বলিউডে গত ৮ বছর ধরে আমি অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ! - এ আর রহমান

ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল একজন মানুষের পরিচয় বহন করে না; বরং তা হয়ে ওঠে একটি যুগের সাউন্ডট্র্যাক। গত তিন দশক ধরে বিশ্বসংগীতের মানচিত্রে ভারতীয় সুরের যে বিজয়কেতন উড়ছে, তার অগ্রভাগে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছেন একজনই আল্লাহ রাখা রহমান (এ আর রহমান)। ১৯৯২ সালে মণিরত্নমের 'রোজা' চলচ্চিত্র দিয়ে যাঁর আত্মপ্রকাশ, পরবর্তী তিন দশকে দুটি অস্কার, দুটি গ্র্যামি, একটি বাফটা, একটি গোল্ডেন গ্লোব এবং ছয়টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে পৌঁছানো যেকোনো সুরকারের জন্য আজন্মের স্বপ্ন।
তবে সম্প্রতি 'বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্ক'-এ দেওয়া এ আর রহমানের একটি বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার পুরো ভারতীয় বিনোদন জগতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সাক্ষাৎকারে তিনি ক্ষোভ ও বিষাদের সুরে দাবি করেছেন "বলিউডে গত ৮ বছর ধরে আমি অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ! সেখানে অ-সৃজনশীল মানুষের একটি 'গ্যাং' বা চক্র গড়ে উঠেছে, যারা সাম্প্রদায়িক কারণে এবং নিজেদের অযোগ্যতার ভীতি থেকে আমাকে বড় বড় কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।"
অস্কার বিজয়ী এক বৈশ্বিক আইকনের মুখ থেকে এই জাতীয় অভিযোগ আসার পর ভারতীয় সংগীত ও চলচ্চিত্র জগৎ দুটি স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে শুরু হয়েছে সমবেদনা ও ইন্ডাস্ট্রি রাজনীতির কুৎসিত ব্যবচ্ছেদ, অন্যদিকে প্রশ্ন উঠেছে সময়ের আবর্তে বদলে যাওয়া মিউজিক বিজনেসের বাস্তবতা নিয়ে।
আজকের এই বিস্তারিত ও বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধে আমরা দেখব সত্যিই কি এ আর রহমান কোনো পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বা লবিংয়ের শিকার? নাকি মূলধারার ভারতীয় চলচ্চিত্রের বদলে যাওয়া ‘ফাস্ট ফুড’ কালচার ও ইনস্টাগ্রাম রিলসের সাথে তাঁর ‘সোলফুল’ সুরের এক অলিখিত, অবধারিত ঐতিহাসিক সংঘাত শুরু হয়েছে?
বলিউডে এ আর রহমান কি সত্যিই নিষিদ্ধ? অভিযোগের ব্যবচ্ছেদ
এ আর রহমানের এই অভিযোগ কিন্তু রাতারাতি উঠে আসা কোনো আকস্মিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। এর আগে ২০২০ সালে 'দিল বেচারা' সিনেমার মুক্তি চলাকালীন এক রেডিও সাক্ষাৎকারেও রহমান প্রথম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে বলিউডে একটি নির্দিষ্ট চক্র তাঁর বিরুদ্ধে গুজব ছড়ায়। সে সময় তিনি বলেছিলেন, যখন কোনো পরিচালক তাঁর কাছে আসেন, তখন সেই চক্রটি পরিচালকদের গিয়ে বলে "রহমানের কাছে যেও না, উনি নাকি প্রচুর টাকা চান, সময়মতো গান দেন না বা বড্ড জটিল।"
লবিং বনাম কর্পোরেট মিউজিক লেবেলের ক্ষমতা
বর্তমানে বলিউডের সংগীত জগৎ আর আগের মতো পরিচালক বা সুরকারের শিল্পবোধের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; এটি নিয়ন্ত্রিত হয় ২-৩টি বিশাল কর্পোরেট মিউজিক লেবেল এবং প্রোডাকশন হাউসের দ্বারা।
মাল্টি-কম্পোজার মডেল: নব্বই বা ২০০০-এর দশকে একটি পুরো সিনেমার গান ও আবহসংগীত (BGM) একজন একক সুরকার তৈরি করতেন (যেমন 'তাল', 'লগান' বা 'রকস্টার')। কিন্তু গত ৮-১০ বছরে বলিউড বেছে নিয়েছে 'মাল্টি-কম্পোজার মডেল'। অর্থাৎ, একটি চলচ্চিত্রে ৫টি গানের জন্য ৪ জন আলাদা সুরকারকে সাইন করানো হয়।
রহমানের একক সত্তা: এ আর রহমান কখনোই এমন 'অ্যাসেম্বলি লাইন' পদ্ধতিতে কাজ করতে পছন্দ করেন না। তিনি একটি সিনেমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মিউজিক্যাল জার্নি বা সাউন্ডস্কেপ তৈরি করতে বিশ্বাসী। কিন্তু বর্তমানের মিউজিক লেবেলগুলো চায় তাৎক্ষণিক রিমেক বা টিকটক হিট। রহমান এই ধারা মেনে নিতে রাজি হননি বলেই অনেক প্রোডাকশন হাউস তাঁকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
'সাম্প্রদায়িক কোণ' ও প্রাসঙ্গিক বিতর্ক
বিবিসির সাক্ষাৎকারে রহমান যে 'সাম্প্রদায়িক কারণ'-এর কথা উল্লেখ করেছেন, তা নিয়ে মিউজিক সার্কেলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ৯০-এর দশকে এ আর রহমান যখন চরম জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান, তখনও ভারতবর্ষ রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু কেবল তাঁর সুরের জাদুতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র দেশের জাতীয় গর্ব।
এখন প্রশ্ন ওঠে, এত বছর পর যখন তিনি কিছুটা কম কাজ পাচ্ছেন, তখন কি ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক কারণ টেনে আনা কতটা যৌক্তিক? একদল বিশ্লেষকের মতে, গত কয়েক বছরে বলিউডের সামগ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিছুটা হলেও মেরুকৃত হয়েছে, যার প্রভাব হয়তো কিছু লবিংয়ের ক্ষেত্রে পড়ে থাকতে পারে।
তবে অন্য দলটির মতে, এটি মূলত রহমানকে বাদ দেওয়ার জন্য 'কর্পোরেট বাহানা'। সরাসরি অস্কারজয়ী রহমানকে "আপনার সুর আর বিক্রি হচ্ছে না" বলতে না পেরে লবিস্টরা হয়তো নানা অজুহাত বা ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে ব্যবহার করে তাঁর কাছে প্রজেক্ট আসা বন্ধ করার চক্রান্ত করেছে।
খোদ দক্ষিণ ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রিতেও কি কোণঠাসা এ আর রহমান?
কেবল বলিউডকে দোষ দিয়ে কিন্তু পুরো সত্যকে আড়াল করা যাবে না। যদি আমরা একটু গভীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভারতের দক্ষিণী সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি (তামিল ও তেলুগু) পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখব সেখানেও এক বিশাল ক্ষমতার রদবদল ঘটেছে।
'অনিরুদ্ধ তরঙ্গ' ও নতুন যুগের রাজত্ব
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা শিল্পে, বিশেষ করে তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে (কলিউড) যেখানে এ আর রহমানের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন রকেট গতিতে রাজত্ব করছেন তরুণ সুরকার অনিরুদ্ধ রবিচন্দ্র। এছাড়া জি.ভি. প্রকাশ কুমার, থমন এস বা সন্তোষ নারায়ণের মতো নতুন প্রজন্মের সুরকাররা বড় বড় মেগা প্রজেক্ট হস্তগত করছেন।
এক সময় মণিরত্নম বা শংকরের সিনেমা মানেই ছিল চোখ বন্ধ করে এ আর রহমানের গান। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। শংকরের সাম্প্রতিক ছবি 'ইন্ডিয়ান ২' বা 'গেম চেঞ্জার'-এর সুরকার অনিরুদ্ধ বা থমন।
লোকেশ কনগরাজ ('বিক্রম', 'লেো'), নেলসন দিলীপকুমার ('জেইলার') বা ্টরলি (' জাওয়ান') আজকের ব্লকবাস্টার 'মাস' মুভিগুলোর প্রথম পছন্দ অনিরুদ্ধ।
কেন নিজের মাটিতেই প্রভাব হারাচ্ছেন 'ম্যাজিক অব মাদ্রাজ'?
দক্ষিণী সিনেমায় রহমানের কাজ কমে যাওয়ার কারণ কোনো সাম্প্রদায়িক লবিং নয়, কারণ সেখানে তিনি ঘরের ছেলে। এর পেছনে কাজ করছে বিজনেস মডেল ও ডেমোগ্রাফিক শিফট। তামিল ও তেলুগু সিনেমা এখন বিশ্বব্যাপী ৫০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকার 'মাস-অ্যাকশন' ব্যবসা করছে। এই ছবিগুলোর চাহিদা সম্পূর্ণ আলাদা, যা পূরণ করতে তরুণ সুরকাররা অনেক বেশি পারদর্শী হয়ে উঠেছেন।
'সোলফুল স্লো পয়জন' বনাম '৩০ সেকেন্ডের ভাইরাল রিল'
এ আর রহমান পিছিয়ে পড়ছেন নাকি তিনি আধুনিক বিনোদন ব্যবস্থার সাথে আপস করতে অস্বীকার করছেন? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর এবং আধুনিক সুরকারদের কাজের দর্শনের পার্থক্যে।
রহমানের মেলোডি (Slow Poison) ─► গভীরতা, অর্কেস্ট্রাল লেয়ারিং, সময়ের সাথে গান সমৃদ্ধ হওয়া
আধুনিক রিল ট্র্যাক (Instant Hit) ─► ৩০ সেকেন্ডের হুক লাইন, ১৩০+ BPM, সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডিং
‘ভাইরাল’ ট্রেন্ড বনাম ‘সোলফুল’ মিউজিক
বর্তমানে একটি সিনেমার মিউজিক অ্যালবামের সাফল্য বিচার করা হয় ছবির মুক্তির আগেই তা ইনস্টাগ্রাম রিলসে বা টিকটকে কত মিলিয়নবার ব্যবহৃত হলো তা দিয়ে।
অনিরুদ্ধ বা থমনের টেকনিক: তাঁরা খুব ভালো বোঝেন কীভাবে ৩০ সেকেন্ডের একটি ক্যাচি 'হুক লাইন' তৈরি করতে হয়। যেমন 'Jailer' ছবির 'Kaavaalaa', 'Leo' ছবির 'Badass' কিংবা 'Jawan'-এর 'Zinda Banda'। এই গানগুলো শোোনামাত্র কানকে সাময়িক বিনোদন দেয় এবং নাচতে বাধ্য করে।
রহমানের টেকনিক: এ আর রহমানের গান হলো 'স্লো পয়জন' (Slow Poison)। তাঁর সুরের ভেতরে থাকে বহুস্তরীয় অর্কেস্ট্রাল অ্যারেঞ্জমেন্ট, বিশ্বসংগীতের ফিউশন এবং আধ্যাত্মিক স্পর্শ। 'রকস্টার'-এর 'নাদান পরিন্দে', 'দিল সে'-র 'সাতরঙ্গি রে' বা সাম্প্রতিক 'আদুজীবিতম (The Goat Life)'-এর সুর প্রথমবার শুনেই হয়তো রিলস বানানো যাবে না, কিন্তু এই গানগুলো বছরের পর বছর ধরে মানুষের মনে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয়। আজকের অস্থির প্রজন্ম যেখানে ১০ সেকেন্ডে ভিডিও সোয়াইপ করে দেয়, সেখানে রহমানের এই গভীরতা অনেক সময় 'স্লো' বলে মনে হয়।
‘মাস এন্ট্রি’ ও ইলেকট্রিক বিজিএম-এর চাহিদা
বর্তমান সিনেমা মূলত থিয়েট্রিকাল এক্সপেরিয়েন্সের ওপর জোর দিচ্ছে। নায়কের 'মাস এন্ট্রি' বা ফাইট সিনের সময় দর্শকরা এখন হলে সিটি বাজাতে চায়। অনিরুদ্ধ বিজিএম (Background Score)-কে এমন এক ইলেকট্রিক ও মেটাল রক মিউজিকের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যা থিয়েটারে দর্শকদের গায়ে কাঁটা দেয়।
রহমানের ক্লাসিকাল বা সিম্ফোনিক বিজিএম নিঃসন্দেহে বিশ্বমানের, কিন্তু আজকের 'মারদাঙ্গা' অ্যাকশন সিনেমার জন্য প্রযোজকরা মনে করেন অনিরুদ্ধের স্টাইল অনেক বেশি 'নিরাপদ' এবং লাভজনক।
কাজের গতি ও কর্পোরেট চাপ
এ আর রহমান কাজ করেন নিজের তৈরি ছন্দে। তিনি চেন্নাই বা লস অ্যাঞ্জেলেসের স্টুডিওতে মধ্যরাতে গভীর ধ্যানে সুর সৃষ্টি করতে পছন্দ করেন। তিনি পারফেকশনিস্ট। অন্যদিকে, বর্তমান কর্পোরেট প্রযোজকরা দ্রুততম সময়ে গান ও বিজিএম চান। নতুন সুরকাররা খুব কম সময়ে আধুনিক ডিজিটাল অডিও ওয়ার্কস্টেশনে (DAW) ট্র্যাক তৈরি করে দিতে পারেন, যা প্রযোজকদের ডেডলাইন মিটাতে সাহায্য করে।
শচীন দেব বর্মন থেকে আর. ডি. বর্মন (পঞ্চম দা)
সংগীত জগতের এই উত্থান-পতন, পছন্দ বদল এবং বয়সের ব্যবধানে কোণঠাসা হয়ে পড়া কিন্তু ভারতীয় চলচ্চিত্রে নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বড় বড় মহান সুরকাররাও একসময় এই একই নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন।
পঞ্চমের ট্র্যাজেডি এবং শেষ বিস্ফোরণ
রাহুল দেব বর্মন (আর. ডি. বর্মন বা পঞ্চম দা) যাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের মিউজিক রিভোলিউশনের জনক বলা হয়, তিনি ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে এসে চরমভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।
ডিসকো ও বাপ্পি লাহিড়ীর আগমন: ৮০-এর দশকে যখন বাপ্পি লাহিড়ীর ডিসকো বিট এবং অ্যাকশন সিনেমার চল শুরু হলো, তখন প্রযোজকরা পঞ্চম দাকে "পুরোনো দিনের সুরকার" বলে বাতিল করতে শুরু করেন।
লবিংয়ের শিকার: সুভাষ ঘাই বা রাজ কাপুরের মতো বিশাল পরিচালকরা একসময় পঞ্চমের দরজায় লাইন দিতেন, কিন্তু ৮০-এর দশকের শেষে তাঁরা নতুনদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। পঞ্চম দা চরম হতাশায় ভুগেছিলেন।
১৯৪২: এ লাভ স্টোরি-র অমর জবাব: জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে, কাজের অভাব সত্ত্বেও পঞ্চম দা তৈরি করেছিলেন '1942: A Love Story'-র মতো এক কালজয়ী মিউজিক্যাল অ্যালবাম। প্রমাণ করেছিলেন প্রতিভা কখনো বয়সের কাছে বা ট্রেন্ডের কাছে হেরে যায় না।
একটি সংবেদনশীল তুলনা
পঞ্চম দা যখন কোণঠাসা হয়েছিলেন, তিনি কিন্তু কখনোই নিজের এই পতনকে ধর্ম, বর্ণ বা জেন্ডার দিয়ে বিচার করেননি। তিনি মেনে নিয়েছিলেন যে ইন্ডাস্ট্রির রুচি সাময়িকভাবে বদলে গেছে। তাই এ আর রহমান যখন নিজের কাজের অভাবের পেছনে 'সাম্প্রদায়িক কারণ' তুলে ধরেন, তখন অনেক প্রবীণ সংগীত বিশেষজ্ঞই মনে করেন রহমানের মতো একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে এমন অভিযোগ তাঁর নিজের বিশাল লিগ্যাসিকে কিছুটা হলেও সংকুচিত করে।
এ আর রহমান বনাম নতুন প্রজন্মের সুরকারবৃন্দ
নিচে এ আর রহমান এবং নতুন প্রজন্মের শীর্ষ সুরকারদের (অনিরুদ্ধ, থমন, সন্তোষ নারায়ায়ন) সঙ্গীতশৈলী, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক মডেলের একটি বস্তুনিষ্ঠ তুলনামূলক ছক উপস্থাপন করা হলো:
মূল পরামিতি / ক্ষেত্র | এ আর রহমান (A. R. Rahman) | নতুন প্রজন্মের সুরকার (Aniruddh / Thaman / Others) |
সংগীতের মূল দর্শন | সোলফুল মেলোডি, ফিউশন, বিশ্বসংগীত ও ক্লাসিকাল লেয়ারিং | হাই-শক্তি বিট, ইলেকট্রনিক ডান্স মিউজিক (EDM) ও মেটাল বিজিএম |
গান প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় | দীর্ঘমেয়াদী; গবেষণা ও গভীর আত্মিক সংযোগের প্রয়োজন হয় | দ্রুততম; স্বল্প সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিক ট্রাক সরবরাহে সক্ষম |
বিজিএম (Background Score) স্টাইল | অর্কেস্ট্রাল, সূক্ষ্ম, দৃশ্যপট ও আবেগের সাথে সংগতিপূর্ণ | অতি-উচ্চমাত্রার বিট, থিয়েট্রিকাল 'হিরো এলিভেশন' ও মাস এন্ট্রি |
সোশ্যাল মিডিয়া ও রিলস সংযোগ | গানগুলো ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়; রিলসের জন্য তৈরি নয় | ৩০ সেকেন্ডের সোশ্যাল মিডিয়া 'হুক নাচ' ও ক্যাচি লিরিক্সে সমৃদ্ধ |
প্রযোজকদের খরচ ও বাজেট | অত্যন্ত ব্যয়বহুল; নিজস্ব প্রিমিয়াম স্টুডিও ও বিশাল টিম প্রয়োজন | তুলনামূলক বাজেট-বান্ধব এবং দ্রুত লাভজনক বাণিজ্যিক রিটার্ন |
পরিচালকদের সাথে সংযোগ | প্রবীণ ও দূরদর্শী পরিচালকদের অগ্রাধিকার (মণিরত্নম, শংকর) | তরুণ প্রজন্মের পরিচালকদের সাথে সহজ ও বন্ধুভাবাপন্ন ভাব বিনিময় |
সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক | Aadujeevitham, Ponniyin Selvan, Chamkila, Maidaan | Jawan, Jailer, Leo, Devara, Vikram |
শ্রোতাগোষ্ঠীর ধরন | সংগীত সংবেদনশীল, দীর্ঘমেয়াদী সং সংগ্রাহক ও ধ্রুপদী ভক্ত | তরুন প্রজন্ম, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী ও থিয়েটার গোলার্স |
এ আর রহমান কি এখন প্রতিযোগিতার উর্ধ্বে এক 'গ্লোবাল ব্র্যান্ড'?
এ আর রহমান গত ৮ বছর ধরে চলচ্চিত্রে 'কম কাজ করছেন' মানেই তিনি 'দেউলিয়া হয়ে গেছেন' এই ধারণাটি চরম হাস্যকর। রহমান এখন আর কেবল একটি সিনেমার সাধারণ জুকবক্স সুরকার নন; তিনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় রূপান্তর করেছেন যেখানে প্রতিযোগিতা শব্দটাই তুচ্ছ।
বিশ্বমঞ্চে উপস্থিতি
রহমান এখন বিশ্বজুড়ে বিশালাকার লাইভ কনসার্ট ট্যুর করেন, যেখানে হাজার হাজার প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক শ্রোতা তাঁর গান শুনতে উপস্থিত হন। তিনি গড়ে তুলেছেন 'KM Music Conservatory' এবং 'Sunshine Orchestra' যার মাধ্যমে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল মিউজিক শেখানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কাজের গুণগত মান
বলিউডের কমার্শিয়াল মাসালা ছবি হয়তো তিনি কম করছেন, কিন্তু যখনই তিনি কাজের সুযোগ পাচ্ছেন, তখনই তাঁর জাদুকরী স্পর্শের প্রমাণ দিচ্ছেন:
আদুজীবিতম (The Goat Life - ২০২৪): এই মালয়ালম মহাকাব্যিক ছবিতে রহমানের আবহসংগীত এবং 'ওমানে আকানালে' গানটি বিশ্বমানের স্তরে পৌঁছেছে।
অমর সিং চমকিলা (২০২৪): ইমতিয়াজ আলীর সাথে জুটিতে 'ইশক্ মিটে' বা 'বিদায়' গানগুলোর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন পাঞ্জাবি লোকসংগীতের প্রাণ কীভাবে ধরে রাখতে হয়।
ময়দান (২০২৪): 'রঙ্গা রাঙ্গা' বা ভারতীয় ফুটবলের গোল্ডেন এরা তুলে ধরতে তাঁর ব্যবহৃত অর্কেস্ট্রা ছিল অবিস্মরণীয়।
রহমান কোনো প্রতিযোগিতায় নেই। যখন কোনো পরিচালকের 'জাতীয় পুরস্কার', 'কালজয়ী ক্লাসিক' বা 'মহাকাব্যিক' কিছু বানানোর প্রয়োজন হয়, তখন তাঁরা রহমানের দুয়ারেই কড়া নাড়েন। কিন্তু যখন প্রয়োজন হয় 'বক্স অফিস ধামাকা' বা 'পার্টি ট্র্যাক', তখন ডাক পড়ে নতুনদের।
সময় শক্তিশালী, কিন্তু সুর অবিনশ্বর
এ আর রহমান সাক্ষাৎকারে যা বলেছেন, তা হয়তো বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা অভিমান ও আবেগের বশেই বলেছেন। দীর্ঘ তিন দশক ধরে একটি বিশাল দেশের সংগীতের একচ্ছত্র সম্রাট থাকার পর যখন সেই সিংহাসনের চারপাশের হাওয়া বদলে যায়, তখন যেকোনো শিল্পীর পক্ষেই তা মেনে নেওয়া কঠিন। লবিং বা গ্রুপিং বলিউডে যেমন সত্য, তেমনই সত্য সময়ের সাথে মানুষের রুচির পরিবর্তন।
তবে এ আর রহমানকে মনে রাখতে হবে তাঁর আসল লড়াই কোনো বলিউডি 'গ্যাং' বা 'লবিং গ্রুপ'-এর সাথে নয়। তাঁর লড়াই তাঁর নিজের তৈরি অলৌকিক লিগ্যাসির সাথে! 'রোজা', 'বোম্বে', 'দিল সে', 'তাল', 'লগান', 'স্বদেশ', 'রং দে বাসন্তী', 'গুরু' কিংবা 'রকস্টার'-এর মতো মিউজিক্যাল ডালি যিনি ভারতকে উপহার দিয়েছেন, তাঁর নতুন করে কাউকে কিছু প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।
বলিউড হয়তো সাময়িক ব্যবসার তাগিদে এ আর রহমানকে এড়িয়ে যাওয়ার ভুল করছে, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী আছে ‘ইনস্ট্যান্ট কফি’ যত দ্রুত শক্তি দেয়, তেমনই দ্রুত তার স্বাদ মিলিয়ে যায়। আর এ আর রহমানের সুর হলো 'পুরোনো ওয়াইন' যত দিন যাবে, এর মাদকতা ও সৌন্দর্য তত বাড়বে। ইন্ডাস্ট্রি আসে আর যায়, ভাইরাল গান হারিয়ে যায় ধূলিকণায়, কিন্তু এ আর রহমানের সুর অমর হয়ে থেকে যায় কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনে। সময় নিঃসন্দেহে শক্তিশালী, কিন্তু সত্যিকারের প্রতিভা অবিনশ্বর।























