আনহেল দি মারিয়া - ফুটবল ইতিহাসের সেরা বিগ ম্যাচ প্লেয়ার

ফুটবল খেলাটি শেষ পর্যন্ত পরিসংখ্যান, ট্রফি আর কিছু জাদুকরী মুহূর্তের সমষ্টি। আধুনিক ফুটবলে যখন সর্বকালের সেরা বা সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়দের তালিকা করা হয়, তখন স্বভাবতই লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বা নেইমারদের নাম সবার আগে উচ্চারিত হয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমন একজন মানুষের সন্ধান মেলে, যিনি হয়তো প্রতি ম্যাচে স্পটলাইটের কেন্দ্রে থাকেননি, কিন্তু যখনই মঞ্চটি সবচেয়ে বড় হয়েছে, যখনই কোটি কোটি মানুষের চোখ উৎকণ্ঠায় বুঁদে এসেছে, ঠিক তখনই তিনি আবির্ভূত হয়েছেন ত্রাতা হিসেবে। তিনি আর কেউ নন ‘এল ফিদেও’ বা আনহেল দি মারিয়া (Ángel Di María)।
আনহেল দি মারিয়াকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা, কিংবা দ্ব্যর্থহীনভাবে ‘সবচেয়ে সেরা বিগ ম্যাচ প্লেয়ার’ (The Ultimate Big Match Player) বললে কি বিন্দুমাত্র ভুল হবে? না, মোটেও না। বরং এটিই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য। ফুটবল বিশ্বে অনেক মহাতারকা আছেন যারা লিগ ম্যাচে গোলের পর গোল করেন, কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে এসে খেই হারিয়ে ফেলেন। দি মারিয়া ঠিক তার বিপরীত। ফাইনাল ম্যাচ মানেই দি মারিয়ার চওড়া হাসি, ফাইনাল ম্যাচ মানেই প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে চুরমার করা দৌড়, আর ফাইনাল ম্যাচ মানেই গোলপোস্টের ওপর দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া কোনো জাদুকরী ‘চিপ’ গোল। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলের হয়ে ১৪৫টি ম্যাচে ৩১টি গোল করা এই উইঙ্গারের ক্যারিয়ারের গল্পটি কেবল কিছু সংখ্যার নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফাইনালগুলো নিজের পায়ে লিখে নেওয়ার গল্প।
বিগ ম্যাচ প্লেয়ারের সংজ্ঞা এবং দি মারিয়া রিয়েলিটি
ফুটবলে 'বিগ ম্যাচ প্লেয়ার' বলতে এমন খেলোয়াড়কে বোঝায় যিনি চাপের মুখে ভেঙে পড়েন না, বরং চাপকে নিজের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। দি মারিয়ার খেলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর মধ্যে এক অদ্ভুত মানসিক দৃঢ়তা রয়েছে। যখন প্রতিপক্ষ দল লিওনেল মেসিকে বোতলবন্দী করে রাখার জন্য তাদের সমস্ত রণকৌশল সাজায়, ঠিক তখনই মাঠের ডান বা বাম প্রান্ত ধরে ডানা মেলেন দি মারিয়া।
তাঁর গতি, নিখুঁত ড্রিবলিং এবং ডিফেন্স-চেরা পাস যেকোনো বড় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ২৮ বছরের ট্রফির খরা কাটানো থেকে শুরু করে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মুকুট বিশ্বজয় সবকিছুর পেছনেই রয়েছে এই একটি নামের ছোঁয়া। তিনি কেবল গোলই করেননি, প্রতিটি ফাইনাল ম্যাচে দলের মানসিকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে দি মারিয়ার ঐতিহাসিক পদচিহ্ন (২০০৭-২০২৪)
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের আকাশী-সাদা জার্সিতে দি মারিয়ার অবদান রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। যুব বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে সিনিয়র দলের বিদায়বেলা পর্যন্ত প্রতিটি বড় অর্জনে তাঁর অবদান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ (২০০৭, কানাডা)
আনহেল দি মারিয়া আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন ২০০৭ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে। সার্জিও আগুয়েরো এবং লিওনেল মেসির সাথে কাঁধ মিলিয়ে সেই যুব বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি দুর্দান্ত অবদান রাখেন। টুর্নামেন্টে তাঁর গতি এবং গোল করার ক্ষমতা নজরে কেড়েছিল বিশ্ববাসীর। সেই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েই দি মারিয়া বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনার ফুটবলের ভবিষ্যৎ এক সোনালী প্রজন্মে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
বেইজিং অলিম্পিক স্বর্ণপদক (২০০৮)
সিনিয়র দলে আসার আগেই দি মারিয়া প্রমাণ করেছিলেন তিনি ফাইনালের মানুষ। ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকের ফুটবলের ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়েছিল শক্তিশালী নাইজেরিয়া। বেইজিংয়ের প্রচণ্ড গরমে যখন ম্যাচটি টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, তখন লিওনেল মেসির পাস থেকে বল পান দি মারিয়া। গোলরক্ষককে একা পেয়ে দূর থেকে তাঁর নেওয়া সেই আইকনিক ‘চিপ’ শট নাইজেরিয়ার জালের ওপর দিয়ে জড়িয়ে যায়। সেই একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনা জিতেছিল অলিম্পিক স্বর্ণপদক। মেসির সাথে দি মারিয়ার সেই ঐতিহাসিক জুটির প্রথম বড় সাফল্য ছিল এটি।
কোপা আমেরিকা (২০২১): ঐতিহাসিক মারাকানা জয়
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্ষত ছিল দীর্ঘ ২৮ বছরের ট্রফিহীনতা। একের পর এক ফাইনাল হেরে দল যখন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, ঠিক তখনই ২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল আসে। স্থান ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়াম, প্রতিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল।
ম্যাচের ২২ মিনিটে রদ্রিগো ডি পলের একটি লং পাস বাতাসে ভাসিয়ে নিয়ন্ত্রণে নেন দি মারিয়া। ব্রাজিলের ডিফেন্ডার রেনান লোডি বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে, দি মারিয়া দৌড়ে এসে আগুয়ান গোলরক্ষক এদেরসনের মাথার ওপর দিয়ে নিখুঁত চিপ শটে বল জালে জড়ান। পুরো ম্যাচে আর কোনো গোল হয়নি। দি মারিয়ার সেই একটি গোল আর্জেন্টিনাকে এনে দেয় বহুকাঙ্ক্ষিত কোপা আমেরিকা শিরোপা এবং লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়।
ডি পলের লং পাস ➔ রেনান লোডির মিস-টাইমিং ➔ দি মারিয়ার জাদুকরী চিপ ➔ মারাকানায় গোল! ➔ ২৮ বছরের খরা অবসান
ফিনালিসিমা (২০২২): ওয়েম্বলির রাত
২০২২ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন ইতালি এবং কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় কনমেবল-উয়েফা কাপ অব চ্যাম্পিয়ন্স বা ফিনালিসিমা। লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইউরোপ সেরাদের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। এই ম্যাচেও দি মারিয়া নিজের চেনা রূপ দেখান। লতারো মার্টিনেজের পাস থেকে বল পেয়ে ইতালির গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মাকে পরাস্ত করে চমৎকার এক গোল করেন তিনি। আর্জেন্টিনা ৩-০ ব্যবধানে ইতালিকে উড়িয়ে দিয়ে ট্রফি জিতে নেয়, যার অন্যতম নায়ক ছিলেন দি মারিয়া।
ফিফা বিশ্বকাপ (২০২২, কাতার): লুসাইলের মহাকাব্য
ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ম্যাচ হিসেবে গণ্য করা হয় ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালকে। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশে দি মারিয়ার অন্তর্ভুক্তি ছিল লিওনেল স্কালোনির সবচেয়ে বড় চমক। ডান প্রান্তের বদলে তাঁকে খেলানো হয় বাম প্রান্তে। আর এই এক চালই ফ্রান্সের রক্ষণকে ধ্বংস করে দেয়।
পেনাল্টি আদায়: ম্যাচের প্রথমার্ধে উসমান ডেম্বেলেকে পরাস্ত করে ডি-বক্সে ঢুকে পেনাল্টি আদায় করেন দি মারিয়া, যা থেকে মেসি গোল করে দলকে এগিয়ে নেন।
ঐতিহাসিক দ্বিতীয় গোল: ম্যাচের ৩৬ মিনিটে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ম্যাক অ্যালিস্টারের পাস পেয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করেন দি মারিয়া। গোল করার পর আনন্দের কান্নায় ভেঙে পড়া দি মারিয়ার সেই ছবি ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। আর্জেন্টিনা টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে।
কোপা আমেরিকা (২০২৪): বিদায়ের মঞ্চেও চ্যাম্পিয়ন
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা ছিল দি মারিয়ার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ টুর্নামেন্ট। ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বার কোপা আমেরিকা জয় করে। এই টুর্নামেন্ট জয়েও দি মারিয়া মাঠে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে খেলেন এবং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান। বিদায়বেলায় তাঁর নামের পাশে যুক্ত হয় আরও একটি আন্তর্জাতিক শিরোপা।
ক্লাব ক্যারিয়ারের যাযাবর জীবন: রোজারিও থেকে ইউরোপের শীর্ষ এবং প্রত্যাবর্তন
দি মারিয়ার ক্লাব ক্যারিয়ারও সমানভাবে বৈচিত্র্যময় এবং সাফল্যে ঘেরা। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে রাজত্ব করার পর তিনি ফিরে গেছেন নিজের শেকড়ে।
রোজারিও সেন্ট্রাল (শৈশব) ➔ বেনফিকা ➔ রিয়াল মাদ্রিদ (লা ডেসিমা) ➔ পিএসজি ➔ জুভেন্টাস ➔ বেনফিকা ➔ রোজারিও সেন্ট্রাল (হোমকামিং)
বেনফিকা থেকে রিয়াল মাদ্রিদ (La Décima Hero)
১৩ বছর আগে পর্তুগালের ক্লাব বেনফিকা ছেড়ে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছিলেন দি মারিয়া। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় কাটান। বিশেষ করে ২০১৪ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে রিয়ালের বহুল প্রতিক্ষিত ১০ম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা "La Décima" জয়ে তিনি ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় (Man of the Match) নির্বাচিত হয়েছিলেন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও গ্যারেথ বেলের পাশে তাঁর ওয়ার্ক-রেট ছিল অবিশ্বাস্য।
পিএসজি এবং জুভেন্টাস অধ্যায়
রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর (মাঝে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে সংক্ষিপ্ত সময় কাটিয়ে) তিনি যোগ দেন ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেইন (PSG)-তে। পিএসজিতে তিনি হয়ে ওঠেন ক্লাবের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অ্যাসিস্ট দাতা। নেইমার ও এমবাপ্পের সাথে জুটি বেঁধে ঘরোয়া সব ট্রফি জেতার পাশাপাশি ২০২০ সালে পিএসজিকে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে তুলতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। এরপর এক মৌসুমের জন্য ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসে গিয়েও নিজের ক্লাসের প্রমাণ দেন তিনি।
বেনফিকায় ফেরা এবং রোজারিও সেন্ট্রাল-এ আবেগঘন প্রত্যাবর্তন
৩৫ বছর বয়সে দি মারিয়া আবারও পাড়ি জমান তাঁর ইউরোপীয় ক্যারিয়ারের প্রথম ক্লাব বেনফিকায়। সেখানেও তিনি তাঁর চিরচেনা পারফরম্যান্স দিয়ে ভক্তদের মুগ্ধ করেন। তবে দি মারিয়ার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি রচিত হয় যখন তিনি তাঁর শৈশবের ক্লাব রোজারিও সেন্ট্রাল-এ ফিরে আসেন। এটি সেই ক্লাব যেখানে তিনি ফুটবল খেলা শিখেছিলেন, যেখান থেকে তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরু হয়েছিল। ইউরোপের সব আলো, অর্থ আর ট্রফি জয় শেষে নিজের প্রিয় মাতৃভূমির শৈশবের ক্লাবে ফিরে এসে খেলাটি শেষ করার সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কতটা খাঁটি।
দি মারিয়ার ক্যারিয়ারের ঐতিহাসিক ফাইনাল ও পরিসংখ্যান
নিচে আনহেল দি মারিয়ার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ফাইনাল ম্যাচ, গোলের বিবরণ এবং ক্লাব ক্যারিয়ারের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:
বছর / আসর | প্রতিপক্ষ দল | ম্যাচের গুরুত্ব ও স্টেডিয়াম | দি মারিয়ার অবদান / গোল | অর্জিত শিরোপা ও ফলাফল |
২০০৭ (U-20 বিশ্বকাপ) | চেকিয়া (Czechia) | যুব বিশ্বকাপ ফাইনাল, কানাডা | মাঝমাঠ ও উইংয়ে দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অ্যাসিস্ট। | চ্যাম্পিয়ন (আর্জেন্টিনা ২-১ চেকিয়া) |
২০০৮ (বেইজিং অলিম্পিক) | নাইজেরিয়া | অলিম্পিক ফুটবল ফাইনাল, বেইজিং | ম্যাচের ৫৮ মিনিটে একমাত্র আইকনিক চিপ গোল। | স্বর্ণপদক (আর্জেন্টিনা ১-০ নাইজেরিয়া) |
২০১৪ (UCL ফাইনাল) | আতলেতিকো মাদ্রিদ | রিয়াল মাদ্রিদের ১০ম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল | অতিরিক্ত সময়ে ওটি-তে অ্যাসিস্ট ও ম্যাচ সেরা। | চ্যাম্পিয়ন (রিয়াল মাদ্রিদ ৪-১ আতলেতিকো) |
২০২১ (কোপা আমেরিকা) | ব্রাজিল | ফাইনাল ম্যাচ, মারাকানা স্টেডিয়াম | ২২ মিনিটে জয়সূচক একমাত্র চিপ গোল। | চ্যাম্পিয়ন (আর্জেন্টিনা ১-০ ব্রাজিল) |
২০২২ (ফিনালিসিমা) | ইতালি | কনমেবল-উয়েফা কাপ, ওয়েম্বলি | প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে চমৎকার লব গোল। | চ্যাম্পিয়ন (আর্জেন্টিনা ৩-০ ইতালি) |
২০২২ (ফিফা বিশ্বকাপ) | ফ্রান্স | বিশ্বকাপ ফাইনাল, লুসাইল স্টেডিয়াম | পেনাল্টি আদায় এবং ৩৬ মিনিটে ঐতিহাসিক দ্বিতীয় গোল। | বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন (টাইব্রেকারে জয়) |
২০২৪ (কোপা আমেরিকা) | কলম্বিয়া | দি মারিয়ার আন্তর্জাতিক বিদায়ী ম্যাচ | অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত মাঠে থেকে আক্রমণভাগ পরিচালনা। | চ্যাম্পিয়ন (আর্জেন্টিনা ১-০ কলম্বিয়া) |
ক্যারিয়ার স্ট্যাটস | ১৪৫ ম্যাচ | ৩১টি আন্তর্জাতিক গোল | সিনিয়র দল (২০০৮–২০২৪) | টোটাল আন্তর্জাতিক ট্রফি: ৫টি |
কেন দি মারিয়া অনন্য? স্পটলাইটের আড়ালে এক নিঃস্বার্থ যোদ্ধা
ফুটবল বিশ্বে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা ব্যক্তিগত পুরষ্কার (যেমন ব্যালন ডি'অর) পাওয়ার জন্য খেলেন। কিন্তু দি মারিয়া ছিলেন সম্পূর্ণ দলগত একজন খেলোয়াড়। রিয়াল মাদ্রিদে তিনি রোনালদোর জন্য জায়গা তৈরি করতেন, পিএসজিতে ইব্রাহিমোভিচ বা এমবাপ্পের জন্য বল বানাতেন, আর আর্জেন্টিনা দলে তিনি ছিলেন লিওনেল মেসির ডান হাত।
মেসি নিজেও বহু সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, দি মারিয়া পাশে না থাকলে তাঁর আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে যেত। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইনজুরির কারণে দি মারিয়া খেলতে পারেননি, যা আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় আফসোস। তিনি সুস্থ থাকলে হয়তো ২০১৪ সালেই আর্জেন্টিনা বিশ্বজয় করতে পারত। তবে প্রকৃতি তাঁর পাওনা বাকি রাখেনি; ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ফুটবল যা কিছু দেওয়ার ছিল, তার সবকিছুই দি মারিয়াকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
ফুটবলের ইতিহাসে অমর এক ‘ফাইনালিস্ট’
আনহেল দি মারিয়া যখন ফুটবল জুতোজোড়া চিরতরে তুলে রাখবেন, তখন ফুটবল বিশ্ব তাঁকে কেবল একজন দুর্দান্ত উইঙ্গার হিসেবে মনে রাখবে না; বরং ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় 'ক্লচ প্লেয়ার' (Clutch Player) হিসেবে। যিনি বড় ম্যাচে কখনো হারতে জানতেন না।
অলিম্পিক ফাইনাল, কোপা আমেরিকা ফাইনাল, ফিনালিসিমা, কিংবা বিশ্বকাপের ফাইনাল প্রতিটি মঞ্চেই তিনি নিজের নামের পাশে লিখে গেছেন ‘গোলদাতা’ শব্দটি। শৈশবের ক্লাব রোজারিও সেন্ট্রাল-এ ফিরে আসার মাধ্যমে তাঁর ক্যারিয়ারের বৃত্তটি আজ পূর্ণ হয়েছে। ফুটবল বিশ্ব হয়তো প্রতিদিন নতুন নতুন তারকার জন্ম দেবে, কিন্তু ফাইনালে চাপের মুখে আনহেল দি মারিয়ার মতো এমন নিখুঁত ও জাদুকরী পারফর্মার আর কখনো আসবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। তিনি ফুটবল ইতিহাসের চিরন্তন এবং অবিসংবাদিত ‘বিগ ম্যাচ কিং’।




















