বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫ - বাংলার মুসলিমদের জন্য আশির্বাদ ও কলকাতার হিন্দুদের জন্য অভিশাপ

বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫ - বাংলার মুসলিমদের জন্য আশির্বাদ ও কলকাতার হিন্দুদের জন্য অভিশাপ

১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর কার্যকর হওয়া বঙ্গভঙ্গ ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠন কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক ভারতের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের এক ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট।

একদিকে পূর্ববঙ্গের দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, শোষিত ও পশ্চাৎপদ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে বঙ্গভঙ্গ আবির্ভূত হয়েছিল অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং সামাজিক অগ্রগতির এক নতুন আলোকবর্তিকা হিসেবে। অন্যদিকে, কলকাতার প্রভাবশালী হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজ, জমিদার, আইনজীবী ও কলকাতার সংবাদপত্র কেন্দ্রিক কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কাছে এটি বিবেচিত হয়েছিল ভারতের অখণ্ড বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আঘাত করার অপপ্রয়াস এবং তাঁদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আধিপত্য হারানোর এক অভিশাপ হিসেবে।

লর্ড কার্জনের এই একক সিদ্ধান্ত ও পরবর্তীতে স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ থেকে শুরু করে ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ এই পুরো অধ্যায়টিই পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভাজন এবং অবশেষে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রচনা করেছিল।

প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পটভূমি: বিশাল প্রেসিডেন্সি ও ঔপনিবেশিক চাণক্যনীতি

উদ্বোধনী শতকের শুরুতেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকে প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে বাংলা প্রেসিডেন্সিকে একটি সুবিশাল প্রশাসনিক একক হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছিল। কিন্তু তৎকালীন সময় নাগাদ এই ভূখণ্ডের প্রশাসনিক কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।

প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাত

তৎকালীন বাংলা প্রেসিডেন্সির আয়তন ছিল প্রায় ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল এবং এর মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ। এত বড় ভূখণ্ড ও বিশাল জনসংখ্যাকে কলকাতা কেন্দ্রিক মাত্র একজন ছোটলাট বা লেফট্যানেন্ট গভর্নরের অধীনে শাসন করা ছিল অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার।

যোগাযোগ ব্যবস্থার তৎকালীন সীমাবদ্ধতার কারণে ঢাকাসহ পূর্ববঙ্গ এবং আসামের দূরবর্তী অঞ্চলগুলো কেন্দ্র থেকে ছিল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোর দিক থেকে পূর্ববঙ্গ চরম অবহেলার শিকার হচ্ছিল। ব্রিটিশ সরকারের দাপ্তরিক নথিতে যুক্তি দেওয়া হয় যে, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক স্থবিরতা দূর করতেই বাংলা ভাগ করা জরুরি।

ব্রিটিশ রাজের প্রকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: 'ভাগ করো ও শাসন করো' (Divide and Rule)

প্রশাসনিক অজুহাতের আড়ালে ব্রিটিশ সরকারের আসল রাজনৈতিক নীলক নকশাটি ছিল ভিন্ন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর নেতৃত্বে ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রবল রূপ ধারণ করে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব এইচ. এইচ. রিসলে (H. H. Risley) তাঁর গোপন নথিতে স্পষ্ট লিখেছিলেন:

"United Bengal is a power; Bengal divided will pull in several different ways... One of our main objects is to split up and thereby weaken a solid body of opponents to our rule." (ঐক্যবদ্ধ বাংলা একটি বড় শক্তি; বাংলা বিভক্ত হলে এই শক্তি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে... আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো আমাদের শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শক্তিশালী বিরোধী শক্তিকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দুর্বল করা।)

লর্ড কার্জন চেয়েছিলেন ধর্মীয় ও ভৌগোলিক মেরুকরণের মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলিম এই দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ফাটল ধরিয়ে দেওয়া, যাতে তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ আন্দোলন ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য হুমকিস্বরূপ না হতে পারে।

পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের দৃষ্টিকোণ: সুদীর্ঘ শোষণের অবসান ও নব সম্ভাবনার সূর্যোদয়

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর থেকে দেড় শতক ধরে পূর্ববঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠী ছিল দ্বিমুখী শোষণের শিকার একদিকে ব্রিটিশদের রাজনৈতিক অবহেলা, অন্যদিকে কলকাতা-কেন্দ্রিক জমিদার, মহাজন, আইনজীবী ও নীলকরদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ। বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত এই অবহেলিত ভূখণ্ডের জন্য নিয়ে আসে এক অভূতপূর্ব সুযোগ।

ঢাকার ঐতিহাসিক প্রশাসনিক পুনর্জীবন

১৭১৭ সালে মুর্শিদকুলি খান বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করার পর ঢাকা তার প্রাচীন গৌরব হারিয়ে এক মফস্বল শহরে পরিণত হয়েছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে ঢাকাকে নতুন গঠিত ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশের রাজধানী ঘোষণা করা হয়।

রাতারাতি ঢাকার রূপ বদলে যেতে থাকে। ফুলবাড়িয়া থেকে রামনা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে তৈরি হয় বিশাল সচিবালয়, আইন পরিষদ ভবন, হাইকোর্ট ভবন, কার্জন হল এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বাসস্থান। ঢাকা আবার এক নতুন প্রাদেশিক রাজধানীতে পরিণত হয়ে তার ঐতিহাসিক মর্যাদা ফিরে পায়।

শিক্ষাগত বিকাশ ও স্থানীয় কর্মসংস্থান

অতীতে পূর্ববঙ্গের মুসলিম তরুণদের উচ্চশিক্ষা লাভ কিংবা প্রশাসনিক চাকরির পরীক্ষার জন্য কলকাতায় যেতে হতো। সেখানে তীব্র বৈষম্য ও আর্থিক অনটনের শিকার হতে হতো তাদের।

ঢাকা রাজধানী হওয়ায় এখানে নতুন শিক্ষা দপ্তর, কলেজ, স্কুল এবং নানা প্রশাসনিক পরিকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে স্থানীয় মুসলিমদের জন্য সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণ ও উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে যায়। পূর্ববঙ্গে একটি নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলিম শ্রেণীর উন্মেষ ঘটার সুযোগ তৈরি হয়।

অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও কাঁচা পাটের বাজার

পূর্ববঙ্গ ছিল বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাঁচা পাট উৎপাদনকারী অঞ্চল। কিন্তু সমস্ত পাটকল (Jute Mills) গড়ে উঠেছিল কলকাতার হুগলি নদীর তীরে। পূর্ববঙ্গের দরিদ্র কৃষক পাট উৎপাদন করলেও সমুদয় লভ্যাংশ চলে যেত কলকাতার হিন্দু পাটকল মালিক ও ফোড়িয়াদের পকেটে।

বঙ্গভঙ্গের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কাঁচা পাট সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশে রপ্তানির পথ উন্মুক্ত হয়। এতে কলকাতার মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে পূর্ববঙ্গের কৃষকরা পাটের ন্যায্যমূল্য পেতে শুরু করে এবং অঞ্চলে এক নতুন অর্থনৈতিক গতিশীলতার সঞ্চার ঘটে।

স্বাধিকার আন্দোলন ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের জন্ম (১৯০৬)

বঙ্গভঙ্গ পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ এই প্রশাসনিক রূপান্তরকে স্বাগত জানান এবং পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের সংগঠিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাহবাগে ‘সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন’ (All India Muhammadan Educational Conference)-এর অধিবেশনে নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ (All India Muslim League)। এই রাজনৈতিক দলের জন্ম পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের জাতীয় রাজনীতির মূলধারায় নিয়ে আসে, যা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্অঙ্কনে প্রধান ভূমিকা রাখে।

কলকাতার উচ্চবর্ণের প্রতিক্রিয়া: স্বার্থে আঘাত, স্বদেশী আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়া মাত্রই কলকাতার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চরম অসন্তোষের দাবানল জ্বলে ওঠে। কলকাতার হিন্দু উচ্চবর্ণের জমিদার, মহাজন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বুদ্ধিজীবী সমাজ একে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি।

জমিদার ও মহাজনদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (Permanent Settlement) মাধ্যমে কলকাতার অনেক ধনী পরিবার পূর্ববঙ্গের বিশাল বিশাল এস্টেট ও জমির মালিক হয়েছিলেন। তারা কলকাতায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন আর পূর্ববঙ্গে তাঁদের নিয়োজিত নায়েব-গোমস্তারা দরিদ্র প্রজা ও মুসলিম রায়তদের কাছ থেকে জোরপূর্বক খাজনা আদায় করত।

পূর্ববঙ্গে নতুন রাজধানী ঢাকায় হাইকোর্ট ও প্রশাসনিক দপ্তর গঠিত হলে জমিদারদের আশঙ্কা তৈরি হয় যে, স্থানীয় প্রজাদের ওপর থেকে তাঁদের আধিপত্য বিলুপ্ত হবে এবং কর ও আইনি জটিলতায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

আইনি পেশা ও সংবাদপত্রের বাজারে ধস

কলকাতার হাইকোর্টে তৎকালীন সময়ে প্রথিতযশা হিন্দু আইনজীবীদের একচেটিয়া প্রভাব ছিল। পূর্ববঙ্গের সমস্ত দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা কলকাতায় যেত, যা ছিল তাঁদের আয়ের মূল উৎস। ঢাকা হাইকোর্ট গঠিত হলে কলকাতার আইনজীবীদের পসারে টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

একইভাবে কলকাতার পত্রিকাগুলো (যেমন: সঞ্জীবনী, বেঙ্গলী, অমিতবাজার পত্রিকা) পূর্ববঙ্গের পাঠকদের ওপর নির্ভর করত। ঢাকা কেন্দ্রিক নতুন সংবাদপত্র ও প্রেস সংস্কৃতি গড়ে উঠলে কলকাতার মিডিয়া রাজত্ব হুমকির মুখে পড়ত।

স্বদেশী আন্দোলন ও বয়কট আন্দোলন

বঙ্গভঙ্গকে 'মাতৃভূমির অঙ্গচ্ছেদ' হিসেবে আখ্যায়িত করে পুরো পশ্চিমবঙ্গজুড়ে অভূতপূর্ব স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্বরা এই আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

রাখীবন্ধন উৎসব: ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকরের দিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে ‘রাখীবন্ধন’ উৎসব পালন করা হয়। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে একে অপরের হাতে রাখী বাঁধা হয় এবং সবাই খালি পায়ে হেঁটে গঙ্গা স্নান করেন।

বিলাতি পণ্য বয়কট: বিলাতি কাপড়, চিনি, লবণ ও বিদেশি পণ্য বয়কট করে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বদলে জন্ম নেয় তাঁত শিল্প, 'বেঙ্গল কেমিক্যালস'-এর মতো দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান।

উৎসব ও সঙ্গীত সাহিত্য: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন তাঁর কালজয়ী গান “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” (যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়) এবং “বুকের মাঝে বিধাতা জাগে”-র মতো গানগুলো, যা স্বদেশী আন্দোলনকে এক আত্মিক ও আবেগীয় শক্তি জুগিয়েছিল।

বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড ও উগ্র জাতীয়তাবাদ

কংগ্রেসের চরমপন্থী অংশ এবং অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মতো বিপ্লবী সংগঠনগুলো বঙ্গভঙ্গ রদের দাবিতে সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন করে। লর্ড কার্জন, পরবর্তীতে লর্ড হার্ডিঞ্জ এবং বিভিন্ন ইংরেজ কর্মকর্তাদের ওপর বোমা হামলা ও গুপ্তহত্যার চেষ্টা শুরু হয়। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকির আত্মত্যাগ এই আন্দোলনেরই অংশ ছিল।

বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) এবং সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ফল

উত্তাল স্বদেশী আন্দোলন, তীব্র বয়কট এবং বৈপ্লবিক বোমাবাজির মুখে পড়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাজ চরম চাপে পড়ে যায়। পুরো বাংলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ব্রিটিশ পণ্যের বাজার ধসে পড়ে।

১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর: ঐতিহাসিক দিল্লি দরবার

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন সম্রাট পঞ্চম জর্জ (King George V) দিল্লির ঐতিহাসিক দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের (Annulment of Partition of Bengal) সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।

পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গকে পুনরায় একত্রিত করে একীভূত 'বাংলা প্রদেশ' গঠন করা হয়। তবে ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল যে কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে তীব্র জাতীয়তাবাদী ও বৈপ্লবিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা সামলানো কঠিন। তাই বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণার সাথে সাথেই ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে সরিয়ে দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়। এর ফলে ভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্রে কলকাতার যে একক ভৌগোলিক আধিপত্য ছিল, তার চিরদিনের জন্য অবসান ঘটে।

ঐতিহাসিক ফলাফল ও হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের চূড়ান্ত অবক্ষয়

পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের চরম হতাশা ও বিশ্বাসভঙ্গ: বঙ্গভঙ্গ রদের সিদ্ধান্ত পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজকে এক গভীর আঘাত ও বিশ্বাসের সংকটে ফেলে দেয়। নবাব সলিমুল্লাহসহ মুসলিম নেতারা অনুধাবন করেন যে, রাজপথের আন্দোলন ও কলকাতার হিন্দু নেতৃত্বের অর্থনৈতিক চক্রান্তের কাছে ব্রিটিশ সরকার নতি স্বীকার করেছে এবং মুসলিমদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছে। এই হতাশা থেকেই মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে পৃথক অস্তিত্বের চেতনা আরও ঘনীভূত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা (১৯২১): বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, তা প্রশমিত করতে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালে ঢাকা সফর করেন। নবাব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলী চৌধুরীর দাবির মুখে ১৯১২ সালে পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বহু বাধা ও কলকাতার একাংশের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯২১ সালের ১লা জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ই পরবর্তীতে পূর্ববঙ্গের উদীয়মান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ তৈরি করে, যা ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে মূখ্য ভূমিকা পালন করে।

এক নজরে ১৯০৫-১৯১১ বঙ্গভঙ্গ

বিষয় / ক্ষেত্র

বিস্তারিত তথ্য ও ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান

বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার তারিখ

১৯০৫ সালের ১৯ই জুলাই প্রস্তাবিত; কার্যকর হয় ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর।

তৎকালীন ভাইসরয় ও সচিব

ভাইসরয়: লর্ড কার্জন (Lord Curzon); ভারত সচিব: সেন্ট জন ব্রডরিক।

অবিভক্ত বাংলার আয়তন ও জনসংখ্যা

আয়তন: প্রায় ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল; জনসংখ্যা: প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ (বাঙালি, বিহারি ও ওড়িয়া সহ)।

পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ

রাজধানী: ঢাকা। অঞ্চল: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ, মালদহ ও আসাম। জনসংখ্যা: ৩ কোটি ১০ লাখ (মুসলিম ১ কোটি ৮০ লাখ, হিন্দু ১ কোটি ২০ লাখ)।

পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ

রাজধানী: কলকাতা। অঞ্চল: পশ্চিম বাংলা, বিহার ও ওড়িশা। জনসংখ্যা: ৫ কোটি ৪০ লাখ (হিন্দু ৪ কোটি ২০ লাখ, প্রাকৃতি ভাষায় কথা বলা জনগোষ্ঠী সংখ্যাগুরু)।

মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া ও নেতৃত্ব

স্বাগত জানায়; প্রধান নেতৃত্ব দেন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী। জন্ম নেয় ১৯০৬-এ মুসলিম লীগ।

হিন্দু মধ্যবিত্ত ও কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া

তীব্র বিরোধিতা; স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন, 'রাখীবন্ধন' উৎসব (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), বৈপ্লবিক সহিংস কর্মকাণ্ড।

বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা

১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর, দিল্লির দরবারে পঞ্চম জর্জ (King George V) কর্তৃক ঘোষিত।

ঐতিহাসিক ক্ষতিপূরণ ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা; হিন্দু-মুসলিম চরম সাম্প্রদায়িক দূরত্ব বৃদ্ধি এবং ১৯৪৭-এর বাংলা ভাগের বীজ বপন।

প্রশাসনিক নথিপত্র ও নেপথ্যের কলকাঠি: রিজলে ও ফুলার অধ্যায়

বঙ্গভঙ্গ কার্যকরের পেছনে ভাইসরয় লর্ড কার্জনের নাম সর্বাধিক উচ্চারিত হলেও, এর মূল নীলক নকশা তৈরির পেছনে ছিলেন কয়েকজন প্রভাবশালী ব্রিটিশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা:

লর্ড কার্জন ও এইচ. এইচ. রিজলে: ১৯০৩ সালের ৩রা ডিসেম্বর ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব এইচ. এইচ. রিজলে একটি বিস্তারিত নথি তৈরি করেন, যা ‘রিজলে চিঠি’ (Risley Paper) নামে পরিচিত। এই চিঠিতেই প্রথম বাংলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। রিজলের গোপন নোটে লেখা হয়েছিল, "বাঙালিদের রাজনৈতিক ঐক্য ভাঙতে না পারলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব বিপন্ন হবে।"

স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রাঝার: তৎকালীন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার অ্যান্ড্রু ফ্রাঝার বঙ্গভঙ্গের প্রশাসনিক নকশা তৈরিতে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেন। তিনি যুক্ত দেখান যে, ওড়িশা ও বিহারকে বাংলার সাথে রাখা প্রশাসনিকভাবে অকার্যকর।

স্যার বামফিল্ড ফুলার (Sir Bampfylde Fuller): পুনর্গঠিত ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশের প্রথম স্যার বার্নেট বামফিল্ড ফুলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ঢাকা কেন্দ্রিক নতুন প্রশাসনিক পরিকাঠামো দাঁড় করান।

ফুলারের 'দুই স্ত্রী' রূপক ও পদত্যাগ

স্যার বামফিল্ড ফুলার পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি একটি রূপক ব্যবহার করে তৎকালীন বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন:

"ব্রিটিশ সরকারের দুই স্ত্রী একজন হিন্দু, অন্যজন মুসলিম। তার মধ্যে মুসলিম স্ত্রীটি অনুগত হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, তাই সরকার এখন তার প্রতি বিশেষ নজর দেবে।"

এই মন্তব্য তৎকালীন কলকাতার সংবাদমাধ্যমে তীব্র বিতর্কের ঝড় তোলে। পরবর্তীতে ১৯০৬ সালে সিরাজগঞ্জের একটি স্কুলে স্বদেশী আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রদের বহিষ্কারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত সরকারের সাথে মতবিরোধ হলে ফুলার পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক কাঠামো ও রাজস্ব বৈষম্য

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক শোষণ ছিল সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানভিত্তিক:

পাটের ভূ-রাজনীতি ও চট্টগ্রাম বন্দর

১৯০৫ সালের আগে বিশ্বের চাহিদার প্রায় ৮০% কাঁচা পাট উৎপাদিত হতো পূর্ববঙ্গে (প্রধানত ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও ফরিদপুরে)। কিন্তু পুরো বাংলায় থাকা শতাধিক পাটকলের (Jute Mills) সবকটিই অবস্থিত ছিল হুগলি নদীর তীরে কলকাতার আশেপাশে।

চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন: বঙ্গভঙ্গের পর ১৯০৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের (Assam Bengal Railway) সাথে সরাসরি যুক্ত করা হয়। ফলে পূর্ববঙ্গের কাঁচা পাট ও চা সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে লন্ডন ও অন্যান্য দেশে রপ্তানি শুরু হয়।

মধ্যস্বত্বভোগীদের পতন: এর ফলে কলকাতার ফড়িয়া, আড়তদার এবং মারওয়াড়ি ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট ধাক্কা খায়, যা ছিল বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তাদের অর্থায়নের অন্যতম কারণ।

ঢাকার নগর অবকাঠামো ও আধুনিকায়ন (১৯০৫–১৯১১)

বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকা এক রাতে প্রাচীন মোগল শহর থেকে আধুনিক ইউরোপীয় শৈলীর প্রশাসনিক রাজধানীতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে ঢাকার নগর পরিকল্পনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়:

রামনা এলাকা উন্নয়ন: ব্রিটিশ স্থপতিদের দিয়ে সাজানো হয় বলধা গার্ডেন ও রামনার পুরো সবুজ বলয়।

আইকনিক ভবনসমূহ: তৎকালীন সময়ে তৈরি হয় 'সচিবালয় ভবন' (যা বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল), 'লাটভবন' বা গভর্নর হাউস (যা বর্তমানে হাইকোর্ট ভবন), এবং ‘কার্জন হল’।

যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ: ১৯০১ সালে যেখানে ঢাকায় হাতে গোনা কিছু পাকা রাস্তা ছিল, ১৯০৬ সালের পর থেকে ঢাকায় প্রথম বিদ্যুতায়ন শুরু হয়, পাকা সড়ক নির্মাণ এবং সুপেয় পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়।

শিমলা ডেপুটেশন (১৯০৬) ও পৃথক নির্বাচনের বীজ

বঙ্গভঙ্গের ধারাবাহিকতায় ভারতের মুসলিম রাজনীতির মোড় চিরতরে ঘুরে যায়। ১৯০৬ সালের ১লা অক্টোবর আগা খানের (Aga Khan III) নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতের একটি প্রতিনিধি দল শিমলায় ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এটি ইতিহাসে 'শিমলা ডেপুটেশন' (Simla Deputation) নামে পরিচিত।

দাবি: প্রতিনিধি দল মুসলিমদের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটা, শিক্ষা তহবিলে আলাদা বরাদ্দ এবং আইনসভায় 'পৃথক নির্বাচন' (Separate Electorates) ব্যবস্থার দাবি জানায়।

ফলাফল: ব্রিটিশ সরকার এই দাবি নীতিগতভাবে মেনে নেয়, যা পরবর্তীতে ১৯০৯ সালের মার্লে-মিন্টো সংস্কার আইনে (Morley-Minto Reforms 1909) অন্তর্ভুক্ত হয়। এই পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার মাধ্যমেই ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মীয় ভিত্তিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের আইনি ভিত্তি স্থাপিত হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৪৭-এর বিভাজন।

স্বদেশী আন্দোলন, অর্থনৈতিক বয়কট ও ১৯০৭ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা

কলকাতায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন কেবল বয়কট ও রাখীবন্ধনে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা দ্রুত সহিংস রূপ ধারণ করে।

১৯০৭ সালের কুমিল্লা ও জামালপুর দাঙ্গা

স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীরা পূর্ববঙ্গের হাট-বাজারে বিলাতি কাপড়, লবণ ও চিনি বিক্রি বন্ধ করতে জোরজুলুম শুরু করে। কিন্তু সাধারণ মুসলিম কৃষক ও ছোট দোকানদারদের পক্ষে চড়া দামে স্বদেশী পণ্য কেনা সম্ভব ছিল না।

স্বদেশী কর্মীদের এই জোরজুলুম এবং হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক (যেমন: দুর্গাপূজা ও কালীর নামে শপথ) ব্যবহার করার ফলে ১৯০৭ সালে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহের জামালপুরে প্রথম বড় ধরনের হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে।

সশস্ত্র বিপ্লববাদ ও বোমার রাজনীতির সূচনা

বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে বাংলায় ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের উত্থান ঘটে।

অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর: ১৯০২ সালে গঠিত হলেও ১৯০৫ বঙ্গভঙ্গের পর ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র, অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং ঢাকায় পুলিন বিহারী দাসের নেতৃত্বে এই গোপন বিপ্লবী সংগঠনগুলো অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে।

কলকাতা ও ঢাকার ভূমিকা: ঢাকা অনুশীলন সমিতি পুরো পূর্ববঙ্গে গোপনে তরুণদের অস্ত্র চালনা ও বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিতে থাকে।

কিংসফোর্ড হত্যা চেষ্টা ও ক্ষুদিরাম: ১৯০৮ সালের ৩০শে এপ্রিল মুজাফফরপুরে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা হামলা চালান ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকি। ভুলবশত দুই ইংরেজ নারী নিহত হন। প্রফুল্ল চাকি আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়।

আলিপুর বোমা মামলা (১৯০৮): মানিকতলার বোমা তৈরির কারখানা আবিষ্কারের পর অরবিন্দ ঘোষসহ বহু বিপ্লবী গ্রেপ্তার হন। এই সশস্ত্র কর্মকাণ্ড ব্রিটিশ সরকারকে শংকিত করে তোলে।

সংবাদপত্র, সাহিত্য ও বুদ্ধিজীবীদের প্রচার যুদ্ধ

বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সংবাদপত্র ও সাহিত্য সমাজ প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল:

রবীন্দ্র-সাহিত্য ও জাতীয় সংগীতের পটভূমি

স্বদেশী আন্দোলনের উন্মাদনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু কালজয়ী স্বদেশী গান রচনা করেন। ১৯০৫ সালে রচিত “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”, “বিদায় দিতে মন চাহে না”, “ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা” গানগুলো স্বদেশী শোভাযাত্রার প্রধান প্রেরণা ছিল। তবে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের হিংসাত্মক রূপ ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দেখে পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ নিজে স্বদেশী আন্দোলনের চরমপন্থা থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন, যার প্রতিফলন ঘটে তাঁর 'ঘরে বাইরে' (১৯১৬)'চার অধ্যায়' উপন্যাসে।

১৯১১ রদের পর ক্ষতিপূরণ চুক্তি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর লর্ড হার্ডিঞ্জের আমলে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলেও, পূর্ববঙ্গের অসন্তোষ প্রশমিত করতে ব্রিটিশ রাজকে বেশ কিছু ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল:

লর্ড হার্ডিঞ্জের ঢাকা সফর (১৯১২): বঙ্গভঙ্গ রদের মাত্র এক মাসের মাথায়, ১৯১২ সালের ৩১শে জানুয়ারি ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় আসেন। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ভাইসরয়ের সাথে দেখা করে পূর্ববঙ্গের প্রতি চরম অবিচারের কথা তুলে ধরেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিশ্রুতি: পূর্ববঙ্গের ক্ষোভ কাটাতে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১): স্যার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে 'নাথান কমিটি' (Nathan Committee) গঠিত হয়। কলকাতার স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সহ এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের প্রবল বিরোধিতা কাটিয়ে অবশেষে ১৯২১ সালের ১লা জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যাকে বঙ্গভঙ্গ রদের সরাসরি 'ক্ষতিপূরণ' (Compensation) হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৯০৫ থেকে ১৯৪৭: বাংলা বিভাজনের চূড়ান্ত ধারাবাহিকতা

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গ (রেডক্লিফ লাইন অনুযায়ী) আলাদা ঘটনা হলেও তাদের মূল রাজনৈতিক উপাদানগুলো ছিল অভিন্ন।

১৯০৫: লর্ড কার্জন প্রশাসনিক অজুহাতে বাংলা ভাগ করেন। মুসলিমরা খুশি হলেও কলকাতার হিন্দু নেতৃত্ব তীব্র আন্দোলন করে রদ করায়।

১৯১১-১৯৪০: বঙ্গভঙ্গ রদ মুসলিম মনস্তত্ত্বে নিশ্চিত করে যে অখণ্ড ভারতে গণতান্ত্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার নামে সংখ্যালঘু মুসলিমদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে না। এর ফলে জন্ম নেয় দ্বিজাতি তত্ত্ব (Two-Nation Theory)।

১৯৪৭: মাত্র ৪২ বছর পর, যখন পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগের প্রস্তাব ওঠে, তখন মুসলিম নেতৃত্ব অখণ্ড বাংলার পক্ষে দাবি তুললেও (সোহরাওয়ার্দী-শরৎ বসু প্রস্তাব), ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করা কলকাতার হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস নেতৃত্বই উল্টো বাংলা ভাগের জোর দাবি তোলে, যাতে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

কালপঞ্জি (Timeline of Key Events: 1903-1921)

১৯০৩ (ডিসেম্বর): রিজলে রিপোর্ট বা বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা প্রথম প্রকাশ্যে প্রকাশ।
১৯০৫ (১৯ই জুলাই): লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা।
১৯০৫ (১৬ই অক্টোবর): বঙ্গভঙ্গ কার্যকর; 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' প্রদেশ গঠন; রাখীবন্ধন ও শোক দিবস পালন।
১৯০৬ (১লা অক্টোবর): শিমলা ডেপুটেশন আগা খানের নেতৃত্বে লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাৎ।
১৯০৬ (৩০শে ডিসেম্বর): ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর শাহবাগ উদ্যানে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ গঠন।
১৯০৭: ঢাকা ও ময়মনসিংহে স্বদেশী আন্দোলনের জেরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা; বামফিল্ড ফুলারের পদত্যাগ।
১৯০৮: আলিপুর বোমা মামলা ও ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি।
১৯০৯: মার্লে-মিন্টো সংস্কারের মাধ্যমে মুসলিমদের পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা আইনি স্বীকৃতি পায়।
১৯১১ (১২ই ডিসেম্বর): দিল্লি দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জ কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ রদ ও ভারতের রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর।
১৯১২ (৩১শে জানুয়ারি): লর্ড হার্ডিঞ্জের ঢাকা সফর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি।
১৯২১ (১লা জুলাই): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু।

১৯৪৭ বাংলা ভাগ এবং বুদ্ধিজীবীদের বৈপরীত্যমূলক অবস্থান

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইরনি বা ট্র্যাজেডি ফুটে ওঠে ১৯০৫ এবং ১৯৪৭ সালের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পেক্ষাপটের তুলনামূলক বিশ্লেষণে।

১৯০৫ সালে যে কলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজ, হিন্দু মহাসভা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সাহিত্যিক শ্রেণী 'বাংলার অখণ্ডতা' ও 'বঙ্গমাতা'র নাম জপে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, ঠিক ৪২ বছর পর ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় তাঁদের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে দাঁড়ায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তৎকালীন সুধী সমাজের অবস্থান

১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খালি পায়ে গঙ্গা স্নান করে 'রাখীবন্ধন' বেঁধেছিলেন এবং একের পর এক হৃদয়স্পর্শী স্বদেশী গান লিখে অখণ্ড বাংলার পক্ষে লড়াই করেছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালে যখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, ১৯৪৭ সালের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলা যদি অখণ্ড থাকে, তবে সেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে গণতান্ত্রিকভাবে একটি স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র বা মুসলিম নেতৃত্ব প্রাধান্য পাবে।

তৎকালীন হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী স্পষ্ট দাবি তোলেন "ভারত যদি ভাগ না-ও হয়, তবুও বাংলাকে ভাগ করতে হবে।" অর্থাৎ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনাধীনে অখণ্ড বাংলায় থাকার চেয়ে তারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে হিন্দু প্রধান পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করাকে শ্রেয় মনে করেছিলেন।

এমনকি ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কলকাতা কেন্দ্রিক সুধী সমাজ ও পত্রিকাগুলো ১৯৪৭ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎচন্দ্র বসু এবং শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের প্রস্তাবিত ‘স্বাধীন অখণ্ড বাংলা’ (United Independent Bengal) কাঠামোর তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯০৫ সালে যাদের কাছে 'মাতৃভূমির অঙ্গচ্ছেদ' ছিল মহাপাপ, ১৯৪৭ সালে তাদের কাছেই 'বাংলা ভাগ' হয়ে দাঁড়ায় আত্মরক্ষার একমাত্র পথ। এটি প্রমাণ করে যে, ১৯০৫ সালের বিরোধিতার নেপথ্যে কেবল আবেগ ছিল না, বরং তার মূল চালিকাশক্তি ছিল সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার আকুল আকাঙ্ক্ষা।

ইতিহাসের মহাকাব্যিক শিক্ষা

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ভারতবর্ষের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক ক্ষণস্থায়ী প্রশাসনিক পরীক্ষা হলেও, ইতিহাসের দীর্ঘ ক্যানভাসে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল চিরস্থায়ী।

লর্ড কার্জনের 'ভাগ করো ও শাসন করো' নীতি সাময়িকভাবে সফল হলেও, তা পূর্ববঙ্গের শোষিত ও ঘুমন্ত মুসলিম সমাজকে নিজেদের অধিকার ও আত্মপরিচয় সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিল। যদি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ না হতো, তবে ১৯০৬ সালে ঢাকা কেন্দ্রিক 'মুসলিম লীগ'-এর জন্ম হতো না, ১৯২১ সালে 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠিত হতো না, আর পূর্ববঙ্গে সেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি হতো না যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম 'বাংলাদেশ' রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল।

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ তাই কেবল দুটি ভূখণ্ডের সীমানা বিভাজন ছিল না; এটি ছিল মূলত পূর্ববঙ্গের অবহেলিত জনপদের আত্মপ্রকাশ, নবজাগরণ এবং স্বাধিকার অর্জনের এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রামের প্রথম মহাকাব্যিক অধ্যায়।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.