আবু জর গিফারী (রা.) দুর্ধর্ষ ডাকাত থেকে রাসূলের প্রিয় সাহাবী

আবু জর গিফারী (রা.) দুর্ধর্ষ ডাকাত থেকে রাসূলের প্রিয় সাহাবী

মানবইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এমন কিছু অনন্য ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন আলোকপাত করলে মানবআত্মার চরম রূপান্তর ও ঈমানী বিপ্লবের এক মহীয়সী চিত্র ভেসে ওঠে। ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের তেমনি এক উজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় নক্ষত্র হযরত আবু জর গিফারী (রা.)। তৎকালীন আরবের জাহেলিয়াতের কুৎসিত আঁধার, ডাকাতি ও অরাজকতার পরিবেশ থেকে নিখাদ তৌহীদের পরম আলোয় এসে তিনি রূপান্তর ঘটেছিলেন এক মহীয়সী আত্মায়। তিনি কেবল ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম সারির সাহাবীই ছিলেন না, বরং স্বীয় জীবনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর হুবহু অনুসরণ, নিগূঢ় দুনিয়াবিমুখতা (যুহ্দ), অকুতোভয় সত্যবাদিতা এবং বঞ্চিত শোষিত মানুষের পক্ষে আপসহীন কন্ঠস্বরের এক প্রদীপ্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।

জাহেলিয়াতের যুগে যিনি ছিলেন দুর্গম মরুপ্রান্তরের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ও কাফেলা লুণ্ঠনকারী, ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে তিনিই হয়ে উঠলেন প্রজ্ঞা, আমানতদারী ও মানবীয় দরদের এক জীবন্ত পরাকাষ্ঠা। নবুওয়াতের প্রারম্ভিক মুহূর্তে যখন মক্কার অলিগলিতে জুলুম ও নির্যাতনের রক্তচক্ষু টহল দিচ্ছিল, তখন তিনি ভয়-ভীতি ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব তুচ্ছ করে কাবার প্রাঙ্গণে তাওহীদের বাণী উচ্চস্বরে ঘোষণা করেছিলেন। এই নিবন্ধে হযরত আবু জর গিফারী (রা.)-এর বিস্ময়কর জীবন পরিক্রমা, ইসলাম গ্রহণের রোমাঞ্চকর ইতিহাস, অনন্য চারিত্রিক মাধুর্য, সাম্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সংগ্রাম এবং রাবযার নির্জন প্রান্তরে তাঁর মহাপ্রস্থানের এক বিশদ ও সমন্বিত ইতিহাস আলোকপাত করা হয়েছে।

প্রাক-ইসলামী জীবন ও গিফার গোত্রীয় পটভূমি

হযরত আবু জর গিফারী (রা.)-এর মূল নাম ছিল জুন্দুব ইবনে জুনাদা (জুনদুব ইবনে জুনাদাহ)। ‘আবু জর’ ছিল তাঁর কুনিয়াত বা ডাকনাম, যার অর্থ ‘জরের পিতা’। তিনি প্রাচীন আরবের বিখ্যাত ‘বনু গিফার’ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। গিফার গোত্রটি মক্কা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী ‘অদ্দান’ ও ‘মার্রুজ জাহরান’ উপত্যকা অঞ্চলে বসবাস করত।

গিফার গোত্রের সামাজিক প্রেক্ষাপট

তৎকালীন আরবি উপদ্বীপে গিফার গোত্রের সুনাম ও দুর্নাম দুটোই সমানভাবে বিস্তৃত ছিল। মক্কা থেকে সিরিয়াগামী কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোকে এই গোত্রের নিয়ন্ত্রিত এলাকা অতিক্রম করে যেতে হতো। ফলে বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে তারা অর্থ আদায় করত। তবে সুযোগ পেলেই তারা কাফেলা লুণ্ঠন করতে দ্বিধা করত না। সাহসিকতা ও তলোয়ার চালনায় এই গোত্রের যুবকেরা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু হেদায়েতের আলো থেকে তারা ছিল বহু দূরে।

জাহেলিয়াতের মাঝেও একত্ববাদের স্ফুলিঙ্গ

আবু জর (রা.) ছিলেন গিফার গোত্রের অন্যতম তেজস্বী ও প্রতিভাবান যুবক। ডাকাতি ও সাহসিকতায় স্বগোত্রে তাঁর খ্যাতি থাকলেও, তাঁর মানসিক গঠন সাধারণ আরবদের মতো ছিল না। তৎকালীন কুরাইশ ও আরবদের পাথর ও কাঠের মূর্তিপূজার অসারতা তিনি শৈশব ও কৈশোরেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ইবনে হিশামের ‘সীরাতুন নবী’ এবং অন্যান্য প্রাচীন ঐতিহাসিক সূত্রমতে, আবু জর (রা.) জাহেলিয়াতের চরম অবক্ষয়ের যুগেও মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করেছিলেন এবং এক অদৃশ্যের স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন।

তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের বিরল ‘হানিফ’ বা একত্ববাদী আদর্শের অনুসারী (যাঁরা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের বিশুদ্ধ তাওহীদী ঐতিহ্যের ওপর টিকে থাকার চেষ্টা করতেন)। গভীর রাতে যখন পুরো মরুভূমি ঘুমে আচ্ছন্ন থাকত, আবু জর (রা.) তখন খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে এক একক রবের ইবাদতে মগ্ন হতেন। ইসলাম গ্রহণের প্রায় তিন বছর পূর্ব থেকেই তিনি এক অলৌকিক প্রেরণায় সালাত আদায় করতেন। সমকালীন সমাজের জাহেলী কুসংস্কার তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি; বরং এক সত্য দ্বীনের অনুসন্ধানে তাঁর হৃদয় সর্বদা ব্যাকুল থাকত।

সত্যের সন্ধান ও ইসলাম গ্রহণের রোমাঞ্চকর সফর

নবুওয়াতের সূচনালগ্নে যখন প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার জমিনে গোপনে একত্ববাদের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, সেই বার্তা মরুভূমির বাতাস পেরিয়ে বহুদূরে ‘অদ্দান’ উপত্যকায় আবু জর (রা.)-এর কানে পৌঁছায়। মক্কায় এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে যিনি নিজেকে আল্লাহর রাসুল দাবি করছেন এবং মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে কথা বলছেন এ খবর শোনামাত্রই আবু জরের ব্যাকুল হৃদয় আলোড়িত হয়ে ওঠে।

ভাই উনাইসের মক্কা সফর

আবু জর (রা.) প্রথমে তাঁর ভাই উনাইস-কে মক্কায় পাঠান নতুন নবীর নবুওয়াত ও দাওয়াতের হাকীকত যাচাই করার জন্য। উনাইস ছিলেন একজন প্রখ্যাত কবি ও ভাষা বিশেষজ্ঞ। উনাইস মক্কায় গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্য ও কুরআনের তিলাওয়াত শুনে এসে আবু জরকে বললেন:

"আমি মক্কায় এমন এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করেছি যিনি উত্তম চরিত্র ও সৎকাজের আদেশ দেন এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করেন। তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী কবিতা নয়, জাদুকরী কথা নয়; তা এক অলৌকিক ও পরম সত্য কালাম।"

কিন্তু অনুসন্ধিৎসু আবু জর কেবল ভাইয়ের বর্ণনায় পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। সত্যকে নিজের চোখে দেখা ও অনুভবের প্রবল আকুলতা নিয়ে তিনি সামান্য ছাতু ও একটি পানির মশকর সঙ্গে নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে একাকী রওনা হলেন।

মক্কায় ভয়াবহ অনিশ্চয়তা ও হযরত আলী (রা.)-এর সাথে মোলাকাত

মক্কায় পৌঁছে আবু জর চরম বিপদের মুখোমুখি হলেন। তখন কুরাইশরা মুসলমানদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছিল। প্রকাশ্য রাজপথে নবীর খবর জিজ্ঞাসা করা মানেই কুরাইশদের তরবারির মুখোমুখি হওয়া। আবু জর (রা.) কারো কাছে পরিচয় বা উদ্দেশ্য প্রকাশ না করে কাবা প্রাঙ্গণে অবস্থান নিলেন। দিনের পর দিন তিনি কেবল যমযমের পানি পান করে খিদে মিটাতে লাগলেন।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের বর্ণনামতে, এভাবে তিন দিন ও তিন রাত কেটে গেল। তৃতীয় রাতে শেরে খোদা হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) কা‘বা চত্বরে এই নিঃসঙ্গ ও আগন্তুক মুসাফিরকে দেখে বুঝতে পারলেন যে তিনি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে এসেছেন। হযরত আলী (রা.) তাঁকে অতিথিপরায়ণতার সাথে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। দুই দিন ধরে উভয় পক্ষই নিরাপত্তার স্বার্থে নিজেদের আসল পরিচয় গোপন রাখলেন। তৃতীয় দিনে হযরত আলী (রা.) যখন পরম বিশ্বস্ততার আশ্বাস দিলেন, তখন আবু জর (রা.) সত্য প্রকাশ করে বললেন: "আমি সেই নতুন নবীর সাক্ষাতের আশায় সুদূর মরুপ্রান্তর থেকে এসেছি।"

হযরত আলী (রা.) অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং পরদিন সকালে তাঁকে গোপনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপবিত্র দরবারে (দারুল আরকাম বা রাসুল (সা.)-এর সাময়িক আস্তানায়) নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে ও কালেমা পাঠ

পরদিন হযরত আলী (রা.)-এর পিছু পিছু অনুগমন করে আবু জর (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হলেন। রাসুল (সা.)-এর নূরানী চেহারা ও চারিত্রিক মাধুর্য দর্শনমাত্রই আবু জরের ভেতরের সমস্ত সংশয় দূর হয়ে গেল।

তিনি ইসলামী সম্ভাষণে রাসুল (সা.)-কে অভিবাদন জানিয়ে বললেন: "আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলুল্লাহ!" (ইসলামী ইতিহাসে আবু জর গিফারী-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে 'আসসালামু আলাইকুম' বলে সম্ভাষণ জানান)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সালামের উত্তর দিলেন এবং তাঁর সামনে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করলেন। কুরআনের ঐশ্বরিক বাণী শুনে আবু জর (রা.) আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে উচ্চস্বরে পাঠ করলেন:

"أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ"

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল।”

ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানীর মতে, আবু জর গিফারী (রা.) ছিলেন সমগ্র মানবজাতির মধ্যে চতুর্থ বা পঞ্চম ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবী। এটি ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে তাঁর ঈমানের সুদৃঢ় ঈমানী সাহসিকতা ও অগ্রগামিতার এক পরম দলিল।

বীরত্ব ও ত্যাগের পরীক্ষা: কাবা চত্বরে প্রথম প্রকাশ্য তোহীদি হুঙ্কার

ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু জর (রা.)-এর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে তাঁকে নির্দেশ দিলেন: "হে আবু জর! তুমি তোমার ঈমানের কথা আপাতত গোপন রাখো এবং চুপচাপ নিজের গোত্রে ফিরে যাও। যখন আমাদের বিজয়ের খবর পাবে, তখন ফিরে এসো।"

কিন্তু নবদীক্ষিত আবু জরের হৃদয়ে তৌহীদের যে অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, তা গোপন রাখা তাঁর বিপ্লবী সত্তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। তিনি আরজ করলেন: "হে আল্লাহর রাসুল! যাঁর হাতে আমার প্রাণ তার কসম করে বলছি, আমি কাফেরদের এই আস্তানায় গিয়ে উচ্চকন্ঠে তৌহীদের ঘোষণা দেব!"

কাবার বুকে ঈমানী বজ্রনির্ঘোষ

তিনি সোজা কাবা প্রাঙ্গণে চলে গেলেন, যেখানে কুরাইশ সর্দাররা আড্ডা দিচ্ছিল। তিনি মাঝখানে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বললেন: "হে কুরাইশ সম্প্রদায়! শুনে রাখো, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল!"

একথা শোনামাত্রই উন্মত্ত কাফেররা চারদিক থেকে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা তাঁকে বুটের লাথি, পাথর ও লাঠি দিয়ে প্রহার করে রক্তাক্ত করে ফেলল।

হযরত আব্বাস (রা.)-এর সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ

আবু জর (রা.) যখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (যিনি তখনও প্রকাশ্য ইসলাম গ্রহণ করেননি, তবে বাণিজ্য হিসাব বুঝতেন) ছুটে এলেন। তিনি আবু জরের দেহের ওপর শুয়ে পড়ে কুরাইশদের সম্বোধন করে চিৎকার করে বললেন:

"ধ্বংস হোক তোমাদের! তোমারা কি জানো না এটি গিফার গোত্রের লোক? তোমাদের সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলাগুলোকে এই গিফার গোত্রের পাশ দিয়েই যেতে হয়! তোমরা যদি একে মেরে ফেলো, তবে গিফার গোত্র তোমাদের একটি কাফেলাও অক্ষত সিরিয়ায় যেতে দেবে না!"

বাণিজ্যিক স্বার্থে আঘাত লাগার ভয়ে কুরাইশরা তৎক্ষণাৎ মারধর বন্ধ করল। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, পরদিন সুস্থ হয়ে আবু জর (রা.) আবারো কাবা চত্বরে গিয়ে একইভাবে উচ্চস্বরে কালেমা তাইয়্যেবা পাঠ করলেন এবং আবারো প্রহৃত হলেন! এই ঘটনা প্রমাণ করে সত্যের পথে তাঁর ঈমানী দৃঢ়তা ও ভয়হীন মানসিকতা কতটা সুউচ্চ ছিল।

স্বগোত্রে দাওয়াত ও সামাজিক বিপ্লব

রাসুলুল্লাহ (সা.) পুনরায় তাঁকে স্বগোত্রে ফিরে গিয়ে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। আবু জর (রা.) তাঁর জন্মভূমি ‘অদ্দান’ উপত্যকায় ফিরে গেলেন।

স্বগোত্রে গিয়ে আবু জর (রা.) কেবল মুখের কথায় নয়, বরং তাঁর চারিত্রিক নৈতিকতা ও সততার মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে লাগলেন। তাঁর ভাই উনাইস ও মাতা সর্বপ্রথমে ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর তাঁর দাওয়াতি মেহনতে গিফার গোত্রের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মদিনায় হিজরতের আগেই ইসলাম গ্রহণ করল। বাকি অর্ধেক অংশ রাসুল (সা.)-এর মদিনায় আগমন ও খন্দকের যুদ্ধের পর ইসলামে দীক্ষিত হয়। পার্শ্ববর্তী ‘আসলাম’ গোত্রও আবু জরের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে।

মদিনায় আগমন ও নবীর ঐতিহাসিক দোয়া

খন্দকের যুদ্ধের পর আবু জর (রা.) যখন তাঁর নবদীক্ষিত বিশাল গিফার ও আসলাম গোত্রের জোয়ানদের সাথে নিয়ে মদিনায় আগমন করলেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলেন। তিনি দুই গোত্রের জন্য ঐতিহাসিক এক দোয়া করলেন:

"غَفَارُ غَفَرَ اللَّهُ لَهَا، وَأَسْلَمُ سَالَمَهَا اللَّهُ"

“আল্লাহ তাআলা 'গিফার' গোত্রকে ক্ষমা করে দিন এবং 'আসলাম' গোত্রকে শান্তিতে ও নিরাপত্তায় রাখুন।” (সহীহ বুখারী: ১০০৬, সহীহ মুসলিম: ২৫১৩)

একজন প্রাক্তন ডাকাতের হাত ধরে একটি অসভ্য ও লুণ্ঠনকারী গোত্র কীভাবে ইসলামের সুশীতল পতাকাতলে এসে মহানবী (সা.)-এর দোয়ার পাত্রে পরিণত হলো, এটি বিশ্বইতিহাসের এক অনুপম দৃষ্টান্ত।

মহীয়সী চারিত্রিক গুণাবলী ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব

হযরত আবু জর গিফারী (রা.)-এর জীবন ছিল রাসুলে কারীম (সা.)-এর সান্নিধ্যে গড় ওঠা এক অতুলনীয় চরিত্র। হাদিস ও ইতিহাসের কিতাবসমূহে তাঁর চরিত্রকে কয়েকটি বিশেষ বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে:

অপার্থিব সত্যবাদিতা: আবু জর (রা.)-এর সত্যবাদিতা সম্পর্কে স্বয়ং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ঐতিহাসিক সনদ দিয়েছেন, তা ইসলামী ইতিহাসে আর কোনো সাহাবী পাননি।

ইমাম তিরমিযী এবং ইবনে মাজাহ-এর বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন:

"مَا أَظَلَّتِ الْخَضْرَاءُ وَلاَ أَقَلَّتِ الْغَبْرَاءُ مِنْ ذِي لَهْجَةٍ أَصْدَقَ وَلاَ أَوْفَى مِنْ أَبِي ذَرٍّ"

“সবুজ আসমান যার ওপর ছায়া দিয়েছে এবং ধূসর জমিন যাকে পিঠে বহন করেছে, তাদের মধ্যে আবু জরের চেয়ে বেশি সত্যবাদী এবং অঙ্গীকার পূর্ণকারী আর কেউ নেই।” (সুনানে তিরমিযী: ৩৮০১)

তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি সত্য বলতে গিয়ে কোনো রাজা, খলিফা বা ধনকুবেরের বিন্দুমাত্র পরোয়া করতেন না।

পরম দুনিয়াবিমুখতা ও চরম দারিদ্র্য বরণ: আবু জর (রা.) দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও বিলাসিতাকে বিষের মতো ভয় করতেন। মদিনার বায়তুল মাল বা ফতুহাতের (বিজয়) মাধ্যমে যখন মুসলিম সালতানাতে অগাধ ধন-সম্পদ আসতে শুরু করল, তখনো আবু জর (রা.) প্রাক-ইসলামী যুগের অতি সাধারণ জীবনধারা বজায় রাখলেন। তাঁর ঘরে কেবল একটি জীর্ণ তোশক, একটি পানির পাত্র এবং একটি রান্নার হাঁড়ি ছাড়া আর কিছুই থাকত না। তিনি বলতেন: "আমার হাবীব (সা.) আমাকে ওসীয়ত করেছেন যেন আমি দুনিয়ার অতটুকুই গ্রহণ করি, যতটুকু একজন মুসাফিরের পাথেয় হিসেবে প্রয়োজন।"

আহলে সুফফা ও ইলমের চর্চা: তিনি ছিলেন মসজিদ-ই-নববীর বিখ্যাত ‘আহলে সুফফা’ (যে গৃহহীন সাহাবীগণ সর্বক্ষণ ইবাদত ও ইলম চর্চায় মগ্ন থাকতেন)-এর অন্যতম অগ্রণী সদস্য। তিনি রাসুল (সা.)-এর কাছ থেকে সরাসরি বহু গভীর সামাজিক ও রূহানী শিক্ষা লাভ করেছিলেন। হযরত আলী (রা.) তাঁর সম্পর্কে বলতেন: "আবু জর এমন ইলম অর্জন করেছিলেন, যা সাধারণ মানুষ অর্জন করতে সক্ষম হয়নি, অতঃপর তিনি তার ওপর শক্ত ঢাকনা দিয়ে আটকে রেখেছিলেন।"

একনজরে হযরত আবু জর গিফারী (রা.)

পাঠকদের সুবিধার্থে হযরত আবু জর গিফারী (রা.)-এর জীবন, পরিচয়, বিশেষ উপাধি ও ঐতিহাসিক অবদান নিচে একটি সংক্ষিপ্ত ও সুবিন্যস্ত সারণীর (Table) মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

মূল বিষয়াadi/ক্ষেত্র

ঐতিহাসিক তথ্য ও বিস্তারিত বিবরণ

মূল নাম ও কুনিয়াত

নাম: জুনদুব ইবনে জুনাদা (جندب بن جنادة); কুনিয়াত: আবু জর (أبو ذر)।

বংশ ও বংশলতিকা

বনু গিফার গোত্র; পিতা: জুনাদা ইবনে সুফিয়ান; মাতা: রামলা বিনতে আল-আনীয়া।

ইসলাম গ্রহণের স্থান ও ক্রম

মক্কা মুকাররমা; সর্বকালের ৪র্থ বা ৫ম ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবী।

বিশেষ সম্মান ও সনদ

"আসমানের নিচে ও জমিনের উপরে আবু জরের চেয়ে সত্যবাদী কেউ নেই" (তিরমিযী)।

প্রাক-ইসলামী ঝোঁক

জাহেলিয়াতেও একত্ববাদী (হানিফ); ইসলাম গ্রহণের ৩ বছর পূর্ব থেকেই সালাত আদায়কারী।

প্রধান সামাজিক ভূমিকা

সম্পদ কুক্ষিগত করার কঠোর প্রতিবাদী, সমতা ও গরিবদের অধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত।

রাসুল (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী

"আবু জর একা চলাফেরা করে, একা মৃত্যুবরণ করবে এবং একা পুনরুত্থিত হবে" (তাবুক অভিযান)।

ইন্তেকাল ও হিজরী সাল

৩২ হিজরী (৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ); খলিফা উসমান (রা.)-এর শাসনকাল।

মৃত্যুর স্থান ও দাফনকারী

রাবযা প্রান্তর (মরুভূমি); জানাজা পড়ান বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)।

রাজকীয় বিলাসিতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও খলিফা উসমান (রা.)-এর আমলের ঘটনাপ্রবাহ

ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম সংবেদনশীল ও মহীয়সী অধ্যায় হলো হযরত আবু জর গিফারী (রা.)-এর অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তৎকালীন শাসকদের বিলাসিতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান। মহানবী (সা.) এবং হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.)-এর ইন্তেকালের পর যখন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য বিজয়ের মাধ্যমে বায়তুল মালে অঢেল সোনা-রূপা জমা হতে শুরু করে, তখন সাধারণ মুসলমানদের জীবনে বিলাসিতার ছোঁয়া লাগে। আবু জর (রা.) এই বৈষয়িক পরিবর্তনকে ইসলামের মৌলিক রুহের জন্য হুমকি মনে করেছিলেন।

সূরা আত-তাওবার ৩৪ নম্বর আয়াতের কঠোর ব্যাখ্যা

আবু জর (রা.) কুরআনুল কারীমের সূরা আত-তাওবার ৩৪ নম্বর আয়াতকে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিজের ও সমাজের ওপর প্রয়োগ করতেন:

"وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلاَ يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ"

“আর যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত (জমা) করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।” (সূরা আত-তাওবা: ৩৪)

তৎকালীন অনেক ফকীহ সাহাবী মনে করতেন যে, সম্পদের যাকাত আদায় করে দিলে বাকি সম্পদ জমা রাখা বৈধ। কিন্তু আবু জর (রা.) চরম তাকওয়ার ওপর ভিত্তি করে বলতেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত যেকোনো সম্পদ জমিয়ে রাখাই 'কানয' (পুঞ্জীভূত সম্পদ) এবং তা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া ওয়াজিব।

সিরিয়া ও 'কাসরুল খাদরা' (সবুজ প্রাসাদ) বিতর্ক

সিরিয়ার তৎকালীন গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া (রা.) যখন দামেস্কে 'কাসরুল খাদরা' (সবুজ রঙের রাজকীয় প্রাসাদ) নির্মাণ করলেন, তখন আবু জর (রা.) সেখানে গিয়ে সরাসরি মুয়াবিয়া (রা.)-কে লক্ষ্য করে ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন:

"হে মুয়াবিয়া! তুমি যদি এই প্রাসাদ বায়তুল মালের (জনগণের) টাকায় বানিয়ে থাকো, তবে তা চরম খিয়ানত ও হীন চুরি! আর যদি তা তোমার ব্যক্তিগত টাকায় বানিয়ে থাকো, তবে তা চরম অপচয় ও বিলাসিতা!"

তিনি সিরিয়ার রাজপথে ঘুরে ঘুরে ধনী ও শাসকদের সম্পদের মোহ ত্যাগ করার কঠোর নসীহত করতে লাগলেন। সাধারণ দরিদ্র ও মজলুম মানুষ তাঁর চারপাশে জড়ো হতে লাগল। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কায় হযরত মুয়াবিয়া (রা.) খলিফা হযরত উসমান (রা.)-কে চিঠি লিখে বিষয়টি জানালেন।

খলিফা উসমান (রা.)-এর সাথে বৈঠক ও 'রাবযা' প্রস্থান

খলিফা উসমান (রা.) অত্যন্ত সম্মানের সাথে আবু জর (রা.)-কে মদিনায় ডেকে পাঠালেন। মদিনায় এসে আবু জর (রা.) খলিফাকে বললেন: "আমাকে দুনিয়ার বিলাসিতা থেকে দূরে থাকতে দিন। মদিনার পরিবেশেও এখন ধন-সম্পদের প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে।"

খলিফা উসমান (রা.) তাঁকে মদিনার কাছেই ‘রাবযা’ (الربذة) নামক একটি নির্জন মরুপ্রান্তরে বসবাসের অনুমতি দিলেন, যাতে তিনি নিজের পছন্দমতো নিভৃত ইবাদতে মগ্ন থাকতে পারেন। এটি কোনো শাস্তিমূলক বাধ্যতামূলক নির্বাসন ছিল না, বরং উম্মতের ভেতরে গৃহবিবাদ ও ফিতনা এড়ানো এবং আবু জরের ব্যক্তিগত যুহ্দ (দুনিয়াবিমুখতা)-কে সম্মান জানানোর এক যৌথ সিদ্ধান্ত ছিল। (ইবনে আসাকীর ও তাবাকাত ইবনে সা‘দ)।

তাবুক অভিযান ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণী

৯ হিজরীতে চরম গ্রীষ্মের দাবদাহের মধ্যে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত তাবুক অভিযান ছিল সাহাবীদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। খাবারের অভাব, পানির তীব্র সংকট এবং প্রচণ্ড গরমের কারণে একে 'জাইশুল উসরাহ' (কঠিন কষ্টের বাহিনী) বলা হয়।

অভিযানের পথে আবু জর (রা.)-এর উটটি অত্যন্ত দুর্বল ও রোগা হওয়ার কারণে বহরের অনেক পেছনে পড়ে গেল। কাফেলা এগিয়ে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে উটটি আর হাঁটতে পারল না। আবু জর (রা.) উট ছেড়ে দিলেন এবং নিজের সমস্ত আসবাবপত্র ও মালামাল নিজ পিঠে বহন করে ৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা সহ্য করে তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে একাকী পায়ে হেঁটে মদীনার সামরিক বহরের পিছু পিছু ছুটতে লাগলেন।

দূর মরু দিগন্তে ধূলিঝড়ের মধ্য দিয়ে একজন মানুষকে একাকী হেঁটে আসতে দেখে সাহাবীগণ চিৎকার করে উঠলেন: "হে আল্লাহর রাসুল! মরুভূমির মধ্য দিয়ে কে যেন একাকী হেঁটে আসছে!"

রাসুলুল্লাহ (সা.) দূর থেকে দেখেই আত্মিক নূরে চিনে ফেললেন এবং মৃদু হেসে বললেন: "كُنْ أَبَا ذَرٍّ" (ও যেন আবু জর-ই হয়!)

সত্যিই তিনি ছিলেন আবু জর! তিনি ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে রাসুল (সা.)-এর সামনে এসে পিঠের বোঝা নামিয়ে ফেললেন।

সেই অলৌকিক ও বেদনাময় ভবিষ্যদ্বাণী

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু জরের এই চরম নিষ্ঠা ও একাকী কষ্ট সহ্য করার দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললেন এবং এক ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী করলেন:

"يَرَحَمُ اللَّهُ أَبَا ذَرٍّ، يَمْشِي وَحْدَهُ، وَيَمُوتُ وَحْدَهُ، وَيُبْعَثُ وَحْدَهُ"

“আল্লাহ তাআলা আবু জরের ওপর রহম করুন! সে একা একা পথ চলে, সে একা একা মৃত্যুবরণ করবে এবং কেয়ামতের দিন একা একাই পুনরুত্থিত হবে।” (সুনানে বায়হাকী: ১৬৫৫৪, সীরাতে ইবনে হিশাম)

রাসুল (সা.)-এর মুখনিঃসৃত এই পবিত্র বাণীটি হুবহু অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তে।

রাবযার নিজন প্রান্তর ও অবিনশ্বর মহাপ্রস্থান

৩২ হিজরী (৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ)। মদিনা থেকে কয়েক মাইল দূরে জনমানবহীন ‘রাবযা’ মরুপ্রান্তরের একটি ছোট্ট জীর্ণ তंबू। বিশ্বনবী (সা.)-এর সেই মহীয়সী ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়ার অন্তিম মুহূর্ত উপস্থিত।

স্ত্রীর কান্না ও সান্ত্বনা: মৃত্যুশয্যায় শায়িত ৮০ বছর পার করা বৃদ্ধ আবু জর গিফারী (রা.)। পাশে কেবল তাঁর স্ত্রী এবং একটি দাসী। কোনো আত্মীয়, চিকিৎসক বা সাহায্যকারী নেই। কাফনের জন্য এক টুকরো বাড়তি কাপড়ও ঘরে নেই।

স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন: "হে রাসুলুল্লাহর সাহাবী! আপনার মৃত্যু উপস্থিত, অথচ আপনাকে পেঁচিয়ে কাফন দেওয়ার মতো অতিরিক্ত একটা চাদরও আমার ঘরে নেই! আমি কীভাবে এই নির্জন মরুভূমিতে আপনার দাফন করব?"

মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া আবু জর (রা.) এক চিলতে হাসি হেসে স্ত্রীকে বললেন:

"কেঁদো না স্ত্রী! রাসুলুল্লাহ (সা.) সত্য বলেছেন। তাবুক অভিযানে তিনি আমাকে বলেছিলেন 'তোমার মৃত্যু হবে এক নির্জন প্রান্তে, আর তোমার জানাজা ও দাফন সম্পাদন করবে মুমিনদের একটি দল।' শোনো, আমি পথচেয়ে আছি, এখনই কোনো কাফেলা এই পথ দিয়ে আসবে।"

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর আগমন

কথা শেষ হতেই আবু জর (রা.) শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে কুফা থেকে মক্কায় ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যাওয়া একটি কাফেলা রাবযা প্রান্তরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল। কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী এবং কুরআনের মহান শিক্ষক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)

একটি নিঃসঙ্গ তাঁবুর সামনে এক নারীকে কাঁদতে দেখে কাফেলাটি থামল। দাসীটি এগিয়ে এসে বলল: "ইনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় সাহাবী আবু জর গিফারী! তিনি ইন্তেকাল করেছেন, তাঁর কাফন ও দাফনের কেউ নেই!"

একথা শোনামাত্রই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি দৌড়ে তাঁবুর ভেতরে ঢুকলেন এবং আবু জরের পবিত্র লাশের পাশে বসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। রাসুল (সা.)-এর সেই ২১ বছর আগের ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ করে ইবনে মাসউদ (রা.) অঝোর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন:

"صَدَقَ رَسُولُ اللَّهِ! تَمْشِي وَحْدَكَ، وَتَمُوتُ وَحْدَكَ، وَتُبْعَثُ وَحْدَكَ!"

(সত্য বলেছেন আল্লাহর রাসুল! আপনি একা চলেছেন, একা মৃত্যুবরণ করেছেন এবং কেয়ামতের দিন একা একাই উঠবেন!)

ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কাফেলায় থাকা এক আনসারী যুবকের বিশুদ্ধ কাপড়ে হযরত আবু জর (রা.)-কে কাফন পরানো হলো। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) নিজেই জানাজার নামাজে ইমামতি করলেন এবং রাবযার নির্জন বালুকাশিখরে ইসলামের এই মহান সত্যবাদী সিংহকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হলো।

বর্তমান সমাজ ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আবু জর গিফারী (রা.)-এর আদর্শ

হযরত আবু জর গিফারী (রা.)-এর জীবন কেবল ইতিহাস বইয়ের পাতায় আবদ্ধ কোনো রূপকথা নয়; বরং একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান বৈশ্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল মুসলিম সমাজে তাঁর জীবনী অত্যন্ত জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিক।

অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অবৈধ সম্পদ সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষা: বর্তমানে পুরো বিশ্বে এবং আমাদের সমাজব্যবস্থায় সম্পদের অসম বণ্টন, অর্থপাচার, পুঁজিবাদের কুৎসিত আগ্রাসন এবং অবৈধ উপায়ে সম্পদ পাহাড়সম করার প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান। আবু জর (রা.)-এর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, পুঞ্জীভূত সম্পদ সমাজে শোষণের জন্ম দেয়। অভাবী ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং সুষম সমাজ গঠনে তাঁর নীতি অত্যন্ত কার্যকর।

সত্যবাদিতা ও নৈতিক সাহসিকতা: বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য আবু জর (রা.) এক মহীয়সী প্রেরণার উৎস। ক্ষমতার দাপট, সামাজিক ভয় কিংবা স্বার্থের মায়া ত্যাগ করে কীভাবে সত্যের পক্ষে অবিচল থাকতে হয়, তা আবু জরের চরিত্র থেকে শেখা যায়। তিনি শিখিয়েছেন যে, অন্যায়ের সাথে আপস করার চেয়ে নির্জন প্রান্তর একা বাস করাও অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ।

শিক্ষাঙ্গন ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা: বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার এবং সামাজিক সংগঠনগুলোতে আবু জর গিফারী (রা.)-এর সততা, আত্মত্যাগ ও সামাজিক সমতার দর্শন নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও শিক্ষা দেওয়া হয়। তাঁর নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা মানুষকে সাধারণ জীবনযাপন ও মানবিক সেবায় উৎসাহিত করে।

হযরত আবু জর গিফারী (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের এমন এক অবিনশ্বর আলোকবর্তিকা, যা যুগের পর যুগ ধরে সত্যকামী মানুষকে পথ দেখিয়ে যাবে। ডাকাতি ও জাহেলিয়াতের ঘনকালো আঁধার থেকে বের হয়ে এসে তিনি নিজেকে ঈমানের এমন এক উচ্চতায় উন্নীত করেছিলেন, যেখানে দুনিয়ার কোনো সম্পদ, ক্ষমতা বা সম্মান তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।

তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসাকে জীবনের একমাত্র পাথেয় করেছিলেন। রাবযার তপ্ত বালুকাবেলায় তাঁর একাকী মৃত্যু আমাদের স্মরিয়ে দেয় যে, সত্যের পথ প্রায়শই নির্জন, কঠিন ও একাকীত্বের কিন্তু সেই পথের শেষ পরিণতি জান্নাতের চিরন্তন সাফল্য। আবু জর গিফারী (রা.)-এর জীবন প্রমাণ করে, মানুষের অতীত যতই অন্ধকার হোক না কেন, তৌহীদের খাঁটি বিশ্বাস ও সততার আলোয় আলোকিত হলে সেই মানুষটিই হয়ে উঠতে পারে আসমান ও জমিনের সবচেয়ে সত্যবাদী মহানায়ক। পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা হযরত আবু জর গিফারী (রা.)-এর আত্মাকে শান্তিতে রাখুন এবং আমাদের তাঁর আদর্শে জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.