ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামে ৮ হাজার বাংলাদেশী বীরযোদ্ধা

ইতিহাসের কিছু অধ্যায় সগৌরবে উদযাপিত হয়, আবার কিছু অধ্যায় বিশাল ক্যানভাসে মহাকাব্যিক রূপ ধারণ করলেও সময়ের ধূসর ধূলিকণায় ঢাকা পড়ে যায়। দ্বিতীয় ধাঁচের তেমনই এক ইতিহাস হলো মধ্যপ্রাচ্যের রুক্ষ মরুভূমি ও লেবাননের পাহাড়-উপত্যকায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা আট হাজার বাঙালি তরুণের বীরত্বগাথা।
একটি পুরনো, আবছা হয়ে যাওয়া সাদাকালো আলোকচিত্র আর লেবাননের বৈরুত কিংবা দক্ষিণ লেবাননের কোনো এক প্রাচীন কবরস্থানে আরবি অক্ষরে খোদাই করা কয়েকটি নামফলক এটুকুই দৃশ্যমান চিহ্ন। কিন্তু এই সামান্য স্মারকের গভীরে লুকিয়ে আছে এমন এক ইতিহাস, যা বাঙালি জাতির আন্তর্জাতিকতাবাদ, অদম্য সাহস ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি অকৃত্রিম সহমর্মিতার এক মহিমান্বিত দলিল।
১৯৮০-র দশকে যখন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী জনগণ চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছিল, তখন হাজার হাজার মাইল দূরের পলিগঠিত বাংলাদেশ থেকে ৮০০০ অকুতোভয় তরুণ ছুটে গিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গনে। তাঁরা কোনো অর্থ, পদবী বা ব্যক্তিগত লাভের আশায় যাননি; গিয়েছিলেন কেবল ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং পিএলও (PLO)-এর পতাকাতলে নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়াই করতে।
এই বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা এই বিস্মৃত বীরত্বগাথার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাক্ষ্য, ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের কাহিনী এবং ফিলিস্তিন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্পর্কের সেই অবিস্মরণীয় অধ্যায়কে অত্যন্ত প্রামাণ্য ও গভীরভাবে উন্মোচন করব।
স্বাধীনতার চেতনা ও ফিলিস্তিন প্রীতি
বাংলাদেশের সাথে ফিলিস্তিনের এই নাড়ির টান হুট করে ১৯৮০ সালে তৈরি হয়নি; এর শিকড় প্রোথিত ছিল ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতেই।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতা: বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালে নিজেরা গণহত্যা, বাস্তুচ্যুতি ও শরণার্থ জীবনের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করেছিল। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার পর, বিশ্বজুড়ে যেখানেই নিপীড়িত মানুষ নিজেদের অধিকারের জন্য লড়ছিল, বাঙালি তাদের নিজেদের আয়নায় দেখতে পেত। ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের নিজেদের জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের শিকার হওয়ার গল্প বাংলাদেশের মানুষকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল।
প্রথম বর্ষীয়ান নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক মেলবন্ধন: স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের (ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ) সময় বাংলাদেশ তার নিজস্ব সীমিত সামর্থ্যের মধ্য থেকেও মিসর ও সিরিয়ায় চা পাঠায় এবং একদল সামরিক চিকিৎসাসংক্রান্ত মেডিকেল টিম প্রেরণ করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি (OIC) সম্মেলনে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (PLO) প্রধান নেতা কিংবদন্তি ইয়াসির আরাফাত-এর সাথে বাংলাদেশের আত্মিক কূটনৈতিক সখ্য গড়ে ওঠে।
১৯৮০ সালের চরম সংকট ও আরাফাতের আহ্বান: ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে এবং ১৯৮০-র দশকের শুরুতে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (PLO) যখন জর্ডান থেকে বিতাড়িত হয়ে লেবাননে তাদের নতুন ঘাঁটি স্থাপন করে, তখন ইসরায়েলী বাহিনী লেবানন সীমান্তে তাদের ওপর চতুর্মুখী চাপ সৃষ্টি করে। পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাত বিশ্বজুড়ে মুসলিম সমাজ ও স্বাধীনতাকামী দেশগুলোর প্রতি ‘স্বেচ্ছাসেবী’ হিসেবে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
আরাফাতের এই আকুল আহ্বানে বিশ্বের যে কয়েকটি দেশ থেকে সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ও অভূতপূর্ব সাড়া এসেছিল, তার মধ্যে বাংলাদেশ ছিল অন্যতম।
সুদূর ঢাকা থেকে বৈরুত: আট হাজার বীরের অবিশ্বাস্য যাত্রা
১৯৮০ সালে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাঙালি প্রবাসীদের মধ্য থেকে তরুণরা সংগঠিত হতে শুরু করেন।
সংখ্যা ও পৌঁছানোর পথরেখা: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিখ্যাত সংবাদসংস্থা ‘আল আরাবিয়া’ (Al Arabiya) এবং পরবর্তীতে একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে প্রায় আট হাজার (৮,০০০) বাঙালি তরুণ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে লড়তে লেবানন ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রণাঙ্গনে গিয়ে পৌঁছান।
এই যাত্রাপথ মোটেও সহজ ছিল না। তখন সরাসরি ঢাকার সাথে বৈরুতের সামরিক যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অনেক তরুণ বাণিজ্যিক বিমানে সিরিয়া কিংবা জর্ডান হয়ে লেবাননে প্রবেশ করেন, আবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত হাজার হাজার প্রবাসী বাঙালি শ্রমিক তাঁদের কষ্টার্জিত চাকরি ছেড়ে দিয়ে সরাসরি পিএলও-এর নিয়োগ কেন্দ্রে গিয়ে নাম লেখান।
পিএলও (PLO)-এর প্রশিক্ষণ ও অন্তর্ভুক্তি: লেবাননে পৌঁছানোর পর এই বাঙালি স্বেচ্ছাসেবীদের ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার সামরিক শাখা ‘আল-আসসিফা’ (Al-Assifa) এবং ফাতাহ (Fatah) ব্রিগেডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
লেবাননের বেকা উপত্যকা এবং সিরিয়ার সীমান্তবর্তী সামরিক ক্যাম্পগুলোতে তাঁদের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র চালনা, গেরিলা যুদ্ধকৌশল, অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল অপারেশন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার নিবিড় সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বাঙালি তরুণদের শৃঙ্খলা, সহ্যক্ষমতা ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা ফিলিস্তিনি সামরিক কমান্ডালদের ব্যাপকভাবে মুগ্ধ করেছিল।
১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধ ও বাঙালি যোদ্ধাদের বীরত্ব
বাঙালি যোদ্ধাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল ১৯৮২ সালে, যখন ইসরায়েল ‘অপারেশন পিস ফর গ্যালিলি’ (Operation Peace for Galilee) নামে লেবাননে এক পূর্ণাঙ্গ ও নজিরবিহীন সামরিক আক্রমণ চালায়।
দক্ষিণ লেবাননের রণাঙ্গনে: ১৯৮২ সালের জুন মাসে যখন ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (IDF) বিশাল ট্যাংক বহর ও বিমান সাপোর্ট নিয়ে লেবাননে প্রবেশ করে, তখন দক্ষিণ লেবাননের টাইর (Tyr), সিডন (Sidon) এবং নাবাতিয়াহ (Nabatieh) এলাকায় অবস্থানরত ফিলিস্তিনি ও বাঙালি যৌথ প্রতিরোধ ব্যূহ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
বাঙালি তরুণরা কেবল লজিস্টিক সহায়তাই দেননি; তাঁরা সরাসরি কাঁধে রকেট প্রোপেলড গ্রেনেড (RPG) এবং স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে ইসরায়েলি সাঁজোয়া বহরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন।
একশোরও বেশি শহীদের রক্তে ভেজা লেবাননের মাটি: ইসরায়েলি বিমান হামলা ও স্থল অভিযানের প্রচণ্ডতায় লেবাননের রণাঙ্গনে শতাধিক বাঙালি যোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন। তাঁদের অনেকেরই মরদেহ যুদ্ধক্ষেত্রের তীব্রতার কারণে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে লেবাননের ‘শহীদ কবরস্থান’ (Martyrs' Cemetery)-এ ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামীদের পাশাপাশি পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়।
এছাড়াও, যুদ্ধের সময় শত শত বাঙালি যোদ্ধা আহত হন এবং বেশ কিছু যোদ্ধা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হাতে বন্দী হয়ে দক্ষিণ লেবাননের কুখ্যাত 'আনসার বন্দিশালা' (Ansar Prison Camp)-এ মাসের পর মাস নির্মম নির্যাতনের শিকার হন।
ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি ইতিহাস: ক্রিস স্টিল পারকিন্স ও লাইব্রেরি অব কংগ্রেস
ইতিহাসের অনেক ঘটনা মৌখিক গল্পের মতো মিলিয়ে গেলেও এই আট হাজার বাঙালির বীরত্বগাথা বাস্তবতার মুখ দেখেছে যুক্তরাজ্যের খ্যাতিমান ফটোসাংবাদিক ক্রিস স্টিল পারকিন্স (Chris Steele-Perkins)-এর ক্যামেরার বদৌলতে।
ফটোসাংবাদিকের স্মৃতিচারণ ও বিবিসি সাক্ষাৎকার
১৯৮২ সালে যখন ইসরায়েল লেবানন দখল করে নিচ্ছে, তখন ব্রিটিশ ম্যাগনাম ফটোজ (Magnum Photos)-এর প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ক্রিস স্টিল পারকিন্স বৈরুত থেকে যুদ্ধের খবর কভার করছিলেন।
পরবর্তীতে বিবিসি (BBC)-র সাথে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পারকিন্স সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে জানান:
"আমি তখন দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত অভিমুখে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ যুদ্ধরত একদল সশস্ত্র তরুণের মুখোমুখি হই। তাঁদের গায়ের রঙ, চেহারা ও পোশাক দেখে আমার মনে হয়েছিল তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় অধিবাসী নন। সংক্ষিপ্ত আলাপে জানতে পারি তারা সবাই বাংলাদেশ থেকে এসেছে ফিলিস্তিনের হয়ে যুদ্ধ করতে! শত্রুর গোলাবর্ষণের মুখে তাঁদের সাথে দীর্ঘ আলোচনার সময় ছিল না, তবে আমি তাঁদের একটি গ্রুপ ছবি তোলার অনুরোধ করি। তাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে খুব শক্ত মুখে আমার ক্যানভাসে ধরা দিয়েছিলেন।"
যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’-এ স্থান লাভ
ক্রিস স্টিল পারকিন্সের তোলা এই সাদাকালো ছবিটি পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ছবিতে দেখা যায় জলপাই রঙের সামরিক পোশাকে, মাথায় ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী কেফিয়েহ (Keffiyeh) পেঁচিয়ে, হাতে এ কে-৪৭ (AK-47) রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন সুঠাম দেহের বাঙালি যুবক।
এই ঐতিহাসিক আলোকচিত্রটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের 'লাইব্রেরি অব কংগ্রেস' (Library of Congress) এবং যুক্তরাজ্যের ম্যাগনাম ফটো আর্কাইভের হেরিটেজ সেকশনে অত্যন্ত দুর্লভ নথি হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। এটিই হলো ফিলিস্তিন মুক্তিসংগ্রামে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ সশস্ত্র অংশগ্রহণের সবচেয়ে শক্তিশালী ও আইকনিক ভিজ্যুয়াল প্রমাণ।
জকিগঞ্জের ইসমাইল চৌধুরী থেকে লেবাননের নাগরিক
আট হাজার বাঙালি তরুণের ভিড়ে সিংহভাগ ইতিহাস যখন হারিয়ে গেছে, তখন অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কল্যাণে এক জীবন্ত বীরের সন্ধান পাওয়া যায়। ফিলিস্তিনের বিখ্যাত সংবাদসংস্থা ‘প্যালেস্টাইন নিউজ নেটওয়ার্ক’ (PNN) এবং স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে উঠে আসে সেই অবিশ্বাস্য গল্প।
জন্মভূমি জকিগঞ্জ থেকে সীমান্ত রণাঙ্গনে: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ফিলিস্তিনি যোদ্ধা মোহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী আকরাম-এর জন্ম বাংলাদেশের সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলায়। ১৯৮০ সালে যখন ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসন তুঙ্গে, তখন ইসমাইল চৌধুরী আর ঘরে স্থির থাকতে পারেননি। মাত্র তরুণ বয়সে তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য ঘর ছাড়েন এবং চরম ঝুঁকি নিয়ে লেবাননে গিয়ে পিএলও-এর বাহিনীতে যোগ দেন।
লেবানন সীমান্তে বীরত্ব ও নাগরিকত্ব লাভ: ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ইসমাইল চৌধুরী। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনি ও লেবানন সরকারের প্রতি তাঁর অদম্য আনুগত্য, ত্যাগ ও সামরিক দক্ষতার কারণে তাঁকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়।
তিনি পরবর্তীতে লেবাননের স্থায়ী নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লেবাননের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রধান দেহাঙ্গরক্ষী (Personal Bodyguard) হিসেবে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর এই জীবনকাহিনী প্রমাণ করে যে, বাঙালি বীরেরা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই রক্ত দেননি, বরং পরবর্তীকালে নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে আরববিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্মান কুড়িয়েছেন।
ফিলিস্তিন যুদ্ধের বাঙালি বীরদের ঐতিহাসিক সারসংক্ষেপ
নিচে ১৯৮০-১৯৮২ সালের ফিলিস্তিন মুক্তিসংগ্রামে বাংলাদেশি স্বেচ্ছাসেবীদের অংশগ্রহণ, ঘটনাপ্রবাহ ও পরিসংখ্যানের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্য চিত্র সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
ঐতিহাসিক পরামিতি | বিস্তারিত তথ্য ও বিবরণ | প্রামাণ্য উৎস / ঐতিহাসিক রেফারেন্স |
অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি যোদ্ধা | আনুমানিক ৮,০০০ (আট হাজার) জন স্বেচ্ছাসেবী তরুণ। | মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল আরাবিয়া (Al Arabiya)। |
মূল রণাঙ্গন ও অঞ্চল | লেবাননের টাইর, সিডন, নাবাতিয়াহ এবং বেকা উপত্যকা। | ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (PLO) ও ফাতাহ আর্কাইভ। |
যুদ্ধের সময়কাল | ১৯৮০ – ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ (বিশেষ করে ১৯৮২-র লেবানন যুদ্ধ)। | আন্তর্জাতিক সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাস। |
শহীদ বাংলাদেশি যোদ্ধা | ১০০+ (একশোটিরও বেশি) সরাসরি রণাঙ্গনে শহীদ হন। | লেবাননের বৈরুতস্থ ‘শহীদ কবরস্থান’ রেকর্ড। |
বন্দী ও আহত যোদ্ধা | শত শত আহত; বহু যোদ্ধা ইসরায়েলের ‘আনসার ক্যাম্পে’ বন্দী। | আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও পিএলও বন্দী বিনিময় তালিকা। |
একমাত্র ঐতিহাসিক আলোকচিত্র | ১৯৮২ সালে ব্রিটিশ ফটোসাংবাদিক ক্রিস স্টিল পারকিন্সের তোলা ছবি। | যুক্তরাষ্ট্র ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’ ও ম্যাগনাম ফটোজ। |
আন্তর্জাতিক মিডিয়া কাভারেজ | আল আরাবিয়া, বিবিসি (BBC) এবং প্যালেস্টাইন নিউজ নেটওয়ার্ক (PNN)। | আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাসমূহ। |
জীবন্ত কিংবদন্তি যোদ্ধা | মোহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী আকরাম (জকিগঞ্জ, সিলেট)। | প্যালেস্টাইন নিউজ নেটওয়ার্ক (PNN) সাক্ষাৎকার। |
যুদ্ধ পরবর্তী জীবন: ইউরোপে অভিবাসন ও আত্মগোপন
১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধের পর ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (PLO) যখন তিউনিসিয়ায় তাদের সদর দপ্তর স্থানান্তরিত করতে বাধ্য হয়, তখন এই আট হাজার বাঙালি যোদ্ধার জীবনে নেমে আসে এক চরম অনিশ্চয়তা।
ইউরোপে নতুন জীবন: যেসব বাঙালি যোদ্ধা লেবাননের রণাঙ্গন থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন, তাঁদের একটি বড় অংশ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন।
সাইপ্রাস ও গ্রিস হয়ে তারা ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি ও সুইডেনে আশ্রয় নেন। ইউরোপে গিয়ে তাঁরা অনেকেই সাধারণ নাগরিক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করলেও, তাঁদের বুকে ফিলিস্তিনের রণাঙ্গনের গুলির ক্ষত চিহ্ন আজও তাজা হয়ে আছে।
বাংলাদেশে নীরব প্রত্যাবর্তন ও আইনি ভীতি: অন্য একটি অংশ আশির দশকের শেষভাগে নীরবে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। কিন্তু তৎকালীন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, পাসপোর্ট জটিলতা এবং 'আন্তর্জাতিক জঙ্গি' বা ‘অবৈধ স্বেচ্ছাসেবী’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় তারা কখনো জনসম্মুখে নিজেদের এই বীরত্বগাথার কথা প্রকাশ করেননি।
তাঁরা নিজেদের গ্রামের বাড়িতে সাধারণ কৃষক, দোকানদার বা ছোটখাটো চাকরিজীবী হিসেবে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিকভাবে এই বিশাল বীরত্বগাথা কোনো দিন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি।
বাংলাদেশ সামরিক একাডেমিতে (BMA) পিএলও ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ
অনেকেরই অজানা একটি ঐতিহাসিক সত্য হলো কেবল বাঙালি তরুণেরাই ফিলিস্তিনে যাননি; বরং ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (PLO) ক্যাডেট ও অফিসারদের একটি বড় দল ১৯৮০-র দশকে বাংলাদেশে এসে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিল।
বিএমএ (BMA) কন্টিনজেন্ট: ১৯৮০-র দশকের শুরুতে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার এবং পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাতের মধ্যকার চুক্তির ভিত্তিতে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারীতে অবস্থিত বাংলাদেশ সামরিক একাডেমিতে (BMA) ফিলিস্তিনি ক্যাডেটদের নিয়মিত ব্যাচ পাঠানো শুরু হয়।
সামরিক দক্ষতা অর্জন: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ নির্দেশকদের অধীনে এই ফিলিস্তিনি তরুণেরা অস্ত্র চালনা, কৌশলগত কমান্ডো প্রশিক্ষণ এবং অফিসার ক্যাডেট কোর্স সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তারা পিএলও-র সামরিক শাখা ‘ফাতাহ’ (Fatah)-এর শীর্ষ ও মধ্যম সারির অফিসার পদে উন্নীত হন।
ইসরায়েলের 'আনসার বন্দিশালা' ও আটক বাঙালি যোদ্ধারা
১৯৮২ সালে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর (IDF) ‘অপারেশন পিস ফর গ্যালিলি’ অভিযানের সময় শত শত ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ যোদ্ধাকে বন্দী করা হয়।
কুখ্যাত আনসার ক্যাম্প: বন্দী যোদ্ধাদের রাখার জন্য দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহ এলাকার কাছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গড়ে তোলে 'আনসার প্রিজনার ক্যাম্প' (Ansar Camp)।
বাঙালি বন্দীদের তথ্য: আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (ICRC) তৎকালীন নথিপত্র এবং পরবর্তীতে মুক্তি পাওয়া পিএলও যোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, আনসার ক্যাম্পে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি স্বেচ্ছাসেবক আটক ছিলেন।
ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের বিস্ময়: জিজ্ঞাসাবাদের সময় ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, এই তরুণেরা কোনো অর্থের বিনিময়ে বা ভাড়াটে সৈন্য (Mercenary) হিসেবে আসেননি; তারা কেবল ধর্মীয় ও মানবিক তাগিদ থেকে স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করতে এসেছেন। এই ঘটনা তৎকালীন বিশ্ব গণমাধ্যমেও আলোচনার সৃষ্টি করেছিল।
১৯৭৩ সালের 'মেডিকেল মিশন' ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিদেশ সহায়তা
১৯৮০ সালের স্বেচ্ছাসেবীদের যাওয়ার পূর্বসূরি হিসেবে কাজ করেছিল ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ (যোম কিপ্পুর যুদ্ধ)। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের মাত্র দুই বছরের মাথায় বাংলাদেশ ফিলিস্তিন ও আরবদের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নেয়।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মিসর ও সিরিয়ায় সামরিক ও চিকিৎসাসংক্রান্ত সহায়তা পাঠানোর নির্দেশ দেন।
২৮ সদস্যের সামরিক চিকিৎসা দল: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর খুরশিদের নেতৃত্বে ২৮ সদস্যের একটি বিশেষ আর্মি মেডিকেল টিম এবং এক লাখ পাউন্ড বিখ্যাত 'শুভ্রা চা' সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয়। এটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা।
ইয়াসির আরাফাতের ঢাকা সফর ও "দ্বিতীয় বাড়ি"
পিএলও চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর ও হৃদ্যতাপূর্ণ।
"বাংলাদেশ আমার জন্য কেবল একটি মিত্র দেশ নয়; এটি ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় বাড়ি।" - ইয়াসির আরাফাত (ঢাকা সফরের সময়)
ঐতিহাসিক সফরসমূহ: ইয়াসির আরাফাত একাধিকবার বাংলাদেশ সফর করেন (বিশেষ করে ১৯৮১, ১৯৮৭ এবং ১৯৯৭ সালে)।
স্বাধীনতার রূপালী জয়ন্তী (১৯৯৭): ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তিতে বিশ্বনেতাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান অতিথি হিসেবে ঢাকায় এসেছিলেন ইয়াসির আরাফাত (সাথে ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা ও তুরস্কের সুলেমান দেমিরেল)। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁকে লাখো জনতার উপস্থিতিতে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল।
ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ
বাঙালি যোদ্ধাদের ত্যাগের পর বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের মধ্যে যে প্রাতিষ্ঠানিক মেলবন্ধন তৈরি হয়, তার অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং স্কলারশিপ: ১৯৮০-র দশক থেকেই বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি মেডিকেল কলেজ, বুয়েট (BUET) এবং বিভিন্ন সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ কোটা বরাদ্দ করে আসছে।
অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের অবদান: বহু ফিলিস্তিনি তরুণ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস (MBBS) ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে গেছেন এবং বর্তমানে গাজা ও পশ্চিম তীরে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।
পাসপোর্টের 'Except Israel' ধারা এবং কূটনৈতিক প্রতিরোধ
লেবাননে রক্ত দেওয়া ৮,০০০ বাঙালি যোদ্ধার সেই অবদানের একটি আইনি প্রতীক ছিল বাংলাদেশের পাসপোর্ট।
আইনি অবস্থান: স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকেই পাসপোর্টে পরিষ্কার ভাষায় লেখা থাকত:
"This Passport is valid for all countries of the world except Israel"
কূটনৈতিক স্বীকৃতি না দেওয়া: বাংলাদেশ বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের একটি, যা অদ্যাবধি ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি এবং তাদের সাথে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক, সামাজিক বা কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখেনি।
যেভাবে হারিয়ে গেল এই বিশাল ইতিহাস
এত বড় এক বৈশ্বিক অভিযানে ৮,০০০ তরুণের অংশগ্রহণের পরও কেন এই ইতিহাস লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেল?
১. রাজনৈতিক অস্থিরতা: ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বারবার পটপরিবর্তন ও সামরিক শাসন থাকার কারণে আন্তর্জাতিক স্তরের এই অর্জনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি।
২. আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও পাসপোর্ট ভীতি: ১৯৮২ সালের পর যেসকল যোদ্ধা দেশে ফিরেছিলেন, তারা আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা বা অ-রাষ্ট্রীয় যোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন।
৩. গবেষণার অভাব: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও ইতিহাসবিদদের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আর্কাইভগুলো (যেমন: পিএলও আর্কাইভ বা লেবানন প্রেস নথিপত্র) ঘেঁটে এই বীরদের তালিকা উদ্ধারের জন্য বড় ধরনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য ও বাংলাদেশ-ফিলিস্তিন বর্তমান সম্পর্ক
ফিলিস্তিনের মাটিতে আট হাজার বাঙালির রক্ত ও ঘাম বিসর্জনের এই ঘটনা কেবল ঐতিহাসিক গল্প নয়; এটি আজকের বাংলাদেশ-ফিলিস্তিন কূটনৈতিক ও আত্মিক সম্পর্কের এক মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর।
পাসপোর্টের ঐতিহাসিক সেই বাক্য: বাংলাদেশের পাসপোর্টে দীর্ঘদিন ধরে একটি ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতা লেখা ছিল: "This Passport is valid for all countries of the world except Israel" (এই পাসপোর্টটি ইসরায়েল ব্যতীত বিশ্বের সকল দেশের জন্য প্রযোজ্য)।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে বাক্যাংশের বিন্যাসে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি আজও ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বের পক্ষে এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিপক্ষে অটল।
ফিলিস্তিনিদের হৃদয়ে বাংলাদেশের নাম: আরব বিশ্বের বহু দেশ যখন আজ ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ (Abraham Accords)-এ সই করছে, তখন ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে বাংলাদেশের জন্য এক বিশেষ শ্রদ্ধার স্থান রয়েছে।
ফিলিস্তিনের রাজধানী রামাল্লা কিংবা গাজার প্রবীণ ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা আজও স্মরণ করেন কীভাবে ১৯৮০-র দশকে হাজার হাজার মাইল দূরের এক রেইনফরেস্টের দেশ থেকে আসা তরুণরা তাঁদের মাতৃভূমির জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন।
ইতিহাস পুনরুদ্ধারের দায় ও আমাদের করণীয়
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এই আট হাজার বাঙালি যোদ্ধার অবদান কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ছিল গ্লোবাল সাউথ (Global South)-এর সংহতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক সর্বকালের সেরা উদাহরণ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীন বাংলাদেশে এই বীরদের নিয়ে কোনো বড় ধরনের গবেষণা হয়নি, কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি, এমনকি জাতীয় পাঠ্যপুস্তকেও তাঁদের ইতিহাস ঠাঁই পায়নি। একটি জাতিকে জীবন্ত রাখতে হলে তার অতীত বীরদের ইতিহাসকে রক্ষা করতে হয়। আজ সময় এসেছে:
১. লেবানন ও ফিলিস্তিন সরকারের সহায়তায় ওই ৮,০০০ যোদ্ধার পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও শহীদদের নাম পরিচয় উদ্ধার করা।
২. যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে থাকা ছবিটির মতো আরো যেসব আর্কাইভাল দলিল রয়েছে, তা সংগ্রহ করে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ করা।
৩. যেক'জন জীবিত যোদ্ধা এখনও ইউরোপ, লেবানন বা বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, তাঁদের সরকারিভাবে 'আন্তর্জাতিক স্বাধীনতা যোদ্ধা'র সম্মাননা প্রদান করা।
আট হাজার বাঙালি তরুণের এই ত্যাগ প্রমাণ করে যে, মানচিত্রের সীমানা যতই দীর্ঘ হোক না কেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতার পক্ষে বাঙালির সংহতি চিরকাল সীমানাহীন। লেবাননের উপত্যকায় লেখা সেই ইতিহাস আজও বাতাসে ভেসে বলে "বাঙালি কোনোদিন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি, করবেও না।"



















