মেজর মোহিত শর্মা - ভারতের সবচেয়ে সাহসী স্পাই

বিশ্বের সামরিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকে, যা কেবল যুদ্ধের বিবরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। যে নামগুলো শুনলে একদিকে যেমন শত্রুশিবিরের বুকে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে যায়, অন্যদিকে প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের হৃদয় এক গভীর গর্ব ও শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইতিহাসে তেমনই এক মহাকাব্যিক ও কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব হলেন মেজর মোহিত শর্মা, অশোক চক্র (মরোণোত্তর), সেনা মেডেল (AC, SM)।
তিনি কেবল ভারতীয় সেনাবাহিনীর এলিট '১ প্যারা স্পেশাল ফোর্সেস' (1 Para SF)-এর এক অত্যন্ত দক্ষ ও দুঃসাহসী অফিসার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে রণকৌশলী, আন্ডারকভার এজেন্ট এবং ছদ্মবেশে শত্রু নিধনের এক অপার জাদুকর। সামরিক মহলে ও সহযোদ্ধাদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘The Spy in Uniform’ নামে।
শত্রুর সীমানার ভেতরে ঢুকে, তাদেরই ভাষায় কথা বলে, তাদের সাথে এক থালায় খাবার খেয়ে কীভাবে তাদের চক্রান্ত ভেস্তে দিতে হয় সেটি তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন। আজ আমরা এই মহান বীরের প্রারম্ভিক জীবন, অসীম সাহসিকতাপূর্ণ সামরিক ক্যারিয়ার, ছদ্মবেশী ‘ইফতিখার ভাট’ হয়ে ওঠার রোমহর্ষক ঘটনা এবং কুপওয়ারার বরফাবৃত জঙ্গলে তাঁর সেই শেষ ঐতিহাসিক লড়াইয়ের বিস্তারিত গল্প তুলে ধরব।
প্রারম্ভিক জীবন ও স্বপ্নের উড্ডয়ন (১৯৭৮-১৯৯৫)
১৯৭৮ সালের ১৩ জানুয়ারি হরিয়ানার রোহতকে এক ঐতিহ্যবাহী ও দেশপ্রেমিক পরিবারে জন্ম নেন মোহিত শর্মা। তাঁর বাবা শ্রী রাজেন্দ্র প্রসাদ শর্মা এবং মা শ্রীমতী সুশীলা শর্মা ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে সঠিক মূল্যবোধ, নীতি ও শৃঙ্খলার শিক্ষায় বড় করে তোলেন। মোহিতের শৈশবের বড় একটি সময় কাটে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে। গাজিয়াবাদ শহরের ‘ডিএভি পাবলিক স্কুল’ (DAV Public School, Sahibabad) থেকে তিনি তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
ছোটবেলা থেকেই মোহিতের ব্যক্তিত্বে ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ। বন্ধুমহলে তিনি পরিচিত ছিলেন 'মাইক' (Mike) নামে। তিনি যেমন পড়াশোনায় ভালো ছিলেন, তেমনই খেলাধুলা, সুইমিং এবং গিটার বাজানোতেও ছিলেন পারদর্শী। কিন্তু পাঠ্যবইয়ের পাতা কিংবা সাধারণ সুরের চেয়ে তাঁর হৃদয়কে বেশি আলোড়িত করত মাতৃভূমির সেবা ও তেরঙ্গা পতাকার মর্যাদা রক্ষা করার এক অদম্য তাগিদ।
মেজর মোহিতের চরিত্রেরই একটি মূল দিক ছিল তাঁর ইস্পাত কঠিন জেদ যে কাজটি তিনি একবার হাতে নিতেন, তা শেষ না করা পর্যন্ত তিনি ক্ষান্ত হতেন না। এই অদম্য জেদ ও অকুতোভয় মানসিকতাই তাঁকে স্কুল জীবনের পড়া শেষ করার পরপরই ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক শিক্ষালয় ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি (NDA)-এর দিকে চালিত করে।
এনডিএ থেকে '৫ মাদ্রাজ': সেনা জীবনের শুভসূচনা (১৯৯৫-১৯৯৯)
১৯৯৫ সালে মোহিত শর্মা কঠোর প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি (NDA)-র ৯৫তম কোর্সে ভর্তি হন। এনডিএ-তে তাঁর আলফা (Alpha) স্কোয়াড্রনের অংশ হিসেবে ক্যাডেট মোহিত শর্মা দ্রুতই নিজের শারীরিক সক্ষমতা ও নেতৃত্বের গুণাবলির পরিচয় দেন। এনডিএ-র তিন বছরের কঠোর শারীরিক ও মানসিকভাবে চূর্ণ করে দেওয়া ট্রেনিং সফলভাবে শেষ করার পর তিনি ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমি (IMA)-তে যোগ দেন।
ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি (NDA) ─► ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমি (IMA) ─► '৫ মাদ্রাজ' রেজিমেন্টে কমিশন (১৯৯৯) ─► প্যারা এসএফ-এর আহ্বান
১৯৯৯ সালে আইএমএ থেকে পাস আউট হওয়ার পর মোহিত শর্মা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যবাহী '৫ মাদ্রাজ' (5 Madras) পদাতিক রেজিমেন্টে লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। তাঁর প্রথম পোস্টিং ছিল অন্ধ্রপ্রদেশের হায়দ্রাবাদে। এরপর তাঁর ব্যাটালিয়ন জম্মু-কাশ্মীরের সীমান্ত ও কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি এলাকায় স্থানান্তরিত হয়।
সাধারণ সামরিক ডিউটি বা ব্যারাকে বসে শান্তিপ্রিয় জীবন কাটানো মোহিতের স্বভাবের সাথে মেলেনি। তিনি জানতেন, তাঁর ভেতরে যে আগুন জ্বলছে, তার জন্য প্রয়োজন আরও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, আরও অনেক বেশি বিপজ্জনক রাজপথ। প্রতিপক্ষের চোখের দিকে চোখ রেখে ছায়াযুদ্ধ লড়ার জন্য তিনি নিজের লক্ষ্য স্থির করেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বিপজ্জনক ও অভিজাত ইউনিট 'স্পেশাল ফোর্সেস'।
‘১ প্যারা (স্পেশাল ফোর্সেস)’: লাল বেরেটের রক্তিম আহ্বান
ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাশুট রেজিমেন্টের অধীনে থাকা স্পেশাল ফোর্সেস (Para SF) ব্যাটালিয়নগুলোকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম সেরা ও মারাত্মক কমান্ডো দল। এর মধ্যে ‘১ প্যারা (SF)’ ব্যাটালিয়নটি 'রেড ডেভিলস' (Red Devils) নামে খ্যাত, যাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য শত বছরের পুরনো।
২০০০ সালে মোহিত শর্মা স্বেচ্ছায় প্যারা স্পেশাল ফোর্সেসের জন্য আবেদন করেন এবং বাছাই প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।
প্যারা এসএফ-এর প্রবেশিকা পরীক্ষা (Probation)
প্যারা এসএফ-এর তিন মাসের ‘প্রোবেশন’ বা বাছাই পর্বকে বলা হয় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার চরম সীমা।
প্রতিনিয়ত ৪০-৫০ কেজির ভারী রুকস্যাক (Pithoo) পিঠে নিয়ে একটানা ৪০ থেকে ১০০ কিলোমিটার দৌড়ানো।
প্রচণ্ড শীতের মধ্যে বরফশীতল পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা।
দিনের পর দিন ঘুমাতে না দিয়ে মানসিক ভারসাম্য পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানো।
প্রায় ৯০% স্বেচ্ছাসেবক এই নরকতুল্য পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। কিন্তু মোহিত শর্মা কেবল এই পরীক্ষায় সফল হননি, বরং নিজের ব্যাচের সেরা পারফর্মার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে অর্জন করেন সেই কাঙ্ক্ষিত ‘মেরুন বেরেট’ (Maroon Beret) এবং বুকের ওপর 'প্যারা ডানায়' (Para Wings) সজ্জিত হন। ২ প্যারা বা ১ প্যারার একজন ক্যালিবার অফিসার হিসেবে তিনি আন্ডারকভার মিশন, গেরিলা আক্রমণ ও আনকনভেনশনাল ওয়ারফেয়ারে (Unconventional Warfare) পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
জম্মু-কাশ্মীরের প্রেক্ষাপট ও 'ছায়াযুদ্ধের' প্রদেয় কৌশল
২০০০-এর দশকের প্রারম্ভে জম্মু-কাশ্মীর উপত্যকা পাকিস্তানি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদী সংগঠন যেমন- লস্কর-ই-তইবা (LeT), জইশ-ই-মুহাম্মদ (JeM) এবং হিজবুল মুজাহিদিনের সহিংসতায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। এসব জঙ্গি গোষ্ঠী পাহাড়ি জঙ্গল এবং উপত্যকার ঘন বসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আশ্রয় নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাত।
সাধারণ সামরিক অভিযান চালিয়ে পাহাড়ি জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের পুরোপুরি ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কারণ শত্রুরা লোকাল পোশাকে মিশে থাকত এবং তাদের স্থানীয় 'হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স' বা খবরের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী ছিল।
মেজর মোহিত শর্মা বুঝতে পেরেছিলেন, ছায়ায় লুকিয়ে থাকা শত্রুকে খতম করতে হলে সেনাকেও ‘ছায়া’ হয়ে উঠতে হবে। প্রচলিত যুদ্ধের ছক ভেঙে শত্রুর নিজের ভূমিতে ঢুকে তাদের অস্ত্রেই তাদের ঘায়েল করার যে কৌশল, সেটাই ছিল মোহিত শর্মার চিন্তাভাবনার মূল ভিত্তি।

'ইফতিখার ভাট': যখন মেজর নিজেই হলেন জঙ্গি
আন্ডারকভার অপারেশনের ইতিহাসে মেজর মোহিত শর্মার 'ইফতিখার ভাট' চরিত্রটি একটি মাস্টারপিস গল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোনো কর্মকর্তা যে নিজ পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলে, জীবন হাতের তালুতে নিয়ে সরাসরি কুখ্যাত সব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ভেতরে অনুপ্রবেশ করতে পারেন তা এর আগে খুব কমই দেখা গেছে।
রুপান্তর ও প্রস্তুতির চূড়ান্ত অধ্যায়
মেজর মোহিত শর্মা তাঁর শারীরিক চেহারা ও চালচলন পুরোপুরি বদলে ফেলেন।
১. তিনি মুখভর্তি দীর্ঘ দাড়ি ও মাথার অগোছালো চুল বাড়াতে শুরু করেন।
২. স্থানীয় কাশ্মীরি সাধারণ মানুষের মতো ঢিলেঢালা 'পিরান' (Pheran) ও টুপি পরা শুরু করেন।
৩. তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাশ্মীরি ভাষা (Koshur) এবং স্থানীয় উপভাষা ও উচ্চারণরীতি অনুশীলন করেন। তিনি ভাষাটি এতটাই নিখুঁতভাবে রপ্ত করেছিলেন যে, একজন স্থানীয় কাশ্মীরিও তাঁর কথা শুনে বুঝতে পারত না যে তিনি আদতে হরিয়ানার একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান এবং ভারতীয় সেনার অফিসার!
লস্কর ও হিজবুলের ডেরায় অনুপ্রবেশ
‘ইফতিখার ভাট’ নাম নিয়ে তিনি দক্ষিণ ও উত্তর কাশ্মীরের ভূগর্ভস্থ জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোর সাথে সম্পর্ক তৈরি করেন। তিনি নিজেকে একজন অসন্তুষ্ট কাশ্মীরি যুবক হিসেবে তুলে ধরেন, যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়।
তিনি সরাসরি লস্কর-ই-তইবা এবং হিজবুল মুজাহিদিনের আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাডার ও শীর্ষ কমান্ডারদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
অবিশ্বাস্য দুঃসাহসের উদাহরণ: মেজর মোহিত শর্মা ওরফে ‘ইফতিখার ভাট’ দিনের পর দিন জঙ্গিদের গোপন আস্তানায় থেকেছেন। তিনি কুখ্যাত জঙ্গি নেতাদের সাথে একই থালায় বসে খাবার খেয়েছেন, তাদের সাথে বসে সেনার কনভয়ে হামলার পরিকল্পনা এঁকেছেন। অথচ তাঁর পাশে বসে থাকা সশস্ত্র জঙ্গিরা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে, যার সাথে তারা হামলার প্ল্যান করছে, তিনি আদতে ভারতীয় সেনার ১ প্যারা এসএফ-এর দুর্ধর্ষ কমান্ডো!

দুটি লস্কর জঙ্গিকে একা নিকেশ করার রোমহর্ষক সত্য ঘটনা
একবার লস্করের দুই শীর্ষ জঙ্গি ইফতিখার ভাটের (মেজর মোহিত) সাথে দেখা করতে আসে। তারা তাঁকে ভারতীয় সেনার ওপর একটি বড়সড় গ্রেনেড ও আইইডি (IED) হামলার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিল।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে মেজর মোহিত অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় তাদের বলেন যে, এই হামলা সফল করতে হলে তাঁর আরও উন্নতমানের অস্ত্র ও গ্রেনেড প্রয়োজন। জঙ্গিরা যখন তাঁকে বিশ্বাস করে নিশ্চিত মনে অস্ত্র তুলে দিতে যায়, ঠিক সেই মুহূর্তে মোহিত শর্মা তাঁর আসল রূপ ধারণ করেন। চোখের পলক ফেলার আগেই নিজের লুকানো রিভলভার বের করে তিনি মুহূর্তের মধ্যে ওই দুই সশস্ত্র লস্কর জঙ্গিকে গুলি করে খতম করেন এবং সেখান থেকে অক্ষত অবস্থায় সেনার ক্যাম্পে ফিরে আসেন।
এই অসামান্য আন্ডারকভার অপারেশনের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ গোপন নথিপত্র, আস্তানার ম্যাপ ও কোড উদ্ধার করেন। এই সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে ২০০৩-২০০৪ সালে মর্যাদাশীল 'সেনা মেডেল' (Sena Medal - Gallantry) প্রদান করে।
সংক্ষেপে মেজর মোহিত শর্মার (AC, SM) জীবনপঞ্জি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
নিচে একটিমাত্র সমন্বিত সারণীর (Table) মাধ্যমে মেজর মোহিত শর্মার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, অর্জন ও সামরিক অবদান তুলে ধরা হলো:
বিষয় / ক্ষেত্র | তথ্য ও বিবরণ | সামরিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য |
পূর্ণ নাম ও পদবি | মেজর মোহিত শর্মা, অশোক চক্র, সেনা মেডেল (Major Mohit Sharma, AC, SM)। | '১ প্যারা (SF)'-এর অন্যতম দুর্ধর্ষ ও আলোচিত কমান্ডো অফিসার। |
জন্ম ও জন্মস্থান | ১৩ জানুয়ারি ১৯৭৮; রোহতক, হরিয়ানা। | গাজিয়াবাদে বেড়ে ওঠা ও ডিএভি পাবলিক স্কুলের কৃতী শিক্ষার্থী। |
সেনাবাহিনীতে কমিশন | ১৯৯৯ সালে '৫ মাদ্রাজ' রেজিমেন্টে কমিশনড; ২০০০ সালে '১ প্যারা (SF)'-এ যোগ। | সাধারণ ইনফ্যান্ট্রি থেকে অভিজাত স্পেশাল ফোর্সেসে আত্মপ্রকাশ। |
ছদ্মবেশী পরিচয় | 'ইফতিখার ভাট' (Iftikhar Bhatt)। | লস্কর ও হিজবুল আস্তানায় অনুপ্রবেশকারী সফল আন্ডারকভার এজেন্ট। |
প্রধান সামরিক সম্মাননা | সেনা মেডেল (২০০৪ - আন্ডারকভার মিশন); অশোক চক্র (২০১০ - মরোণোত্তর)। | শান্তিকালীন সময়ে ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্ব পুরস্কারে ভূষিত। |
ঐতিহাসিক শেষ লড়াই | ২১ মার্চ ২০০৯; কুপওয়ারার হাফুরুদা জঙ্গল অপারেশন (জম্মু-কাশ্মীর)। | চারজন শীর্ষ লস্কর জঙ্গিকে খতম ও নিজের দলের জীবন রক্ষা। |
স্মারক ও অমরত্ব | 'মেজর মোহিত শর্মা রাজেন্দ্র নগর' মেট্রো স্টেশন (গাজিয়াবাদ) ও রাজপথ স্মারক। | ভারতের কোটি কোটি তরুণের হৃদয় ও সামরিক ইতিহাসে চিরন্তন অনুপ্রেরণা। |
কুপওয়ারা অপারেশন ২০০৯: হাভুরুদা জঙ্গলের শেষ রক্তিম মহাকাব্য
২০০৯ সালের মার্চ মাস। উত্তর কাশ্মীরের ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC) সংলগ্ন কুপওয়ারা জেলার হাফুরুদা (Haphruda Forest) জঙ্গল তখন কয়েক ফুট গভীর বরফে ঢাকা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই জঙ্গলটি তার খাড়া পাহাড়ি পথ, ঘন পাইন গাছ ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল।
পাক-অধিকৃত কাশ্মীর (PoK) থেকে সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রবেশ করা লস্কর-ই-তইবার একদল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সন্ত্রাসী এই জঙ্গলের গভীরে আস্তানা গেড়েছিল।
২১ মার্চ ২০০৯। ভোরবেলা থেকেই পুরো হাফুরুদা জঙ্গল ঢাকা ছিল ঘন কুয়াশায়। দৃশ্যমানতা ছিল প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মেজর মোহিত শর্মা তাঁর ছোট কমান্ডো দলটি নিয়ে নিঃশব্দে ট্র্যাকিং করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
কিন্তু উঁচু পাহাড়ি টিলায় সুবিধাজনক অবস্থানে জঙ্গিরা আগে থেকেই অ্যাম্বুশ (Ambush) করে ওত পেতে বসে ছিল।
আকস্মিক হামলা ও ক্লোজ কোয়ার্টার ব্যাটল (CQB)
হঠাৎ করে নিস্তব্ধ জঙ্গল কাঁপিয়ে ওপর থেকে ধেয়ে আসে স্বয়ংক্রিয় এডিকে (AK-47) ও ইউবিজিএল (UBGL) গ্রেনেডের বৃষ্টি। আকস্মিক এই হামলায় মেজর মোহিতের দলের প্রথম সারির কয়েকজন কমান্ডো জওয়ান গুরুতর আহত হন।
ভৌগোলিক প্রতিকূলতা ও আকস্মিকতার কারণে স্পেশাল ফোর্সেসের টিমটি অত্যন্ত কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এই মুহূর্তে পিছু হটা মানেই আহত জওয়ানদের নিশ্চিত মৃত্যু এবং পুরো টিমের ধ্বংস।
মেজর মোহিত শর্মা এক সেকেন্ডও দ্বিধা করেননি। তিনি নিজের পজিশন ছেড়ে উন্মুক্ত বরফের ওপর দিয়ে সরাসরি শত্রুর গুলির সামনে ধেয়ে যান, যাতে জঙ্গিদের মনোযোগ নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়া যায়। অত্যন্ত কাছ থেকে গুলিবিনিময়ে (Close Quarter Battle - CQB) তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দুজন জঙ্গিকে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে খতম করেন।
রক্তে ভেজা ইউনিফর্ম ও আত্মত্যাগের পরাকাষ্ঠা
লড়াই চলাকালীন একটি শত্রুর বুলেট মেজর মোহিতের বুক চিরে ভেতরে ঢুকে যায়। তা ছাড়া গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে তাঁর শরীর মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়। শুভ্র বরফের ওপর ফিনকি দিয়ে ছুটে বের হতে থাকে মোহিতের লাল রক্ত।
শারীরিক যন্ত্রণা যখন সাধারণ কোনো মানুষের সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিল, তখন মোহিত শর্মা রক্তাপ্লুত শরীরে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যান। তিনি অন্য এক আহত কমান্ডো জওয়ানকে নিজের দিকে টেনে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেন এবং আরও একজন ধেয়ে আসা লস্কর জঙ্গিকে নিকেশ করেন।
শেষ আদেশ ও মহাপ্রয়াণ: প্রচুর রক্তক্ষরণে শরীর অবশ হয়ে আসছিল, কিন্তু মেজরের গলার আওয়াজ তখনও ছিল বজ্রের মতো স্পষ্ট। তিনি কমান্ডোদের কভারিং ফায়ার দেওয়ার নির্দেশ দিতে থাকেন এবং চিৎকার করে বলেন, “কভার দাও! একটা জঙ্গিও যেন বেঁচে ফিরে না যায়!”
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের অটোমেটিক রাইফেল থেকে গুলি চালিয়ে তিনি সুনিশ্চিত করেন যেন তাঁর দলের বাকি জওয়ানরা এই মরণফাঁদ থেকে নিরাপদে বেরিয়ে পজিশন নিতে পারে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে বীর সেনাপতি মেজর মোহিত শর্মা দেশের মাটি ও তেরঙ্গা পতাকার কোলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর এই অভাবনীয় পাল্টা আক্রমণ ও আত্মত্যাগের ফলে সেদিন কুপওয়ারা অভিযানে লস্কর-ই-তইবার ৪ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী নিহত হয় এবং ভারতীয় সেনার একটি বড় ইউনিট নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়।
ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে এনডিএ: এক অদম্য সিদ্ধান্তের গল্প
মেজর মোহিত শর্মা যে কেবল ছোটবেলা থেকেই সেনায় যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তা নয়, তিনি অত্যন্ত মেধাবী একজন শিক্ষার্থীও ছিলেন।
পড়াশোনা ও কলেজ জীবন: গাজিয়াবাদের ডিএভি স্কুল থেকে অত্যন্ত ভালো নম্বর নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি মহারাষ্ট্রের শেগাঁও-তে অবস্থিত বিখ্যাত 'শ্রী সন্ত গজাইন মহারাজ কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং' (SSGMCE)-এ ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনে ভর্তি হয়েছিলেন।
স্বপ্নের টানে কলেজ ত্যাগ: ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রথম বর্ষে পড়ার সময় তিনি সফলভাবে এনডিএ-র (NDA) লিখিত পরীক্ষা ও এসএসবি (SSB) ইন্টারভিউ পাস করেন। ভবিষ্যৎ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে একটি সুসংহত ক্যারিয়ারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, প্রথম বর্ষের পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়েই তিনি ১৯৯৫ সালে ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমিতে যোগ দেন।
সুরের জাদুকর ও বহুমুখী প্রতিভা: ‘মাইক’-এর অন্য রূপ
রণক্ষেত্রে শত্রুর সামনে কালভৈরব রূপ ধারণ করলেও, ব্যক্তিগত জীবনে মোহিত শর্মা ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, সৃষ্টিশীল ও সংস্কৃতিমনা এক মানুষ।
সঙ্গীতপ্রীতি: তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ গিটারিস্ট। এছাড়া যেকোনো সুর শুনেই তা মাউথ অর্গানে তুলে নিতে পারতেন। ক্লাসিক্যাল থেকে শুরু করে রক মিউজিক সব ধরনের সুরেই তাঁর দখল ছিল।
খেলার মাঠ ও সাঁতার: তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সাঁতারু ও ট্র্যাকার। এনডিএ-তে থাকাকালীন বিভিন্ন অ্যাথলেটিকস ও সাঁতার প্রতিযোগিতায় তিনি অসংখ্য পদক জয় করেছিলেন।
‘মাইক’ ডাকনামের পেছনের কথা: এনডিএ এবং ক্যাডেটদের মাঝে তিনি 'মাইক' নামে পরিচিত ছিলেন। বন্ধুমহলে গিটার হাতে গান গেয়ে মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশ চাঙ্গা করে তোলার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর।
সেনাবাহিনীর দম্পতি: স্ত্রী মেজর রেশমা শর্মার বীরত্ব
মেজর মোহিত শর্মার ব্যক্তিগত জীবনের একটি অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হলো তাঁর বিবাহিত জীবন।
সেনা দম্পতি: মোহিত শর্মার সহধর্মিণী রেশমা শর্মা নিজেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অফিসার (মেজর) ছিলেন।
পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা: একই পেশায় থাকার কারণে দেশের প্রতি দায়িত্ব এবং ঝুঁকি সম্পর্কে দুজনেরই গভীর সম্যক ধারণা ছিল। মোহিত শর্মার আন্ডারকভার মিশনে থাকার সময় কিংবা দীর্ঘস্থায়ী গোপন অপারেশনে থাকার সময়েও মেজর রেশমা শর্মা অটল মানসিক শক্তিতে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
স্বামীর স্মৃতির আলো: ২০০৯ সালে মোহিত শর্মার বীরগতির পর, মেজর রেশমা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের জীবনের শোক সামলে নিয়ে সেনার পোশাক পরে দেশের সেবা চালিয়ে গেছেন এবং মোহিতের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন।
‘ইফতিখার ভাট’ মিশনের কিছু অপ্রকাশিত ও রোমহর্ষক সত্য
কাশ্মীর উপত্যকায় 'ইফতিখার ভাট' ছদ্মবেশে থাকার সময় মোহিত শর্মা যে ধরনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন, তা আধুনিক সামরিক গোয়েন্দা ইতিহাসের অন্যতম বিরল ঘটনা।
যোগাযোগের গোপন ব্যবস্থা: আন্ডারকভার মিশনে থাকার সময় তিনি সেনাক্যাম্পের সাথে কোনো ডিজিটাল বা রেডিও ডিভাইস ব্যবহার করতেন না, কারণ ধরা পড়ার আশঙ্কা ১০০% ছিল। তিনি নির্দিষ্ট কিছু 'ড্রপ পয়েন্ট' (Dead Drop Points) ব্যবহার করতেন, যেখানে সাংকেতিক চিরকুটে তিনি গোয়েন্দা তথ্য রেখে আসতেন।
মানসিক চাপ ও নিখুঁত অভিনয়: মাসের পর মাস জঙ্গিদের সাথে থেকে তাদের মতো জীবনযাপন করা এবং নিজের মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা ছিল সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ। সামান্যতম ঘুমের ঘোরে বলা কোনো ভুল কথা বা চোখ-মুখের অভিব্যক্তি তাঁর পরিচয় ফাঁস করে দিতে পারত।
ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতির নিখুঁত জ্ঞান: কাশ্মীরি ভাষা শেখার পাশাপাশি তিনি ইসলাম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, স্থানীয় প্রবাদ এবং নামাজের বিভিন্ন নিয়মকানুন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রপ্ত করেছিলেন, যাতে কোনো জঙ্গির মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না জাগে।
কুপওয়ারা অপারেশনের (২০০৯) ক্ষুদ্রাতিক ক্ষুদ্র রণকৌশল
২১ মার্চ ২০০৯-এর হাফুরুদা জঙ্গলের লড়াইটি সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ছিল অত্যন্ত জটিল এবং অসম এক যুদ্ধ।
জঙ্গিদের রণকৌশল: জঙ্গিরা পাহাড়ের ওপর সুবিধাজনক স্থানে 'হাইডআউট' বানিয়ে বসে ছিল এবং তাদের কাছে স্নাইপার রাইফেল ও ইউবিজিএল (Under Barrel Grenade Launcher) ছিল।
ডাইভারশন কৌশল (Diversion Attack): সেনার কমান্ডোরা যখন বরফে আটকে গিয়ে গুলিবর্ষণের মুখে পড়েন, মোহিত শর্মা জানতেন যে কভার ছাড়া এগোলে পুরো টিম শেষ হয়ে যাবে। তাই তিনি নিজের প্রাণের মায়া না করে কভার থেকে বেরিয়ে একা খোলা জায়গায় চলে যান, যাতে জঙ্গিরা তাদের সব গুলি ও মনোযোগ তাঁর দিকে ঘুরিয়ে নেয়।
বুকে আঘাতের পরও লড়াই: বুলেটে পাজর ও বুক ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে লস্করের শীর্ষ স্নাইপার ও কমান্ডারকে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে (খুব কাছ থেকে) ৯ মিলিমিটার পিস্তল দিয়ে গুলি করে হত্যা করেন।
পপ-কালচার, বই এবং মিডিয়ায় মেজর মোহিত শর্মা
মেজর মোহিত শর্মার জীবন কাহিনী ভারতের জাতীয় সংস্কৃতি ও সামরিক সাহিত্যে এক বিশাল জায়গা করে নিয়েছে।
‘ইন্ডিয়াজ মোস্ট ফিয়ারলেস’ (India's Most Fearless): ভারতের প্রখ্যাত প্রতিরক্ষা সাংবাদিক শিব আরুর (Shiv Aroor) এবং রাহুল সিং-এর বিশ্ববিখ্যাত বই 'India's Most Fearless' (প্রথম খণ্ড)-এর একটি পুরো অধ্যায় উৎসর্গ করা হয়েছে মেজর মোহিত শর্মার 'ইফতিখার ভাট' মিশন এবং তাঁর শেষ লড়াইয়ের ওপর। এই অধ্যায়টি ভারতীয় সামরিক সাহিত্যের অন্যতম সর্বাধিক পঠিত কাহিনী।
পডকাস্ট ও মিলিটারি একাডেমি: ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমি (IMA) এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমিতে (NDA) নবীন ক্যাডেটদের মানসিক দৃঢ়তা ও আন্ডারকভার অপারেশনের উদাহরণ হিসেবে মেজর মোহিতের জীবনী পড়ানো হয়।
পর্দায় ফুটে ওঠার গুঞ্জন: ভারতীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন হিট ওয়েব সিরিজ এবং ডিফেন্স ডকুমেন্টারিতে (যেমন 'Avrodh' বা বিভিন্ন মিলিটারি পডকাস্ট) মোহিত শর্মার 'ইফতিখার ভাট' চরিত্রটি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন আন্ডারকভার চরিত্র তৈরি করা হয়েছে।
'মেজর মোহিত শর্মা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট' ও সামাজিক অবদান
মেজর মোহিত শর্মার শহীদ হওয়ার পর তাঁর পরিবার বাবা রাজেন্দ্র প্রসাদ শর্মা, মা সুশীলা শর্মা এবং ভাই মধুর শর্মা এই বীরের স্মৃতিকে স্থায়ী করতে গঠন করেন 'Major Mohit Sharma Memorial Trust'।
মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা: এই ট্রাস্টের মাধ্যমে প্রতি বছর অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য বৃত্তি প্রদান করা হয়।
সেনাবাহিনীতে যোগদানে উৎসাহ: এই ট্রাস্ট নিয়মিত গাজিয়াবাদ ও আশপাশের এলাকার তরুণ-তরুণীদের বিনামূল্যে সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদানের জন্য এসএসবি (SSB) ইন্টারভিউয়ের পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদান করে।
শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো: সীমান্তে শহীদ হওয়া অন্যান্য সৈনিকদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের আইনি বা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কাজেও এই ট্রাস্ট সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে।
কেন তিনি সামরিক ইতিহাসে অমর?
মেজর মোহিত শর্মা কেবল একজন সৈনিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সামরিক কৌশলবিদ।
বেশিরভাগ কমান্ডো কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে লড়াই করেন। কিন্তু মোহিত শর্মা প্রমাণ করেছেন যে, অস্ত্রের চেয়েও বড় শক্তি হলো বুদ্ধি, মানসিক ধৈর্য এবং যেকোনো পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
তিনি দেখিয়ে গেছেন কীভাবে প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বিপজ্জনক আস্তানায় ঢুকে কোনো রক্তপাত ছাড়াই ভেতর থেকে শত্রুকে ধ্বংস করা যায়।
অমরত্ব ও সর্বোচ্চ সম্মান: মরোণোত্তর অশোক চক্র
মেজর মোহিত শর্মার এই অভূতপূর্ব সাহসিকতা, অতুলনীয় নেতৃত্ব ও দেশের জন্য পরম ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালের ২৬ জানুয়ারি সাধারণতন্ত্র দিবসে ভারত সরকার তাঁকে দেশের শান্তিকালীন সময়ের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্ব পদক ‘অশোক চক্র’ (Ashoka Chakra) প্রদান করে।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি প্রতিভা পাতিল এক আবেগঘন পরিবেশে মোহিত শর্মার মাতা-পিতার হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন।
গাজিয়াবাদবাসী ও সমগ্র ভারতের মানুষের শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে গাজিয়াবাদের 'রাজেন্দ্র নগর মেট্রো স্টেশন'-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে “মেজর মোহিত শর্মা রাজেন্দ্র নগর মেট্রো স্টেশন”। এ ছাড়া শহরের রাজপথ ও স্তম্ভে তাঁর বীরত্বগাথা খোদাই করে রাখা হয়েছে। কিন্তু তাঁর আসল স্মারক সংরক্ষিত আছে ১ প্যারা (SF)-এর ঐতিহ্য এবং প্রতিটি ভারতীয় সেনার হৃদয়ে।
মেজরের রণকৌশল ও নেতৃত্বের অনন্য শিক্ষা
মেজর মোহিত শর্মার সামরিক জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি কেবল অস্ত্রের জোরে যুদ্ধ করেননি; তিনি লড়েছিলেন বুদ্ধিমত্তা, মানসিক শক্তি এবং অটল বিশ্বাসের জোরে। তাঁর জীবন থেকে আমরা মূলত ৪টি বড় শিক্ষা পাই:
সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া (Lead from the Front): কুপওয়ারা অপারেশনে অফিসার হয়েও তিনি দলের পেছনে বা নিরাপদ দূরত্বে থাকেননি। বিপদ দেখে তিনি সবার আগে নিজের বুকে গুলি পেতে নিয়েছেন, যাতে তাঁর জওয়ানরা বেঁচে থাকতে পারে।
অপ্রচলিত চিন্তাভাবনা (Out-of-the-Box Thinking): প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে 'ইফতিখার ভাট' চরিত্র সৃষ্টি করে শত্রুর আস্তানায় মাসের পর মাস একা কাটিয়ে দেওয়া তাঁর উচ্চ স্তরের চিন্তাশক্তি ও কৌশলের প্রমাণ।
আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও পেশাদারিত্ব: শত্রুর ডেরায় আন্ডারকভার থাকার সময় এক সেকেন্ডের মনযোগ বিচ্যুতি মানেই মৃত্যু। সেই চরম মানসিক চাপের মুখেও তিনি বরফশীতল স্নায়ু ধরে রেখেছিলেন।
সাধারণ মানুষের প্রতি মানবিকতা: তিনি সবসময় নিশ্চিত করতেন যেন কোনো অপারেশনে কোনো নিরীহ স্থানীয় নাগরিকের ক্ষতি না হয়। তিনি বলতেন, "আমাদের লড়াই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে, কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়।"
হৃদয়ে খোদাই করা এক চিরন্তন ধ্রুবতারা
আজ মেজর মোহিত শর্মা (AC, SM) আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে উপস্থিত নেই। কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর বীরত্বগাথা এবং তাঁর অসীম আত্মত্যাগ প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
তিনি ছিলেন সেই 'স্পাই ইন ইউনিফর্ম', যিনি অন্ধকারের আড়ালে থেকে আমাদের জীবনে আলোর নিশ্চয়তা দিয়ে গেছেন। আজ আমরা যখন নিজ নিজ ঘরে নিশ্চিন্তে শান্তিতে ঘুমাতে পারি, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত হিমালয়ের বরফাবৃত পাহাড়ে বা গভীর বিপজ্জনক জঙ্গলে মেজর মোহিত শর্মার মতো কোনো না কোনো অকুতোভয় সন্তান নিজের জীবন বাজি রেখে আমাদের সীমানা পাহারা দিচ্ছেন।
মেজর মোহিত শর্মা আমাদের শিখিয়েছেন দেশপ্রেম কোনো ফাঁকা বুলি বা সাময়িক আবেগ নয়; দেশপ্রেম হলো দেশের জন্য নিজের সর্বোচ্চ উজাড় করে দেওয়ার এক নীরব ব্রত।























