আবু সালেম - বলিউডের প্রকৃত ডন ও অন্দরমহলের মূর্তিমান আতঙ্ক

আবু সালেম - বলিউডের প্রকৃত ডন ও অন্দরমহলের মূর্তিমান আতঙ্ক

রুপালী পর্দায় অমিতাভ বচ্চন কিংবা শাহরুখ খানের 'ডন' রূপ দেখে যদি কেউ মনে করেন যে বলিউডের প্রকৃত ডন বুঝি তাঁরাই, তবে তিনি বাস্তবতার সাথে মারাত্মক এক অবিচার করবেন। সিনেমা হলের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত আঁধারে প্রজেক্টরের আলোয় তাঁরা কেবল স্ক্রিপ্টভিত্তিক অভিনয়ের জাদু দেখিয়ে গেছেন। কিন্তু বাস্তব জীবনের বলিউডের অন্দরমহলে যেখানে কোপল্যান্ড ও জুহুর আলো ঝলমলে বিলাসবহুল বাংলোতে রাজত্ব করতেন নামজাদা প্রযোজক, পরিচালক ও প্রথম সারির তারকারা সেখানে রূপকথার কোনো ডন ছিলেন না; সেখানে ছিলেন রক্তমাংসের এক মূর্তিমান আতঙ্ক, যার একটিমাত্র ফোন কলে শিউরে উঠতো পুরো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।

যার ফোনের রিং বাজলে রূপালী পর্দার ‘অ্যাগ্রিসিভ হিরো’ কিংবা অ্যাকশন তারকারা সুবোধ বালকের মতো কাঁপা কাঁপা গলায় হুকুম তামিল করতেন, সালমান খান বা শাহরুখ খানের মতো মেগাস্টারদের বুকে জমে উঠতো হিমশীতল ভয়, সুভাষ ঘাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালক নিজের জীবন বাঁচাতে আড়ালে চাঁদা গুনে দিতেন, এবং মনীষা কৈরালার মতো গ্ল্যামারাস নায়িকার চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় খুন হতে হতো তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে তিনিই ছিলেন নব্বইয়ের দশকের বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত অধিপতি আবু সালেম (Abu Salem)।

উত্তরাঞ্চলের এক অখ্যাত শহর থেকে পকেটে মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে বোম্বেতে পা রাখা সেই হাইস্কুল ড্রপআউট ছেলেটি একসময় নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন প্রায় ৫,০০০ কোটি রুপি মূল্যের অঢেল বিত্ত-বৈভবে। তিনি ছিলেন যেমন এক রক্তপিপাসু ঘাতক ও চতুর পাচারকারী, তেমনি ছিলেন বলিউডের লাস্যময়ী সুন্দরীদের মোহগ্রস্ত করা এক অদ্ভুত ‘ক্যাসানোভা ডন’। আজমগড়ের এক আইনজীবী বাবার সন্তান থেকে বোম্বাইয়ের অন্ধকার জগতের অধিপতি এবং পর্তুগালের লিসবন হয়ে মুম্বাইয়ের আর্থার রোড জেলের নিভৃত অন্ধকূপ আবু সালেমের জীবনের এই অবিশ্বাস্য রোলারকোস্টার যেকোনো বাণিজ্যিক রোমাঞ্চকর সিনেমাকেও হার মানায়।

আইনজীবীর পরিবার থেকে বেআইনী জীবনের সূচনা

এটি প্রফেশনাল অপরাধ ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর আইরনি যে, দক্ষিণ এশিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ডে রাজত্ব করা দুই দুর্ধর্ষ ডনের জন্ম হয়েছিল এমন দুটি পরিবারে, যাদের কাজ ছিল সমাজে আইনের শাসন বজায় রাখা। বোম্বাইয়ের মাফিয়া সম্রাট দাউদ ইব্রাহিমের বাবা ছিলেন বোম্বে পুলিশের একজন সৎ কনস্টেবল, আর বলিউডের অন্দরমহল কাঁপানো আবু সালেমের বাবা ছিলেন আইনের একজন সম্মানিত ধারক পেশাদার আইনজীবী।

আজমগড়ের সারাই মীর ও আকস্মিক বিপর্যয়

ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলার এক নিভৃত ও শান্ত শহর সারাই মীর। সেখানকার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন আবু সালেম। তাঁর বাবা কাইয়ুম আনসারী ছিলেন দেওয়ানি আদালতের অত্যন্ত নামজাদা একজন অ্যাডভোকেট। পরিবারে চার ভাই ও এক বোন মোট পাঁচ সন্তানের মধ্যে সালেম ছিলেন দ্বিতীয়। সচ্ছল ও সুশিক্ষিত পরিবারে বেড়ে উঠলেও সালেমের ভাগ্য বদলে যায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়।

সালেমের শৈশবেই এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা কাইয়ুম আনসারী মারা যান। সাথে সাথেই মধ্যবিত্ত পরিবারটি পড়ে চরম আর্থিক অনটনে। স্থানীয় উর্দু মাধ্যম স্কুলে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর পড়াশোনায় ইস্তফা দিতে বাধ্য হন ১৩-১৪ বছরের বালক আবু সালেম। পরিবারের খরচ চালাতে তিনি স্থানীয় একটি মেকানিক দোকানে সাইকেল ও মোটরসাইকেল মেরামতের কাজ শুরু করেন। অল্প দিনের মধ্যেই নিজের ক্ষিপ্র বুদ্ধি দিয়ে তিনি একজন দক্ষ মোটর মেকানিক হয়ে ওঠেন।

বড় শহরের মোহ: দিল্লি থেকে মুম্বাই

আজমগড়ের ছোট দোকান সালেমের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধরে রাখতে পারেনি। তিনি পাড়ি জমান রাজধানী দিল্লিতে। দিল্লির করোল বাগ ও চাঁদনি চক এলাকায় মেকানিক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন ছোটখাটো কাজের সাথে যুক্ত হন। কিন্তু সেখানেও মন টিকল না তাঁর। আশি ও নব্বইয়ের দশকে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) শহরটি ছিল ভারতের প্রতিটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবকের কাছে 'স্বপ্নের নগরী'।

১৯৮৫ সালের দিকে পকেটে মাত্র ১০০ টাকা এবং একবুক দুঃসাহস নিয়ে বোম্বে সেন্ট্রাল স্টেশনে পা রাখেন ১৮ বছরের যুবক আবু সালেম। বোম্বে শহরের চাকচিক্য এবং আড়ালে থাকা অন্ধকার জগত দুটোই তাঁকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে শুরু করে।

‘ডি-কোম্পানি’, আরাসা শপিং সেন্টার ও অপরাধের প্রথম পাঠশাল

মুম্বাই পৌঁছানোর পর সালেম আশ্রয় নেন সান্তাক্রুজ ও জোগেশ্বরী এলাকায়। সেখানে জোগেশ্বরীর আরাসা শপিং সেন্টারে (Arasa Shopping Centre) তাঁর এক চাচাতো ভাই বেল্ট ও পোশাকের ব্যবসা করতেন। সালেম সেই দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেন।

আরাসা শপিং সেন্টারের রহস্য

তৎকালীন বোম্বাইয়ের আরাসা শপিং সেন্টারটি কোনো সাধারণ কেনাকাটার জায়গা ছিল না। সেটি ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত ‘ডি-কোম্পানি’র (D-Company) কালো টাকা সাদা করার অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ কেন্দ্র। দুবাইয়ে পলাতক দাউদ ইব্রাহিমের দুই ছোট ভাই আনিস ইব্রাহিম ও নূরা ইব্রাহিম বোম্বেতে বসেই মাফিয়া রাজত্ব চালাতেন।

আরাসা শপিং সেন্টারে আনিস ইব্রাহিমের প্রধান খাস লোক ছিলেন সৈয়দ টুপি। শপিং সেন্টারে কাজ করার সুবাদে চতুর ও বাকপটু সালেমের সাথে ঘনিষ্টতা তৈরি হয় সৈয়দ টুপির। সালেমের নির্ভীক মনোভাব, শান্ত স্বভাব এবং যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি ঠাণ্ডা মাথায় সামাল দেওয়ার ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হন টুপি।

সৈয়দ টুপির হাত ধরেই আবু সালেম সরাসরি আনিস ইব্রাহিমের সংস্পর্শে আসেন। সালেমের সততা ও কাজের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে আনিস তাঁর দাদাসাহেব অর্থাৎ দাউদ ইব্রাহিমকে বার্তা পাঠান "বোম্বেতে আমাদের কাজের জন্য এক নিখুঁত হীরা পাওয়া গেছে।"

চোরাচালান ও 'লুতফি এন্টারপ্রাইজ'

আনিস ইব্রাহিমের সেনাপতি হিসেবে কাজ শুরু করার পর সালেমের ভাগ্য দ্রুত বদলে যেতে থাকে। অল্প দিনেই প্রচুর অর্থের মালিক হয়ে যান তিনি। মুম্বাইয়ের সান্তাক্রুজ এলাকায় তিনি ‘লুতফি এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ট্রাভেল এজেন্সি ও জুয়েলারি শপ খোলেন। কিন্তু এই দোকানের আড়ালে মূল ব্যবসা ছিল ভারতের লাভজনক স্বর্ণ চোরাচালান (Gold Smuggling) ও রিয়েল এস্টেট চাঁদাবাজি।

ষাট ও সত্তরের দশকে হাজী মাস্তান কিংবা ইউসুফ প্যাটেলরা যে স্বর্ণ চোরাচালান করে বোম্বে কাঁপিয়েছিলেন, সালেম ডি-কোম্পানির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সেই ব্যবসাকে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। কিন্তু চতুর দাউদ ইব্রাহিম সালেমের মাঝে কেবল একজন সফল পাচারকারীকে দেখেননি; তিনি দেখেছিলেন সালেমের রুচিশীল পোশাক, সুগঠিত চেহারা, লম্বা সুদৃঢ় নাক এবং সম্মোহনী কথাবার্তার ক্ষমতা। দাউদ তাকে বিশেষ দায়িত্ব দেন "বলিউডের বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতে হবে এবং সেখান থেকে কোম্পানির জন্য কোটি কোটি রুপি বের করে আনতে হবে।"

১৯৯৩-এর মুম্বাই সিরিজ বোমা হামলা ও সঞ্জয় দত্ত সংযোগ

১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বোম্বেতে শুরু হয় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এর জবাবে ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ পুরো বোম্বে শহরকে কাঁপিয়ে দেয় ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম 'মুম্বাই সিরিজ বোমা হামলা' (1993 Mumbai Serial Bombings), যাতে ২৫৭ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয় এবং ১,৪০০ জনের বেশি আহত হন।

একে-৫৬ (AK-56) রাইফেল এবং সঞ্জয় দত্ত

মুম্বাই হামলার ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে দাউদ ইব্রাহিম ও আনিস ইব্রাহিমের নির্দেশে বোম্বেতে অস্ত্র ও আরডিএক্স (RDX) আনার দায়িত্ব পড়ে আবু সালেমের ওপর। গুজরাট সীমান্ত দিয়ে সমুদ্রপথে আসা অবৈধ অস্ত্রের একটি বড় চালান শহরের বিভিন্ন স্থানে গোপন আস্তানায় পৌঁছে দেন সালেম।

এরই মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে বলিউডের হার্টথ্রব তারকা সঞ্জয় দত্ত (Sanjay Dutt)-এর সাথে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুনীল দত্তের পুত্র সঞ্জয় দত্তের বান্দ্রার পালিয়াল হিলসের বাড়িতে একটি মারুতি ৮০০ কারে করে নিজেই হাজির হন আবু সালেম। তাঁর সাথে ছিলেন সমীর হিঙ্গোরা ও হানিফ কাদাওয়ালা (ম্যাগনাম প্রডাকশনের মালিক)।

সালেম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সঞ্জয় দত্তের হাতে তুলে দেন তিনটি একে-৫৬ স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ২৫০ রাউন্ড গুলি এবং কিছু হ্যান্ড গ্রেনেড। পরবর্তীতে পুলিশী অভিযানের সময় সঞ্জয় দত্ত একটি রাইফেল রেখে বাকি অস্ত্র ফেরত দেন, যা সালেম নিজেই সরিয়ে ফেলেন। ১৯৯৩-এর হামলার পর ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন চিরুনি অভিযান শুরু করে, সালেম তখন দাউদের সহায়তায় দুবাই পালিয়ে যান। এই ঘটনাটি বোম্বাই অপরাধ জগতে আবু সালেমকে এক রাতে মেগাস্টারের মর্যাদায় বসিয়ে দেয়।

বলিউডে রক্তের হোলিখেলা: চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ অন্ধকার যুগ

দুবাইয়ে বসে আবু সালেম বলিউডের ওপর নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। নব্বইয়ের দশকে বলিউডের সিনেমা নির্মাণের অর্থায়ন থেকে শুরু করে বিদেশে সিনেমার ওভারসিজ ডিস্ট্রিবিউশন রাইটস (Overseas Rights) কমানো বা বাড়ানোর সমস্ত সিদ্ধান্ত হতো সালেমের টেলিফোন কলে।

গুলশান কুমার হত্যাকাণ্ড (১২ আগস্ট, ১৯৯৭)

নব্বইয়ের দশকের বলিউডের সবচেয়ে করুণ ও স্তম্ভিতকারী ঘটনাটি ছিল সঙ্গীত প্রযোজনা সংস্থা ‘টি-সিরিজ’ (T-Series)-এর প্রতিষ্ঠাতা গুলশান কুমার (Gulshan Kumar)-এর নৃশংস হত্যাকাণ্ড।

দিল্লির রাস্তায় ফলের জুস বিক্রি করে জীবন শুরু করা গুলশান কুমার নিজের মেধা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন কোটি কোটি টাকার মিউজিক অ্যাম্পায়ার। 'আশিকি' (Aashiqui) সিনেমার মাধ্যমে তিনি সুরকার জুটি নাদিম-শ্রাবণ (Nadeem-Shravan)-কে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যান। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নাদিম সাইফির সাথে গুলশান কুমারের আর্থিক ও ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। নাদিম অভিযোগ তোলেন, গুলশান কুমার তাঁকে উপযুক্ত সম্মান ও অ্যালবামের সম্মানী দিচ্ছেন না।

প্রতিশোধ নিতে নাদিম সাইফি দুবাইয়ে আবু সালেমের সাথে যোগাযোগ করেন এবং গুলশান কুমারকে পথ থেকে সরাতে ২৫ লাখ রুপি সুপারি (কনট্র্যাক্ট কিলিং) দেন।

১৯৯৭ সালের ১২ই আগস্ট সকাল। মুম্বাইয়ের আন্ধেরীর জীতেন নগরীতে অবস্থিত জিতেশ্বর মহাদেব মন্দিরে যথারীতি পুজো দিতে যান ধর্মপ্রাণ গুলশান কুমার। মন্দির থেকে বের হওয়ার সময় বাইরে ওত পেতে থাকা আবু সালেমের প্রধান হিটম্যান 'রাজা' এবং তার দল গুলশান কুমারকে ঘিরে ফেলে।

সালেম দুবাই থেকে ফোনে নির্দেশ দিয়েছিলেন "ফোন কাটিবি না! গুলশান কুমার মরার সময় কীভাবে বাঁচার জন্য চিল্লায়, সেই আর্তনাদ আমি দুবাইয়ে বসে শুনতে চাই।"

মন্দিরের বাইরে শত শত মানুষের চোখের সামনে রাজা ও তার সহযোগীরা গুলশান কুমারকে লক্ষ্য করে একটার পর একটা গুলি চালাতে থাকে। গুলিবিদ্ধ গুলশান কুমার জীবন বাঁচাতে পাশের একটি পাবলিক টয়লেটে ঢোকার চেষ্টা করেন, কিন্তু পা পিছলে পড়ে যান। সেখানে তাঁকে নির্মমভাবে ৬ রাউন্ড গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ওপেন ফোনে দুবাইয়ে বসে উদযাপনে মেতে ওঠেন আবু সালেম। এই একটি হত্যাকাণ্ড পুরো বলিউডকে ভীতি ও আতঙ্কের এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় নিয়ে যায়।

রাকেশ রোশন, মনীষা কৈরালা ও মেগাস্টারদের হুমকি

গুলশান কুমার হত্যার পর বলিউডের প্রযোজক-পরিচালকরা সালেমের নাম শুনলেই হাতজোড় করে চাঁদা দিতে শুরু করেন।

রাকেশ রোশনকে গুলি (২০০০): ২০০০ সালে হৃতিক রোশন ও আমিশা প্যাটেল অভিনীত 'কহো না... পেয়ার হ্যায়' সিনেমাটি ব্লকবাস্টার হিট হওয়ার পর আবু সালেম বিদেশে সিনেমাটির ডিস্ট্রিবিউশন রাইটস তাঁর সিন্ডিকেটের কাছে জলের দরে বিক্রির দাবি জানান। রাকেশ রোশন অস্বীকৃতি জানালে ২০০০ সালের ২১ জানুয়ারি তাঁর সান্তাক্রুজের অফিসের বাইরে দিনদুপুরে রাকেশ রোশনকে বুক ও বাহুতে দুটি গুলি করে সালেমের লোক। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান রাকেশ রোশন।

মনীষা কৈরালা ও অজিত দেওয়ানি খুন: প্রখ্যাত গ্ল্যামারাস অভিনেত্রী মনীষা কৈরালার কাছে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন সালেম। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় ২০০১ সালে মনীষা কৈরালার ব্যক্তিগত সচিব (Secretary) অজিত দেওয়ানিকে তাঁর নিজের অফিসে ঢুকে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

শাহরুখ, সালমান ও সুভাষ ঘাই: বোম্বে পুলিশ প্রকাশিত অডিও টেপ থেকে জানা যায়, শাহরুখ খান, সালমান খান কিংবা প্রখ্যাত পরিচালক সুভাষ ঘাইকে ফোন করে সালেম অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতেন এবং তাঁর আয়োজিত বিদেশের শো-তে বিনা পারিশ্রমিকে পারফর্ম করার নির্দেশ দিতেন। অন্যথায় পরিণতি গুলশান কুমারের মতো হবে বলে হুমকি দিতেন।

দাউদের সাথে দ্বন্দ্ব ও 'স্বতন্ত্র ডন' হিসেবে আত্মপ্রকাশ

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে এসে আবু সালেমের অহংকার ও ক্ষমতা ডি-কোম্পানির অন্য সদস্যদের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে দাউদ ইব্রাহিমের একছত্র ডানহাত ছোট শাকিল (Chhota Shakeel)-এর সাথে সালেমের তুমুল বিবাদ শুরু হয়।

১৯৯৮ সালে আবু সালেম আনুষ্ঠানিকভাবে দাউদ ইব্রাহিমের ‘ডি-কোম্পানি’ থেকে বের হয়ে আসেন এবং নিজের স্বতন্ত্র ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি দুবাই, কায়রো, দক্ষিণ আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন স্থান থেকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বোম্বেতে চাঁদাবাজি ও হত্যা মিশন চালাতে থাকেন।

ক্যাসানোভা ডন ও মনিকা বেদীর সাথে রূপকথার ধ্বংসাত্মক প্রেম

আবু সালেম কেবল এক দুর্ধর্ষ মাফিয়া ছিলেন না; তিনি ছিলেন দারুণ ক্যাসানোভা স্বভাবের পুরুষ। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন বলিউড সুন্দরীদের একনিষ্ঠ ভক্ত। আজমগড় ও দিল্লির মেকানিক দোকানে বসে ফিল্মি ম্যাগাজিনগুলোতে রূপসী অভিনেত্রীদের ছবি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন তিনি। অপরাধ জগতের শিখরে ওঠার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, কেবল ফোনে হুমকি দেওয়া নয় বলিউডের রূপসীদের হৃদয়েও রাজত্ব করবেন তিনি।

মনিকা বেদীর আগমন ও পরিচয়

১৯৭৫ সালে পাঞ্জাবে জন্ম নেওয়া মনিকা বেদী (Monica Bedi)-র বাবা প্রেম বেদী ছিলেন একজন সুশিক্ষিত চিকিৎসক। তাঁদের পুরো পরিবার স্থায়ীভাবে নরওয়েতে বসবাস করত। ১৯৯২ সালে ১৭ বছর বয়সে মনিকা বিলেতের স্বনামধন্য অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী মনিকার পড়াশোনায় মন বসেনি।

তিনি মুম্বাই চলে আসেন এবং শখের বশে নর্তক গোপী কিষাণ একাডেমিতে নাচ শিখতে শুরু করেন। অনেক চেষ্টা করেও বলিউডের মূল ধারায় সুযোগ পাচ্ছিলেন না মনিকা। 'করণ অর্জুন' সিনেমায় সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পর হতাশ মনিকা প্রযোজক মুকেশ দুগ্গালের মাধ্যমে দুবাইয়ের ফিল্মি পার্টিতে অংশ নেওয়া শুরু করেন।

'আরসালান আলী'র আসল চেহারা

দুবাইতে এক বর্ণাঢ্য পার্টিতে মনিকা বেদীর সাথে পরিচয় হয় এক সুদর্শন, বিত্তশালী পাকিস্তানি ব্যবসায়ীর, যিনি নিজেকে পরিচয় দেন ‘আরসালান আলী’ হিসেবে। আরসালান মনিকাকে দামি গাড়ি, হিরে ও দুবাইয়ের বিলাসবহুল জীবন উপহার দিতে থাকেন। মনিকাকে বলিউডের শীর্ষ অভিনেত্রী বানানোর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

আরসালান আলীর ছায়াতলেই মনিকা পান 'সুরক্ষা', 'জনম সামঝা করো' এবং পরবর্তীতে সঞ্জয় দত্ত ও গোবিন্দার সাথে হিট সিনেমা 'জোড়ি নম্বর ওয়ান' (Jodi No. 1)-এর মূল চরিত্র। সালেম নিজে ফোন করে বহু প্রযোজক-পরিচালককে হুমকি দিয়ে মনিকাকে কাস্ট করতে বাধ্য করতেন।

কিন্তু একদিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয় মনিকাকে। তিনি জানতে পারেন, রোমান্টিক প্রেমিক ‘আরসালান আলী’ আর কেউ নন তিনি ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড গ্যাংস্টার ডন আবু সালেম! ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইন্টারপোল ও মুম্বাই পুলিশের খাতায় মনিকা বেদীর নামও আবু সালেমের সহযোগী হিসেবে যুক্ত হয়ে গেছে।

বিশ্বভ্রমণ ও পলায়ন পর্ব (১৯৯৯–২০০২)

১৯৯৯ সালে ভারত ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকলে সালেম মনিকাকে নিয়ে দুবাই ছেড়ে পালিয়ে যান। তাঁদের কাছে ছিল ভুয়া নামে তৈরি অসংখ্য পাকিস্তানি ও ভারতীয় পাসপোর্ট।

যুক্তরাষ্ট্রে নিবাস: তারা প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ, তারপর কেনিয়ার নাইরোবি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাতে নাম পরিবর্তন করে বসবাস শুরু করেন। সেখানে সালেমের প্রথম স্ত্রী সামিরাও থাকতেন। সালেম যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর অবৈধ উপায়ে অর্জিত কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে ৫টি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, একটি সিনেমা হল এবং কয়েকটি পেট্রোল পাম্প ক্রয় করেন।

৯/১১ পরবর্তী পরিবর্তন: ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত মুসলিম ও সন্দেহভাজন বিদেশীদের ওপর কঠোর নজরদারি শুরু হয়। ধরা পড়ার ভয়ে সালেম মনিকাকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ইউরোপের পর্তুগালে পাড়ি জমান।

লিসবনে গ্রেপ্তার, আন্তর্জাতিক আইনি লড়াই ও ভারতের কাছে হস্তান্তর

২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে 'আরসালান আলী' ও 'সানিয়া মালিক' ছদ্মনামে সুখে দিন কাটাচ্ছিলেন আবু সালেম ও মনিকা বেদী। কিন্তু ততদিনে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই (CBI) এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল (Interpol) তাঁদের ট্র্যাকিং সম্পন্ন করে ফেলেছে।

২০ সেপ্টেম্বর, ২০০২: লিসবনে শুভলগ্ন শেষ

২০০২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর পর্তুগাল পুলিশ এক বিশেষ অভিযানে লিসবনের রাস্তা থেকে ভুয়া পাকিস্তানি নথি বহনের অভিযোগে আবু সালেম ও মনিকা বেদীকে গ্রেপ্তার করে। পুরো ভারতে খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বলিউডের প্রযোজক ও তারকারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। পর্তুগালের স্থানীয় আদালত ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহারের অপরাধে দুজনকে তিন থেকে চার বছরের কারাদণ্ড দেয়।

কূটনৈতিক যুদ্ধ ও পর্তুগাল-ভারত চুক্তি

পর্তুগাল থেকে সালেমকে ভারতে ফিরিয়ে আনা মোটেও সহজ ছিল না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অভিযুক্তকে এমন দেশে প্রত্যর্পণ (Extradition) করা যায় না, যেখানে মৃত্যুদণ্ডের (Death Penalty) বিধান রয়েছে।

ভারতের তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানি ও সিবিআইয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পর্তুগাল সরকারকে অফিসিয়াল ও কূটনৈতিক সার্বভৌম গ্যারান্টি দেন "আবু সালেমকে ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও তাঁর কোনো মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না এবং সাজার মেয়াদ ২৫ বছরের বেশি হবে না।"

এই ঐতিহাসিক চুক্তির পর সুদীর্ঘ ৩ বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৫ সালের নভেম্বরে বিশেষ বিমানে আবু সালেম ও মনিকা বেদীকে মুম্বাই ফিরিয়ে আনা হয়।

আদালতের রায়, সাজা ও অন্ধকার কুঠুরির বাস্তব জীবন

ভারতে আনার পর সালেম ও মনিকা বেদীর পথ আলাদা হয়ে যায়।

মনিকা বেদীর মুক্তি ও পুনর্বাসন

মনিকা বেদীর বিরুদ্ধে ভুয়া পাসপোর্ট তৈরির অপরাধে মামলা চলে। অন্ধ্রপ্রদেশ ও ভোপালের আদালতে সাজার মেয়াদ শেষে তিনি মুক্ত হন। সালেমের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে মনিকা বেদী আবার গ্ল্যামার জগতে ফিরে আসেন এবং 'বিগ বস' (Bigg Boss) ও 'সরস্বতীচন্দ্র'-এর মতো জনপ্রিয় টিভি রিয়্যালিটি শো ও সিরিয়ালে অভিনয় করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন।

আবু সালেমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

আবু সালেমের বিরুদ্ধে প্রায় ডজনখানিক হত্যা, অপহরণ, সন্ত্রাসবাদ ও অবৈধ অস্ত্রের মামলা দায়ের করা হয়।

প্রদীপ জৈন হত্যা মামলা (২০১৫): ১৯৯৫ সালে মুম্বাইয়ের খ্যাতনামা রিয়েল এস্টেট বিল্ডার প্রদীপ জৈনকে হত্যার দায়ে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশেষ টাডা (TADA) আদালত আবু সালেমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

১৯৯৩ মুম্বাই সিরিজ বোমা হামলা মামলা (২০১৭): ২০১৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৩ সালের বোম্বে বিস্ফোরণে সরাসরি অংশ নেওয়া, আরডিএক্স ও একে-৫৬ রাইফেল সরবরাহের দায়ে টাডা আদালত তাকে আবারও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ রুপি জরিমানা করে (সরকারের গ্যারান্টির কারণে তিনি ফাঁসি থেকে বেঁচে যান)।

বর্তমানে নাভি মুম্বাইয়ের তালোজা সেন্ট্রাল জেল (Taloja Jail) এবং মুম্বাইয়ের আর্থার রোড জেলের হাই-সিকিউরিটি বুলেটরুফ আণ্ডারগ্রাউন্ড সেলে দিন কাটছে এই সাবেক মাফিয়া ডনের। বার্ধক্য, একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা এখন তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। যে ডন একসময় ফোনের ওপার থেকে পুরো বলিউড শাসন করতেন, আজ কারারুদ্ধ অন্ধকার কুঠুরি থেকে কেবল মৃত্যুর প্রতীক্ষাই তাঁর একমাত্র নিয়তি।

এক নজরে আবু সালেম: জীবন ও অপরাধ জগতের প্রোফাইল

বিষয় / ক্ষেত্র

বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান

প্রকৃত নাম ও ডাকনাম

আবু সালেম আব্দুল কাইয়ুম আনসারী (রিং নেম: আবু সালেম, ক্যাপ্টেন, আরসালান আলী)।

জন্ম তারিখ ও স্থান

১৯৬৮ (আনুমানিক), সারাই মীর, আজমগড় জেলা, উত্তর প্রদেশ, ভারত।

পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড

বাবা অ্যাডভোকেট কাইয়ুম আনসারী (আইনজীবী), মা জান্নাতুন্নিসা। ৫ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয়।

শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শুরুর কেরিয়ার

৭ম শ্রেণী পর্যন্ত (উর্দু মাধ্যম), আজমগড় ও দিল্লিতে মোটর সাইকেল মেকানিক।

অপরাধ জগতে প্রবেশ

১৯৮৫ সালে মুম্বাই আগমন; আরাসা শপিং সেন্টারে কাজ ও 'ডি-কোম্পানি'র মাধ্যমে অপরাধে পদার্পণ।

মূল অপরাধসমূহ

১৯৯৩ মুম্বাই বোমা হামলায় অস্ত্র সরবরাহ, গুলশান কুমার হত্যা (১৯৯৭), রাকেশ রোশনকে গুলি (২০০০), ব্যাপক চাঁদাবাজি ও স্বর্ণ চোরাচালান।

সম্পদের আনুমানিক পরিমাণ

২০০২ সালে গ্রেপ্তারের সময় প্রায় ৫,০০০ কোটি রুপি (যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও ভারতে আবাসন, সিনেমা হল ও পেট্রোল পাম্প)।

আলোচিত রোমান্টিক সম্পর্ক

প্রথম স্ত্রী সামিরা; পরবর্তীতে বলিউড অভিনেত্রী মনিকা বেদীর সাথে চাঞ্চল্যকর প্রেম ও বিয়ে।

গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণ

২০ সেপ্টেম্বর ২০০২-এ পর্তুগালের লিসবনে আটক; ২০০৫ সালে ভারত সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় হস্তান্তরিত।

বর্তমান আইনি স্থিতি

১৯৯৩ মুম্বাই বিস্ফোরণ ও প্রদীপ জৈন হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড; বর্তমানে নাভি মুম্বাইয়ের তালোজা জেলের বন্দি।

বলিউডের তারকাদের সাথে আবু সালেমের সরাসরি মুখোমুখি সংঘাত

আবু সালেমের হুমকিসংক্রান্ত ফোন কলগুলোর বেশ কিছু অডিও টেপ বোম্বে পুলিশ ও সিবিআই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল। সাংবাদিক অনুপমা চোপড়ার বিখ্যাত গ্রন্থ 'King of Bollywood: Shah Rukh Khan and the Seductive World of Indian Cinema' সহ একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ঘটনার লোমহর্ষক বিবরণ রয়েছে।

শাহরুখ খানের সাথে টেলিফোন দ্বন্দ্ব

নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে আবু সালেম সরাসরি শাহরুখ খানকে ফোন করে হুমকি দেওয়া শুরু করেন। সালেম চেয়েছিলেন শাহরুখ যেন তাঁর ঘনিষ্ঠ এক মুসলিম প্রডিউসারের ছবিতে অভিনয় সই করেন।

শাহরুখ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে সালেমকে বলেছিলেন "আমি আপনাকে বলব না কাকে গুলি করবেন আর কাকে করবেন না, তাই আপনিও আমাকে বলবেন না কার ছবিতে আমি অভিনয় করব আর কার ছবিতে করব না।"

শাহরুখের এই জবাবে সালেম ক্ষুব্ধ হলেও তাঁর সাহসী ব্যক্তিত্ব দেখে অবাক হন। তবে এরপর থেকে দীর্ঘদিন শাহরুখকে বুলেটরুফ গাড়িতে এবং সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পুলিশি প্রহরায় ঘোরাফেরা করতে হয়েছিল।

যশ চোপড়া ও জে পি দত্ত

‘বর্ডার’ (Border) সিনেমা ব্লকবাস্টার হিট হওয়ার পর পরিচালক জে পি দত্তের কাছে সালেম মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। ভয়ে জে পি দত্ত দীর্ঘদিন বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং সিবিআইয়ের শরণাপন্ন হন।

একইভাবে 'দিল তো পাগল হ্যায়' সিনেমার সাফল্যের পর প্রযোজক যশ চোপড়াকেও দুবাই থেকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়। সালেমের ক্যাডাররা বোম্বেতে প্রখ্যাত প্রযোজক ও নির্দেশকদের বাড়ির সামনে চক্কর দিত, যাতে ভয়ের পরিবেশ বজায় থাকে।

আন্ডারওয়ার্ল্ড যেভাবে বলিউডের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত

আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ পর্যন্ত ভারতে চলচ্চিত্র নির্মাণকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বৈধ ‘শিল্প’ (Industry) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে বড় বাজেটের সিনেমার জন্য প্রযোজকদের শরণাপন্ন হতে হতো মাফিয়াদের কাছে।

হুন্ডি ও ওভারসিজ ডিস্ট্রিবিউশন: আবু সালেম ও ডি-কোম্পানি বুঝতে পেরেছিল যে ভারতে সিনেমার টিকিটের চেয়েও বেশি লাভ বিদেশে এর ডিস্ট্রিবিউশন রাইটসে। সালেম জোরপূর্বক সিনেমার ওভারসিজ রাইটস কম দামে নিজের নামে লিখিয়ে নিতেন এবং পরে আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ও দুবাইতে চড়া দামে বিক্রি করে সেই টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ডাইভার্ট করতেন।

বিনামূল্যে শো ও কনসার্ট: আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলোতে বলিউড তারকাদের নিয়ে যেসব বড় বড় মিউজিক্যাল নাইট হতো, সেগুলোর নেপথ্য আয়োজক ছিল সালেমের বেনামী কোম্পানি। সালমান খান, কারিশমা কাপুরদের মতো তারকাদের নামমাত্র বা বিনা পারিশ্রমিকে সেসব শো-তে অংশ নিতে বাধ্য করা হতো।

আবু সালেমের মামলার আপডেট ও প্রত্যর্পণ জটিলতা

পর্তুগাল থেকে ভারতে প্রত্যর্পণের পর সালেমের বিচার প্রক্রিয়া ও সাজার আইনি ইতিহাস আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম জটিল অধ্যায়।

মামলা / ট্রায়াল

অপরাধের বিবরণ

আদালতের চূড়ান্ত রায় ও সাজার স্থিতি

প্রদীপ জৈন হত্যা (১৯৯৫)

মুম্বাইয়ের নামজাদা বিল্ডারকে জমি ছেড়ে না দেওয়ায় হত্যা।

২০১৫ সালে বিশেষ টাডা (TADA) আদালত কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

১৯৯৩ বোম্বে সিরিজ বিস্ফোরণ

গুজরাট সীমান্ত থেকে অস্ত্র ও আরডিএক্স বহন এবং সরবরাহ।

২০১৭ সালে বিচারিক আদালত কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানা।

অজিত দেওয়ানি হত্যা (২০০১)

অভিনেত্রী মনীষা কৈরালার সেক্রেটারিকে চাঁদা না পেয়ে হত্যা।

সালেম ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত।

পর্তুগাল প্রত্যর্পণ চুক্তি (২০০৫)

আন্তর্জাতিক ডিপ্লোম্যাটিক এগ্রিমেন্ট।

২৫ বছরের বেশি সাজা দেওয়া যাবে না শর্তে প্রত্যর্পণ।

কারাকুঠুরিতে গ্যাংওয়ার: জেলের ভেতরেই আবু সালেমের ওপর জোড়া হামলা

পর্তুগাল থেকে ২০০৫ সালে ভারতে ফিরিয়ে আনার পর মনে করা হয়েছিল, বুলেটপ্রুফ সিকিউরিটি ও উচ্চ-সুরক্ষিত জেলের ভেতরে আবু সালেম সুরক্ষিত থাকবেন। কিন্তু মাফিয়াদের রক্তক্ষয়ী শত্রুতা জেলের দেয়াল ভেদ করেও তাঁর পিছু ছাড়েনি। বিশেষ করে দাউদ ইব্রাহিমের চরম শত্রু ছোট রাজন (Chhota Rajan) গ্রুপ সালেমকে চিরতরে খতম করতে জেলের ভেতরেই দু-দুটো মারাত্মক হামলা চালায়।

প্রথম হামলা (২০১০, আর্থার রোড জেল): ২০১০ সালে মুম্বাইয়ের কুখ্যাত আর্থার রোড জেলের হাই-সিকিউরিটি 'হাইভ সেলে' বন্দি ছিলেন সালেম। খাবারের সময় ছোট রাজনের ঘনিষ্ঠ ক্যাডার জগদীশ শেঠি (Jagdish Shetty) তীক্ষ্ণ ধারালো প্লাস্টিকের চামচ ও লোহার টুকরো দিয়ে সালেমের ঘাড়ে ও মুখে উপরিউপরি আঘাত করে। রক্তে ভেসে যান সালেম। অন্যান্য কারারক্ষীরা ছুটে এসে তাকে অলৌকিকভাবে রক্ষা করেন। এই ঘটনার পর তাকে নাভি মুম্বাইয়ের তালোজা সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তরিত করা হয়।

দ্বিতীয় হামলা (২০১৩, তালোজা সেন্ট্রাল জেল): তালোজা জেলে স্থানান্তর করার পরও বিপদ কাটেনি। ২০১৩ সালের ২৭ জুন ছোট রাজনের ভাড়াটে খুনি দেবেন্দ্র জগতাপ (ওরফে জেডি) জেলের ভেতরের অতি-সুরক্ষিত আঙিনায় একটি অবৈধ পয়েন্ট ২২ বোরের রিভলভার নিয়ে হাজির হয়। সালেমকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে দু-রাউন্ড গুলি ছোড়ে জেডি। সালেম ক্ষিপ্রতার সাথে হাত দিয়ে মুখ ঢাকলে একটি গুলি তাঁর ডান হাতের তালু ও কনুই এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়।

গোয়েন্দা প্রশ্ন: বুলেটপ্রুফ নিরাপত্তা বেষ্টনী ও মেটাল ডিটেক্টর ডিঙিয়ে জেলের ভেতর কীভাবে একটি আসল পিস্তল ও গুলি ঢুকেছিল, তা নিয়ে পুরো মহারাষ্ট্র পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তোড়পাড় শুরু হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, জেলের কিছু অসাধু সদস্যকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে কাপড় ও খাবারের আড়ালে অস্ত্রটি ভেতরে পাঠানো হয়েছিল।

পর্তুগাল সরকারের সাথে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ২০২৭ সালে মুক্তি

আবু সালেমের সাজা ও ভারতে অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও আইনি লড়াই সংঘটিত হয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে। পর্তুগাল থেকে সালেমকে হস্তান্তরের সময় ভারত সরকার যে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি (Solemn Sovereign Assurance) দিয়েছিল, তা সালেমের সাজা নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলে।

লালকৃষ্ণ আদভানির প্রতিশ্রুতি ও সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় (২০২২): ২০০২ সালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানি পর্তুগাল সরকারকে লিখিত আশ্বাস দিয়ে জানান, ভারতে আবু সালেমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না এবং তাঁর কারাদণ্ডের মোট মেয়াদ ২৫ বছরের বেশি হবে না।

কিন্তু ভারতের টাডা (TADA) আদালত সালেমকে পৃথক দুটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলে সালেমের আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানান যে, আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে ভারতকে ২৫ বছরের বেশি সাজা দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়নি।

২০২২ সালের জুলাই মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এস কে কাউল এবং বিচারপতি এম এম সুন্দরেশের বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করেন:

  1. ভারত সরকার আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধ এবং পর্তুগালকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বাধ্য।

  2. ২০০২ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর (যেদিন পর্তুগালে সালেম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন) থেকে তাঁর ২৫ বছরের কারাদণ্ডের মেয়াদ গণনা শুরু হবে।

  3. ফলে, সাজার ২৫ বছর পূর্ণ হলে ২০২৭ সালের ১০ই নভেম্বরের মধ্যে ভারত সরকার সালেমকে মুক্তি দিতে বা তাঁর সাজা মওকুফ করতে বাধ্য থাকবে।

‘ক্যাসানোভা ডন’-এর রূপচর্চা ও জেলের ভেতর ফোন-প্রেম

মনিকা বেদীর সাথে বিচ্ছেদের পরও আবু সালেমের জীবনের অদ্ভুত নারীপ্রীতি ও ফ্যাশন সচেতনতা কমেনি। তালোজা জেলের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বন্দি অবস্থাতেও সালেম তাঁর ব্যক্তিত্ব ও রূপচর্চা নিয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন।

লখনউ ট্রেনের 'ফোন-প্রেম' ও বিয়ে বিতর্ক (২০১৪–২০১৫): ২০১৪ সালে লখনউয়ের একটি আদালতে শুনানিতে নেওয়ার সময় ট্রেনে সালেমের সাথে মুম্বাইয়ের মুমব্রা এলাকার ২৫ বছর বয়সী এক তরুণীর পরিচয় ঘটে। অল্প দিনেই তাঁদের মধ্যে নিয়মিত টেলিফোনে যোগাযোগ তৈরি হয়। ২০১৫ সালে সালেম জেলের বিশেষ আদালতের কাছে আবেদন জানান, সেই তরুণীকে তিনি বিয়ে করতে চান এবং তাঁকে প্যারোল (সাময়িক মুক্তি) দেওয়া হোক। জেলের ভেতর থেকেই কাজী ডেকে টেলিফোনে নিকাহ সম্পন্ন করার চেষ্টা নিয়ে পুরো ভারতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল।

বিলাসী জীবন ও সাজগোজ: জেলে থাকা সত্ত্বেও সালেম সর্বদাই প্রেস করা ব্র্যান্ডের পোশাক পরতেন। নিজের চুল রঙ করা (হেয়ার ডাই) এবং বিশেষ আয়ুর্বেদিক সাবান ও প্রসাধনী ব্যবহারের জন্য আদালতের কাছে একাধিকবার বিশেষ অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন এই গ্যাংস্টার।

বলিউডের ‘ব্ল্যাক মানি’ ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের অর্থায়ন

নব্বইয়ের দশকে কেন আবু সালেম বা দাউদ ইব্রাহিম পুরো বলিউডকে মুঠোয় পুরতে পেরেছিলেন, তা বুঝতে হলে তৎকালীন ভারতের চলচ্চিত্র অর্থায়ন ব্যবস্থা জানা প্রয়োজন।

প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের অভাব ও 'আন্ডারওয়ার্ল্ড ফাইন্যান্স'

২০০০ সালের আগে ভারত সরকার বলিউডকে প্রাতিষ্ঠানিক 'শিল্প' (Industry) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে কোনো বড় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিনেমা তৈরির জন্য ঋণ বা ফাইন্যান্স করত না। এই সুযোগটি নেয় বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ড।

দুবাই থেকে সোনা পাচার ও মাদক কারবারের শত শত কোটি টাকা 'হাওয়ালা'র মাধ্যমে মুম্বাইয়ের প্রযোজকদের দেওয়া হতো। সালেমের মতো ডনরা যেসব সিনেমায় টাকা খাটাচ্ছন, সেগুলোর মূল লাভের ৭০-৮০% সরাসরি দুবাই ও করাচিতে চলে যেত।

ক্যাসেট পাইরেসি ও টি-সিরিজ ধ্বংসের নেপথ্য

অডিও ক্যাসেটের যুগে ভারত জুড়ে কোটি কোটি ক্যাসেট বিক্রি হতো। দুবাই থেকে ডি-কোম্পানি ও আবু সালেমের ক্যাডাররা বোম্বেতে মুক্তি পাওয়া প্রতিটা সুপারহিট সিনেমার ভুয়া বা পাইরেটেড ক্যাসেট বানিয়ে রাতারাতি বাজারে ছেড়ে দিত।

গুলশান কুমারের 'টি-সিরিজ' কোম্পানি এই পাইরেসির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এবং অডিও রাইটস পানির দামে মাফিয়াদের হাতে ছাড়তে অস্বীকার করেছিল। সেটিই ছিল গুলশান কুমারকে পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কারণ।

'চোরি চোরি চুপকে চুপকে' মামলা (২০০১)

২০০১ সালে নির্মিত সালমান খান, রানি মুখার্জি ও প্রীতি জিনতা অভিনীত হিট সিনেমা 'চোরি চোরি চুপকে চুপকে' (Chori Chori Chupke Chupke)-র ডিরেক্টর ছিলেন আব্বাস-মাস্তান এবং ফাইন্যান্সার ছিলেন বিখ্যাত হিরে ব্যবসায়ী ভারত শাহ।

মুম্বাই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ ড্যাশবোর্ড ও কল ট্র্যাকিং করে প্রমাণ করে যে, এই সিনেমার পুরো বাজেট সরবরাহ করেছিলেন আবু সালেমের সাবেক সতীর্থ ছোট শাকিল। পুলিশ পুরো সিনেমার রিল বাজেয়াপ্ত করে এবং ভারত শাহকে গ্রেপ্তার করে। এটিই ছিল বলিউডের আন্ডারওয়ার্ল্ড ফান্ডের ওপর পুলিশের সবচেয়ে বড় ধাক্কা।

বলিউডের আন্ডারওয়ার্ল্ড রাজত্বের পতন ঘটল যেভাবে

আবু সালেম গ্রেপ্তার হওয়া এবং ডি-কোম্পানি কোনঠাসা হয়ে পড়ার পেছনে তিনটি মূল কারণ কাজ করেছিল:

ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যাটাস প্রদান (২০০০): ভারত সরকার ২০০০ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শিল্পের মর্যাদা’ দেয়। এর ফলে আইডিবিআই (IDBI) ব্যাংক, ইরোস ইন্টারন্যাশনাল, ধর্ম প্রডাকশন্স এবং যশ রাজ ফিল্মসের মতো কর্পোরেট সংস্থাগুলো বৈধ ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করা শুরু করে। মাফিয়াদের অবৈধ কাঁচা টাকার প্রয়োজন চিরতরে শেষ হয়ে যায়।

মুম্বাই পুলিশের এনকাউন্টার স্কোয়াড: প্রদীপ শর্মা, দয়া নায়ক, বিজয় সালস্কার ও শচীন ওয়াজেদের মতো দুর্ধর্ষ এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট অফিসারদের হাতে একে একে মারা পড়ে সালেম ও দাউদ ইব্রাহিমের শতাধিক শুটার ও ইনফর্মার।

এমসিওসিএ (MCOCA) আইন: সংগঠিত অপরাধ দমনে মহারাষ্ট্র সরকার MCOCA (Maharashtra Control of Organised Crime Act) প্রয়োগ করে। এতে মাফিয়াদের সাথে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা ফোনে কথা বলা প্রমাণিত হলেই প্রযোজক ও তারকাদের সরাসরি জেলে পাঠানোর কঠোর নিয়ম চালু হয়।

বলিউডের প্রকৃত ডনের পতনের চিরস্থায়ী শিক্ষা

আবু সালেমের এই উত্থান ও পতনের কাহিনী প্রমাণ করে যে, অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত ৫,০০০ কোটি টাকার সাম্রাজ্য, বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, বিদেশের সিনেমা হল কিংবা রূপসী নারীদের সঙ্গ কোনো কিছুই জীবনের শেষ পরিণতি রক্ষা করতে পারে না।

আজমগড়ের মোটর গ্যারেজে ১০০ টাকা দিয়ে জীবন শুরু করে ৫,০০০ কোটি টাকার মালিক হওয়া এবং বলিউডের সুন্দরীদের নিয়ে বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়ানোকে আপাতদৃষ্টিতে রূপকথার গল্প মনে হলেও, তার শেষ পরিণতি হয়েছে কারাগারের অন্ধকার চার দেওয়ালে। গুলশান কুমারের রক্ত কিংবা নিঃশ্বাসের আর্তনাদ যে ঈশ্বর বা নিয়তি ভুলে যাননি, তা সালেমের বর্তমান জীবনই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

রুপালী পর্দার ‘ডন’ সিনেমায় অমিতাভ বা শাহরুখের সংলাপ শুনে সিটি বাজানো সহজ, কিন্তু বাস্তব জীবনের 'ডন' আবু সালেম ছিলেন সেই অন্ধকার অভিশাপ, যা বলিউডের ইতিহাসকে বছরের পর বছর ধরে রক্ত ও আতঙ্কে রঞ্জিত করে রেখেছিল। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে কোনো নায়ক হিসেবে নয়; বরং বলিউডের অন্দরমহলের এক নির্মম, ছদ্মবেশী ও ধ্বংসাত্মক 'মূর্তিমান আতঙ্ক' হিসেবে।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.