বেঙ্গালুরু ভারতের সিলিকন ভ্যালি - গার্ডেন সিটি থেকে এশিয়ার টেক-ক্যাপিটাল

বেঙ্গালুরু ভারতের সিলিকন ভ্যালি - গার্ডেন সিটি থেকে এশিয়ার টেক-ক্যাপিটাল

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথা উঠলেই সাধারণ মানুষের মানসপটে সাধারণত ভেসে ওঠে ঐতিহাসিক শহর কলকাতা, রাজধানী নতুন দিল্লি কিংবা অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইয়ের কথা। কিন্তু ভারতের সর্বদক্ষিণের কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরু (বা ব্যাঙ্গালোর) নিয়ে সার্বিক আলোচনা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম হয়। অথচ দাক্ষিণাত্যের মালভূমির ওপর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত, ১ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষের এই মহানগরী আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিশ্বে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করে চলেছে।

একসময় যে শহরকে ব্রিটিশ আমল বা স্বাধীন ভারতের সূচনালগ্নে শান্ত আবহাওয়ার জন্য ‘পেনশনার’স প্যারাডাইস’ (অবসরপ্রাপ্তদের স্বর্গরাজ্য) কিংবা সবুজে ঘেরা উদ্যানগুলোর জন্য ‘গার্ডেন সিটি’ (উদ্যান নগরী) বলা হতো, সেই শহরই আজ এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছে ‘ভারতের সিলিকন ভ্যালি’ খেতাব।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়ায় অবস্থিত মূল 'সিলিকন ভ্যালি' যেমন বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু, ঠিক তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী অর্থনীতির স্পন্দন তৈরি করছে বেঙ্গালুরু। কিন্তু কীভাবে একটি শান্ত, সবুজে ঘেরা অবসর যাপনের শহর রাতারাতি বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ হাব হয়ে উঠল? এর পেছনে রয়েছে চার দশকের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এক অনন্য মেধাবী জনগোষ্ঠীর মেলবন্ধন।

বর্তমান বেঙ্গালুরু: স্টার্টআপ ও প্রযুক্তির প্রাণকেন্দ্র

সশরীরে বেঙ্গালুরু শহরে পা রাখলে এর রূপান্তর চোখের সামনে চাক্ষুষ বাস্তবতায় ধরা পড়ে। সাপ্তাহিক কর্মদিবসে সকাল ৮টা বাজার আগেই শহরের ইলেকট্রনিক সিটি, হোয়াইটফিল্ড কিংবা আউটার রিং রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে দেখা যায় বহুজাতিক কোম্পানির বাস আর হাজার হাজার ব্যক্তিগত যানবাহনের দীর্ঘ যানজট। ১ কোটি ২০ লক্ষাধিক অধিবাসীর পদচারণায় মুখরিত এই শহরের বাতাসে যেন সবসময় তাড়া করার তাগিদ। ঐতিহ্যবাহী দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি এখানে গড়ে উঠেছে আধুনিক পপ-কালচার, বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও নাইটলাইফ যা চিরাচরিত রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজব্যবস্থার সাথে এক অনন্য বৈপরীত্য তৈরি করে।

তবে দৃশ্যমান আধুনিকতার গভীরে তাকালে দুটি প্রধান পেশাজীবী শ্রেণিকে বেঙ্গালুরুর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়: প্রকৌশলী (Engineers) এবং উদ্যোক্তা (Entrepreneurs)। আর এদের দৈনন্দিন আলোচনার সবচেয়ে জনপ্রিয় শব্দটি হলো ‘স্টার্টআপ’ (Startup)

প্রতি সপ্তাহেই শহরের বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্ট বা হোস্টেল রুম থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ। এর ফলে বেঙ্গালুরু পরিণত হয়েছে সমগ্র এশিয়ার অন্যতম গতিশীল স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পরিসংখ্যান

গ্লোবাল স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম রিপোর্ট: ২০১৮ সালে মাত্র ১২ মাসে বেঙ্গালুরুতে ১৫৩টিরও বেশি সফল স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। 'গ্লোবাল স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম রিপোর্ট ২০১৯'-এ বেঙ্গালুরু বিশ্বে ১৮তম অবস্থান অর্জন করে।

বিশ্বের সবচেয়ে বৈশ্বিক ও গতিশীল শহর: বিশিষ্ট রিয়েল এস্টেট ও প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা জেএলএল (JLL)-এর 'সিটি মোমেন্টাম ইনডেক্স ২০১৭'-এ প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও উদ্ভাবনী সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে বেঙ্গালুরুকে বিশ্বের সবচেয়ে গতিশীল নগরীর খেতাব দেওয়া হয়।

গ্লোবাল আইটি জায়ান্টদের ঠিকানা: যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে যেমন অ্যাপল, গুগল, মেটা ও এনভিডিয়ার সদর দপ্তর অবস্থিত, বেঙ্গালুরুও একইভাবে বৈশ্বিক টেক জায়ান্টদের ভারতীয় ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। এখানে অ্যামাজন, আইবিএম, মাইক্রোসফট, অ্যাপল, ইনটেল, সিসকো, অ্যাডোবি, গুগল, স্যামসাং, নোকিয়া ও সিমেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তম গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে।

ভারতীয় অর্থনীতি ও আইটি খাতে বেঙ্গালুরুর প্রভাব

ভারত বর্তমানে বৈশ্বিক সফটওয়্যার ও আইটি পরিষেবার অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশ। ভারতে আইটি এবং আইটি-এনাবল্ড সার্ভিসেস (ITeS) খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) মানুষ কর্মরত। এই খাত থেকে প্রতি বছর ৮৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য ও সেবা বিদেশে রপ্তানি হয়।

বিস্ময়কর তথ্য হলো, ভারতের এই বিপুল আইটি রপ্তানি আয়ের এককভাবে প্রায় ৪০ শতাংশ যোগান দেয় কেবল বেঙ্গালুরু நகரம்

ভারত সরকার যখন দেশের অর্থনীতিকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তখন সেই অর্থনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে বড় কাণ্ডারি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বেঙ্গালুরু।

তবে মূল সিলিকন ভ্যালির সাথে অর্থনৈতিক আকারের দিক থেকে বেঙ্গালুরুর পার্থক্য এখনো বেশ বড়। যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়ার নিজস্ব অর্থনীতিই প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের সমতুল্য, যা এককভাবে গোটা ভারতের জিডিপির কাছাকাছি। তা সত্ত্বেও, প্রযুক্তি পণ্যের উদ্ভাবন, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ বাজার দখলের ক্ষেত্রে বেঙ্গালুরু আজ বিশ্বমঞ্চে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছে।

ইতিহাসের পাতায় বেঙ্গালুরু: কীভাবে শুরু হয়েছিল প্রযুক্তি বিপ্লব?

আজকের টেক-ক্যাপিটাল বেঙ্গালুরু কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং ১৯৮০-এর দশকের সফটওয়্যার নীতি।

প্রাক-আইটি পর্ব: গবেষণাগার ও ভারী শিল্পের ভিত্তি (১৯০৯-১৯৭০)

অনেকেই মনে করেন বেঙ্গালুরুর আইটি যাত্রা ১৯৮০-এর দশকে শুরু হয়েছিল। কিন্তু এর প্রকৃত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ১৯০৯ সালে, যখন শিল্পপতি জামসেটজি টাটা এবং মহীশূরের রাজপরিবারের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স' (IISc)

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর ভারত গড়ার লক্ষ্যে কৌশলগতভাবে বেঙ্গালুরুকে বেছে নেন। কারণ শহরটির চমৎকার আবহাওয়া এবং ভৌগোলিক অবস্থান একে শত্রুভাবাপন্ন যেকোনো প্রতিবেশী দেশের সম্ভাব্য বিমান হামলা থেকে নিরাপদ রেখেছিল। ফলে ভারতের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ গবেষণার প্রধান সংস্থাগুলো এখানে স্থাপিত হয়:

এইচএএল (Hindustan Aeronautics Limited - HAL): বিমান ও অ্যারোস্পেস নির্মাণ কারখানা।
বিইএল (Bharat Electronics Limited - BEL): সামরিক ও বেসামরিক ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকারক।
আইটিআই (Indian Telephone Industries - ITI): ভারতের প্রথম সরকারি টেলিকম কারখানা।
ইসরো (ISRO): ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, যার সদর দপ্তর বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত।
ডিআরডিও (DRDO): প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার একাধিক ল্যাবরেটরি।

এই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো (PSU) বেঙ্গালুরুতে হাজার হাজার দক্ষ প্রকৌশলী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক বিশাল অবকাঠামো এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়, যা পরবর্তী সফটওয়্যার বিপ্লবের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।

আশির দশক: উইপ্রো, ইনফোসিস ও নতুন সফটওয়্যার নীতি (১৯৮০-১৯৮৯)

১৯৮০-এর দশকের শুরুতে বেঙ্গালুরুর রূপান্তরে মূল অনুঘটক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ভারতীয় বেসরকারি খাত ও সরকার:

দেশীয় আইটি প্রতিষ্ঠানের আগমন: ১৯৮৩ সালে আজিম প্রেমজির 'উইপ্রো' (Wipro) এবং নারায়ণ মূর্তির 'ইনফোসিস' (Infosys - যা পুনে থেকে তাদের সদর দপ্তর বেঙ্গালুরুতে সরিয়ে আনে) শহরটিতে বড় পরিসরে কার্যালয় স্থাপন করে। তারা স্থানীয় ভারতীয় প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রোগ্রামিং ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে নিয়োগ দেওয়া শুরু করে।

১৯৮৪ সালের নতুন কম্পিউটার ও সফটওয়্যার নীতি: ভারতের তৎকালীন তরুণ প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ১৯৮৪ সালে বৈপ্লবিক কম্পিউটার ও সফটওয়্যার নীতি প্রণয়ন করেন। এর ফলে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার আমদানি-রপ্তানির শুল্ক কমানো হয় এবং কম্পিউটার ব্যবহারের প্রশাসনিক অনুমোদন সহজ করা হয়।

টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টের আগমন (১৯৮৫): ১৯৮৫ সালে প্রথম প্রধান মার্কিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে 'টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্ট' (Texas Instruments) বেঙ্গালুরুতে তাদের ডেভেলপমেন্ট সেন্টার খোলে। তারা স্যাটেলাইট ডিশ বসিয়ে বেঙ্গালুরু থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাসে কোডিং ডেটা ট্রান্সফার করত। এটি দেখে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য পশ্চিমা টেক কোম্পানিগুলোও ভারতের সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পারে।

পশ্চিমা দেশের লাভ ও ভারতীয় আউটসোর্সিং ব্যবস্থা

ওয়েস্টার্ন কোম্পানিগুলো বেঙ্গালুরুকে বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ ছিল খরচের সাশ্রয়। সিলিকন ভ্যালির একজন আমেরিকান প্রকৌশলীকে যে বেতন দিতে হতো, তার ১০ ভাগের এক ভাগ খরচে বেঙ্গালুরুর সমান দক্ষ ভারতীয় প্রকৌশলীদের দিয়ে কাজ করানো যেত।

তবে শুরুর দিকে এই প্রক্রিয়ায় একটি বড় সমস্যা ছিল। ৮০ ও ৯০-এর দশকে ভারতীয় আইটি প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত পশ্চিমাদের দেওয়া নিম্নমানের সাব-কনট্র্যাক্টিং, কম জটিল কোডিং বা ব্যাগ্রাউন্ড ব্যাক-অফিস সাপোর্ট দিত। ফলে বিশ্ববাজারে "ভারতীয় সফটওয়্যার মানেই কম দামের নিম্নমানের কাজ" এমন একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় মেধা দ্রুত নিজেদের মান উন্নত করে সেই দুর্নাম ভুলিয়ে দেয়।

ব্রেইন ড্রেন থেকে ব্রেইন গেইন: স্টার্টআপ বিপ্লবের সূচনা

১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে ভারতীয় মেধার উৎকর্ষ নিয়ে বিশ্বে কোনো সন্দেহ ছিল না, কিন্তু দেশে উপযুক্ত সুযোগের অভাবে ভারতের সেরা প্রকৌশলীরা দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাতেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হতো ‘ব্রেইন ড্রেন’ (Brain Drain) বা মেধা পাচার। আজ সুন্দর পিচাই (গুগল), সত্য নাদেলা (মাইক্রোসফট) কিংবা শান্তনু নারায়েনের (অ্যাডোবি) মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের বৈশ্বিক টেক জায়ান্টদের শীর্ষ পদে দেখার পেছনে এই ব্রেইন ড্রেনের বড় ভূমিকা ছিল।

কিন্তু ২০১০ সালের পর থেকে এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। একে বলা হয় ‘ব্রেইন গেইন’ (Brain Gain) বা মেধার প্রত্যাবর্তন।

স্বদেশী স্টার্টআপের বিশ্বজয়

মেধাবী ভারতীয়রা আর কেবল মার্কিন কোম্পানিতে চাকরি করাকে জীবনের চরম সাফল্য বলে মনে করল না; বরং নিজ দেশে বিশ্বমানের প্রযুক্তি কোম্পানি তৈরি করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। আর সেই স্বপ্নের জন্মভূমি হলো বেঙ্গালুরু:

ফ্লিপকার্ট (Flipkart): ২০০৭ সালে বেঙ্গালুরুর একটি ছোট্ট ঘরে অ্যামাজনের সাবেক দুই কর্মী শচীন বানসাল ও বিন্নি বানসাল প্রতিষ্ঠা করেন ফ্লিপকার্ট। এটি ভারতের ই-কমার্স বাজার আমূল বদলে দেয়। পরবর্তীতে মার্কিন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট ১৬ বিলিয়ন ডলারে ফ্লিপকার্টকে অধিগ্রহণ করে। ফ্লিপকার্ট সরাসরি ৩০,০০০-এর বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।

ওলা ক্যাবস (Ola Cabs): বিশ্বব্যাপী রাইড শেয়ারিং জায়ান্ট উবারকে ভারতের মাটিতে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি ফেলে ওলা। অ্যাপভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থায় ওলা ভারতের বাজারে নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

অন্যান্য ইউনিকর্ন স্টার্টআপ: ফিনটেক জায়ান্ট ফোনপে (PhonePe), রেজোরপে (Razorpay), ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম সুইগি (Swiggy), এডটেক কোম্পানি বাইজুস (BYJU'S) এবং ব্রোকারেজ প্ল্যাটফর্ম জেরোদা (Zerodha) সবগুলোরই জন্ম ও বিকাশ বেঙ্গালুরুতে।

বেঙ্গালুরুকে 'ভারতের সিলিকন ভ্যালি' বানানোর ৫টি প্রধান অনুঘটক

বেঙ্গালুরু কোনো দুর্ঘটনাচক্রে সিলিকন ভ্যালি হয়ে ওঠেনি; এর পেছনে রয়েছে পাঁচটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক উপাদান:

বিপুল টেকনিক্যাল ট্যালেন্ট পুল (Talent Density): বেঙ্গালুরু তার নিজস্ব জনশক্তি দিয়ে শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে। শহরের ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১০ লক্ষের বেশি মানুষ পেশাদার সফটওয়্যার ডেভেলপার। শহরে ৫০টিরও বেশি স্বীকৃত আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে। প্রতি বছর এখান থেকে হাজার হাজার উচ্চশিক্ষিত প্রকৌশলী পাশ করে বের হচ্ছে, যারা সাথে সাথেই কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে প্রস্তুত।

গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাচুর্য: কেবল প্রকৌশল নয়, প্রযুক্তি গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে বেঙ্গালুরু অনন্য। এখানে রয়েছে- ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (IISc), আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, বেঙ্গালুরু (IIIT-B), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন টেকনোলজি (NIFT), জওহরলাল নেহেরু সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড সায়েন্টিফিক রিসার্চ (JNCASR)।

চমৎকার আবহাওয়া ও ভৌগোলিক সুবিধা: উত্তর বা দক্ষিণ ভারতের অধিকাংশ শহর যখন তীব্র গরম বা আর্দ্রতায় হাসফাস করে, তখন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় বেঙ্গালুরুর আবহাওয়া সারা বছরই চমৎকার, মনোরম ও শীতল থাকে (সাধারণত ১৫° সেলসিয়াস থেকে ৩২° সেলসিয়াসের মধ্যে)। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই মনোরম জলবায়ু বিদেশী বিনিয়োগকারী, সরকারি আমলা এবং বহুজাতিক কোম্পানির নির্বাহীদের বেঙ্গালুরুকে পছন্দ করার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।

সরকারি নীতি ও আইটি পার্ক নির্মাণ: কর্ণাটক সরকার ১৯৭৮ সালেই বেঙ্গালুরু শহরের বাইরে ৩৩২ একর জমিতে প্রতিষ্ঠা করে ‘ইলেকট্রনিক সিটি’ (Electronic City)। পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকে তৈরি হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল টেক পার্ক বেঙ্গালুরু’ (ITPL)। সরকার ডেডিকেটেড হাই-স্পিড স্যাটেলাইট লিঙ্ক, কর ছাড় এবং এক দরজায় প্রশাসনিক সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করে আইটি কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণ করে।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (VC) বিনিয়োগের সহজলভ্যতা: যেখানে ধারণা (Idea) আছে, সেখানে পুঁজিরও প্রয়োজন। বেঙ্গালুরুতে ভারতের বৃহত্তম ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলোর অফিস রয়েছে। সেকুওইয়া ক্যাপিটাল (বর্তমানে Peak XV Partners), অ্যাক্সেল (Accel), টাইগার গ্লোবাল এবং সফটব্যাংকের মতো বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী তহবিলগুলো বেঙ্গালুরুর স্টার্টআপগুলোতে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে।

বেঙ্গালুরু ও মার্কিন সিলিকন ভ্যালির তুলনামূলক বিশ্লেষণ

মূল বিচার্য বিষয় / সূচক

মার্কিন সিলিকন ভ্যালি (স্যান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া)

বেঙ্গালুরু (ভারতের সিলিকন ভ্যালি)

ভৌগোলিক অবস্থান

ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

কর্ণাটক, ভারত (দাক্ষিণাত্যের মালভূমি)

ঐতিহাসিক ভিত্তি

সেমিকন্ডাক্টর ও সামরিক ইলেকট্রনিক্স গবেষণা (Stanford)

বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র (IISc) ও সরকারি ভারী শিল্প (HAL, ISRO)

প্রধান শিল্পকৌশল

উদ্ভাবনী হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, অপারেটিং সিস্টেম ও এআই

আইটি পরিষেবা, আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস (SaaS), ই-কমার্স

গ্লোবাল জায়ান্ট সদর দপ্তর

অ্যাপল, গুগল (অ্যালফাবেট), মেটা, এনভিডিয়া, আইবিএম

উইপ্রো, ইনফোসিস, ফ্লিপকার্ট, সুইগি, ফোনপে, রেজোরপে

এমএনসি আরঅ্যান্ডডি হাব

প্রধান আবিষ্কারক ও পেটেন্ট ধারণকারী অঞ্চল

গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও ইনটেলের বৃহত্তম বৈশ্বিক গবেষণা কেন্দ্র

অর্থনৈতিক স্কেল/প্রভাব

অঞ্চলটির নিজস্ব জিডিপি আনুমানিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার

ভারতের সামগ্রিক আইটি রপ্তানির প্রায় ৪০% অবদান (বার্ষিক ~$৩৪ বিলিয়ন+)

পেশাদার জনশক্তি

বিশ্বজুড়ে আগত উচ্চ দক্ষ আন্তর্জাতিক গবেষক ও প্রকৌশলী

১০ লক্ষাধিক পেশাদার সফটওয়্যার ডেভেলপার (মোট জনসংখ্যার ~৮.৩%)

প্রধান আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ

উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় ও রিয়েল এস্টেটের অতিরিক্ত দাম

নগরায়নের চাপ, তীব্র যানজট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও পানি সংকট

বেঙ্গালুরুর প্রধান আইটি ও টেক পার্কসমূহ

বেঙ্গালুরু শহরের প্রযুক্তি কাঠামোর ভৌগোলিক রূপরেখা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভক্ত, যার প্রতিটি এলাকা নির্দিষ্ট ধরনের আইটি কর্মকাণ্ডের জন্য খ্যাত:

ইলেকট্রনিক সিটি (Electronic City): শহরের দক্ষিণে অবস্থিত ৩৩২ একর আয়তনের এই অঞ্চলটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও পরিকল্পিত আইটি পারফরম্যান্স হাব। ১৯৮০-এর দশকে তৈরি এই টেক পার্কে ইনফোসিস (Infosys), উইপ্রো (Wipro), এইচসিএল (HCL) এবং সিমেন্স (Siemens)-এর সুবিশাল ক্যাম্পাস রয়েছে।

হোয়াইটফিল্ড (Whitefield): শহরের পূর্বে অবস্থিত এই অঞ্চলটি মূলত 'ইন্টারন্যাশনাল টেক পার্ক বেঙ্গালুরু' (ITPL)-এর জন্য পরিচিত। সিঙ্গাপুর ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত আইটিপিএল ভারতজুড়ে হাই-টেক পার্ক তৈরির আদর্শ মডেলে পরিণত হয়। এখানে টিসিএস (TCS), ওরাকল (Oracle), এবং স্যাবের (Sabre)-এর কার্যালয় অবস্থিত।

আউটার রিং রোড (Outer Ring Road - ORR): সিল্ক বোর্ড থেকে হেব্বাল পর্যন্ত বিস্তৃত আউটার রিং রোডকে বলা হয় বেঙ্গালুরুর "বিলিয়ন ডলার কোরিডোর"। বিশ্বের প্রায় সকল প্রধান ফরচুন ৫০০ (Fortune 500) টেক কোম্পানির দপ্তর এই করিডোরে দেখা যায়। জেসিপি প্রিমিয়ার পার্ক, মেনিওটা এম্বাসি বিজনেস পার্ক, এবং ব্রেগম্যান পার্কের মতো বিশালাকার টেক ক্যাম্পাসগুলো এখানেই অবস্থিত।

মান্যতা টেক পার্ক (Manyata Tech Park): উত্তর বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত এই পার্কটি এশিয়ার বৃহত্তম অন্যতম বিজনেস পার্ক, যেখানে ১ লক্ষেরও বেশি আইটি পেশাজীবী কর্মরত। আইবিএম, কগনিজেন্ট, এবং এলঅ্যান্ডটি (L&T)-এর প্রধান অপারেশন এখান থেকেই পরিচালিত হয়।

গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার (GCC)-এর বৈশ্বিক রাজধানী

গত এক দশকে বেঙ্গালুরু কেবল বহুজাতিক কোম্পানির দূরবর্তী সাব-কনট্রাক্টিং হাব থেকে গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার (GCC) বা বৈশ্বিক ইন-হাউস ইনোভেশন হাব-এ রূপান্তরিত হয়েছে।

ইন-হাউস উদ্ভাবন কেন্দ্র: পূর্বে পশ্চিমা ব্যাংক বা খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতীয় আইটি কোম্পানিকে কাজ চুক্তি দিত। বর্তমানে তারা সরাসরি বেঙ্গালুরুতে নিজেদের বিশাল নিজস্ব টেক টিম প্রতিষ্ঠা করছে।

প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা: বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফিন্যান্সিয়াল ও রিটেল কোম্পানি যেমন গোল্ডম্যান স্যাক্স (Goldman Sachs), জেপি মরগান (JPMorgan Chase), ওয়েলস ফার্গো (Wells Fargo), টার্গেট (Target), এবং ওয়ালমার্ট ল্যাবস (Walmart Labs)-এর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্র বেঙ্গালুরুতেই অবস্থিত।

পরিসংখ্যান: ভারতে মোট অবস্থিত ১৬০০-এর বেশি জি সি সি-র প্রায় ৩৫% থেকে ৪০% এককভাবে বেঙ্গালুরুতেই കേന്ദ്രীভূত। এখান থেকে বৈশ্বিক লেনদেন, সাইবার সিকিউরিটি, এবং মূল সফটওয়্যার আর্কিটেকচার নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

ডিপটেক (DeepTech), এআই (AI) এবং ইভি (EV) বিপ্লব

সাধারণ অ্যাপ-ভিত্তিক সেবা ও সফটওয়্যার কাস্টমাইজেশন অতিক্রম করে বেঙ্গালুরু এখন আধুনিক ডিপটেক ও হার্ডওয়্যার উদ্ভাবনে মনোযোগ দিচ্ছে:

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও বিগ ডেটা

গ্লোবাল এআই ল্যাব: গুগল তাদের অন্যতম বিশ্বমানের 'Google AI Research Lab' স্থাপন করেছে বেঙ্গালুরুতে। একই সাথে মাইক্রোসফটের 'Microsoft Research India' ল্যাব এখান থেকে এআই ও কম্পিউটেশনাল সিস্টেম নিয়ে মৌলিক গবেষণা পরিচালনা করছে।

এআই স্টার্টআপ ক্লাস্টার: ভারতে বর্তমানে পরিচালিত মোট এআই স্টার্টআপের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক।

ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) ও মোবিলিটি হাব

অ্যাথার এনার্জি (Ather Energy): ভারতের অন্যতম সফল ই-স্কুটার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাথার-এর জন্ম ও প্রধান গবেষণা সেন্টার বেঙ্গালুরুতে।

ওলা ইলেকট্রিক (Ola Electric): বিশ্বমানের ইলেকট্রিক স্কুটার তৈরির গ্লোবাল হেডকোয়ার্টার ও আরঅ্যান্ডডি বেঙ্গালুরু থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়।

সান মোবিলিটি (SUN Mobility): ব্যাটারি সোয়াপিং বা ব্যাটারি পরিবর্তন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতের শীর্ষস্থানীয় উদ্ভাবন কেন্দ্র এটি।

বায়োটেকনোলজি ও অ্যারোস্পেস: শিল্পের বহুমুখী মাত্রা

আইটি খাতের পাশাপাশি বেঙ্গালুরু ভারতীয় বায়োটেকনোলজি ও অ্যারোস্পেস মানচিত্রের কেন্দ্রবিন্দু:

ভারতের বায়োটেক রাজধানী: ড. কিরণ মজুমদার-শ শাও-এর প্রতিষ্ঠিত বায়োকন (Biocon) বেঙ্গালুরুকে বিশ্ব বায়োটেক মানচিত্রে স্থান দিয়েছে। ভারতের বায়োটেকনোলজি খাতের মোট আয়ের প্রায় ৫০% কর্ণাটক থেকে আসে, যার সিংহভাগ কেন্দ্র বেঙ্গালুরু। শহরটির 'ব্যাঙ্গালোর বায়োইনোভেশন সেন্টার' (BBC) বায়ো-স্টার্টআপদের মূল আশ্রয়স্থল।

অ্যারোস্পেস ও ডিফেন্স ট্রায়াঙ্গেল: বেসামরিক ও সামরিক বিমান চালনায় বেঙ্গালুরুর বিকল্প ভারতে নেই। মার্কিন যুদ্ধবিমান প্রস্তুতকারক বোয়িং (Boeing) তাদের আমেরিকার বাইরের সবচেয়ে বড় ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি কেন্দ্র (Boeing India Engineering & Technology Center) ১,৬০০ কোটি রুপি ব্যয়ে বেঙ্গালুরুর কেম্পেগৌড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে স্থাপন করেছে। এয়ারবাস (Airbus) তাদের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও আইটি পরিচালনার বড় অংশ বেঙ্গালুরু থেকেই সম্পন্ন করে।

স্টার্টআপ কালচার ও 'কোরামানগালা ইফেক্ট'

বেঙ্গালুরুর সাফল্যের অন্তরালে রয়েছে এক বিশেষ ভৌগোলিক ও সামাজিক নেটওয়ার্কিং সংস্কৃতি।

কোরামানগালা ও ইন্দিরা নগর কালচার: বেঙ্গালুরুর কোরামানগালা (Koramangala) এবং ইন্দিরা নগর (Indiranagar) অঞ্চলকে বলা হয় ভারতীয় স্টার্টআপের নার্সারি। কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (VC) অফিস, কো-ওয়ার্কিং স্পেস (WeWork, Awfis), এবং ক্যাফে।

ইনভেস্টরদের ভৌগোলিক ঘনত্ব: সিকোইয়া ক্যাপিটাল (Peak XV), অ্যাক্সেল (Accel), এবং ব্লুম ভেনচার্স (Blume Ventures)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী সংস্থার অংশীদারদের এই ক্যাফেগুলোতে উদীয়মান উদ্যোক্তাদের সাথে আলোচনা করতে দেখা যায়।

নেটওয়ার্কিং সামিট: বার্ষিক 'Bangalore Tech Summit' (BTS) এবং 'TechSparks'-এর মতো বৈশ্বিক কনফারেন্সের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী ভারতীয় ও প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীরা বেঙ্গালুরুতে একত্রিত হন।

ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন ও চলমান মেগা প্রজেক্টসমূহ

দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যার সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং যানজট সমস্যা সামাল দিতে বেঙ্গালুরুতে বেশ কিছু মেগা অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ চলছে:

নম্মা মেট্রো (Namma Metro) সম্প্রসারণ:

ব্লু লাইন (Blue Line): সেন্ট্রাল সিল্ক বোর্ড থেকে শুরু করে আউটার রিং রোড হয়ে সরাসরি কেম্পেগৌড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রো ট্র্যাক তৈরি হচ্ছে, যা শহরের প্রধান আইটি কাস্টমারদের বিমানবন্দর যাত্রা দ্রুত করবে।

ইয়েলো লাইন (Yellow Line): শহর থেকে সরাসরি ইলেকট্রনিক সিটিকে দ্রুত মেট্রো নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হচ্ছে।

বেঙ্গালুরু সাব-আরবান রেল প্রজেক্ট (BSRP): ১৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চার-করিডোরের শহরতলি রেল প্রকল্প যা শহরের উপকণ্ঠের সাথে মূল আইটি পার্কগুলোর সংযোগ স্থাপন করবে।

স্যাটেলাইট টাউন রিং রোড (STRR): ২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়েটি শহরের বাইরে দিয়ে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলের সুযোগ দেবে, যাতে মূল শহরের ভেতরে যানজট হ্রাস পায়।

গ্রিন বিল্ডিং ও পরিবেশবান্ধব টেক পার্ক: বেঙ্গালুরুর নতুন টেক পার্কগুলো (যেমন এম্বাসি মেনিওটা) তাদের নিজস্ব বর্জ্য জল পুনর্ব্যবহার (STP), সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আইজিবিসি (IGBC) গোল্ড ও প্ল্যাটিনাম সার্টিফাইড গ্রিন টেকনোলজি ব্যবহার করছে।

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যতের পথচলা

বেঙ্গালুরু সাফল্য অর্জন করলেও এর সামনে বেশ কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, যা সমাধান না করলে শহরটির সিলিকন ভ্যালি খেতাব ঝুঁকিতে পড়তে পারে:

অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অবকাঠামোগত সংকট

আইটি শিল্পের দ্রুত বৃদ্ধির সাথে সাথে বেঙ্গালুরুর জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে, কিন্তু শহরের ভৌত অবকাঠামো সেই গতিতে উন্নত হয়নি।

যানজট: বেঙ্গালুরুর ট্রাফিক জ্যাম বিশ্বখ্যাত। প্রতিদিন কোটি কোটি কর্মঘণ্টা কেবল রাস্তায় নষ্ট হয়।

পানির সংকট: ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় খরা মৌসুমে মারাত্মক খাবার পানির সংকট দেখা দেয়।

পরিবেশ বিপর্যয়: 'লেক সিটি' হিসেবে পরিচিত বেঙ্গালুরুর শতাধিক ঐতিহাসিক হ্রদ দখল হয়ে গেছে বা দূষিত হয়ে পড়েছে।

অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা

ভারতের অন্যান্য শহর যেমন হায়দরাবাদ (Cyberabad), গুরুগ্রাম, নোইডা এবং পুনে এখন সস্তায় জমি ও ভালো অবকাঠামো দিয়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণ করছে। বিশেষ করে হায়দরাবাদ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে দ্রুত জমি ও অনুমোদন দিয়ে বেঙ্গালুরুর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।

ডিপটেক ও জেনারেটিভ এআই-এর যুগে রূপান্তর

প্রথাগত আইটি সার্ভিস ও সাধারণ কোডিং-এর দিন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, বায়োটেকনোলজি এবং ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) প্রযুক্তির যুগে টিকে থাকতে হলে বেঙ্গালুরুকে কেবল "সার্ভিস প্রোভাইডার" থেকে "অরিজিনাল প্রোডাক্ট ইনোভেটর" বা আবিষ্কারকে রূপান্তর হতে হবে।

উপসংহার

পেনশনারদের শান্ত উদ্যান নগরী থেকে আজকের ধুলোবালি, যানজট আর কোডিং-এ মুখরিত আন্তর্জাতিক টেক-হাবে পরিণত হওয়া বেঙ্গালুরুর এই গল্পটি মূলত আধুনিক ভারতেরই অর্থনৈতিক উত্থানের প্রতিচ্ছবি।

যে শহরটি একসময় কেবল পশ্চিমা দেশগুলোর কম খরচে সফটওয়্যার বানানোর আউটসোর্সিং হাব হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সেই শহরই আজ নিজস্ব অর্থায়নে উদ্ভাবিত হাজার হাজার ইউনিকর্ন স্টার্টআপ দিয়ে বৈশ্বিক টেক জায়ান্টদের সাথে টেক্কা দিচ্ছে। অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, বেঙ্গালুরুর রয়েছে এক অনন্য মেধা ও উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম, যা সহজে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়।

এশিয়ার এই দ্রুতবর্ধনশীল প্রযুক্তির রাজধানী যদি তার পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে, তবে অদূর ভবিষ্যতে কেবল ভারতের সিলিকন ভ্যালি হিসেবে নয় বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের এক নম্বর বিশ্বকেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারা বেঙ্গালুরুর জন্য মোটেও অসম্ভব কিছু নয়।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.