ভারতের ইতিহাসের শীর্ষ ১০ জন গ্যাংস্টার ডন - ভারতের আন্ডারওয়ার্ল্ড

অন্ধকার জগতের কোনো নিজস্ব সীমানা থাকে না; কিন্তু সেই জগতের কিছু চরিত্র এমন এক ইতিহাস তৈরি করে, যা আস্ত একটি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, বিনোদন জগৎ এবং সামাজিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলে। ভারতের সংগঠিত অপরাধ এবং মাফিয়া জগতের ইতিহাস বহু বছরের পুরনো। এটি কেবল মুম্বাইয়ের অপরাধ সিন্ডিকেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং উত্তর ভারতের রক্তক্ষয়ী 'বাহুবলী' সংস্কৃতি, কিংবা দক্ষিণ ভারতের গহীন অরণ্যের ভয়াল দস্যুরাজের রূপ নিয়ে সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
উপকূলীয় বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বাই) বন্দরকেন্দ্রিক সোনা ও বিদেশি পণ্যের চোরাচালান থেকে শুরু করে ভারতের রিয়েল এস্টেট দখল, বলিউড তারকাদের ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার চাঁদা আদায়, জাল নোটের ব্যবসা, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ এবং রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ভারতের আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিবর্তন ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী ও রোমাঞ্চকর।
এই নিবন্ধে আমরা ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী ১০ জন গ্যাংস্টার ডনের উত্থান, তাদের তৈরি অপরাধ সাম্রাজ্য, আন্ডারওয়ার্ল্ডের কৌশল এবং তাদের চূড়ান্ত পরিণতি বিশ্লেষণ করব।
ভারতে সংগঠিত অপরাধের বিবর্তন ও বিকাশ
ভারতের আন্ডারওয়ার্ল্ড বা মাফিয়া সংস্কৃতিকে প্রধানত চারটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পর্বে ভাগ করা যায়:
বোম্বাইয়ের প্রথম প্রকাশি মাফিয়া (১৯৫০-১৯৭০): স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে উচ্চ ট্যাক্স এবং আমদানি নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে বোম্বে বন্দরে বিদেশি ঘড়ি, সোনা এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর বিশাল চোরাচালান চক্র গড়ে ওঠে। এই সময়টিতে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রক ছিলেন হাজী মাস্তান, করিম লালা এবং বরদারাজন মুদালিয়ারের মতো ব্যক্তিরা, যারা মূলত অহিংস উপায়ে আর্থিক নেটওয়ার্ক চালাতেন।
রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ার ও ডি-কোম্পানি (১৯৮০-১৯৯০): আশির দশকে সুদের ব্যবসা, জুয়া এবং চোরাচালানের জায়গা দখল করে চরম সহিংসতা, রিয়েল এস্টেট চাঁদাবাজি এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা। এই সময়ে দাউদ ইব্রাহিম এবং ছোট রাজনের উত্থান ঘটে, যারা পুরনো সিন্ডিকেট ভেঙে অস্ত্রের জোরে পুরো শহর দখল করে।
আন্তর্জাতিকীকরণ ও সন্ত্রাসবাদ (১৯৯৩ পরবর্তী): ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা হামলার পর আন্ডারওয়ার্ল্ডের চরিত্র রাতারাতি বদলে যায়। সাধারণ অপরাধ সিন্ডিকেট রূপ নেয় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কে। মাদক, হাওলা এবং আন্তর্জাতিক ফিক্সিং চক্র ভারতের আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
উত্তর ভারতের 'বাহুবলী' রাজনীতি: মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড যখন নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করে, তখন উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চল (পূর্বাঞ্চল) ও বিহারে জমি দখল, সরকারি ঠিকাদারি এবং রাজনৈতিক শক্তির জোরে গ্যাংস্টারদের উদয় হয়। মুখতার আনসারী ও আতিক আহমেদের মতো অপরাধীরা সশরীরে সংসদে ও বিধানসভায় পৌঁছে যান।
দক্ষিণ ভারতের আঞ্চলিক দস্যুতা: মুম্বাই বা উত্তর ভারতের নগরকেন্দ্রিক অপরাধের বিপরীতে দক্ষিণ ভারতে দেখা যায় ভিন্ন রূপ যেখানে বীরপ্পনের মতো অপরাধীরা প্রাকৃতিক সম্পদ (চন্দন কাঠ ও হাতির দাঁত) লুট করে প্রায় তিন দশক ধরে সমান্তরাল প্রশাসন পরিচালনা করে।
ভারতের শীর্ষ ১০ গ্যাংস্টার ডনের বিস্তারিত বিবরণ
১. হাজী মাস্তান (Haji Mastan)
পূর্ণ নাম: মাস্তান হায়দার মির্জা (১৯২৬ – ১৯৯৪)
কার্যক্ষেত্র: দক্ষিণ মুম্বাই, বোম্বে ডকইয়ার্ড (বন্দর) ও তৎকালীন বোম্বে শহর
উত্থান ও অপরাধ সাম্রাজ্য: তামিলনাড়ুর কুড্ডালোর জেলার একটি দরিদ্র তামিল মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া মাস্তান হায়দার মির্জা মাত্র আট বছর বয়সে (১৯৩৪ সালে) বাবার সাথে ভাগ্যান্বেষণে বোম্বেতে আসেন। বোম্বাইয়ের ক্রফোর্ড মার্কেটে বাবার ছোট সাইকেল মেরামতের দোকানে কাজ করে তাঁর শৈশব কাটে। পরবর্তীতে তিনি বোম্বে পোর্ট ট্রাস্টে (ডকইয়ার্ড) কুলি হিসেবে কাজ শুরু করেন। কাজ করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন যে, ভারতীয় শুল্ক বিভাগকে ফাঁকি দিয়ে বিদেশি জিনিসপত্র দেশে আনার বিশাল চাহিদা রয়েছে। এই সময় গালফ বা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল (বিশেষ করে দুবাই ও কুয়েত) থেকে আসা জাহাজগুলো থেকে বিদেশি ঘড়ি, সোনা, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী এবং রেয়ন কাপড়ের পাচার শুরু হয়।
ষাট ও সত্তরের দশকে গুজরাটের প্রভাবশালী পাচারকারী সুকুর নারায়ণ বাখিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে হাজী মাস্তান বোম্বাই বন্দরের মাধ্যমে সোনা ও বিদেশি পণ্য চোরাচালানের প্রধান সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। কয়েক বছরের মধ্যে বোম্বে বন্দরে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে সোনা পাচারের একচ্ছত্রাধিপতি হয়ে ওঠেন তিনি।
জীবনধারা: হাজী মাস্তান তৎকালীন বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যান্য মাফিয়াদের চেয়ে একদম আলাদা ছিলেন। তিনি নিজেকে গ্যাংস্টার না বলে 'পণ্য সমন্বয়কারী' বা ব্যবসাহী হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। তিনি কখনো নিজের হাতে কোনো অস্ত্র স্পর্শ করেননি, কাউকে সরাসরি হত্যা করেননি বা সহিংস গ্যাংওয়ারে জড়িত হননি। তিনি অপরাধ সাম্রাজ্য চালাতেন বুদ্ধি, অর্থ, প্রভাব এবং পুলিশ, কাস্টমস ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে।
মাস্তানের জীবনধারা ছিল অত্যন্ত বিলাসবহুল। তিনি সর্বদা খাঁটি সাদা সিল্কের পোশাক পরতেন, পায়ে থাকত সাদা জুতো, হাতে দামী বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিগারেট এবং চলাচলের জন্য ব্যবহার করতেন একটি সাদা মার্সিডিজ গাড়ি।
বলিউডের সাথে সম্পর্ক ও রবিন হুড ভাবমূর্তি: তিনিই ছিলেন বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রথম ব্যক্তি যিনি হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প বা বলিউডে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ শুরু করেন। ফিল্ম ফাইনান্সিং ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তিনি তৎকালীন প্রযোজক, পরিচালক ও শীর্ষ তারকাদের (যেমন: দিলীপ কুমার, দেব আনন্দ, অমিতাভ বচ্চন, রাজ কাপুর) কাছাকাছি চলে আসেন। তিনি 'চৌকিদার' সহ কয়েকটি চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছিলেন। হিন্দি চলচ্চিত্রের বিখ্যাত চরিত্র বা ছবি (যেমন ১৯৭৫ সালের অমিতাভ বচ্চন অভিনীত কালজয়ী চলচ্চিত্র 'দিওয়ার') হাজী মাস্তানের বাস্তব জীবনের ওপর ভিত্তি করেই সেলিম-জাভেদ জুটি রচনা করেছিলেন। তৎকালীন বোম্বাইয়ের দরিদ্র ও বস্তিবাসী মানুষের কাছে তিনি একজন সাহায্যকারী 'রবিন হুড' হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কারণ তিনি তাঁর উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ দরিদ্রদের মাঝে দান করতেন।
রাজনৈতিক জীবন ও পরিণতি: ১৯৭৫ সালে ভারতে জরুরি অবস্থা (Emergency) জারি করা হলে ঐতিহাসিক 'মিজোরা' বা MISA (Maintenance of Internal Security Act) আইনের অধীনে হাজী মাস্তানকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়। কারাবাসকালীন সময়ে তিনি লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ এবং সুফি সাধকদের আদর্শে প্রভাবিত হন। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অপরাধ জগত ত্যাগ করেন।
অপরাধ জগত ছাড়ার পর ১৯৮৪ সালে তিনি 'দলিত মুসলিম সুরোক্ষা মহাজোট' (যা পরবর্তীতে 'ভারতীয় মাইনোরিটি সুরোক্ষা মহাসংঘ' নামে পরিচিত হয়) গঠন করেন। এই দলিত-মুসলিম রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়কে সংগঠিত করা এবং সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৯৪ সালের ৯ মে ৬৮ বছর বয়সে বোম্বাইয়ের বিখ্যাত ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়।
২. করিম লালা (Karim Lala)
পূর্ণ নাম: আব্দুল করিম শের খান (১৯১১ – ২০০২)
কার্যক্ষেত্র: দক্ষিণ মুম্বাই (ডোংরি, নাগপাড়া, ভিন্ডি বাজার, গ্রান্ট রোড)
উত্থান ও অপরাধ সাম্রাজ্য: আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশে জন্ম নেওয়া পশতুন (পাঠান) বংশোদ্ভূত করিম লালা ১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে বোম্বাইয়ে আসেন। বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সর্বজ্যেষ্ঠ ও আদি মাফিয়া ডন হিসেবে তাঁকে "বোম্বাইয়ের মূল গডফাদার" বলা হতো। প্রাথমিক জীবনে বোম্বে ডকে কুলি ও সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও দ্রুতই তিনি দক্ষিণ বোম্বাইয়ে বসবাসকারী আফগান ও পাঠান অভিবাসীদের সংগঠিত করে একটি দুর্ধর্ষ বাহিনী গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসজুড়ে "পাঠান গ্যাং" বা "পশতুন গ্যাং" নামে পরিচিত লাভ করে।
করিম লালার অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল ভিত্তি ছিল বেআইনি সুদের কারবার (দাদন ব্যবসা), মদের অবৈধ ভাট্টি ও জুয়ার আড্ডা (মটকা) পরিচালনা করা, কসাইখানা নিয়ন্ত্রণ, আফিম ও হাশিশ পাচার এবং বলপূর্বক জমি ও সম্পত্তি দখল করা। দক্ষিণ বোম্বাইয়ের ডোংরি, নাগপাড়া, ভিন্ডি বাজার ও গ্রান্ট রোড এলাকা ছিল তাঁর শক্ত ঘাঁটি।
নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা ও সামাজিক প্রভাব: করিম লালা বোম্বাইয়ের সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং এমনকি চলচ্চিত্র জগতের কলাকুশলীদের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নিজস্ব এক আদালত চালাতেন, যাকে বলা হতো 'দরবার'। দক্ষিণ বোম্বাইয়ের মানুষ আইনি আদালতের চেয়ে করিম লালার 'দরবারে' গিয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার বা সমাধান পেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। সেখানে তিনি সালিশি করে আর্থিক বা সম্পত্তিগত বিবাদ মিটিয়ে দিতেন।
ত্রি-মুখী চুক্তি ও রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ার: সত্তরের দশকে রক্তপাত এড়াতে করিম লালা, হাজী মাস্তান এবং তামিলনাড়ু থেকে আসা বরদারাজন মুদালিয়ার এই তিনজন মিলে পুরো বোম্বাই শহরকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। এই চুক্তিতে হাজী মাস্তান বোম্বে বন্দর ও পাচার বাণিজ্য, বরদারাজন মধ্য বোম্বাই ও তামিল অধ্যুষিত অঞ্চল এবং করিম লালা দক্ষিণ বোম্বাইয়ের ব্যবসা ও অপরাধ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
তবে আশির দশকের শুরুতে বোম্বাইয়ের অপরাধ জগতে উদীয়মান গ্যাংস্টার দাউদ ইব্রাহিম ও তাঁর ভাই শাবির কাসকারের (যাঁরা ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল ইব্রাহিম কাসকারের সন্তান) উত্থান ঘটে। দাউদ বাহিনী পাঠান গ্যাংয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য ও সুদের ব্যবসাকে চ্যালেঞ্জ জানালে বিবাদ চরমে ওঠে। ১৯৮১ সালে করিম লালার ভাইপো সামাদ খান এবং গ্যাংয়ের শীর্ষ ক্যাডার আমির জাদা মিলে দাউদের ভাই শাবির কাসকারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনা বোম্বাইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ারের জন্ম দেয়। প্রতিশোধ হিসেবে দাউদ ইব্রাহিম একে একে পাঠান গ্যাংয়ের প্রধান চালিকাশক্তিদের হত্যা করে; ১৯৮৬ সালে বিকেসি-তে সামাদ খানও দাউদের শুটারদের হাতে নিহত হন।
পরিণতি: দাউদের গ্যাংয়ের সাথে পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ভাইপো সামাদ খানসহ মূল সহযোগীদের হারিয়ে পাঠান গ্যাংয়ের শক্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। বার্ধক্য, শারীরিক অসুস্থতা এবং গ্যাংয়ের পরাজয়ের কারণে আশির দশকের শেষভাগে করিম লালা অপরাধ জগত থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন। ২০০২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৯১ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে বার্ধক্যজনিত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই আদি গডফাদারের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়।
৩. বরদারাজন মুদালিয়ার (Varadarajan Mudaliar)
পূর্ণ নাম: বরদারাজন মুদালিয়ার (১৯২৬ – ২ জানুয়ারি ১৯৮৮)
অন্যান্য নাম: বরধা ভাই, বরধারাজন
কার্যক্ষেত্র: মধ্য ও উত্তর মুম্বাই (ধারাভি, মাতুঙ্গা, সায়ন, কোলিওয়াড়া, বোম্বে পোর্ট ডক এলাকা)
প্রাথমিক জীবন ও মুম্বাইয়ে আগমন: তামিলনাড়ুর তুতিকোরিন (Tuticorin) বা মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির তোণ্ডাইমণ্ডলাম অঞ্চলে ১৯২৬ সালে একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন বরদারাজন মুদালিয়ার। ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে জীবিকার তাগিদে তিনি তদানিন্তন বোম্বে শহরে পাড়ি জমান। বোম্বাই শহরের ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস (VT) রেলওয়ে স্টেশনে (বর্তমান ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ টার্মিনাস) একজন সাধারণ কুলি (পোর্টার) হিসেবে তাঁর কাজের সূচনা ঘটে। রেলওয়ে স্টেশনে কাজ করার ফাঁকেই তিনি রেলওয়ে ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মালবাহী ট্রেন থেকে চাল, গম ও চিনি চুরির ক্ষুদ্র অপরাধের মাধ্যমে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের প্রথম পদক্ষেপ ফেলেন। পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে তিনি রেললাইন সংলগ্ন দক্ষিণ ভারতীয় অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বেআইনি চোলাই মদ বিক্রির ব্যবসায় নামেন।
উত্থান ও অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তার: ষাট ও সত্তরের দশকে দক্ষিণ ভারত (বিশেষ করে তামিলনাড়ু) থেকে জীবিকার খোঁজে হাজার হাজার তামিল অভিবাসী বোম্বাইয়ে আসতে শুরু করে এবং ধারাভি, মাতুঙ্গা, সায়ন ও কোলিওয়াড়া এলাকায় বিশাল ঝুপড়ি বসতি গড়ে তোলে। স্থানীয় বোম্বাইবাসীদের বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বরদারাজন এই তামিল জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন।
সত্তরের দশকে তিনি ধারাভিতে নিজের এক অপ্রতিহত অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে বোম্বে অপরাধ জগতের তিন মূল স্তম্ভ বা 'ত্রিমূর্তি'র (হাফিজ মস্তান, করিম লালা এবং বরদারাজন মুদালিয়ার) অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর অপরাধ সাম্রাজ্যের প্রধান দিকগুলো ছিল:
বেআইনি মদ ও চোলাই সিন্ডিকেট: ধারাভির জলাভূমি ও আঁকাবাঁকা ঝুপড়ি গলিতে শত শত বেআইনি চোলাই মদের (হাতভাটি) কারখানা গড়ে তোলেন, যা গোটা বোম্বাই শহরের চোলাই মদের চাহিদা মেটাত।
কাস্টমস চোরাচালান ও ডক নিয়ন্ত্রণ: বোম্বে পোর্টের ডক শ্রমিক ইউনিয়ন ও মাল খালাসের কাজ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে সোনা, ঘড়ি ও দামি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী চোরাচালান করতেন।
সুদের কারবার ও চাঁদাবাজি: স্থানীয় ব্যবসায়ী, বস্তিবাসী ও কুলি-শ্রমিকদের উচ্চ সুদে ঋণ প্রদান এবং বিশাল অঙ্কের নিয়মিত তোলা আদায় করতেন।
রিয়েল এস্টেট দখল: ধারাভি ও মাতুঙ্গা এলাকার সরকারি-বেসরকারি জমি জবরদখল করে অবৈধ আবাসন ও দোকানপাট নির্মাণ করে কোটি কোটি টাকা আয় করতেন।
বিকল্প বিচার ব্যবস্থা ও সামাজিক প্রভাব: বরদারাজন কেবল একজন গ্যাংস্টার ছিলেন না; তিনি ধারাভি এলাকায় নিজস্ব একটি সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থা ও বিকল্প আদালত পরিচালনা করতেন, যা "বরধার দরবার" নামে পরিচিত ছিল। সরকারি পুলিশ প্রশাসন বা আদালতের ওপর অনাস্থা থাকা স্থানীয় তামিল জনগণ যেকোনো জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক ঝামেলা, আর্থিক লেনদেন বা সামাজিক গোলযোগের মীমাংসার জন্য সরাসরি বরধার দরবারে হাজির হতো। বরধার প্রদত্ত বিচার উভয় পক্ষই মেনে নিতে বাধ্য হতো।
নিজের অবৈধ আয়ের বিপুল অংশ তিনি সামাজিক ও ধর্মীয় কাজে ব্যয় করতেন। মাতুঙ্গার বিখ্যাত ভজন সমাজ এবং মাতুঙ্গা গণেশ উৎসবে তিনি বিপুল অর্থ দান করতেন। মাতুঙ্গার গণেশ উৎসবকে তিনি এক বিশাল আড়ম্বরপূর্ণ সামাজিক উৎসবে পরিণত করেন, যেখানে সাধারণ দরিদ্র তামিলদের মাঝে জামাকাপড় ও খাবার বিতরণ করা হতো। এর ফলে অপরাধ জগতে ভয়ের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি পরম নির্ভরযোগ্য নেতা বা 'বরধা ভাই' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
পপ কালচার ও চলচ্চিত্রে প্রভাব: বরদারাজন মুদালিয়ারের বাস্তব জীবনের ঘটনা ও নাটকীয় উত্থান-পতন ভারতীয় চলচ্চিত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছিল:
নায়কান (Nayakan - 1987): প্রখ্যাত নির্মাতা মনি রত্নমের কালজয়ী তামিল চলচ্চিত্র 'নায়কান'-এ কমল হাসান অভিনীত 'ভেলু নায়কার' চরিত্রটি সম্পূর্ণভাবে বরদারাজনের জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।
অগ্নিপথ (Agneepath - 1990) ও দয়ালবান (Dayavan - 1988): বলিউড চলচ্চিত্র 'দয়ালবান' (বিনোদ খান্না অভিনীত) ছিল 'নায়কান'-এর সরাসরি রিমেক। এছাড়া অমিতাভ বচ্চন অভিনীত 'অগ্নিপথ' ছবিতে বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই দক্ষিণ ভারতীয় নেটওয়ার্কের ছায়া স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
পুলিশি অভিযান, পতন ও মৃত্যু: ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে বোম্বে পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের তৎকালীন অদম্য ডিসিপি (DCP) ওয়াই সি পাওয়ার (Yashowardhan Chandrakant Pawar) বরদারাজনের অপরাধ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব অভিযান শুরু করেন। ডিসিপি পাওয়ার কোনো রাজনৈতিক চাপ তোয়াক্কা না করে ধারাভি ও মাতুঙ্গায় একের পর এক বেআইনি মদের কারখানা, জুয়ার ঠেক এবং চোরাচালান সিন্ডিকেট ধ্বংস করে দেন। একের পর এক ডানের গ্রেফতার ও আর্থিক নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বরদারাজনের ক্ষমতা একদম নিঃশেষ হয়ে যায়।
গ্রেফতারি এড়াতে এবং বোম্বে পুলিশের লাগাতার অভিযানে টিকতে না পেরে ১৯৮০-র দশকের শেষভাগে তিনি বোম্বে ছেড়ে তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ে পালিয়ে যান। তাঁর অনুপস্থিতিতে মুম্বাইয়ের দক্ষিণ ভারতীয় মাফিয়া সাম্রাজ্য পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ১৯৮৮ সালের ২ জানুয়ারি চেন্নাইয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬২ বছর বয়সে বরদারাজন মুদালিয়ার মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর মাফিয়া ডন হাফিজ মস্তান একটি চার্টার্ড বিমানে করে বরদারাজনের দেহ চেন্নাই থেকে মুম্বাই নিয়ে আসেন, যেখানে ধারাভির হাজার হাজার সাধারণ মানুষ তাঁর শেষযাত্রায় অংশ নেয়।
৪. দাউদ ইব্রাহিম (Dawood Ibrahim)
পূর্ণ নাম: দাউদ ইব্রাহিম কাসকার (জন্ম: ২৬ ডিসেম্বর ১৯৫৫)
অন্যান্য নাম: ভাই, বিগ বস, ডন
কার্যক্ষেত্র: মুম্বাই, করাচি, দুবাই, লন্ডন এবং বিশ্বব্যাপী অপরাধ সিন্ডিকেট Network
প্রাথমিক জীবন ও আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রবেশ: মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি জেলার খেদ এলাকায় ২৬ ডিসেম্বর ১৯৫৫ সালে জন্ম নেন দাউদ ইব্রাহিম কাসকার। তাঁর বাবা ইব্রাহিম কাসকার ছিলেন বোম্বে পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের একজন অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান কনস্টেবল। তবে বাবার সততার সম্পূর্ণ বিপরীত পথ বেছে নিয়ে তরুণ বয়সেই দাউদ অপরাধের অন্ধকার জগতে পা বাড়ান। মুম্বাইয়ের ডোংরি এলাকায় বেড়ে ওঠা দাউদ আহমেদ সাইলানি হাই স্কুলে পড়াশোনা করলেও বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেননি।
শুরুতে ছোটখাটো চুরি, পকেটমারি, তোলাবাজি ও স্থানীয় মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে নিজের বড় ভাই সাবির কাসকারকে সাথে নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন উঠতি তরুণকে একত্রিত করে গঠন করেন 'বাইচুলা গ্যাং' (Byculla Gang)। প্রথমদিকে তারা ছোটখাটো জুয়ার ঠেক পরিচালনা ও চোরাচালানিদের মালামাল পাহারা দেওয়ার কাজ করতেন।
গ্যাংওয়ার, উত্থান ও 'ডি-কোম্পানি'র প্রতিষ্ঠা: সত্তরের দশকে বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল আফগান ভিত্তিক 'পাঠান গ্যাং' (যার নেতৃত্বে ছিলেন করিম লালা, আমীর জাদা ও আলমজেব)। কাস্টমস চোরাচালান ও এলাকা দখল নিয়ে বায়চুলা গ্যাংয়ের সাথে পাঠান গ্যাংশের ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়।
১৯৮১ সালে পাঠান গ্যাংয়ের সদস্যরা অত্যন্ত নির্মমভাবে দাউদের বড় ভাই সাবির কাসকারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড বোম্বাইয়ের ইতিহাসকে বদলে দেয়। ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে দাউদ ইব্রাহিম এক অভূতপূর্ব হিংসাত্মক গ্যাংওয়ার শুরু করেন। ছোট রাজান (Chhota Rajan), অরুণ গাওলি (Arun Gawli) এবং ছোট শাকিলকে (Chhota Shakeel) সাথে নিয়ে দাউদ একের পর এক পাঠান গ্যাংয়ের শীর্ষ নেতাদের (আমীর জাদা, আলমজেব) হত্যা করে পাঠান সিন্ডিকেটকে ধ্বংস করে দেন।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাঠান গ্যাংকে বোম্বে থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দাউদ ইব্রাহিম বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র সম্রাট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি তাঁর গ্যাংয়ের আধুনিকায়ন ঘটান এবং নতুন নাম দেন "ডি-কোম্পানি" (D-Company)। এই সিন্ডিকেট কেবল বোম্বেতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং দুবাই হয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত কর্পোরেট ধাঁচে নেটওয়ার্ক বিস্তার করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ সাম্রাজ্য ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক: ডি-কোম্পানি প্রথাগত রাস্তার অপরাধ ছেড়ে এক বিশাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক মাফিয়া সিন্ডিকেটে পরিণত হয়। দাউদের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের প্রধান স্তম্ভগুলো ছিল:
মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান: আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে গোল্ডেন ক্রিসেন্ট রুটে বিশ্বব্যাপী হেরোইন, চরাস ও মানড্রাক্স (Mandrax) পাচার এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালান।
হাওলা ও জাল নোট (FICN): বেআইনি অর্থ আদান-প্রদানের জন্য নিজস্ব আন্তর্জাতিক হাওলা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং ভারতে জাল রুপি পাচার করে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
বলিউড ও আবাসন খাতে চাঁদাবাজি: মুম্বাইয়ের বিখ্যাত বিল্ডার, শিল্পপতি এবং বলিউড প্রযোজক-পরিচালকদের ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার তোলা আদায় ও বেনামে চলচ্চিত্র অর্থায়ন।
ক্রিকেট ম্যাচ ফিক্সিং: আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ, বিশেষ করে শারজাহ ও অন্যান্য ওয়ানডে টুর্নামেন্টে কোটি কোটি ডলারের বেটিং ও স্পট ফিক্সিং সিন্ডিকেট পরিচালনা।
১৯৯৩ মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা হামলা: ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং তৎপরবর্তী বোম্বে দাঙ্গার পর দাউদ ইব্রাহিম উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ বোম্বাই শহরে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ ধারাবাহিক বোমা হামলা চালানো হয়। বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ, এয়ার ইন্ডিয়া বিল্ডিং, প্লাজা সিনেমা এবং পাসপোর্ট অফিসসহ শহরের ১২টি গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল স্থানে পরপর শক্তিশালী আরডিএক্স (RDX) বিস্ফোরণ ঘটে।
এই নৃশংস হামলায় ২৫৭ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান এবং ৭০০-র বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হন। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর সহযোগিতায় দাউদ ইব্রাহিম, তাঁর ডান হাত ছোট শাকিল এবং টাইগার মেমন (Tiger Memon) যৌথভাবে এই হামলার ষড়যন্ত্র, বিস্ফোরক সরবরাহ, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন করেছিলেন।
পলাতক জীবন, বৈশ্বিক সন্ত্রাসী ঘোষণা ও বর্তমান অবস্থান: ১৯৯৩ সালের বোমা হামলার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে দাউদ ইব্রাহিম ভারত ছেড়ে দুবাই পালিয়ে যান। পরবর্তীতে ভারতের আন্তর্জাতিক চাপ ও প্রত্যর্পণ দাবির মুখে তিনি দুবাই ত্যাগ করে পাকিস্তানের করাচিতে স্থায়ী আশ্রয় নেন।
গ্লোবাল টেররিস্ট ঘোষণা: ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (US Department of the Treasury) এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC Resolution 1267) দাউদ ইব্রাহিমকে "বিশেষভাবে চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী" (Specially Designated Global Terrorist) হিসেবে ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা রিপোর্টে লস্কর-ই-তৈয়েবা এবং আল-কায়েদার সাথে তাঁর সরাসরি অর্থনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগের প্রমাণ মেলে।
মোস্ট ওয়ান্টেড ও করাচিতে আশ্রয়: তিনি ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড রেড কর্নার নোটিশের শীর্ষে রয়েছেন। পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে দাউদের উপস্থিতির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করলেও, আন্তর্জাতিক তথ্য ও গোয়েন্দা নথিপত্রে প্রমাণিত যে তিনি করাচির অভিজাত ক্লিফটন (Clifton) এলাকায় পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় বসবাস করছেন।
৫. ছোট রাজন (Chhota Rajan)
পূর্ণ নাম: রাজেন্দ্র সদাশিব নিকালজে (জন্ম: ১৯৬০)
কার্যক্ষেত্র: মুম্বাই, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া
উত্থান: মুম্বাইয়ের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত মারাঠি পরিবারে জন্ম নেওয়া রাজেন্দ্র খুব অল্প বয়সেই অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন। চেম্বুরের সাহাকার সিনেমা হলের সামনে টিকিটের কালোবাজারি দিয়ে তাঁর অপরাধ জীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে তিনি তিলক নগর এলাকায় সক্রিয় গ্যাংস্টার রাজান নায়ার (ওরফে 'বড় রাজন')-এর দলে যোগ দেন। দ্রুতই তিনি বড় রাজনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত পাত্রে পরিণত হন। ১৯৮৩ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল কুঞ্জু গ্যাংয়ের হাতে বড় রাজন নিহত হলে রাজেন্দ্র গ্যাংয়ের নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন এবং নিজেকে "ছোট রাজন" নামে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরে বড় রাজনের হত্যার প্রতিশোধ নিতে তিনি আব্দুল কুঞ্জুকে এক ফুটবল ম্যাচ চলাকালে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেন।
ডি-কোম্পানিতে উত্থান ও নেটওয়ার্ক বিস্তার: বড় রাজনের মৃত্যুর পর প্রতিপক্ষ গ্যাংয়ের চাপ সামলাতে ছোট রাজন দাউদ ইব্রাহিমের সাথে হাত মেলান এবং তাঁর দল ডি-কোম্পানির সাথে একীভূত হয়। ১৯৮৬ সালে মুম্বাই পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান ও করিম লালার ভাইপো সামাদ খানের গ্যাংয়ের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মুখে দাউদ ইব্রাহিম দুবাই পালিয়ে গেলে মুম্বাইয়ে ডি-কোম্পানির মূল মাঠপর্যায়ের অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব পান ছোট রাজন। ছোট রাজন মুম্বাইয়ের চাঁদাবাজি, অবৈধ জমি দখল, সোনা ও হিরে চোরাচালান এবং বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ভয়ভীতি দেখিয়ে হাপ্তা আদায়ের সুবিশাল নেটওয়ার্ক একক হাতে পরিচালনা শুরু করেন। ছোট শাকিল ও শরদ শেট্টির পাশাপাশি দাউদ ইব্রাহিমের প্রধান সেনাপতি হিসেবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে রাজনের প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
১৯৯৩ সালের ভাঙন ও "দেশপ্রেমিক ডন" রাজনীতি: ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা হামলা ভারতীয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমীকরণ বদলে দেয়। এই হামলার পেছনে দাউদ ইব্রাহিম ও মেমন ভাইদের সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ISI-এর অর্থায়নের কথা সামনে এলে ছোট রাজন ডি-কোম্পানি ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। রাজন নিজেকে একজন "দেশপ্রেমিক হিন্দু ডন" (Patriotic Don) হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং দাবি করেন যে তিনি কোনো রাষ্ট্রবিরোধী বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশ নেবেন না। ডি-কোম্পানি থেকে আলাদা হয়ে রাজন তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী ওপি সিং, রোহিত বর্মা ও বালু জোকারদের নিয়ে পৃথক গ্যাং গড়ে তোলেন এবং দাউদ ইব্রাহিমের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
রক্তক্ষয়ী গ্যাং ওয়ার ও ব্যাংকক হত্যাকাণ্ড (২০০০): পরবর্তী দুই দশকে ব্যাংকক, কাঠমান্ডু, দুবাই, নাইরোবি ও মুম্বাইয়ের রাজপথে দাউদ গ্যাং ও রাজন গ্যাংয়ের মধ্যে বহু রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটে। রাজন গ্যাং ১৯৯৩ সালের বোমা হামলার একাধিক অভিযুক্তকে হত্যা করে। এর জবাবে ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দাউদের প্রধান শ্যুটার মুন্না ঝিংগারা ও ছোট শাকিলের দল থাইল্যান্ডের ব্যাংককে সুখুমভিত রোডের একটি অ্যাপার্টমেন্টে ছোট রাজনের ওপর ভয়াবহ হামলা চালায়। এই ঘটনায় রাজনের ডানহাত রোহিত বর্মা নিহত হন এবং রাজন পেটে ও পায়ে মারাত্মক গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে থাই পুলিশ ও ডি-কোম্পানির নজর ফাঁকি দিয়ে রাজন চারতলার জানালা দিয়ে দড়ি বেয়ে নিচে নেমে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় তাঁকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
আভ্যন্তরীণ কোন্দল ও পতন: ব্যাংকক হামলার পর রাজন গ্যাং শারীরিকভাবে ও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হতে শুরু করে। রাজনের অতিরিক্ত সন্দেহের কারণে দলের ভেতরে মারাত্মক কোন্দল দেখা দেয়। রাজনের নির্দেশে তাঁর নিজের দলের শীর্ষ সহযোগী ওপি সিংকে জেলে হত্যা করা হলে ভরত নেপালি, সন্তোষ শেট্টি এবং বিজয় শেট্টির মতো প্রধান সহযোগীরা রাজন গ্যাং ছেড়ে বেরিয়ে যান এবং নিজেদের আলাদা দল গঠন করেন।
গ্রেপ্তার ও বর্তমান আইনি পরিণতি: দীর্ঘ দুই দশক ধরে একাধিক ভুয়া নাম ও পাসপোর্টের (যেমন: বিজয় কদম) সাহায্যে নেপাল, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় আত্মগোপনে ছিলেন রাজন। অবশেষে ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার বালি বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক পুলিশের (Interpol) সহায়তা ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে ছোট রাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। নভেম্বর ২০১৫-এ তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে এনে নয়াদিল্লির অতি-সুরক্ষিত তিহার জেলে (জেল নম্বর ২) রাখা হয়। ২০১১ সালে মুম্বাইয়ের অনুসন্ধানী সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দে (জে ডে) হত্যা মামলায় ২০১৮ সালে মহারাষ্ট্রের বিশেষ সিবিআই আদালত ছোট রাজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে ৭০টিরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
৬. অরুণ গাওলি (Arun Gawli)
পূর্ণ নাম: অরুণ গোলাপ গাওলি (জন্ম: ১৯৫৫)
কার্যক্ষেত্র: সেন্ট্রাল মুম্বাই (বাইচুলা, সাত রাস্তা)
উত্থান: অরুণ গোলাপ গাওলি (জন্ম: ১৭ জুলাই, ১৯৫৫)। মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলার কোপারগাঁওয়ে জন্ম হলেও তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সেন্ট্রাল মুম্বাইয়ের বাইচুলা এলাকায়। তাঁর বাবা গোলাপরাও বাইচুলার সুতি বস্ত্র কারখানায় (Textile Mill) কাজ করতেন। অরুণ গাওলিও খুব কম বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে শক্তি মিলসসহ বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
মুম্বাইয়ের মিল ধর্মঘট ও 'BRA' গ্যাংয়ের উত্থান: ১৯৮২ সালে দত্ত সামন্তের নেতৃত্বে মুম্বাইয়ের টেক্সটাইল মিলগুলোতে ঐতিহাসিক দীর্ঘমেয়াদি ধর্মঘট শুরু হলে একের পর এক সুতি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং অগণিত তরুণ বেকার হয়ে পড়ে। এই তরুণদের সংগঠিত করে অরুণ গাওলি অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন। গাওলি তাঁর শৈশবের বন্ধু বাবু রেশিম এবং রামা নায়েকের সাথে মিলে গড়ে তোলেন 'বিআরএ' (BRA - Babu, Rama, Arun) গ্যাং। এই দলটি সেন্ট্রাল মুম্বাইয়ের বাইচুলা, আগরপাড়া ও সাত রাস্তার বেআইনি মদের ঠেক, জুয়ার আড্ডা ও সুদের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
"দাগদি চাল" দুর্গ ও "ড্যাডি" উপাধি: অরুণ গাওলির ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাইচুলার "দাগদি চাল" (Dagdi Chawl)। একাধিক বহুতল ভবনের সমন্বয়ে গঠিত এই প্রাচীন চালটিকে গাওলি একটি ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেন। চালের চারপাশের উঁচু দেয়াল, গোপন পথ, সিসিটিভি ক্যামেরা ও শত শত অনুসারীর সতর্ক পাহারা পেরিয়ে পুলিশ বা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের পক্ষে ভেতরে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। গাওলি সেখানে নিয়মিত 'জনতা দরবার' বসিয়ে স্থানীয় মানুষের পারিবারিক ও আর্থিক সমস্যার সমাধান করতেন, গরিবদের সাহায্য করতেন এবং উৎসব-পার্বণে বিপুল অর্থ দান করতেন। ফলে স্থানীয় মারাঠি অধিবাসীদের কাছে তিনি অপরাধীর চেয়েও বেশি 'রক্ষাকর্তা' বা "ড্যাডি" (Daddy) নামে পরিচিতি পান।
দাউদ গ্যাংয়ের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাত: আশির দশকের শেষের দিকে দাউদ ইব্রাহিমের গ্যাংয়ের সাথে বিআরএ (BRA) গ্যাংয়ের অঞ্চল দখল ও তোলাবাজি নিয়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। ১৯৮৮ সালে এক পুলিশ এনকাউন্টারে রামা নায়েক নিহত হলে গাওলি দাবি করেন যে, দাউদ ইব্রাহিম তথ্য দিয়ে পুলিশকে দিয়ে রামা নায়েককে হত্যা করিয়েছে। এর কিছুদিন পর প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের হাতে পুলিশ কাস্টডিতে বাবু রেশিম খুন হলে গাওলি দলের একচ্ছত্র অধিনায়ক হন এবং দাউদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। বদলা হিসেবে দাউদের দুলাভাই ইব্রাহিম পারকারকে গাওলি গ্যাংয়ের শুটাররা প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের জবাবে দাউদের দল (ছোট শাকিল ও সুভাষ ঠাকুর) মুম্বাইয়ের জেজে হাসপাতালে হামলা চালিয়ে গাওলি গ্যাংয়ের মূল শুটার শৈলেশ হালদাঙ্করকে হত্যা করে, যা মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সংঘাত হিসেবে পরিচিত। এই রক্তক্ষয়ী গ্যাং ওয়ারে অরুণ গাওলির নিজের ভাই পাপা গাওলিসহ বহু সদস্য নিহত হন।
স্থানীয় মারাঠি পরিচয় ও রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ: নব্বইয়ের দশকে মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের অধিকাংশ ডন দুবাই বা বিদেশের মাটিতে বসে গ্যাং পরিচালনা করতেন। একমাত্র অরুণ গাওলিই ছিলেন মুম্বাইয়ের মাটিতে সরাসরি অবস্থানকারী স্থানীয় মারাঠি ডন। প্রাথমিকভাবে শিবসেনা প্রধান বাল ঠাকরে গাওলি গ্যাংভিত্তিক নেটওয়ার্ককে দাউদের গ্যাংয়ের বিপরীতে "আমাদের ঘরের ছেলে" (আমচা মুলগা) বলে পরোক্ষ সমর্থন দিতেন। কিন্তু পরবর্তীতে গাওলির রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় শিবসেনার সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ১৯৯৭ সালে অরুণ গাওলি নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করেন 'অখিল ভারতীয় সেনা' (ABS)। ২০০৪ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে তিনি মধ্য মুম্বাইয়ের 'চিন্তাপোকলি' (Chinchpokli) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়ী হন এবং বিধায়ক (MLA) নির্বাচিত হন।
কামলাকর জামসান্দেকর হত্যাকাণ্ড ও সাজা: রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও গাওলির আন্ডারওয়ার্ল্ড সাম্রাজ্য ও চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের (সুপারি) কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। ২০০৮ সালের মার্চ মাসে শিবসেনা কর্পোরেটর কামলাকর জামসান্দেকরকে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়। মুম্বাই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, জামসান্দেকরের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষরা অরুণ গাওলিকে ৩০ লাখ রুপি 'সুপারি' দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সম্পাদন করিয়েছিল। ২০০৮ সালের মে মাসে পুলিশ দাগদি চালে অভিযান চালিয়ে অরুণ গাওলিকে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে মহারাষ্ট্রের সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আইন (MCOCA) প্রয়োগ করা হয়। ২০১২ সালে বিশেষ মকোকা আদালত কামলাকর জামসান্দেকর হত্যা মামলায় গাওলিকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। বর্তমানে তিনি নাগপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা ভোগ করছেন।
৭. আবু সালেম (Abu Salem)
পূর্ণ নাম: আবু সালেম আব্দুল কাইয়ুম আনসারী (জন্ম: ১৯৬৯)
কার্যক্ষেত্র: মুম্বাই, বলিউড, দুবাই, লিসবন (পর্তুগাল)
উত্থান ও ডি-কোম্পানির শীর্ষ কমান্ডার: উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলার সরাই মীর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবু সালেম। তাঁর বাবা পেশায় একজন আইনজীবী ছিলেন, কিন্তু এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর অকালমৃত্যু ঘটলে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। সংসারের হাল ধরতে আশি-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে সালেম মুম্বাইয়ে আসেন। শুরুতে তিনি কাপড়ের দোকানে কাজ, রাজমিস্ত্রি, টেলিফোন বার্নার, ডেলিভারি বয় এবং পরবর্তীতে ট্যাক্সি চালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
আশি-র দশকের শেষভাগে তিনি মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন দাউদ ইব্রাহিমের ছোট ভাই আনিস ইব্রাহিমের সাথে পরিচিত হন। নিজের চতুরতা, নির্ভরযোগ্যতা ও গাড়ি চালনায় দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দ্রুত ডি-কোম্পানিতে নিজের স্থান করে নেন। শুরুতে তিনি মূলত অবৈধ অস্ত্র পরিবহন ও গ্যাংয়ের গাড়ি চালক হিসেবে কাজ করতেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দাউদের আস্থাজনিত শীর্ষ কমান্ডারদের একজন হয়ে ওঠেন এবং মুম্বাইয়ের রিয়েল এস্টেট খাত থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা চাঁদাবাজি ও তোলা আদায়ের একক দায়িত্ব পান।
বলিউডে রাজত্ব ও ১৯৯৩ সালের হামলা: নব্বইয়ের দশকে পুরো বলিউড চলচ্চিত্র শিল্পে আবু সালেমের নাম আতঙ্কের সমার্থক হয়ে উঠেছিল। চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালকদের কাছ থেকে সিনেমার ওভারসিজ ডিস্ট্রিবিউশন রাইটস (বিদেশি প্রদর্শন স্বত্ব) নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে হাতিয়ে নেওয়া ছিল তাঁর প্রধান কৌশল। ১৯৯৭ সালে টি-সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা গুলশান কুমারকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজীব রাইয়ের ওপর প্রাণঘাতী হামলার পে পেছনে সালেমের সরাসরি ভূমিকা ছিল। পরবর্তীতে ২০০০ সালে বিখ্যাত পরিচালক রাকেশ রোশনকে তাঁর কার্যালয়ের সামনে গুলি করার ঘটনাতেও সালেমের নাম উঠে আসে।
১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা হামলার মূল বাস্তবায়নকারীদের একজন ছিলেন সালেম। গুজরাট উপকূলের দিঘি বন্দর থেকে আরডিএক্স (RDX) ও অবৈধ অস্ত্রের চালান মুম্বাইয়ে পৌঁছানোর দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল। তিনি তৎকালীন জনপ্রিয় অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের বাড়িতে স্বয়ংক্রিয় একে-৪৭ (AK-47) রাইফেল, হ্যান্ড গ্রেনেড ও গোলাবারুদ পৌঁছে দিয়েছিলেন।
দাউদের সাথে বিরোধ, পলায়ন ও গ্রেপ্তার: ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে ডি-কোম্পানির ভেতরে ক্ষমতা ও অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দাউদ ইব্রাহিম ও ছোটা শাকিলের সাথে সালেমের তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়। ফলে সালেম ডি-কোম্পানি ত্যাগ করে নিজস্ব একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তিনি দুবাই, আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে ব্যবসা ও গ্যাং পরিচালনা করতে থাকেন।
২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টারপোল ও পর্তুগিজ পুলিশের যৌথ অভিযানে লিসবন থেকে আবু সালেম এবং তাঁর সঙ্গিনী, মডেল-অভিনেত্রী মনিকা বেদীকে গ্রেপ্তার করা হয়। সালেম সেসময় আর্সলান আলী নামে ভুয়া পাকিস্তানি ও নরওয়েজিয়ান পাসপোর্ট ব্যবহার করছিলেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৫ সালে পর্তুগাল সরকারের সাথে ভারত সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার শর্ত ছিল সালেমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না এবং সর্বোচ্চ ২৫ বছরের বেশি আটক রাখা যাবে না। এই শর্তেই তাঁকে ভারতে ফেরত আনা (Extradition) হয়।
আইনি পরিণতি ও বর্তমান অবস্থা: ভারতে ফিরিয়ে আনার পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, অপহরণ ও চাঁদাবাজির মামলায় বিচার শুরু হয়। ২০১৫ সালে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী প্রদীপ জৈন হত্যা মামলায় তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে সিবিআই-এর বিশেষ তদা (TADA) আদালত ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বিস্ফোরণে সরাসরি ষড়যন্ত্র ও অস্ত্র সরবরাহের দায়ে আবু সালেমকে পুনরায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। বর্তমানে তিনি মহারাষ্ট্রের নভি মুম্বাইয়ের তালোজা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় সাজা ভোগ করছেন।
৮. মান্যা সুর্ভে (Manya Surve)
পূর্ণ নাম: মনোহর অর্জুন সুর্ভে (১৯৪৪ – ১৯৮২)
কার্যক্ষেত্র: দক্ষিণ ও মধ্য মুম্বাই এবং পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল
শিক্ষিত গ্যাংস্টার ও অপরাধ জগতে পদার্পণ: মুম্বাইয়ের মাফিয়া ইতিহাসে অধিকাংশ অপরাধী অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত হলেও মান্যা সুর্ভে ছিলেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি জেলার রণপার গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মান্যা শৈশবেই মায়ের সাথে মুম্বাইয়ের দাদারে চলে আসেন। তিনি মুম্বাইয়ের বিখ্যাত কীর্তি কলেজ থেকে অত্যন্ত ভালো ফলাফলের সাথে ব্যাচেলর অব আর্টস (BA) ডিগ্রি অর্জন করেন। সাহিত্য ও দূরদর্শী কৌশলে পারদর্শী এই যুবক প্রথমে গ্যাংস্টার হতে চাননি।
১৯৬৯ সালে একটি অাকাঙ্ক্ষিত সহিংস ঘটনা তাঁর জীবন বদলে দেয়। নিজের সৎ ভাই ভাস্কর এবং বন্ধু মান্যা পোডকরের সাথে মিলে এক প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাং সদস্য (দান্ডেকর) হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন সুর্ভে। সুর্ভে নিজে সরাসরি হত্যায় যুক্ত না থাকলেও আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে পুণের ইয়েরওয়াদা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়। অন্যায় সাজার ক্ষোভ থেকে তিনি জেলে থাকাকালেই একটি আন্তর্জাতিক মানের সুসংগঠিত গ্যাং গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। ১৯৭৯ সালে জেলে অনশন ধর্মঘট পালন করে গুরুতর অসুস্থতার ভান করেন এবং সেখান থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত হলে কৌশল খাটিয়ে জেলের প্রহরীদের ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে মুম্বাই চলে আসেন।
নতুন কৌশল, ডাকাত দল ও পাঠান গ্যাংয়ের সাথে জোট: মুম্বাই ফিরে এসে মান্যা সুর্ভে প্রচলিত মাফিয়াদের সব নিয়ম ভেঙে দেন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট এলাকা দখল করে সুদের ব্যবসা বা ছোটখাটো তোলাবাজির বদলে ব্যাংক ডাকাতি, সরকারের পে-রোল ভ্যান ছিনতাই এবং বড় বড় স্বর্ণের দোকানে সশস্ত্র হামলা চালানো শুরু করেন। নিজের সুশিক্ষিত মস্তিষ্ক প্রয়োগ করে তিনি পুলিশের গতিবিধি ও রেডিও সিগন্যাল পর্যবেক্ষণ করতেন এবং অত্যন্ত নিখুঁত সময় নির্ধারণ (Precision Timing) করে হামলা চালাতেন। তিনি ও তাঁর দল ক্যানারা ব্যাংক এবং ডিউক অ্যান্ড সন্স কোম্পানির অর্থ পরিবহনকারী ভ্যানে বড় ধরনের ডাকাতি করে মুম্বাই মাফিয়া জগতে তোলপাড় সৃষ্টি করেন।
তিনি তৎকালীন আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে শক্তিশালী করিম লালার 'পাঠান গ্যাং'-এর (আমির জাদা ও সামাদ খান) সাথে হাত মেলান। দাউদ ইব্রাহিমের ভাই সাবির ইব্রাহিমকে ১৯৮১ সালে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে মান্যা সুর্ভে পাঠান গ্যাংয়ের মূল স্ট্রাইকার হিসেবে কাজ করেছিলেন।
এনকাউন্টার ও ঐতিহাসিক প্রভাব: মান্যা সুর্ভে ও তাঁর দলের আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার এবং ঘনঘন সশস্ত্র ডাকাতি মুম্বাই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁকে নির্মূল করতে তৎকালীন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তারা বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৮২ সালের ১১ জানুয়ারি, এক গোপন সংবাদের ভিত্তিতে (ধারণা করা হয় তাঁর দলেরই এক সদস্য তথ্য ফাঁস করেছিল) মুম্বাই পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার রাজা দেশপান্ডে এবং সিনিয়র ইনস্পেক্টর ইসাক বাগওয়ানের নেতৃত্বে এক বিশেষ স্কোয়াড মুম্বাইয়ের ওয়াদালা এলাকার অম্বেডকর কলেজের কাছে ওঁৎ পেতে থাকে।
মান্যা সুর্ভে একটি ট্যাক্সি থেকে নামামাত্রই পুলিশ তাঁকে চারদিক থেকে ঘেরাও করে। সুর্ভে আত্মসমর্পণ না করে নিজের রিভলভার থেকে গুলি ছুড়লে দু'পক্ষের মধ্যে তীব্র গুলির লড়াই শুরু হয়। পুলিশের গুলিতে মান্যা সুর্ভে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনাটি মুম্বাই পুলিশের ইতিহাসে পুলিশের নথিতে নিবন্ধিত প্রথম অফিসিয়াল "পুলিশ এনকাউন্টার" (Police Encounter) হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মান্যা সুর্ভের পতনের মধ্য দিয়েই মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে এক একক আধিপত্যের নতুন যুগের সূচনা হয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে জন আব্রাহাম ও অনিল কাপুর অভিনীত বিখ্যাত হিন্দি সিনেমা 'শুটাউট অ্যাট ওয়াদালা' (Shootout at Wadala) নির্মিত হয়।
৯. বীরপ্পন (Veerappan)
পূর্ণ নাম: কূলমুনিস্বামী মুথুলক্ষ্মী বীরপ্পন (১৯৫২ – ২০০৪)
কার্যক্ষেত্র: তামিলনাড়ু, কর্ণাটক ও কেরালার সীমান্ত জঙ্গল (বিশেষ করে সত্যমঙ্গলম ও গোপীচেট্টিপালায়ম অরণ্যঞ্চল)
অরণ্যের অনভিষিক্ত সম্রাট ও অপরাধ সাম্রাজ্য: ভারতের শহুরে আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির অপরাধী ছিলেন কুথুর মুথুলক্ষ্মী বীরপ্পন গৌন্ডার। তামিলনাড়ুর মেট্যুর সংলগ্ন গোপীনাথমে এক পশুপালক পরিবারে তাঁর জন্ম। কিশোর বয়সেই তিনি আত্মীয় এবং ডাকাত মালায়ুর মামাত্তিয়ানের সংস্পর্শে আসেন এবং বন্যপ্রাণী শিকারে হাতেখড়ি নেন। পরবর্তীতে সীবানি গৌন্ডারের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি হাতি শিকার এবং চন্দন কাঠ পাচারে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন। সত্তরের দশক থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং কেরালার প্রায় ৬,০০০ বর্গকিলোমিটার ব্যাপ্ত ঘন সত্যমঙ্গলম ও বানেরঘাট্টা বনাঞ্চলে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। অরণ্যের স্থানীয় আদিবাসী (বিশেষ করে সোলিগা সম্প্রদায়)-দের মধ্যে অর্থ বিতরণ করে এবং ভীতি প্রদর্শন করে বীরপ্পন এক শক্তিশালী ইনফর্মার বা তথ্য সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন।
গণহত্যা, বর্বরোচিত হামলা ও রাজকুমার অপহরণ: নিজের সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য বীরপ্পন অত্যন্ত নৃশংস পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। তাঁর তিন দশকের অপরাধ জীবনের খতিয়ান- প্রায় ২,০০০-এর বেশি হাতি হত্যা করে তাদের হাতির দাঁত আন্তর্জাতিক বাজারে পাচার করা। সংরক্ষিত অরণ্য থেকে রক্তচন্দন ও চন্দন কাঠ কেটে শত শত কোটি টাকার কালোবাজারি পরিচালনা করা। ১৮ জন পুলিশ ও বন কর্মকর্তা সহ মোট ১২০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা।
বীরপ্পন তাঁর সাম্রাজ্যে সরকারি নজরদারি সহ্য করতেন না। ১৯৯১ সালে তিনি কর্ণাটক ক্যাডারের জনপ্রিয় আইএফএস (IFS) কর্মকর্তা পি. শ্রীনিবাসকে ছলে-বলে ডেকে এনে হত্যা ও শিরচ্ছেদ করেন। ১৯৯২ সালে পুলিশ সুপার টি. হারিকৃষ্ণ এবং তাঁর দলকে অতর্কিত হামলায় হত্যা করা হয়। ১৯৯৩ সালের পালার ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ ছিল তাঁর ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ঘটনা, যেখানে এসটিএফ এবং পুলিশের গাড়ি উড়িয়ে দিয়ে ২২ জন পুলিশ ও বনকর্মীকে হত্যা করা হয়।
২০০০ সালের ৩০ জুলাই বীরপ্পন ভারতীয় সিনেমা জগতের অন্যতম মহাতারকা, কন্নড় সুপারস্টার রাজকুমারকে তাঁর নিজস্ব বাসভবন (গাজানুর) থেকে অপহরণ করেন। রাজকুমারকে ১০৮ দিন গহীন জঙ্গলে জিম্মি রেখে তিনি পুরো ভারতের রাজনীতি ও সরকারকে তোলপাড় করে দিয়েছিলেন। বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক শর্ত পূরণের পর রাজকুমারকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০২ সালে কর্ণাটকের সাবেক মন্ত্রী এইচ. নাগাপ্পাকেও তিনি অপহরণ করেন, যিনি পরবর্তীতে জঙ্গলে মৃত অবস্থায় উদ্ধার হন।
অপারেশন কোকুন ও পতন: বীরপ্পনকে জীবিত বা মৃত ধরতে তামিলনাড়ু ও কর্ণাটক সরকার যৌথভাবে গঠন করে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। বহু বছর নিষ্ফল অভিযানের পর ২০০৪ সালে তামিলনাড়ু এসটিএফ-এর প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ADGP) কে. বিজয় কুমার এবং তাঁর সহযোগী কর্মকর্তা এন. কে. সেনথামারাইকান্নানের নেতৃত্বে শুরু হয় গোপন "অপারেশন কোকুন" (Operation Cocoon)।
বীরপ্পন দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক চোখের ছানি এবং অন্ত্রের রোগে ভুগছিলেন। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এসটিএফ এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ছদ্মবেশী অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে বীরপ্পনের গ্যাংয়ের কাছে ভেড়ায়। বীরপ্পনকে বলা হয় যে তাঁকে চিকিৎসার জন্য সালেম শহরে নিয়ে যাওয়া হবে। ১৮ অক্টোবর ২০০৪ সালে বীরপ্পন ও তাঁর সহযোগীরা ছদ্মবেশী সেই অ্যাম্বুলেন্সে ওঠেন। ধর্মপুরী জেলার পাপারাপাত্তি গ্রামের কাছে অ্যাম্বুলেন্সটি পৌঁছালে আগে থেকে ঘেরাও করে রাখা এসটিএফ সদস্যরা গুলিবর্ষণ করে এবং এতে বীরপ্পন নিহত হন।
১০. মুখতার আনসারী (Mukhtar Ansari)
পূর্ণ নাম: মুখতার আনসারী (১৯৬৩ – ২০২৪)
কার্যক্ষেত্র: উত্তর প্রদেশ (গাজীপুর, মউ, বারাণসী, আজমগড় ও পূর্বাঞ্চল)
উত্থান ও রাজনৈতিক মাফিয়ার বিকাশ: উত্তর প্রদেশের গাজীপুর জেলার ইউসুফপুরে এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও রাজনৈতিক পরিবারে মুখতার আনসারীর জন্ম। তাঁর পিতামহ ডক্টর মুক্তার আহমেদ আনসারী ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর মাতামহ ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ ওসমান ১৯৪৮ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য মরণোত্তর মহাবীর চক্র পদকে ভূষিত হন।
তবে পারিবারিক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য সত্ত্বেও আশির দশকে উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে সরকারি ঠিকাদারি, রেলওয়ে টেন্ডার, কয়লা পরিবহন, স্ক্র্যাপ লোহা ও অবৈধ বালি উত্তোলনের যে সহিংসতা শুরু হয়, তাতে মুখতার আনসারী জড়িয়ে পড়েন। তিনি প্রথমে মখনু সিং গ্যাংয়ে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে বারাণসীর অপরাধী সাধু সিংয়ের সাথে জোট বেঁধে নিজস্ব সুসংগঠিত গ্যাং 'IS-191' গঠন করেন।
রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ার, রাজনীতি ও ক্রাইম সিন্ডিকেট: নব্বইয়ের দশকে পূর্বাঞ্চলের সরকারি ঠিকাদারি ও অপরাধ জগতের আধিপত্য নিয়ে মুখতার আনসারীর সাথে গ্যাংস্টার বীজেশ সিংয়ের এক ভয়াবহ গ্যাংওয়ার শুরু হয়। ২০০১ সালে চটচটি মোড়ে বীজেশ সিংয়ের গ্যাং মুখতারের কনভয়ে অতর্কিত হামলা চালায়, যাতে একাধিক ব্যক্তি নিহত হলেও মুখতার অল্পের জন্য বেঁচে যান।
অপরাধমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আইনি সুরক্ষা পেতে মুখতার আনসারী ১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত উত্তর প্রদেশের মউ (Mau) বিধানসভা আসন থেকে টানা পাঁচবার বিধায়ক (MLA) নির্বাচিত হন। এমনকি জেলে বন্দি থাকা অবস্থায়ও তিনি ২০০৭ ও ২০১২ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে খুন, অপহরণ, রিয়েল এস্টেট দখল এবং সুপারি কিলিংয়ের ৬০টিরও বেশি ফৌজদারি মামলা রুজু ছিল।
তাঁর সবচেয়ে আলোচিত অপরাধগুলোর মধ্যে ছিল ১৯৯১ সালে কংগ্রেস নেতা অবধেশ রাই হত্যা, ১৯৯৭ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কোষাধ্যক্ষ নন্দকিশোর রুংটাকে অপহরণ-হত্যা এবং ২০০৫ সালের ২৯ নভেম্বর বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণানন্দ রাইকে হত্যা। গাজিপুরের মোহাম্মদাবাদে কৃষ্ণানন্দ রাইয়ের কনভয়ে মুখতারের প্রধান শুটার মুন্না বজরঙ্গী সহ কয়েকজন হামলাকারী একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে ৪০০ রাউন্ডেরও বেশি গুলি চালিয়ে রাই সহ মোট ৭ জনকে হত্যা করে।
পরিণতি ও শেষ জীবন: ২০০৫ সালে কৃষ্ণানন্দ রাই হত্যাকাণ্ডের পর উত্তাল পরিস্থিতির মুখে মুখতার আনসারী আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লখনউ, গাজীপুর এবং পাঞ্জাবের রোপার জেলে বন্দি ছিলেন।
উত্তর প্রদেশে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং প্রশাসন গ্যাংস্টার দমন নীতি গ্রহণ করলে মুখতার আনসারী ও তাঁর চক্রের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পাঞ্জাব জেল থেকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তাঁকে পুনরায় উত্তর প্রদেশের বান্দা জেলে স্থানান্তর করা হয়। ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের মাধ্যমে পুরোনো মামলাগুলোর বিচার ত্বরান্বিত করা হয় এবং ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অবধেশ রাই হত্যা ও গ্যাংস্টার অ্যাক্টের একাধিক মামলায় আদালত তাঁকে একাধিকবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
২০২৪ সালের ২৮ মার্চ বান্দা জেলে থাকা অবস্থায় মুখতার আনসারী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর পরিবার অভিযোগ করেছিল তাঁকে খাবারের সাথে স্লো পয়জন (ধীরগতির বিষ) দেওয়া হচ্ছে, যদিও কারা কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করে। সে রাতে শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাঁকে বান্দার রানী দুর্গাবতী মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
ভারতের শীর্ষ ১০ গ্যাংস্টার ডন: সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ
গ্যাংস্টার ডন | কার্যকর অঞ্চল | মূল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড | বিশেষ পরিচিতি / খেতাব | চূড়ান্ত পরিণতি |
হাজী মাস্তান | মুম্বাই, মহারাষ্ট্র | সোনা ও ইলেকট্রনিক্স চোরাচালান, বলিউডে অর্থ লগ্নিকরণ | 'স্মাগলিং কিং', বোম্বাইয়ের প্রথম হাই-প্রোফাইল মাফিয়া | রাজনীতিতে যোগদান, ১৯৯৪ সালে হৃদরোগে স্বাভাবিক মৃত্যু। |
করিম লালা | মুম্বাই, মহারাষ্ট্র | বেআইনি সুদের ব্যবসা, জুয়া, জমি দখল, গ্যাং ওয়ার | 'পাঠান গ্যাং'-এর প্রধান, বোম্বাই মাফিয়ার আদি পিতা | গ্যাং ক্ষয়প্রাপ্ত হয়; ২০০২ সালে বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক মৃত্যু। |
বরদারাজন মুদালিয়ার | মুম্বাই (ধারাভি/মাতুঙ্গা) | বেআইনি মদ, চোরাচালান, রিয়েল এস্টেট দখল | তামিল অধিবাসীদের 'মসিহা' বা 'বরধা ভাই' | পুলিশের চাপে চেন্নাই পলায়ন; ১৯৮৮ সালে হৃদরোগে মৃত্যু। |
দাউদ ইব্রাহিম | মুম্বাই, করাচি (আন্তর্জাতিক) | সন্ত্রাসবাদ, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র পাচার, ম্যাচ ফিক্সিং | 'ডি-কোম্পানি' প্রধান, আন্তর্জাতিক মোস্ট ওয়ান্টেড | ভারতে পলাতক; জাতিসংঘের বৈশ্বিক সন্ত্রাসী, করাচিতে আত্মগোপন। |
ছোট রাজন | আন্তর্জাতিক (মুম্বাইভিত্তিক) | রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, তোলাবাজি, ডি-কোম্পানি বিরোধী | 'দেশপ্রেমিক ডন' | ২০১৫ সালে বালি থেকে গ্রেফতার; তিহার জেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। |
অরুণ গাওলি | সেন্ট্রাল মুম্বাই | রিয়েল এস্টেট চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড | দাগদি চালের 'ড্যাডি', সাবেক বিধায়ক (MLA) | কর্পোরেটর হত্যাকাণ্ডে ২০১২ সাল থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। |
আবু সালেম | মুম্বাই, লিসবন, আজমগড় | বলিউড চাঁদাবাজি, অস্ত্র সরবরাহ, ৯৩ বোমা হামলা | ডি-কোম্পানির সাবেক প্রধান শ্যুটার | ২০০৫ সালে পর্তুগাল থেকে প্রত্যর্পণ; বর্তমানে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। |
মান্যা সুর্ভে | মুম্বাই | ব্যাংক ডাকাতি, সুসংগঠিত সশস্ত্র হামলা | বোম্বাইয়ের প্রথম শিক্ষিত (গ্র্যাজুয়েট) গ্যাংস্টার | ১৯৮২ সালে মুম্বাই পুলিশের প্রথম অফিসিয়াল এনকাউন্টারে নিহত। |
বীরপ্পন | তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, কেরালা | চন্দন কাঠ পাচার, হাতির দাঁত চোরাচালান, অপহরণ | 'জঙ্গলের দস্যুরাজ' | ২০০৪ সালে 'অপারেশন কোকুন'-এ পুলিশ টাস্ক ফোর্সের গুলিতে নিহত। |
মুখতার আনসারী | উত্তর প্রদেশ (পূর্বাঞ্চল) | সরকারি ঠিকাদারি দখল, জমি দখল, রাজনৈতিক হত্যা | ৫ বারের বিধায়ক, 'পূর্বাঞ্চলের বাহুবলী' | ২০২৪ সালে জেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে মৃত্যু। |
আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যান্য আলোচিত ডন ও নারী 'গডমাদার'
মুম্বাই এবং উত্তর ভারতের অপরাধ জগতে কেবল পুরুষ ডনদেরই দাপট ছিল না, বেশ কয়েকজন নারীও এই সাম্রাজ্যের নেপথ্য চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন।
ছোট শাকিল (Chhota Shakeel): ডি-কোম্পানির প্রকৃত ‘সিইও’ (CEO) বলা হতো ছোট শাকিলকে। দাউদ ইব্রাহিম যখন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও কৌশলগত দিক সামলাতেন, তখন প্রতিপক্ষ নির্মূল, সুপারি কিলিং এবং দৈনিক তোলাবাজির কাজ পরিচালনা করতেন শাকিল। ১৯৯৩ সালের পর দাউদের সাথে একমাত্র যে নেতা বিশ্বস্ততার সাথে টিকে ছিলেন, তিনি হলেন ছোট শাকিল।
জেনাবাই দরবেশ (Jenabai Darvesh / Jena Aap): ১৯เจ সত্তরের দশকে বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী মধ্যস্থতাকারী ছিলেন জেনাবাই। ডোংরি এলাকায় তিনি 'জেনা আপা' নামে পরিচিত ছিলেন। হাজী মাস্তান, করিম লালা এবং বরদারাজন মুদালিয়ারের মতো পরাক্রমশালী ডনরা যেকোনো বড় বিবাদ বা গ্যাংওয়ার থামানোর জন্য জেনাবাইয়ের দরবারে বসতেন। পরবর্তীতে তরুণ দাউদ ইব্রাহিমকেও তিনি অপরাধ জগতে প্রতিষ্ঠিত হতে দিকনির্দেশনা দেন।
হাসিনা পার্কার (Haseena Parkar): দাউদ ইব্রাহিম ভারত ছাড়ার পর মুম্বাইয়ে তাঁর বিশাল সম্পত্তি এবং অর্থনৈতিক লেনদেন সামলানোর দায়িত্ব নেন তাঁর বোন হাসিনা পার্কার, যাকে বলা হতো 'গডমাদার অব নাগপাড়া'। ১৯৯১ সালে অর্জু গাওলির গ্যাং হাসিনার স্বামী ইব্রাহিম পার্কারকে হত্যা করার পর হাসিনা সরাসরি অপরাধের ব্যবসায় নামেন। দক্ষিণ মুম্বাইয়ের রিয়েল এস্টেট চুক্তি, ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্ক এবং বিদেশি সিনেমার স্বত্ব থেকে তিনি কোটি কোটি টাকা আদায় করতেন।
আতিক আহমেদ (Atiq Ahmed): উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজের (সাবেক এলাহাবাদ) একচ্ছত্র বাহুবলী ডন ছিলেন আতিক আহমেদ। রাজনৈতিক আশ্রয়ে তিনি ৫ বার বিধায়ক এবং ১ বার সংসদ সদস্য (MP) হন। তাঁর বিরুদ্ধে ১০০টিরও বেশি ফৌজদারি মামলা ছিল। ২০২৩ সালে পুলিশি ও চিকিৎসাধীন হেফাজতে লাইভ টিভির সামনে আততায়ীদের গুলিতে আতিক ও তাঁর ভাই আশরাফ নিহত হন।
আন্ডারওয়ার্ল্ড ও বলিউডের গোপন সাম্রাজ্য
আশির দশক থেকে ২০০০ সালের শুরু পর্যন্ত মুম্বাইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বা বলিউড পুরোপুরি আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। এই আঁতাতকে বলা হতো "বলিউড-মাফিয়া নেক্সাস"।
সিনেমা ফাইনান্সিং ও কালো টাকা সাদা করা: তৎকালীন সময়ে ভারতে ব্যাংকিং খাত থেকে চলচ্চিত্রে অর্থায়ন করা কঠিন ছিল। এই সুযোগে দাউদ ইব্রাহিম, আবু সালেম এবং ছোট রাজন কোটি কোটি কালো টাকা চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করতেন।
ওভারসিজ ডিস্ট্রিবিউশন রাইটস: বিদেশি বাজারে (যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য) হিন্দি সিনেমার টিকিট বিক্রির বিশাল বাজার দখল করত ডি-কোম্পানি। প্রযোজকদের ভয় দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে এসব স্বত্ব হাতিয়ে নেওয়া হতো।
গুলশান কুমার হত্যাকাণ্ড (১৯৯৭): টি-সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা গুলশান কুমার আন্ডারওয়ার্ল্ডকে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে এবং আবু সালেমের হুমকি উপেক্ষা করলে তাকে দিনের আলোতে মন্দিরের সামনে ২৩টি গুলি করে হত্যা করা হয়।
রাকেশ রোশনকে গুলি ও মহাতারকাদের ওপর চাপ: বিখ্যাত ছবি 'কাহো না পিয়ার হ্যায়' এর সাফল্যের পর ওভারসিজ রাইটস না দেওয়ায় ২০০১ সালে পরিচালক রাকেশ রোশনকে মুম্বাইয়ের রাস্তায় গুলি করা হয়। এছাড়া শাহরুখ খান, সালমান খান, অনিল কাপুর সহ শীর্ষ তারকাদের দুবাই ও করাচিতে দাউদের পার্টিতে উপস্থিত থাকতে বাধ্য করা হতো।
এনকাউন্টার সংস্কৃতি ও পুলিশি প্রতিরোধ
আন্ডারওয়ার্ল্ডের সহিংসতা দমনে মুম্বাই পুলিশ এবং উত্তর প্রদেশ পুলিশ আইনানুগ বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে "এনকাউন্টার সংস্কৃতি" তৈরি করে।
মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চের 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট': ১৯৯০-এর দশকে মুম্বাই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের অধীনে একটি বিশেষ স্কোয়াড গঠন করা হয়। প্রদীপ শর্মা (১০০-র বেশি এনকাউন্টার), দয়া নায়ক, বিজয় সালাসকার, প্রফাত নবলে এবং শচীন ওয়াজের মতো কর্মকর্তারা সরাসরি রাস্তায় গ্যাংস্টারদের ঘেরাও করে খতম করতেন। তাঁদের মূল কৌশল ছিল আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে ডনদের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া।
ভোরা কমিটি রিপোর্ট (Vohra Committee Report - 1993): ১৯৯৩ সালের বোমা হামলার পর এন. এন. ভোরা কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, ভারতে অপরাধী, রাজনীতিবিদ এবং আমলাদের মধ্যে এক মারাত্মক ত্রিভুজ গড়ে উঠেছে, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
উত্তর প্রদেশ পুলিশের 'এসটিএফ' (UP STF): ১৯৯৮ সালে উত্তর প্রদেশ পুলিশ গঠন করে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। বাহুবলী গ্যাংস্টারদের খতম করতে তারা অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে। সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধীদের গাড়ি উল্টে যাওয়া বা পালানোর চেষ্টাকালে এনকাউন্টারে নিহত হওয়ার ঘটনা ভারতের অপরাধ দমনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
নতুন যুগের গ্যাংস্টার সংস্কৃতি: লরেন্স বিষ্ণোই ও প্যান-ইন্ডিয়া সাইবার মাফিয়া
বর্তমানে রাস্তার গলি দখলের মাফিয়া কালচার বিলুপ্ত হয়ে রূপ নিয়েছে বৈশ্বিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ সিন্ডিকেটে। এই নতুন যুগের গ্যাংস্টারদের প্রতিনিধিত্ব করছে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং (Lawrence Bishnoi Gang)।
কারাগার থেকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক: লরেন্স বিষ্ণোই গুজরাটের সবরমতি বা দিল্লির তিহার জেলে বন্দি থাকলেও ডার্ক ওয়েব, এনক্রিপ্টেড সিগন্যাল/টেলিগ্রাম অ্যাপস এবং স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে ভারত, কানাডা, আমেরিকা, দুবাই ও থাইল্যান্ডে ছড়িয়ে থাকা ১,০০০-এর বেশি শ্যুটার পরিচালনা করছেন।
হাই-প্রোফাইল টার্গেট কিলিং: ২০২২ সালে পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালে মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিকি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বিষ্ণোই গ্যাং প্রমাণ করেছে যে, তারা ভারতীয় রাজনীতি ও বিনোদন জগতে নতুন আতঙ্কের নাম।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও আন্তর্জাতিক ওভারসিজ মডিউল: এখন ব্যাংক বা ক্যাশ টাকার বদলে ক্রিপ্টোকারেন্সির (Bitcoin/USDT) মাধ্যমে সুপারি কিলিং ও তোলাবাজির টাকা লেনদেন হয়। গোল্ডি ব্রার (Goldy Brar) এবং রোহিত গোদারা কানাডা ও আমেরিকা থেকে লরেন্সের এই আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়াল মডিউল সামলাচ্ছেন।
আইন-শৃঙ্খলার পদক্ষেপ ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধুনিক চিত্র
ভারতের গ্যাংস্টার সংস্কৃতি দমনে রাষ্ট্র এবং বিচার ব্যবস্থা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন ও পুলিশি কৌশল প্রণয়ন করেছে:
MCOCA (Maharashtra Control of Organised Crime Act, 1999): সংগঠিত অপরাধ বন্ধে মহারাষ্ট্র সরকার এই কঠোর আইন চালু করে, যেখানে জামিন প্রায় অসম্ভব এবং পুলিশি কনফেশন আদালতে গ্রহণযোগ্য তথ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
UAPA (Unlawful Activities Prevention Act): সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও দেশবিরোধী সংগঠিত অপরাধ দমনে এই আইনের পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে।
এনকাউন্টার কালচার (Encounter Culture)
আশির দশকে মান্যা সুর্ভে হত্যাকাণ্ডের পর মুম্বাই পুলিশ "এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট" (যেমন: প্রদীপ শর্মা, দয়া নায়ক, শচীন ওয়াজে) তৈরি করেছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আদালতে দীর্ঘ আইনি জটিলতা এড়িয়ে সরাসরি অপরাধীদের খতম করা। পরবর্তীতে এই কৌশল উত্তর প্রদেশ পুলিশ ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে।
আধুনিক ডিজিটাল অপরাধ
২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারত থেকে প্রথাগত রাস্তাঘাটের ডনদের প্রভাব প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে অপরাধের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক গ্যাংস্টাররা (যেমন: লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং) এখন আন্তর্জাতিক স্থান (কানাডা, ইউকে, দুবাই) থেকে এনক্রিপ্টেড অ্যাপস (Signal, Telegram), ডার্ক ওয়েব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ভারতজুড়ে চাঁদাবাজি ও সুপারি কিলিং পরিচালনা করছে।
উপসংহার
ভারতের আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই শীর্ষ ১০ জন গ্যাংস্টারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে অপরাধের পথ যত অর্থ, ক্ষমতা বা সামাজিক রোমাঞ্চই নিয়ে আসুক না কেন, তার শেষ পরিণতি হয় অত্যন্ত মর্মান্তিক। কারাগারে চিরদিনের বন্দিদশা, প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংয়ের হাতে অকাল মৃত্যু কিংবা পুলিশের এনকাউন্টার এই ৩টি পথের বাইরে অপরাধ জগতের আর কোনো সমাপ্তি নেই।
ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়গুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের আইনি ক্ষমতার কাছে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী ডন বা গ্যাংস্টারকেও নতি স্বীকার করতেই হয়।



















