১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প - বাংলার ইতিহাসে বৃহত্তম ভূমিকম্প ও যমুনার জন্মকথা

বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের বহু বিবরণ চোখে পড়ে। কিন্তু আজ থেকে আড়াইশত বছরেরও বেশি সময় আগে এই বাংলার মাটিতে যে এমন এক প্রলয়ঙ্করী ভূকম্পন আঘাত হেনেছিল, যা পুরো অঞ্চলের মানচিত্রকেই বদলে দিয়েছিল তা আধুনিক মানুষের কাছে প্রায় অজানা।

সালটি ছিল ১৭৬২, তারিখ ২ এপ্রিল। তৎকালীন বাংলায় বসন্তের শেষ বিকেলের এক নিস্তব্ধ সময়, ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ঠিক ৫টা। হঠাৎ করেই কেঁপে উঠেছিল পুরো চট্টগ্রাম, আরাকান ও সমগ্র বাংলা অঞ্চল। কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই মাটির গভীর থেকে শুরু হওয়া সেই কম্পন টানা ৪ মিনিট ধরে প্রলয়নৃত্য চালিয়েছিল।

রিখটার স্কেলে এর আনুমানিক মাত্রা ছিল ৮.৮। ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, এটি ছিল এযাবৎকালের রেকর্ডকৃত ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও বিধ্বংসী ভূমিকম্প, যা ভূতাত্ত্বিক পরিভাষায় '১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প' (Arakan Earthquake of 1762) নামে পরিচিত।

মাটির নিচ থেকে হঠাৎ তোপ বা কামানের গর্জনের মতো ১৫টি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে এসেছিল। সাধারণ মানুষ যখন ভয়ে দিশেহারা, তখন পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও অন্তত ১১ বার বড় ধরনের পরকম্পন (Aftershocks) অনুভূত হয়েছিল। এই এক একক ভূমিকম্প সমগ্র বাংলার নদীমালা, পর্বত ও উপকূলীয় ভূখণ্ডের অবয়ব চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্প ও এর ভূতাত্ত্বিক প্রকৃতি

১৭৬২ সালের এই ভূকম্পনটি সাধারণ কোনো ফল্টলাইনের সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল একটি মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্প (Megathrust Earthquake)। টেকটনিক প্লেইট বা ভূ-ত্বকের বিশাল দুটি স্ল্যাবের মধ্যকার প্রচণ্ড ঘর্ষণের ফলে যখন বছরের পর বছর জমা হওয়া বিপুল শক্তি একবারে মুক্ত হয়, তখন এ ধরনের ভূকম্পন ঘটে।

ইন্ডিয়ান প্লেট (Indian Plate) এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেটের (Burma Microplate) সংযোগস্থলে অবস্থানরত 'আরাকান সাবডাকশন জোন' জুড়েই এই মহাবিপর্যয়ের উৎপত্তি ঘটেছিল। ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, মিয়ানমারের রাখাইন (তৎকালীন আরাকান) উপকূল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সিলেট টেকটনিক বেল্ট পর্যন্ত প্রায় ৭০০ কিলোমিটার বিস্তৃত ফল্টলাইন একযোগে ফেটে গিয়েছিল।

এর ফলে যে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, তার কম্পন সমগ্র বাংলা, আসাম, বিহার থেকে শুরু করে বার্মার বহু গভীর অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর প্রভাবে উপকূলীয় ভূমির কোথাও কোথাও ১ থেকে ২ মিটার মাটি স্থায়ীভাবে ডেবে যায়, আবার অনেক স্থানে পানির নিচের ভূখণ্ড উঁচুতে উঠে নতুন চরের সৃষ্টি করে।

ভূখণ্ডের প্রলয়ঙ্করী রূপান্তর: নদ-নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও যমুনা নদীর জন্ম

এই ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড় ও দূরপ্রসারী ঐতিহাসিক প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থায়। এটি কেবল ঘরবাড়ি বা পাহাড় ভাঙেনি, বরং যুগের পর যুগ ধরে প্রবাহিত হয়ে আসা বড় বড় নদ-নদীর গতিপথ এক লহমায় বদলে দিয়েছিল।

ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন

হাজার বছর ধরে মূল ব্রহ্মপুত্র নদ ময়মনসিংহ ও নরসিংদীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীতে গিয়ে মিশত, যা 'পুরাতন ব্রহ্মপুত্র' নামে পরিচিত। ১৭৬২ সালের ভূকম্পনের প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে পুরো মধুপুর গড় ও পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ড টেকটনিকভাবে বেঁকে যায় এবং কাত হয়ে পড়ে।

তৎকালীন নদীগর্ভের তলদেশ এক ধাক্কায় উঁচুতে উঠে আসায় ব্রহ্মপুত্রের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। নদীটি তার হাজার বছরের পুরনো খাত ত্যাগ করে বাধ্য হয়ে পশ্চিম দিকে মোড় নেয়।

যমুনা নদীর জন্মকথা

ব্রহ্মপুত্র নদীর এই মোড় পরিবর্তনের ফলে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ নিচু অঞ্চল দিয়ে পানি প্রচণ্ড বেগে প্রবাহিত হতে শুরু করে। পুরনো একটি ছোট খালের ওপর দিয়ে বিশাল জলধারা বইতে শুরু করলে তৈরি হয় এক নতুন ও প্রমত্তা নদী যমুনা

আজ আমরা যে যমুনা নদীকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও বৃহৎ নদী হিসেবে জানি, তার জন্ম মূলত ১৭৬২ সালের এই মহাপ্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পেরই সরাসরি ফলাফল। একইসাথে পদ্মা ও মেঘনার সংযোগস্থল এবং অন্যান্য ছোট-বড় বেশ কয়েকটি শাখা নদীর প্রবাহেও রাতারাতি আমূল পরিবর্তন এসেছিল।

চট্টগ্রাম শহরে ধ্বংসলীলা: উপকূল, পাহাড় ও লোকালয়

ভূমিকম্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু (Epicenter) আরাকান ও চট্টগ্রাম উপকূলে হওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শহর ও এর আশেপাশের অঞ্চলে ধ্বংসের মাত্রা ছিল অকল্পনীয়।

তৎকালীন প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী:

"মাটির নিচ থেকে মনে হচ্ছিল হাজার হাজার কামান একসাথে দাগা হচ্ছে। চোখের সামনে চট্টগ্রাম শহরের ইটের ও মাটির তৈরি সমস্ত ঘরবাড়ি তাসের ঘরের মতো ভেঙে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল।"

চট্টগ্রাম শহরের অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়:

পাহাড় ফেটে চৌচির: চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী উঁচু পাহাড়গুলোর গায়ে বিশাল বিশাল ফাটল দেখা দেয় এবং অনেক পাহাড় ধসে পড়ে সমতলকে ঢেকে দেয়।

জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবন: ভূমিকম্পের আকস্মিক দোলায় কর্ণফুলী নদীর পানি ভয়াল রূপ ধারণ করে। প্রায় ১০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসের প্লাবন চট্টগ্রাম শহরের ওপর আছড়ে পড়ে। শহরের বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়।

পুকুর ও দিঘির বিলুপ্তি: মাটির তলার তরলীকরণ (Soil Liquefaction) প্রক্রিয়ার কারণে চট্টগ্রামের বড় বড় প্রাচীন দিঘি ও পুকুর এক রাতের মধ্যে দেবে গিয়ে এবং পাশের পলিমাটিতে ভরাট হয়ে সমতলভূমিতে পরিণত হয়।

বিশাল ভূ-ফাটল: চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে মাটি ফেটে ২০ থেকে ৩০ হাত (৩০-৪৫ ফুট) বিস্তৃত গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছিল। এসব ফাটল থেকে অনবরত কাদা, বালু ও বিষাক্ত গ্যাসের ধোঁয়া বের হতে দেখা গিয়েছিল।

উপকূলীয় অঞ্চলের ভয়াবহ চিত্র

কর্ণফুলীর ওপারে ধস: কর্ণফুলী নদীর উল্টোদিকে অবস্থিত একটি পুরো গ্রাম ভূমিকম্পের তাণ্ডবে মাটি দেবে গিয়ে প্রায় সাত হাত পানির নিচে সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়।

পাথরঘাটা থেকে হাওলা ধস: পাথরঘাটা থেকে হাওলা পর্যন্ত প্রায় ৮ মাইল দীর্ঘ ভৌগোলিক এলাকার ভূখণ্ডে বিশাল সব ফাটল তৈরি হয়ে তা নদী ও সমুদ্রের পানিতে চিরতরে নিমজ্জিত হয়ে যায়।

বাঁশবাড়িয়ার বিরল দৃশ্য: বাঁশবাড়িয়ার কাছে সমুদ্র উপকূলে মাটি ফেটে কুয়ার মতো গোল গোল অগভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল, যেখান থেকে অনবরত লবণাক্ত পানি ও কাদা মাটি ফিনকি দিয়ে উঠছিল।

সীতাকুণ্ডের কাদা আগ্নেয়গিরি ও চিরন্তন গ্যাসের শিখা

১৭৬২ সালের মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্পের শক্তির তীব্রতা কতটা গভীরে প্রবেশ করেছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায় সীতাকুণ্ড অঞ্চলে। ভূকম্পনের প্রচণ্ড চাপ এবং টেকটনিক প্লেইটের ঘর্ষণে সীতাকুণ্ড পাহাড়ের মাটির তলার প্রাকৃতিক গ্যাস ও ভূগর্ভস্থ পানির পকেটগুলো ফেটে যায়।

এর ফলে সীতাকুণ্ডে দুটি কাদা আগ্নেয়গিরি (Mud Volcano) থেকে হঠাৎ অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। মাটির গভীর থেকে কাদা, ছাই ও মেথেন গ্যাসের তীব্র প্রবাহ বাইরে বেরিয়ে আসে এবং তাতে প্রাকৃতিকভাবে আগুন ধরে যায়।

ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় ও তার আশেপাশে আজও যেসব প্রাকৃতিক গ্যাসের শিখা জ্বলতে দেখা যায় এবং মাটি থেকে গ্যাস নির্গত হয় তার পেছনে ১৭৬২ সালের সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পের গভীর ভূ-ফাটলের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। ভূগর্ভের সেই মেথেন পকেটের মুখ আজও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

বঙ্গোপসাগরের বুকে বিলীন হওয়া দ্বীপে মহাবিপর্যয়

১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্পের সবচেয়ে করুণ ও মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়টি ঘটেছিল কক্সবাজার ও রামুর উপকূলীয় এলাকায়।

কক্সবাজারের সন্নিকটে বঙ্গোপসাগরে বহু শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা একটি সমৃদ্ধ জনবহুল দ্বীপ ছিল। ভূকম্পনের ফলে পুরো দ্বীপটির নিচের টেকটনিক প্লেট একলহমায় বেশ কয়েক মিটার নিচে দেবে যায়। একইসাথে ভূকম্পনজনিত সুনামির বিশাল ঢেউ এসে দ্বীপটির ওপর আছড়ে পড়ে।

মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কয়েকশ মানুষ, তাঁদের শত শত বছরের পুরনো ভিটেমাটি, গবাদিপশু ও সহায়-সম্পদসহ গোটা দ্বীপটি বঙ্গোপসাগরের তলদেশে তলিয়ে যায়। সমুদ্রের পানি সেই দ্বীপকে এমনভাবে গিলে খেয়েছিল যে, পরবর্তীকালে কোনোদিন আর সেই দ্বীপ কিংবা তার বাসিন্দাদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি বাংলার ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর ও নীরবে ঘটে যাওয়া জলীয় সমাধি।

১৭৬২ সালের আরাকান ভূকম্পনের সারসংক্ষেপ

নিচে ১৭৬২ সালের এই প্রলয়ঙ্করী ভূকম্পন, এর ভূ-প্রাকৃতিক আঘাত এবং ক্ষয়ক্ষতির একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র উপস্থাপন করা হলো:

বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্র

১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্পের বিবরণ

সংগঠিত হওয়ার তারিখ ও সময়

২ এপ্রিল, ১৭৬২ (শুক্রবার), বিকেল ঠিক ৫:০০ টা।

কম্পনের স্থায়িত্ব

টানা ৪ মিনিট (পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও ১১টি প্রধান পরকম্পন)।

ভূমিকম্পের মাত্রা (Magnitude)

রিখটার স্কেলে আনুমানিক ৮.৮ (মেগাথ্রাস্ট ঘটনা)।

উৎপত্তিস্থল ও ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল

আরাকান (রাখাইন) ও চট্টগ্রাম উপকূল, সমগ্র বাংলা, আসাম ও মিয়ানমার।

শব্দ ও ধ্বনিগত উপসর্গ

মাটির নিচ থেকে তোপ বা কামানের গর্জনের মতো ১৫টি বিকট বিস্ফোরণ।

প্রধান ভৌগোলিক রূপান্তর

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন এবং যমুনা নদীর সৃষ্টি

উপকূলীয় ভূখণ্ড ও সুনামি

উপকূল ১-২ মিটার ধসে যাওয়া, কর্ণফুলীতে ১০ ফুট জলোচ্ছ্বাস।

বিশেষ ভূতাত্ত্বিক ঘটনা

সীতাকুণ্ডে কাদা আগ্নেয়গিরির (Mud Volcano) অগ্ন্যুৎপাত ও গ্যাস নির্গমন।

সবচেয়ে বড় বিপর্যয়

কক্সবাজারের কাছে কয়েকশ মানুষসহ একটি পুরো দ্বীপের সাগরে সলিল সমাধি।

নগর ক্ষয়ক্ষতি ও ফাটল

চট্টগ্রাম শহরের সমস্ত মাটির ও ইটের ঘরবাড়ি ধ্বংস, ২০-৩০ হাত ফাটল।

আনুমানিক প্রাণহানি

নথিপত্র অনুযায়ী কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার মানুষ (বহু গ্রাম নিমজ্জিত)।

আধুনিক ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এবং প্যালিসিওসমিওলজি (Paleoseismology)-র কল্যাণে আজ আমরা ১৭৬২ সালের এই ভূমিকম্পের এমন সব অজানা তথ্য উন্মোচন করতে পেরেছি, যা কেবল অতীতকে জানার জানালারাই খোলে না, বরং বর্তমান বাংলাদেশ ও সমগ্র বঙ্গীয় বদ্বীপের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

টেকটনিক প্লেট ও আরাকান মেগাথ্রাস্টের গভীরতম বৈজ্ঞানিক বিন্যাস

আজকের বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকা তিনটি সুবিশাল টেকটনিক প্লেটের অত্যন্ত জটিল ত্রিভুজাকার সংযোগস্থলে (Triple Junction) অবস্থিত:

ইন্ডিয়ান প্লেট (Indian Plate): যা উত্তর-পূর্ব দিকে বার্ষিক প্রায় ৪-৫ সেন্টিমিটার গতিতে ধাবিত হচ্ছে।

ইউরেশিয়ান প্লেট (Eurasian Plate): যা উত্তরে বিশাল শিলাস্তম্ভ হিসেবে স্থির দাঁড়িয়ে আছে।

বার্মা মাইক্রোপ্লেট (Burma Microplate): যা ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান প্লেটের মাঝে অবস্থান করে একটি সক্রিয় সাবডাকশন জোন গঠন করেছে।

১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল বিকেল ৫টায় এই আরাকান সাবডাকশন জোন (Arakan Subduction Zone)-এর দীর্ঘদিনের আটকে থাকা 'লকড সেগমেন্ট' (Locked Segment) এক মুহূর্তের বিস্ফোরণে ভেঙে পড়ে। ভূ-বিজ্ঞানীদের গাণিতিক মডেল অনুযায়ী, সেদিন মাটির ১৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার গভীরে শিলাস্তরের মধ্যকার স্থানচ্যুতি বা স্লিপ (Slip) ঘটেছিল প্রায় ১০ থেকে ১৪ মিটার

এক ধাক্কায় এতটা শিলাখণ্ড সরে যাওয়ার কারণে নির্গত শক্তির পরিমাণ ছিল কয়েকশো পারমাণবিক বোমার সম্মিলিত বিস্ফোরণের চেয়েও বেশি। এটি মূলত ছিল ২০০৪ সালের সুমাত্রা-আন্দামান ভূমিকম্প কিংবা ২০১১ সালের জাপানের তোহুকু ভূমিকম্পের মতোই একটি ভয়াল মেগাথ্রাস্ট ইভেন্ট।

ঐতিহাসিক দলিলপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রাথমিক বিবরণী (১৮ শতকের নথি)

১৭৬২ সালের ভূমিকম্পের তথ্য কেবল লোকমুখে বেঁচে থাকেনি; তৎকালীন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং রয়্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে এটি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল।

হ্যারি ভেরেলস্ট (Harry Verelst)-এর সরকারি চিঠিপত্র

তৎকালীন চট্টগ্রামের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিফ অব কাউন্সিল ছিলেন হ্যারি ভেরেলস্ট (যিনি পরবর্তীতে বাংলার গভর্নর হন)। তিনি ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিলের ঘটনার মাত্র কয়েক দিন পর ফোর্ট উইলিয়ামে তৎকালীন গভর্নর হেনরি ভ্যানসিটার্ট (Henry Vansittart)-এর কাছে একটি বিস্তারিত প্রশাসনিক রিপোর্ট পাঠান।

হ্যারি ভেরেলস্টের সরকারি রিপোর্টে লেখা ছিল:

"বিকেল ৫টায় হঠাত্ করে পৃথিবী এমনভাবে দুলতে শুরু করল যে মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ৪ মিনিট ধরে চলা এই কম্পনের সঙ্গে মাটির নিচ থেকে বিকট শব্দ আসছিল, যা মনে হচ্ছিল অনেকগুলো তোপ বা ক্যানন একসাথে দাগা হচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরের সমস্ত ইটের কোঠা সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশে গেছে। সমুদ্র ও নদীর পানি প্লাবিত হয়ে উপকূলে আছড়ে পড়েছে। হাওলার দিকে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড দেবে গিয়ে অগণিত মানুষের সলিল সমাধি ঘটেছে।"

রয়্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের 'ফিলোসফিক্যাল ট্রানজ্যাকশনস' (১৭৬৩)

১৭৬৩ সালে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল সোসাইটির বিখ্যাত সাময়িকী 'Philosophical Transactions of the Royal Society of London' (Vol. 53)-এ এই ভূমিকম্পের ওপর কয়েকটি সংগৃহীত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

এর মধ্যে রেভারেন্ড গ্যাভিন হ্যামিল্টন (Rev. Gavin Hamilton) এবং অন্যান্য ইংরেজ ব্যবসায়ীদের পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে, কম্পনটি ঢাকা, ক্যালকাটা (কলকাতা), আসাম, জলপাইগুড়ি এবং এমনকি বার্মার আভা (Ava) শহর পর্যন্ত অত্যন্ত তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল। তৎকালীন নথিতে স্পষ্ট বলা হয়, গেদে ও বাকল্যান্ড নদীর পাড় দেবে গিয়ে বিশাল জলাভূমির সৃষ্টি হয়েছে।

তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নথিপত্র, এশিয়াটিক সোসাইটির সাময়িকী এবং ব্রিটিশ মানচিত্রবিদদের বিবরণীতে এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

মেজর জেমস রেনেল-এর মানচিত্র ও বর্ণনা

বাংলার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক মানচিত্রবিদ মেজর জেমস রেনেল (James Rennell) ১৭৬৪ থেকে ১৭৭৭ সালের মধ্যে সমগ্র বাংলা জরিপ করেন। তিনি ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পের আগের এবং পরের নদীর গতিপথের স্পষ্ট ব্যবধান লক্ষ্য করেছিলেন। রেনেল তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেন যে, ব্রহ্মপুত্রের মূল স্রোত আকস্মিকভাবে পশ্চিমে সরে গিয়ে এক বিশাল নতুন নদীখাত তৈরি করেছে, যা তৎকালীন স্থানীয়রা 'যমুনা' নামে ডাকতে শুরু করেছিল।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিঠিপত্র

তৎকালীন ফোর্ট উইলিয়ামে (কলকাতা) চট্টগ্রাম থেকে পাঠানো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক চিঠিতে লেখা হয়েছিল:

"চট্টগ্রামে এমন কোনো ইটের বা কাঁচা ঘর অবশিষ্ট নেই যা ভেঙে পড়েনি। সমুদ্রের পানি ও নদীর জলোচ্ছ্বাসে সমগ্র শহর ভেসে গেছে। বহু স্থানে ভূখণ্ড ফেটে গিয়ে কালো কাদা ও গন্ধকযুক্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে।"

ভৌগোলিক রূপান্তরের সুদূরপ্রসারী মানচিত্র: সেন্ট মার্টিন, রাখাইন ও সিলেট

১৭৬২ সালের এই ভূমিকম্প কেবল একটি শহরের ক্ষতি করেই ক্ষান্ত হয়নি, এটি পুরো উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরীয় উপকূলের ভূসংস্থান (Topography) বদলে দিয়েছিল।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জন্ম ও কাইনেম্যাটিক উত্থান (Coseismic Uplift)

আমাদের বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন (St. Martin's Island)-এর বর্তমান অস্তিত্বের পেছনে ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৭৬২ সালের আগে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের প্রধান শিলাস্তর ও প্রবাল প্রাচীর সমুদ্রপৃষ্ঠের বেশ নিচে নিমজ্জিত ছিল।

ভূমিকম্পের তীব্র ধাক্কায় সাবডাকশন জোনের ইলাস্টিক রিকয়েল (Elastic Rebound)-এর কারণে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ভূখণ্ড এক ধাক্কায় ৩ থেকে ৪ মিটার (১০-১৩ ফুট) উঁচুতে উঠে আসে। আধুনিক সিসমোলজিস্টরা সেন্ট মার্টিনের প্রাচীন প্রবাল শিলার (Fossil Coral) কার্বন ডেটিং পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, এর উল্লেখযোগ্য অংশ ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পের সময়ই পানির ওপর স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত হয়েছিল।

রাখাইনের 'ফাউল দ্বীপ' বা নানথাকিউন (Nanthakyun)

মিয়ানমারের রাখাইন উপকূলে অবস্থিত নানথাকিউন বা প্রাচীন 'ফাউল আইল্যান্ড'-এ এই ভূমিকম্পের প্রভাব ছিল আরও চরম। গবেষণায় দেখা গেছে, সেই দ্বীপে মাটির তলদেশ প্রায় ৯ মিটার (৩০ ফুট) পর্যন্ত স্থায়ীভাবে উঁচুতে উঠে গিয়েছিল, যা বিশ্ব ইতিহাসে যেকোনো ভূকম্পনে ভূখণ্ড উঁচুতে উঠে যাওয়ার অন্যতম সর্বোচ্চ রেকর্ড।

সিলেটের হাওর অববাহিকার গভীরতা বৃদ্ধি

দক্ষিণে যখন ভূখণ্ড উঁচুতে উঠছিল, উত্তর-পূর্বে ঠিক তার বিপরীত প্রক্রিয়া ঘটছিল। সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ছাতকের নিচু ভূখণ্ড টেকটনিক ধসের কারণে কয়েক মিটার নিচে দেবে যায়

এর ফলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি ছড়িয়ে পড়ে বিশাল জলাভূমির সৃষ্টি করে, যা আজকের সুনামগঞ্জের বিস্তৃত হাওর অববাহিকাকে আরও গভীর ও স্থায়ী জলাভূমিতে পরিণত করে।

ঢাকা, কলকাতা ও সুন্দরবনে ভূকম্পনের তাণ্ডব

চট্টগ্রাম ও আরাকান ছিল এই ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের মূল ক্ষেত্র হলেও, এর উৎপাদিত ভূ-কম্পন তরঙ্গ (Seismic Waves) সমগ্র গাঙ্গেয় বদ্বীপজুড়ে তীব্র তাণ্ডব চালিয়েছিল।

ঢাকায় বুড়িগঙ্গার লাফিয়ে ওঠা পানি ও লালবাগ কেল্লা

১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল বিকেলে ঢাকায় যখন ভূকম্পন আঘাত হানে, তখন শহরের প্রাচীন বুড়িগঙ্গা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে ৫ থেকে ৬ ফুট উঁচুতে লাফিয়ে উঠে শহরের নদী তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত করে।

ঢাকার তৎকালীন ইটের তৈরি ঐতিহ্যবাহী ভবন, বিশেষ করে লালবাগ কেল্লার প্রাকার ও আশপাশের সুফিয়ানা কাটরা এবং মসজিদের দেয়ালে গভীর ফাটল দেখা দেয়। বুড়িগঙ্গার তীরে নদীর তলদেশ থেকে কাদা ও কালো রঙের সালফার যুক্ত পানি বের হতে দেখা গিয়েছিল।

কলকাতা ও সুন্দরবনে সুনামি ও কাদা নিঃসরণ

কলকাতা শহরেও ভূমিকম্পটির প্রভাব ছিল ভয়াবহ। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের বিশালাকার ইটের প্রাচীরে ফাটল দেখা দেয়। পার্ক স্ট্রিট ও চৌরঙ্গী এলাকায় মাটির ফাটল থেকে অনবরত ঘোলা পানি ও কাদা নির্গত হতে শুরু করে, যাকে ভূতাত্ত্বিক পরিভাষায় 'সয়েল লিকুইফ্যাকশন' (Soil Liquefaction) বলা হয়।

একই সময়ে সুন্দরবন উপকূল এবং গঙ্গাসাগর দ্বীপে প্রায় ৪ থেকে ৫ ফুট উঁচু সুনামি বা প্রলয়ঙ্করী ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, যার ফলে বহু মাছ ধরার নৌকো ভেসে যায় এবং উপকূলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

মেগা-সুনামি (Paleotsunami) ও বঙ্গোপসাগরের তাণ্ডব

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করা হতো যে বঙ্গোপসাগরের কেবল সুমাত্রা অংশে বড় ভূমিকম্প হলেই সুনামি তৈরি সম্ভব। কিন্তু ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প প্রমাণ করে যে, টেকনাফ-আরাকান উপকূলের সাবডাকশন জোন থেকেও প্রলয়ঙ্করী সুনামি উৎপন্ন হতে পারে।

মাটির নিচে শিলাস্তরের ১০ থেকে ১৪ মিটারের এই আকস্মিক উল্লম্ব স্থানান্তরের (Vertical Displacement) ফলে সমুদ্রের কোটি কোটি টন পানি এক নিমেষে উঁচুতে উঠে যায়। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে ৩ থেকে ৬ মিটার (১০ থেকে ২০ ফুট) উঁচু সুনামি ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়।

এই সুনামি তরঙ্গের প্রভাবেই কক্সবাজারের নিকটের সেই জনবহুল দ্বীপটি সমুদ্রের নিচে চিরতরে বিলীন হয়ে গিয়েছিল এবং চট্টগ্রাম শহরের কর্ণফুলী নদীতে ১০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছিল।

১৭৬২ ভূ-কম্পন সম্পর্কিত ভূতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক উপাত্তের সারসংক্ষেপ

নিচে ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প সংক্রান্ত আধুনিক ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, ঐতিহাসিক দলিল এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট উপাত্তের একমাত্র সারণী উপস্থাপন করা হলো:

অনুসন্ধানের ক্ষেত্র

সুনির্দিষ্ট তথ্য ও বৈজ্ঞানিক উপাত্ত

ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক শ্রেণি

মেগাথ্রাস্ট ইভেন্ট (Megathrust Event / Subduction Zone Rupture)।

প্রধান ফল্টলাইন

আরাকান সাবডাকশন জোন (ইন্ডিয়ান ও বার্মা মাইক্রোপ্লেটের সীমানা)।

ফাটার পরিধি (Rupture Length)

প্রায় ৭০০ কিলোমিটার (মিয়ানমারের চেদুবা দ্বীপ হতে বাংলাদেশ পর্যন্ত)।

ভূগর্ভস্থ স্থানচ্যুতি (Fault Slip)

১০ থেকে ১৪ মিটার পর্যন্ত শিলাস্তরের সরণ।

কো-সাইসমিক উত্থান (Uplift)

সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ৩-৪ মিটার; রাখাইনের ফাউল দ্বীপে ৯ মিটার উত্থান।

কো-সাইসমিক অবদমন (Subsidence)

সিলেট-সুনামগঞ্জ হাওর অববাহিকায় ভূখণ্ড ৩-৪ মিটার দেবে যাওয়া।

সুনামি তরঙ্গের উচ্চতা

উত্তর বঙ্গোপসাগর ও চট্টগ্রাম উপকূলে ৩ থেকে ৬ মিটার (১০-২০ ফুট)।

নদীর প্রধান পরিবর্তন

প্রাচীন ব্রহ্মপুত্রের পথ পরিবর্তন ও প্রমত্তা যমুনা নদীর সৃষ্টি

ঐতিহাসিক প্রাথমিক দলিল

Philosophical Transactions of the Royal Society (1763) ও হ্যারি ভেরেলস্টের চিঠি।

লিকুইফ্যাকশন উপসর্গ

সীতাকুণ্ডে কাদা আগ্নেয়গিরি চালু হওয়া, সর্বত্র মাটির ফাটল থেকে পানি নিঃসরণ।

আধুনিক প্যালিসিওসমিওলজি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা

গত দুই দশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'আর্থ অবজারভেটরি' (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রয়াত অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের নেতৃত্বে) এবং যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-ডোহার্টি আর্থ অবজারভেটরি (Lamont-Doherty Earth Observatory) যৌথভাবে বাংলাদেশে একটি আধুনিক জিপিএস (GPS) নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে।

জিপিএস নেটওয়ার্কের চাঞ্চল্যকর তথ্য

বার্ষিক স্ট্রেইন অ্যাকুমুলেশন: জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম থেকে দেখা গেছে, বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত এবং আরাকান অঞ্চলে প্রতি বছর ১৩ থেকে ১৭ মিলিমিটার হারে নতুন টেকটনিক শক্তি জমা হচ্ছে।

লকড প্লেট সীমানা (Locked Boundary): ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পের পর থেকে গত ২৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ফল্টলাইনের উত্তর অংশটি 'লক' হয়ে আছে। অর্থাৎ মাটির নিচে জমে থাকা সেই বিপুল শক্তি রিলিজ বা মুক্ত হওয়ার কোনো পথ পায়নি।

ভবিষ্যতের বিপর্যয় সম্ভাবনা: ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, এই অঞ্চলটিতে বর্তমানে যে পরিমাণ শক্তি জমা হয়ে আছে, তা মুক্ত হলে ভবিষ্যতে আবারো ৮.২ থেকে ৮.৮ মাত্রার একটি প্রলয়ঙ্করী মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্প ঘটাতে সক্ষম।

'লকড সাবডাকশন জোন': আধুনিক বাংলাদেশের কৌশলগত ঝুঁকি

আজকের বাংলাদেশ ১৭৬২ সালের বাংলার মতো কোনো গ্রামীণ জনপদ নয়। আজ বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ এবং রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মেগাসিটি। ১৭৬২ সালের ভূ-বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠ আমাদের দেখায় যে, আগামীতে এ ধরনের ভূমিকম্প হলে তার প্রভাব কেমন হতে পারে:

ভয়াবহ সয়েল লিকুইফ্যাকশন (Soil Liquefaction): ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাশয় বা নিচু জমি বালু দিয়ে ভরাট করে নির্মিত হয়েছে। ৮.৫ বা তার বেশি মাত্রার ভূকম্পনে মাটি তার শক্তিমত্তা হারিয়ে পানির মতো তরল আচরণ শুরু করবে। এর ফলে বহুতল ভবনগুলো অক্ষত থেকেও একপাশে দেবে যাবে বা হেলে পড়বে।

মেঘনা ও পদ্মার অববাহিকায় জলীয় প্লাবন: ১৭৬২ সালে যেমন ব্রহ্মপুত্র নদ তার হাজার বছরের খাত বদলে ফেলেছিল, আধুনিক সময়ে একই ধরনের ভূকম্পন ঘটলে পদ্মা, মেঘনা বা যমুনার গতিপথে নতুন পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে নদী তীরবর্তী নতুন নতুন লোকালয় প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

উপকূলীয় মেগা স্ট্রাকচারের সুরক্ষা: কক্সবাজার, মহেশখালী ও মাতারবাড়িতে গড়ে ওঠা বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর ও এলএনজি টার্মিনালগুলোর নকশায় ১৭৬২ সালের সম্ভাব্য প্রলয়ঙ্করী সুনামি এবং কো-সাইসমিক আফলিফট/সাবসিডেন্সের ঝুঁকিকে শতভাগ বিবেচনায় রাখা অত্যাবশ্যক।

আজকের বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

১৭৬২ সালের এই মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্প কেবল অতীতের ইতিহাস নয়, এটি আধুনিক বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য একটি বিরাট সতর্কবার্তা।

ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, আরাকান সাবডাকশন জোন এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের ডাউকি ফল্টলাইনে (Dauki Fault) প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ বছর পর পর বড় ধরনের মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্প পুনরাবৃত্ত হওয়ার একটি প্রাকৃতিক চক্র (Recurrence Interval) থাকে।

আধুনিক বাংলাদেশের জন্য মূল ঝুঁকিগুলো

জমানো টেকটনিক স্ট্রেস (Accumulated Energy): গত আড়াইশত বছরে আরাকান সাবডাকশন জোনে আর কোনো ৮.৫ বা তারচেয়ে বড় মাপের ভূমিকম্প হয়নি। এর অর্থ হলো, মাটির গভীরে গত ২৬০ বছর ধরে বিপুল পরিমাণ টেকটনিক চাপ বা শক্তি জমা হয়ে রয়েছে।

নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত ইমারত: ১৭৬২ সালে চট্টগ্রাম ছিল একটি ছোট উপকূলীয় শহর। কিন্তু আজ চট্টগ্রাম ও ঢাকা মিলিয়ে কোটি কোটি মানুষের বসবাস। অনিয়ন্ত্রিত বহুতল ভবন, জলাশয় ভরাট করে আবাসন এবং নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে আজ ৮.০ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১৭৬২ সালকেও বহু গুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

উপকূলীয় অবকাঠামো ও সুনামি ঝুঁকি: বর্তমানে কক্সবাজার, মহেশখালী ও মাতারবাড়ি অঞ্চলে গড়ে উঠেছে দেশের বড় বড় মেগা প্রজেক্ট (যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর)। ১৭৬২ সালের মতো আবার যদি সমুদ্রে ভূখণ্ড ধসে পড়ে বা সুনামি সৃষ্টি হয়, তবে জাতীয় অর্থনীতি চরম হুমকির মুখে পড়বে।

ইতিহাসের শিক্ষা ও প্রকৃতির সতর্কবার্তা

১৭৬২ সালের ২ এপ্রিলের সেই ৪ মিনিট ছিল বাংলার ভূপ্রকৃতির ইতিহাসে এক রূপান্তরের ক্ষণ। এক নিমেষে মাটির নিচে বিলীন হয়ে যাওয়া কক্সবাজারের সেই দ্বীপ, সীতাকুণ্ডের আগুনে আগ্নেয়গিরি, চট্টগ্রাম শহরের ধসে যাওয়া পাহাড়, আর প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্রের দিক বদলে যমুনার জন্ম সবই আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির অপার ও অনিয়ন্ত্রণযোগ্য ক্ষমতার কথা।

ইতিহাস আমাদের অতীতকে জানার সুযোগ দেয় কেবল কৌতুহল মেটানোর জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নিতে। ১৭৬২ সালের সেই বিস্মৃত ভূকম্পন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সক্রিয় টেকটনিক জোনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

প্রাকৃতিক দূরদর্শিতা, কঠোর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা (Building Code) অনুসরণ এবং দ্রুত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা অর্জন করাই হতে পারে এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের রক্ষা করার একমাত্র পথ।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.