের সুবাসে সাফিসা হয়ে উঠেছিল স্বর্গীয় কোনো উদ্যান।
কনের পোশাক ও হীরাখচিত সাজ: এই বিয়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল কনে খাজিদ্যার বিয়ের পোশাক। লেবানিজ ডিজাইনার এলি সাব (Elie Saab)-এর ডিজাইন করা এই পোশাকটির ওজন ছিল প্রায় ২৫ কেজি। পুরো পোশাকে ছিল নিখুঁত এমব্রয়ডারি এবং হাজার হাজার ক্ষুদ্র পাথরের কাজ। পোশাকের ওজন এত বেশি ছিল যে, কনেকে হাঁটার সময় বেশ কয়েকজনের সাহায্য নিতে হয়েছিল। শুধুমাত্র এই পোশাকটির পেছনেই খরচ হয়েছিল কয়েক কোটি টাকা। সাথে ছিল হীরার মুকুট এবং গয়না, যা খাজিদ্যার সৌন্দর্যকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বিশ্বখ্যাত তারকাদের পারফরম্যান্স: গুতসেরেভ পরিবারের এই বিয়েতে বিনোদনের জন্য যাদের আনা হয়েছিল, তা যেকোনো আন্তর্জাতিক মিউজিক ফেস্টিভ্যালকেও হার মানাবে। মঞ্চ মাতিয়েছিলেন পপ কুইন জেনিফার লোপেজ, স্প্যানিশ হার্টথ্রব এনরিক ইগলেসিয়াস এবং কিংবদন্তি শিল্পী স্টিং। গুঞ্জন রয়েছে, শুধুমাত্র জেনিফার লোপেজকে কয়েক মিনিটের পারফরম্যান্সের জন্য দেওয়া হয়েছিল বিপুল পরিমাণ অর্থ।
আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য ছিল রাজকীয় আপ্যায়ন। প্রত্যেকের জন্য ছিল বিশেষ উপহারের বাক্স, যার প্রতিটির মূল্য ছিল আকাশচুম্বী। বিলাসিতার এই চরম শিখর সাঈদ এবং খাজিদ্যার বিয়েকে ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।
অনন্ত আম্বানি ও রাধিকা মার্চেন্ট
ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় এবং বিলাসবহুল বিয়ের কথা বললে ২০২৪ সালের অনন্ত আম্বানি ও রাধিকা মার্চেন্টের বিয়ের নাম সবার আগে আসবে। এশিয়ার শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে অনন্তের এই বিয়ে কেবল একটি অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল ভারতের সফট পাওয়ার এবং আম্বানি পরিবারের আকাশচুম্বী প্রভাবের এক মহা-প্রদর্শনী।
প্রাক-বিবাহের বিলাসিতা: বিয়েটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হলেও এর উৎসব শুরু হয়েছিল কয়েক মাস আগে থেকেই। গুজরাটের জামনগরে তিন দিনের প্রথম প্রি-ওয়েডিং অনুষ্ঠানটি ছিল অবিশ্বাস্য। সেখানে বিশ্বের অন্যতম বড় বন্যপ্রাণী রেসকিউ সেন্টার 'বনতারা'র (Vantara) আবহে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়। এই অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল পপ আইকন রিহানা-র পারফরম্যান্স। বলা হয়ে থাকে, এটি ছিল ভারতে রিহানার প্রথম পারফরম্যান্স, যার জন্য তাকে প্রায় ৬০-৭০ কোটি টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছিল।
ইউরোপীয় ক্রুজ ও গ্লোবাল পপ আইকনরা: জামনগরের পর আম্বানি পরিবার তাদের অতিথিদের নিয়ে পাড়ি জমায় ইউরোপে। ইতালির উপকূলে একটি বিলাসবহুল ক্রুজে দ্বিতীয় দফায় প্রি-ওয়েডিং পালন করা হয়। কয়েক দিন ধরে চলা এই সমুদ্রযাত্রায় পারফর্ম করেছিলেন ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ, কেটি পেরি এবং ইতালিয়ান টেনর আন্দ্রেয়া বোচেলি। ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির বুকে এমন আয়োজন বিশ্ব আগে কখনো দেখেনি।
মূল আয়োজন ও বিশ্বনেতাদের মেলা: মুম্বাইয়ের জিও ওয়ার্ল্ড কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত মূল বিয়েতে বসেছিল তারার মেলা। আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় ছিলেন:
বিল গেটস (মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা)
মার্ক জাকারবার্গ (মেটার সিইও)
বোরিস জনসন (যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী)
বলিউডের শাহরুখ খান, সালমান খান থেকে শুরু করে হলিউডের জন সিনা পর্যন্ত।
এই বিয়ের মোট খরচ ৬০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫০০০ কোটি টাকার উপরে) ছাড়িয়ে গেছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। অতিথিদের জন্য বিশেষ বিমান, বিলাসবহুল গাড়ি এবং বিশ্বের সেরা শেফদের হাতের তৈরি খাবারের মেনু সব মিলিয়ে এটি ছিল আধুনিক যুগের এক ডিজিটাল রূপকথা।
ইশা আম্বানি ও আনন্দ পিরামাল
আম্বানি পরিবারের বিয়ের জৌলুস প্রথম বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল ২০১৮ সালে, যখন মুকেশ আম্বানির একমাত্র কন্যা ইশা আম্বানি এবং আনন্দ পিরামাল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তৎকালীন সময়ে এটিই ছিল ভারতের সবচেয়ে আলোচিত এবং ব্যয়বহুল বিয়ে।
উদয়পুরের সেই স্বপ্নিল সন্ধ্যা: বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল রাজস্থানের উদয়পুরে। উদয়পুরের সিটি প্যালেসে আয়োজিত প্রাক-বিবাহ অনুষ্ঠানে ছিল রাজকীয় ছোঁয়া। এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় চমক ছিল বিশ্বখ্যাত ডিভা বিয়ন্সে (Beyoncé)-র পারফরম্যান্স। বিয়ন্সেকে নিজের ব্যক্তিগত কনসার্টের জন্য নিয়ে আসা আম্বানি পরিবারের ক্ষমতার এক বড় নিদর্শন ছিল। বিয়ন্সেকে আনার জন্য আম্বানি পরিবার কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল।
বিলাসিতাবহুল অ্যান্টিলিয়া: বিয়ের মূল অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় মুম্বাইয়ে আম্বানিদের নিজস্ব বাসভবন 'অ্যান্টিলিয়া'-তে। বিশ্বের সবচেয়ে দামি ব্যক্তিগত বাসভবন হিসেবে পরিচিত ২৭ তলার এই ভবনটিকে বিয়ের সময় হাজার হাজার ফুল ও আলো দিয়ে সাজানো হয়েছিল। আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় ছিলেন হিলারি ক্লিনটন থেকে শুরু করে ভারতের প্রায় সব প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
অতিথিদের অভাবনীয় আপ্যায়ন: ইশা আম্বানির বিয়েতে অতিথিদের যাতায়াতের জন্য ১০০টিরও বেশি চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিয়ের প্রতিটি কার্ডের দাম ছিল কয়েক লাখ টাকা, যা ছিল একটি বিলাসবহুল বাক্স। এই বক্সের ভেতরে ছিল সোনার চেইন এবং বহুমূল্যবান উপহার। খাবারের মেনুতে ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শত শত পদের সমাহার। এই বিয়ের আনুমানিক খরচ ছিল প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। যদিও অনন্ত আম্বানির বিয়ের তুলনায় এটি ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু ২০১৮ সালের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল কল্পনাতীত।
ভানিশা মিত্তাল ও অমিত ভাটিয়া
২০০৪ সালের সেই সময়টির কথা ভাবুন, যখন ইন্টারনেটের এত দাপট ছিল না, কিন্তু সারা বিশ্বের গণমাধ্যম একটি বিয়ের সংবাদে তোলপাড় ছিল। সেই বিয়েটি ছিল স্টিল টাইকুন লক্ষ্মী মিত্তালের একমাত্র কন্যা ভানিশা মিত্তাল এবং বিনিয়োগ ব্যাংকার অমিত ভাটিয়ার। ভারতীয় আভিজাত্য যখন ফরাসি ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তৈরি হয় এক অনন্য ইতিহাস।
ঐতিহাসিক ভেন্যু ও রাজকীয় আয়োজন: এই বিয়ের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল ফ্রান্সের অত্যন্ত ঐতিহাসিক এবং দৃষ্টিনন্দন স্থান ভক্স-লে-ভিকম্ট (Vaux-le-Vicomte)। এটি ছিল ১৭শ শতকের একটি ফরাসি প্রাসাদ, যা তার স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিশ্ববিখ্যাত। টানা ছয় দিনব্যাপী চলা এই বিয়ের প্রতিটি অনুষ্ঠান ছিল আড়ম্বরপূর্ণ।
ভারত থেকে প্রায় ১০০০-এরও বেশি ভিআইপি অতিথিকে ব্যক্তিগত বিমানে করে প্যারিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অতিথিদের থাকার জন্য প্যারিসের ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্যারিস লে গ্র্যান্ডের মতো সেরা ফাইভ স্টার হোটেলের পুরো ফ্লোরগুলো বুক করা হয়েছিল। অতিথিদের জন্য যে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিল, সেটিও ছিল দেখার মতো একটি ভারী সিলভার বক্সে রাখা ২০ পাতার একটি বই, যা হাতে পাওয়া ছিল এক পরম ভাগ্যের বিষয়।
বিনোদন ও খাবারের সমারোহ: মিত্তাল পরিবারের এই বিয়েতে বিনোদনের কোনো কমতি ছিল না। সে সময়কার পপ সেনসেশন কাইলি মিনোগকে বিশেষভাবে পারফর্ম করার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। এছাড়াও বলিউডের নামী-দামি তারকাদের উপস্থিতি ছিল এই বিয়ের অন্যতম আকর্ষণ। জানা যায়, জাভেদ আখতার একটি বিশেষ নাটক লিখেছিলেন যা মিত্তাল পরিবারের সদস্যরা মঞ্চস্থ করেছিলেন।
খাবারের ক্ষেত্রেও ছিল বিলাসিতার চরম শিখর। ভারতের বিখ্যাত শেফদের প্যারিসে নিয়ে আসা হয়েছিল এবং ছয় দিনব্যাপী বিভিন্ন দেশের কয়েকশ পদের খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল। বিশেষ করে মদের সংগ্রহের জন্য কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়েছিল।
ব্যয়ের পরিমাণ ও বর্তমান মূল্য: ২০০৪ সালে এই বিয়ের মোট খরচ ছিল প্রায় ৬৬ মিলিয়ন ডলার। আজকের দিনে মুদ্রাস্ফীতির হিসেব করলে এই অর্থের পরিমাণ অবিশ্বাস্য পর্যায়ে পৌঁছাবে। বর্তমানের হিসেবে এটি প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এটি কেবল একটি বিয়ে ছিল না, বরং ভারতীয় ব্যবসায়িক শক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী ছিল বিশ্বমঞ্চে।
প্রিন্স চার্লস ও লেডি ডায়ানা - বিংশ শতাব্দীর সেরা রাজকীয় বিয়ে
১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই তারিখটি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রিন্স চার্লস এবং লেডি ডায়ানা স্পেন্সারের বিয়েটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি 'ফেয়ারি টেল ওয়েডিং'। সেই সময়ে এটি ছিল আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং কাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
রাজকীয় জাকজমক ও ডায়ানার রাজপোশাক: লেডি ডায়ানা যখন ক্যাথেড্রালের সামনে নামলেন, সারা বিশ্বের মানুষ তার সৌন্দর্য এবং আভিজাত্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার বিয়ের গাউনটি ছিল তৎকালীন সময়ের ফ্যাশনের এক অনন্য নিদর্শন। এই পোশাকে ব্যবহার করা হয়েছিল ১০ হাজার মুক্তা এবং এর পেছনে থাকা টেইলটি ছিল ২৫ ফুট লম্বা যা রাজকীয় ইতিহাসে দীর্ঘতম। এই পোশাকটি ডিজাইন করেছিলেন ডেভিড এবং এলিজাবেথ ইমানুয়েল।
লন্ডনের রাস্তায় সেদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছিল কেবল এই নবদম্পতিকে এক নজর দেখার জন্য। আর প্রযুক্তির অভাব থাকা সত্ত্বেও সারা বিশ্বের প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় সরাসরি এই রাজকীয় আয়োজন উপভোগ করেছিল।
ব্যয়ের অবিশ্বাস্য হিসাব: এই বিয়ের আড়ম্বর কেবল পোশাকে বা সাজসজ্জায় সীমাবদ্ধ ছিল না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রাজকীয় ভোজ এবং আলোকসজ্জা মিলিয়ে সেই সময়ে খরচ হয়েছিল প্রায় ৪৮ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানের মুদ্রাস্ফীতির বাজার দর অনুযায়ী এই খরচের পরিমাণ ১১০ মিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি ছাড়িয়ে যাবে।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব: ডায়ানার এই বিয়ে রাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। ডায়ানা কেবল একজন রাজবধূ হিসেবে নন, বরং 'পিপলস প্রিন্সেস' হিসেবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। এই বিয়েটি রাজকীয় পরিবারের আধুনিক যুগের সূচনা হিসেবেও দেখা হয়।
প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মারকেল
দীর্ঘ কয়েক দশক পর ২০১৮ সালে আবারও ব্রিটিশ রাজপরিবার বিশ্ববাসীকে এক জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে উপহার দেয়। প্রিন্স হ্যারি এবং হলিউড অভিনেত্রী মেগান মারকেলের বিয়ে ছিল আভিজাত্য এবং আধুনিকতার এক অপূর্ব মিশ্রণ। ১৯ মে, ২০১৮ তারিখে উইন্ডসর ক্যাসেলের সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে এই বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
নিরাপত্তা ও আড়ম্বর: হ্যারি এবং মেগানের বিয়ের সবচেয়ে বড় খরচের খাত ছিল এর নিরাপত্তা। সেই সময়ের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং রাজকীয় পরিবারের জনপ্রিয়তার কারণে নিরাপত্তার জন্য কয়েক স্তরের কড়াকড়ি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। স্নাইপার, সাদা পোশাকের পুলিশ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহারের কারণে কেবল নিরাপত্তাতেই খরচ হয়েছিল কয়েক কোটি পাউন্ড।
মেগানের বিয়ের গাউনটি ছিল বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড 'গিভেনশি' (Givenchy)-এর তৈরি। এটি ছিল অত্যন্ত সিম্পল কিন্তু অত্যন্ত মার্জিত, যা আধুনিক ফ্যাশন সচেতন মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছিল। তার ৫ মিটার লম্বা ওড়নাটিতে কমনওয়েলথের ৫৩টি দেশের ফুলের নকশা হাতে বোনা ছিল।
সেলিব্রিটি গেস্ট লিস্ট: এই বিয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর অতিথিদের তালিকা। রাজকীয় পরিবারের বাইরের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব এতে আমন্ত্রিত ছিলেন। ওপরা উইনফ্রে, জর্জ ক্লুনি, ডেভিড বেকহ্যাম, ভিক্টোরিয়া বেকহ্যাম এবং সেরেনা উইলিয়ামসের মতো বিশ্বসেরা তারকারা এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই বিয়েটি ছিল বৈচিত্র্যের প্রতীক, কারণ এতে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সাথে আমেরিকান সংস্কৃতির এক মিলন ঘটেছিল।
খরচের খতিয়ান: পুরো আয়োজনে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। যার সিংহভাগই ব্যয় হয়েছিল নিরাপত্তার পেছনে। খাবারের ক্ষেত্রেও ছিল ব্যাপক আয়োজন, যেখানে রাজকীয় শেফরা ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি আধুনিক পদের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
প্রিন্স উইলিয়াম ও কেট মিডলটন
২০১১ সালের ২৯ এপ্রিল। গোটা বিশ্বের চোখ ছিল লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে-তে। ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের উত্তরসূরি প্রিন্স উইলিয়াম এবং তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকা কেট মিডলটনের বিয়েটি ছিল একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত ঘটনা। একে কেবল একটি বিয়ে বললে ভুল হবে, এটি ছিল ব্রিটিশ ঐতিহ্যের এক আধুনিক বহিঃপ্রকাশ।
রাজকীয় আয়োজন: এই বিয়েটি দেখার জন্য ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে-র বাইরে লাখ লাখ মানুষ ভিড় জমিয়েছিলেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, কেবল সশরীরে উপস্থিত থাকা মানুষই নন, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় এবং ইউটিউবে সরাসরি এই অনুষ্ঠান উপভোগ করেছিলেন। এটি ছিল রাজপরিবারের জন্য একটি বিশাল মাইলফলক, কারণ ডায়ানার পর কেট মিডলটনের মাধ্যমেই সাধারণ ঘরের কেউ রাজপরিবারের রাজবধূ হিসেবে প্রবেশ করলেন।
ফ্যাশন এবং বিয়ের রাজকীয় পোশাক: কেট মিডলটনের বিয়ের পোশাকটি আজও ফ্যাশন প্রেমীদের কাছে একটি আইকন। সারা বার্টনের ডিজাইন করা আলেকজান্ডার ম্যাককুইন ব্র্যান্ডের এই গাউনটি ছিল সাদা এবং হাতির দাঁতের রঙের (ivory) সংমিশ্রণ। এতে হাতে তৈরি সূক্ষ্ম লেসের কাজ ছিল, যা ব্রিটিশ রাজকীয় আভিজাত্যকে ফুটিয়ে তুলেছিল। এই পোশাকটির দাম ছিল আনুমানিক ৪ লাখ ৩৪ হাজার ডলার।
খরচের খতিয়ান ও আড়ম্বর: এই বিয়ের মোট বাজেট ছিল প্রায় ৩৪ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছিল নিরাপত্তার পেছনে। তবে বিয়ের কেকটি ছিল আলোচনার তুঙ্গে। আট স্তরের এই বিশাল ফ্রুট কেকটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল কয়েক লাখ ডলার। বিয়ের পর বাকিংহাম প্রাসাদে আয়োজিত রাজকীয় ভোজ এবং সান্ধ্যকালীন পার্টিতে অতিথিদের জন্য ছিল বিশ্বের সেরা সব খাবার ও পানীয়।
অ্যাঞ্জেলাবেবি ও হুয়াং শিয়াওমিং
পাশ্চাত্যে যেমন কিম কার্দাশিয়ান তার বিলাসবহুল জীবনযাত্রার জন্য পরিচিত, প্রাচ্যে অর্থাৎ চীনে ঠিক তেমনি এক নাম অ্যাঞ্জেলাবেবি। ২০১৫ সালে চীনের এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও মডেল যখন অভিনেতা হুয়াং শিয়াওমিংকে বিয়ে করেন, তখন সেই অনুষ্ঠানটি আক্ষরিক অর্থেই ইন্টারনেটে ঝড় তুলেছিল।
সাংহাই প্রদর্শনী কেন্দ্রের রূপান্তর: তাদের বিয়ের ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল সাংহাই প্রদর্শনী কেন্দ্রকে। বিশাল এই জায়গাটিকে সাজাতে ব্যবহার করা হয়েছিল হাজার হাজার ফুল এবং অত্যাধুনিক আলোকসজ্জা। পুরো ভেন্যুটি একটি রূপকথার দুর্গের মতো মনে হচ্ছিল।
ডিজাইনার গাউন ও ১০ ফুটের কেক: অ্যাঞ্জেলাবেবি তার বিয়ের দিন যে কাস্টম মেইড গাউনটি পরেছিলেন, সেটি ছিল বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড ডিওর (Dior)-এর তৈরি। এই গাউনটি তৈরি করতে কারিগরদের সময় লেগেছিল দীর্ঘ ৫ মাস। এর পেছনে ছিল কয়েকশ ফুটের সাটিন এবং অর্গানজা কাপড়। শুধু পোশাকই নয়, তাদের বিয়ের কেকটি ছিল ১০ ফুট লম্বা, যা তৈরি করতে শেফদের পুরো এক মাস সময় লেগেছিল। এই কেকের ডিজাইন করা হয়েছিল একটি বিশালাকার ঘূর্ণায়মান ঘোড়ার গাড়ির (Carousel) আদলে।
২০০০ অতিথি এবং বিলাসবহুল উপহার: এই বিয়েতে উপস্থিত প্রায় ২০০০ অতিথির প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছিল একটি করে দামী গিফট ব্যাগ এবং একটি করে ব্র্যান্ড নিউ মোবাইল ফোন। বিয়ের এই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মোট খরচ ছিল প্রায় ৩১ মিলিয়ন ডলার। চীনের মতো দেশেও এত বিশাল অঙ্কের বিয়ে এর আগে কেউ দেখেনি, যা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল।
মাইকেল জর্ডান ও ইভেট প্রিয়েটো: বাস্কেটবল কিংবদন্তির দ্বিতীয় বিয়ে
বাস্কেটবল বিশ্বের ঈশ্বর বলা হয় মাইকেল জর্ডানকে। ২০১৩ সালে তিনি যখন মডেল ইভেট প্রিয়েটো-কে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখনই বোঝা গিয়েছিল এটি কোনো সাধারণ অনুষ্ঠান হবে না। ফ্লোরিডার পাম বিচে আয়োজিত এই বিয়েটি ছিল ক্রীড়া ও বিনোদন জগতের তারকাদের এক বিশাল মিলনমেলা।
বিশাল ভেন্যু ও তারকাখচিত অতিথি: জর্ডানের বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন বাস্কেটবল ও হলিউডের নামী-দামী সব তারকারা। বিয়েতে প্রায় ৫০০ অতিথি গির্জায় উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু আসল চমক ছিল রিসেপশনে। সেখানে যোগ দিয়েছিলেন আরও ১৫০০ জন অতিথি। অনুষ্ঠানের জন্য পাম বিচে একটি বিশাল তাবু তৈরি করা হয়েছিল, যার আয়তন ছিল প্রায় ৪০,০০০ বর্গফুট যা ছিল তৎকালীন সময়ের রেকর্ড।
বিনোদন ও জাঁকজমক: জর্ডান তার বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করতে বিনোদনের কোনো কমতি রাখেননি। গ্র্যামি জয়ী জনপ্রিয় শিল্পী উশার (Usher) এবং রবিন থিক সেখানে লাইভ পারফর্ম করেছিলেন। ইভেট প্রিয়েটো পরেছিলেন জে’আটন কুচার (J’Aton Couture) ব্র্যান্ডের সিল্কের তৈরি একটি গাউন, যা হাজার হাজার সোয়ারোভস্কি ক্রিস্টাল দিয়ে খচিত ছিল। এই বিয়ের আনুমানিক ব্যয় ছিল প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার। জর্ডান তার জীবনের দ্বিতীয় এই বিয়েটিকে পূর্ণতা দিতে অর্থের কোনো কার্পণ্য করেননি।
লোলিতা ওসমানোভা ও গাসপার অ্যাভদল্যান: হলিউড স্টাইলে রাশিয়ার আভিজাত্য
তালিকায় সবশেষে রয়েছে রাশিয়ার দুই অতি-ধনকুবের পরিবারের সন্তানদের বিয়ে। ২০১৭ সালে লোলিতা ওসমানোভা এবং গাসপার অ্যাভদল্যানের বিয়েটি কেবল খরচ নয়, বরং ভেন্যু নির্বাচনের কারণেও সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।
অস্কারের ভেন্যুতে বিয়ে: লোলিতা ও গাসপার তাদের বিয়ের জন্য বেছে নিয়েছিলেন লস অ্যাঞ্জেলেসের বিখ্যাত ডলবি থিয়েটার। উল্লেখ্য, এই থিয়েটারেই প্রতি বছর বিশ্ববিখ্যাত অস্কার পুরস্কার প্রদান করা হয়। একটি ব্যক্তিগত বিয়ের জন্য অস্কারের ভেন্যু ভাড়া নেওয়াটা ছিল তৎকালীন সময়ের এক দুঃসাহসিক ও ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত।
ফুলেল সাজ ও লেডি গাগার পারফরম্যান্স: পুরো ডলবি থিয়েটারকে সাজাতে ব্যবহার করা হয়েছিল লাখ লাখ বিদেশি ফুল। বিশেষ করে সাদা গোলাপ দিয়ে পুরো মঞ্চ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, যার পেছনেই ব্যয় হয়েছিল ৫ লাখ ডলারের বেশি। তবে মূল আকর্ষণ ছিল সংগীত আয়োজন। এই বিয়েতে লাইভ গান গাওয়ার জন্য হলিউড সুপারস্টার লেডি গাগা এবং জেসন ডেরুলো-কে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। লোলিতার বিয়ের পোশাকটি ছিল অত্যন্ত ভারী এবং স্বর্ণের সুতোর কাজ করা। এই রাজকীয় বিয়ের মোট ব্যয়ও ছিল প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার।
বিলাসিতা নাকি অপচয়?
বিশ্বের এই ব্যয়বহুল বিয়েগুলো আমাদের দেখায় যে, মানুষের কল্পনা এবং সম্পদের সীমারেখা কতদূর যেতে পারে। কারো কাছে এগুলো স্রেফ অর্থের অপচয় মনে হলেও, অনেকের কাছে এগুলো আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। তবে বিয়ের খরচ যাই হোক না কেন, দিনশেষে দম্পতির ভালোবাসা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাই বিয়ের আসল সার্থকতা।
আপনার কাছে এই ১০টি বিয়ের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে? আমাদের কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না!


















