বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয় ও লক্ষণ সেনের পলায়ন

বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয় ও লক্ষণ সেনের পলায়ন

ইতিহাসের পাতায় স্থান পাওয়া বাক্যগুলো অনেক সময় এতটাই সংক্ষিপ্ত ও নিরসভাবে পরিবেশিত হয় যে, তার পেছনে লুকিয়ে থাকা মহানাটকীয়তা, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা আড়ালেই থেকে যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষার পাঠ্যবইয়ে আমরা একটি বাক্য অগণিতবার পড়েছি "১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী সেনা নিয়ে নদীয়ার বৃদ্ধ রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে বাংলা জয় করেন।"

বাস্তবে কি মাত্র ১৭ বা ১৮ জন সৈন্য নিয়ে একটি বিশাল ও সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য জয় করা সম্ভব? নদীয়ার রাজপ্রাসাদে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল? কে ছিলেন এই বখতিয়ার খিলজী, যিনি গজনী ও দিল্লির দরবার থেকে শারীরিক ও আর্থিক অযোগ্যতার কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েও পরবর্তীতে সুদূর প্রাচ্যে নিজের এক স্বাধীন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?

খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকের প্রারম্ভে সংঘটিত এই ঘটনাটি কেবল একটি রাজবংশের পতন আর নতুন রাজবংশের উত্থান ছিল না; এটি ছিল বাংলা তথা সমগ্র পূর্ব ভারতের জনমিতি, সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক অমোঘ ঐতিহাসিক মোড়।

ত্রয়োদশ শতকের প্রারম্ভে বাংলা ও ভারত মহাসোপান

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা তৎকালীন উপমহাদেশের অন্যতম ধনধান্যপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে গণ্য হতো। একাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পাল রাজবংশের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক অঞ্চল থেকে আগত সেন বংশ বাংলায় নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। সামন্ত সেন ও হেমন্ত সেনের হাত ধরে যে সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল, তা বিজয় সেন ও বল্লাল সেনের রাজত্বকালে পূর্ণতা লাভ করে।

১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার শাসক ছিলেন সেন বংশের অন্যতম প্রতাপশালী রাজা বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন। লক্ষণ সেনের প্রাথমিক জীবন ছিল সামরিক সাফল্যে উজ্জ্বল। তিনি কলিঙ্গ, কামরূপ ও কাdirectories (কাশী) অভিযানে নিজের বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। কবি জয়দেব, ধোয়ী, শরণ ও উমা পতিধরের মতো বিখ্যাত পণ্ডিতরা তাঁর সভা অলঙ্কৃত করতেন। কিন্তু জীবনের অপরাহ্ণে এসে রাজা লক্ষণ সেন রাজনীতি ও সামরিক তৎপরতা থেকে খানিকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তিনি গঙ্গাতীরের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র নদীয়ায় ধর্মচর্চা ও সাহিত্য সাধনায় সময় অতিবাহিত করছিলেন, আর তাঁর প্রশাসনিক ও মূল সামরিক মূলকেন্দ্র ছিল পূর্ব বাংলার বিক্রমপুরে।

একই সময়ে বাংলার বাইরে, সমগ্র মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারতে বইছিল পরিবর্তনের এক প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া। তুর্কি মুসলমানদের বিজয়রথ তখন মধ্য এশিয়া ছাড়িয়ে উত্তর ভারতের গাঙ্গেয় সমভূমিতে আছড়ে পড়ছিল। একদিকে হিন্দু রাজাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও জাতিভেদপ্রথা, অন্যদিকে তুর্কিদের গতিশীল অশ্বারোহী যুদ্ধকৌশল—এই দুইয়ের ধাক্কায় একে একে ভেঙে পড়ছিল উত্তর ভারতের প্রাচীন দুর্গগুলো।

ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের তিনটি ঐতিহাসিক তরঙ্গ

উপমহাদেশে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রক্রিয়াটি একদিনে ঘটেনি। প্রধানত তিনটি পৃথক ঐতিহাসিক তরঙ্গের মাধ্যমে এই অঞ্চলে ইসলামি রাজনৈতিক ক্ষমতার বিস্তার ঘটেছিল:

প্রথম তরঙ্গ (৭১২ খ্রিষ্টাব্দ): উমাইয়া খিলাফতের আমলে তরুণ সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে আরবরা সিন্ধু ও মুলতান জয় করে। এটি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিমদের প্রথম স্থায়ী সামরিক প্রবেশ। তবে এই বিজয় সিন্ধু ও সংলগ্ন মরু অঞ্চলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

দ্বিতীয় তরঙ্গ (দশম ও একাদশ শতক): গজনীর শাসক আমীর সবুক্তগীন এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র সুলতান মাহমুদ উত্তর-পশ্চিম ভারতে পরপর ১৭ বার অভিযান পরিচালনা করেন। সুলতান মাহমুদের মূল উদ্দেশ্য সাম্রাজ্য স্থায়ীভাবে বিস্তার করা না হলেও, তিনি লাহোরসহ পাঞ্জাবের একটি বড় অংশ গজনী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং ভারতের রাজনৈতিক ভঙ্গুরতা বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করে দেন।

তৃতীয় তরঙ্গ (দ্বাদশ শতকের শেষভাগ): ঘুড় সাম্রাজ্যের সুলতান শিহাবউদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরী এবং তাঁর অনুগত সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবেক ভারতে স্থায়ী মুসলিম সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে প্রথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করে দিল্লিতে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বিহার ও বাংলা অভিযান ছিল মূলত এই তৃতীয় তরঙ্গেরই একটি অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাধীন ও দুর্ধর্ষ সম্প্রসারণ।

বখতিয়ার খিলজীর প্রাথমিক জীবন, শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও ভাগ্যান্বেষণ

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী ছিলেন আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের গরমশির (বর্তমান হেলমান্দ প্রদেশ) এলাকার অধিবাসী। জাত্যাভিমানের দিক থেকে তিনি ছিলেন তুর্কিদের 'খিলজী' সম্প্রদায়ভুক্ত। খিলজীরা বহু পূর্বে মধ্য এশিয়া থেকে আফগান পার্বত্য অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেছিল।

গজনী ও দিল্লির দরবারে প্রত্যাখ্যান: যুবক বখতিয়ারের বাল্যজীবন কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। ভাগ্যান্বেষণে তিনি নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে গজনীতে আসেন। তখন মুহাম্মদ ঘুরীর সেনাদলে নতুন সৈন্য নিয়োগ চলছিল। বখতিয়ার সামরিক বিভাগে চাকুরীর আবেদন জানান, কিন্তু সেনাধক্ষ্য তাঁকে দেখে সরাসরি নাকচ করে দেন।

তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি সেনাকে নিজস্ব ঘোড়া, বর্ম ও অস্ত্র নিয়ে উপস্থিত হতে হতো। দরিদ্র বখতিয়ারের কোনো উন্নত ঘোড়া বা অস্ত্র কেনার সামর্থ্য ছিল না। এর চেয়েও বড় বাধা ছিল তাঁর অদ্ভুত শারীরিক গঠন। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'তবকাত-ই-নাসিরি'-তে উল্লেখ করেছেন: বখতিয়ার খিলজী ছিলেন খর্বকায় (হাইট কম), চেহারায় কুরুচিপূর্ণ এবং তাঁর হাত দুটি ছিল অস্বাভাবিক লম্বা, যা সোজা হয়ে দাঁড়ালে হাঁটু স্পর্শ করত (আজানুলম্বিত বাহু)। সামরিক কুচকাওয়াজে এই শারীরিক গঠনকে অনুপযুক্ত মনে করা হয়েছিল।

গজনীতে ব্যর্থ হয়ে বখতিয়ার দিল্লিতে আসেন, যেখানে কুতুবউদ্দিন আইবেক সেনাপতিদের নিয়োগ দিচ্ছিলেন। সেখানেও একই কারণে তিনি প্রত্যাখ্যাত হন।

বদাউন ও অযোধ্যায় উত্থান: বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও বখতিয়ার ধৈর্য হারাননি। তিনি পূর্বদিকে ধাবিত হয়ে বদাউনে পৌঁছান। বদাউনের শাসক মালিক হিজবর-উদ-দীন বখতিয়ারের অদম্য ইচ্ছাশক্তি দেখে তাঁকে সামান্য সওয়ারি বা কম বেতনের সৈনিক হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী বখতিয়ার সেখানে বেশিদিন থাকেননি। তিনি চলে যান অযোধ্যায়।

অযোধ্যার শাসক মালিক হসাম-উদ-দীন ছিলেন জহুরি। তিনি বখতিয়ারের ভেতরের লুকিয়ে থাকা অনন্য সামরিক প্রতিভা ও নেতৃত্বের দক্ষতা আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি বখতিয়ারকে অযোধ্যার পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত ভিউলীভগত (বর্তমান উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর জেলা সংলগ্ন এলাকা) নামক দুটি পরগনার জায়গীর প্রদান করেন এবং সীমান্ত পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

সীমান্ত প্রদেয় জায়গীর থেকে বিহার অভিযান

ভিউলী ও ভগত পরগনা দুটি ছিল মুসলিম রাজ্য সীমানার একবারে শেষ প্রান্তে, যার পরেই শুরু হতো স্বাধীন হিন্দু রাজা ও বুদ্ধভিত্তিক ছোট ছোট অঞ্চলের সীমানা। এখান থেকেই শুরু হয় বখতিয়ারের একক সামরিক দূরদর্শিতা।

ছোট ছোট আক্রমণ ও বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি

বখতিয়ার বুঝতে পেরেছিলেন, বড় কোনো অভিযান চালাতে হলে নিজের স্বয়ংসম্পূর্ণ বাহিনী ও অঢেল সম্পদের প্রয়োজন। তিনি জায়গীরের সীমানা সংলগ্ন ছোট ছোট এলাকাগুলোতে ঝটিকা আক্রমণ চালানো শুরু করেন। পার্শ্ববর্তী রাজারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ব্যস্ত থাকায় বখতিয়ারের এই সীমান্ত রেইডগুলো প্রতিহত করতে পারেনি।

লুণ্ঠিত ধন-সম্পদ দিয়ে বখতিয়ার উন্নতমানের আরবীয় ঘোড়া ও অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ক্রয় করেন। তাঁর এই ধারাবাহিক বিজয়ের খবর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কর্মহীন, ভাগ্যান্বেষী খিলজী তরুণরা এসে বখতিয়ারের পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বখতিয়ারের অধীনে গড়ে ওঠে এক দুর্ধর্ষ, গতিশীল অশ্বারোহী বাহিনী।

ওদন্তপুরী বিহার দখল ও নালন্দা প্রসঙ্গ (১২০৩ খ্রিষ্টাব্দ)

১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খিলজী দক্ষিণ বিহারের দিকে অগ্রসর হন। পথে তিনি সুউচ্চ প্রাচীরবেষ্টিত বিশাল এক দুর্গের মতো দেখতে স্থানে উপস্থিত হন। কোনো বিশেষ সামরিক প্রতিরোধ ছাড়াই বখতিয়ারের বাহিনী স্থানটি দখল করে নেয়। দুর্গে প্রবেশ করে দেখা যায়, অধিবাসীদের অধিকাংশই মুণ্ডিতমস্তক এবং তাদের হাতে অস্ত্রের বদলে রয়েছে অজস্র বই ও পাণ্ডুলিপি।

খিলজী সৈনিকরা অনুসন্ধান করে জানতে পারেন যে, এটি কোনো সামরিক দুর্গ নয়; এটি ছিল একটি বৌদ্ধ মহাবিহার, যার নাম ওদন্তপুরী বিহার। তুর্কিরা এই স্থানটির নাম দেন 'বিহার' (যেখান থেকে পরবর্তীতে সমগ্র রাজ্যের নাম হয় 'বিহার')।

নালন্দা ও বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস বিতর্ক: ঐতিহাসিক বিবরণীতে ওদন্তপুরী ছাড়াও নালন্দা ও বিক্রমশীলা বিহারের ধ্বংসের সাথে বখতিয়ার খিলজীর নাম যুক্ত করা হয়। তিব্বতি ইতিহাসবিদ লামা তারানাথ ও মিনহাজ-ই-সিরাজের বিবরণী থেকে জানা যায়, যুদ্ধ চলাকালীন এবং বৌদ্ধ বিহারগুলোকে দুর্গ মনে করে ভুলবশত তুর্কি সেনারা আক্রমণ চালিয়েছিল। তবে আধুনিক ঐতিহাসিকদের (যেমন আর. সি. মজুমদার, এ. এম. চৌধুরী) একাংশের মতে, বখতিয়ারের আগমনের পূর্বেই তুর্কি আক্রমণ থেকে বাঁচতে এবং বাংলায় পাল বংশের পতনের পর সেনদের ব্রাহ্মণ্যবাদী নীতি ও আর্থিক সমর্থনের অভাবে বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলো অনেকটা জীর্ণ ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল। তবুও, ওদন্তপুরী বিজয়ের মাধ্যমে বিহারে সেন সাম্রাজ্যের ক্ষমতার মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে যায়।

বিহার বিজয়ের পর বখতিয়ার প্রচুর ধন-রত্ন নিয়ে দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের দরবারে হাজির হন। একদা যে দরবার থেকে তিনি বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেখানে কুতুবউদ্দিন আইবেক তাঁকে রাজকীয় সম্মান প্রদর্শন করেন, খিলআত (সম্মানসূচক পোশাক) দেন এবং পূর্বদিকে সাম্রাজ্য বিস্তারের অনুমতি প্রদান করেন।

নদীয়া বিজয়ের পটভূমি ও '১৭/১৮ অশ্বারোহী'র সামাজিক-ঐতিহাসিক মিথ

বিহার জয়ের পর বখতিয়ারের পরবর্তী চোখ পড়ে বাংলার দিকে। তৎকালীন বাংলায় লক্ষণ সেনের রাজত্ব তখন নানা কারণে টালমাটাল।

গণকদের ভবিষ্যদ্বাণী ও লক্ষণ সেনের উদাসীনতা

মিনহাজ-ই-সিরাজের 'তবকাত-ই-নাসিরি' গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, বখতিয়ার যখন বিহারে নিজের শাসন মজবুত করছিলেন, তখন নদীয়ার রাজদরবারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লক্ষণ সেনের ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, জ্যোতিষী ও গণক দল রাজাকে গিয়ে সতর্ক করেন যে, তাঁদের প্রাচীন শাস্ত্রে লেখা রয়েছে বাংলা শিগগিরই এক তুর্কি সেনাপতির হস্তগত হবে।

রাজা লক্ষণ সেন জানতে চান, শাস্ত্রে সেই বিজয়ীর কোনো শারীরিক পরিচয় আছে কি না। পণ্ডিতরা জানান, সেই ব্যক্তি হবেন খর্বকায়, কুৎসিত এবং তাঁর হাত দুটো হাঁটুর নিচে নেমে যাবে। লক্ষণ সেন তাঁর গুপ্তচরদের মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে, বিহারজয়ী বখতিয়ার খিলজীর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সাথে এই বিবরণ হুবহু মিলে যায়।

পণ্ডিত ও রাজপরিবারের অনেকেই এই ভবিষ্যদ্বাণীতে ভীত হয়ে নদীয়া ত্যাগ করে পূর্ব বাংলা (বিক্রমপুর) ও আসাস-উড়িষ্যার দিকে পালিয়ে যান। কিন্তু বৃদ্ধ রাজা লক্ষণ সেন নদীয়া ত্যাগ না করে সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন এবং আক্রমণের সম্ভাবনাকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি।

"১৭ জন অশ্বারোহী"র ভুল ধারণার ব্যবচ্ছেদ

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রচলিত ভুল ধারণা হলো মাত্র ১৭ বা ১৮ জন সৈন্য নিয়ে বখতিয়ার খিলজী পুরো বাংলা জয় করেছিলেন। এটি সামরিক ও যুক্তিবিদ্যার দিক থেকে সম্পূর্ণ অসম্ভব।

ঐতিহাসিক সত্যটি মিনহাজ নিজেই পরিষ্কারভাবে লিখেছেন:

বখতিয়ার খিলজী তাঁর মূল বাহিনীকে পেছনে রেখে অত্যন্ত দ্রুতগামী অশ্বারোহীদের নিয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন। নদীয়া শহরের প্রবেশদ্বারে যখন বখতিয়ার এসে পৌঁছান, তখন তাঁর সাথে ছিলেন মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী

এর কারণ হলো, বখতিয়ারের মূল বাহিনীটি পেছনে ধাবমান ছিল, কিন্তু বখতিয়ার এত দ্রুত গতিতে ঘোড়া চালিয়েছিলেন যে, মূল বাহিনীর কেবল ১৮ জন সৈন্যই তাঁর সাথে গতি বজায় রাখতে পেরেছিল। বাকি বাহিনীটি শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার পেছনে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে অবস্থান করছিল। এই ১৮ জন সেনা দিয়ে তিনি নদীয়া শহরের 'সরপ্রাইজ অ্যাটাক' বা আচমকা অভিযান শুরু করেছিলেন, পুরো বাংলা জয় করেননি।

ঝাড়খণ্ডের গহিন অরণ্য থেকে রাজপ্রাসাদ: নদীয়া আক্রমণ ও লক্ষণ সেনের পলায়ন

১২০৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসের দিকে (মতান্তরে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) বখতিয়ার খিলজী নদীয়া অভিযানের জন্য প্রস্তুত হন।

ভৌগোলিক চমক: তেলিয়াগড় গিরিপথ এড়িয়ে যাওয়া

বিহার থেকে বাংলায় প্রবেশের প্রথাগত ও স্বাভাবিক পথটি ছিল তেলিয়াগড় গিরিপথ (বর্তমান রাজমহল পাহাড়ের পাশের পথ)। লক্ষণ সেনের সামরিক উপদেষ্টারা ধারণা করেছিলেন, যদি আক্রমণ হয়, তবে তা এই পথ দিয়েই হবে। তাই তেলিয়াগড় গিরিপথে সেন বংশের শক্তিশালী সৈন্য ও সীমান্ত প্রহরী মোতায়েন ছিল।

কিন্তু সামরিক প্রতিভা বখতিয়ার খিলজী প্রথাগত পথে না গিয়ে বেছে নেন অত্যন্ত বিপজ্জনক ও দুর্গম পথ। তিনি বীরভূম ও ছোটনাগপুর মালভূমির গভীর অরণ্য অঞ্চল ঝাড়খণ্ডের জঙ্গল অতিক্রম করে নদীয়ার দিকে অগ্রসর হন। এই পথটি এতই দুর্গম ছিল যে, বিশাল সেনাবহর নিয়ে সেখান দিয়ে আক্রমণ চালানো অসম্ভব বলে সেন রাজা মনে করতেন। ফলে বখতিয়ারের আগমনের কোনো খবরই নদীয়ার সীমান্ত প্রহরীরা পায়নি।

ঘোড়া ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশ ও প্রাসাদে হানা

দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বখতিয়ার যখন নদীয়া শহরের তোরণে এসে পৌঁছান, তখন তাঁর সাথে মাত্র ১৮ জন সৈন্য। তাঁরা শহরের নিরাপত্তারক্ষীদের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য নিজেদের তুর্কি ঘোড়া ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন। সেই যুগে মধ্য এশিয়া থেকে নিয়মিতভাবে উন্নতমানের ঘোড়া বাংলায় বিক্রির জন্য আনা হতো। তাই রক্ষীরা কোনো সন্দেহ না করে তাঁদের শহরের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়।

বখতিয়ার সোজা রাজা লক্ষণ সেনের প্রাসাদের তোরণে চলে যান। তোরণে পৌঁছেই খিলজী ও তাঁর সঙ্গীরা খাপ থেকে তলোয়ার বের করে দ্বাররক্ষী ও প্রাসাদ প্রহরীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রাসাদ চত্বরে মুহূর্তের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও হাহাকার শুরু হয়ে যায়।

লক্ষণ সেনের পলায়ন

তুর্কি আক্রমণের সময়ে বৃদ্ধ রাজা লক্ষণ সেন মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত ছিলেন। প্রাসাদের বাইরে আকস্মিক চিৎকার, তলোয়ারের ঝংকার ও রক্ষীদের আর্তনাদ শুনে রাজা স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি ভাবেন, বিশাল তুর্কি বাহিনী বুঝি পুরো শহর ঘেরাও করে ফেলেছে।

কোনো সামরিক প্রতিরোধের প্রস্তুতি না থাকায় এবং গণকদের সেই পুরনো ভবিষ্যদ্বাণীর কথা স্মরণে আসায়, রাজা লক্ষণ সেন আত্মরক্ষার্থ প্রাসাদ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মধ্যাহ্নভোজের অন্ন ত্যাগ করে, খালি পায়ে প্রাসাদের পিছনের গোপন দ্বার দিয়ে গঙ্গার ঘাটে রক্ষিত নৌকায় গিয়ে ওঠেন। নদীপথ পাড়ি দিয়ে তিনি নিরাপদে পূর্ব বাংলার বিক্রমপুরে (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ, বাংলাদেশ) আশ্রয় গ্রহণ করেন।

রাজা পালিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বখতিয়ারের পেছনের মূল সেনাবহর নদীয়া শহরে প্রবেশ করে এবং পুরো শহর নিয়ন্ত্রণে নেয়। বখতিয়ার নদীয়া থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা, রূপা, রত্নাবলী, রাজকীয় হস্তী ও দাস-দাসী হস্তগত করেন। ৩ দিন নদীয়া অবস্থানের পর বখতিয়ার শহরটি ধ্বংস না করে সেটিকে পরিত্যাগ করে উত্তর বাংলার দিকে গমন করেন।

লখনৌতি রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও বখতিয়ারের প্রশাসনিক পুনর্গঠন

নদীয়া বিজয়ের পর বখতিয়ার খিলজী অনুধাবন করেছিলেন যে, নদীয়া ছিল কেবল সেনদের এক ধর্মীয় ও তীর্থ কেন্দ্র, মূল প্রশাসনিক শক্তি নয়। তাছাড়া ভৌগোলিক দিক থেকেও দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলা থেকে রাজ্য পরিচালনা করা কঠিন। তাই তিনি উত্তর বাংলার লক্ষ্মণাবতী বা গৌড় দখল করেন এবং এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন 'লখনৌতি'। লখনৌতিকেই তিনি তাঁর নবপ্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন।

প্রশাসনিক বণ্টন ও সামন্ত ব্যবস্থা

একটি সাম্রাজ্য কেবল তলোয়ার দিয়ে জয় করা যায়, কিন্তু তা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন হয় সুপ্রশাসনের। বখতিয়ার খিলজী বিজিত অঞ্চলগুলোকে কয়েকটি প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করে নিজের বিশ্বাসযোগ্য ও অনুগত খিলজী সেনাপতিদের হাতে দায়িত্ব দেন:

আলী মর্দান খিলজী: ঘোড়াঘাট ও বরেন্দ্রে সামরিক শাসনভার।
হসামউদ্দিন ইওয়াজ খিলজী: দেবকোট ও আশপাশের এলাকার দায়িত্ব।
মুহাম্মদ শিরান খিলজী: দক্ষিণ ও পূর্ব সীমান্তের প্রশাসনিক ও সামরিক প্রধান।

আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন

বখতিয়ার কেবল বিজয়ী সেনাপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক।

মুদ্রা প্রচলন: তিনি কুতুবউদ্দিন আইবেকের আনুগত্য স্বীকার করে হলেও লখনৌতিতে নিজস্ব নামে এবং সুফিসাধকদের সম্মানে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা জারি করেন।

ইসলামিক অবকাঠামো: রাজ্যজুড়ে তিনি অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা (শিক্ষা কেন্দ্র) এবং সুফি খানকাহ্ নির্মাণ করেন। মধ্য এশিয়া ও পারস্য থেকে আসা আলেম, সুফি ও চিকিৎসকদের তিনি রাজকীয় ভাতা প্রদান করতেন।

ধর্মীয় সহাবস্থান: সাধারণ প্রজাদের ওপর তিনি কোনো জোরপূর্বক ধর্মান্তর চাপিয়ে দেননি। বরং সেন আমলের কঠোর জাতিভেদপ্রথায় নিপীড়িত নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী তুর্কিদের সমতাভিত্তিক সামাজিক আচরণ দেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হতে শুরু করে।

তিব্বত অভিযান: বখতিয়ার খিলজীর ট্র্যাজিক পরিণতি (১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ)

বাংলা ও বিহার জয় করার পর বখতিয়ারের বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা আরও বেড়ে যায়। ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক অথচ ট্র্যাজিক সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করেন তিব্বত অভিযান

অভিযানের কারণ ও পরিকল্পনা

তিব্বত অভিযানের পেছনে বখতিয়ারের তিনটি প্রধান কৌশলগত কারণ ছিল:

বাণিজ্যিক পথ দখল: তিব্বত ও চীনের সাথে যুক্ত প্রাচীন রেশম পথ (Silk Route) এবং ঘোড়া আমদানির পাহাড়ি পথটি নিয়ন্ত্রণ করা।

ভৌগোলিক নিরাপত্তা: তুর্কি রাজ্যের উত্তর সীমানাকে পুরোপুরি শত্রুমুক্ত করা।

সম্পদ আহরণ: তিব্বতের বৌদ্ধ মঠগুলোতে গচ্ছিত অঢেল সম্পদের খবর।

অভিযানের পূর্বে বখতিয়ার মেচ উপজাতির এক স্থানীয় নেতাকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন, যার নাম রাখা হয় আলী মেচ। আলী মেচ তিব্বতগামী দুর্গম পাহাড়ি পথের পথপ্রদর্শক (গাইড) হিসেবে কাজ করেন।

কামরূপের কৌশল ও তিব্বতের বিপর্যয়

১২০৬ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে বখতিয়ার ১০,০০০ বাছাই করা অশ্বারোহী সেনা নিয়ে লখনৌতি থেকে রওয়ানা হন। তিনি ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদী পার হয়ে তিব্বতের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন।

পথিমধ্যে কামরূপের (আসাম) রাজা বখতিয়ারের সাথে মিত্রতার ভান করেন এবং পরামর্শ দেন যে, বর্ষাকালের পর অভিযান চালাতে। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী বখতিয়ার থামেননি।

পর্বতের দুর্গম গিরিপথ অতিক্রম করে খিলজী বাহিনী তিব্বতের সীমান্তে পৌঁছায়। কিন্তু সেখানকার পাহাড়ি তিব্বতি সৈন্যরা তুর্কিদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায় এবং চারপাশের শস্যখেত পুড়িয়ে দিয়ে খাদ্য সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পাহাড়ি শীত, চরম খাদ্যসংকট এবং তিব্বতিদের প্রতিরোধে বাধ্য হয়ে বখতিয়ার পিছু হটার নির্দেশ দেন।

করতোয়ার পাথরের সেতু ও ট্র্যাজেডি

পলায়নরত ক্লান্ত খিলজী বাহিনী যখন কামরূপের মধ্য দিয়ে ফিরে আসছিল, তখন কামরূপের রাজা নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে পেছন থেকে অতর্কিত হামলা চালান। কামরূপ সেনারা নদীর ওপর অবস্থিত একমাত্র পাথরের বড় সেতুটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।

তুর্কি সেনারা উত্তাল করতোয়া/তিস্তা নদী সাঁতরে পার হতে গিয়ে হাজার হাজার সেনা ডুবে মারা যায়। ১০,০০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর মধ্যে মাত্র কয়েকশ সৈন্য নিয়ে বখতিয়ার কোনোমতে দেবকোটে (বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ) ফিরে আসতে সক্ষম হন।

দেবকোটে শেষ দিন ও হত্যাকাণ্ড

তিব্বত অভিযানের এই চরম বিপর্যয় বখতিয়ারকে সামাজিকভাবে ও মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দেয়। তিনি তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন এবং শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দেই দেবকোটে অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকাকালে তাঁরই এক সেনাপতি আলী মর্দান খিলজী বিষ প্রয়োগে বা ছুরিকাঘাতে এই মহান তুর্কি বীরকে হত্যা করেন।

দেবকোটেই বখতিয়ার খিলজীকে সমাহিত করা হয় (যদিও দিনাজপুরের পীরগঞ্জে তাঁর মাজার রয়েছে বলে স্থানীয় লোকবিশ্বাস রয়েছে)।

বখতিয়ার খিলজীর জীবন ও অভিযানসূচির পরিক্রমা

বছর / সময়কাল

ঘটনার স্থান / পর্যায়

ঘটনার বিবরণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা

ফলাফলের গুরুত্ব

১১৭০-১১৯০ (আনু.)

গরমশির, আফগানিস্তান

বখতিয়ার খিলজীর জন্ম ও দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ।

ভাগ্যান্বেষণে গজনী ও ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা।

১১৯৫ (আনু.)

গজনী ও দিল্লি

খর্বকায় ও দীর্ঘবাহু গঠনের কারণে সামরিক পদে প্রত্যাখ্যাত।

পূর্ব ভারতে বদাউন ও অযোধ্যায় আগমন।

১১৯৭-১২০২

ভিউলী ও ভগত (অযোধ্যা)

সীমান্ত প্রধান হিসেবে জায়গীর লাভ; পার্শ্ববর্তী সীমান্ত রেইড।

নিজস্ব খিলজী অশ্বারোহী বাহিনী গঠন ও অর্থ আহরণ।

১২০৩ খ্রিষ্টাব্দ

দক্ষিণ বিহার

ওদন্তপুরী বিহার জয় এবং বিহার অঞ্চলের অধিপতি হওয়া।

কুতুবউদ্দিন আইবেক কর্তৃক রাজকীয় খিলআত লাভ।

১২০৪ (মে)

নদীয়া (বাংলা)

১৮ জন অশ্বারোহী সেনাসহ নদীয়া প্রাসাদে অতর্কিত হামলা।

লক্ষণ সেনের বিক্রমপুরে পলায়ন; সেন শাসনের পতন।

১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ

লখনৌতি (গৌড়)

নতুন রাজধানী স্থাপন; মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা।

বাংলার প্রথম স্থায়ী মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা।

১২০৬ (মার্চ-মে)

তিব্বত ও কামরূপ

তিব্বত অভিযান; খাদ্য সংকট ও করতোয়া নদীতে সেতু ধ্বংস।

১০,০০০ সৈন্যের মধ্যে সিংহভাগের মৃত্যু; বিপর্যয়।

১২০৬ (শেষভাগ)

দেবকোট (উত্তর বাংলা)

অসুস্থ অবস্থায় সেনাপতি আলী মর্দান খিলজীর হাতে হত্যা।

বখতিয়ার খিলজীর শাসনের অবসান ও খিলজী গৃহযুদ্ধ।

বখতিয়ার-উত্তর লখনৌতি: খিলজী মালিকদের গৃহযুদ্ধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব (১২০৬-১২২৭)

১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে তিব্বত অভিযান থেকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে দেবকোটে ফেরার পর বখতিয়ার খিলজী শয্যাশায়ী হন এবং সেখানেই তাঁর অন্যতম সেনাপতি আলী মর্দান খিলজী-র হাতে নিহত হন। বখতিয়ারের মৃত্যুর পর লখনৌতির নতুন স্বাধীন রাজ্যটি চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। বখতিয়ারের বিশ্বস্ত তিন প্রধান সামরিক অধিনায়ক (ইক্তাদার) মুহাম্মদ শিরান খিলজী, হিসামউদ্দিন ইওয়াজ খিলজী এবং আলী মর্দান খিলজী ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন।

মুহাম্মদ শিরান খিলজী ও প্রারম্ভিক প্রতিশোধ

বখতিয়ারের মৃত্যুর খবর পেয়ে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি মুহাম্মদ শিরান খিলজী দ্রুত সৈন্যদল নিয়ে দেবকোটে আসেন। তিনি বখতিয়ারের হত্যাকারী আলী মর্দান খিলজীকে পরাস্ত করে বন্দি করেন এবং খিলজী মালিকদের সম্মতিক্রমে লখনৌতির শাসনভার গ্রহণ করেন।

তবে বন্দিদশা থেকে পালিয়ে আলী মর্দান দিল্লিতে গিয়ে সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের কাছে আশ্রয় নেন এবং লখনৌতি আক্রমণে দিল্লিকে প্ররোচিত করেন। কুতুবউদ্দিনের নির্দেশে অযোধ্যার সুবাদার কায়মাজ রুমী লখনৌতি আক্রমণ করলে শিরান খিলজী পরাজিত হন এবং পরবর্তী অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে নিহত হন।

আলী মর্দান খিলজীর শাসন ও নির্মমতা (১২১০-১২১২)

কুতুবউদ্দিন আইবেকের সহায়তায় আলী মর্দান খিলজী ১২১০ খ্রিষ্টাব্দে লখনৌতির ক্ষমতা লাভ করেন। ১২১০ খ্রিষ্টাব্দে লাহোরে কুতুবউদ্দিনের মৃত্যুর পর আলী মর্দান নিজেকে স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন এবং 'সুলতান আলাউদ্দিন' উপাধি গ্রহণ করেন।

তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ক্রূর ও অত্যাচারী শাসক। সামান্য অপরাধে তিনি খিলজী আমির ও স্থানীয় অধিবাসীদের মৃত্যুদণ্ড দিতেন। তাঁর এই অত্যাচারী শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে খিলজী অভিজাত সম্প্রদায় গোপনে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং ১২১২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে হত্যা করে।

গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খিলজী: লখনৌতির প্রকৃত সংগঠক (১২১২-১২২৭)

আলী মর্দানের পন্থার বিপরীতে হিসামউদ্দিন ইওয়াজ খিলজী (যিনি 'সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খিলজী' নাম ধারণ করেন) লখনৌতির সিংহাসনে আরোহণ করে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেন। তিনি ছিলেন একাধারে দূরদর্শী সামরিক নেতা, স্থাপত্য অনুরাগী এবং দক্ষ প্রজা হিতৈষী শাসক।

রাজধানী স্থানান্তর: তিনি কৌশলগত কারণে রাজধানী দেবকোট থেকে পুনর্নির্মাণ করে গৌড় বা লক্ষ্মণাবতীতে স্থানান্তর করেন এবং শহরের প্রতিরক্ষার জন্য 'বসনকোট' নামক এক দুর্গ নির্মাণ করেন।

নৌবাহিনী ও সড়ক অবকাঠামো: নদীমাতৃক বাংলায় তুর্কি অশ্বারোহী বাহিনীর সীমাবদ্ধতা বুঝে ইওয়াজ খিলজীই প্রথম বাংলা নৌবাহিনী গড়ে তোলেন। বর্ষাকালে লখনৌতির যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে তিনি গৌড় থেকে দেবকোট এবং লখনৌর (বীরভূম) পর্যন্ত দীর্ঘ উঁচু আইল বা বাঁধের মতো সড়ক নির্মাণ করেন, যা বর্ষার পানি প্লাবিত অঞ্চলকে পারাপারের উপযোগী করে তুলেছিল।

স্বাধীন মুদ্রা ও খিলাফতের স্বীকৃতি: তিনি দিল্লির তোয়াক্কা না করে নিজস্ব রৌপ্যমুদ্রা জারি করেন এবং বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা আল-নাসিরের স্বীকৃতি লাভ করে নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ: তিনি কামরূপ (আসাম), ত্রিহুত (বিহার), এবং উড়িষ্যার কিছু অংশে অভিযান চালিয়ে কর আদায় করেন এবং সীমানা বিস্তৃত করেন।

১২২৭ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের পুত্র নাসিরউদ্দিন মাহমুদ লখনৌতি আক্রমণ করেন। ইওয়াজ খিলজী বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত ও নিহত হন, যার মাধ্যমে লখনৌতি সাময়িকভাবে দিল্লির অধীনে একটি প্রদেশে পরিণত হয়।

তুর্কি-খিলজী সামরিক ব্যবস্থার বিশেষত্ব ও রণকৌশল

বখতিয়ার খিলজী ও তাঁর পরবর্তী তুর্কি যোদ্ধাদের সফলতা কেবল হঠাৎ আক্রমণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। তাঁদের সামরিক ব্যবস্থার পেছনে ছিল সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব।

অশ্বারোহী ধনুর্বিদ (Mounted Archers) ও গতির খেলা

মধ্য এশিয়ার খিলজী ও তুর্কিদের প্রধান শক্তি ছিল তাঁদের দ্রুতগামী জাতঘোড়া এবং চলন্ত অবস্থায় ধনুক থেকে নিখুঁত নিশানা হানার ক্ষমতা (Mounted Archery)।

ধাতব রিকাব (Iron Stirrups): তুর্কিরা লোহার শক্ত রিকাব ব্যবহার করত, যা অশ্বারোহীকে চলন্ত ঘোড়ার ওপর দাঁড়িয়ে চারদিকে ঘুরে তীর ছুড়তে সাহায্য করত।

সংমিশ্রণ ধনুক (Composite Bow): কাঠ, শিং ও রডের সমন্বয়ে তৈরি এই ধনুকগুলো আকারে ছোট হলেও এর ভেদনক্ষমতা ছিল প্রথাগত বাঁশের ধনুকের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

স্থানীয় সেন বাহিনীর দুর্বলতা

তৎকালীন সেন রাজাদের সেনাবাহিনী প্রধানত নির্ভর করত ধীরগতির পদাতিক বাহিনী এবং বিশালাকার হস্তীবাহিনীর ওপর। হস্তীবাহিনী খোলামাঠে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও তুর্কিদের দ্রুতগতির গতিশীল আক্রমণ এবং শোরগোলের মুখে অনেক সময় ক্ষিপ্ত হয়ে নিজেদের পদাতিক বাহিনীকেই দলিত করত।

সেনদের রিক্রুটমেন্ট ব্যবস্থা ছিল সামন্তভিত্তিক; ফলে হঠাৎ আক্রমণের মুখে দ্রুত বিশাল বাহিনী জড়ো করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হতো না।

বাংলা বিজয়ের দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

বখতিয়ার খিলজীর এই অভিযানের ফলে কেবল শাসক পরিবর্তন হয়নি, বরং বাংলার সমাজ কাঠামো, ধর্মীয় বিন্যাস এবং অর্থনীতিতে এক আমূল বিপ্লব সূচিত হয়েছিল।

সামাজিক কাঠামো ও জাতপ্রথার শিথিলতা

সেন রাজাদের আমলে (বিশেষ করে বল্লাল সেনের সময়ে) বাংলায় কঠোর কৌলিন্য প্রথা এবং জাতিভেদ প্রথা প্রবর্তন করা হয়। এর ফলে নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং বৌদ্ধ সমাজ চরম সামাজিক বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হতো।

খিলজীদের আগমনের ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় ভেদাভেদহীন প্রশাসনিক সুযোগ তৈরি হয়। ইসলাম ধর্মে বর্ণিত সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এবং সুফিদের সংস্পর্শে এসে স্থানীয় নিম্নবর্ণের অসংখ্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, যা বাংলায় এক নতুন জনসংখ্যাতাত্ত্বিক গঠন (Demographic shift) তৈরি করে।

সুফি-সাধক ও খানকাহ সংস্কৃতির উত্থান

বখতিয়ার ও তাঁর উত্তরসূরিরা কেবল সৈন্য আনেননি, তাঁদের বিজয়ের পথ ধরে মধ্য এশিয়া, পারস্য ও উত্তর ভারত থেকে বহু বিখ্যাত সুফি-সাধক, দরবেশ ও আলেম বাংলায় আগমন করেন।

হযরত শাহ সুলতান বলখী (বগুড়া), শেখ জালালউদ্দিন তাবরিজি (দেউতলা/পান্ডুয়া), এবং বাবা আদম শহীদ (বিক্রমপুর)-এর মতো সুফি সাধকরা খানকাহ ও আস্তানা স্থাপন করেন। এই খানকাহগুলো কেবল ধর্মপ্রচারের কেন্দ্র ছিল না; এগুলো বিনামূল্যে অন্নদান (লঙ্গরখানা), চিকিৎসা পরিষেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করত।

অর্থনীতিতে রূপার মুদ্রার প্রত্যাবর্তন ও নগরায়ন

পাল ও সেন আমলে বাংলার স্থানীয় অর্থনীতি মূলত কড়ি এবং কৃষিনির্ভর বিনিময়ের ওপর নির্ভর করত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ছিল সীমিত।

তঙ্কা বা রূপার মুদ্রা: খিলজী সুলতানরা লখনৌতি থেকে রৌপ্য মুদ্রা (তঙ্কা) জারি করা শুরু করলে বাংলায় আবার ধাতুভিত্তিক মুদ্রা অর্থনীতি চালু হয়।

নগরায়ন: গৌড়, দেবকোট, সোনারগাঁও, এবং পরে পান্ডুয়া নতুন নতুন বাণিজ্যিক নগরী হিসেবে গড়ে ওঠে। পারস্য ও আরবের ব্যবসায়ীদের সাথে সমুদ্র ও স্থলপথে বাংলার মসলিন, চাল ও রেশমের বাণিজ্য পুনরায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

সেন রাজবংশের চূড়ান্ত গতিপথ ও পূর্ব বাংলা (বিক্রমপুর)

অনেক সময় মনে করা হয় বখতিয়ারের নদীয়া বিজয়ের সাথেই সেন বংশ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, যা একটি ঐতিহাসিক ভুল ধারণা। বখতিয়ার জয় করেছিলেন মূলতঃ উত্তর ও পশ্চিম বাংলা (লখনৌতি ও বরেন্দ্র)।

বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেনের রাজত্ব: নদীয়া থেকে পালিয়ে আসার পর লক্ষণ সেন বিক্রমপুরে এসে আরও কয়েক বছর শাসন করেন। ১২০৬-এ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন এবং কেশব সেন পূর্ব বাংলায় (ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চল) স্বাধীনভাবে রাজত্ব পরিচালনা করেন।

তাম্রশাসনের প্রমাণ: কেশব সেনের প্রাপ্ত তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, তাঁরা নিজেদের ‘গৌড়েশ্বর’ উপাধিতে ভূষিত রাখতেন এবং খিলজী শক্তির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দাবি করতেন।

চূড়ান্ত বিলুপ্তি: ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সেনদের দুর্বলতার সুযোগে পূর্ব বাংলায় দেব রাজবংশ (যেমন রাজা দশরথ দেব বা দানুজমর্দন দেব) ক্ষমতা দখল করে। অবশেষে ১২৮১ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবান সোনারগাঁও অভিযান চালালে পূর্ব বাংলায় স্বাধীন হিন্দু রাজবংশের শাসনের অবসান ঘটে এবং সমগ্র বাংলা একক মুসলিম সালতানাতের অধীনে আসে।

আধুনিক ইতিহাস চর্চায় বখতিয়ার খিলজীর মূল্যায়ন

বখতিয়ার খিলজী ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসচর্চায় অন্যতম বিতর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে মূল্যায়ন করা হয়েছে:

ঔপনিবেশিক ও সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চা: ১৯শ শতকে ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা (যেমন এইচ. এম. এলিয়ট ও জন ডাউসন) এবং পরবর্তীতে কিছু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় ঐতিহাসিক বখতিয়ার খিলজীকে কেবল একজন 'বর্বর ধ্বংসকারী', 'মন্দির ও বিহার পুড়িয়ে প্রদানকারী' এবং 'অনুকম্পাহীন লুটেরা' হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। এই মূল্যায়নে খিলজীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণের মতো বিষয়গুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়।

বস্তুনিষ্ঠ ও আধুনিক গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গি: আধুনিক ইতিহাসবিদদের (যেমন যদুনাথ সরকার, এম. এ. রহিম, এবং সাইয়্যেদ আমীর আলী) মতে, বখতিয়ারকে বিচার করতে হবে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যযুগীয় কঠোর রাজনৈতিক বাস্তবতা দিয়ে:

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বনাম ধর্মীয় ধ্বংসাত্মকতা: বখতিয়ারের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজ্য বিস্তার ও সম্পদ সংগ্রহ করে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করা। তিনি ওদন্তপুরী জয় করেছিলেন সেটাকে সামরিক দুর্গ মনে করে।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতা: তৎকালীন যুগে যেকোনো বিজয়ী রাজাই (সে হিন্দু, বৌদ্ধ বা মুসলিম যাই হোক) বিজিত অঞ্চলের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা ধ্বংস করতেন। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ ভারতের চোল রাজারা যখন বাংলায় আক্রমণ করেছিলেন, তারাও বহু মন্দির ও গ্রাম ধ্বংস করেছিলেন।

নতুন সংস্কৃতির জনক: বখতিয়ার বাংলায় এমন এক যুগের সূচনা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের আমলে 'বাঙালি' জাতীয়তাবাদ ও বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তি তৈরি করেছিল।

বখতিয়ার খিলজীর ঐতিহাসিক প্রভাব, সমালোচনা ও আধুনিক মূল্যায়ন

ইতিহাসের ক্যানভাসে বখতিয়ার খিলজী এক অনন্য ও বহুধা বিভক্ত ব্যক্তিত্ব। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর মূল্যায়ন ভিন্নভাবে করা হয়ে থাকে।

নেতিবাচক সমালোচনা ও অপবাদ

হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজবংশগুলোর ইতিহাস এবং আধুনিককালের কিছু ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিকদের লেখনীতে বখতিয়ারকে একজন নির্মম আক্রমণকারী ও ধ্বংসকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

প্রাচীন শিক্ষা কেন্দ্র ধ্বংস: ওদন্তপুরী ও নালন্দার ক্ষতিসাধনকে ঐতিহাসিকরা প্রাচীন ভারতের শিক্ষা ও জ্ঞানের ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখেন।

রাজনৈতিক নিষ্কাশন: বিজয়ের উদ্দেশ্যে নদীয়া শহরে লুণ্ঠন ও রক্তপাত চালানের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।

আধুনিক ইতিহাস ও সাহিত্যে বখতিয়ার খিলজীর মূল্যায়ন

বখতিয়ার খিলজী ইতিহাসজুড়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়িত হয়েছেন।

সনাতন ও বৌদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি: অনেক হিন্দু ও বৌদ্ধ ঐতিহাসিক বখতিয়ারকে একজন নির্দয় ধ্বংসকারী, লুণ্ঠনকারী এবং বৌদ্ধ বিহার ও প্রাচীন পুথি ধ্বংসের জন্য দায়ী ব্যক্তি হিসেবে মনে করেন।

জাতীয়তাবাদী ও আধুনিক মুসলিম সাহিত্য: অন্যদিকে, মুসলিম এবং আধুনিক রিভিশনিস্ট গবেষকরা তাঁকে বাংলায় রাজনৈতিক ভূ-সংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী এবং সামন্ততান্ত্রিক প্রথা ভাঙার নায়ক হিসেবে দেখেন।

কবি আল মাহমুদের 'বখতিয়ারের ঘোড়া': বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার অন্যতম দিকপাল কবি আল মাহমুদ তাঁর প্রখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’-তে খিলজীকে কেবল একজন বিজেতা হিসেবে নন, বরং নিপীড়িত জনতার শৃঙ্খলমোচনকারী ও বাংলার নতুন পুনর্জাগরণের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কবি লিখেছেন:

"বখতিয়ারের ঘোড়া আজও যেন বাংলার প্রান্তরে প্রান্তরে নতুন আশার বার্তা নিয়ে ছুটিয়ে চলেছে..."

উপসংহার

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয় কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। এটি ছিল এক অসম্ভবের সমীকরণকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প।

গজনী ও দিল্লির দরবারে চেহারার কুরুচিপূর্ণতা ও খর্বকায় শারীরিক গঠনের জন্য যে সৈনিকটি একসময় একবেলা খাবারের চাকুরীর জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, সেই লোকটিরই অদম্য আত্মবিশ্বাস, ভৌগোলিক বুদ্ধি ও নিখুঁত রণকৌশল ৮০০ বছর আগে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছিল।

ঝাড়খণ্ডের জঙ্গল পেরিয়ে ১৮ জন অশ্বারোহী সেনা নিয়ে নদীয়ার রাজপ্রাসাদে তাঁর সেই ঝটিকা হানা আজও বিশ্বের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর স্ট্র্যাটেজিক মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে স্বীকৃত। নদীয়ার রাজপ্রাসাদের পিছনের দরজা দিয়ে রাজা লক্ষণ সেনের পলায়ন কেবল একজন বৃদ্ধ রাজার আত্মরক্ষা ছিল না; সেটি ছিল বাংলায় সাড়ে তিনশত বছরের হিন্দু রাজত্বের চূড়ান্ত অবসান এবং পরবর্তী পাঁচশত বছরের এক সমৃদ্ধ, গতিশীল ও বৈচিত্র্যময় মুসলিম শাসনের শুভ সূচনা।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.