'আবুল হাকাম' থেকে 'আবু জাহেল' - আরবের বুদ্ধিমান ব্যক্তি কেন ইতিহাসে মূর্খ নামে পরিচিত?

আরব উপদ্বীপের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা কিছু এক অদ্ভুত, বৈপরীতপূর্ণ ও ট্র্যাজিক ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি হই। তিনি এমন এক ব্যক্তি, যাঁর বুদ্ধি, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বিচারিক ক্ষমতার খ্যাতি একসময় সমগ্র আরবে কিংবদন্তীর রূপ নিয়েছিল। প্রাক-ইসলামী মক্কার গোত্রে গোত্রে যেকোনো জটিল সমস্যা, রাজনৈতিক সংকট কিংবা আইনি জটিলতা দেখা দিলে সর্বাগ্রে তাঁকেই ডেকে আনা হতো। তিনি ছিলেন আরবের সম্ভ্রান্ত অভিজাত সমাজের কেন্দ্রবিন্দু, অত্যন্ত সম্মানিত এবং সর্বজনগ্রাহ্য বিচারক।
তাঁর মূল নাম ছিল আম্র ইবনে হিশাম ইবনে মুগীরা। আর মক্কার সমাজ তাঁকে অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে ডেকে আনত একটি বিশেষ উপাধিতে 'আবুল হাকাম', যার শাব্দিক অর্থ 'প্রজ্ঞার পিতা' বা 'বিচক্ষণ বিচারক'। কিন্তু কালের প্রবাহে ও ইতিহাস লেখনীর ধারায় সেই পরম পূজনীয় 'আবুল হাকাম' পরিচয়টি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল। তাঁর স্থান দখল করে নিল একটি চরম অপমানজনক ও বিপরীতমুখী উপাধি 'আবু জাহেল', যার অর্থ 'মূর্খতার পিতা' বা 'পরম অজ্ঞ'।
একই ব্যক্তির জীবনের এই দুই মেরুর পরিচয় কেবল একটি নাম পরিবর্তনের সাদামাটা ঘটনা নয়। এটি মানবমনস্তত্ত্ব, ক্ষমতার লোভ, সামাজিক অহংকার এবং সত্যের সাথে মিথ্যার চিরন্তন সংঘাতের এক সুগভীর আখ্যান। কীভাবে একজন স্বীকৃত বিচক্ষণ মানুষ ইতিহাসের পাতায় মূর্খতার প্রতীকে পরিণত হলেন? কেন তাঁর সমস্ত জ্ঞান ও সামাজিক মর্যাদা ধুলায় মিশে গেল? এই ইতিহাস কেবল ৬ষ্ঠ বা ৭ম শতাব্দীর কোনো পুরনো গল্প নয়; এটি আধুনিক যুগের মানুষের জন্যও এক চিরন্তন আয়না, যেখানে ফুটে ওঠে—জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সত্যকে জেনে-বুঝে অস্বীকার করলে মানুষের পরিণতি কতটা ভয়াবহ ও করুণ হতে পারে।
নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পরিচয়
নাম মানুষের স্রেফ একটি পারিবারিক পরিচায়ক শব্দ নয়; প্রাচীন সমাজব্যবস্থায় নাম বা উপাধি ছিল একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক অবস্থান এবং কর্মের প্রতিফলন। বিশেষ করে প্রাক-ইসলামী আরবে কোনো ব্যক্তিকে তার গুণাবলীর ওপর ভিত্তি করে 'কুনিয়াত' বা ডাকনাম/উপাধি দেওয়া হতো।
আম্র ইবনে হিশামের ক্ষেত্রে তাঁর উপাধি পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি ছিল ইসলামী ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। এটি তৎকালীন মক্কার সামাজিক বৈষম্য, গোত্রীয় রাজনীতির অন্ধকার গলিগলি এবং তাওহীদের মহান বাণীর মুখোমুখি হওয়ার পর অভিজাত শ্রেণীর চরম মানসিক অস্থিরতাকে উন্মোচিত করে।
‘আবুল হাকাম’ পরিচয়ের ভিত্তি: এটি কোনো স্বঘোষিত উপাধি ছিল না। মক্কার কুরাইশদের শীর্ষস্থানীয় নেতারা তাঁর প্রখর রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধি ও প্রজ্ঞার স্বীকৃতিস্বরূপ সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
ইতিহাসের চরম বৈপরীত্য: যাকে কয়েক বছর আগেও মক্কার মানুষ বিচার-বুদ্ধির চূড়ান্ত প্রতীক মনে করত, সত্যের আলো আসার সাথে সাথেই তাঁর ভেতরের অন্ধকার বেরিয়ে এলো। ফলে সেই একই সমাজ ও ইতিহাস তাঁকে 'আবু জাহেল' হিসেবে চিরকালের জন্য চিহ্নিত করল।
প্রাক-ইসলামী মক্কায় আম্র ইবনে হিশাম
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে মক্কার রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর শীর্ষে অবস্থান করতেন যে কজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আম্র ইবনে হিশাম। তিনি ছিলেন মক্কার অন্যতম সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী গোত্র ‘বনু মাখজুম’-এর সম্মানিত নেতা।
বিচারিক ক্ষমতা ও ‘দারুন নদওয়া’-র নেতৃত্ব: মক্কার পার্লামেন্ট বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সভা হিসেবে পরিচিত ছিল ‘দারুন নদওয়া’। সেখানে যেকোনো সাধারণ মক্কাবাসীর প্রবেশাধিকার ছিল না। নিয়ম ছিল যে, সাধারণত ৪০ বছর বয়স না হলে কোনো গোত্রপ্রধান বা কুরাইশ নেতা এই সভায় মতামত দেওয়ার সুযোগ পেতেন না। কিন্তু আম্র ইবনে হিশামের বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অসামান্য দক্ষতার কারণে মাত্র ৩০ বছর বয়সেই তাঁকে ‘দারুন নদওয়া’-র স্থায়ী ও প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
কূটনীতি ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা
প্রাক-ইসলামী আরবে গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সামান্য ঘোড়দৌড় বা পানির কূপকে কেন্দ্র করে দশককালব্যাপী যুদ্ধ চলত। এই ধরনের জটিল ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে আম্র ইবনে হিশাম নিরপেক্ষ বিচারকের ভূমিকা পালন করতেন।
ন্যায্য বিচার ও স্পষ্টভাষিতা: কুরাইশদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তিতে তাঁর রায়কে চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়া হতো।
অর্থ ও জনবল: বনু মাখজুম গোত্রের অগাধ বিত্ত-বৈভব এবং শক্তিশালী অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব থাকার কারণে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল অবিসংবাদিত।
মক্কার প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করত যে, আম্র ইবনে হিশাম যা বলেন, তা প্রজ্ঞা ও যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই বলেন। তাঁর এই 'প্রজ্ঞার পিতা' পরিচয়টি ছিল মক্কার সমাজের অন্যতম শক্ত স্তম্ভ।
যখন প্রজ্ঞা পরাজিত হলো অহংকারের কাছে
যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার জমিনে একত্ববাদের দাওয়াত প্রচার শুরু করলেন এবং মূর্তি পূজার অসারতা ও সামাজিক সমতার কথা বললেন, তখন পুরো মক্কার ঐতিহ্যবাহী সামাজিক কাঠামো কেঁপে উঠল। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আম্র ইবনে হিশামের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি সামনে আসে।
জেনে-বুঝে সত্য অনুধাবন: আম্র ইবনে হিশাম সাধারণ কোনো মূর্খ লোক ছিলেন না যে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণীর গভীরতা বুঝতে পারেননি। বরং তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অনুধাবন করেছিলেন যে, মুহাম্মদ (সা.) যা তিলাওয়াত করছেন, তা কোনো সাধারণ মানুষের কথা বা কবির রচিত কাব্য হতে পারে না।
ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম ও ইমাম তাবারী (র.) বর্ণনা করেছেন যে, মক্কার অন্ধকার রাতে আম্র ইবনে হিশাম (আবু জাহেল), আবু সুফিয়ান এবং আখ নাস ইবনে শুরাইক এই তিনজন কুরাইশ নেতা গোপনে একে অপরকে না জানিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরের পাশে গিয়ে কালামুল্লাহ (কুরআন) তিলাওয়াত শুনতেন। পরপর তিন রাত তারা এই মধুর কুরআন তিলাওয়াত শুনে মুগ্ধ হয়ে ফিরে আসতেন এবং পথে একে অপরের মুখোমুখি হয়ে প্রতিজ্ঞা করতেন যে, কাল থেকে আর আসা যাবে না, কারণ সাধারণ মানুষ দেখলে বিভ্রান্ত হবে।
আখ নাস ইবনে শুরাইক একবার ব্যক্তিগতভাবে আম্র ইবনে হিশামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: "হে আবুল হাকাম! তুমি মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকে যা শুনলে, সে সম্পর্কে তোমার মত কী?"
আম্র ইবনে হিশাম তখন তাঁর হৃদয়ের ভেতরের আসল সত্যটি উচ্চারণ করেছিলেন, যা তাঁর অন্ধ গোত্রীয় অহংকারকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। তিনি বলেছিলেন:
"আমরা এবং বনু আবদে মানাফ (রাসুলের গোত্র) সম্মানের দৌড়ে বরাবর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এসেছি। তারা মানুষকে খানা খাইয়েছে, আমরাও খাইয়েছি; তারা দান-খয়রাত করেছে, আমরাও করেছি; তারা মানুষের দায়িত্ব বহন করেছে, আমরাও করেছি। এভাবে যখন আমরা তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছিলাম এবং সমকক্ষ হয়ে উঠেছিলাম, ঠিক তখনই তারা বলতে শুরু করল 'আমাদের মধ্য থেকে একজন নবীর আগমন হয়েছে, যার কাছে আসমান থেকে ওহী আসে!' এখন বলো, এই মর্যাদায় আমরা কীভাবে তাদের সমকক্ষ হব? আল্লাহর কসম! আমরা কখনো তাঁর ওপর ঈমান আনব না এবং তাঁকে সত্য বলে স্বীকার করব না।"
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সামাজিক অবস্থানের ভয়
আম্র ইবনে হিশামের এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, তিনি সত্যকে সত্য হিসেবে চিনতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাঁর সামনে তিনটি বড় বাধা ছিল:
১. গোত্রীয় অহংকার (عصبية): বনু মাখজুম গোত্র কীভাবে বনু হাশিম গোত্রের এক এতিম যুবককে নিজেদের ধর্মীয় ও আত্মিক নেতা হিসেবে মেনে নেবে?
২. ক্ষমতা হারানোর ভয়: মক্কার কাবার রক্ষক ও কুরাইশদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব যদি রাসুল (সা.)-এর হাতে চলে যায়, তবে বনু মাখজুমের প্রভাব চিরতরে বিলুপ্ত হবে।
৩. সামাজিক সমতার ভীতি: ইসলাম ঘোষণা করেছিল যে, একজন হাবশী ক্রীতদাস (যেমন হযরত বিলাল রা.) এবং কুরাইশ সর্দারের মধ্যে আল্লাহর বিচারে কোনো পার্থক্য নেই পার্থক্য কেবল তাকওয়ায়। মক্কার দাসপ্রথা ও অভিজাততন্ত্রের ধারক হিসেবে এই সামাজিক সাম্যকে মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
সত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হিংস্রতা ও নিপীড়নের মূল হোতা
যখন প্রজ্ঞা ও যুক্তি হেরে যায় অহংকারের কাছে, তখন মানুষ সহিংস হয়ে ওঠে। আম্র ইবনে হিশামও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে যুক্তি দিয়ে ইসলামের অগ্রযাত্রা রোখা যাবে না, তাই তিনি বেছে নিলেন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের পথ।
প্রথম শহীদদের ওপর অমানসিক অত্যাচার: ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শহীদ হযরত সুমাইয়া (রা.) এবং তাঁর স্বামী হযরত ইয়াসির (রা.)-এর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালান আম্র ইবনে হিশাম। তিনি সুমাইয়া (রা.)-কে বর্শা দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করে শহীদ করেন। হযরত বিলাল (রা.)-কে তপ্ত মরুভূমিতে ভারী পাথর দিয়ে চেপে রাখার পেছনেও তাঁর উসকানি ও প্রত্যক্ষ ইন্ধন ছিল।
শে‘আবে আবী তালিবে বয়কট: মুসলমানদের তিলে তিলে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে কুরাইশরা যে তিন বছরব্যাপী অর্থনৈতিক ও সামাজিক বয়কট চুক্তি করেছিল, তার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া সেই চুক্তিপত্রের কারণে মুসলিম নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের গাছের পাতা ও চামড়া চিবিয়ে দিন কাটাতে হয়েছিল।
রাসুল (সা.)-কে হত্যার চক্রান্ত: হিজরতের পূর্বে দারুন নদওয়ায় যখন সভা বসেছিল যে কীভাবে ইসলামের দাওয়াত চিরতরে বন্ধ করা যায়, তখন আম্র ইবনে হিশামই সেই জঘন্য কুখ্যাত প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন: "মক্কার প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে তরুণ ও সুঠাম যুবক বাছাই করা হোক। তারা সবাই মিলে একযোগে তরবারি দিয়ে মুহাম্মদের ওপর হামলা চালাবে। ফলে রক্তপণ বা হত্যার দায় কোনো একটি গোত্রের ওপর পড়বে না, আর বনু হাশিম পুরো কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করতে পারবে না।"
এই সর্বাত্মক হিংস্রতা প্রমাণ করে যে, তিনি ভুলবশত বিরোধী ছিলেন না; বরং অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সত্য ও সুন্দরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।
'আবু জাহেল': ইতিহাস প্রদত্ত এক নতুন উপাধি
আম্র ইবনে হিশামের এই চূড়ান্ত গোঁড়ামি, অহংকার এবং সত্যকে জেনে-বুঝে ধ্বংস করার হিংসাত্মক প্রবণতা দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে একটি চিরন্তন উপাধিতে ভূষিত করেন ‘আবু জাহেল’ (أبو جهل)।
'জাহেল' শব্দের প্রকৃত অর্থ ও দর্শন
সাধারণ অর্থে 'জাহেল' মানে মূর্খ বা যার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। কিন্তু আরবি ভাষা এবং ইসলামী সংস্কৃতিতে 'জাহেলিয়াত' বা 'জাহেল' শব্দটির অর্থ কেবল অক্ষরজ্ঞানের অভাব নয়।
ইসলামী পরিভাষায় 'জাহেল' বলা হয় সেই ব্যক্তিকে যে ব্যক্তি সত্যকে স্পষ্টভাবে চেনার পরও নিজের অহংকার ও পার্থিব স্বার্থের কারণে তা মানতে অস্বীকার করে।
যার জ্ঞান তাকে সঠিক পথে চালিত করতে পারে না, বরং অন্যায় ও শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যে ব্যক্তি সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদ ও নীতি-নৈতিকতাকে তুচ্ছ করে নিজের নফসের (প্রবৃত্তির) পূজা করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন তাঁকে 'আবু জাহেল' বা 'মূর্খতার পিতা' বলে ডাকলেন, তখন তিনি এটিই স্পষ্ট করে দিলেন যে দুুনিয়াবী রাজনীতি বা বিচারে একজন মানুষ মহা জ্ঞানী হতে পারে, কিন্তু যদি তার ভেতরে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি আনুগত্য না থাকে, তবে তার সেই জ্ঞান শূন্য ও তুচ্ছ। আম্র ইবনে হিশামের জ্ঞান তাঁকে মুক্তির পথ দেখায়নি, বরং তাঁকে পরিচালিত করেছিল অন্ধ ধ্বংসের দিকে। তাই তিনি প্রজ্ঞার পিতা নন, বরং মূর্খতা ও জ্ঞানপাপের চূড়ান্ত প্রতীক।
আম্র ইবনে হিশাম (আবু জাহেল)-এর ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবর্তন
নিচে একটি সমন্বিত ও সুবিন্যস্ত সারণীর (Table) মাধ্যমে আম্র ইবনে হিশামের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক, রূপান্তর এবং ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হলো:
মূল বিষয় ও ক্ষেত্র | ‘আবুল হাকাম’ পর্ব (প্রাক-ইসলামী যুগ) | ‘আবু জাহেল’ পর্ব (ইসলামী যুগ) |
মূল পরিচয় ও নাম | আম্র ইবনে হিশাম ইবনে মুগীরা (বনু মাখজুম গোত্র)। | আবু জাহেল (রাসুলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক প্রদত্ত উপাধি)। |
সামাজিক উপাধি ও অর্থ | আবুল হাকাম (প্রজ্ঞার পিতা / পরম বিচক্ষণ বিচারক)। | আবু জাহেল (মূর্খতার পিতা / চরম জ্ঞানপাপী)। |
রাজনৈতিক অবস্থান | ‘দারুন নদওয়া’-র কনিষ্ঠ সম্মানিত বিচারক ও নেতা। | ইসলাম-বিরোধী জোটের প্রধান ষড়যন্ত্রকারী ও সেনাপতি। |
মনস্তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি | নিরপেক্ষতা, কূটনৈতিক বুদ্ধি ও সামাজিক সম্মান। | অন্ধ গোত্রীয় অহংকার, ক্ষমতার লোভ ও অহমিকা। |
কুরআন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি | গভীর রাতে গোপনে শুনে এর অলৌকিকত্ব অনুধাবন। | জনসমক্ষে সত্য অস্বীকার ও কুরআন তিলাওয়াত বন্ধের চেষ্টা। |
উল্লেখযোগ্য জঘন্য কাজ | মক্কার গোত্রীয় বিরোধ মেটাতে যৌক্তিক মধ্যস্থতা। | সুমাইয়া (রা.)-কে হত্যা, বয়কট চুক্তি ও রাসুল (সা.)-কে হত্যার চক্রান্ত। |
ঐতিহাসিক পরিণতি | আরবের অন্যতম সম্মানিত ও প্রভাবশালীদের একজন। | বদর যুদ্ধে (২ হিজরী) দুই কিশোরের হাতে নিহত ও চিরস্থায়ী ধিক্কার। |
বদরের প্রান্তরে দম্ভের পতন ও শোকাবহ পরিণতি
আবু জাহেলের অহংকার ও সত্যের বিরুদ্ধে তাঁর চরম শত্রুতার চূড়ান্ত ফয়সালা ঘটেছিল দ্বিতীয় হিজরীর ১৭ই রমজান, ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধে।
যুদ্ধের উসকানি ও অন্ধ অহংকার: কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফেলাটি আবু সুফিয়ানের বুদ্ধিমত্তায় নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে যাওয়ার পরও, আবু জাহেল মক্কায় ফিরে যেতে অস্বীকার করেন। কুরাইশ সর্দার উত্বাহ ইবনে রবীআ যুদ্ধ এড়িয়ে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু আবু জাহেল চিৎকার করে উঠেছিলেন:
"আল্লাহর কসম! আমরা বদরে না গিয়ে এবং সেখানে তিন দিন অবস্থান না করে ফিরে যাব না। আমরা উট জবাই করব, মদ্যপান করব, গায়িকারা গান গাইবে এবং পুরো আরববাসী আমাদের এই শক্তির কথা শুনবে। তারা চিরকাল আমাদের ভয় করবে!"
তাঁর এই আত্মম্ভরিতা ও দম্ভই তাঁকে নিজের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
দুই কিশোরের হাতে চরম পরাজয়
যুদ্ধের ময়দানে আবু জাহেলকে বর্ম পরিহিত অবস্থায় মাখজুম গোত্রের বিশিষ্ট সেনারা ঘিরে রেখেছিল। কিন্তু আল্লাহর বিচার ছিল ভিন্ন। মদিনার আনসারদের দুই অত্যন্ত অল্পবয়সী তরুণ ভাই হযরত মুআজ ইবনে আম্র (রা.) এবং হযরত মুআওয়াজ ইবনে আফরা (রা.) আবু জাহেলকে চিনে নেন।
তাঁরা আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: "চাচা! আবু জাহেল কোথায়? আমরা শুনেছি সে নাকি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে গালি দেয়! যার হাতে আমাদের প্রাণ, তার কসম আমরা তাকে দেখলে হয় তাকে হত্যা করব, না হয় নিজেরা শহীদ হব!"
যুদ্ধ শুরু হতেই এই দুই তরুণ সিংহ মানবপ্রাচীর ভেদ করে আবু জাহেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাঁদের তরবারির সুনির্দিষ্ট আঘাতে মক্কার প্রজ্ঞার চাদর মোড়া স্বৈরাচারীকে ধূলিসাৎ করে দেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সাথে শেষ সাক্ষাৎকার
আবু জাহেল যখন রক্তাক্ত অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) (যাঁকে একসময় মক্কায় ছাগল চরানোর জন্য আবু জাহেল তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিল এবং চড় মেরেছিল) তাঁর বুকের ওপর গিয়ে দাঁড়ান।
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার মুহূর্তেও আবু জাহেলের ভেতরের গোত্রীয় অহংকার কমেনি। সে ইবনে মাসউদ (রা.)-কে দেখে বলেছিল: "হে ছাগলের রাখাল! তুমি এক কঠিন ও উঁচুপদে পা রেখেছ! আজকের দিনে জয় কার হলো?"
ইবনে মাসউদ (রা.) উত্তর দিয়েছিলেন: "জয় হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের!"
অতঃপর ইবনে মাসউদ (রা.) তাঁর মাথা বিচ্ছিন্ন করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন আবু জাহেলের মৃতদেহ দেখলেন, তখন তিনি বললেন: "إِنَّهُ فِرْعَوْنُ هَذِهِ الأُمَّةِ" (ইনি হলেন এই উম্মতের ফেরাউন।)
‘জ্ঞানপাপী’ সত্তার গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ
আম্র ইবনে হিশামের এই ঐতিহাসিক রূপান্তর আমাদের শেখায় যে, বুদ্ধিমত্তা এবং প্রজ্ঞা এক জিনিস নয়।
বুদ্ধিমত্তা (Intellect) বনাম নৈতিক প্রজ্ঞা (Wisdom): বুদ্ধিমত্তা হলো তথ্য বিশ্লেষণ করার এবং পার্থিব সুবিধা আদায় করার একটি কৌশলগত ক্ষমতা। কিন্তু 'হিকমাহ' বা প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো সেই নৈতিক আলো, যা মানুষকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে এবং সত্যের সামনে মাথা নত করার বিনয় দান করে। আম্র ইবনে হিশামের বুদ্ধিমত্তা ছিল, কিন্তু অহংকারের কারণে তাঁর ভেতরে কোনো হিকমাহ বা প্রজ্ঞা ছিল না।
অহংকার: সত্যের সবচেয়ে বড় শত্রু: ইবলিস (শয়তান) যেমন আল্লাহর অস্তিত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবগত থাকা সত্ত্বেও স্রেফ অহংকার ('আমি তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ') করার কারণে অভিশপ্ত হয়েছিল; ঠিক তেমনি আবু জাহেলও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সত্যতা জানার পরও স্রেফ গোত্রীয় অহংকারের কারণে অভিশপ্ত হলো। অহংকার মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয়।
স্বার্থভিত্তিক সত্য প্রত্যাখ্যান: ইতিহাস সাক্ষী, যখনই সত্যের বাণী মানুষের ব্যক্তিগত স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুবিধা বা সামাজিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে যায়, তখন সুবিধাভোগী শ্রেণী সত্যকে আক্রমণ করে। আবু জাহেলের বিরোধিতা ছিল তাঁর নিজস্ব সামাজিক শাসন ও অর্থনৈতিক শোষণ বজায় রাখার এক মরিয়া প্রচেষ্টা।
আধুনিক যুগে ‘আবু জাহেল’ ভাবাদর্শের শিক্ষণীয় দিক
আম্র ইবনে হিশামের এই উপাখ্যান কেবল ১৪০০ বছর আগের কোনো অতীত কাহিনী হিসেবে পড়লে চলবে না। আধুনিক সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে 'আবু জাহেল' মানসিকতার লোক খুঁজে পাওয়া যায়। এই ইতিহাস থেকে আমরা বেশ কিছু কালজয়ী শিক্ষা লাভ করতে পারি:
শিক্ষিত জ্ঞানপাপীদের বিপদ: প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি, বড় পদবী বা আন্তর্জাতিক খ্যাতি থাকলেই একজন মানুষ প্রজ্ঞাবান হয় না। আধুনিক যুগেও অনেক তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও শক্তিশালী নেতা সত্য, ন্যায় এবং নির্যাতিত মানুষের অধিকারকে জেনে-বুঝে নিজের স্বার্থে দমন করে। তারা আধুনিক যুগের 'আবু জাহেল'।
ক্ষমতা ও পদের ক্ষণস্থায়িত্ব: মানুষ সাময়িকভাবে বিচারক বা শাসক হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস তাকে বিচার করবে তার নৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে। আবু জাহেলের রাজনৈতিক ক্ষমতা তাঁকে আল্লাহর শাস্তি ও ইতিহাসের ধিক্কার থেকে বাঁচাতে পারেনি।
কর্মই মানুষের আসল পরিচয়: জন্মের পরিচয়, বংশের আভিজাত্য বা উপাধি দিয়ে কারো শেষ পরিচয় নির্ধারিত হয় না। মানুষ তার জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত কী করল এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়াল নাকি বিপক্ষে তার ওপরই তার চিরন্তন পরিচয় রচিত হয়।
সত্যের অনিবার্য বিজয়: বাহ্যিকভাবে মিথ্যা ও স্বৈরাচারী শক্তিকে অনেক বেশি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী মনে হতে পারে (যেমন মক্কায় কুরাইশরা ছিল), কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে সত্যের জয় অনিবার্য। সত্যকে দমন করার সমস্ত চক্রান্ত একদিন বদরের প্রান্তরের মতো ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
আম্র ইবনে হিশামের জীবনকাহিনি মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন ও করুণ সতর্কবার্তা। তিনি 'আবুল হাকাম' বা প্রজ্ঞার পিতা হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, পুরো আরব সমাজ তাঁর বিচারিক ক্ষমতায় মুগ্ধ ছিল, কিন্তু যখন পরম সত্য তাঁর দরজায় কড়া নাড়ল, তখন তিনি নিজের অহমিকা, ক্ষমতা ও পদের মোহে অন্ধ হয়ে সত্যকে চিরতরে প্রত্যাখ্যান করলেন।
তাঁর জীবন আমাদের অনুবাধন করায় যে, যে জ্ঞান মানুষকে স্রষ্টার সামনে বিনয়ী করে না, যে বুদ্ধি মানুষকে সত্যের পথে চালিত করে না, আর যে ক্ষমতা মানুষকে সাধারণ মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতে দেয় না তা প্রজ্ঞা নয়, তা পরম মূর্খতা।
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। যিনি একসময় আরবের সবচেয়ে সম্মানিত বিচারক ছিলেন, তিনি আজ মানব ইতিহাসে চিরন্তন 'জ্ঞানপাপী' ও 'আবু জাহেল' হিসেবে অভিশপ্ত। এই ট্র্যাজেডি আমাদের প্রতিনিয়ত শিক্ষা দেয় ব্যক্তিগত স্বার্থ, অন্ধ অহংকার ও সামাজিক আভিজাত্যের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে সানন্দে গ্রহণ করাই মানুষের প্রকৃত প্রজ্ঞা ও মুক্তির একমাত্র পথ।





















