ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বে আরবের প্রাচীন সভ্যতা - মরুভূমির বুকে সংস্কৃতির শিকড়

বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাস এক গতিশীল ও অবিরাম বহমান স্রোতস্বিনী। হাজার হাজার বছর ধরে মানবেতিহাসের নানা বাঁকে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নগর, রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্য। মানবজাতি যখন বন্য দশা অতিক্রম করে কৃষি, প্রযুক্তি, কারিগরিবিদ্যা এবং নগর জীবনযাত্রার বিকাশ ঘটিয়েছে, তখনই উদয় ঘটেছে বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার। এই সভ্যতাগুলো তৎকালীন মানুষকে দান করেছিল জ্ঞান, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের অভূতপূর্ব উৎকর্ষ, যা কালক্রমে মানবজাতির অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে সময়ের আবর্তে বহু পরাক্রমশালী রাজ্য ও তাদের নির্মিত সুউচ্চ অট্টালিকা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে ধূলিসাৎ হয়েছে, ঢাকা পড়েছে মরুভূমির তপ্ত বালি কিংবা মাটির গভীরে। পরবর্তীকালে পুরাতাত্ত্বিক খননকার্য এবং শিলালিপির পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে সেইসব চাপা পড়া সভ্যতার গৌরবময় দিনগুলোর পুনরুজ্জীবন ঘটে।

বিশ্ব সভ্যতার আদি জন্মভূমি বা 'আঁতুড়ঘর' হিসেবে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া (টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী অববাহিকা) কিংবা মিশরীয় নীল নদ অববাহিকাকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও, এর ঠিক গা-ঘেঁষে অবস্থিত বিশাল আরব উপদ্বীপ (Arabian Peninsula) কেবল একটি নিষ্ফলা ও অনূর্বর মরুভূমি ছিল না। বরং প্রাক-ইতিহাস এবং ধ্রুপদী প্রাচীন যুগে আরব ভূখণ্ড ছিল মেসোপটেমীয়, সিন্ধু ও ভূমধ্যসাগরীয় সভ্যতার মধ্যবর্তী এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সংযোগস্থল। সংক্ষেপে একে বলা চলে প্রাচীন বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মিলনকেন্দ্র।

সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রাচীন আরবের অধিবাসীদের কেবল ভবঘুরে ও যাযাবর বেদুঈন মনে করা হলেও, বস্তুত তারা কেবল তাঁবুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পারস্য উপসাগরের তীর থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের উপকূল, ইয়েমেনের উর্বর পাহাড়ি উপত্যকা এবং উত্তর আরবের পাথুরে মরুভূমিতে গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর ইতিহাস কাঁপানো সব প্রাচীন সভ্যতা। তৎকালীন সময়ে বর্তমানের আধুনিক রাষ্ট্র সৌদি আরব, ইয়েমেন, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভৌগোলিক সীমারেখায় উথলে উঠেছিল বাণিজ্য, শিল্প, সুউচ্চ পাষাণ-স্থাপত্য এবং অনন্য উপজাতীয় শাসনকাঠামো।

নিম্নে প্রাক-ইতিহাস থেকে শুরু করে ধ্রুপদী যুগ পর্যন্ত আরব উপদ্বীপে বিকাশ লাভ করা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রাচীন সভ্যতা, তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক জীবন ও প্রমান্য পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের বিস্তৃত আলোকপাত করা হলো।

আল-মাগার সভ্যতা (Al-Magar Culture): নব্যপ্রস্তরযুগের প্রাক-ঐতিহাসিক বিস্ময়

আরব উপদ্বীপের প্রাক-ঐতিহাসিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যে সভ্যতার নাম সবার আগে উঠে আসে, তা হলো ‘আল-মাগার’ (Al-Magar)। এটি একটি নব্যপ্রস্তরযুগীয় (Neolithic) প্রাক-ঐতিহাসিক সভ্যতা, যা বিজ্ঞান ও পুরাতত্ত্বের জগতে প্রাচীন আরবের প্রাচীনতম সুসংগঠিত সমাজ হিসেবে বিবেচিত।

ভৌগোলিক অবস্থান ও সময়কাল

সৌদি আরবের মধ্য-দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চভূমি অর্থাৎ নেজদ (Najd) অঞ্চলে আধুনিক 'ওয়াদি আল-দাওয়াসির'-এর কাছে আল-মাগার প্রত্নস্থলটি অবস্থিত। রেডিওকার্বন ডেটিং (C-14) এবং প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনুযায়ী, আল-মাগার সভ্যতা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৯,০০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৭,০০০ অব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১১,০০০ বছর পূর্বে বিকাশ লাভ করেছিল।

জলবায়ু, জীবনযাত্রা ও গৃহায়ন

বর্তমান নেজদ অঞ্চলটি প্রচণ্ড রুক্ষ ও তপ্ত মরুভূমি হলেও, আজ থেকে প্রায় ১০-১১ হাজার বছর পূর্বে অর্থাৎ শেষ বরফযুগের শেষের দিকে (Holocene Wet Phase) এই অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত সবুজ, আর্দ্র ও উর্বর। সেখানে ছিল বিশাল নদী, হ্রদ এবং সবুজ চারণভূমি। আল-মাগারের অধিবাসীরা কেবল ক্ষণস্থায়ী তাঁবুতে বাস করত না; বরং তারা খোদাই করা পাথর ও কাদা-মাটি দিয়ে স্থায়ী গৃহ ও কাঠামো নির্মাণ করতে পারত, যা প্রমাণ করে সেই প্রাক-ঐতিহাসিক কালেও তাদের মধ্যে সুসংগঠিত স্থাপত্য চর্চার সূচনা ঘটেছিল। তারা কৃষি এবং পশুপালনের প্রারম্ভিক কলাকৌশল রপ্ত করেছিল।

ঘোড়ার গৃহপালন ও বিশ্ব-ইতিহাসে বিপ্লব

আল-মাগার প্রত্নস্থলের সবচেয়ে যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো ঘোড়ার ভাস্কর্য ও অবশেষ। পূর্বে আন্তর্জাতিক নৃতত্ত্ববিদদের ধারণা ছিল যে, সেন্ট্রাল এশিয়া বা ইউরেশীয় ট্রাইবে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ অব্দের দিকে প্রথম ঘোড়া গৃহপালিত হয়। কিন্তু ২০১১ সালে আল-মাগারে চালানো খননকার্যে প্রায় আশি সেন্টিমিটার দীর্ঘ এক বিশাল পাথরের ঘোড়ার মূর্তির অবশেষ পাওয়া যায়, যার মাথার অংশে স্পষ্টভাবে লাগাম (Bridle) এবং পিঠে বসবার দাগ খোদাই করা রয়েছে।

রেডিওকার্বন পরীক্ষায় দেখা গেছে এই শিল্পকর্মগুলোর বয়স আনুমানিক ৯,০০০ বছর (খ্রিস্টপূর্ব ৭,০০০ অব্দ)। এই আবিষ্কার আন্তর্জাতিক প্রত্নতত্ত্বের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং প্রমাণ করে যে, বিশ্বে প্রথম ঘোড়াকে গৃহপালিত ও প্রশিক্ষিত প্রাণীতে রূপান্তর করার কৃতিত্ব প্রাচীন আরবদের আল-মাগার সভ্যতার অধিবাসীদের। এ ছাড়া সেখান থেকে তীরের ফলক, চামড়া প্রসেস করার পাথরের যন্ত্রপাতি এবং অনন্য মৃৎশিল্প আবিষ্কৃত হয়েছে।

দিলমুন সভ্যতা (Dilmun Civilization): বাণিজ্য, স্বর্গের বাগান ও উপসাগরীয় সাম্রাজ্য

পারস্য উপসাগরের উপকূলে মেসোপটেমিয় সভ্যতার প্রায় সমসাময়িককালে আত্মপ্রকাশ ঘটে প্রাক-আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সামুদ্রিক শক্তি ‘দিলমুন’ (Dilmun) সভ্যতার। এটি ছিল পূর্ব আরবের একটি সামুদ্রিক, সেমিটিক-ভাষী মেগালোপলিস কেন্দ্রিক শক্তি।

সময়কাল ও কেন্দ্রস্থল

দিলমুন সভ্যতার গোড়াপত্তন ঘটেছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪,০০০ অব্দে (প্রায় ৬,০০০ বছর পূর্বে)। বর্তমান দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইন ছিল প্রাচীন দিলমুনের প্রাণকেন্দ্র বা প্রশাসনিক হৃদপিণ্ড। তবে এর বিস্তার ছড়িয়ে পড়েছিল পূর্ব সৌদি আরবের আল-হাসা, কুয়েতের ফাইলাকা দ্বীপ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাতার ও উপকূলীয় এলাকা পর্যন্ত। খ্রিস্টপূর্ব ৩,০০০ থেকে ১,৮০০ অব্দ ছিল দিলমুনের শক্তির চরম স্বর্ণযুগ।

'স্বর্গের বাগান' ও সুমেরীয় পৌরাণিক সংযোগ

প্রাচীন মেসোপটেমীয় রূপকথা ও ধর্মবিশ্বাসে দিলমুন এক অত্যন্ত পবিত্র ও রহস্যময় স্থানের মর্যাদা পেত।

গিলগামেশ মহাকাব্য: সুমেরীয়দের কালজয়ী 'গিলগামেশ মহাকাব্য' (Epic of Gilgamesh)-এ দিলমুনকে উপস্থাপন করা হয়েছে এক অমর পবিত্র ভূমি হিসেবে, যেখানে কোনো ব্যাধি, বার্ধক্য কিংবা মৃত্যু ছিল না।

গার্ডেন অব ইডেন (Garden of Eden): সুমেরীয়রা দিলমুনকে গণ্য করত ‘সূর্য উদয়ের স্থান’ এবং ‘জীবন্ত মানুষের পবিত্র দেশ’ হিসেবে। সেমিটিক ধর্মসমূহের আদি রূপকথা বা 'গার্ডেন অব ইডেনের' ধারণার সাথে দিলমুনের সুজলা-সুফলা ও মুক্তার ভূমির ভৌগোলিক গঠন অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।

কিউনিফর্ম লিপি: খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের শেষের দিকে মেসোপটেমিয়ার ঐতিহ্যবাহী উরুক (Uruk) শহরের দেবী ইনানার মন্দিরে প্রাপ্ত মাটির ট্যাবলেটের কিউনিফর্ম লিপিতে দিলমুনের প্রথম লিখিত প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়।

সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র

দিলমুন মূলত কৃষিনির্ভরতার চেয়ে পারস্য উপসাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তারা মেসোপটেমিয়ার সুমের, আক্কাদ ও ব্যাবিলোনিয়ার সাথে পূর্বে অবস্থিত সিন্ধু উপত্যকা (যেটিকে সুমেরীয়দের লিপিতে 'মেলুহা' বলা হতো) এবং পরবর্তীতে প্রাচীন মিশর ও চীনের মধ্যবর্তী এক সুবিশাল ট্রানজিট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।

দিলমুনের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য:

রপ্তানি পণ্য: পারস্য উপসাগরের খাঁটি মুক্তা, ওমানের তামা (মোগান), মিষ্ট খেজুর, মূল্যবান কাঠ, খোদাই করা হাতির দাঁতের দ্রব্যাদি, শাঁখ, রঙিন পাথরের পুঁতি ও তাজা সবজি।

আমদানি পণ্য: মেসোপটেমিয়া থেকে আসা রৌপ্য (রুপা), টিন, সুতি ও উলের সূক্ষ্ম কাপড়, জলপাই তেল এবং গম ও শস্য।

পতন ও বিলুপ্তি

খ্রিস্টপূর্ব ১,৮০০ অব্দের পর থেকে পারস্য উপসাগরে জলদস্যুতা বৃদ্ধি পাওয়া, মেসোপটেমীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর রূপান্তর এবং নতুন বাণিজ্য পথ তৈরি হওয়ার ফলে দিলমুনের বাণিজ্যিক একচ্ছত্র প্রভাব কমতে থাকে। অবশেষে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দের দিকে নব্য-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীতে পারস্যের হখামনিশী (Achaemenid) সাম্রাজ্য দিলমুনকে নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করে নেয়।

সামুদ সভ্যতা (Thamud Civilization): পাষাণ-স্থাপত্য, অবাধ্যতা ও ঐতিহাসিক রূপান্তর

আরব উপদ্বীপের হেজাজ (উত্তরাঞ্চলীয় মরুভূমি) অঞ্চলের পাহাড় কেটে নির্মিত বিস্ময়কর অট্টালিকার কারিগর ছিল ‘সামুদ’ (Thamud) জাতি বা সামুদ সভ্যতা। ইসলামিক ইতিহাস, প্রাচীন আসিরীয় শিলালিপি এবং ক্লাসিক্যাল রোমান সাহিত্যে সামুদদের বিস্তৃত ও স্পষ্ট উল্লেখ মেলে।

ঐতিহাসিক উৎস ও ভৌগোলিক কেন্দ্র

অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী শাসক দ্বিতীয় সারগনের (Sargon II) খ্রিস্টপূর্ব ৭১৫ অব্দের একটি রাজকীয় শিলালিপিতে সামুদদের সর্বপ্রথম লিখিত ও নিরপেক্ষ প্রামাণ্য ঐতিহাসিক নথি পাওয়া যায়। এতে তাদের আসিরীয়দের অধীনস্থ উত্তর ও মধ্য আরবের এক শক্তিশালী যোদ্ধা উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সামুদদের আদি আবাসস্থল ছিল মূলত দক্ষিণ আরবে, কিন্তু পরবর্তীতে তারা স্থানান্তরিত হয়ে উত্তর-পশ্চিম আরবের আল-হিজর (Al-Hijr) অর্থাৎ বর্তমান সৌদি আরবের মাদাইন সালিহ (Mada'in Salih) অঞ্চলে বিশাল বসতি গড়ে তোলে। ১৬০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের আমলে সামুদদের প্রধান দেবতা ‘লহ’-এর উদ্দেশ্যে নির্মিত একটি দ্বিভাষিক (নাবাতিয়ান ও গ্রিক) গ্রীক শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়, যা তাদের রাজত্ব ও রোমানদের সাথে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের বার্তা দেয়।

স্থাপত্যকলা ও সংস্কৃতি

সামুদ জাতি পাহাড় খোদাই করার বিদ্যায় প্রাচীন বিশ্বে অসামান্য শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। তারা মরুভূমির প্রকাণ্ড বালুপাথরের (Sandstone) পাহাড়ের বুক কেটে বিশাল সব প্রাসাদ, দেবালয়, বাণিজ্যিক আস্তানা এবং রাজকীয় সমাধি নির্মাণ করেছিল। তাদের বাজারগুলো গড়ে উঠত পাহাড়ের উঁচু শৃঙ্গে, যাতে শত্রুর আক্রমণ থেকে সহজেই রক্ষা পাওয়া যায়। তারা প্রাচীন উত্তর-আরবীয় বর্ণমালায় (Thamudic script) শিলালিপি খোদাই করত।

কুরআনিক ও ইসলামিক প্রেক্ষাপট: হযরত সালেহ (আ.) ও প্রলয়ঙ্করী গজব

ইসলামিক ঐতিহ্যে সামুদদের ইতিহাসকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শিক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে সামুদ জাতির কথা প্রায় ২৩ বার উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের বিবরণ অনুযায়ী, সামুদ ছিল প্রাচীন 'আদ' (A'ad) জাতির উত্তরসূরি। তারা প্রচণ্ড বাহুবল, সম্পদ ও শৌর্যবীর্যের অধিকারী হলেও চরম অহংকার, কুফর, শিরক ও নৈতিক অবক্ষয়ে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।

তাদের সঠিক পথ দেখাতে এবং একেশ্বরবাদের দাওয়াত দিতে আল্লাহ প্রেরণ করেন নবী হযরত সালেহ (আ.)-কে। সামুদ সম্প্রদায়ের অহংকারী নেতারা সালেহ (আ.)-এর কাছে নবুওয়তের প্রমাণ হিসেবে ক্বাতেবা নামক শক্ত পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি জীবিত, ১০ মাসের গর্ভবতী ও স্বাস্থ্যবতী উট বের করে দেখানোর দাবি জানায়। সালেহ (আ.)-এর প্রার্থনায় মোজেজাস্বরূপ এক অলৌকিক মাদী উট (না ক্বাতুল্লাহ) পাথর ভেঙে বেরিয়ে আসে। শর্ত দেওয়া হয় যে, একদিন উটটি কুপের সব পানি পান করবে এবং বিনিময়ে সমগ্র সামুদবাসীকে প্রচুর দুধ দেবে, আর অন্যদিন মানুষ পানি ব্যবহার করবে; তবে কেউ যেন উটটির ক্ষতি না করে।

কিন্তু সামুদদের নয়জন প্রভাবশালী ও দুষ্কৃতকারী ব্যক্তি পরামর্শ করে তীর ও তরবারি দিয়ে সেই অলৌকিক উটটিকে হত্যা করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সালেহ (আ.) তাঁদের তিন দিনের চূড়ান্ত আলটিমেটাম দেন। প্রথম দিন তাদের চেহারা হলুদ, দ্বিতীয় দিন লাল এবং তৃতীয় দিন কুচকুচে কালো হয়ে যায়। অবশেষে চতুর্থ দিন এক ভয়ঙ্কর মহাবজ্রধ্বনি (Saihah), তীব্র ভূমিকম্প এবং ভয়াল ভূগর্ভস্থ কম্পনে সমগ্র সামুদ জাতির বাসস্থান ধসে পড়ে এবং সালেহ (আ.) ও তাঁর সামান্য অনুসারী ব্যতীত পুরো সামুদ সভ্যতা এক নিমেষে চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।

সাবা সভ্যতা (Sabaean Kingdom): শেবার রানী, মারিব বাঁধ ও মশলা বাণিজ্য

দক্ষিণ আরবের (বর্তমান ইয়েমেন) ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, ঐতিহ্যবাহী ও সমৃদ্ধ সভ্যতা হলো ‘সাবা’ (Saba/Sabaeans) বা হিব্রু শাস্ত্রে উল্লেখিত 'শেবা' (Sheba) রাজ্য। দক্ষিণ আরবীয় ভাষার অন্তর্গত সাবীয় ভাষায় তারা কথা বলত। এর রাজধানী ছিল ঐতিহাসিক মা’রিব (Ma'rib) শহর।

সময়কাল ও রাজনৈতিক কাঠামো

সাবা রাজ্যের সঠিক সূচনাকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দুটি মত বিদ্যমান- একটি বড় প্রত্নতাত্ত্বিক গোষ্ঠী মনে করেন সাবা রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয় খ্রিস্টপূর্ব ১,২০০ অব্দে এবং এটি ২৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। অন্য একদল গবেষকের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতাব্দী থেকে সাবার একচ্ছত্র রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল।

সাবা কেবল একটি একনায়কতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ছিল না; এটি মূলত একটি সুসংগঠিত উপজাতীয় ফেডারেশন (Tribal Federation) হিসেবে কাজ করত। রাজাকে (যাকে 'মুকাল্লিব' বা পরবর্তীতে 'মালিক' বলা হতো) পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে অভিজ্ঞ প্রবীণ কাউন্সিলর নিযুক্ত থাকত।

মারিবের গ্রেট ড্যাম (Great Dam of Ma'rib) ও কৃষি বিপ্লব

সাবা সভ্যতার প্রকৌশলবিদ্যার শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন ছিল সায়হাদ মরুভূমির প্রান্তে অবস্থিত মা’রিব শহরের বিশাল বাঁধ বা 'গ্রেট ড্যাম অব মারিব'। এটি খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতকে নির্মিত হয়েছিল। এই প্রকাণ্ড পাথুরে বাঁধের সাহায্যে পাহাড়ি ঢলের বিপুল জলরাশিকে এক বিশাল কৃত্রিম জলাধারে আটকে রাখা হতো এবং সুনির্দিষ্ট খালের মাধ্যমে হাজার হাজার একর মরুভূমিকে উর্বর শস্যক্ষেত ও ফলবান বাগানে রূপান্তর করা হতো। কুরআনে সাবার এই প্রাচুর্যময় উদ্যানকে ‘জান্নাতাইন’ বা ‘দুই পাশে দুটি বিশাল উদ্যান’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

লোবান, গন্ধরস ও মশলার আন্তর্জাতিক রুট

সাবা রাজ্য ধনী হওয়ার প্রধান কারণ ছিল তাদের ভৌগোলিক অবস্থান। তারা লোহিত সাগরের কৌশলগত প্রণালী বাব-আল-মান্দেবকে নিয়ন্ত্রণ করত। সেই যুগে ধর্মীয় আচার, মমীকরণ এবং সুগন্ধি তৈরির জন্য বিশ্বব্যাপী 'লোবান' (Frankincense) এবং 'গন্ধরস' (Myrrh)-এর বিপুল চাহিদা ছিল, যা কেবল দক্ষিণ আরব ও হর্ন অব আফ্রিকায় উৎপাদিত হতো। সাবীয়রা উটের কাফেলার মাধ্যমে উত্তরমুখী ‘ইনসেনস রুট’ (Incense Route) নিয়ন্ত্রণ করে রোম, পারস্য, গ্রীস এবং মিশরে কোটি টাকার সুগন্ধি বিক্রি করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়।

হযরত সুলাইমান (আ.) ও রানী বিলকিস

সাবা সভ্যতার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর উপাখ্যান জড়িত রয়েছে জেরুজালেমের বিজ্ঞ শাসক হযরত সুলাইমান (আ.) এবং সাবার রানী বিলকিস (Queen of Sheba)-কে কেন্দ্র করে। এই কালজয়ী ঘটনাটি পবিত্র কুরআনের সূরা আল-নামল এবং হিব্রু বাইবেলে অত্যন্ত রাজকীয়ভাবে বর্ণিত হয়েছে।

হুদহুদ পাখির মাধ্যমে রানী বিলকিসের সূর্যপূজার খবর পেয়ে সুলাইমান (আ.) তাঁকে একেশ্বরবাদের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠান। রানী প্রথমে সুলাইমান (আ.)-কে বিশাল উপঢৌকন পাঠিয়ে পরীক্ষা করতে চান, কিন্তু সুলাইমান (আ.) তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে রানী বিলকিস নিজে জেরুজালেমে সুলাইমান (আ.)-এর রাজদরবারে উপস্থিত হন। সেখানে সুলাইমান (আ.)-এর নির্দেশে এক অলৌকিক উপায়ে রানীর সিংহাসন মুহূর্তের মধ্যে জেরুজালেমে নিয়ে আসা হয় এবং কাঁচ নির্মিত স্বচ্ছ প্রাসাদের মেঝে দেখে পানি ভেবে রানী যখন নিজের পোশাক সামান্য ওপরে তোলেন, তখন সুলাইমান (আ.)-এর মহত্ত্ব ও আল্লাহর অলৌকিক ক্ষমতা উপলব্ধি করে রানী বিলকিস ইসলাম বা একেশ্বরবাদ গ্রহণ করেন।

সাইল আল-আরিম বা বাঁধের প্রলয়ঙ্করী বন্যা

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে সাবার অধিবাসীরা আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় না করে বিলাসিতা ও অহংকারে লিপ্ত হয়। ফলে তাদের ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয় যাকে কুরআনে ‘সাইল আল-আরিম’ (Sail al-Arim) বা ‘বাঁধ ভাঙা ভয়াবহ বন্যা’ বলা হয়েছে। মা’রিবের সেই ঐতিহাসিক বাঁধটি প্রচণ্ড পানির চাপে একাধিকবার ধসে পড়ে এবং অবশেষে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে সাবার বিশাল কৃষি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, সবুজ বাগান শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয় এবং সাবীয় জনগণ সমগ্র আরব উপদ্বীপে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দীতে হিমিয়ারীয়রা এবং ৩য় শতাব্দীতে হিমিয়ার রাজ্য পুরোপুরি সাবা দখল করে নেয়।

নাবাতিয়ান সভ্যতা (Nabataean Kingdom): পাহাড় খোদাইয়ের মহাকাব্য ও পেট্রার সাম্রাজ্য

উত্তর আরবের যে সভ্যতাটি নিজের অনন্য স্থাপত্যকলা দিয়ে আজও পুরো বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে, তা হলো ‘নাবাতিয়ান’ (Nabataean) সভ্যতা।

যাযাবর বেদুইন থেকে সুসংগঠিত সাম্রাজ্য

নাবাতিয়ানরা মূল উৎস বিচারে ছিল যাযাবর বেদুইন আরব উপজাতি, যারা তাদের পশুপালের চারণভূমি এবং পানির সন্ধানে সিরীয় ও অ্যারাবিয়ান মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াত। তবে খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ এবং ২য় শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে তারা নিজেদের সংগঠিত করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পরাক্রমশালী এক রাজ্যে পরিণত হয়।

তারা মরুভূমিতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার বিশেষ গোপন ভূগর্ভস্থ জলাধার (Cisterns) তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করেছিল, যা মরুভূমির ভেতরে যেকোনো বহিরাগত শত্রুর জন্য তাদের পরাস্ত করা অসম্ভব করে তুলেছিল।

পেট্রা ও হেগ্রা: পাথর খোদাই করা জাদুকরী শহর

নাবাতিয়ানদের মূল প্রশাসনিক রাজধানী ছিল বিশ্ববিখ্যাত পেট্রা (Petra), যা বর্তমান জর্ডানে অবস্থিত। লালচে পাথরের পাহাড় কেটে নির্মিত এই গোলাপি শহরটি (Rose Red City) তার 'আল-খাজনেহ' (The Treasury) এবং বিশাল থিয়েটারের জন্য জগৎখ্যাত।

পেট্রা ছাড়াও নাবাতিয়ানরা বর্তমান সৌদি আরবের আল-উলা অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেছিল তাদের দ্বিতীয় রাজধানী হেগ্রা (Hegra) যার বর্তমান নাম মাদাইন সালিহ। এই শহরগুলোতে তারা পাহাড়ের বুক খোদাই করে তৈরি করেছিল রাজকীয় সমাধি, উপাসনালয় এবং পানীয় জলের নেটওয়ার্ক। তাদের স্থাপত্যে স্থানীয় সেমিটিক রীতির পাশাপাশি গ্রিক (Hellenistic) এবং মেসোপটেমীয় স্থাপত্যের মেলবন্ধন দেখা যায়।

নাবাতিয়ান দেব-দেবী ও ধর্মীয় রূপ

নাবাতিয়ানরা মূলত বহুদেবতাবাদী ছিল। তবে তারা কোনো মূর্তির বদলে দেব-দেবীকে প্রতীকী পাথর বা 'বেটিল' (Baetyls) হিসেবে খোদাই করে পূজা করত।

দুশারা (Dushara): নাবাতিয়ানদের সর্বোচ্চ দেবতা, যাকে পর্বত ও সূর্যের দেবতা মনে করা হতো।

আল-উজ্জা (Al-Uzza): মাতৃদেবী ও শস্য-উর্বরতার সর্বোচ্চ প্রতীক।

আল-কওম (Al-Qaum): যুদ্ধের দেবতা এবং রাতের বেলায় কাফেলার রক্ষাকর্তা।

আল-কুতবি (Al-Kutba): জ্ঞান, লিপি ও ভবিষ্যদ্বাণীর দেবতা।

মানাত (Manat) ও আল-লাত (Al-Lat): ভাগ্য, বসন্ত ও সময়ের দেবী।

রোমান আগ্রাসন ও পতন

১০৬ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট ট্রাজান (Trajan) একটি বিশাল সামরিক অভিযান চালিয়ে স্বাধীন নাবাতিয়ান রাজ্য দখল করেন। নাবাতিয়ান অঞ্চলকে রোমান সাম্রাজ্যের ‘অ্যারাবিয়া পেট্রিয়া’ (Arabia Petraea) প্রদেশে পরিণত করা হয় এবং এর মাধ্যমে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নাবাতিয়ান সভ্যতার অবসান ঘটে।

কিন্দাহ সভ্যতা (Kindah Kingdom): মধ্য আরবের প্রথম যাযাবর সাম্রাজ্য

দক্ষিণ ও উত্তর আরবে যখন সুসংগঠিত নগর সভ্যতা গড়ে উঠছিল, তখন মধ্য আরবের রুক্ষ নেজদ প্রান্তরে খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীতে উত্থান ঘটে ‘কিন্দাহ’ (Kindah) রাজ্যের। কিন্দাইটরা ছিল মূলত দক্ষিণ ইয়েমেন থেকে আগত এক পরাক্রমশালী উপজাতীয় কনফেডারেশন।

ক্বারিয়াত আল-ফাও (Qaryat al-Faw)

কিন্দাহ রাজ্যের প্রথম রাজধানী ছিল ক্বারিয়াত যাত কাহিল, যা বর্তমানে প্রত্নতাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে ‘ক্বারিয়াত আল-ফাও’ (Qaryat al-Faw) নামে সমধিক পরিচিত। এটি সৌদি আরবের দক্ষিণ-মধ্য নেজদ অঞ্চলের খালি চারের (Rub' al Khali) সীমান্তে অবস্থিত।

সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে আল-ফাও থেকে ব্রোঞ্জের তৈরি 'আততার' ও 'কাহিল' দেবতার মূর্তি, বহুভাষিক লিপি, সমৃদ্ধ বাজার, প্রাসাদ এবং সুউচ্চ দুর্গ আবিষ্কৃত হয়েছে। যা প্রমাণ করে কিন্দাইটরা কেবল যাযাবর ছিল না; তারা দক্ষিণ আরবের ইয়েমেনি রাজ্যগুলোর আদলে নগর সংস্কৃতিও চর্চা করত।

ধর্মীয় রূপান্তর ও পতন

কিন্দাইটরা খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত বহুদেবতাবাদী ছিল। পরবর্তীতে ইয়েমেনের ইহুদি রাজা ধুর নুওয়াসের সময়কালে কিছু কিন্দাইট ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের সংমিশ্রণে আসে। ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়তকালে কিন্দাহ উপজাতি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং ইসলামিক খিলাফতের আরব ও পারস্য বিজয়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক ভূমিকা পালন করে।

প্রাক-ইসলামিক আরবের অন্যান্য আঞ্চলিক রাজ্যসমূহ

উল্লিখিত প্রধান সভ্যতাগুলো ছাড়াও প্রাচীন আরবের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছিল আরও বেশ কিছু প্রভাব বিস্তারকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি রাজ্য।

পালমিরা রাজ্য (Palmyrene Empire)

খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতাব্দীতে সিরিয়ার শুভ্র মরুদ্যানে আত্মপ্রকাশ ঘটে পালমিরা (Palmyra) রাজ্যের। রোমান ও পারস্যের স্যাসানীয় সাম্রাজ্যের ঠিক মাঝখানে অবস্থান হওয়ায় এটি দ্রুত ধনী বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।

রাজা ওজাইনাহ (Odenathus): পালমিরার এই পরাক্রমশালী রাজা রোমানদের সাথে জোট বেঁধে পারস্যদের পরাজিত করেন এবং এশিয়া মাইনর, সিরিয়া ও আর্মেনিয়ায় কর্তৃত্ব স্থাপন করেন।

রানী জেনোবিয়া (Queen Zenobia): ওজাইনাহর মৃত্যুর পর তাঁর সুন্দরী ও দুঃসাহসী স্ত্রী রানী জেনোবিয়া পালমিরার শাসনভার নেন। তিনি সরাসরি রোমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মিসর ও মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশ দখল করে পালমিরা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তবে ২৭২ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট অরেলিয়ান (Aurelian) পালমিরা আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেন এবং জেনোবিয়াকে বন্দি করেন।

মিনীয় রাজ্য (Ma'in / Minaeans)

ইয়েমেনের রাজধানী সানার উত্তর-পূর্বে 'মা'আন' নামক স্থানে সাবার পাশাপাশি খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে আত্মপ্রকাশ ঘটে স্বাধীন মিনীয় (Minaeans) রাজ্যের। তাদের রাজধানী ছিল কারনব (Karnaw), যা বর্তমানে 'মাইন' নামে পরিচিত। মিনীয়রা সাবার প্রধান বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। তারা লোহিত সাগর উপকূলীয় সুগন্ধি বাণিজ্যে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে। কিন্তু পরবর্তীতে সাবার অর্থনৈতিক সামরিক চাপের মুখে মিনীয় রাজ্য সাবা সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়ে যায়।

হাজরামাউত রাজ্য (Hadramaut Kingdom)

দক্ষিণ আরবের পূর্ব ইয়েমেন, পশ্চিম ওমান এবং দক্ষিণ সৌদি আরবের অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল পৃথক স্বাধীন হাজরামাউত (Hadramaut) রাজ্য। এর ঐতিহাসিক রাজধানী ছিল শাবওয়াহ (Shabwah)

নামকরণ রহস্য: স্থানীয় উপকথা অনুযায়ী, সামুদ জাতি ধ্বংস হওয়ার পর নবী সালেহ (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে এই ইয়েমেনি অঞ্চলে চলে আসেন এবং এখানে মৃত্যুবরণ করেন। তাই এর নামকরণ হয় ‘হাজরা-মাউত’ বা ‘মৃত্যু এসেছে’।

হাজরামাউত রাজ্যটি ছিল খাঁটি 'লোবান' বা ফ্র্যাঙ্কেনসেন্স উৎপাদনের মূল কেন্দ্র। এখানকার অধিবাসীদের 'হাজরামী' বলা হতো, যারা পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী প্রধান সামুদ্রিক বণিক হিসেবে পরিচিতি পায়।

হিমিয়ারীয় রাজ্য (Himyarite Kingdom)

সাবিয়ান ও মিনীয় সভ্যতার পর দক্ষিণ আরবে (ইয়েমেন) খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ অব্দ থেকে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ রাজত্ব করে হিমিয়ার (Himyar) রাজবংশ। হিমিয়ারীদের প্রাচীন রাজধানী ছিল ইয়েমেনের উচ্চভূমির জাফরা (Zafar) এবং পরবর্তীতে সানা (Sana'a)।

হিমিয়ারীরাই দক্ষিণ আরবের সমস্ত বিচ্ছিন্ন রাজ্যকে একত্রিত করে 'সাবা ও ধুর সায়দানের রাজা' উপাধি গ্রহণ করে। তাদের আমলে দক্ষিণ আরবে খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদি ধর্মের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। হিমিয়ারীয় রাজা ধুর নুওয়াস খ্রিস্টানদের ওপর অত্যাচারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন (যাদের কথা কুরআনের 'আসহাবুল উখদুদ' বা গর্তের অধিবাসীদের কাহিনীতে এসেছে)।

পরবর্তীতে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে আবিসিনিয়ার (ইথিওপিয়া) আক্সুমাইট সাম্রাজ্য ইয়েমেন আক্রমণ করে হিমিয়ারীয় রাজ্যের চ্যাপ্টার চিরতরে বন্ধ করে দেয়।

এক নজরে আরবের প্রাচীন সভ্যতা ও রাজ্যসমূহের তালিকা

নিচে প্রদত্ত একমাত্র সারণীতে আরবের প্রাচীন সভ্যতা, তাদের আনুমানিক স্থায়ীকাল, প্রাণকেন্দ্র বা রাজধানী, প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

সভ্যতার নাম

আনুমানিক স্থায়িত্বকাল

প্রধান অঞ্চল / রাজধানী

প্রধান অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি

বিশিষ্ট পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন ও গুরুত্ব

আল-মাগার (Al-Magar)

খ্রিস্টপূর্ব ৯,০০০ – ৭,০০০ অব্দ

নেজদ (সৌদি আরব) / আল-মাগার

নব্যপ্রস্তরযুগীয় কৃষি, পশুপালন ও বিশ্বের প্রথম ঘোড়া গৃহপালন।

লাগামযুক্ত পাথরের ঘোড়ার ভাস্কর্য ও পাথরের বাড়ি।

দিলমুন (Dilmun)

খ্রিস্টপূর্ব ৪,০০০ – ৬০০ অব্দ

বাহরাইন, কুয়েত ও পূর্ব আরব

পারস্য উপসাগরীয় সামুদ্রিক বাণিজ্য, মুক্তা উত্তোলন ও তামা স্থানান্তর।

কিউনিফর্ম লিপি ও 'গার্ডেন অব ইডেন'-এর পুরাণ।

সামুদ (Thamud)

খ্রিস্টপূর্ব ৮ম শতক – ৫ম শতক

আল-হিজর (মাদাইন সালিহ)

পাহাড় কেটে প্রাসাদ নির্মাণ, বাণিজ্য ও খোদাই শিল্প।

পাহাড়ে খোদাইকৃত সমাধি ও নবী সালেহ (আ.)-এর মোজেজা।

সাবা (Saba / Sheba)

খ্রিস্টপূর্ব ১,২০০ – ২৭৫ অব্দ

মা’রিব (ইয়েমেন)

মারিব বাঁধের সেচ নির্ভর কৃষি, লোবান ও মশলার কাফেলা।

মারিবের মহা-বাঁধ, রানী বিলকিস ও সুলাইমান (আ.)।

নাবাতিয়ান (Nabataean)

খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক – ১০৬ খ্রিস্টাব্দ

পেট্রা (জর্ডান) ও হেগ্রা (সৌদি আরব)

মরুভূমির সুগন্ধি বাণিজ্য রুট নিয়ন্ত্রণ ও জল ব্যবস্থাপনা।

পাহাড় কেটে নির্মিত 'পেট্রা' ও হেগ্রার রাজকীয় অট্টালিকা।

কিন্দাহ (Kindah)

খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতক – ৬ষ্ঠ খ্রিস্টাব্দ

ক্বারিয়াত আল-ফাও (সৌদি আরব)

মধ্য আরবের বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ন্ত্রণ ও ইয়েমেনি সংস্কৃতি।

ক্বারিয়াত আল-ফাও প্রত্নস্থল ও প্রাক-ইসলামিক ব্রোঞ্জ মূর্তি।

পালমিরা (Palmyra)

খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতক – ২৭২ খ্রিস্টাব্দ

সিরীয় মরুভূমি / পালমিরা

পারস্য ও রোমের মধ্যবর্তী সিল্ক রোড ও কাফেলা বাণিজ্য।

রানী জেনোবিয়ার প্রাসাদ ও রোমান প্যান্থিয়ন স্থাপত্য।

মিনীয় (Minaeans)

খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতক – ২য় শতক

মাইন (কারনব), ইয়েমেন

লোহিত সাগরের উপকূলীয় ইনসেন্স ও সুগন্ধি বাণিজ্য।

দক্ষিণ আরবীয় ইনস্ক্রিপশন ও সাবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

হাজরামাউত

খ্রিস্টপূর্ব ১ম সহস্রাব্দ – ৩০০ খ্রিস্টাব্দ

শাবওয়াহ (ইয়েমেন/ওমান)

খাটি লোবান (Frankincense) উৎপাদন ও রফতানি।

শাবওয়াহ প্রাচীন দুর্গ ও প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্য কেন্দ্র।

হিমিয়ার (Himyar)

খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ অব্দ – ৫২৫ খ্রিস্টাব্দ

জাফরা / সানা (ইয়েমেন)

দক্ষিণ আরবের একীকরণ, কৃষি ও লোহিত সাগরের বাণিজ্য।

ইয়েমেনে ইহুদি/খ্রিস্টধর্ম বিস্তার ও 'আসহাবুল উখদুদ'।

আরও কিছু প্রাচীন সভ্যতা ও ঐতিহাসিক মরুদ্যান

পূর্বের নিবন্ধগুলোতে সাবা, সামুদ, দিলমুন কিংবা নাবাতিয়ান সভ্যতার কথা বলা হলেও আরব উপদ্বীপে আরও কয়েকটি প্রভাবশালী রাজ্য ও বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল:

দেদান ও লিহিয়ান রাজ্য (Dedan and Lihyan)

সৌদি আরবের ঐতিহাসিক আল-উলা (Al-Ula) উপত্যকায় খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে দেদান এবং পরবর্তীতে লিহিয়ান সাম্রাজ্যের বিকাশ ঘটেছিল।

বাণিজ্যিক ভূমিকা: দেদানিয়রা উত্তর-দক্ষিণ মশলা বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ করত।

পাহাড়ের সিংহ সমাধি: পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা প্রকাণ্ড 'সিংহ সমাধি' (Tombs of the Lions) দেদানীয় স্থাপত্যের অনন্য উদাহরণ।

লিহিয়ান লিপি: তারা নিজস্ব লিহিয়ানীয় লিপি ব্যবহার করত, যা পরবর্তী আরবি ভাষার বিকাশে ভূমিকা রাখে।

কাতাবান রাজ্য (Qataban)

দক্ষিণ আরবের (ইয়েমেন) ওয়াদি বাইহান এলাকায় খ্রিস্টপূর্ব ১ম সহস্রাব্দে গড়ে ওঠা একটি সমৃদ্ধ রাজত্ব।

রাজধানী টিমনা (Timna): এটি ধূপ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী স্টেশন ছিল।

আইনি কোড: কাতাবানের অধিবাসীরা পাথরের স্ল্যাবে অত্যন্ত সুসংগঠিত বাণিজ্যিক ও সামাজিক আইন খোদাই করে রেখেছিল, যা দক্ষিণ আরবের সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত আইনি দলিলের একটি।

মাগান সভ্যতা (Magan)

সুমেরীয় ও আক্কাদীয় মাটির ট্যাবলেটে ‘মাগান’ নামক এক সমৃদ্ধ এলাকার প্রচুর উল্লেখ পাওয়া যায়, যা বর্তমান ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল।

তামা ও পাথরের আধার: খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে মেসোপটেমীয় সভ্যতায় ব্যবহৃত অধিকাংশ তামা এবং কালচে ডায়োরাইট পাথর মাগান থেকেই সরবরাহ করা হতো।

তাইমা মরুদ্যান (Tayma Oasis)

উত্তর আরবের তাইমা ছিল প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক মরুদ্যান।

ব্যাবিলনের রাজা নাবোনিডাস (Nabonidus): খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ব্যাবিলনের শেষ স্বাধীন রাজা নাবোনিডাস ব্যাবিলন ছেড়ে টানা ১০ বছর তাইমাতে অবস্থান করেছিলেন এবং এখান থেকেই তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন।

প্রাচীন আরবের বর্ণমালা ও শিলালিপি (Epigraphy)

আরব উপদ্বীপের ইতিহাস জানার অন্যতম প্রধান উৎস হলো পাথরে খোদাই করা হাজার হাজার শিলালিপি:

মুসনাদ লিপি (Musnad Script): দক্ষিণ আরবের সাবা, হিমিয়ার ও কাতাবান রাজ্যে ব্যবহৃত জ্যামিতিক ও অত্যন্ত সুন্দর লিপি। এটি পাথর ও ধাতব ফলকে খোদাই করা হতো।

সাফাইটিক লিপি (Safaitic): উত্তর আরব ও সিরীয় মরুভূমিতে বসবাসকারী সাধারণ যাযাবর বাদুঈনরা পাথরের গায়ে হাজার হাজার সাফাইটিক শিলালিপি লিখে রেখে গেছে। এতে তাদের দৈনন্দিন জীবন, শিকার, প্রেম ও যুদ্ধের বিবরণ রয়েছে।

নামারা শিলালিপি (Namara Inscription - ৩২৮ খ্রিস্টাব্দ): সিরিয়ার নামারা অঞ্চলে প্রাপ্ত এটি একটি ঐতিহাসিক সমাধিলিপি। লখমিদ রাজা মার আল-কায়েসের এই সমাধিপ্রস্তরটিকে আধুনিক আরবি ভাষার আদি রূপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মনে করা হয়।

পৌরাণিক রহস্য: জিনের শ্রেণীবিন্যাস ও ক্বাফ পর্বত

আরবীয় লোকগাথায় অতিপ্রাকৃতিক সত্তার শ্রেণীবিন্যাস এবং অলৌকিক ভূগোলের বিশেষ স্থান রয়েছে:

জিনের (Jinn) প্রধান চার শ্রেণীবিন্যাস

আরব পৌরাণিক কাহিনী ও রূপকথায় জিনদের কেবল এক ধরণের সত্তা মনে করা হয় না; বরং তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে:

ইফরিত (Ifrit): অত্যন্ত শক্তিশালী, চালাক এবং আগুনে তৈরি ডানাযুক্ত জিন। এরা প্রধানত ভূগর্ভস্থ প্রাসাদ ও প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে বাস করে। ‘আলিফ লাইলা’-তে প্রদীপের শক্তিশালী জিনের ভূমিকায় প্রায়ই এদের দেখা যায়।

মারিদ (Marid): জিনদের মধ্যে সবচেয়ে বিশাল, পরম পরাক্রমশালী ও অহংকারী শ্রেণী। এরা সাধারণত সমুদ্র, জলাশয় ও উন্মুক্ত বাতাসে অবস্থান করে এবং জাদুকরদের বশ করা সবচেয়ে কঠিন।

আম্মার (A'mmar): যেসব জিন মানুষের ঘরে বা লোকালয়ের আশেপাশে মানুষের সাথে ছায়ার মতো বসবাস করে।

শয়তান (Shaytan): অশুভ ও মন্দ চিন্তার উদ্রেককারী জিন সত্তা।

ক্বাফ পর্বতমালা (Mount Qaf)

আরব লোকগাথা ও মধ্যযুগীয় রূপকথার মহাজাগতিক ভৌগোলিক ধারণায় ‘জাবাল ক্বাফ’ বা ক্বাফ পর্বতমালা একটি অতিপ্রাকৃতিক স্থান। বিশ্বাস করা হতো, পুরো দৃশ্যমান পৃথিবীকে ঘেরা দিয়ে রেখেছে এক বিশাল সবুজ পান্নার (Emerald) তৈরি পর্বতমালা, যার নাম ক্বাফ পর্বত।

সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের সময় আকাশের নীল বা সবুজ আভা এই পর্বতের ওপর সূর্যের আলোর প্রতিফলনের ফলেই সৃষ্টি হয়। ক্বাফ পর্বতকে জিনের রাজ্য, আনকা পাখির আবাসস্থল এবং অলৌকিক জাদুকরী প্রাণীদের স্থান বলে মনে করা হতো।

আইয়ামে জাহিলিয়ার মূল দেব-দেবী ও সাহিত্য

ইসলাম আগমনের পূর্বে (আইয়ামে জাহিলিয়া) মক্কা ও আরব উপদ্বীপে পৌত্তলিক ধর্মীয় ধারা প্রচলিত ছিল।

হুবাল (Hubal): কাবার প্রধান দেবতা। এটি লাল আকিক (Carnelian) পাথর দিয়ে তৈরি মানুষের আকৃতির এক বিশাল মূর্তি ছিল, যার একটি হাত সোনালী ধাতু দিয়ে মেরামত করা ছিল। ভাগ্য পরীক্ষার জন্য এর সামনে তীর নিক্ষেপ করা হতো।

অন্যান্য প্রধান দেবী: আল-লাত (উর্বরতার দেবী), আল-উজ্জা (ক্ষমতা ও যুদ্ধ), এবং মানাত (ভাগ্য ও সময়ের দেবী)।

মুআল্লাকাত (Al-Mu'allaqat): ঝুলন্ত মহাকাব্য

প্রাক-ইসলামিক আরবদের কেবল যুদ্ধ ও মূর্তিপূজা নয়, ছিল ভাষার অভূতপূর্ব অলঙ্কার ও কাব্যিক প্রতিভা। প্রতি বছর ওকাজ (Ukaz) মেলায় আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিরা কবিতা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন।

বিজয়ী সাতজন কবির মহাকাব্যিক কাসিদাগুলো (কবিতা) খাঁটি সোনার হরফে হরিণের চামড়ায় লিখে সম্মানার্থে কা’বা শরীফের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো। ইমরুল কায়েস, অন্তরা ইবনে সাদ্দাদ, তারাফা ও জুহাইরের মতো কবিদের রচিত এই 'মুআল্লাকাত' প্রাক-ইসলামিক আরবের সামাজিক জীবন, প্রেম, যুদ্ধ ও বেদুঈন সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক দলিল।

প্রাচীন আরবের সাংস্কৃতিক ধারা ও ইসলামী শরীয়তে এর প্রভাব

আরবের প্রাক-ইসলামিক যুগকে পরবর্তীকালে 'আইয়ামে জাহিলিয়া' বা অজ্ঞতার যুগ বলা হলেও, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের মধ্যে বেশ কিছু উন্নত সামাজিক রীতি, সংস্কৃতি এবং ধ্রুপদী রীতিনীতির চর্চা ছিল। প্রখ্যাত প্রাক-ইসলামিক পণ্ডিত মুহাম্মদ শুকরি আল-আলুসি তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘বুলুঘ আল-আরব ফি আহওয়াল আল-আরব’-এ উল্লেখ করেছেন যে, প্রাক-ইসলামিক আরবরা এমন অনেক নৈতিক ও ধর্মীয় আচার অনুশীলন করত, যা পরবর্তীতে ইসলামী শরীয়তেও সংস্কারপূর্বক অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সামাজিক ও বৈবাহিক সংস্কার

প্রাচীন আরবরা মায়ের সাথে মেয়ের বিয়ে এবং একই সাথে দুই বোনকে বিয়ে করাকে চরম জঘন্য অপরাধ মনে করত। সৎ মাকে বিয়ে করার কুপ্রথাকে তারা 'ধাইজান' বলত এবং সামাজিক তিরস্কার করত।

কাবা গৃহের তীর্থযাত্রা ও পবিত্রতা

প্রাক-ইসলামিক আরবরা আব্রাহামীয় (ইব্রাহিমী) ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় কাবার জিয়ারত, হজ্ব এবং ওমরাহ সম্পাদন করত। তারা কাবার চার পাশে তাওয়াফ করত, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে দৌড়াত ('সাই' করত) এবং শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করার প্রতীকী আচার পালন করত।

বৈবাহিক বা শারীরিক মিলনের পর গোসল করা, মুখ কুলি করা, নাকের ভেতর পানি দিয়ে পরিষ্কার করা, নখ কাটা, গোপনাঙ্গের লোম পরিষ্কার করা এবং নবজাতকের খৎনা (সন্ন্যাস) করার মতো বিশুদ্ধতার আচারগুলো প্রাচীন আরব সংস্কৃতিতেই বিদ্যমান ছিল।

দণ্ডবিধি ও আইনি সমাজ

আরবের সামুদ, সাবীয় কিংবা নাবাতিয়ান আইনি কাঠামোর মধ্যে চুরির অপরাধে হাত কেটে দেওয়া এবং মারাত্মক ব্যভিচারের শাস্তিস্বরূপ পাথর ছুড়ে মারার দণ্ডবিধি কদাচিৎ প্রচলিত ছিল, যা উপজাতীয় ন্যায়বিচার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো।

আধুনিক মানবজাতির অগ্রগতিতে আরব পুরাতত্ত্বের অবদান

ইতিহাসের ধূলিমলিন পাতা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা আরবের প্রাচীন সভ্যতাগুলোর ইতিবৃত্ত প্রমাণ করে যে আরব উপদ্বীপ কেবল বালুর সমুদ্র ছিল না; বরং তা ছিল প্রাক-আধুনিক মানব সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত পরীক্ষা-গার।

আল-মাগারের ৯,০০০ বছর আগের ঘোড়ার গৃহপালন থেকে শুরু করে দিলমুনের মেসোপটেমীয় বিশ্ব-বাণিজ্য, সামুদ ও নাবাতিয়ানদের পাষাণ খোদাই করা অনন্য অট্টালিকা এবং সাবার প্রকৌশলগত মারিব বাঁধ প্রতিটি সভ্যতাই বিশ্ব মানবজাতিকে প্রযুক্তিকৌশল, কারিগরিবিদ্যা এবং নগর ব্যবস্থাপনার এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মরুকরণ কিংবা আযাবের ফলে এসব পরাক্রমশালী রাজবংশ পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেছে, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া পাথরের অট্টালিকা, শিলালিপি এবং কাহিনীর ধারা আজও ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বের দর্পণে প্রাক-ইসলামিক আরবের এই প্রাচীন ঐতিহ্য তাই কেবল কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখণ্ডের গল্প নয়, বরং তা সমগ্র মানব সভ্যতারই এক অমূল্য ও গৌরবময় অধ্যায়।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.