বাংলার রবিনহুড রঘু ডাকাত

Jan 29, 2026

ছোটবেলা ইংল্যান্ডের রবিনহুড সিরিয়ালটা বেশ পছন্দের ছিল। মন দিয়ে দেখতাম। দেখতাম রবিনহুড বড়লোক জমিদারদের কাছ থেকে সম্পদ ডাকাতি করে সাধারণ মানুষের কাছে বিলিয়ে দিচ্ছে। বেশ থ্রিলিং ছিল সিরিয়ালটা। কিন্তু এমনই এক জনদরদি এক মানুষ ছিল বাংলায়। আর সেই মানুষ ছিল রঘুনাথ ঘোষ ওরফে কিংবদন্তি রঘু ডাকাত। রঘু ডাকাতের নাম শুনলেই মনে ভেসে ওঠে সেই ছোটবেলায় শোনা ডাকাতদের চিৎকার, লাঠিবাহিনীর আক্রমণ, ভয়, আতংক, আর একটা মুখাবয়ব যা দেখলে রক্ত হীম হয়ে যায়। ভয় আর আতংক মিশ্রিত সেই চরিত্র হল রঘু ডাকাত,যার নাম শুনলে ইংরেজ আমলে সত্যি সত্যি বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত।

বাংলার রবিনহুড - কিংবদন্তি রঘু ডাকাত

আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে, উনিশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, যখন বাংলার মাটি ইংরেজ কোম্পানির পায়ের তলায় পিষ্ট হচ্ছে, নীলকরদের অত্যাচারে কৃষকদের দিনরাত ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, তখন একটা নাম ছড়িয়ে পড়ল গাঁয়ে-গঞ্জে রঘু ডাকাত। এ নাম শুনলে ধনী জমিদারদের ঘুম হারাম হয়ে যেত, আর গরীবের মুখে ফুটে উঠত এক অদ্ভুত হাসি। কত মানুষকে যে সে সাহায্য করেছে তার ইয়ত্তা নেই। আবার কত যে জমিদারের ঘর খালি করেছে রঘু- তার হিসাব ও প্রায় অজানা।

রঘু ছিল না কোনো সাধারণ চোর-ডাকাত; সে ছিল জীবন্ত কিংবদন্তি, যার জীবনের গল্পে মিশে আছে প্রতিশোধের আগুন।

রঘুনাথ ঘোষ এটাই ছিল তার আসল নাম। জন্ম হয়েছিল হুগলির কাছে একটা ছোট্ট গ্রামে, সম্ভবত সপ্তগ্রাম বা দেবীপুরের জঙ্গলময় অঞ্চলে, এক কৃষক পরিবারে। তার বাবা ছিলেন সাধারণ একজন চাষি, যিনি মাটির সঙ্গে লড়াই করে সংসার চালাতেন। কিন্তু উনিশ শতাব্দীর শুরুতে, যখন ইংরেজ নীলকরেরা বাংলার কৃষকদের উপর অত্যাচারের রাজত্ব চালাত, রঘুর বাবা সেই অত্যাচারের শিকার হলেন। নীল চাষ করতে অস্বীকার করায় তাঁকে নীলকুঠি তে ধরে নিয়ে মারধর করা হল, পেটাতে পেটাতে মেরেই ফেলল ইংরেজ সৈনিকরা। শেষে লাশটা বাজারের মাঝখানে টাঙিয়ে দেয়া হল। সব কৃষক যেন জানতে পারে- নীল চাষ না করলে কী পরিণতি হতে পারে।

ছোট্ট রঘুর যার বয়স তখন বারো কি তেরো।বাবার লাশের এমন দশা দেখে দেখে তার মনে একটা আগুন জ্বলে উঠেছিল। শ্মশানে শুইয়ে আগুণ দিল বাবার লাশের মুখে। হয়তো সেই আগুন জ্বলে উঠেছিল রঘুর বুকের ভেতর। সে ছিল লাঠিয়াল বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠি যুদ্ধে দক্ষ। গ্রামের যুবকদের সঙ্গে মিলে সে একটা দল তৈরী করল। প্রথমেই নীলকরদের কুঠি পোড়াতে শুরু করল ওরা, তারপর জমিদারদের বাড়ি লুটতে লাগল দেদারসে। লুটের মাল সে গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দিত। এভাবেই রঘু ঘোষ হয়ে উঠল রঘু ডাকাত এমন একটা নাম যা ধনী জমিদার আর ইংরেজদের মনে কাঁপন ধরিয়ে দিত।

রঘু ডাকাতের দল ও তাঁদের কঠোর নিয়মাবলী

তার সঙ্গীসাথীরা ছিল তার মতোই যুবক, যারা ইংরেজ অত্যাচারে জর্জরিত। তার ভাই বিধু ভূষণ ঘোষ ছিল তার ডান হাত দুই ভাই মিলে ডাকাত গ্যাং গড়ে তুলল। অন্যান্য সদস্যদের নাম ইতিহাসে খুব একটা লেখা নেই, কিন্তু তারা সবাই ছিল দেবীপুরের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা যোদ্ধা। তাদের নিয়ম ছিল কড়া। কখনো গরীব, বুড়ো, মেয়ে বা শিশুকে আঘাত করা যাবে না। লুটের মাল থেকে তারা নিজেরা রাখত কম, বেশিরভাগ গরীব গ্রামবাসীদের দিয়ে দিত। এজন্য গরীবরা তাকে দেবতার মতো পুজো করত, পুলিশ খুজতে এলে লুকোনোর যায়গা দেখিয়ে দিত যেন রঘু নির্বিঘ্নে পালাতে পারে। আর রঘুও সুযোগ পেলেই হাপিশ হয়ে যেত।

রঘু ডাকাতের সিগনেচার স্টাইল

রঘু ডাকাতির আগে জমিদারদের আগাম চিঠি পাঠাত 'অমুক তারিখে অমুক সময়ে তোমার বাড়িতে আসছি, ইতি রঘু ডাকাত'। এটা ছিল তার সিগনেচার স্টাইল। একবার নৈহাটির জমিদার বিনোদ বাবু বন্ধুদের সাথে বাগান বাড়িতে আমোদ ফুর্তি করছিলেন। সেখানে মদের নেশায় চুর হয়ে সে বলেই বসল- 'আমার তল্লাটে রঘু ডাকাত ঢুকতে পারবেনা।' এই কথাটা সেদিন এমনভাবে চাউর হল যে রঘুর কানে ও চলে গেল। আর রঘু তো এটাকে নিজের একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে ফেলল। কদিন পরেই সে চিঠি পাঠাল জমিদারকে। বলল- 'অমুক তারিখ অমুক সময়ে বাড়ি লুট হবে- তৈরী থেকো- ইতি রঘু'

চিঠি পেয়েই তো হুশ ফিরল জমিদার বিনোদ ঘোষালের। কী করা যায়? জানানো হল পুলিশকে। পুলিশ ও তখন কোমর বেঁধে রঘুকেই খুজে ফিরছে। স্বয়ং পুলিশ অফিসার দূর্গাচরণ চক্রবর্তী নিজে রঘুর আসার দিনে পাহারায় বসলেন। কিন্তু কয়েকদিন পাহাড়া দিলেও রঘুর টিকির দেখাও পাওয়া গেলনা। এদিকে হুট করেই একজন লোক বিলাতি গাড়ি চেপে জমিদারের বাগান বাড়িটাই কিনতে এল। পুলিশ সহ সেই লোককে জমিদারবাবু পুরো বাড়ি ঘুরে দেখালেন। পুরোটা দেখে টেখে জমিদারবাবুকে লোকটা দিল ১০০ টাকা বায়নার জন্য। এরপর সেই লোক চলেও গেল।

এদিকে এই ঘটনার পর রঘুর দেখা না পেয়ে জমিদারের পাহারাও ঢিল হয়ে গেছে। আর এমনই এক ঢিলেঢালা দিনে রঘু এসে লুট করল বিনোদ ঘোষালের বাগানবাড়ি। পুরো বাড়ি ফাঁকা করে নিয়ে গেল রঘু। ফেলে রেখে গেল বিনোদ বাবু সহ সব লাঠিয়ালের হাত পা বাঁধা শরীর।

পরদিন বিনোদ বাবু চিঠি পেলেন: 'আমার আতিথেয়তা কেমন লাগল? আপনার কাছে আমার একশো টাকা রয়ে গেছে। ওটা রেখে দেবেন। আপনার সম্পদ আমি আপনার প্রজাদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছি। ধন্যবাদ- ইতি রঘু'

এর মানে রঘু ডাকাত সেদিন ঠিকই বাগান বাড়িতে গিয়েছিল- তবে ছদ্মবেশে।

এই ঘটনা সেই আমলে কলকাতায় হইচই ফেলে দিয়েছিল। এখনকার হিসেবে যেটাকে আমরা বলি- ভাইরাল হওয়া। তেমনই আরকি।

রঘু ডাকাত ও মানবিকতার কিছু অনন্য উদাহরণ

আরেকবার- রঘু ডাকাতের দল যখন ডাকাতি করে বেড়াত, তখন এক গরিব ব্রাহ্মণের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেই ব্রাহ্মণ খুব দরিদ্র ছিলেন, কন্যার বিয়ে দিতে হবে কিন্তু টাকা-পয়সার খুব অভাব। ব্রাহ্মণের কাছে যা কিছু ছিল, সবই তিনি মেয়ের বিয়ের জন্য জোগাড় করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু যথেষ্ট হচ্ছিল না। বিয়েতে পুরো পাঁচশো টাকা লাগবে- যোগাড় না হলে পাত্র পক্ষ বিয়েতে বসবে কিনা সেই হিসেব কষতে কষতে দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করছিলেন সেই ব্রাহ্মণ লোকটা।

এক রাতে রঘুর দল ডাকাতি করতে গিয়ে সেই ব্রাহ্মণের বাড়িতে পৌঁছায়। ব্রাহ্মণ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সব কিছু দিয়ে দেন যা ছিল তাই। কিন্তু রঘু দেখলেন, বাড়িতে কোনো মূল্যবান জিনিসই নেই, শুধু কিছু পুরনো বাসন-কোসন আর সামান্য কিছু টাকা-পয়সা। ব্রাহ্মণ কাঁদতে কাঁদতে বললেন যে এই টাকাগুলো মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো, এটা নিলে তার মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাবে।

রঘু ডাকাতের মনে দয়া হল। তিনি সব ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন-
“আমি ডাকাত, কিন্তু ব্রাহ্মণের অপমান করি না। তোমার মেয়ের বিয়ের জন্য যা দরকার, আমি নিজে দেব।”

রঘু তার দলবল নিয়ে চলে গেলেন। কিছুদিন পর ব্রাহ্মণের বাড়িতে একটা বড় থলে এসে পৌঁছাল তাতে প্রচুর সোনা-রুপো, টাকা আর বিয়ের জন্য দরকারি সব জিনিস। সঙ্গে একটা চিঠি-

“এটা তোমার ঋণ নয়, এটা আমার ঋণ শোধ। আমি যে দিন তোমার বাড়িতে এসেছিলাম, সেদিন আমি তোমার কাছ থেকে কিছু নিতে পারিনি। কিন্তু ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ নিয়েছি। আজ সেই আশীর্বাদের বিনিময়ে এই ঋণ শোধ করলাম।”

ব্রাহ্মণ অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বুঝলেন এটা রঘু ডাকাতের কাজ। পরে বিয়ে হয়ে গেল সুখে-শান্তিতে। এই ঘটনার পর থেকে গরিব মানুষের মধ্যে রঘু ডাকাতকে আরও বেশি সম্মান করতে শুরু করল। বলতে লাগল, “রঘু ডাকাত ধনীদের লুট করে, কিন্তু গরিবের ঋণ শোধ করে দিয়ে যায়।”

আরেকবার শীতের শেষ রাতে, মাঘ মাসের কুয়াশায় ঢাকা এক গ্রামে বড়সড় নীলকর সাহেবের বাংলোতে ডাকাতির পরিকল্পনা করে রঘু ডাকাত। সেই সাহেব ছিল স্থানীয় কৃষকদের ওপর অত্যাচারের জন্য কুখ্যাত নীলচাষের নামে জোরজুলুম করতো, খাজনা না দিতে পারলে মারধর করতো। খুন ও করে ফেলতে দ্বিধা করতোনা। এই খবর রঘুর কানে আগেই পৌঁছেছিল।

সেদিন রাতে রঘু তার দল নিয়ে বাংলোর পেছনের আমবাগান দিয়ে ঢুকে পড়ল। কুয়াশায় হাত দশেক দূরের কিছু দেখা যায় না। পাহারারত দু’জন লাঠিয়ালকে সে নিজে কথা বলে বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। নিজেকে পথভোলা মাঝি বলে পরিচয় দিয়ে সুযোগ বুঝে তার সঙ্গীরা নীরবে পাহারাদারদের অস্ত্র কেড়ে নেয়। কোনো চিৎকার নেই, কোনো রক্তপাত নেই সবকিছু যেন ছায়ার মতো ঘটে যাচ্ছে।

বাংলোর ভেতরে ঢুকে তারা সাহেবের লোহার আলমারি খুলে ফেলল। সেখানে ছিল রুপোর বাসন, সোনার চেন, আর নগদ টাকা। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, রঘু শুধু সম্পদ নেয়নি সে নীলচাষিদের কাছ থেকে জোর করে আদায় করা খাজনার হিসাবের খাতাগুলোও আগুনে পুড়িয়ে দিয়ে গেল। যাওয়ার আগে সাহেবের টেবিলে রেখে যায় একটি চিঠি-
“অন্যায়ের ধন বেশিদিন টেকে না।”

পরদিন সকালে সাহেব ক্ষতির হিসাব করতে গিয়ে দেখেন, টাকা-গয়না গেছে ঠিকই, কিন্তু গ্রামের কয়েকজন দরিদ্র চাষির ঘরের সামনে রহস্যজনকভাবে কিছু মুদ্রা আর চালের বস্তা পড়ে আছে। কে দিল, কীভাবে দিল কেউ জানে না। জিনিসগুলো যে রঘুই রেখে এসেছিল-সেটা নিশ্চয়ই আর বলতে হচ্ছেনা।

ছদ্মবেশে পুলিশকে নাজেহাল

ইংরেজ সরকার রঘুকে ধরার জন্য পাগল হয়ে উঠল। জমিদাররা সবাই মিলে একাট্টা হল রঘুর বিরুদ্ধে। কিন্তু কিছুতেই রঘুর টিকির দেখাও পাওয়া যায়না। ১৮৩০ সালে থাগি অ্যান্ড ডাকোইটি ডিপার্টমেন্ট গঠন করল, তার মাথায় মোটা টাকার পুরষ্কার ঘোষণা হল। নদীয়া, হুগলি, বর্ধমান সব জায়গায় পুলিশ ছড়িয়ে পড়ল। নৈহাটির ওসি দুর্গাচরণ চক্রবর্তী পাগল হয়ে গেলেন রঘুর অত্যাচারে।নৈহাটি থানার দারোগাবাবু রঘু ডাকাতকে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে পুরস্কার ঘোষণা করা হল, জীবিত বা মৃত ধরে দিতে পারলেই পুরষ্কার। থানায় অতিরিক্ত পাহারা বসানো হয়েছে। রঘুকে ধরতে না পারলে দারোগার মান-সম্মান সব যাবে। এমন সময় একদিন রঘু ডাকাতের নামে একটা চিঠি এল দারোগার কাছে। চিঠিতে লেখা-
“দারোগা বাবু, আমি রঘু ডাকাত। আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসছি। প্রস্তুত থাকুন।”

দারোগা তো হতভম্ব! এত বড় সাহস! তিনি তৎক্ষণাৎ থানায় জোরদার পাহারা বসালেন, সিপাই-কনস্টেবলদের সতর্ক করে দিলেন কোনো অচেনা লোক এলে ধরে ফেলবে। কিন্তু কয়েকদিন কেটে গেল, রঘু আর এল না। দারোগা ভাবলেন, হয়তো ভয় পেয়ে পালিয়েছে।

এর কিছুদিন পর এক সকালে থানায় এক জেলে এল। হাতে দুটো বড় বড় রুই মাছ ঝুলিয়ে। দারোগা বাবু সাথে সাথে পাকড়াও করল জেলেকে। জেলে বলল, “জমিদারবাবু পাঠিয়েছেন।” সঙ্গে একটা চিঠি খুলে দেখালো। চিঠিতে লেখা-
“দারোগাবাবু, পৌত্রের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে আমার পুকুরে মাছ ধরেছিলাম। আপনি আসতে পারবেন না জানিয়েছিলেন। তাই দুটি মাছ আপনার জন্য লোক মারফত পাঠালাম। লোকটি আমার বিশ্বস্ত প্রজা।”

দারোগা খুব খুশি হলেন। ভাবলেন, জমিদারের সৌজন্য। জেলেকে দু’টাকা বকশিশ দিয়ে বিদায় করলেন, মাছ দুটো নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।

আরও কয়েকদিন পর আবার একটা চিঠি এল দারোগার কাছে এবার লাল কালিতে লেখা, রঘু ডাকাতের স্বাক্ষর। চিঠিতে লেখা-

“দারোগা বাবু, আপনাকে কথা দিয়েছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে আসব। সেদিন দেখা করে এসেছি। দ্বিতীয়বার দেখেও তো আমাকে চিনতে পারলেন না। মাছ কেমন খেলেন? বখশিশের জন্যে অনেক ধন্যবাদ।”

দারোগা চমকে উঠলেন! বুঝলেন, সেই জেলে-ই ছিল রঘু ডাকাত নিজে! মুখোশ পরে বা ছদ্মবেশে থানায় ঢুকে মাছ পৌঁছে দিয়ে চলে গেছে, আর দারোগা তাকে চিনতেই পারেননি। থানার সবাই সতর্ক ছিল, কিন্তু রঘুর এমন দুঃসাহস ও চতুরতা যে কেউ সন্দেহ করেনি।

আধ্যাত্মিক পরিবর্তন - রঘু ডাকাত ও সাধক রামপ্রসাদ

অন্ধকার জঙ্গলের মাঝে, হুগলি নদীর তীরে একটা পোড়ো মন্দিরে পড়ে ছিল একটা পুরনো কালীমূর্তি। কেউ পূজা করত না, কেউ ভয়ে কাছে যেত না। সেই সময় রঘুর মনে একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। রাতের পর রাত ঘুম আসত না।

এক রাতে, গভীর ঘুমের মধ্যে রঘু স্বপ্ন দেখল। এক ভয়ঙ্কর রূপিণী নারী তার সামনে দাঁড়িয়ে। জিভ বার করা, গলায় মুণ্ডমালা, হাতে খাঁড়া। চোখ দুটো যেন আগুন। সেই দেবী বললেন,

“রঘু! আমি তোর মা কালী। জঙ্গলে আমার মূর্তি পড়ে আছে। তুই আমাকে জাগিয়ে তোল। প্রাণ প্রতিষ্ঠা কর। আমি তোকে শক্তি দেব। যা করবি, আমি রক্ষা করব।”

স্বপ্ন ভাঙতেই রঘু দেরি করল না। দলের লোকদের নিয়ে জঙ্গলে গেল। সেই পোড়ো মূর্তি খুঁজে বের করে পরিষ্কার করল। তন্ত্রমতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করল। তারপর থেকে শুরু হল মা কালীর পূজা।

প্রতি কার্তিক অমাবস্যায় রঘু নিজের হাতে পূজা করত। ভোগে দিত পোড়া ল্যাটা মাছ যেটা তার নিজের প্রিয় ছিল। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে সবাই মিলে সেই ভোগ খেত। বিশ্বাস ছিল, মা কালী আশীর্বাদ করলে কেউ ধরতে পারবে না।

কিন্তু পূজার একটা ভয়ঙ্কর দিকও ছিল। রঘু নরবলি দিত। রাতের অন্ধকারে রাস্তায় যাকে পেত, তাকে ধরে এনে বলি দিত মায়ের পায়ে। শক্তি লাভের জন্য, তন্ত্রসাধনার জন্য।

এমনই এক অমাবস্যার রাতে দলের লোকেরা রাস্তা থেকে একজন সাধুকে ধরে আনল। কারণ রঘু সেদিন আর কোন বলি পায়নি। সাধারণত ডাকাতি করতে গেলে বাড়ির কোন পুরুষকে ধরে নিয়ে আসত বলির জন্যে। সেদিন পায়নি। এজন্যেই সে বলেছিল জঙ্গল থেকে কাউকে তুলে নিয়ে আসতে। কিন্তু যে সাধুকে নিয়ে এল রঘুর দল-সে বলল, “বলি দেওয়ার আগে আমার শেষ ইচ্ছে দেবীর সামনে একটা গান গাইব।”
রঘু রাজি হল। সাধু বলিকাষ্ঠে বসে গাইতে লাগলেন-
“তিলেক দাঁড়া ওরে শমন, বদন ভরে মাকে ডাকি...
মা গো, আমায় নিয়ে যা তোর কোলে...”

গান শুনে রঘুর হুশ উড়ে গেল। সে দেখল বলির জায়গায় সাধুর বদলে দেখল খোদ মা কালী বসে আছে! জিভ বার করা, রক্তচক্ষু, কিন্তু চোখে করুণা। দেবী যেন বলছেন “আমি নিজেই তোর বলি হয়ে দাঁড়িয়েছি। আর নরবলি হবেনা !”

সাধুর পায়ে পড়ে রঘু কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চেয়েছিল। সেই রাত থেকে নরবলি প্রথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যে সাধুর জন্যে এটা সম্ভব হয়েছিল তিনি হলেন বিখ্যাত কালী সাধক ও শ্যামা সঙ্গীত রচয়িতা রামপ্রসাদ সেন কালীকীর্তনের মহান রচয়িতা রামপ্রসাদ, যাঁর গান আমরা রামপ্রসাদী সঙ্গীত হিসেবে চিনি।

শোনা যায় রঘু এর পর ডাকাতি ছেড়ে দিয়েছিল। সে যে মন্দিরে কালী পুজো করত-সেই মন্দিরের নাম বিখ্যাত সিদ্ধেশ্বরী কালী বাড়ি। পশ্চিমবঙ্গের হুগলিতে এই কালী মন্দির বেশ প্রসিদ্ধ। এছাড়াও অনেক গুলো ডাকাতকালী মন্দির রঘু প্রতিষ্ঠা করেছিল বলে জনশ্রুতি আছে।

আবার এমন ও অনেকে বলে- রঘু ডাকাত আসলে একজন ছিলেন না। অনেকেই রঘু ডাকাত নামে ডাকাতি করেছে। রঘু ডাকাত নামটা একটা ট্রেডমার্ক হয়ে গিয়েছিল। কালো লম্বা দোহারা গড়নের রঘুর নামে অনেক ডাকাত সেই সময় ডাকাতি করেছিল-যারা ধনী জমিদার আর ইংরেজদের ধনসম্পদ সাধারণ মানুষকে বিলিয়ে দেয়ার ব্রত করেছিল। আর জন্যেই রঘু ডাকাত হয়ে গেছে কিংবদন্তী।

তথ্যসূত্র: বাংলার ডাকাত - যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত।
An article about Raghu dacoit and history of colonial india | Robbar

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.