ভারতের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় যে ১০টি স্থানে
ভারত তার বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত, যেখানে এক দিকে রয়েছে রাজস্থানের শুষ্ক মরুভূমি, আরেক দিকে মেঘালয়ের চিরহরিৎ বনভূমি। যেখানে জলবায়ু এবং বৃষ্টিপাতের ধরন অঞ্চলভেদে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। ভারতের কিছু অঞ্চলে বছরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, আবার কিছু স্থানে বছরে হাজার হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা তাদের ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ স্থান‘ হিসেবে খ্যাতি এনে দিয়েছে। সর্বশেষ আবহাওয়া এবং ভৌগোলিক তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় যে ১০টি স্থানে এ নিয়ে আজকে আলোচনা করবো।
দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আগত আর্দ্র বাতাস ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত এবং পশ্চিমঘাটের পশ্চিম ঢালে অত্যন্ত উচ্চ পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়, যা বিশ্বের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল স্থানগুলোর মধ্যে কিছু স্থানকে তালিকাভুক্ত করেছে। এই তথ্যগুলো ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (IMD), গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সংগৃহীত।
১. মৌসিনরাম, মেঘালয়
মৌসিনরাম পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হওয়া স্থান হিসেবে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান করে নিয়েছে। মৌসিনরাম মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পাহাড় জেলায় অবস্থিত একটি গ্রাম, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের স্থান হিসেবে পরিচিত। এখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১১,৮৭২ মিলিমিটার (৪৬৭ ইঞ্চি)। ২০২২ সালের ১৭ জুনে মৌসিনরামে ১০০৩.৬ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা একদিনে চেরাপুঞ্জিকে ছাড়িয়ে যায়। এই অঞ্চলের উচ্চতা (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৪০০ মিটার) এবং খাসি পাহাড়ে বঙ্গোপসাগরের আর্দ্র বাতাসের আঘাত বৃষ্টিপাতের প্রধান কারণ। মৌসিনরামের বাসিন্দারা বৃষ্টির সঙ্গে সহাবস্থানের জন্য বিশেষ বাঁশের তৈরি ছাতা ব্যবহার করে, যা পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয়।
২. চেরাপুঞ্জি, মেঘালয়
চেরাপুঞ্জি মেঘালয়ের আরেকটি বৃষ্টিবহুল স্থান, যা একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ধারণ করেছিল। এটি মৌসিনরাম থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১১,৭৭৭ মিলিমিটার (৪৬৩.৭ ইঞ্চি)। ২০২২ সালের ১৮ জুনে চেরাপুঞ্জিতে ৯৭২ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা গত ১২২ বছরে একদিনে তৃতীয় সর্বোচ্চ। চেরাপুঞ্জি তার জলপ্রপাত, গুহা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। বর্ষাকালে এখানে প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হয় এবং আকাশ মেঘে ঢাকা থাকে। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং পাহাড়ি ঢাল বৃষ্টিপাত বাড়ায়। প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে এই অঞ্চলের ভূমি খুবই উর্বর এবং ঘন বনভূমিতে আবৃত।
৩. আগুম্বে, কর্ণাটক
আগুম্বে পশ্চিমঘাটের শিমোগা জেলায় অবস্থিত, ভারতের অন্যতম বৃষ্টিবহুল স্থান। আগুম্বেকে ‘দক্ষিণ ভারতের চেরাপুঞ্জি’ বলা হয়। এটি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এখানকার চিরহরিৎ বনভূমি অত্যন্ত ঘন। এখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৭,০০০ মিলিমিটার। আগুম্বেতে বৃষ্টিপাতের কারণ হলো আরব সাগর থেকে আসা মৌসুমি বায়ু, যা পশ্চিমঘাট পর্বতের সাথে ধাক্কা খেয়ে উপরে ওঠে এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। এটি তার জৈববৈচিত্র্য এবং বর্ষার সময় সবুজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।
আরো পড়ুন: বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় যে ১০টি স্থানে
৪. আমবোলি, মহারাষ্ট্র
আম্বোলি সহ্যাদ্রি পর্বতমালার (Sahyadri mountain range) একটি অংশ। আমবোলি মহারাষ্ট্রের সিন্ধুদুর্গ জেলায় অবস্থিত একটি পাহাড়ি স্টেশন, বার্ষিক প্রায় ৭,৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত পায়। পশ্চিমঘাটের পশ্চিম ঢালে অবস্থান এবং আরব সাগরের নৈকট্য এই অঞ্চলকে বৃষ্টিপ্রবণ করে তোলে। আমবোলির জলপ্রপাত এবং সবুজ পরিবেশ বর্ষাকালে পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এ স্থানটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জলপ্রপাত এবং জৈববৈচিত্র্যের জন্যও পরিচিত, যেখানে বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী পাওয়া যায়।
৫. মহাবালেশ্বর, মহারাষ্ট্র
মহাবালেশ্বর ভারতের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলির মধ্যে অন্যতম। মহারাষ্ট্রের পশ্চিমঘাটে অবস্থিত মহাবালেশ্বর বার্ষিক প্রায় ৫,৫০০-৬,০০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত পায়। এটিও পশ্চিমঘাট পর্বতমালার একটি অংশ, যার কারণে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এই পাহাড়ি স্টেশনটি তার ঘন জঙ্গল, জলপ্রপাত এবং ঠান্ডা জলবায়ুর জন্য পরিচিত। এই স্থানটি তার স্ট্রবেরি বাগানের জন্য বিখ্যাত এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত স্ট্রবেরির চাষের জন্য অপরিহার্য। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু পশ্চিমঘাটে আঘাত করার ফলে এখানে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। মহাবালেশ্বর পর্যটকদের কাছে একটি জনপ্রিয় গন্তব্য, বিশেষ করে বর্ষাকালে।
৬. সোগাল, কর্ণাটক
সোগাল বেলগাভি জেলার একটি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত। এর ভৌগোলিক অবস্থানই এখানকার অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের প্রধান কারণ। এটি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ভারত মহাসাগর থেকে আসা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর কারণে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ৪,৫০০ মিলিমিটার। সোগাল তার জলপ্রপাত এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। এখানে একটি বিখ্যাত জলপ্রপাত আছে, যা বর্ষাকালে তার পূর্ণ রূপ ধারণ করে।
৭. চিন্নাকাল্লার, তামিলনাড়ু
চিন্নাকাল্লার তামিলনাড়ু রাজ্যের কোয়েম্বাটোর জেলার একটি ছোট গ্রাম। চিন্নাকাল্লার একটি অল্প পরিচিত কিন্তু অত্যন্ত বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল। এখানকার বৃষ্টিপাতের ধরন একে দক্ষিণ ভারতের অন্যতম রেইনফরেস্ট করে তুলেছে। এটি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অংশ আনানাইলাই পাহাড়ের কোলে অবস্থিত। এই অঞ্চলের জলবায়ু প্রধানত ক্রান্তীয়, যা সারা বছরই বৃষ্টিপাত পাওয়ার জন্য অনুকূল। বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ৪,৫০০-৫,০০০ মিলিমিটার। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে চিন্নাকাল্লার এবং এর আশেপাশের অঞ্চলটি ঘন চিরহরিৎ বনে ঢাকা থাকে।
৮. নেরিয়ামঙ্গলম, কেরালা
কেরালা রাজ্যের একটি ছোট্ট গুরুত্বপূর্ণ শহর নেরিয়ামঙ্গলম, যা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। এ অঞ্চল কেরালাকে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার উঁচু অঞ্চলের সাথে যুক্ত করে। এখানকার ল্যান্ডস্কেপ বা ভূখণ্ড মূলত নদী, ঘন বনভূমি এবং ছোট ছোট পাহাড় নিয়ে গঠিত। কেরালার এই অঞ্চল বর্ষাকালে ঈশ্বরের নিজের দেশ-এর প্রকৃত সৌন্দর্য তুলে ধরে। নেরিয়ামঙ্গলম পশ্চিমঘাট পর্বতমালার পূর্ব ঢালে অবস্থিত। বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ৪,০০০-৪,৫০০ মিলিমিটার। এখানকার জীববৈচিত্র্য খুব সমৃদ্ধ, যেখানে বিভিন্ন ধরনের পাখি এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে।
৯. দার্জিলিং, পশ্চিমবঙ্গ
পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এবং বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ৩,০০০-৩,৫০০ মিলিমিটার। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থান এবং বঙ্গোপসাগরের মৌসুমি বায়ুর প্রভাব এখানে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটায়। দার্জিলিং তার চা বাগান, কাঞ্চনজঙ্ঘা দৃশ্য এবং ঠান্ডা জলবায়ুর জন্য বিখ্যাত। বর্ষাকালে এখানকার কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
১০. জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ
জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গের আরেকটি উত্তরাঞ্চলীয় জেলা, বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ৩,৫০০ মিলিমিটার। বঙ্গোপসাগরের মৌসুমি বায়ু এবং হিমালয়ের নৈকট্য এই অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টি নিয়ে আসে। জলপাইগুড়ির ঘন জঙ্গল, চা বাগান, এবং তিস্তা নদীর উপস্থিতি এটিকে বৃষ্টিপ্রবণ করে। এই অঞ্চল বন্যার জন্যও পরিচিত, বিশেষ করে ভারী বর্ষণের সময়।
উচ্চ বৃষ্টিপাতের কারণ
ভারতের এই বৃষ্টিবহুল স্থানগুলোর উচ্চ বৃষ্টিপাতের পেছনে প্রধানত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এবং বঙ্গোপসাগরের আর্দ্র বাতাসের ভূমিকা রয়েছে। পশ্চিমঘাট এবং হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত অঞ্চলগুলোতে মৌসুমি বায়ু পাহাড়ে আঘাত করে, যার ফলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। মৌসিনরাম এবং চেরাপুঞ্জির মতো স্থানগুলো খাসি পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত, যা বঙ্গোপসাগরের মেঘগুলোকে বাধা দেয় এবং ভারী বৃষ্টি ঘটায়।
পশ্চিমঘাটের পশ্চিম ঢাল, যেমন আগুম্বে এবং আমবোলি, আরব সাগর থেকে আগত আর্দ্র বাতাসের কারণে প্রচুর বৃষ্টি পায়। উত্তর-পূর্ব ভারতের অঞ্চলগুলো, যেমন আসাম এবং মেঘালয়, বঙ্গোপসাগরের মৌসুমি বায়ুর সরাসরি প্রভাবে থাকে। এছাড়া এই অঞ্চলগুলোর উচ্চতা এবং ভৌগোলিক গঠন বৃষ্টিপাত বাড়াতে সাহায্য করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ভারতের বৃষ্টিপাতের ধরনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মৌসুমি বায়ুর তীব্রতা এবং সময়কাল পরিবর্তিত হচ্ছে, যার ফলে মৌসিনরাম এবং চেরাপুঞ্জির মতো স্থানে আরও তীব্র বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ২০২৫ সালে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (IMD) রিপোর্ট করেছে যে উত্তর-পূর্ব ভারতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গত দশকে তুলনায় বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝড়, বন্যা এবং সাইক্লোনের মতো চরম আবহাওয়া ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা এই অঞ্চলগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়
এই বৃষ্টিবহুল স্থানগুলো পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয়। মৌসিনরাম এবং চেরাপুঞ্জির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জলপ্রপাত এবং জিভে জল আনা খাসি খাবার পর্যটকদের আকর্ষণ করে। আগুম্বে এবং আমবোলির মতো পশ্চিমঘাটের স্থানগুলো বর্ষাকালে সবুজ জঙ্গল এবং জলপ্রপাতের জন্য বিখ্যাত। দার্জিলিং এবং জলপাইগুড়ির চা বাগান এবং হিমালয়ের দৃশ্য বর্ষাকালে একটি অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে। এই অঞ্চলগুলোর স্থানীয় সংস্কৃতি এবং জীবনধারা বৃষ্টির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, যা এগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে।
ভারতের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের ১০টি স্থান, যেমন মৌসিনরাম, চেরাপুঞ্জি, আগুম্বে এবং দার্জিলিং এই দেশের ভৌগোলিক এবং জলবায়ুগত বৈচিত্র্যের প্রমাণ। এই অঞ্চলগুলোর অত্যধিক বৃষ্টিপাত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জৈববৈচিত্র্য বাড়ায়, তবে বন্যা এবং ভূমিধসের মতো চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। এই স্থানগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ভারতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের একটি অংশ, যা পর্যটক এবং গবেষকদের জন্য সমানভাবে আকর্ষণীয়।



















