বাংলার রবিনহুড রঘু ডাকাত – ইংরেজ নীলকর জমিদারদের আতংক

ছোটবেলায় টেলিভিশন বা দূরদর্শনের পর্দায় ইংল্যান্ডের কালজয়ী লোকনায়ক রবিনহুডের গল্প দেখে মোহিত হননি এমন মানুষ কমই আছেন। শেরউড জঙ্গলের সেই দুঃসাহসী বীর, যে অত্যাচারী ধনী জমিদার ও রাজপুরুষদের কাছ থেকে ধনসম্পদ কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব, ক্ষুধার্ত সাধারণ প্রজা ও কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দিত তা দেখে রোমাঞ্চ জাগাই স্বাভাবিক ছিল। থ্রিল, অ্যাকশন আর ন্যায়বিচারের এক অদ্ভুত মিশ্রণ ছিল সেই গল্পে। কিন্তু আমাদের অনেকেরই অজানা যে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে এই বাংলার বুকেও ঠিক তেমনই এক লোকনায়ক বা 'রবিনহুড' চরিত্রের আবির্ভাব ঘটেছিল। যার নাম শুনলে সাধারণ কৃষকের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটত, আর ঘুম হারাম হয়ে যেত তৎকালীন প্রবল প্রতাপশালী ব্রিটিশ নীলকর ও অত্যাচারী জমিদারদের। তিনি আর কেউ নন কিংবদন্তির 'রঘু ডাকাত' ওরফে রঘুনাথ ঘোষ।
বাঙালি মানসে 'রঘু ডাকাত' নামটির সাথে জড়িয়ে আছে এক জটিল ও দ্বিমুখী মানসিকতা। একদিকে রঘু ডাকাত শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে অন্ধকার অমাবস্যার রাত, বাঁশঝাড়ের আড়ালে মশাল জ্বালিয়ে ডাকাতদলের বিকট হুঙ্কার, লাঠি-সোটার ঝনঝনানি, ভয় আর আতঙ্কে জমে যাওয়া এক রক্তহিম করা আবহ। অন্যদিকে, সেই ভয়ের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল চরম মানবিকতা, দেশপ্রেম এবং তৎকালীন গণমানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। ব্রিটিশ আমলে যখন "বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত" বলে প্রবাদ প্রচলিত ছিল, সেই শক্তিমত্তার প্রতীক ছিলেন রঘুনাথ।
আজ থেকে প্রায় দুই শতাব্দী আগে, উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, যখন সুজলা-সুফলা বাংলার মাটি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বুটের তলায় পিষ্ট হচ্ছিল, নীলকরদের বেপরোয়া অত্যাচারে কৃষকদের দিনরাত চরম হাহাকার ও ত্রাহি অবস্থা তখনই হুগলি, নদীয়া, বর্ধমান ও ২৪ পরগনার গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র বাংলায় একটি নাম বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে: রঘু ডাকাত।
তিনি কোনো সাধারণ চোর, লম্পট বা অর্থলোভী ডাকাত ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি, যার রক্তে প্রবাহিত হতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগুন। এই দীর্ঘ ও গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে আমরা উনবিংশ শতাব্দীর সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে রঘু ডাকাতের জীবন, তাঁর বৈপ্লবিক ডাকাত দল, সিগনেচার স্টাইল, ঐতিহাসিক রবিনহুড ইমেজ, সাধক রামপ্রসাদের সাথে তাঁর অলৌকিক সাক্ষাত এবং আধুনিক প্রেক্ষাপটে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি
রঘু ডাকাতের উত্থানকে কেবল কয়েকজন অপরাধীর উপদ্রব হিসেবে দেখলে ঐতিহাসিক ভুল হবে। তাঁর এই চরমপন্থী ও বিদ্রোহী রূপ ধারণের নেপথ্যে ছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ভয়াবহ অর্থনৈতিক শোষণ ও বিচারহীনতার পরিবেশ।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ও কৃষকদের ওপর নিপীড়ন: ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর এবং ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার পরোক্ষভাবে কবজা করে। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) কোম্পানির চরম রাজস্ব শোষণের ফলে নেমে আসে ভয়াবহ 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর', যাতে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অনাহারে প্রাণ হারায়। এর পরও রাজস্ব আদায়ের কোনো শিথিলতা ছিল না।
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস কর্তৃক 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' (Permanent Settlement) প্রবর্তিত হলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সমাজকাঠামো এক রাতের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়। জমির আসল মালিক কৃষক রাতারাতি উচ্ছেদযোগ্য প্রজায় পরিণত হয়, আর জন্ম নেয় একশ্রেণির নব্য অভিজাত জমিদারের যাদের একমাত্র কাজ ছিল যেকোনো মূল্যে কৃষকের রক্ত চুষে ট্যাক্স আদায় করা এবং ইংরেজদের চাটুকারিতা করা।
নীলচাষের অত্যাচার ও নীলকুঠির আতঙ্ক: উনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বাংলায় নীল চাষের ভয়াবহ বিস্তার ঘটে। ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের সুবাদে বস্ত্র কারখানায় সূতি কাপড়ে রং করার জন্য প্রাকৃতিক নীলের চাহিদা তুঙ্গে ওঠে। ইংরেজ ব্যবসায়ীরা বাংলায় এসে গড়ে তোলে অসংখ্য 'নীলকুঠি'।
দাদন প্রথা তথা কৃষকদের সামান্য কিছু টাকা অগ্রিম (দাদন) দিয়ে জোরপূর্বক উর্বর জমিতে ধান বা খাদ্যের বদলে নীল চাষে বাধ্য করা হতো। কোনো কৃষক নীল চাষে অস্বীকৃতি জানালে তার ঘরে আগুন দেওয়া হতো, গবাদিপশু কেড়ে নেওয়া হতো, এমনকি নীলকুঠির অন্ধকার ঘরে চাবুক দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হতো।
আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ও প্রজা বিদ্রোহ: কোম্পানির পুলিশ ব্যবস্থা ছিল চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ও চাটুকার। দারোগা ও কনস্টেবলরা দরিদ্র সাধারণ প্রজা বা কৃষকদের নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে জমিদার ও নীলকরদের লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করত। বিচার ব্যবস্থার কোনো অস্তিত্ব সাধারণ মানুষের জন্য ছিল না। এই নৈরাজ্যময় ও বিচারহীন পরিবেশেই জন্ম নেয় সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন। ফরায়েজি আন্দোলন, ওয়াহাবি আন্দোলন, এমনকি রঘু ডাকাত ও বিশে ডাকাতের মতো দুঃসাহসী চরিত্রদের উত্থান ঘটেছিল এই সামাজিক ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে।
রঘুনাথ ঘোষের প্রাথমিক জীবন ও প্রতিশোধের সূচনা
রঘু ডাকাতের আসল নাম ছিল রঘুনাথ ঘোষ। তিনি ছিলেন খাঁটি বাঙালি, মাটির সন্তান।
জন্ম ও বংশ পরিচয়: উনবিংশ শতাব্দীর একদম শুরুর দিকে (আনুমানিক ১৭৯০-১৮০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি) তৎকালীন হুগলি জেলার কাছে একটি ছোট্ট গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। ঐতিহাসবিদ ও লোকগাথাকারদের মতে, সপ্তগ্রাম বা দেবীপুরের জঙ্গলময় অঞ্চল ছিল তাঁর আদি বাসস্থান। তিনি একটি অত্যন্ত সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সৎ, নিরহংকারী এবং মাটির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা চাষি।
নীলকরের চাবুক এবং বাবার নির্মম হত্যাকাণ্ড: রঘুনাথের বয়স যখন মাত্র ১২ বা ১৩ বছর, তখন তাঁর জীবনের মোড় এক চরম নির্মম ট্র্যাজেডির মাধ্যমে ঘুরে যায়। স্থানীয় এক অত্যাচারী ইংরেজ নীলকর নীলকুঠির পেয়াদাদের পাঠায় রঘুনাথের বাবার কাছে, যাতে তিনি তাঁর খাদ্যশস্য উৎপাদনের উর্বর জমিটিতে নীল চাষ করেন। কিন্তু রঘুনাথের আত্মসম্মানী বাবা পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে নীল চাষ করতে পরিষ্কার অস্বীকার করেন।
এর পরিণতি হয় অত্যন্ত ভয়াবহ। গভীর রাতে নীলকুঠির সশস্ত্র পেয়াদারা এসে রঘুনাথের বাবাকে বেঁধে নিয়ে যায় নীলকুঠির প্রাঙ্গণে। বালক রঘুর চোখের সামনে তাঁর বাবাকে গাছে বেঁধে চাবুক ও লাঠি দিয়ে প্রহার করা হয়। পৈশাচিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে রঘুর বাবার প্রাণবায়ু নির্গত হয়। কিন্তু অত্যাচারী ইংরেজদের আস্ফালন সেখানেই থামেনি; অন্যান্য কৃষকদের মনে আতঙ্ক ছড়াতে এবং বিদ্রোহের ফল কী হতে পারে তা বোঝাতে লাশটি গ্রামের হাটের মাঝখানে একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
শ্মশানের আগুন ও হৃদয়ে প্রতিশোধের সংকল্প: বাবার ঝুলন্ত ও রক্তাক্ত লাশ দেখে বালক রঘুনাথের কচি মনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা সাধারণ কোনো সান্ত্বনায় ভরার ছিল না। শ্মশানে বাবার চিতায় যখন তিনি মুখাগ্নি করলেন, তখন কাঠ পোড়ার আগুনের চেয়েও তীব্র এক প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠেছিল ১৩ বছরের কিশোর রঘুর বুকের ভেতরে। তিনি চিতার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এই অন্যায়ের বিচার তিনি নিজেই করবেন। যে সমাজ ও আইন তাঁর বাবাকে রক্ষা করতে পারেনি, সেই আইনের তোয়াক্কা তিনি আর করবেন না।
লাঠিখেলায় পারদর্শিতা ও 'রঘু ডাকাত' দলের আত্মপ্রকাশ
প্রতিশোধের আগুন বুকে নিয়ে রঘুনাথ বসে থাকেননি। নিজেকে শারীরিকভাবে প্রস্তুত করতে শুরু করেন।
লাঠিয়াল সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ততা: তৎকালীন বাংলায় লাঠিখেলা ছিল আত্মরক্ষা ও প্রতিপত্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। রঘুনাথ স্থানীয় ওস্তাদদের কাছ থেকে লাঠিখেলা, কুস্তি, খড়্গচালনা এবং গেরিলা যুদ্ধবিদ্যায় অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেন। অল্প বয়সেই তাঁর সুঠাম কান্তি, কালো লম্বা দোহারা গঠন এবং অসম্ভব শারীরিক শক্তির কারণে সবাই তাঁকে মান্য করতে শুরু করে।
দেবীপুরের জঙ্গলে গোপন ঘাঁটি ও ক্যাডার বাহিনী: রঘুনাথ জানতেন একা ইংরেজ বা জমিদারদের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব নয়। তিনি স্থানীয় নীলকরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ যুবকদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। তাঁর এই অভিযানে সর্বাত্মক সহায়তা করেন তাঁর আপন ভাই বিধু ভূষণ ঘোষ। বিধু ভূষণ ছিলেন রঘুর ডানহাত, তাঁর প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপতি।
দুই ভাই মিলে হুগলির দেবীপুর ও ত্রিবেণীর গহীন জঙ্গলে তাদের গোপন আস্তানা গড়ে তোলেন। এই জঙ্গল ছিল ঘন বাশে ও ঝোপঝাড়ে আবৃত, যেখানে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, সিপাহি বা পুলিশ বাহিনী ঢোকার সাহস পেত না। দেখতে দেখতে শত শত শোষিত কৃষক ও লাঠিয়াল তরুণ রঘুর দলে যোগ দেয়।
নীলকুঠি দহন ও জমিদারদের ঘরে আক্রমণ: দল সংগঠিত করেই রঘুনাথ প্রথম আঘাত হানেন সেই নীলকুঠিতে, যেখানে তাঁর বাবাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। গভীর রাতে রঘুর দল নীলকুঠি ঘিরে ফেলে, পাহারাদারদের পরাস্ত করে এবং কুঠিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কুখ্যাত নীলকর সাহেব কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর থেকে শুরু হয় রঘুনাথ ঘোষের ডাকাত জীবন। তবে তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের গচ্ছিত ধনসম্পদ। লুণ্ঠিত অর্থ ও শস্য তিনি নিজের বিলাসের জন্য না রেখে, খাজনা দিতে না পারা দরিদ্র কৃষক ও বস্ত্রহীন গ্রামবাসীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। আর এই মানবিক ও দুঃসাহসিক কাজের মাধ্যমেই কৃষক সমাজের কাছে "রঘুনাথ ঘোষ" রূপ নেন সর্বকালের সেরা কিংবদন্তি "রঘু ডাকাত"-এ।
রঘু ডাকাতের দল ও তাঁদের কঠোর নীতি ও আদর্শ
সাধারণ চোর-ডাকাতের সাথে রঘু ডাকাতের প্রধান পার্থক্য ছিল তাঁর শৃঙ্খলা, আদর্শ ও কঠোর নৈতিক কোড (Code of Ethics)।
রঘুর টিমের কঠোর শৃঙ্খলামালা
রঘু ডাকাত তাঁর দলের জন্য কিছু নিয়মাবলী অলিখিত হলেও অত্যন্ত কঠোরভাবে জারি করেছিলেন। এই নিয়ম ভাঙলে অপরাধীকে দল থেকে বিতাড়িত বা চরম শাস্তি দেওয়া হতো:
দুর্বলকে আঘাত না করা: নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষের গায়ে কখনো হাত তোলা যাবে না।
দরিদ্রদের সুরক্ষা: দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর বা ভিক্ষুকদের কাছ থেকে একটি কানাকড়িও নেওয়া যাবে না; বরং তাদের সাহায্য করতে হবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্মান: নারী জাতি এবং পণ্ডি তা সচ্চরিত্র ব্রাহ্মণদের পরম সম্মান করতে হবে।
সম্পদ বণ্টন: ডাকাতির সমস্ত মালের সিংহভাগ গরীবদের সেবা ও সুকাজে ব্যয় করতে হবে, নিজেদের জীবনধারণের জন্য যতটুকু না হলেই নয়, ততটুকুই রাখা যাবে।
সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও 'প্রাকৃতিক ঢাল'
এই কঠোর নীতিমালার কারণে সাধারণ মানুষ রঘুকে ডাকাত মনে করত না, মনে করত নিজেদের ঘরের সন্তান বা লোকরক্ষক। ফলস্বরূপ, পুলিশ বা ব্রিটিশ সিপাহিরা যখন রঘুকে ধরতে গ্রামে গ্রামে তল্লাশি চালাত, তখন সাধারণ গ্রামবাসীরাই রঘু ও তাঁর দলকে নিজেদের ঘরে লুকিয়ে রাখত বা পুলিশকে ভুল পথ দেখিয়ে বিভ্রান্ত করত। গ্রামবাসীদের এই ভালোবাসাই ছিল রঘু ডাকাতের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা বলয়।
সিগনেচার স্টাইল: আগাম চিঠি ও নৈহাটির জমিদার লুণ্ঠনের ঐতিহাসিক কাহিনী
রঘু ডাকাতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর দুঃসাহস ও আত্মবিশ্বাস। তিনি কখনো চোরের মতো চুপিচুপি বা লুকিয়ে ডাকাতি করতেন না।
"আগাম চিঠি" পাঠানোর রীতি
ডাকাতি করতে যাওয়ার কয়েক দিন আগে রঘু ডাকাত সংশ্লিষ্ট জমিদারের বাড়িতে রিকশা বা বাহক মারফত লাল কালিতে লেখা চিঠি পাঠাতেন। চিঠির বয়ান হতো অনেকটা এরকম:
"অমুক তারিখ, অমুক সময়ে আপনার ভবনে রঘু ডাকাত হাজির হইবে। ধনসম্পদ প্রস্তুত রাখিবেন। ইতি-রঘু ডাকাত।"
এটি ছিল জমিদারের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছোঁড়া। জমিদাররা সমস্ত সশস্ত্র লাঠিয়াল, দারোয়ান এবং পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করেও রঘুর ডাকাতি আটকাতে পারত না।
নৈহাটির জমিদার বিনোদ ঘোষাল ও বাগানবাড়ি লুণ্ঠনের ঘটনা
রঘু ডাকাতের বুদ্ধিমত্তা ও চালবাজির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো নৈহাটির খ্যাতনামা জমিদার বিনোদ ঘোষালের বাগানবাড়ি লুণ্ঠন।
ঘটনার সূত্রপাত: একবার নৈহাটির জমিদার বিনোদ বাবু তাঁর বন্ধুদের নিয়ে গঙ্গার তীরে অবস্থিত বিশাল বাগানবাড়িতে মদ্যপ অবস্থায় আস্ফালন করছিলেন। মদের নেশায় চুর হয়ে তিনি চিৎকার করে বলেন, "রঘু ডাকাতের এত বড় সাহস! দেখি আমার তল্লাটে সে কীভাবে ঢোকে! আমার লাঠিয়ালদের দেখে রঘুর রক্ত হিম হয়ে যাবে।"
কথাটি দ্রুত বাতাসে ভেসে রঘু ডাকাতের কানে পৌঁছায়। রঘু এটাকে নিজের সম্মানের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেন। কয়েকদিন পরেই জমিদারের কাছে আগাম চিঠি পৌঁছায় অমুক তারিখে অমুক রাতে বাগানবাড়ি লুট হবে!
পুলিশের প্রস্তুতি: চিঠি পেয়েই জমিদার বিনোদ বাবুর নেশা ছুটে যায়। তিনি ছোটেন নৈহাটি থানার তৎকালীন তুখোড় ব্রিটিশভক্ত দারোগা দুর্গাচরণ চক্রবর্তীর কাছে। দারোগা দুর্গাচরণবাবু বিশাল পুলিশ বাহিনী ও সিপাহি নিয়ে জমিদারের বাগানবাড়ি ঘিরে ফেললেন। দিনরাত পাহারা চলতে লাগল।
ছদ্মবেশী বণিক রঘু: নির্দিষ্ট তারিখের একদিন আগে, দিনের আলোয় একটি মহামূল্যবান বিলাতি ঘোড়ার গাড়িতে চেপে এক পরম সম্ভ্রান্ত ও ধনকুবের ব্যবসায়ী জমিদারের বাগানবাড়িতে এসে হাজির হন। লোকটির পরনে ছিল দামি রেশমি পোশাক, হাতে হীরার আংটি। তিনি নিজেকে কলকাতার বড় মারवाड़ी ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি জমিদারের এই মনোরম বাগানবাড়িটি চড়া দামে কিনে নিতে চান।
জমিদার বিনোদ বাবু ও পুলিশ অফিসার দুর্গাচরণ চক্রবর্তী মহা আনন্দে সেই ধনী ব্যবসায়ীকে সম্পূর্ণ বাগানবাড়ি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন। কোথায় কোথায় গুপ্তধন আছে, কোথায় পুলিশের পাহারা বসানো হয়েছে সব স্বয়ং দারোগাবাবু ও জমিদার খালি মুখে তাঁকে দেখিয়ে দিলেন! ব্যবসায়ী সন্তুষ্ট হয়ে জমিদারের হাতে অগ্রিম বায়না বাবদ ১০০ টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, "পরশু এসে বাকি টাকা দিয়ে দলিল সই করব।" তারপর বীরদর্পে চলে গেলেন।
চূড়ান্ত ডাকাতি: পুলিশ ও জমিদার ভাবলেন, রঘু ডাকাত হয়তো পুলিশের ভয়ে পিছিয়ে গেছে। ঘটনার দিন রাতে পাহারায় কিছুটা ঢিল পড়েছিল। ঠিক সেই সুযোগেই রাত ২টায় রঘুর দল হানা দেয়। কোনো রক্তপাত ছাড়াই তারা সমস্ত পাহারাদার ও লাঠিয়ালকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। ঘরের সমস্ত সোনা-দানা, রুপোর পাত্র ও নগদ টাকা খালি করে ফেলে রঘুর দল।
পরদিনের চিরকুট: সকালে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হওয়ার পর জমিদার বিনোদ বাবু তাঁর টেবিলে একটি চিঠি পান। সেখানে লেখা ছিল:
"বিনোদ বাবু, আপনার আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ। গতকাল যে ১০০ টাকা আপনাকে বায়না বাবদ দিয়াছিলাম, তাহা আপনার নিকটই রাখিয়া দিলাম। আপনার সমস্ত ধনসম্পদ আমি আপনার নির্যাতিত প্রজাদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিয়াছি। ইতি-রঘু ডাকাত।"
অর্থাৎ, গতকাল যে ছদ্মবেশী ধনী ব্যবসায়ী এসে ১০০ টাকা বায়না দিয়ে গোটা বাগানবাড়ির সিকিউরিটি প্ল্যান দেখে গিয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন-স্বয়ং রঘু ডাকাত! এই ঘটনাটি তৎকালীন কলকাতা ও সমগ্র বাংলায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল এবং সাধারণ মানুষের কাছে এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যানে পরিণত হয়েছিল।
রঘু ডাকাতের বিরল মানবিক উদাহরণসমূহ
রঘু ডাকাতের ভেতরে কেবল একজন হিংস্র যোদ্ধা ছিল না, ছিল একজন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবিক হৃদয়। ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্র ও লোককথা থেকে তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত ঘটনা উঠে আসে:
গরীব ব্রাহ্মণের কন্যার বিবাহে সাহায্য
একবার গভীর অমাবস্যার রাতে রঘুর দল এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের বাড়িতে ডাকাতি করতে হানা দেয়। বাড়িতে ঢুকে তারা দেখে, ঘরে মূল্যবান বলতে কিছুই নেই। কয়েকটি পুরনো পিতলের বাসন এবং সামান্য কিছু তামার মুদ্রা ছাড়া কিছুই পাওয়া গেল না।
ব্রাহ্মণ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রঘুর পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করতে থাকেন এবং বলেন, "বাবা, এই সামান্য কিছু টাকা আর বাসন আমি আমার মাতৃহীন মেয়ের বিয়ের জন্য অনেক কষ্টে জোগাড় করেছি। পাত্রপক্ষ পাঁচশত টাকা যৌতুক ও গয়না চেয়েছে। এই টাকাটুকু নিলে আমার মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাবে, মেয়েটা আত্মঘাতী হবে।"
কথাটি শুনে রঘু ডাকাতের চোখ সজল হয়ে ওঠে। তিনি তৎক্ষণাৎ সঙ্গীদের নির্দেশ দেন সংগৃহীত সামান্য বাসনপত্র ফিরিয়ে দিতে। তিনি ব্রাহ্মণের মাথায় হাত রেখে বলেন, "পণ্ডিত মশাই, আমি ডাকাত হতে পারি, কিন্তু ব্রাহ্মণের অভিশাপ বা কান্নার জল নিতে আসি নাই। আপনার মেয়ে মানে আমারও মেয়ে।"
এর ঠিক তিন দিন পর, রাতের অন্ধকারে সেই ব্রাহ্মণের উঠোনে একটি ভারী বস্তা এসে পড়ে। বস্তা খুলে ব্রাহ্মণ দেখে তাতে প্রচুর সোনা-রুপোর গয়না, নতুন রেশমি শাড়ি, বস্তাভরা চাল-ডাল এবং নগদ এক হাজার টাকা! সাথে একটি ছোট চিঠি:
"ইহা কোনো ঋণ নহে, আপনার আশীর্বাদের উপহার। আপনার মেয়ের বিবাহ মহাসমারোহে সম্পন্ন করুন। ইতি-কন্যাদায়গ্রস্ত এক পিতা (রঘু)।"
কুখ্যাত নীলকর সাহেবের বাংলো অভিযান ও 'খাজনার খাতা' দহন
মাঘ মাসের এক হাড়কাঁপানো শীতের রাতে রঘু ডাকাত নদীয়া অঞ্চলের এক পরম অত্যাচারী ইংরেজ নীলকর সাহেবের বাংলোতে অভিযানের ছক আঁকেন। সেই নীলকর সাহেব স্থানীয় কৃষকদের জোর করে নীলচাষ করাত এবং খাজনা দিতে না পারলে তাদের বসতভিটা বাজেয়াপ্ত করত।
রঘু কুয়াশার সুযোগ নিয়ে নিজে এক পথভোলা সাধারণ মাঝির ছদ্মবেশে বাংলোর ফটকে গিয়ে পাহারাদারদের সাথে কথা বলে তাদের মনযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেন। এই সুযোগে রঘুর সঙ্গীরা নিরবে দুজন পাহারাদারকে কাবু করে ফেলে। ভেতরে ঢুকে সাহাবকে বন্দি করে তারা লোহার আলমারি থেকে সমস্ত স্বর্ণালঙ্কার ও মুদ্রা লুট করে।
তবে এই অভিযানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজ ছিল রঘু শুধু টাকা নেননি; তিনি নীলকরের সুদের ও জোরপূর্বক আদায় করা 'খাজনার সমস্ত নথি ও খাতা' টেনে বের করে উঠোনে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেন। এর ফলে এক রাতের মধ্যে শত শত দরিদ্র চাষি নীলকরের ঋণের শিকল থেকে মুক্ত হয়। পরদিন সকালে গ্রামবাসীরা দেখে, তাদের ঘরের দরজার সামনে অলৌকিকভাবে রাখা আছে চালের বস্তা ও রুপোর মুদ্রা।
ছদ্মবেশে পুলিশকে নাজেহাল: দারোগা ও রুই মাছের গল্প
১৮৩০ সালের দিকে ইংরেজ সরকার রঘু ডাকাতকে ধরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। নদীয়া, হুগলি ও বর্ধমান অঞ্চলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। গঠিত হয় বিশেষ 'থাগি অ্যান্ড ডাকোইটি ডিপার্টমেন্ট' (Thuggee and Dacoity Department)। রঘু ডাকাতকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে তৎকালীন সময়ের বিশাল অঙ্কের আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
নৈহাটি থানার দারোগাবাবু (মতান্তরে দুর্গাচরণবাবু) রঘুকে ধরতে দিনে-রাতে এক করে ফেলছিলেন। সরকারের চাপে তাঁর চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমন সময় দারোগার কাছে রঘুর চিঠি আসে: "দারোগা বাবু, আপনার খুব কষ্ট হইতেছে। আমি নিজেই আপনার সহিত দেখা করিতে আসিতেছি। প্রস্তুত থাকুন।"
দারোগা থানায় উচ্চ সতর্কতা (High Alert) জারি করলেন। কিন্তু দিনের পর দিন কেটে গেলেও রঘুর কোনো পাত্তা নেই।
এর কয়েকদিন পর এক সকালে, এক সাধারণ জেলে দুটি বিশাল টাটকা রুই মাছ কাঁধে নিয়ে থানায় হাজির হয়। দারোগাবাবু অমনি তাকে চেপে ধরেন "তুই কে রে? কার মাছ?"
জেলে খুব ভয়ে ভয়ে সেলাম ঠুকে বলে, "হুজুর! আমি পাশের গাঁয়ের জমিদারের প্রজা। জমিদার বাবুর নাতির অন্নপ্রাশন। উনি আপনাকে এই মাছ দুটি পাঠাইছেন আর এই চিঠিটা দিছেন।"
চিঠিতে লেখা ছিল: "প্রিয় দারোগাবাবু, নাতির অন্নপ্রাশনে আপনাকে পাইলাম না, তাই দুটি টাটকা রুই মাছ লোক মারফত পাঠাইলাম। গ্রহণ করিবেন।"
দারোগাবাবু সানন্দে মাছ দুটি গ্রহণ করলেন এবং দরিদ্র জেলেকে দয়া করে দুই টাকা বকশিশ দিয়ে বিদায় করলেন।
এর তিন দিন পর দারোগার কাছে আবার রঘু ডাকাতের লাল কালির চিঠি আসে:
"দারোগাবাবু, কথা দিয়েছিলাম দেখা করতে আসব। আসিয়াছিলাম। দুটি বড় রুই মাছ নিজের হাতে দিয়া আসিলাম। আপনি তো চিনিতেই পারিলেন না! তদুপরি আমাকে দুই টাকা বকশিশও দিলেন! আতিথেয়তা ও বকশিশের জন্য অশেষ ধন্যবাদ। মাছ কেমন খাইলেন জানাইবেন। ইতি-রঘু ডাকাত।"
চিঠি পড়ে দারোগাবাবুর মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল! যে সাধারণ জেলেকে তিনি দুই টাকা বকশিশ দিয়ে বিদায় করেছেন, তিনি আর কেউ নন স্বয়ং রঘু ডাকাত! থানার সিপাহিদের নাকের ডগা দিয়ে এসে মাছ খাইয়ে বকশিশ নিয়ে চলে গেছেন, অথচ কেউ টের পায়নি।
আধ্যাত্মিক পরিবর্তন: রঘু ডাকাত, সাধক রামপ্রসাদ ও 'সিদ্ধেশ্বরী কালী'
রঘু ডাকাতের জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, আবেগঘন ও অলৌকিক অধ্যায়টি হলো তাঁর জীবনের আধ্যাত্মিক পরিবর্তন (Spiritual Transformation)।
স্বপ্নাদেশ ও মা কালীর পূজা
লোকশ্রুতি অনুযায়ী, ডাকাতি জীবনের শুরুতে রঘু ডাকাত ছিলেন মা কালীর পরম ভক্ত। কথিত আছে, গভীর রাতে হুগলি নদীর তীরের ঘন জঙ্গলে এক পরিত্যক্ত মন্দিরে গিয়ে তিনি স্বপ্নে মা কালীর রূপ দর্শন পান। দেবী তাঁকে পূজাArchana করার নির্দেশ দেন।
এরপর থেকে রঘু ডাকাত যেকোনো বড় অভিযানে যাওয়ার আগে মা কালীর পূজা দিতেন। দেবীমূর্তির সামনে তিনি নিজের প্রিয় খাবার 'পোড়া ল্যাটা মাছের ভোগ' নিবেদন করতেন। আজও বাংলায় অনেক ডাকাতকালী মন্দিরে পোড়া ল্যাটা মাছের ভোগ দেওয়ার ঐতিহ্য রঘু ডাকাতের সময় থেকেই প্রবাহিত হয়ে আসছে।
নরবলির প্রথা ও অমাবস্যার রাত
তবে সেই সময়ের তন্ত্রসাধনায় একটি ভয়াবহ কুপ্রথা প্রচলিত ছিল 'নরবলি'। রঘু বিশ্বাস করতেন, অমাবস্যার রাতে দেবীমূর্তির চরণকমলে নরবলি দিলে দেবী প্রসন্ন হন এবং দলকে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করেন। সাধারণ নিয়ম ছিল যে রাতে তারা ডাকাতি করতে বের হতো, সে রাতে পথচলতি কোনো পুরুষকে ধরে এনে বলিকাষ্ঠে বলি দেওয়া হতো।
সাধক রামপ্রসাদ সেনের সাথে ঐতিহাসিক সাক্ষাত
এমনই এক ভয়ঙ্কর কার্তিক অমাবস্যার রাতে রঘুর দল ডাকাতিতে গিয়ে কোনো মানুষ বা বলি খুঁজে পায়নি। খালি হাতে ফিরলে খড়্গপূজা অসম্পূর্ণ থাকবে ভেবে রঘুর নির্দেশে অনুচররা জঙ্গলে লোক খুঁজতে বের হয়। এমন সময় তারা দেখে, গঙ্গার তীর ঘেঁষে এক সাধক আনমনে হেঁটে যাচ্ছেন। তিনি আর কেউ নন বাংলার অমর শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা সাধক রামপ্রসাদ সেন!
রঘুর দল বলির জন্য রামপ্রসাদকে ধরে নিয়ে এসে বলিকাষ্ঠে সোপর্দ করে। বলির সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন। রঘু ডাকাত চকচকে হাঁসুলি খাঁড়া হাতে নিয়ে প্রস্তুত। বলির ঠিক পূর্বমুহূর্তে রঘু জিজ্ঞেস করলেন, "হে সাধু, বলিকাষ্ঠে ওঠার আগে তোর শেষ ইচ্ছা কী বল?"
সাধক রামপ্রসাদ অত্যন্ত শান্ত ও প্রসন্ন মনে উত্তর দিলেন, "আমার কোনো ধনসম্পদের লোভ নাই। মৃত্যুকেও ভয় পাই না। কেবল মা কালীর উদ্দেশ্যে একটি গান গাইতে চাই।"
রঘু অনুমতি দিলে সাধক রামপ্রসাদ তাঁর অমিয় ও দরদী কণ্ঠে গান ধরে দিলেন:
"তিলেক দাঁড়া ওরে শমন, বদন ভরে মাকে ডাকি...
মাতা বর্তমানে পুত্রকে কি শমনে ভয় দেখায়?
মা গো, আমায় নিয়ে যা তোর কোলে..."
গানের প্রতিটি সুর যেন সাপের বিষ উতারোর মতো কাজ করল। জঙ্গলজুড়ে এক অলৌকিক স্তব্ধতা নেমে এলো। গান গাইতে গাইতে সাধক রামপ্রসাদ যখন চোখের জলে ভাসছেন, তখন রঘু ডাকাত চোখের সামনে এক মহাজাগতিক দৃশ্য দেখতে পেলেন!
রঘু দেখলেন বলিকাষ্ঠে সাধক রামপ্রসাদ বসে নেই; সেখানে স্বয়ং চতুর্ভুজা, ভয়ঙ্করী অথচ করুণাময়ী জগতজননী মা কালী দাঁড়িয়ে আছেন! মায়ের মুখ থেকে রক্ত ঝরছে না, ঝরছে করুণার অশ্রু। দেবী যেন রঘুকে বলছেন, "রঘু! তুই কাকে বলি দিতে যাচ্ছিস? এতো আমারই প্রিয় সন্তান! আজ থেকে কোনো সন্তানের রক্ত আমি গ্রহণ করব না!"
খড়্গ ত্যাগ ও 'সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি'
চোখের সামনে এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে রঘু ডাকাতের হাত থেকে রক্তমাখা খাঁড়া মাটিতে খসে পড়ল। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সাধক রামপ্রসাদের পায়ে লুটিয়ে পড়লেন। রামপ্রসাদ রঘুকে কোলে তুলে নিয়ে মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন।
সেই রাতেই রঘু প্রতিজ্ঞা করলেন তিনি আর কখনো নরবলি দেবেন না এবং অপরাধ ও হিংসার পথ চিরতরে ত্যাগ করবেন। লোকশ্রুতি আছে, এর পর থেকে রঘু ডাকাত ডাকাতি ছেড়ে দেন এবং পুরোপুরি ধর্মচর্চা ও সমাজসেবায় মন দেন।
যে মন্দিরে এই অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল, তা পরবর্তীতে "সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি" (হুগলি) নামে সুবিখ্যাত হয়। আজও হুগলী, নদীয়া ও বারাসাতের একাধিক 'ডাকাতকালী' মন্দিরে রঘু ডাকাতের নাম গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তির সাথে স্মরণ করা হয়।
রঘু ডাকাত: ব্যক্তি নাকি বহুবচনের 'ট্রেডমার্ক'? (ঐতিহাসিক ও লোকসংস্কৃতিমূলক বিশ্লেষণ)
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে রঘু ডাকাতকে নিয়ে দু ধরণের মতবাদ প্রচলিত রয়েছে:
একক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব: একদল ঐতিহাসিক মনে করেন, রঘুনাথ ঘোষ ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর একজন বাস্তব ও একক ব্যক্তিত্ব। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির 'থাগি অ্যান্ড ডাকোইটি ডিপার্টমেন্ট'-এর পুরনো নথি, আদালতের রেজিস্টার এবং তৎকালীন আঞ্চলিক জমিদারদের নথিপত্রে "রঘুনাথ ঘোষ" বা "রঘু ডাকাত"-এর স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি হুগলি, নদীয়া ও বর্ধমান জেলাজুড়ে সক্রিয় ছিলেন।
প্রতীকী 'ট্রেডমার্ক' বা বহুবচনের ধারণা: অন্য আরেকদল সমাজবিজ্ঞানী ও লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, "রঘু ডাকাত" কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন না; বরং এটি উনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় এক বৈপ্লবিক 'ট্রেডমার্ক' (Trademark) বা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছিল।
তৎকালীন সময়ে যখনই কোনো সংঘবদ্ধ লাঠিয়াল দল অত্যাচারী নীলকর বা অসৎ জমিদারের সম্পত্তি লুট করে গরীবদের মাঝে চাল-ডাল ও টাকা বিলাই দিত, তখনই সাধারণ মানুষ বা ভুক্তভোগী জমিদাররা সেই ঘটনাকে "রঘু ডাকাতের কাজ" বলে ধরে নিত। অনেক বিদ্রোহী যুবক ও বিদ্রোহী কৃষকর দল ইংরেজদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য নিজেরাও "রঘু ডাকাত"-এর নাম ব্যবহার করে আগাম চিঠি পাঠাত। ফলে রঘু ডাকাত হয়ে উঠেছিলেন শোষণবিরোধী আন্দোলন ও কৃষকদের সামাজিক প্রতিরোধের এক যৌথ প্রতীক (Collective Symbol)।
রঘু ডাকাত সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপঞ্জি (এক নজরে)
পাঠকের সুবিধার জন্য রঘু ডাকাতের জীবন, ইতিহাস ও লোকগাথার মূল বিষয়গুলো নিচে একটি সংক্ষেপিত ছকে তুলে ধরা হলো:
বিষয়/ক্ষেত্র | ঐতিহাসিক ও লোকগাথামূলক তথ্য |
প্রকৃত নাম | রঘুনাথ ঘোষ (জনপ্রিয় নাম: রঘু ডাকাত) |
সময়কাল | উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (আনুমানিক ১৮০০ – ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ) |
আদি বাসস্থান ও ঘাঁটি | হুগলী জেলার সপ্তগ্রাম/দেবীপুরের ঘন জঙ্গল এবং ত্রিবেণী অঞ্চল |
প্রধান সহযোগী/ডানহাত | বিধু ভূষণ ঘোষ (আপন ভাই) |
বিদ্রোহের মূল কারণ | ইংরেজ নীলকরের হাতে বাবার নির্মম হত্যাকাণ্ড ও কৃষকদের ওপর নিপীড়ন |
প্রধান প্রতিপক্ষ | ব্রিটিশ নীলকর, অত্যাচারী নব্য জমিদার ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুলিশ |
বিশেষ ডাকাতি শৈলী | ডাকাতির পূর্বে জমিদারের কাছে লাল কালিতে "আগাম চিঠি" প্রেরণ |
ঐতিহাসিক ঘটনা | নৈহাটির জমিদার বিনোদ ঘোষালের বাগানবাড়ি লুণ্ঠন ও দারোগাকে রুই মাছ উপহার |
সামাজিক পরিচিতি | "বাংলার রবিনহুড" (ধনী ও শোষকদের লুট করে গরীবদের সাহায্যকারী) |
আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব | সাধক রামপ্রসাদ সেনের গান শুনে পরিবর্তন ও নরবলি প্রথা রদ |
ঐতিহাসিক স্মারক | হুগলির ঐতিহ্যবাহী 'সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি' ও বিভিন্ন অঞ্চলের 'ডাকাতকালী' মন্দির |
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, বাংলার সমাজ ও আধুনিক প্রেক্ষাপটে রঘু ডাকাতের প্রাসঙ্গিকতা
আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে রঘু ডাকাতের জীবন ও ইতিহাসকে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আইন বনাম ন্যায়বিচার (Law vs. Justice): আইনের দৃষ্টিতে রঘু ডাকাত একজন অপরাধী ছিলেন, কারণ তিনি রাজ্যীয় আইন ভেঙে ডাকাতি ও লুণ্ঠন করেছেন। কিন্তু তৎকালীন ব্রিটিশ আইন কি আদৌ ন্যায়সংগত ছিল? যে আইন সাধারণ কৃষকের বুক থেকে জমি কেড়ে নিত, যে আইন বাবাকে চাবুক মেরে হত্যা করার পর বিচার দিত না সেই আইনকে অমান্য করাই ছিল রঘুর মতো চরিত্রদের নৈতিক প্রতিবাদ। রঘু ডাকাত প্রমাণ করেছিলেন, কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় 'আইন' (Law) আর জনমানুষের 'ন্যায়বিচার' (Justice) এক হয় না।
সাহিত্য ও শিল্পে রঘু ডাকাত: বাংলার লোকসংস্কৃতি, যাত্রা, নাটক, উপন্যাস এবং আধুনিক চলচ্চিত্রে রঘু ডাকাত বারবার ফিরে এসেছেন এক ট্র্যাজিক হিরো বা লোকনায়ক হিসেবে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'দেবী চৌধুরাণী' কিংবা অন্যান্য ডাকাত চরিত্রে যে মানবিকতা ও নীতিবোধের উন্মেষ দেখা যায়, তার পেছনে রঘু ডাকাতের মতো বাস্তব চরিত্রদের অবদান অনস্বীকার্য।
আধুনিক সমাজের শিক্ষা: আজকের সমাজেও যখন নেতৃত্বের অভাব, নব্য-ধনীকশ্রেণীর শোষণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দুর্নীতির প্রসার ঘটে তখন সাধারণ মানুষ মনে মনে রঘু ডাকাতের মতো কোনো বীরের সন্ধান করে, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে এবং শোষকের হাত থেকে সম্পদ কেড়ে নিয়ে শোষিতের মুখে হাসি ফোটাবে।
উপসংহার
রঘু ডাকাত বা রঘুনাথ ঘোষ কেবল লোককথার কোনো কাল্পনিক গল্প বা ভীতিপ্রদ ডাকাতের নাম নয়; তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার নিপীড়িত জনমানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও প্রতিরোধের এক ঐতিহাসিক স্ফুলিঙ্গ।
শৈশবে দেখা সেই ইংল্যান্ডের রবিনহুডের রূপকথা যেমন শেরউড জঙ্গলের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে, তেমনই বাংলার সুজলা-সুফলা মাটির ইতিহাসে, নদীয়া-হুগলির সবুজ বনে এবং মেঠো পথের লোকগাথায় রঘু ডাকাত অমর হয়ে থাকবেন "বাংলার রবিনহুড" হিসেবে। তিনি শিখিয়ে গেছেন অন্যায় ও অত্যাচারের দাপট যতই প্রবল হোক না কেন, শোষিতের পক্ষ নিয়ে সাহসিকতার সাথে রুখে দাঁড়ালে অত্যাচারীর প্রাসাদও একদিন কেঁপে উঠতে বাধ্য!
তথ্যসূত্র: বাংলার ডাকাত - যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত।
An article about Raghu dacoit and history of colonial india | Robbar





















