বিল গেটসের পছন্দের ১০টি বই আপনিও পড়তে পারেন

Jul 19, 2025

বিল গেটস মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, সমাজসেবক এবং একজন অসাধারণ পাঠক। তিনি তার জ্ঞান ও দূরদৃষ্টির জন্য বিখ্যাত। তিনি শুধু একজন সফল উদ্যোক্তাই নন, একজন পড়ুয়া ব্যক্তিত্বও। তাঁর ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি বই পড়ার অভ্যাস তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। গেটসের পঠন তালিকায় রয়েছে বিজ্ঞান, ইতিহাস, স্মৃতিকথা থেকে শুরু করে উপন্যাস পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বই। তাঁর ব্লগ Gates Notes এবং সাক্ষাৎকারে তিনি প্রায়ই তাঁর প্রিয় বইগুলোর কথা উল্লেখ করেন। এই নিবন্ধে আমরা বিল গেটসের পছন্দের ১০টি বই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

বিল গেটসের পছন্দের ১০টি বই

বিল গেটসের পছন্দের ১০টি বই যেগুলো তিনি নিজে পড়েছেন এবং অন্যদের পড়ার জন্য সুপারিশ করেছেন।

১. দ্য বেটার অ্যাঞ্জেলস অব আওয়ার নেচার (The Better Angels of Our Nature)

লেখক: স্টিভেন পিঙ্কার
প্রকাশকাল: ২০১১
ধরন: নন-ফিকশন, সমাজবিজ্ঞান

স্টিভেন পিঙ্কারের এই বইটি মানব সমাজে সহিংসতার ইতিহাস নিয়ে লেখা। বিল গেটস এই বইটিকে তাঁর সর্বকালের প্রিয় বইগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন। পিঙ্কার দেখিয়েছেন যে, সময়ের সাথে সাথে মানুষ কীভাবে কম সহিংস এবং আরও মানবিক হয়ে উঠেছে। ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে, আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ, হত্যা এবং অন্যান্য সহিংস ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গেটস বলেন, “এই বই আমাকে আশাবাদী করেছে। এটি প্রমাণ করে যে মানুষের অগ্রগতি সম্ভব।” বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বইটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক অস্থিরতা এবং দ্বন্দ্বের মধ্যেও মানবিকতার উন্নতির সম্ভাবনা দেখায়। এই বইটি বাংলাদেশের তরুণদের জন্য সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণাদায়ক।

২. অরিজিন স্টোরি (Origin Story: A Big History of Everything)

লেখক: ডেভিড ক্রিশ্চিয়ান
প্রকাশকাল: ২০১৮
ধরন: নন-ফিকশন, বিজ্ঞান ও ইতিহাস

এই বইটি পৃথিবীর ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের ইতিহাসকে একটি সুতোয় গেঁথেছে। লেখক বিগ ব্যাং থেকে শুরু করে আধুনিক সভ্যতা পর্যন্ত বিজ্ঞান, ইতিহাস এবং দর্শনের সমন্বয়ে একটি চিত্তাকর্ষক বর্ণনা তৈরি করেছেন। বিল গেটস এই বইটির প্রশংসা করে বলেছেন, “এটি এমন একটি বই যা জটিল বিষয়গুলোকে সহজ এবং মজারভাবে ব্যাখ্যা করে।” বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এই বইটি বিজ্ঞান ও ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ জাগাতে পারে। এই ধরনের বই বাংলাদেশের তরুণদের বিশ্বের বিস্তৃত ইতিহাস বোঝার জন্য উৎসাহিত করতে পারে।

৩. অ্যান আমেরিকান ম্যারেজ (An American Marriage)

লেখক: তায়ারি জোনস
প্রকাশকাল: ২০১৮
ধরন: উপন্যাস

তায়ারি জোনসের এই উপন্যাসটি একটি আফ্রিকান-আমেরিকান দম্পতির জীবনের কঠিন বাস্তবতার গল্প। বইটি সম্পর্ক, ন্যায়বিচার এবং সমাজে বৈষম্যের বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। গেটস বলেন, “জোনসের লেখা এতটাই শক্তিশালী যে পাঠকরা চরিত্রগুলোর কষ্ট অনুভব করতে পারেন।” এই বইটি সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ায়। বাংলাদেশে, যেখানে সামাজিক বৈষম্য এবং সম্পর্কের জটিলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই বই পাঠকদের মধ্যে সহানুভূতি ও বোঝাপড়া বাড়াতে পারে।

৪. দ্য সিমপ্যাথাইজার (The Sympathizer)

লেখক: ভিয়েত থান গুয়েন
প্রকাশকাল: ২০১৫
ধরন: উপন্যাস

২০১৬ সালে পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী এই উপন্যাসটি ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা। এটি একজন ভিয়েতনামী গুপ্তচরের গল্প, যিনি আমেরিকায় গিয়ে তাঁর পরিচয় এবং আনুগত্য নিয়ে সংকটে পড়েন। গেটস বলেন, “এই বইটি ভিয়েতনামের দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধের গল্প বলে, যা আমাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে।” বইটি পাঠকদের ইতিহাসের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এই বইটি ঔপনিবেশিক এবং যুদ্ধোত্তর সময়ের প্রভাব বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

৫. দিজ ট্রুথস (These Truths: A History of the United States)

লেখক: জিল লেপোর
প্রকাশকাল: ২০১৮
ধরন: নন-ফিকশন, ইতিহাস

এই বইটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের একটি সৎ এবং বিস্তারিত বর্ণনা। গেটস বলেন, “এটি আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর বইগুলোর একটি।” লেপোর আমেরিকার জটিল ইতিহাসকে সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশে, যেখানে ইতিহাস শিক্ষা প্রায়ই স্থানীয় প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ, এই বইটি বিশ্ব ইতিহাস বোঝার জন্য একটি দরজা খুলে দেয়। এই বইটি তরুণদের জন্য গ্লোবাল ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ জাগাতে পারে।

৬. এডুকেটেড (Educated)

লেখক: তারা ওয়েস্টভার
প্রকাশকাল: ২০১৮
ধরন: স্মৃতিকথা

এই বইটি লেখকের নিজের জীবনের গল্প, যিনি একটি কট্টরপন্থী পরিবারে বেড়ে উঠে নিজের প্রচেষ্টায় শিক্ষা অর্জন করেছেন। গেটস বলেন, “ওয়েস্টভারের গল্প আমাকে শিক্ষার শক্তি সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।” এই বইটি শিক্ষার মাধ্যমে জীবন পরিবর্তনের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বাংলাদেশে, যেখানে শিক্ষার অ্যাক্সেস অনেকের জন্য চ্যালেঞ্জিং, এই বইটি তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক হতে পারে।

৭. দ্য হেডস্পেস গাইড টু মেডিটেশন অ্যান্ড মাইন্ডফুলনেস (The Headspace Guide to Meditation and Mindfulness)

লেখক: অ্যান্ডি পুডিকম্ব
প্রকাশকাল: ২০১১
ধরন: নন-ফিকশন, মনোবিজ্ঞান

অ্যান্ডি পুডিকম্ব, একজন প্রাক্তন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, এই বইয়ে ধ্যান ও মননশীলতার সহজ কৌশল ব্যাখ্যা করেছেন। গেটস বলেন, “এই বই আমাকে ধ্যানের প্রতি আগ্রহী করেছে।” এই বইটি মানসিক চাপ কমাতে এবং মনের স্বাস্থ্য উন্নত করতে সহায়ক। বাংলাদেশে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এখনও কম, এই বইটি পাঠকদের মানসিক শান্তি অর্জনে সাহায্য করতে পারে। তরুণরা এই বই থেকে মননশীলতার গুরুত্ব শিখতে পারে।

৮. বর্ন আ ক্রাইম (Born a Crime)

লেখক: ট্রেভর নোয়া
প্রকাশকাল: ২০১৬
ধরন: স্মৃতিকথা

ট্রেভর নোয়া, ‘দ্য ডেইলি শো’-এর হোস্ট, এই বইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের সময়ে তাঁর বেড়ে ওঠার গল্প লিখেছেন। তাঁর মা কৃষ্ণাঙ্গ এবং বাবা শ্বেতাঙ্গ হওয়ায় তিনি জন্মের সময় থেকেই বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। গেটস বলেন, “এই বই হাস্যরস এবং দুঃখের এক অনন্য মিশ্রণ।” বইটি বর্ণবাদ এবং সামাজিক বৈষম্যের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ায়। বাংলাদেশে যেখানে সামাজিক বৈষম্য এখনও একটি সমস্যা, এই বইটি পাঠকদের জন্য শিক্ষণীয়।

৯. দ্য রোজি রেজাল্ট (The Rosie Result)

লেখক: গ্রায়েম সিমসিয়ন
প্রকাশকাল: ২০১৯
ধরন: উপন্যাস

এটি ‘দ্য রোজি প্রজেক্ট’ সিরিজের তৃতীয় বই। গেটস এই সিরিজের ভক্ত এবং প্রথম বইটি তাঁর ৫০ জন বন্ধুকে উপহার দিয়েছিলেন। বইটি একটি হাস্যরসাত্মক গল্প, যা সম্পর্ক এবং পারিবারিক জীবন নিয়ে আলোচনা করে। গেটস বলেন, “এই বই পড়ে হাসবেন, আবার সম্পর্ক নিয়ে ভাববেন।” এই বইটি মানুষের সম্পর্কের জটিলতা বোঝার জন্য আদর্শ। বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এই বইটি হালকা কিন্তু গভীর বার্তা দেয়।

১০. আ ফুল লাইফ (A Full Life)

লেখক: জিমি কার্টার
প্রকাশকাল: ২০১৫
ধরন: স্মৃতিকথা

যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯তম প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের এই আত্মজীবনীতে তাঁর জীবনের গল্প উঠে এসেছে। গেটস বলেন, “কার্টারের গল্প অবিশ্বাস্য। তিনি একটি গ্রাম থেকে হোয়াইট হাউসে পৌঁছেছেন।” এই বইটি নেতৃত্ব এবং সংগ্রামের একটি উৎসাহব্যঞ্জক গল্প। বাংলাদেশে যেখানে অনেক তরুণ নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখে, এই বইটি তাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বইগুলোর গুরুত্ব

বাংলাদেশে শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ক্রমবর্ধমান জোর দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের মধ্যে পড়ার অভ্যাস বাড়ানোর জন্য বিল গেটসের মতো ব্যক্তিত্বের পছন্দের বইগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ‘অরিজিন স্টোরি’ এবং ‘এডুকেটেড’ শিক্ষার মূল্য এবং বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়। ‘দ্য হেডস্পেস গাইড’ বইটি মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। ‘দ্য সিমপ্যাথাইজার’ এবং ‘বর্ন আ ক্রাইম’ বৈষম্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়ে শিক্ষা দেয়। ‘আ ফুল লাইফ’ এবং ‘দ্য বেটার অ্যাঞ্জেলস’ তরুণদের স্বপ্ন পূরণে উৎসাহিত করে।

কীভাবে এই বইগুলো পড়বেন?

বাংলাদেশে বিল গেটসের পছন্দের বইগুলো পাওয়া যায় ঢাকার নীলক্ষেত, বইমেলা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেমন রকমারি বা বইবাজারে। ইংরেজি বইয়ের চাহিদা বাংলাদেশে ক্রমশ বাড়ছে। এছাড়াও কিন্ডল বা অডিওবুকের মাধ্যমেও এই বইগুলো পড়া যায়।

উপসংহার

বিল গেটসের পছন্দের এই ১০টি বই জ্ঞান, অনুপ্রেরণা এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গির একটি ভাণ্ডার। এই বইগুলো বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে। বাংলাদেশের তরুণ পাঠকদের জন্য এই বইগুলো শুধু জ্ঞানের উৎসই নয়, বরং তাদের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করার একটি সুযোগ। বিল গেটসের মতো একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের পঠন তালিকা অনুসরণ করে আমরাও আমাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে পারি এবং একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে পারি।

Related Posts

More Article by Moynamoti

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.