কাদিয়ানী আহমদীয়া সম্প্রদায় - আকীদাগত বিতর্ক ও বিভিন্ন দেশে তাদের অমুসলিম ঘোষণা

কাদিয়ানী আহমদীয়া সম্প্রদায় - আকীদাগত বিতর্ক ও বিভিন্ন দেশে তাদের অমুসলিম ঘোষণা

ইসলাম ধর্মের দীর্ঘ ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ ধর্মীয় মতবাদ, রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও ফিরকার উদ্ভব ঘটেছে। এর মধ্যে ১৯ শতকের শেষের দিকে (১৮৮৯ সালে) তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের কাদিয়ান নামক স্থানে উদ্ভূত 'কাদিয়ানী' বা 'আহমদীয়া' আন্দোলনটি অন্যতম বিতর্কিত ও বহুল আলোচিত বিষয়।

আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী। মূলধারার সুন্নি ও শিয়া মুসলিম পণ্ডিতদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মতো মৌলিক ঈমানী ভিত্তি 'খাতমে নবুয়ত' অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে শেষ ও চূড়ান্ত নবী হিসেবে বিশ্বাস করার নীতিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা বা অস্বীকার করার কারণে কাদিয়ানীরা ইসলামী মিল্লাত বা উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। অন্যদিকে, তারা নিজেদের 'আহমদীয়া মুসলিম জামায়াত' হিসেবে দাবি করে বিশ্বজুড়ে প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে।

কাদিয়ানী সম্প্রদায় প্রকৃতপক্ষে কারা, তাদের আকীদা ও মূলধারার ইসলামের সাথে বিরোধের মূল জায়গাগুলো কোথায়, কেন বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ ও আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমিগুলো তাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে অমুসলিম ঘোষণা করেছে এবং বিশ্বজুড়ে তাদের ভৌগোলিক বিস্তার কেমন তার বিস্তারিত ও গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ নিচে উপস্থাপন করা হলো।

কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের নামকরণ ও কার্যক্রমের সূচনা

কাদিয়ানী হলো এমন একটি ধর্মীয় আন্দোলন, যা ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার ‘কাদিয়ান’ নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামে আত্মপ্রকাশ করে। এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (১৮৩৫-১৯০৮)।

১৮৮৯ সালের ২৩ মার্চ ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলের লুধিয়ানায় বিয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণের মাধ্যমে মির্জা গোলাম আহমদ (১৮৩৫-১৯০৮) আনুষ্ঠানিকভাবে এই আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার কাদিয়ান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৮০ থেকে ১৮৮৪ সালের মধ্যে প্রকাশিত তাঁর চার খণ্ডের গ্রন্থ ‘বরাহীনে আহমদীয়া’ (Barahin-e-Ahmadiyya)-এর মাধ্যমে তিনি প্রথম ভারতীয় উপমহাদেশে পরিচিতি লাভ করেন। প্রারম্ভিক পর্যায়ে তিনি খ্রিস্টান মিশনারি এবং হিন্দু সংস্কারবাদী সংগঠন ‘আর্য সমাজ’-এর মতাদর্শের বিরুদ্ধে লেখালিখি ও বিতর্কের মাধ্যমে ইসলামের প্রতিরক্ষার দাবি জানান।

কাদিয়ানী: আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা গোলাম আহমদের জন্মস্থান ‘কাদিয়ান’ গ্রাম থেকে এই নামটির উৎপত্তি। বিশ্বজুড়ে মূলধারার মুসলিম সমাজ, ইসলামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান (যেমন রাবেতায়ে আলমে ইসলামী) এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি আইন ও দাপ্তরিক নথিপত্রে তাদের চিহ্নিত করতে ‘কাদিয়ানী’ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়।

আহমদীয়া: এই সম্প্রদায়ের অনুসারীরা নিজেদের ‘আহমদীয়া মুসলিম জামাত’ (Ahmadiyya Muslim Jama'at) হিসেবে পরিচয় দেয়। ১৯০০ সালের নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ সরকারের আদমশুমারির সময় মির্জা গোলাম আহমদ তাঁর অনুসারীদের নিবন্ধনের জন্য ‘আহমদীয়া’ নামটি গ্রহণ করেন। তাঁদের দাবি অনুসারে, কুরআনে বর্ণিত হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অপর নাম ‘আহমদ’ (সূরা আস-সফ: ৬) অনুসরণে এই নামকরণ করা হয়েছে। তবে মূলধারার সুন্নি ও শিয়া ওলামাদের মতে, সাধারণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করতে এবং ইসলামের সাথে নিজেদের একীভূত দেখাতে এই পরিভাষা ব্যবহার করা হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ব্রিটিশ আমল

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি ব্রিটিশ রাজের অধীনে উপমহাদেশের শাসনভার হস্তান্তরিত হয়। সেসময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও বিশেষ করে মুসলিম সমাজের সশস্ত্র প্রতিরোধ চেতনাকে প্রশমিত করার একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। এই সময়ে মির্জা গোলাম আহমদ ঘোষণা করেন যে, তৎকালীন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম বা জিহাদ স্থগিত বা রহিত করা হয়েছে। তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের পরিবর্তে ‘জিহাদ বিল ক্বলম’ (কলমের জিহাদ) বা অহিংস প্রচার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ঔপনিবেশিক প্রশাসন ভারতীয়দের মধ্যকার সশস্ত্র অসন্তোষ দমন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করত। মির্জা গোলাম আহমদের রাজভক্তিমূলক অবস্থান এবং সশস্ত্র জিহাদ স্থগিতের তত্ত্বকে তৎকালীন ঔপনিবেশিক সরকার তাদের শাসন সুসংহত করার অনুকূল উপাদান হিসেবে প্রত্যক্ষ করে। একই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম যেমন মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী সহ বহু সুন্নি ও আহলে হাদিস গবেষক মির্জা গোলাম আহমদের বিভিন্ন দাবির বিরোধিতা করে পুস্তিকা রচনা করেন এবং বহাস ও বিতর্কের আহ্বান জানান, যা সমকালীন ধর্মীয় পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

মির্জা গোলাম আহমদ ও তাঁর ধাপে ধাপে দাবিসমূহ

মির্জা গোলাম আহমদ (১৮৩৫–১৯০৮) তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরদাসপুর জেলার কাদিয়ান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ধর্মীয় বিতর্ক, লেখালেখি এবং নতুন নতুন ধারণার মাধ্যমে তিনি উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে একটি নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। তাঁর ধর্মীয় দাওয়াত ও দাবির রূপান্তর একবারে ঘটেনি, বরং কয়েক দশকে তা ধাপে ধাপে বিস্তৃত ও পরিবর্তিত হয়েছিল:

লেখক ও মুনাজির (বিতর্ককারী): প্রাথমিক জীবনে তিনি খ্রিস্টান মিশন এবং তৎকালীন হিন্দু সংস্কারবাদী সংগঠন ‘আর্য সমাজ’-এর যুক্তির বিরুদ্ধে ইসলামের পক্ষে লেখালেখি ও তর্কে লিপ্ত হন। ১৮৮০ সালে তাঁর বিখ্যাত আকর গ্রন্থ ‘বারাহীনে আহমদীয়া’-র প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড (পরবর্তীতে ১৮৮২ ও ১৮৮৪ সালে ৩য় ও ৪থ খণ্ড) প্রকাশিত হয়। এ পর্বে তিনি যুক্তিভিত্তিক লেখক হিসেবে মুসলিম সমাজে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেন। তবে এই বইয়েই তিনি ধীরে ধীরে নিজের ওপর ঐশ্বরিক বাণী বা ‘ইলহাম’ ও দর্শনের (‘কশফ’) কথা উল্লেখ করা শুরু করেন।

মুজাদ্দিদ বা যুগের সংস্কারক: ১৮৮৫ সালের দিকে তিনি নিজেকে চতুর্দশ হিজরী শতকের ‘মুজাদ্দিদ’ (ধর্মীয় সংস্কারক) হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ১৮৮৯ সালে তিনি অনুসারীদের কাছ থেকে ‘বাইআত’ (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ শুরু করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আহমদীয়া মুসলিম জামাত’ প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রতিশ্রুত মাসীহ ও ইমাম মাহদী: ১৮৯১ সালে তিনি ‘ফাতহে ইসলাম’, ‘তাউদীহে মারাম’ এবং ‘অযালে ওহাম’ শীর্ষক বইগুলোতে নতুন দাবি উত্থাপন করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, হযরত ঈসা (আ.) আকাশ থেকে সশরীরে নেমে আসবেন না, বরং রূপক অর্থে এক রূপান্তর ঘটবে। নিজেকে তিনি শেষ জামানার প্রতিশ্রুত ঈসা মাসীহ এবং ইমাম মাহদী হিসেবে দাবি করেন।

নবুয়ত ও রাসূলত্বের দাবি: ১৯০১ সালে প্রকাশিত ‘এক গলতি কা ইযালা’ (একটি ভুলের নিরসন) শীর্ষক ট্র্যাক্টে তিনি স্পষ্টভাবে নিজেকে আল্লাহ তাআলার ‘নবী’ ‘রাসূল’ হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে নিজের নবুয়তকে মূলধারার ইসলাম থেকে আলাদা দেখাতে তিনি ‘জিল্লি’ (ছায়াস্বরূপ), ‘ব্রুজি’ (প্রতিফলন) এবং ‘উম্মতি নবী’ শব্দগুলো ব্যবহার করেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, তিনি কোনো নতুন শরীয়ত বা নতুন আসমানী কিতাব আনেননি, বরং হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পূর্ণ অনুগত থেকে নবুয়তের মাকাম লাভ করেছেন।

কাদিয়ানীদের প্রধান আকীদা ও মূলধারার ইসলামের সাথে সংঘাত

ইসলামের মৌলিক ও অনমনীয় বিশ্বাসের সাথে কাদিয়ানী (আহমদীয়া) সম্প্রদায়ের মূল পার্থক্যগুলো প্রধানত নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে:

খতমে নবুয়তের অস্বীকৃতি

ইসলামী বিশ্বাসের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো নবুয়ত ও রাসূলত্বের ধারাবাহিকতা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমেই চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ৪০ নম্বর আয়াতে এর স্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে:

"মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী (খাতামুন্নাবিয়্যীন)।"

মূলধারার মুসলিম পন্ডিতদের মতে, 'খাতাম' শব্দের অর্থ মোহর বা সমাপ্তি অর্থাৎ নবুয়তের দরজায় চিরতরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে। অসংখ্য সহীহ হাদীসেও এর ব্যাখ্যা স্পষ্ট; যেমন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আমার ও কিয়ামতের মধ্যবর্তী সময়ে আর কোনো নবী নেই" এবং "আমিই শেষ নবী, আমার পর আর কোনো নবী আসবে না" (লা নবিয়্যা বা'দী)

পক্ষান্তরে, মির্জা গোলাম আহমদ ‘খাতামুন্নাবিয়্যীন’ শব্দটির ব্যাখ্যা বদলে দিয়ে দাবি করেন যে, মুহাম্মদ (সা.) নবীদের সিল বা মোহর, অর্থাৎ তাঁর অনুগত্যের মাধ্যমে এখনও নবুয়ত লাভ সম্ভব। মূলধারার সমস্ত ইসলামী আলেম ও আইনবিদদের দৃষ্টিতে এই ব্যাখ্যা কুরআনিক ঘোষণার সরাসরি বিকৃতি। এ কারণেই ১৯৭৪ সালে রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামীর বিশ্ব সম্মেলনে এবং পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে কাদিয়ানী বা আহমদী সম্প্রদায়কে অমুসলিম হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

হযরত ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু সম্পর্কিত বিশ্বাস

পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নিসার ১৫৭ ও ১৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, হযরত ঈসা (আ.)-কে হত্যাও করা হয়নি এবং ক্রুশবিদ্ধও করা হয়নি, বরং আল্লাহ তাআলা তাঁকে সশরীরে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। মূলধারার আকিদা হলো, কিয়ামতের পূর্বে ঈসা (আ.) সশরীরে আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়ে বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।

কাদিয়ানীদের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে, হযরত ঈসা (আ.)-কে ক্রুশে চড়ানো হলেও তিনি সেখানে মারা যাননি; বরং মূর্ছিত অবস্থায় তাঁকে ক্রুশ থেকে নামিয়ে আনা হয় এবং পরবর্তীতে জখম নিরাময় করা হয়।

চিকিৎসা শেষে তিনি বনি ইসরাঈলের হারিয়ে যাওয়া গোত্রগুলোর সন্ধানে পূর্বদিকে ভ্রমণ করে ভারতের কাশ্মীরে পৌঁছান। সেখানে শ্রীনগরের ‘খানয়ার’ এলাকার ‘রোজা বল’ নামক স্থানে ‘ইউস আসাফ’ নামে ১২০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

কাদিয়ানীদের মতে, যেহেতু মূল ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন, তাই আসমান থেকে তাঁর সশরীরে প্রত্যাবর্তনের ধারণা ভুল। ফলে মির্জা গোলাম আহমদ নিজেই আধ্যাত্মিক গুণাবলীতে সেই প্রতিশ্রুত ঈসা। মূলধারার ইসলাম শাস্ত্রবিদরা এই তত্ত্বকে ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় ভিত্তিহীন হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন।

সশস্ত্র জিহাদ বিলুপ্তির ঘোষণা

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে মির্জা গোলাম আহমদ ফতোয়া দেন যে, ইসলামে সশস্ত্র বা তলোয়ারের জিহাদ বাতিল ও চিরতরে রদ করা হয়েছে। ‘শাহাদাতুল কুরআন’সহ তাঁর বিভিন্ন লেখায় তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান যুগে কাফেরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করা হারাম এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা শরীয়তসম্মত দায়িত্ব। তাঁর মতে, এ যুগে কেবল কলম, যুক্তি, দাওয়াত ও আত্মশুদ্ধির (জিহাদে আকবর) মাধ্যমে ইসলামের প্রচার চালানো যাবে।

মূলধারার আলেমদের মতে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও স্বাধীনতাকামী মুসলিমদের সশস্ত্র প্রতিরোধকে নিষ্ক্রিয় করার লক্ষ্যেই ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটিশ রাজের অনুকূলে এই তত্ত্ব উত্থাপন করা হয়েছিল। ইসলামে প্রতিরক্ষামূলক বা ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে জিহাদের বিধান অপরিবর্তনীয়, যা কোনো ব্যক্তি এককভাবে রদ করতে পারে না।

আহমদীয়া আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন: কাদিয়ানী বনাম লাহোরী

১৯০৮ সালে আহমদীয়া আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা গোলাম আহমদের মৃত্যুর পর হাকিম নুরুদ্দীন প্রথম উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯১৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং মির্জা গোলাম আহমদের ধর্মীয় মর্যাদা নিয়ে তীব্র নীতিগত মতপার্থক্য তৈরি হয়, যার ফলে আন্দোলনটি দুটি স্পষ্ট উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে:

আহমদীয়া মুসলিম জামাত (কাদিয়ানী গ্রুপ)

মির্জা গোলাম আহমদের পুত্র মির্জা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদকে দ্বিতীয় খলীফা নির্বাচনের মাধ্যমে এই মূল ও সংখ্যাগরিষ্ঠ ধারার প্রশাসনিক সূচনা হয়। এই গোষ্ঠীটি একক খিলাফত ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। ১৯১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে পঞ্চম খলীফা হিসেবে মির্জা মাসরুর আহমদ যুক্তরাজ্যের লন্ডনে থেকে বিশ্বব্যাপী পরিচালনা করছেন।

কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থানান্তর: এদের সদর দফতর প্রথমে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের কাদিয়ানে ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর এটি পাকিস্তানের রাবওয়াহতে স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক 'অর্ডিন্যান্স ২০' জারির মাধ্যমে আহমদীয়াদের প্রকাশ্য ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও পরিভাষা ব্যবহারে আইনি নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলে বৈশ্বিক সদর দফতর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে (বর্তমানে তিলফোর্ড) সরিয়ে নেওয়া হয়।

নবুওয়াত সংক্রান্ত আকিদা: কাদিয়ানী গ্রুপ মির্জা গোলাম আহমদকে পূর্ণাঙ্গ অর্থে নবুওয়াতের অধিকারী ('জিলী' বা 'উম্মতী' নবী) মনে করে। তাদের মতে, তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসরণে নতুন কোনো শরিয়ত ব্যতিরেকেই নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন।

অন্যান্য মুসলিমদের বিষয়ে অবস্থান: এই গোষ্ঠীটি মনে করে যে, মির্জা গোলাম আহমদকে প্রতিশ্রুত মাসীহ ও নবী হিসেবে মেনে নেওয়া আবশ্যক। ফলে যারা তাঁকে স্বীকার করে না, তাদের তারা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মূল বিশ্বাসের বাইরে অবস্থানকারী বলে গণ্য করে।

লাহোর আহমদীয়া আন্দোলন (লাহোরী গ্রুপ)

মৌলবী মুহাম্মদ আলী ও খাজা কামালউদ্দীনের নেতৃত্বে ১৯১৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে 'আহমদীয়া আঞ্জুমান ইশাআতে ইসলাম লাহোর' গঠিত হয়। এরা খিলাফত ব্যবস্থার বিরোধিতা করে একটি নির্বাচিত পরিচালন পর্ষদ (আঞ্জুমান) দ্বারা পরিচালিত হতে শুরু করে।

ধর্মীয় অবস্থান ও সংস্কারকের দাবি: লাহোরী গ্রুপ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-ই শেষ নবী (খাতামুন্নাবিয়্যীন) এবং তাঁর পর নবুওয়াতের দরজা চিরতরে বন্ধ। তারা মির্জা গোলাম আহমদকে কোনো প্রকার 'নবী' বা 'রাসূল' হিসেবে মানতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে; বরং তাঁকে কেবল চতুর্দশ হিজরী শতকের 'মুজাদ্দিদ' (ধর্মীয় সংস্কারক), 'প্রতিশ্রুত মাসীহ' ও 'মেহেদী' হিসেবে দাবি করে।

অন্যান্য মুসলিমদের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি: এরা সাধারণ মুসলিমদের অমুসলিম মনে করে না এবং মূলধারার মুসলিমদের সাথে ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার নীতি পোষণ করে।

বুদ্ধিবৃত্তিক ও দাওয়াতী কাজ: মৌলবী মুহাম্মদ আলী কর্তৃক কুরআনের ইংরেজি অনুবাদ ও তাফসীর প্রকাশের মাধ্যমে এরা পশ্চিমা বিশ্বে প্রথাগত দাওয়াতী কার্যক্রমে মনোযোগ দেয়। যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক 'ওয়োকিং মসজিদ' কেন্দ্রিক কার্যক্রমেও এদের বড় ভূমিকা ছিল।

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি

বিশ্বের সর্বসম্মত ইসলামী স্কলারদের প্রতিষ্ঠান (যেমন: মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ, ওআইসি ফিকহ একাডেমি ও আন্তর্জাতিক দেওবন্দী স্কলারগণ) উভয় গ্রুপকেই ইসলামের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে।

কাদিয়ানী গ্রুপের বিচ্যুতি: নবুওয়াতের সমাপ্তি (খাতামে নবুওয়াত) সংক্রান্ত মৌলিক ইসলামী আকিদা লঙ্ঘন করে মির্জা গোলাম আহমদকে নবী দাবি করা এবং অন্যান্য সর্বসাধারণ মুসলিমকে অমুসলিম মনে করা।

লাহোরী গ্রুপের বিচ্যুতি: যদিও এরা সরাসরি মির্জা গোলাম আহমদকে 'নবী' বলে না, তবুও তাঁকে ঈসা (আ.)-এর স্থলাভিষিক্ত মাসীহ ও মাহদী হিসেবে গ্রহণ করা এবং তাঁর মতাদর্শকে ইসলামি বিশ্বাসের অংশ করার কারণে আলেমদের মতে উভয় দলেরই মূল ভিত্তি এক এবং এরা উভয়েই মূলধারার উম্মাহ থেকে পৃথক।

মূলধারার ইসলাম বনাম কাদিয়ানী আকীদার তুলনামূলক বিশ্লেষণ

নিচে মূলধারার ইসলামী বিশ্বাস এবং কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের মৌলিক পার্থক্যসমূহ ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:

বিচার্য বিষয় / আকীদা

মূলধারার ইসলাম (আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াত)

কাদিয়ানী / আহমদীয়া সম্প্রদায়

খতমে নবুয়ত (নবুয়তের সমাপ্তি)

হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ ও চূড়ান্ত নবী। তাঁর পর যেকোনো ধরণের নবুয়তের দাবি বাতিল ও ভণ্ডামি।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) শ্রেষ্ঠ নবী হলেও নবুয়ত বন্ধ হয়নি; তাঁর অধীনে 'জিল্লি' বা 'ব্রুজি' (ছায়াস্বরূপ) নবী হিসেবে মির্জা গোলাম আহমদ এসেছেন।

হযরত ঈসা (আ.)-এর আসমানী হায়াত

তাঁকে আসমানে জীবিত অবস্থায় উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কিয়ামতের পূর্বে তিনি সশরীরে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হবেন।

তিনি কাশ্মীরে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন। আসমান থেকে তাঁর আর কোনো প্রত্যাবর্তন ঘটবে না।

ইমাম মাহদী ও মাসীহ

শেষ জামানায় মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধারায় ইমাম মাহদী আসবেন এবং আসমান থেকে ঈসা (আ.) এসে তাঁর সাথে মিলিত হবেন।

মির্জা গোলাম আহমদ একাধারে প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদী এবং রূপক অর্থে ঈসা মাসীহ।

জিহাদের বিধান

শরীয়তের বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্ত ও পরিস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও আত্মরক্ষায় শারীরিক/সশস্ত্র জিহাদ স্বীকৃত।

তলোয়ার বা অস্ত্রের জিহাদ চিরতরে রহিত ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে; কেবল কলম ও দাওয়াতের মাধ্যমে জিহাদ বৈধ।

অনুগামীদের ইসলামী মর্যাদা

যে ব্যক্তি শাহাদাহ প্রদান করে এবং দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে ঈমান আনে, সে মুসলিম।

মির্জা গোলাম আহমদকে যারা বিশ্বাস করে না, তারা ঈমানের পরিপূর্ণতা থেকে বঞ্চিত বা অননুসারী।

বিভিন্ন দেশে কাদিয়ানীদের অবস্থা ও অমুসলিম ঘোষণা

কাদিয়ানী (আহমদীয়া) সম্প্রদায়ের আকীদা, মতবাদ এবং মির্জা গোলাম আহমদের দাবির প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ইসলামী রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং একাধিক দেশের সর্বোচ্চ আদালত ও আইনসভা তাদের অমুসলিম হিসেবে ঘোষণা করেছে।

পাকিস্তান

পাকিস্তান কাদিয়ানীদের আইনি মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় অবস্থানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠোর ও দীর্ঘ রাজনৈতিক-আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে।

১৯৭৪ সালের দ্বিতীয় সংশোধনী: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর শাসনকালে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে দীর্ঘ ৯ দিনের রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও যুক্তিতর্কের পর ১৯৭৪ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর সংবিধানে দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়। এর মাধ্যমে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬০(৩)-এ কাদিয়ানী ও লাহোরী উভয় গ্রুপকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

১৯৮৪ সালের অডিন্যান্স ২০ (Ordinance XX): প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের আমলে এই অধ্যাদেশ জারি করে পাকিস্তান দণ্ডবিধিতে (PPC) ২৯৮-বি এবং ২৯৮-সি ধারা যুক্ত করা হয়। এই আইনি ধারার অধীনে কাদিয়ানীদের জন্য নিজেদের 'মুসলিম' হিসেবে পরিচয় দেওয়া, নিজেদের উপাসনালয়কে 'মসজিদ' বলা, আজান দেওয়া, প্রকাশ্যে ইসলামী পরিভাষা ব্যবহার করা এবং নিজেদের ধর্মকে 'ইসলাম' হিসেবে প্রচার করা ৩ বছরের কারাদণ্ডসহ দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে কার্যকর করা হয়।

১৯৯৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায়: ‘জহিরউদ্দীন বনাম রাষ্ট্র’ ঐতিহাসিক মামলায় পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অডিন্যান্স ২০-এর বৈধতা বহাল রাখে এবং উল্লেখ করে যে অমুসলিমদের দ্বারা মূলধারার ইসলামী প্রতীক ও পরিভাষা ব্যবহার করা সাধারণ মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ করে।

সৌদি আরব ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ

১৯৭৪ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের সম্মেলনে বিশ্বজুড়ে ১৪০টিরও বেশি মুসলিম দেশ ও ধর্মীয় সংস্থার প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতিক্রমে কাদিয়ানীদের ইসলামবহির্ভূত ও অমুসলিম বলে ঘোষণা করে।

পবিত্র ভূমিতে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা: সৌদি আরব সরকার কাদিয়ানীদের অমুসলিম হিসেবে গণ্য করে। দেশটির রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী অমুসলিমদের জন্য পবিত্র মক্কা ও মদীনার সীমান্ত সীমানায় (হারামাইন শারিফাইন) প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

হজ্জ ও ওমরাহ ভিসা নীতি: হজ্জ ও ওমরাহের ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে প্রতিটি আবেদনকারীকে স্পষ্ট অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয় যে, তিনি শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে শেষ রাসুল হিসেবে বিশ্বাস করেন (খতমে নবুয়ত) এবং কাদিয়ানী বা আহমদীয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নন।

অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহ

মালয়েশিয়া: ১৯৭৫ সালে মালয়েশিয়ার জাতীয় ফতোয়া পরিষদ (National Fatwa Council) কাদিয়ানীদের অমুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে ঘোষণা করে। সেলানগর, পেনাং সহ একাধিক রাজ্য ধর্মীয় পরিষদ (MAIS) আইন পাস করে তাদের দ্বারা ইসলামের নামে কোনো প্রচার-প্রচারণা চালানো বা নিজেদের 'মুসলিম' পরিচয় দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ করেছে।

ইন্দোনেশিয়া: ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ ইসলামী সংস্থা 'মজলিস ওলামা ইন্দোনেশিয়া' (MUI) ১৯৮০ এবং ২০০৫ সালে ফতোয়া জারি করে কাদিয়ানী মতবাদকে একটি বিপথগামী এবং ইসলামের বহির্ভূত ধারা হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০০৮ সালে ইন্দোনেশিয়া সরকার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের যৌথ আদেশে (SKB) কাদিয়ানীদের প্রকাশ্যে তাদের মতবাদ প্রচার এবং নিজেদের ইসলামী সম্প্রদায় হিসেবে দাবি করার ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

মিশর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত: মিশরে ১৯৫৮ সালে প্রশাসনিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে কাদিয়ানী জামায়াতকে একটি অবৈধ সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তাদের প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধ ধর্মীয় কার্যক্রম, লিফলেট বিতরণ ও পুস্তক প্রকাশ নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে কাদিয়ানী সম্প্রদায় নিজেদের 'আহমদীয়া মুসলিম জামাত' নাম দিয়ে পরিচালিত হয়। ঢাকা (বকশীবাজার), পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের কার্যালয় ও উপাসনালয় রয়েছে।

ইসলামী দল ও আলেমদের দাবি: বাংলাদেশের প্রধান ধারার আলেমসমাজ, হেফাজতে ইসলাম, আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াতসহ সমস্ত ইসলামী দল ও সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে যেন পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশের সংবিধানেও কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

প্রকাশনা ও বই সংক্রান্ত আইনি পদক্ষেপ: ২০০৪ সালে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কাদিয়ানীদের প্রকাশিত সমস্ত বইপত্র ও পত্রিকা বাজেয়াপ্ত করার একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ প্রদান করে।

বর্তমান আইনি ও সামাজিক অবস্থা: বাংলাদেশে সংবিধানে এখনো পর্যন্ত তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়নি। তারা আইনগতভাবে সাধারণ নাগরিক অধিকার ভোগ করছে। তবে মূলধারার মুসলিমদের মতো একই পরিভাষা, প্রতীক ও আযান ব্যবহারের কারণে প্রায়শই পঞ্চগড় ও অন্যান্য স্থানে সালানা জলসাকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও ধর্মীয় টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।

বিশ্বজুড়ে কাদিয়ানীদের বর্তমান আবাসন ও বৈশ্বিক সদর দপ্তর

কাদিয়ানী (আহমদীয়া) সম্প্রদায়ের বিশ্বব্যাপী সদস্যসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান রয়েছে। তাদের নিজস্ব প্রচার মাধ্যমগুলোর দাবি অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ২০৯টিরও বেশি দেশ ও ভূখণ্ডে তাদের অনুসারী সংখ্যা ১০ মিলিয়নের (১ কোটি) বেশি। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টার এবং স্বাধীন সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, তাদের প্রকৃত জনসংখ্যা বৈশ্বিক মোট মুসলিম জনসংখ্যার ০.২% থেকে ০.৫%-এর মধ্যে, যা আনুমানিক ১ থেকে ১.৫ কোটির কাছাকাছি। পাকিস্তান, ভারত, নাইজেরিয়া, ঘানা এবং ইন্দোনেশিয়ায় তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুসারী বসবাস করে।

বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দু ও সদর দপ্তর স্থানান্তর

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আইনি বিধিনিষেধের কারণে এই সম্প্রদায়ের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক সদর দপ্তর তিনটি ঐতিহাসিক পর্যায়ে স্থানান্তরিত হয়েছে:

কাদিয়ান (ভারত, ১৮৮৯–১৯৪৭): ১৮৮৯ সালে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের গুরুদাসপুর জেলার কাদিয়ান গ্রামে মির্জা গোলাম আহমদ এই সম্প্রদায়ের ভিত্তিপ্রস্থাপন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পূর্ব পর্যন্ত কাদিয়ানই ছিল তাদের সমস্ত ধর্মীয়, প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মূল কেন্দ্র। এখানে অবস্থিত 'মিনারাতুল মসীহ' এবং তাদের প্রবর্তকের সমাধিক্ষেত্রটি সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের মূল স্থান হিসেবে বিবেচিত।

রাবওয়াহ/চেনাব নগর (পাকিস্তান, ১৯৪৭–১৯৮৪): ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অনুসারীদের একটি অংশ ভারতে থেকে গেলেও মূল নেতৃত্ব নতুন গঠিত পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৪৮ সালে তাদের দ্বিতীয় খলীফা মির্জা বশীরউদ্দীন মাহমুদের নেতৃত্বে ঝং (বর্তমান চিনিয়োট) জেলায় ঝিলম নদীর তীরে ইজারাকৃত জমিতে 'রাবওয়াহ' শহর প্রতিষ্ঠা করা হয়। দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে এটি ছিল সম্প্রদায়ের পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক শহর, যেখানে 'সদর আনজুমানে আহমদীয়া' এবং 'তাহরীকে জদীদ' এর আন্তর্জাতিক সদর দপ্তর অবস্থিত ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদ আইন পাস করে রাবওয়াহ শহরের নাম পরিবর্তন করে 'চেনাব নগর' রাখে।

ইসলামাবাদ/টিলফোর্ড (যুক্তরাজ্য, ১৯৮৪–বর্তমান): ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা এবং ১৯৮৪ সালে সামরিক শাসক জিয়াউল হকের আমলে 'অর্ডিন্যান্স ২০' জারির মাধ্যমে কাদিয়ানীদের জন্য ইসলামী পরিভাষা ও প্রতীক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এই পরিস্থিতিতে সম্প্রদায়ের তৎকালীন চতুর্থ খলীফা মির্জা তাহের আহমদ ১৯৮৪ সালে যুক্তরাজ্যে হিজরত করেন। প্রাথমিক অবস্থায় লন্ডনের 'ফজল মসজিদ' (১৯২৬ সালে নির্মিত) প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের সারেই (Surrey) কাউন্টির টিলফোর্ডে অবস্থিত 'ইসলামাবাদ' নামক বিস্তৃত প্রাঙ্গণে তাদের আনুষ্ঠানিক বৈশ্বিক সদর দপ্তর পরিচালনা শুরু হয়। বর্তমান পঞ্চম খলীফা মির্জা মসরুর আহমদ সেখান থেকেই আন্তর্জাতিক কার্যক্রম ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন নেটওয়ার্ক (MTA International) পরিচালনা করেন।

অনুসারীদের ভৌগোলিক বিস্তার

বর্তমান বিশ্বে কাদিয়ানীরা প্রধানত যেসব অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে:

যুক্তরাজ্য ও পশ্চিম ইউরোপ: যুক্তরাজ্য বর্তমানে কাদিয়ানীদের বৈশ্বিক সমন্বয় কেন্দ্র। দক্ষিণ লন্ডনের মারডেনে অবস্থিত তাদের 'বায়তুল ফুতুহ' মসজিদ ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ উপাসনালয়। প্রতি বছর অল্টনে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন (জলসা সালানা)-য় বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার প্রতিনিধি অংশ নেন। জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডসেও তাদের সুসংগঠিত সংগঠন ও একাধিক উপাসনালয় রয়েছে।

উত্তর আমেরিকা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় গত কয়েক দশকে তাদের অবকাঠামোগত উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। আমেরিকার মেরিল্যান্ডে 'বায়তুর রহমান' এবং কানাডার ক্যালগারিতে 'বায়তুন নূর' মসজিদসহ টরন্টোর কাছে 'পিস ভিলেজ' নামক তাদের স্বকীয় আবাসন প্রকল্প রয়েছে। সামাজিক কল্যাণমূলক সংস্থা 'হিউম্যানিটি ফার্স্ট'-এর মাধ্যমে তারা স্থানীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকে।

আফ্রিকা মহাদেশ: দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে সবচেয়ে ব্যাপক প্রচার ও বিস্তার ঘটেছে উপ-সাহারা আফ্রিকায়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে 'নুসরতে জাহান স্কিম'-এর অধীনে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে (যেমন: ঘানা, নাইজেরিয়া, সিয়েরা লিওন, বুর্কিনা ফাসো ও গাম্বিয়া) তারা স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অবকাঠামো গড়ে তোলে। ঘানায় তারা নিজস্ব মেডিকেল সেন্টার, কারিগরি ইনস্টিটিউট ও বহু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করে।

পাকিস্তান: সাংবিধানিক ও আইনি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চেনাব নগরসহ করাচি, লাহোর এবং রাওয়ালপিন্ডিতে তাদের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে বসবাস করে।

ভারত: পাঞ্জাবের কাদিয়ান শহরটি এখনও তাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় এবং প্রতি বছর সেখানে ভারতীয় আঞ্চলিক জলসা সালানা অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশ: ঢাকায় বকশীবাজারস্থ প্রধান কেন্দ্র ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পঞ্চগড়, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলে তাদের অনুসারী রয়েছে। তবে স্থানীয় মূলধারার আলেমসমাজ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখে তাদের নানাবিধ ধর্মীয় কর্মকাণ্ড প্রায়শই বাধার সম্মুখীন হয়।

আন্তর্জাতিক ইসলামী ফোরাম ও ইজমার চূড়ান্ত রায়

কাদিয়ানী (আহমদীয়া) সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অবস্থান কেবল কোনো নির্দিষ্ট দেশের স্থানীয় আলেমদের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়, বরং এটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত ইজমা (ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত)। গত এক শতাব্দী ধরে আল-কুরআন ও সুন্নাহর নুসুস (স্পষ্ট প্রমাণের) আলোকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী গবেষণা সংস্থা, সর্বোচ্চ ফিকহ একাডেমি এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলো কাদিয়ানী মতবাদকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে এটিকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

রাবিতাতুল আলমে ইসলামী (Muslim World League)

১৯৭৪ সালের ৬ থেকে ১০ এপ্রিল (১৪-১৮ রবীউল আউয়াল ১৩৯৪ হিজরী) পবিত্র মক্কায় রাবিতাতুল আলমে ইসলামীর উদ্যোগে এক ঐতিহাসিক বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বিশ্বজুড়ে ১৪০টি দেশের ১৪০টিরও বেশি নিবন্ধিত ইসলামী সংস্থার প্রতিনিধি, শীর্ষস্থানীয় মুফতি, আন্তর্জাতিক ফকিহ ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ অংশগ্রহণ করেন। উক্ত সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাবনায় বলা হয়:

খতমে নবুয়ত অস্বীকার: হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে শেষ নবী ও রাসুল হিসেবে বিশ্বাস করা ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য মূলনীতি। মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নিজেকে নবী দাবি করার মাধ্যমে এই মূলনীতি ভঙ্গ করেছেন।

অমুসলিম ঘোষণা: কাদিয়ানী মতবাদ ইসলামবিরোধী একটি স্বতন্ত্র ধারা। এর অনুসারীরা (কাদিয়ানী ও লাহোরী উভয় গ্রুপ) খতমে নবুয়ত অস্বীকার করার কারণে ইসলামের গণ্ডির বাইরে এবং তারা অমুসলিম সংখ্যালঘু।

পবিত্র ভূমিতে প্রবেশাধিকার: ইসলামের শরীয়তি বিধান অনুযায়ী অমুসলিমদের জন্য পবিত্র মক্কা ও মদীনা হারাম সীমানায় প্রবেশ নিষিদ্ধ, যা কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য।

মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান: বিশ্বের সকল মুসলিম দেশের সরকার ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যাতে তারা কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের ইসলামবিরোধী প্রচারণা ও সাময়িকী বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে।

উক্ত সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হয় যে:

"কাদিয়ানী মতবাদ ইসলামবিরোধী একটি স্বতন্ত্র ধারা। এর অনুসারীরা খতমে নবুয়ত অস্বীকার করার কারণে ইসলামের গণ্ডির বাইরে এবং তারা অমুসলিম।"

ওআইসি ইসলামী ফিকহ একাডেমি

১৯৮৫ সালের ২২-২৮ ডিসেম্বর জর্দানের আম্মানে অনুষ্ঠিত অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (OIC)-এর অধীনস্থ ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি’-র দ্বিতীয় সাধারণ অধিবেশনে (প্রস্তাব নং ৪) বিশ্বখ্যাত ফকিহগণের উপস্থিতিতে কাদিয়ানীবাদ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা পেশ করা হয়। উক্ত অধিবেশনে প্রদানকৃত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও ফতোয়া অনুযায়ী মির্জা গোলাম আহমদের নবুয়তের দাবি, কথিত ওয়াহী লাভ এবং নবুয়তের ধারাক্রম চালু থাকার আকীদা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট কুফরী।

কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের অনুসারীরা বাহ্যিকভাবে ইসলামী পরিভাষা, ইবাদতের পদ্ধতি ও নাম ব্যবহার করলেও তাদের মূল আকীদা কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ফলে তারা উম্মাতে মুসলিমাহ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন।

আল-আজহার আল-শরীফ ও বৈশ্বিক ফিকহ কাউন্সিলসমূহ

মিশরের বিশ্ববিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এবং আল-আজহারের সর্বোচ্চ ইসলামী গবেষণা পরিষদ (মাজমাউল বুহুসুল ইসলামিয়্যা) একাধিক সুনির্দিষ্ট ফতোয়ায় কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করেছে। আল-আজহারের ফতোয়া বোর্ডে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মুহাম্মদ (সা.)-এর পর যেকোনো ব্যক্তির নবুয়তের দাবি বা তা মেনে নেওয়া ইসলাম থেকে বিচ্যুতির শামিল। এছাড়া ১৯৭৮ সালে রাবিতাতুল আলমে ইসলামীর অধীনস্থ ‘মাজমাউল ফিকহিল ইসলামী’ (ইসলামী ফিকহ পরিষদ) পুনর্নিশ্চিত করে যে, কাদিয়ানী মতবাদের সাথে মূলধারার ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই।

রাষ্ট্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আদালতের স্বীকৃতি

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিচার বিভাগ ও আইনসভাতেও এই ইজমা প্রতিফলিত হয়েছে:

পাকিস্তানের সংবিধান (১৯৭৪): ১৯৭৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শুনানির পর কাদিয়ানীদের আনুষ্ঠানিকভাবে অমুসলিম সংখ্যালঘু হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

আন্তর্জাতিক বিচারিক নজির: দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন সুপ্রিম কোর্টসহ বেশ কয়েকটি দেশের উচ্চ আদালতে কাদিয়ানী আকীদার আইনি ও শরীয়তি পর্যালোচনা শেষে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় যে, কাদিয়ানী সম্প্রদায় মূলধারার মুসলিম সত্তা থেকে পৃথক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী।

মির্জা গোলাম আহমদ তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীতে (যেমন 'রূহানী খযায়েন') নিজেকে নবী, মাহদী ও রূপক মাসীহ দাবি করার পাশাপাশি প্রথাগত জিহাদ রদ করা এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ রাসুল রূপকের আড়ালে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ইতিহাস, দলিল এবং উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের নিরিখে এটি সুস্পষ্ট যে, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে শেষ নবী হিসেবে অস্বীকার করা এবং মির্জা গোলাম আহমদকে যেকোনো রূপেই নবী হিসেবে মেনে নেওয়াই মূলধারার ইসলামের সাথে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের চিরন্তন বিচ্ছেদের প্রধান কারণ। এই মৌলিক আকীদাগত পার্থক্যের কারণেই বিশ্বের প্রধান ইসলামী সংস্থা, রাষ্ট্রীয় আইন এবং সর্বস্তরের আলেম সমাজ কাদিয়ানীদের ইসলামের অন্তর্ভুক্ত না মেনে একটি পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে।

উপসংহার

কাদিয়ানী বা আহমদীয়া সম্প্রদায় হলো ১৯ শতকে ভারতের পাঞ্জাবে সূচিত এমন একটি ধর্মীয় আন্দোলন, যার আকিদা ও বিশ্বাস ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ ও ঈমানের সর্বসম্মত মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে শেষ নবী হিসেবে অস্বীকার করা এবং মির্জা গোলাম আহমদকে নবী হিসেবে গ্রহণ করার দরুন বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ ও আন্তর্জাতিক ফিকহ পরিষদসমূহ সর্বসম্মতভাবে কাদিয়ানীদের ইসলামের গণ্ডিবহির্ভূত ও অমুসলিম হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং বিভ্রান্তি দূরীকরণের জন্য কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের উচিত নিজেদের একটি পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের বিশ্বাস চর্চা করা এবং মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়, শব্দাবলী ও ইবাদতখানা ব্যবহারের অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকা। এটিই বিশ্বব্যাপী শান্তিশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় সততা বজায় রাখার অন্যতম পথ।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.