বলিউডে গত ৮ বছর ধরে আমি অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ! - এ আর রহমান

Jan 20, 2026

বলিউড ও দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সংগীত আকাশ নিয়ে ভাবলে যে নামটি ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠে, তিনি এ আর রহমান। গত তিন দশক ধরে বিশ্বসংগীতের মঞ্চে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তা আর কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কে তাঁর দেওয়া একটি সাক্ষাৎকার সংগীত জগতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, "বলিউডে গত ৮ বছর ধরে আমি অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ!" বলিউডে তাঁকে ঘিরে একটি ‘গ্যাং’ তৈরি হয়েছে, যারা তাঁর বিরুদ্ধে গুজব ছড়াচ্ছে এবং তাঁকে কাজ থেকে দূরে রাখছে।

আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা বিশ্লেষণ করব সত্যিই কি এ আর রহমান ষড়যন্ত্রের শিকার? নাকি বদলে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রির ‘ফাস্ট ফুড’ কালচারের সাথে তাঁর ‘সোলফুল’ মিউজিকের এক অলিখিত সংঘাত শুরু হয়েছে?

বলিউডে এ আর রহমান কি সত্যিই নিষিদ্ধ?

বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কের সাক্ষাৎকারে এ আর রহমান বলেন, "আমি গত ৮ বছর ধরে বলিউডে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ! ইন্ডাস্ট্রির ক্ষমতা এখন কিছু অ-সৃজনশীল মানুষের হাতে, যারা একটি চক্র বা গ্যাং তৈরি করেছে এবং সাম্প্রদায়িক কারণে আমাকে কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।"

তাঁর এই অভিযোগের রেশ ধরে সংগীতবোদ্ধারা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছেন। রহমান সরাসরি কারো নাম না নিলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বড় প্রজেক্টের অফার তাঁর কাছে আসার আগেই এই 'লবিং গ্রুপ' সেই অফার ফিরিয়ে দিচ্ছে অথবা পরিচালকদের মনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। প্রশ্ন ওঠে, অস্কার এবং গ্র্যামিজয়ী একজন শিল্পীর সাথে এমন আচরণ কি আদৌ সম্ভব? ইতিহাস বলে, বলিউডে লবিং কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে রহমানের ক্ষেত্রে তিনি এর পেছনে 'সাম্প্রদায়িক কারণ' ও 'ক্রিয়েটিভ ইনসিকিউরিটি'কে বড় করে দেখছেন।

খোদ নিজের ঘরেই কি কোণঠাসা এ আর রহমান?

বলিউডের কথা বাদ দিলেও খোদ দক্ষিণ ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রি যেখানে রহমানের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেখানেও পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। তামিল ও তেলুগু সিনেমায় এখন অনিরুদ্ধ রবিচন্দ্র, জি.ভি. প্রকাশ, থমন বা সন্তোষ নারায়ণের মতো তরুণ তুর্কিরা রাজত্ব করছেন।

এক সময় মণি রত্নম বা শংকরের সিনেমা মানেই ছিল এ আর রহমানের সুর। কিন্তু এখন চিত্রটা ভিন্ন। বড় বাজেটের 'মাস' মুভিগুলোর প্রথম পছন্দ এখন অনিরুদ্ধ। কেন নিজের মাটিতেই রহমান কিছুটা কম ডাক পাচ্ছেন? এর পেছনের কারণগুলো কেবল ষড়যন্ত্র নয়, বরং ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরনের পরিবর্তন।

কেন পিছিয়ে পড়ছেন এ আর রহমান?

বর্তমান সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এখন আর কেবল গল্পের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, এটি দাঁড়িয়ে আছে 'ভাইরাল' ট্রেন্ডের ওপর। এখানে রহমান ও নতুন প্রজন্মের সুরকারদের মধ্যে কয়েকটি মৌলিক পার্থক্য চোখে পড়ে:

ক) ‘ভাইরাল’ ট্রেন্ড বনাম ‘সোলফুল’ মিউজিক

বর্তমান সাউথ ইন্ডাস্ট্রি এখন ‘ইনস্টাগ্রাম রিলস’ এবং ‘হুক স্টেপ’ কালচারের ওপর নির্ভরশীল। অনিরুদ্ধ বা থমন খুব ভালো জানেন কীভাবে ৩০ সেকেন্ডের একটি ‘হুক লাইন’ তৈরি করতে হয় যা রাতারাতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলবে। যেমন- 'Hukum', 'Kaavaalaa' বা 'Arabic Kuthu'। প্রযোজকরা এখন চটজলদি হিট চান যাতে সিনেমার প্রমোশন সহজ হয়। অন্যদিকে, রহমানের গান হলো 'স্লো পয়জন'। তাঁর গান বুঝতে সময় লাগে, যা আজকের অস্থির 'ফাস্ট ফুড' জমানার সাথে প্রায়ই খাপ খায় না।

খ) ‘মাস এন্ট্রি’ ও ইলেকট্রিক বিজিএম-এর চাহিদা

লোকেশ কনগরাজ, নেলসন বা আটলির মতো নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা সিনেমায় লাউড, ইলেকট্রিক এবং হাই-ভোল্টেজ বিজিএম (Background Music) পছন্দ করেন। অনিরুদ্ধ এই জায়গায় নিজেকে ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী’ প্রমাণ করেছেন। তিনি জানেন কীভাবে হিরোর 'এলিভেশন সিন'-এ দর্শকদের থিয়েটারে সিট থেকে দাঁড় করিয়ে দিতে হয়। রহমানের বিজিএম অনেক বেশি অর্কেস্ট্রাল এবং সূক্ষ্ম। ফলে ‘মারদাঙ্গা’ অ্যাকশন ছবির জন্য পরিচালকরা এখন রহমানকে কিছুটা 'নিরাপদ' মনে করছেন না।

কাজের ধরন ও বাজেটের সীমাবদ্ধতা

এ আর রহমান কাজ করেন তাঁর নিজস্ব গতিতে। তিনি পারফেকশন বিশ্বাসী এবং তাঁর স্টুডিওতে নিজের নিয়মে কাজ করেন। বর্তমানের কর্পোরেট স্টাইলে যেখানে একটি সিনেমা দ্রুত শেষ করার তাড়া থাকে, সেখানে নতুন প্রজন্মের সুরকাররা অনেক বেশি গতিশীল।

আবার বাজেটের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রহমান ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম দামী সুরকার। অনেক প্রযোজক মনে করেন, অনিরুদ্ধ বা থমনকে দিয়ে কাজ করালে বাজেটের মধ্যে থেকেই ‘হিট গান’ পাওয়া সম্ভব। তাই তাঁরা অহেতুক রহমানের পেছনে বিশাল বাজেট খরচ করতে অনীহা প্রকাশ করেন।

কমিউনিকেশন গ্যাপ ও জেনারেশন শিফট

মণি রত্নম বা শংকরের মতো পরিচালকরা এ আর রহমানের ওপর অন্ধের মতো ভরসা করেন (যেমন Ponniyin Selvan বা Thug Life)। কিন্তু নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা বড় হয়েছেন রহমানের গান শুনেই। কাজ করার সময় তাঁরা তাঁদের সমবয়সী বা যাদের সাথে 'ভাইব' মেলে, তাঁদের খোঁজেন। অনিরুদ্ধ বা জি.ভি. প্রকাশ তাঁদের বন্ধুস্থানীয়, ফলে তাঁদের সাথে সৃজনশীল আলোচনা সহজ হয়। বড় কোনো কিংবদন্তির কাছে গিয়ে কথা বলতে অনেক নতুন পরিচালকই জড়তা অনুভব করেন।

এ আর রহমান কি নিজেই গুটিয়ে নিয়েছেন?

এটাও সত্যি যে রহমান এখন আর সব ধরণের কাজ করতে চান না। তিনি এখন এমন প্রজেক্ট বেছে নেন যেখানে তাঁর সৃজনশীলতার সুযোগ আছে। চটুল বা গতানুগতিক কমার্শিয়াল মাসালা মুভিতে তিনি নিজেই হয়তো আগের মতো আগ্রহ দেখান না। তবে ধানুশ অভিনীত 'রায়ান' (Raayan) সিনেমায় তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি চাইলে এখনও ‘মাস’ মিউজিক দিতে পারেন। কিন্তু তিনি হয়তো নিয়মিত এই ফর্মুলা মিউজিকে নিজেকে আটকে রাখতে চান না।

শচীন দেব বর্মন থেকে আর.ডি. বর্মন

সংগীত জগতে এই 'উত্থান-পতন' নতুন কিছু নয়। রাহুল দেব বর্মন বা পঞ্চম দার মতন লেজেন্ডরাও জীবনের শেষ দিকে কাজ পাচ্ছিলেন না। লবিং বা ইন্ডাস্ট্রি ট্রেন্ডের কারণে তাঁকে এক সময় ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেই অবস্থাতেও তিনি Parinda, Gardish বা Arjun-এর মতো একশন ছবিতে নিজের ছাপ রেখে গেছেন। এবং সবশেষে 1942: A Love Story-র মতো মিউজিক্যাল ডালি সাজিয়ে প্রমাণ করেছিলেন কালজয়ী প্রতিভা কখনো হারিয়ে যায় না।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পঞ্চম দা কোনোদিন নিজের কাজ না পাওয়াকে 'জাত' বা 'ধর্ম' দিয়ে বিচার করেননি। তিনি জানতেন সময় বড় শক্তিশালী। রহমান যখন সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনেন, তখন প্রশ্ন ওঠে অস্কার জেতার সময় কি এই সমাজ বা ইন্ডাস্ট্রি একই রকম ছিল না? শিল্পীর জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু তাকে ধর্মীয় রঙ দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।

এ আর রহমান কি এখন একটি ‘ব্র্যান্ড’?

এ আর রহমানকে কেউ ইচ্ছে করে ‘বাতিল’ করছে, বিষয়টি পুরোপুরি এমন নয়। বরং বলা যায়, ইন্ডাস্ট্রির খেলার নিয়ম বদলে গেছে। এখনকার ইন্ডাস্ট্রি চায় ‘ইনস্ট্যান্ট কফি’ (অনিরুদ্ধ/থমন), আর এ আর রহমান হলেন ‘পুরানো ওয়াইন’।

যখন কোনো পরিচালক ‘জাতীয় পুরস্কার’, ‘ক্লাসিক’ বা ‘মহাকাব্যিক’ কিছু বানাতে চান (যেমন- Aadujeevitham), তখন তাঁরা রহমানের কাছেই যান। কিন্তু যখন দরকার ‘বক্স অফিস ধামাকা’ বা ‘পার্টি সং’, তখন ডাক পড়ে নতুনদের। রহমান এখন প্রতিযোগিতার উর্ধ্বে চলে গেছেন। তিনি এখন আর কেবল একজন সুরকার নন, তিনি একটি ‘গ্লোবাল ব্র্যান্ড’।

সময়ের আবর্তে কিংবদন্তির লড়াই

এ আর রহমান যা বলেছেন, তা হয়তো আবেগের বশেই বলেছেন। ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ সময় শীর্ষে থাকার পর যখন গুরুত্ব কিছুটা কমে আসে, তখন অনেক শিল্পীই তা মন থেকে মেনে নিতে পারেন না। তবে লবিং বা চক্র যে নেই, তা হলফ করে বলা যায় না।

রহমানকে মনে রাখতে হবে, তাঁর লড়াই কোনো 'গ্যাং'-এর সাথে নয়, বরং তাঁর লড়াই তাঁর নিজের তৈরি লিগ্যাসির সাথে। বিশ্বজুড়ে তাঁর কোটি কোটি ভক্ত আজও তাঁর একটি ‘সোলফুল’ কম্পোজিশনের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করে। বলিউড তাঁকে ব্রাত্য করলেও, সংগীতের বিশ্ব মানচিত্রে তাঁর স্থান কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। সময় শক্তিশালী, কিন্তু প্রতিভা অবিনশ্বর।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.