বাগেরহাট - দক্ষিণবঙ্গের প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময় ও এক হারানো শহরের আখ্যান

বিশ্বখ্যাত আমেরিকার ফোর্বস (Forbes) ম্যাগাজিন যখন পৃথিবীর সেরা ১৫টি হারিয়ে যাওয়া শহরের ("15 Lost Cities of the World") একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল, তখন বিশ্ববাসী চমত্কৃত হয়েছিল। কারণ, সেই তালিকায় পেরুর মাচু পিচু, মেক্সিকোর ইৎজা, মিসরের মেম্ফিস, মেসোপটেমিয়ার বেবিলন, ইতালির পম্পেই কিংবা ট্রয়ের মতো প্রাচীন কিংবদন্তীতুল্য নগরীগুলোর পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার একটি অনবদ্য ঐতিহাসিক শহর ‘মসজিদের শহর বাগেরহাট’

বাগেরহাটের নামটি যখন বিশ্বমঞ্চে এই প্রাচীন নগরীগুলোর পাশে উচ্চারিত হয়, তখন অনেকের মনেই বিস্ময় জাগা স্বাভাবিক। পম্পেই বা বেবিলনের মতো বাগেরহাট তো কেবল এক প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষের প্রদর্শনী ক্ষেত্র নয়; এটি আজও এক প্রাণবন্ত, জনবহুল ও কর্মমুখর জনপদ। তালিকার অন্যান্য প্রাচীন শহরের সাথে বাগেরহাটের মৌলিক পার্থক্য ঠিক এখানেই। পৃথিবীর অধিকাংশ প্রাচীন হারিয়ে যাওয়া শহর তাদের প্রাচীন ঐতিহ্য উন্মোচনের পর উন্মুক্ত জাদুঘর বা পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাগেরহাট এমন এক বিরল স্থান, যা তার ছয় শতক আগের প্রাচীন স্থাপত্যের সাথে আধুনিক জীবনযাত্রার এক অপরূপ মেলবন্ধন ঘটিয়ে চলেছে।

প্রখ্যাত পর্যটন বিশেষজ্ঞ টিম স্টিল (Tim Steel) বাংলাদেশের এই প্রাচীন ও হারিয়ে যাওয়া নগরীগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন:

“বাংলাদেশের মাটি থেকে ধীরে ধীরে বেশ কিছু হারিয়ে যাওয়া, অনন্য, সম্ভাব্য তাৎপর্যপূর্ণ শহর বেরিয়ে আসছে: ওয়ারী বটেশ্বর, ভিটাগড় এবং এগারোসিন্দুর যাদের মধ্যে সবচেয়ে কম অনুমিত। তবে এদের কোনোটিই, এখন পর্যন্ত, বাগেরহাটের সমপর্যায়ের সমৃদ্ধ ইতিহাসের বাস্তব প্রমাণ দিতে পারেনি। অথচ আবারো, আজ যে বাগেরহাট আমরা দেখি সেটির দৃশ্যমান ইতিহাসও কিন্তু মাত্র ছয় শতকের, যেখানে অন্যান্য স্থানের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, এবং আরো পুরনো ইতিহাসও হয়তো বের হওয়া বাকি। তারপরও সেগুলোর পক্ষে নিশ্চিতভাবেই কখনো এই সুন্দর, প্রাচীন, এবং আধুনিক মসজিদের শহরের মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য ও বাস্তব আবেদন সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না।”

ইউনেস্কো (UNESCO)-র বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের তথ্যমতে, তৎকালীন ‘খলিফাতাবাদ’ নামে পরিচিত প্রায় ৫০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই প্রত্ননগরীতে ছড়িয়ে ছিল ৩৬০টি মসজিদ, প্রশাসনিক ভবন, সমাধিস্তম্ভ, সেতু, ইটের তৈরি রাস্তা এবং অজস্র সুপেয় পানির দীঘি। এর মধ্যে অন্তত ৫০টি ঐতিহাসিক স্থাপত্য আজ অব্দি দৃশ্যমান রয়ে গেছে, যা বঙ্গীয়-সুলতানি ঘরানার ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীর এক মহিমান্বিত উদাহরণ। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো কেবল ষাট গম্বুজ মসজিদকে নয়, বরং খান জাহান আলী (র.) কর্তৃক নির্মিত পুরো খলিফাতাবাদ শহরটিকেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ঐতিহ্যের (World Heritage Site) তালিকাভুক্ত করে।

‘বাগেরহাট’ নামকরণের ইতিহাস ও লোকগাথা

‘বাগেরহাট’ নামটি কীভাবে আসলো, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ, ভাষাবিদ ও স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে নানা মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। এই নামকরণের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান তত্ত্ব কাজ করে:

বাঘের উপদ্রব তত্ত্ব: একটি প্রাচীন প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, বাগেরহাট অঞ্চলটি বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে এবং সুন্দরবনের একদম সীমানায় অবস্থিত হওয়ার কারণে অতীতে এখানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের চরম উপদ্রব ছিল। স্থানীয় মানুষজন হিংস্র বাঘের ভয়ে সংঙ্কিত থাকতো। ধারণা করা হয়, বাঘের বিচরণক্ষেত্র হিসেবে এই এলাকাটি প্রথমে ‘বাঘেরহাট’ নামে পরিচিতি পায়, যা কালক্রমে মুখের ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে ‘বাগেরহাট’-এ পরিণত হয়েছে।

বাগান বা ‘বাগ’ তত্ত্ব: দ্বিতীয় মতবাদটি জড়িয়ে আছে হযরত খান জাহান আলী (র.)-এর ঐতিহাসিক অবদানের সাথে। তিনি যখন এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও সমৃদ্ধ নগর গড়ে তুলতে আসেন, তখন চারপাশে অজস্র ফলমূল ও ফুলের বাগান বা ‘বাগ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ফারসি ভাষায় ‘বাগ’ শব্দের অর্থ বাগান। এই ‘বাগ’ বা বাগানের প্রাচুর্যের কারণে খলিফাতাবাদ অঞ্চলটিকে অনেকে বলতেন ‘বাগের আবাদ’। এই ‘বাগের আবাদ’ শব্দটি থেকেই পরবর্তীকালে ‘বাগেরহাট’ নামের উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন।

ভৈরব নদীর ‘বাঁকেরহাট’ তত্ত্ব (সর্বজনগ্রাহ্য): নামকরণের ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদদের কাছে সবচেয়ে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি পাওয়া যায় স্থানীয় ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণে। বাগেরহাট শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ভৈরব নদী। নদীটি শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় উত্তর দিকের হাড়িখালী থেকে বর্তমান নাগের বাজার পর্যন্ত একটি দীর্ঘ ও বিশাল ‘বাঁক’ বা মোড় তৈরি করেছে। প্রাচীনকালে ভৈরব নদীর এই সুবিশাল বাঁকের মাথায় একটি বিখ্যাত ও জমজমাট হাট বসতো। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হাটের নাম হয়ে যায় ‘বাঁকেরহাট’। কালক্রমে আঞ্চলিক উচ্চারণের বিবর্তনে এই ‘বাঁকেরহাট’ শব্দটিই আজকের ‘বাগেরহাট’ রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।

হযরত খান জাহান আলী (র.) ও খলিফাতাবাদের গোড়াপত্তন

বাগেরহাটের প্রকৃত স্বর্ণযুগ ও নগর জীবন শুরু হয়েছিল ১৫ শতকের মহান দরবেশ, বীর যোদ্ধা ও অসাধারণ স্থপতি হযরত খান জাহান আলী (র.)-এর হাত ধরে।

প্রারম্ভিক জীবন ও বঙ্গ অভিমুখে যাত্রা

তুর্কি বংশোদ্ভূত হযরত খান জাহান আলী (র.) ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষগণ মধ্য এশিয়া থেকে দিল্লিতে এসেছিলেন। ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লির সুলতানি সেনাবাহিনীতে একজন সামরিক কর্মকর্তা বা সেনাপতি হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু রাজ্য জয়ের মোহ ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইসলাম প্রচারের মহান ব্রত নিয়ে তিনি দিল্লির দরবার ত্যাগ করেন।

ঠিক কবে নাগাদ তিনি দক্ষিণবঙ্গে পদার্পণ করেছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে সামান্য মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে, ১৫ শতকের প্রথমার্ধে (সম্ভবত সুলতান জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ শাহের রাজত্বকালে) তিনি বঙ্গ অঞ্চলে আসেন। তাঁর বঙ্গ অভিযানের দুটি মূল উদ্দেশ্য ছিল:

  1. তৌহিদ ও ইসলামের সাম্যের বার্তা প্রচার করা।

  2. মানবকল্যাণমূলক স্থাপত্য ও সুন্দরবনের পাদদেশে স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা।

দক্ষিণবঙ্গে প্রবেশের ঐতিহাসিক পথপরিক্রমা

খান জাহান আলী (র.) তাঁর সফরসঙ্গী ও প্রশিক্ষিত বাহিনীকে নিয়ে এক দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে জলপথই ছিল চলাচলের প্রধান মাধ্যম। তিনি গৌড় থেকে যাত্রা শুরু করে নদীপথে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের নিকটবর্তী ভৈরব নদীতে পৌঁছান। সেখান থেকে চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ অতিক্রম করে যশোরের ইতিহাসখ্যাত বারোবাজারে আসেন।

বারোবাজারে তিনি ১১ জন প্রধান আউলিয়াকে নিয়ে কিছুদিন অবস্থান করেন এবং সেখানে বেশ কিছু মসজিদ ও দীঘি খনন করেন। এখান থেকেই তাঁর দক্ষিণবঙ্গ জয়ের মূল কার্যক্রম বিস্তৃত হয়।

বারোবাজার থেকে তিনি যশোর শহরের কাছে মুরলীতে আসেন। মুরলীতে এসে তাঁর বিশাল বাহিনীকে তিনি দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেন:

প্রথম দল: একটি দল দক্ষিণ অভিমুখে কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীর ধরে সুন্দরবনের গভীরে অগ্রসর হয়।

দ্বিতীয় দল (মূল বাহিনী): এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং খান জাহান আলী (র.)। তাঁরা পূর্ব-দক্ষিণ দিক বরাবর ভৈরব নদীর কোল ঘেঁষে অগ্রসর হয়ে পায়গ্রাম কসবায় পৌঁছান।

পায়গ্রাম কসবায় কিছুদিন অবস্থান করে শেষপর্যন্ত তিনি ভৈরবের তীরে সুন্দরঘোনা নামক স্থানে উপনীত হন। সুন্দরঘোনা ও এর চারপাশের নিবিড় বনাঞ্চল সাফ করে তিনি এক নতুন প্রশাসনিক ও আত্মআধ্যাত্মিক নগরীর গোড়াপত্তন করেন, যার নামকরণ করা হয় ‘খলিফাতাবাদ’

জঙ্গল সাফ ও মানবকল্যাণ

খান জাহান আলী (র.) যখন খলিফাতাবাদে আসেন, তখন পুরো এলাকাটি ছিল দুর্গম জঙ্গল, হিংস্র জীবজন্তুর অভয়ারণ্য এবং লোনা পানির জলাভূমি। তিনি স্থানীয় মানুষকে সাথে নিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করেন, কৃষিকাজের সুব্যবস্থা করেন এবং মিষ্টি পানির মারাত্মক সংকট দূর করতে শত শত সুবিশাল দীঘি খনন করেন। খলিফাতাবাদ কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত রাজ্য ছিল না; বরং এটি ছিল সুফি সাধকের মানবকল্যাণ, প্রজাভাবনা ও নৈতিক নেতৃত্বের এক অনুপম দৃষ্টান্ত।

স্থাপত্যের মহোৎসব: ষাট গম্বুজ মসজিদ ও তার গোপন স্থাপত্যকৌশল

খান জাহান আলী (র.) প্রথম যেখানে তাঁর সামরিক ছাউনি ও প্রশাসনিক দফতর স্থাপন করেছিলেন, সেই স্থানটির নাম দেওয়া হয়েছিল বারাকপুর। এখানেই তিনি মিষ্টি পানির অভাব দূর করতে তাঁর প্রথম ঐতিহাসিক দীঘি খনন করেন, যা ‘ঘোড়া দীঘি’ নামে পরিচিত। জনশ্রুতি আছে, খান জাহান আলী (র.) একটি দ্রুতগামী ঘোড়াকে দৌড়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন; ঘোড়াটি একটানা যতটুকু পথ দৌড়ে গিয়েছিল, ততটুকু দৈর্ঘ্যজুড়ে এই দীঘি খনন করা হয়। প্রাচীন পরিমাপে এই দীঘির আয়তন ছিল প্রায় ১,০০০ × ৬০০ হাত।

এই ঘোড়া দীঘির পূর্ব পাড়েই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বাংলার সুলতানি স্থাপত্যের মুকুটমণি- ষাট গম্বুজ মসজিদ

স্থাপত্যকৌশল ও অনন্য বৈশিষ্ট্য

ষাট গম্বুজ মসজিদটি কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় ছিল না, বরং আবহাওয়া ও স্থায়িত্ব বিবেচনা করে নির্মিত এক প্রকৌশলগত বিস্ময়:

আয়তন ও দেয়াল: মসজিদটি দৈর্ঘ্যে ১৬৮ ফুট এবং প্রস্থে ১০৮ ফুট। এর দেয়ালগুলো প্রায় ৮ ফুট পুরু, যা ইট ও চুন-সুরকির এক অসামান্য সংমিশ্রণ। এই পুরু দেয়াল চরম তাপদাহে মসজিদের ভেতরের পরিবেশকে শীতল রাখত।

খিলান ও প্রবেশপথ: আলো-বাতাস চলাচলের জন্য মসজিদের পূর্ব দেয়ালে ১১টি বিশাল খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে (মাঝেরটি সবচেয়ে বড়)। এছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ৭টি করে খিলান পথ রয়েছে।

ভেতরের ধারণক্ষমতা: মসজিদের অভ্যন্তরে ৭টি সারিতে মোট ২১টি কাতার রয়েছে, যেখানে একসাথে প্রায় তিন হাজার মুমিন বান্দা নামাজ আদায় করতে পারেন। মহিলাদের জন্য মসজিদের ভেতরে আলাদা সংরক্ষিত স্থান বা গ্যালারি ছিল।

রোসন কোঠা ও আঁধার কোঠা: মসজিদের চার কোণায় চারটি সুউচ্চ গোলাকার মিনার রয়েছে। সামনের দুটি মিনার পেছনের দুটির চেয়ে উঁচু এবং এদের ভেতরে ঘোরানো সিঁড়ি রয়েছে। উত্তর-পূর্ব কোণের মিনারটিকে বলা হতো ‘রোসন কোঠা’ (আলোক ঘর) এবং দক্ষিণ-পূর্ব কোণের মিনারটিকে বলা হতো ‘আঁধার কোঠা’। অতীতে মুয়াজ্জিনেরা এই সিঁড়ি দিয়ে মিনারের চূড়ায় উঠে আজান দিতেন এবং দূর থেকে শত্রুর আগমন পর্যবেক্ষণ করতেন।

দ্বৈত ভূমিকা: ইবাদতখানা ও রাজদরবার

খান জাহান আলী (র.)-এর আমলে ষাট গম্বুজ মসজিদ দুটি ভিন্ন কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত:

মসজিদ হিসেবে: প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হতো।

দরবারগৃহ হিসেবে: এটি ছিল খলিফাতাবাদের প্রধান বিচারালয় ও প্রশাসনিক দরবার। সকালে খান জাহান আলী (র.) পশ্চিম দেয়ালের প্রস্তরবেদী এবং উত্তর পাশের ইষ্টকবেদীতে বসে প্রজাদের অভাব-অভিযোগ শুনতেন, রাজস্ব আদায় করতেন এবং বিচার কাজ পরিচালনা করতেন। রাজকার্য পরিচালনার মাঝেই নামাজের ওয়াক্ত হলে সেখানে সমবেত সবাই সারিবদ্ধ হয়ে সালাত আদায় করতেন।

নামকরণের রহস্য: কতটি গম্বুজ আসলে আছে?

মসজিদটির নাম ‘ষাট গম্বুজ’ হলেও বাস্তব গণনায় দেখা যায় এতে গম্বুজের সংখ্যা ৬০টির অনেক বেশি! ছাদের ওপর মোট মূল গম্বুজ আছে ৭০টি (অর্ধডিম্বাকৃতি)। মসজিদের মাঝের সারিতে রয়েছে বাংলা ছনঘন আকৃতির ৭টি চৌচালা গম্বুজ। চার কোণের চারটি মিনারের মাথায় রয়েছে ৪টি অনুগম্বুজ

মোট গম্বুজ সংখ্যা = ৭০ + ৭ + ৪ = ৮১টি!

তাহলে ৮১টি গম্বুজ থাকা সত্ত্বেও এর নাম ‘ষাট গম্বুজ’ কেন হলো? গবেষক ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা তিনটি প্রধান তত্ত্ব উপস্থাপন করেন:

সাত চৌচালা থেকে রূপান্তর: মসজিদের ছাদের ঠিক মাঝখান দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে প্রসারিত ৭টি চৌচালা গম্বুজ বাংলা স্থাপত্যের এক বিশেষত্ব। অনেকের মতে, এই 'সাত গম্বুজ' বা 'সাত চৌচালা' শব্দটি লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে কালক্রমে ‘ষাট গম্বুজ’-এ পরিণত হয়েছে।

‘ষাট খাম্বাজ’ বা স্তম্ভ তত্ত্ব (সর্বাধিক গৃহীত): মসজিদের মূল ছাদটি ভেতরের ৬০টি বিশাল অখণ্ড পাথরের স্তম্ভের (Pillars) ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফারসি ভাষায় স্তম্ভকে বলা হয় ‘খাম্বাজ’। ৬০টি পাথরের স্তম্ভ বা খাম্বার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাসাদসম ভবনকে বলা হতো ‘ষাট খাম্বাজ মসজিদ’। কালক্রমে সাধারণ মানুষের মুখে ‘খাম্বাজ’ শব্দটি বিবর্তিত হয়ে ‘গম্বুজ’ রূপ ধারণ করেছে।

‘ছাদ গম্বুজ’ তত্ত্ব: প্রচলিত দালানের মতো এই মসজিদের কোনো আলাদা সমতল ছাদ নেই; গম্বুজগুলোই এর ছাদ। তাই একে বলা হতো ‘ছাদ গম্বুজ চালিত মসজিদ’, যা অপভ্রংশ হয়ে আজকের ‘ষাট গম্বুজ’ নাম নিয়েছে।

বাগেরহাটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোঃ মামুনুর রশীদ ষাট গম্বুজ মসজিদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন, মসজিদটি অত্যন্ত স্বকীয় কারণ এর দেয়ালে পোড়ামাটির শিল্পে বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলাসহ নানা ঐতিহ্যবাহী দেশীয় মোটিফ খোদাই করা আছে। এটি এমন এক হারিয়ে যাওয়া সুলতানি সভ্যতার স্মারক, যা পরবর্তীতে পুনঃআবিষ্কৃত হয়ে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করেছে।

খান জাহানের প্রাচীন সড়ক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উন্মোচন

হযরত খান জাহান আলী (র.) নির্মিত স্থাপত্যকলায় প্রচুর পরিমাণ শক্ত পাথরের ব্যবহার দেখা যায়। নদীর পলিগঠিত দক্ষিণবঙ্গে কোনো প্রাকৃতিক পাথরের খনি ছিল না। তবে এত বিশাল বিশাল পাথর তিনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন?

চট্টগ্রাম যোগসূত্র ও বায়াজিৎ বোস্তামী (র.)

ঐতিহাসিকদের মতে, খান জাহান আলী (র.) এই ভারী পাথরগুলো সুদূর চট্টগ্রাম থেকে নদীপথে আনাতেন। পাঠান ও সুলতানি আমলে সুন্দরবন ও খুলনা বিভাগের এই অংশ প্রশাসনিকভাবে চট্টগ্রাম বিভাগের সাথে সংযুক্ত ছিল। পাথর পরিবহনের সূত্রে তৎকালীন চট্টগ্রামের প্রখ্যাত সাধক হযরত বায়াজিৎ বোস্তামী (র.)-এর সাথে খান জাহানের গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

এই যোগাযোগ ও মালামাল আদান-প্রদান সহজতর করতে খান জাহান আলী (র.) খলিফাতাবাদ (বাগেরহাট) থেকে শুরু করে একেবারে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এক সুদীর্ঘ ও সড়কপথ নির্মাণ করেছিলেন।

গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের চেয়েও প্রাচীন সড়ক!

সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ববিদরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, ১৫ শতকে নির্মিত খান জাহান আলী (র.)-এর এই সড়কটি ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের চেয়েও প্রাচীন! এতদিন ষোড়শ শতকে সুলতান শের শাহ সূরি কর্তৃক নির্মিত সোনারগাঁও থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কটিকে উপমহাদেশের প্রাচীনতম দীর্ঘ সড়ক মনে করা হতো। কিন্তু খান জাহানের এই মহাসড়ক প্রমাণ করে যে তার আগেই দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলায় এমন উন্নত অবকাঠামো বিদ্যমান ছিল। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার এই প্রাচীন রাস্তাটিকে সংরক্ষিত জাতীয় পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সতীশ চন্দ্র মিত্র তাঁর ১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে এই রাস্তার বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছেন:

“ষাটগুম্বজ হইতে যে রাস্তা পূর্বমুখে বর্তমান বাগেরহাট সহরের দিকে গিয়াছে, ঐ রাস্তাই কাড়াপাড়ার রাস্তা ছাড়াইয়া একটু অগ্রবর্তী হইয়া বাসাবাটী গ্রামের মধ্য দিয়া পুরাতন ভৈরব ও বলেশ্বরের অন্তর্বর্তী প্রদেশ পার হইয়া চলিয়া গিয়াছে... রাস্তাটি ভৈরবের বাঁকের মাথা দিয়া বৈটপুর, কচুয়া, চিংড়াখালি প্রভৃতি গ্রামের মধ্য দিয়া অগ্রসর হইয়া হোগলাবুনিয়ার নিকট বলেশ্বর পার হইয়া বরিশাল জেলায় প্রবেশ করিয়াছে। তথা হইতে চাঁদপুর পর্যন্ত ঐ রাস্তার বিশেষ নিদর্শন পাওয়া যায় না... তবে চাঁদপুর হইতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি জঙ্গলাবৃত রাস্তা খাঞ্জালির রাস্তা বলিয়া প্রসিদ্ধ আছে, তাহা আমরা জানি।”

ইংরেজি আমলে প্রকাশিত ‘বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার, যশোর’ গ্রন্থেও এই প্রাচীন শাহী সড়কের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।

হারিয়ে যাওয়া বসতভিটে উন্মোচন

মরগা ও সুন্দরঘোনা গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে খান জাহান আলী (র.)-এর মূল রাজপ্রাসাদ বা বসতভিটে ছিল বলে বহু শতক ধরে জনশ্রুতি ছিল। সতীশ চন্দ্র মিত্রের বইয়েও উল্লেখ ছিল যে, ষাট গম্বুজ থেকে উত্তর মুখে ভৈরব নদী পর্যন্ত বিস্তৃত রাস্তার পাশেই গড়বেষ্টিত কেল্লা ও আবাসবাটি ছিল।

বহু বছর এটি মাটির নিচে ঢাকা পড়ে ছিল। ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে মরগার এক উঁচু ঢিবি থেকে ইট ও প্রাচীন মৃৎপাত্রের টুকরো বের হতে থাকলে স্থানীয়রা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে খবর দেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে প্রথম সেখানে আনুষ্ঠানিক খননকাজ শুরু হয় এবং ২০০৮ সাল থেকে নিয়মিত খননের মাধ্যমে খান জাহান আলী (র.)-এর মূল বসতভিটে, নর্দমা ব্যবস্থা, সীমানা প্রাচীর এবং দৈনন্দিন ব্যবহৃত নানা মূল্যবান প্রত্নবস্তু উদ্ধার করা হয়।

খলিফাতাবাদের পূর্বে প্রাচীন সভ্যতা: প্রাক-ইসলামিক অতীত

অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে যে, ১৫ শতকে হযরত খান জাহান আলী (র.) আসার আগে বাগেরহাট অঞ্চলে হয়তো মানুষের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, খলিফাতাবাদ প্রতিষ্ঠার বহু শতক আগেই এই অঞ্চলে প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল।

প্রাক-ইসলামিক নিদর্শনের প্রমাণসমূহ

হিন্দু ধর্মীয় প্রত্নবস্তু: বাগেরহাটের অতি প্রাচীন স্থান পানিঘাটে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে কষ্টিপাথরের তৈরি একটি দুর্লভ অষ্টাদশভুজা দেবীমূর্তি। এছাড়া চিতলমারী উপজেলার খরমখালি গ্রামে পাওয়া গেছে কৃষ্ণপ্রস্তরের তৈরি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি। মরগা খালের তীরে খান জাহানের পাথরভর্তি জাহাজ নোঙর করার স্থান ‘জাহাজঘাটায়’ মাটির নিচে খোদিত অষ্টাদশভুজা মহিষমর্দিনী দেবীর পাথরের নকশা পাওয়া গেছে।

বৌদ্ধ নগরীর ধ্বংসাবশেষ: সতীশ চন্দ্র মিত্রের তথ্যমতে, খান জাহান আলী (র.) যখন খলিফাতাবাদ নগরী নির্মাণ করেন, তখন তিনি একটি প্রাক-বিদ্যমান প্রাচীন বৌদ্ধ নগরীর পাথরের স্তম্ভ ও ইটের ধ্বংসাবশেষ নতুন কাজে ব্যবহার করেছিলেন। খাঞ্জেলির দীঘি খননের সময় মাটির নিচ থেকে একটি অসামান্য আবক্ষ ধ্যানী বৌদ্ধমূর্তি উদ্ধার করা হয়েছিল, যা প্রমাণ করে এই অঞ্চলে একসময় বৌদ্ধ ভিক্ষু ও অনুসারীদের বসবাস ছিল।

প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্য রুট: টিম স্টিলের মতে, প্রাচীন বিশ্বের বণিক ও পর্যটকরা বঙ্গোপসাগর এবং সুন্দরবনের নৌ-পথের ব্যাপারে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময় থেকেই এই অঞ্চল আন্তর্জাতিক উপকূলীয় বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

পরবর্তীকালে বিশাল জলোচ্ছ্বাস বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে সেই প্রাক-ইসলামিক জনপদ ধ্বংস হয়ে যায় এবং জঙ্গল দিয়ে ঢেকে যায়, যার ওপর ১৫ শতকে খান জাহান আলী (র.) তাঁর স্বপ্নের নগরী গড়ে তোলেন।

ঔপনিবেশিক আমল, নীল বিদ্রোহ ও বাগেরহাট মহকুমা

২৬ জিলহজ্ব ৮৬৩ হিজরী (১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ অক্টোবর) মহান সুফি সাধক হযরত খান জাহান আলী (র.) ইন্তেকাল করেন। তাঁকে বাগেরহাটের সুবিশাল দীঘির পাড়ে সমাধিস্থ করা হয়।

হুসেন শাহী রাজবংশ ও টাকশাল

খান জাহানের মৃত্যুর পর বঙ্গ শাসনকারী হুসেন শাহী রাজবংশের (১৪৯৩-১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) শাসকরা এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেন। সুলতান নুসরাত শাহের আমলে বাগেরহাট শহরের নিকটবর্তী মিঠাপুকুরের কাছে একটি রাজকীয় টাকশাল (Mint) ছিল, যেখানে সুলতানি মুদ্রা তৈরি হতো। মিঠাপুকুর পাড়ে আজও সেই সময়ের একটি প্রাচীন সুন্দর মসজিদ বিদ্যমান।

নীল বিদ্রোহ ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবদান

পরবর্তী শতকগুলোতে রোদ-বৃষ্টি ও পরিচর্যার অভাবে খলিফাতাবাদ নগরী আবারো ঘন জঙ্গলে রূপ নেয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ রাজত্বের অধীনে ১৭৮৬ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের আমলে যশোরকে জেলা বানানো হলে বাগেরহাট তার অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৮৪৯ সালে মোড়েল উপাধিধারী দুই নিষ্ঠুর ইংরেজ ভাই বাগেরহাটে একটি বন্দর স্থাপন করেন, যার নাম দেওয়া হয় মোড়েলগঞ্জ। মোড়েলরা স্থানীয় কৃষকদের ওপর চরম নীল চাষের অত্যাচার শুরু করে। এর প্রতিবাদে ১৮৬১ সালের ২৬ নভেম্বর বীর কৃষক রহিমুল্লাহর নেতৃত্বে নীলকর মোড়েলদের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক যুদ্ধ হয়, যা ‘মোড়েল-রহিমুল্লাহ সংঘর্ষ’ নামে নীল বিদ্রোহের ইতিহাসে বিখ্যাত।

তৎকালীন সময়ে খুলনার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বাংলা সাহিত্যের সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এই রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ তদন্ত করতে এসে বঙ্কিমচন্দ্র উপলব্ধি করেন যে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য এই অঞ্চলে পৃথক প্রশাসনিক কেন্দ্র দরকার। তাঁর সুনির্দিষ্ট সুপারিশের ভিত্তিতে ১৮৬৩ সালে বাগেরহাট যশোর জেলার অধীনে একটি পৃথক মহকুমায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ১৮৮২ সালে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট নিয়ে খুলনা জেলা গঠিত হয়।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাগেরহাটের রক্তঝরা দিনগুলি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনার লড়াইয়ে বাগেরহাটের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

যুদ্ধের প্রস্তুতি ও ৯ নম্বর সেক্টর

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর ৯ মার্চ বাগেরহাটে ‘সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত হয়। ১১ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৯ জন বাঙালি সদস্য সুবেদার মুজিবের নেতৃত্বে অস্ত্রসহ বাগেরহাটে এসে স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদে যোগ দেন। বাগেরহাট ছিল ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে।

রফিক বাহিনী, তাজুল বাহিনী ও চূড়ান্ত বিজয়

পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন কুখ্যাত শিক্ষামন্ত্রী এ কে এম ইউসুফ (রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা) এর বাড়ি বাগেরহাটে হওয়ায়, পাক হানাদার ও স্থানীয় রাজাকার প্রধান রজব আলী ফকিরের তাণ্ডবে ২৪ এপ্রিল থেকে বাগেরহাটে ভয়াবহ গণহত্যা শুরু হয়।

১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও ১৭ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত বাগেরহাট শহর রাজাকার ও পাক সেনাদের দখলে ছিল। ১৭ ডিসেম্বর ভোরে মুক্তিবাহিনী ত্রিমুখী আক্রমণ চালায়:

রফিক বাহিনী: রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বে মুনিগঞ্জ দিয়ে আক্রমণ।

তাজুল বাহিনী: ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে আক্রমণ।

মেজর জিয়াউদ্দিন বাহিনী: দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ।

মুক্তিযোদ্ধাদের এই প্রচণ্ড যৌথ আক্রমণের মুখে রাজাকার ও পাক বাহিনী রণাঙ্গন ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় এবং ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ভোরে বাগেরহাটে বিজয়ের স্বাধীন পতাকা উত্তোলিত হয়। ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাট মহকুমা থেকে পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত হয়।

বাগেরহাটের প্রধান ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ

বাগেরহাট জেলায় ছড়িয়ে থাকা প্রধান প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলোর তথ্য একনজরে সারণীতে তুলে ধরা হলো:

নিদর্শনের নাম

নির্মাণকাল / প্রতিষ্ঠাতা

স্থাপত্যের ধরন ও উপাদান

ঐতিহাসিক ও বিশেষ গুরুত্ব

ষাট গম্বুজ মসজিদ

১৫ শতক (খান জাহান আলী)

পোড়ামাটি, ইট ও পাথর (৮১টি গম্বুজ)

ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য; দরবারগৃহ ও মসজিদের দ্বৈত ভূমিকা।

খান জাহান আলী (র.) মাজার

১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ

এক গম্বুজ বিশিষ্ট সমাধি ভবন

ভিত্তি থেকে মাটির ৩ ফুট উপর পর্যন্ত অখণ্ড পাথরে তৈরি।

সিঙ্গাইর মসজিদ

১৫ শতক (সুলতানি আমল)

এক গম্বুজ বিশিষ্ট গম্বুজ স্থাপত্য

ষাট গম্বুজ মসজিদের কাছেই অবস্থিত পুরু দেয়ালে তৈরি মসজিদ।

নয় গম্বুজ মসজিদ

১৫ শতক (খান জাহান আলী)

৯টি গম্বুজ ও পোড়ামাটির অলংকরণ

ঠাকুর দীঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত অপূর্ব সুলতানি কারুকাজ।

রণবিজয়পুর মসজিদ

১৫ শতক (খান জাহান আলী)

এক গম্বুজ (বাংলাদেশের বৃহত্তম)

এর মূল গম্বুজটি বাংলাদেশের যেকোনো এক-গম্বুজ মসজিদের চেয়ে বড়।

চুনাখোলা মসজিদ

১৫ শতক (সুলতানি আমল)

এক গম্বুজ বিশিষ্ট একক ভবন

নিবিড় গ্রামের মাঝে অবস্থিত অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন পোড়ামাটির মসজিদ।

অযোধ্যা/কোদলা মঠ

আনুমানিক ১৬/১৭ শতক

সুউচ্চ কোণাকৃতির হিন্দু মঠ

শিকরা শৈলীতে তৈরি চমৎকার অলংকরণযুক্ত সুউচ্চ মঠ।

খান জাহানের প্রাচীন সড়ক

১৫ শতক (খান জাহান আলী)

পোড়ামাটির ইট ও চুন-সুরকি

শেহ শাহের গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের চেয়েও প্রাচীন সংরক্ষিত সড়ক।

মাজার দীঘির বিখ্যাত কুমির: কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়

হযরত খান জাহান আলী (র.)-এর সাথে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে বিখ্যাত কিংবদন্তিগুলোর একটি হলো তাঁর মাজার সংলগ্ন দীঘির (ঠাকুর দীঘি) লোনা পানির কুমির।

কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ের গল্প: স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, খান জাহান আলী (র.) যখন এই সুবিশাল দীঘি খনন করেন, তখন এতে মিষ্টি পানির ভারসাম্য রক্ষা এবং অলৌকিক রক্ষক হিসেবে দুটি মিষ্টি পানির কুমির এনে ছেড়েছিলেন। তিনি এদের নাম রেখেছিলেন ‘কালাপাহাড়’ এবং ‘ধলাপাহাড়’

ডাকে সাড়া দেওয়ার অলৌকিকতা: বলা হয়ে থাকে, সুফি সাধক খান জাহান আলী (র.) নাম ধরে ডাকলেই কুমির দুটি দীঘির পানির ওপর ভেসে উঠতো এবং তাঁর হাত থেকে খাবার গ্রহণ করত।

বংশধর ও বর্তমান অবস্থা: এই কুমির দুটির বংশধরেরাই শত শত বছর ধরে এই দীঘিতে বাস করে আসছিল। তবে ২০০৫ সালের দিকে এই মূল বংশের শেষ খাঁটি মিষ্টি পানির কুমিরটি বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যায়। পরবর্তীতে ঐতিহ্য ধরে রাখতে ভারত (মাদ্রাজ কুমির ব্যাংক) এবং সুন্দরবন থেকে নতুন কুমির এনে এই দীঘিতে ছেড়ে দেওয়া হয়।

খান জাহানীয় স্থাপত্যরীতির (Khan Jahani Style) অনন্য বিজ্ঞান

বাগেরহাটের ইমারতগুলো কেবল সৌন্দর্য নয়, বরং জলবায়ু ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা করে তৈরি এক বিশেষ প্রকৌশলবিদ্যার নিদর্শন। স্থাপত্যবিদরা একে ‘খান জাহানীয় শৈলী’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

তুঘলকী প্রভাব ও পিরামিড দেয়াল: দিল্লির তুঘলক স্থাপত্যরীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে খান জাহান আলী (র.) তাঁর দালানগুলোর দেয়াল নিচের দিকে বেশ পুরু এবং উপরের দিকে কিছুটা হেলানো বা পিরামিড আকৃতির (Tapering Walls) করে তৈরি করেছিলেন। এতে ভূমিকম্প ও চরম দুর্যোগেও দেয়াল হেলে পড়ে না।

বক্র কার্নিশ (Curved Cornice): উপকূলীয় অঞ্চলের অতিবৃষ্টির কথা মাথায় রেখে মসজিদের ছাদ ও কার্নিশগুলোকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ছন-ঘরের চালের মতো ঈষৎ বাঁকানো আকৃতি দেওয়া হতো, যাতে বৃষ্টির পানি জমে না থেকে দ্রুত গড়িয়ে পড়ে।

লোনা পানির নোনা-প্রতিরোধী প্রযুক্তি: লোনা পানির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষার জন্য ইটের গাঁথুনিতে বিশেষ প্রক্রিয়াজাত চুন, সুরকি এবং এক ধরনের আঠা ব্যবহার করা হয়েছিল, যা শত শত বছর ধরে আর্দ্রতা ঠেকিয়ে রেখেছে।

অলোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা অন্যান্য অনন্য নিদর্শন

ষাট গম্বুজ বা খান জাহানের মাজার ছাড়াও বাগেরহাটে বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক রত্ন রয়েছে, যা সাধারণ পর্যটকদের চোখে অনেক সময় এড়িয়ে যায়:

সাবেকডাঙ্গা মনুমেন্ট (Sabekdanga Monument): ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ছোট্ট এক-গম্বুজবিশিষ্ট ইমারতটি এক অসাধারণ স্থাপত্য। অনেকে এটিকে ইবাদতখানা আবার কেউ কেউ সমাধি হিসেবে মনে করেন। এর ভেতরের ও বাইরের দেয়ালের চমৎকার পোড়ামাটির কারুকাজ (Terracotta) সুলতানি আমলের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মগুলোর একটি।

বিবি বেগুনী মসজিদ: ধারণা করা হয়, এটি খান জাহান আলী (র.)-এর অন্যতম স্ত্রী বা কন্যার স্মরণে নির্মিত হয়েছিল। এই এক-গম্বুজ মসজিদের দেয়ালগুলো প্রায় ৩.০৫ মিটার (১০ ফুট) পুরু!

রণবিজয়পুর মসজিদ: এই মসজিদের মূল গম্বুজটি বাংলাদেশের যেকোনো এক-গম্বুজ মসজিদের মধ্যে বৃহত্তম (যার ব্যাস প্রায় ১১ মিটার)। এর ভেতরের বিশাল খালি জায়গা স্থাপত্যকলার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন।

রেজা খোদা মসজিদ (ছয় গম্বুজ মসজিদ): জিন্দা পীর সমা‌ধি সংলগ্ন এই মসজিদটি বর্তমানে কিছুটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও এর ছাদ ও মিহরাবের ইটের বিন্যাস প্রমাণ করে এটি একসময় অত্যন্ত সুদৃশ্য ছয় গম্বুজবিশিষ্ট স্থাপত্য ছিল।

ঐতিহ্য সংরক্ষণে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও লবণাক্ততা

বাগেরহাটের শতবর্ষী পোড়ামাটির স্মৃতিস্তম্ভগুলো বর্তমানে এক মারাত্মক প্রাকৃতিক হুমকির মুখোমুখি।

লবণাক্ততার আক্রমণ (Salt Efflorescence): সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়ার কারণে মাটির তলদেশ ও বাতাসের লোনাভাব দিন দিন বাড়ছে। এই নোনা পানি ইটের রন্ধ্রে প্রবেশ করে শুষ্ক মৌসুমে কেলাসিত (Crystallized) হয়, যাকে বলা হয় 'সল্ট এফরলোরেসেন্স'। এর ফলে প্রাচীন ইট ও পোড়ামাটির অলংকরণগুলো গুঁড়ো হয়ে খসে পড়ছে।

এই অমূল্য বিশ্ব ঐতিহ্য বাঁচাতে ইউনেস্কো, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী (UNDP) এবং বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যৌথভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রলেপ (Chemical Treatment) এবং বিশেষ ড্রেনেজ ব্যবস্থা ব্যবহার করে ভবনগুলো সংরক্ষণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বাগেরহাটের লোকসংস্কৃতি, রন্ধনশৈলী ও অর্থনীতি

বাগেরহাটের অনন্য পরিচয় কেবল ইট-পাথরেই সীমাবদ্ধ নয়, এর নিজস্ব সংস্কৃতি ও রসনা বিলাসও অত্যন্ত সমৃদ্ধ:

‘চুই ঝাল’ ও নারকেলের মেলবন্ধন: দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলার মতো বাগেরহাটের রান্নায় ‘চুই ঝাল’ (Piper chaba) গাছের কাণ্ড ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে চুই ঝাল ও নারকেলের দুধ দিয়ে খাসি/গরুর মাংস কিংবা গলদা চিংড়ি রান্না বাগেরহাটের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী খাবার।

পান-সুপারির অর্থনীতি: ‘বাগেরহাট’ নামের আরেকটি লোকপ্রচলিত অর্থ প্রচলিত আছে সুপারি বাগান বা সুপারির হাট থেকে। বাগেরহাটের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সুপারি চাষ এবং সুন্দরবনের গোলপাতা ও মধু আহরণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বড় ভূমিকা রেখে আসছে।

আধুনিক বাগেরহাট: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, হাকিমপুরের দুর্গাপূজা ও সম্ভাবনা

ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট কেবল মুসলিম ঐতিহ্যের আধার নয়; এটি অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও এক এক অনন্য নজির।

হাকিমপুর গ্রামের সর্ববৃহৎ দুর্গাপূজা

মসজিদের শহর হিসেবে পরিচিত এই বাগেরহাটেই অনুষ্ঠিত হয় এশিয়ার অন্যতম সর্ববৃহৎ দুর্গাপূজা। ২০১০ সালে বাগেরহাট সদর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের ব্যবসায়ী লিটন শিকদার ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৫১টি প্রতিমা নিয়ে তাঁর বাড়িতে দুর্গাপূজা শুরু করেন। ২০১৯ সালে এই একটি মণ্ডপেই ৮০১টি ভিন্ন ভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরি করে পূজা অনুষ্ঠিত হয়, যা আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুর্গাপূজা। এই উৎসব দেখতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশের লাখ লাখ দর্শনার্থী জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাগেরহাটে সমবেত হন।

পর্যটন সম্ভাবনা ও পদ্মা সেতুর প্রভাব

বাগেরহাটে একই সাথে রয়েছে ইউনেস্কো স্বীকৃত দুটি বিশ্ব ঐতিহ্য ক্ষেত্র একদিকে খলিফাতাবাদের সুলতানি স্থাপত্য, অন্যদিকে বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এছাড়া রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মংলা, খান জাহান আলী সেতু, রূপসা নদী এবং অজস্র ঐতিহাসিক দীঘি।

অতীতে ঢাকা থেকে বাগেরহাট যাওয়ার পথে সুবিশাল পদ্মা নদী পার হতে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার ভোগান্তি পোহাতে হতো। কিন্তু স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে বাগেরহাটের দূরত্ব ও সময় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এখন মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই রাজধানী থেকে সরাসরি মহাসড়ক পথে বাগেরহাটে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করেছে।

উপসংহার

বাগেরহাট সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত সংবাদপত্র টাইমস অফ ইন্ডিয়া (Times of India) তাদের এক বিশেষ পর্যটন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল:

“বাংলাদেশের এক ছোট প্রান্তে অবস্থিত বাগেরহাট আপনাকে নিয়ে যাবে এক স্থাপত্য ভ্রমণে। কিংবা একে কোনো পুরনো বইয়ের একটি দীর্ঘ-বিস্মৃত পাতাও বলতে পারেন আপনি। এই জায়গাটি আপনাকে অনুধাবন করাবে, যদি অনাবিষ্কৃত থাকত তবে কী জিনিসই না আপনি হারাতেন!”

ছয় শতক আগে সুফি সাধক হযরত খান জাহান আলী (র.) যে মানবিক, নান্দনিক ও আধ্যাত্মিক নগরীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই খলিফাতাবাদ আজকের আধুনিক বাগেরহাট হয়ে বিশ্বমানচিত্রে স্বমহিমায় ভাস্বর। ইতিহাস, স্থাপত্য, প্রকৃতি এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার মেলবন্ধনে বাগেরহাট চিরকাল বাংলা ও বিশ্ব ঐতিহ্যের এক পরম বিস্ময় হয়ে টিকে থাকবে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.