বোকো হারাম - আফ্রিকার নিষ্ঠুরতম সন্ত্রাসী সংগঠনের উত্থান ও ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস

একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে সন্ত্রাসবাদ কেবল মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি আফ্রিকার সাহেল (Sahel) এবং লেক চাদ অববাহিকায় এমন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যা বিশ্বনিরাপত্তার জন্য এক বিরাট হুমকি। এই অঞ্চলের অন্যতম সম্পদশালী অথচ তীব্র বৈষম্যপীড়িত রাষ্ট্র নাইজেরিয়া। তেলসম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতি, সামাজিক অস্থিরতা ও চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে দেশটি উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলে দ্বিখণ্ডিত এক মানসিক ও সামাজিক অবয়বে দাঁড়িয়ে আছে। এই ভঙ্গুর পরিবেশের সুযোগ নিয়েই ২১ শতকের প্রথমার্ধে আত্মপ্রকাশ ঘটে আফ্রিকার ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর ও বর্বর সন্ত্রাসী সংগঠন ‘বোকো হারাম’ (Boko Haram)-এর।

বিগত দুই দশকে পশ্চিম আফ্রিকার এই সংগঠনটি কেবল একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহী গ্রুপ হিসেবে অবস্থান তৈরি করেনি, বরং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসে নির্মমতার এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। বোকো হারামের সুনির্দিষ্ট সশস্ত্র হামলা, আত্মঘাতী বোমা হামলা, গণ-অপহরণ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে টানা সংঘর্ষে প্রায় ১ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন—যাদের সিংহভাগই নিরীহ নারী ও শিশু। আধুনিক শিক্ষার ওপর কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও উগ্রবাদী মনোভাব চাপিয়ে দিয়ে এই গোষ্ঠীটি অন্তত ১,৪০০-এর বেশি স্কুল জ্বালিয়ে ছারখার করে দিয়েছে, হত্যা করেছে ২,২৯৫ জনেরও বেশি শিক্ষককে। তাদের ধ্বংসাত্মক উন্মাদনার ফলে কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, তৈরি হয়েছে অজস্র এতিম শিশু ও বিধবা নারী। নাইজেরিয়ার জাতীয় অর্থনীতিতে এই সংগঠনের সরাসরি ও পরোক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

প্রশ্ন ওঠে, একটি চরমপন্থী গোষ্ঠী কীভাবে পুরো একটি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো পরাক্রমশালী হয়ে উঠল? কেন সাধারণ মানুষ বা তরুণ সমাজ এমন একটি বর্বর সংগঠনের পতাকাতলে গিয়ে দাঁড়াল? এই নিবন্ধে বোকো হারামের সূচনা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, আদর্শিক ভিত্তি, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপান্তরের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।

বোকো হারামের প্রতিষ্ঠা, নামকরণ ও আদর্শিক শিকড়

যদিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বোকো হারামের পরিচিতি ২০০৯ সালের পর বিস্তার লাভ করে, তবে এর সামাজিক ও আদর্শিক বীজ বপন করা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে। উত্তর নাইজেরিয়ার বোরনো রাজ্যের রাজধানী মাইদুগুরি (Maiduguri) শহরকে কেন্দ্র করে কিছু উগ্রধর্মীয় যুবক সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছোট ছোট জোট গড়ে তুলতে শুরু করে।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২০০২ সালে সালাফি ধর্মগুরু মোহাম্মদ ইউসুফ-এর হাত ধরে এই সংগঠনটি একটি সুসংগঠিত কাঠামোর রূপ পায়। ইউসুফ ব্যক্তিগতভাবে সৌদির সালাফি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ও প্রখ্যাত ধর্মবেত্তাদের অধীনে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি নাইজেরিয়ার প্রখ্যাত সালাফি আলেম আবুবকর ঘুমির চিন্তাধারা দ্বারাও প্রভাবিত ছিলেন। বিশ্বব্যাপী গড়ে ওঠা 'সালাফি জিহাদিবাদ' বা 'ইসলামি মূলনীতিবাদ'-এর সাথে সংগতি রেখেই ইউসুফ নাইজেরিয়ায় তাঁর আন্দোলন পরিচালনা করেন।

সংগঠনের আনুষ্ঠানিক ও স্থানীয় নাম:

বোকো হারাম সদস্যরা নিজেদের একটি সুনির্দিষ্ট আরবি নামে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। তাদের আসল নাম ‘জামাতুল আহলিস সুন্না লিদদাওয়াতি ওয়াল সুন্নাহ’ (Jama'at Ahl as-Sunnah lid-Da'wah wa'l-Jihad), যার ভাবার্থ হলো ‘রাসুল (সা.)-এর শিক্ষা ও জিহাদের প্রতি প্রতিশ্রুত ব্যক্তিবর্গ’। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে যে ‘বোকো হারাম’ নামে এটি পরিচিত, তা স্থানীয় 'হুসা' (Hausa) ভাষা ও আরবি শব্দের মিশ্রণে তৈরি। হুসা ভাষায় ‘বোকো’ মানে অপবিত্র বা পশ্চিমা শিক্ষা, আর আরবি ‘হারাম’ মানে নিষিদ্ধ। অর্থাৎ, বোকো হারাম শব্দের সার্বিক অর্থ দাঁড়িয়েছে ‘পশ্চিমা শিক্ষা নিষিদ্ধ’

সালাফি চরমপন্থা ও মৌলিক মূল্যবোধ

সালাফি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামকে তার আদি ও মৌলিক রূপে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। বোকো হারাম দাবি করে, রাসুল (সা.) এবং তাঁর সাহাবিদের জীবনপদ্ধতিই একমাত্র অনুসরণীয়। তবে বিশ্বব্যাপী সুন্নি বা সালাফি ধারণার বিপরীতে বোকো হারাম এক চরমপন্থী ও বিকৃত ব্যাখ্যার রূপ দেয়। তারা দাবি করতে শুরু করে:

  • আধুনিক প্রযুক্তি (যদি তা ইসলামি বিধানের বাইরে ব্যবহৃত হয়), পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি 'হারাম' বা কুফরি।

  • নাইজেরিয়া সরকার একটি অবৈধ, দুর্নীতিগ্রস্ত ও ক্বাফের রাষ্ট্রকাঠামো, যার বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেওয়া এবং বিদ্রোহ করা প্রত্যেক অনুসারীর জন্য বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।

  • শরিয়াহ আইনের অত্যন্ত কঠোর ও চরমপন্থী ব্যাখ্যা সমগ্র নাইজেরিয়ায় প্রয়োগ করতে হবে এবং অন্য যেকোনো ইসলামি মতবাদ বা চিন্তাধারাকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করতে হবে।

মোহাম্মদ ইউসুফ খুব চতুরতার সাথে নাইজেরিয়ার দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতি, নিরাপত্তা বাহিনীর অপশাসন এবং সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যকে কাজে লাগান। তিনি নাইজেরীয় রাষ্ট্রকে ইসলামের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং তরুণদের বোঝাতে সক্ষম হন যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য করছে।

অহিংস দাওয়াত থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘাত: ২০০৯ সালের মোড়ঘোরা ঘটনা

২০০২–২০০৯: কৌশলগত নীরবতার যুগ

প্রতিষ্ঠার পর প্রথম কয়েক বছর বোকো হারাম সরাসরি কোনো বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাত বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হামলায় লিপ্ত হয়নি। তারা মাইদুগুরিতে একটি মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে, যাকে তারা বিকল্প সমাজ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। সেখানে তারা দরিদ্র পরিবারগুলোকে অন্ন সংস্থান, শিক্ষা এবং ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের ভিত্তি মজবুত করে।

এই সাত বছরে বোকো হারাম মূলধারার সমাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে এক ধরনের ‘অনুকরণীয় ছোট রাষ্ট্র’ চালনার চেষ্টা করছিল। তবে ২০০৩ সালে সীমান্ত পুলিশের সাথে আনুমানিক দুইশত বোকো হারাম সদস্যের একটি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হয়, যা সেসময় স্থানীয় সমস্যা হিসেবেই দেখা হয়েছিল।

২০০৯ সালের দমন-পীড়ন ও মোহাম্মদ ইউসুফের মৃত্যু

২০০৯ সাল ছিল বোকো হারাম এবং নাইজেরিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও মোড়ঘোরা মুহূর্ত। জুলাই ২০০৯-এ, বোকো হারামের মোটরসাইকেল আরোহী সদস্যদের হেলমেট পরিধান সংক্রান্ত একটি সামান্য ট্রাফিক আইন অমান্যকে কেন্দ্র করে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাধে। নাইজেরিয়া সরকার বোকো হারামকে পুরোপুরি নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সামরিক বাহিনীকে অভিযানের নির্দেশ দেয়।

নাইজেরীয় নিরাপত্তা বাহিনী মাইদুগুরিতে বোকো হারামের প্রধান ঘাঁটিতে ব্যাপক বিমান ও স্থল হামলা চালায়। এই নির্বিচার সামরিক অভিযানে অন্তত ৮০০ বোকো হারাম সদস্য নিহত হন, আহত হন শত শত মানুষ। সংগঠনের প্রধান কেন্দ্র এবং মসজিদটি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়। সবচেয়ে স্পর্শকাতর ঘটনাটি ঘটে যখন প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ইউসুফকে জীবিত গ্রেপ্তার করার পর পুলিশি হেফাজতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

আবুবকর শেকাওয়ের আগমন ও নৃসংতার নতুন যুগ

সরকার ভেবেছিল মোহাম্মদ ইউসুফকে হত্যার মাধ্যমে বোকো হারামের চ্যাপ্টার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ইউসুফের মৃত্যুর পর তাঁর প্রধান সহযোগী ও উপ-অধিনায়ক আবুবকর শেকাও (Abubakar Shekau) সংগঠনের হাল ধরেন।

শেকাও ছিলেন অত্যন্ত উগ্র, মানসিক অস্থিরতাসম্পন্ন এবং নির্দয় মানসিকতার সামরিক অধিনায়ক। তিনি বোকো হারামকে একটি রাজনৈতিক-ধর্মীয় সংস্কারবাদী গ্রুপ থেকে রূপান্তর করে বিশ্বইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত করেন। শেকাওয়ের অধীনে বোকো হারাম ঘোষণা করে যে, ইউসুফ ও তাঁদের শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে নাইজেরিয়া রাষ্ট্র, পুলিশ, সেনাবাহিনী, খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং তাঁদের মতাদর্শে বিশ্বাসী নয় এমন যেকোনো সুন্নি মুসলিমকেও হত্যা করা বৈধ।

বোকো হারামের ভয়াবহতা ও মানবীয় বিপর্যয়

বোকো হারামের বর্বরতার মাত্রা অনুধাবন করতে হলে তাদের গত দুই দশকের কর্মকাণ্ড ও তা থেকে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের দিকে চোখ মেলানো প্রয়োজন। তাদের কৌশল ছিল সাধারণ মানুষকে চরম ভীতির মধ্যে রাখা, যেন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারিয়ে মানুষ হয় বোকো হারামের আনুগত্য স্বীকার করে অথবা ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আক্রমণ ও শিক্ষকদের ওপর গণহত্যা

সংগঠনটির আদর্শের মূল কথাই ছিল ‘পশ্চিমা শিক্ষা নিষিদ্ধ’। ফলে তাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে দেশটির প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো।

বিদ্যালয় ধ্বংস: বোকো হারাম নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ১,৪০০টিরও বেশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল আগুনে পুড়িয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।

শিক্ষকদের গণহত্যা: কেবল আধুনিক শিক্ষার সাথে যুক্ত থাকার অপরাধে বোকো হারামের সন্ত্রাসীরা ২,২৯৫ জনেরও বেশি শিক্ষককে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

শিক্ষার্থী অপহরণ (চিবক বালিকা ট্র্যাজেডি): ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে বোরনো রাজ্যের চিবক (Chibok) শহরের একটি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২৭৬ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রীকে এক রাতে গানপয়েন্টে অপহরণ করে বোকো হারাম। এই ঘটনা পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেয়। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী #BringBackOurGirls আন্দোলন গড়ে উঠলেও, অনেক মেয়েকেই শেকাওয়ের বাহিনীর সদস্যরা জোরপূর্বক বিয়ে করতে এবং ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করে।

আত্মঘাতী হামলা ও নারী-শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার

বোকো হারামের নৃশংসতার সবচেয়ে ঘৃণ্য দিক ছিল শিশুদের বিশেষ করে ছোট ছোট মেয়েদের শরীরে বিস্ফোরক বেঁধে দিয়ে আত্মঘাতী বোমা হামলা করানো। বোকো হারামই পৃথিবীর প্রথম সন্ত্রাসী সংগঠন, যারা এত ব্যাপক পরিসরে শিশু ও অপহৃত নারীদের আত্মঘাতী বোমারু হিসেবে সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় পাঠিয়েছে।

অর্থনীতি ও পরিকাঠামো ধ্বংস

বোকো হারামের সংঘাতের কারণে নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, চাদ ও নাইজারের অর্থনীতি তছনছ হয়ে গেছে। সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে কৃষি, গবাদিপশু পালন এবং মাছ চাষের মতো গ্রামীণ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিগুলো স্তব্ধ হয়ে গেছে।

প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কেবল নাইজেরিয়া সরকারের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। হাজার হাজার একর আবাদি জমি বোকো হারামের পুঁতে রাখা মাইন ও হামলার ভয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, যা পুরো অঞ্চলে তীব্র দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করেছে।

কেন ঘটল বোকো হারামের উত্থান? আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের উত্থান কেবল অন্ধ ধর্মীয় উন্মাদনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বোকো হারামের শিকড় নাইজেরিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব দিয়ে এর বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

কলিয়ার ও হফলারের মডেল (Greed vs. Grievance)

প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল কলিয়ার ও অনিস হফলার (Collier-Hoeffler Model)-এর গবেষণা অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিপ্লব, অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত বা সন্ত্রাসবাদের জন্ম মূলত কেবল ক্ষোভ (Grievance) থেকে হয় না, বরং সংঘাত সৃষ্টির পেছনে লোভ বা অর্থনৈতিক সুবিধা (Greed/Opportunity Cost) বড় ভূমিকা পালন করে।

যেসব রাষ্ট্রে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক উপার্জনের পথ বন্ধ, বেকারত্ব বেশি এবং বেআইনি কাজের মাধ্যমে সহজে বিপুল অর্থ উপার্জনের পথ খোলা থাকে, সেখানে সন্ত্রাসী দলে যোগদানের ‘সুযোগ ব্যয়’ (Opportunity Cost) অত্যন্ত কম হয়। নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটেছে। উত্তর নাইজেরিয়ার তরুণদের সামনে কোনো কর্মসংস্থান ছিল না, অথচ অস্ত্র হাতে বোকো হারামে যোগ দিলে তারা অর্থের সাথে সাথে সামাজিক ক্ষমতার এক ভ্রান্ত অনুভূতি পেত।

প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও তেল সম্পদের অন্যায্য বণ্টন

নাইজেরিয়া তেলসম্পদে আফ্রিকার শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্র হলেও সেই সম্পদের সুফল কদাচিৎ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে। স্বাধীনতা লাভের পর তেলের রাজস্ব থেকে নাইজেরিয়া শত শত বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, কিন্তু সেই অর্থের ৯০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে খ্রিস্টানপ্রধান দক্ষিণ নাইজেরিয়ার পরিকাঠামো, শিল্প ও রাজনৈতিক এলিটদের পেছনে।

উত্তর বনাম দক্ষিণ নাইজেরিয়ার ফারাক: উত্তর নাইজেরিয়ায় বসবাসকারী ১১ কোটি মানুষের অর্ধেকেরও বেশি চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। অন্যদিকে দক্ষিণে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার হার ও জীবনযাত্রার মান বহুগুণ ভালো।

চরম আয়বৈষম্য: অক্সফামের রিপোর্ট অনুযায়ী, নাইজেরিয়ায় প্রতি ৫ জনের মধ্যে ৩ জন দৈনিক ১ ডলারেরও কম আয় করেন। একদিকে দেশটির শীর্ষ ৫ জন ধনীর নিকট মোট সম্পদের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন ডলার, অন্যদিকে সবচেয়ে দরিদ্র সাড়ে চার কোটি মানুষের সর্বমোট সম্পদের পরিমাণও সেই ৩০ বিলিয়ন ডলার। এই বৈষম্য সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব (Rational Choice Theory)

যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব (Rational Choice Theory) বলে, প্রতিটি মানুষ তার কাছে থাকা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নিজের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সুবিধা ও লাভ অর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়।

নাইজেরিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে একজন সাধারণ উত্তর নাইজেরীয় যুবক যদি সৎভাবে কাজ করে, তবে তার দৈনিক গড় আয় ১ ডলারের কাছাকাছি। এমনকি নাইজেরীয় সেনাবাহিনীর একজন সাধারণ সৈনিকের দৈনিক বেতন মাত্র ৩ ডলার। কিন্তু বিপরীতে বোকো হারামে যোগ দিলে একজন তরুণ প্রতিদিন অন্তত ৩০ ডলার আয় করার সুযোগ পেত!

একটি দারিদ্র্যপীড়িত, কর্মসংস্থানহীন সমাজে কোনো যুবকের কাছে নীতি-নৈতিকতার চেয়ে পরিবারের অন্ন সংস্থানের জন্য প্রতিদিন ৩০ ডলার পাওয়ার লোভ অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হিসেবে দেখা দেয়। ফলে অনেকেই স্রেফ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পেতে বোকো হারামের খাতায় নাম লিখিয়েছে।

নাইজেরিয়ার ব্যর্থ রাষ্ট্রকাঠামো ও উত্তর অঞ্চলের প্রান্তিকতা

বোকো হারামের উত্থানকে অনুধাবন করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাইজেরিয়াকে একটি ‘দুর্বল বা ব্যর্থ রাষ্ট্র’ (Weak/Failed State) হিসেবে বিবেচনা করা।

সরকারি সেবার অনুপস্থিতি

উত্তর নাইজেরিয়ার বোরনো, ইয়োবে, বাউচি এবং সোকোতো রাজ্যে সরকারের উপস্থিতিও কার্যত ছিল শূন্য। এই অঞ্চলগুলোতে শিশুদের শতকরা ১০ ভাগের কম বয়স অনুযায়ী টিকা পেত। শিক্ষার হার ছিল ২০ শতাংশেরও নিচে। পানীয় জল, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল বা সড়কের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো সেখানে অধরা ছিল।

যখন রাষ্ট্র কোনো অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেখানে অ-রাষ্ট্রীয় পরাশক্তি বা চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো (Non-state actors) সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। বোকো হারাম শুরুতে ঠিক এই শূন্যস্থানটিই পূরণ করেছিল। তারা বিকল্প আদালত গঠন, নিরাপত্তা প্রদান এবং খাদ্য বিতরণ করে জনগণের মন জয়ের চেষ্টা করে।

প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন ও ‘স্কেপগোট’ (Scapegoating)

যখন সাধারণ নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি বা গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ করতে পারেননি, তখন রাষ্ট্র তাঁদের দমানোর জন্য চরম সহিংস পথ বেছে নিয়েছে। নাইজেরীয় সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী উত্তর অঞ্চলের সাধারণ মুসলিমদের বোকো হারাম সন্দেহ করে পাইকারি হারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা করেছে।

রাষ্ট্রের এই নির্বিচার দমন-পীড়ন সাধারণ মানুষকে আরও বেশি বোকো হারামের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের জীবন ও পরিবারকে পুলিশি অত্যাচার থেকে বাঁচাতে তরুণরা বাধ্য হয়ে বোকো হারামের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছে।

বোকো হারামের অর্থায়ন ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক

বোকো হারাম কেবল লাঠি-সোটা বা সাধারণ অস্ত্র দিয়ে নাইজেরিয়া সেনাবাহিনীকে টেক্কা দেয়নি; তাদের কাছে ছিল আধুনিক রকেট চালিত গ্রেনেড (RPG), সাঁজোয়া যান, এবং ভারী মেশিনগান। এই বিপুল সামরিক ক্ষমতা অর্জনের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল বিশাল অঙ্কের অর্থ ও আন্তর্জাতিক লজিস্টিক সাপোর্ট।

স্বনির্ভর অর্থায়ন কৌশল

মুক্তিপণের জন্য অপহরণ (Kidnapping for Ransom): বোকো হারামের অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল বিদেশি নাগরিক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অপহরণ করা। কেবল নাইজেরিয়া ও ক্যামেরুন সরকারের কাছ থেকে তারা মুক্তিপণ হিসেবে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আদায় করেছে।

জোরপূর্বক ট্যাক্স বা খাজনা আদায়: লেক চাদ অববাহিকায় যেসব অঞ্চল বোকো হারামের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখানে তারা স্থানীয় কৃষক, গবাদিপশু ব্যবসায়ী এবং জেলেদের ওপর চড়া হারে কর আরোপ করত। কর না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো।

ডাকাতি ও অবৈধ ব্যবসা: তারা নিয়মিত উত্তর নাইজেরিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকে সশস্ত্র ডাকাতি চালিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে তেলের অবৈধ চোরাচালান চালিয়েছে।

বৈশ্বিক সংযোগ: আল-কায়েদা থেকে আইএসআইএস (ISWAP)

শুরুতে বোকো হারাম একটি আঞ্চলিক সংগঠন থাকলেও দ্রুতই তা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়।

আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরেব (AQIM): ২০১০ সাল থেকে বোকো হারাম উত্তর আফ্রিকার আল-কায়েদা ফ্রন্টের থেকে অর্থনৈতিক অনুদান ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ পেতে শুরু করে।

আইএসআইএস-এর আনুগত্য (ISWAP-এর জন্ম): ২০১৫ সালে আবুবকর শেকাও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন 'আইএসআইএস' (ISIS)-এর প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এরপর বোকো হারামের একটি বড় অংশ ভেঙে গিয়ে গঠিত হয় ‘ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স’ (ISWAP)। এই ঘটনা সংগঠনটিকে আরও বেশি পেশাদার ও সুসংগঠিত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে তোলে।

এক নজরে বোকো হারাম

নিচে প্রদত্ত একমাত্র সারণীতে বোকো হারামের সূচনা, আদর্শ, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং মানবিক ক্ষয়ক্ষতির প্রধান তথ্যসমূহ সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

মূল বিষয়াবলি

বিস্তারিত বিবরণ ও তথ্যসমূহ

প্রতিষ্ঠার বছর ও প্রতিষ্ঠাতা

২০০২ খ্রিস্টাব্দ; সালাফি ধর্মগুরু মোহাম্মদ ইউসুফ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত (অপ্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম ১৯৯০ থেকে)।

মূল আরবি নাম

‘জামাতুল আহলিস সুন্না লিদদাওয়াতি ওয়াল সুন্নাহ’ (রাসুল সা.-এর শিক্ষা ও জিহাদের প্রতি প্রতিশ্রুত ব্যক্তিবর্গ)।

‘বোকো হারাম’ শব্দের অর্থ

হুসা ও আরবি শব্দের মিশ্রণে তৈরি; অর্থ- ‘পশ্চিমা শিক্ষা নিষিদ্ধ’

প্রধান আদর্শ ও লক্ষ্য

চরমপন্থী সালাফি জিহাদিবাদ; আধুনিক শিক্ষা ও গণতন্ত্রের বিলোপ এবং শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা।

নেতৃত্বের পরিবর্তন

মোহাম্মদ ইউসুফ (২০০২–২০০৯); আবুবকর শেকাও (২০০৯–২০২১); পরবর্তীতে ISWAP কোয়ালিশন।

মানবীয় ক্ষয়ক্ষতি

প্রায় ১,০০,০০০ মানুষের মৃত্যু; ২,২৯৫+ শিক্ষকের গণহত্যা; হাজার হাজার নারী ও শিশু অপহরণ।

শিক্ষায় আঘাত

১,৪০০-এর বেশি স্কুল আগুনে ধ্বংসকরণ; চিবক শহর থেকে ২৭৬ জন ছাত্রী অপহরণ।

অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি

নাইজেরিয়ার অর্থনীতিতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি

অর্থায়নের প্রধান উৎস

মুক্তিপণের জন্য অপহরণ ($১০M+), স্থানীয় ব্যবসায়ীদের থেকে কর আদায়, ব্যাংক ডাকাতি ও আইএসআইএস/আল-কায়েদার অনুদান।

নিয়োগের অর্থনৈতিক কারণ

সাধারণ শ্রমিকের দৈনিক আয় $১ এবং সেনার $৩; বিপরীতে বোকো হারামের দেওয়া দৈনিক $৩০ বেতনের প্রলোভন

বোকো হারামের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ৩টি প্রধান উপদল

বোকো হারাম কোনো একক বা একমুখী সংগঠন হিসেবে এতদিন টিকে থাকেনি। কৌশল ও আদর্শগত মতভেদের কারণে এটি প্রধানত তিনটি আলাদা ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে:

জেএএস (JAS - Jamā'at Ahl as-Sunnah lid-Da'wah wa'l-Jihād)

নেতা: আবুবকর শেকাও (মে ২০২১-এ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত)।

কৌশল: এটি ছিল বোকো হারামের সবচেয়ে চরমপন্থী ও অবাধ্য গোষ্ঠী। শেকাওয়ের নীতি ছিল যেকোনো ব্যক্তি বা মুসলিম যদি তাঁদের সরাসরি সমর্থন না করে, তবে সে ‘কাফের’ এবং তাকে হত্যা করা বৈধ। এরা বাজারে বোমা হামলা, গণ-অপহরণ এবং নারীদের আত্মঘাতী বোমারু হিসেবে ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত ছিল।

আইএসডব্লিউএপি (ISWAP - Islamic State West Africa Province)

নেতা: আবু মুসাব আল-বারনাভি (প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ইউসুফের পুত্র)।

কৌশল: ২০১৬ সালে শেকাওয়ের চরমপন্থী আচরণের (সাধারণ মুসলিমদের ওপর নির্বিচার হত্যা) বিরোধিতা করে মধ্যপ্রাচ্যের আইএসআইএস আল-বারনাভিকে পশ্চিম আফ্রিকায় তাদের অফিসিয়াল প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করে। ISWAP সাধারণ নাগরিকদের ওপর সরাসরি হামলা না চালিয়ে নাইজেরীয় সামরিক ঘাঁটি, পুলিশ চেকপোস্ট এবং সরকারি অবকাঠামোকে টার্গেট করার কৌশল গ্রহণ করে। বর্তমানে এটি এই অঞ্চলের সবচেয়ে সুসংগঠিত সামরিক শক্তি।

আনসারু (Ansaru)

প্রতিষ্ঠা: ২০১২ খ্রিস্টাব্দ।

কৌশল: 'আনসারু' (পুরো নাম: জামাতু আনসারিল মুসলিমিনা ফি বিলাদিস সুদান) মূলত আল-কায়েদার অনুসারী একটি গোষ্ঠী। তারা শেকাওয়ের বেসামরিক মুসলিম হত্যার বিরোধিতা করে আল-কায়েদার মতো সরাসরি পশ্চিমা নাগরিক, বিদেশি প্রকৌশলী এবং হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের অপহরণ ও আক্রমণের কৌশল বেছে নেয়।

বোকো হারামের ইতিহাসের ৩টি মোড়ঘোরা রক্তক্ষয়ী ঘটনা

২০১১: আবুজায় জাতিসংঘ ভবনে গাড়ি বোমা হামলা

২০১১ সালের আগস্টে নাইজেরিয়ার রাজধানী আবুজায় জাতিসংঘ সদর দফতরে একটি শক্তিশালী আত্মঘাতী গাড়ি বোমা হামলা চালায় বোকো হারাম। এতে ২৩ জন কর্মকর্তা নিহত এবং শতাধিক আহত হন। এই হামলার মাধ্যমে বোকো হারাম প্রমাণ করে যে তারা কেবল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামেই সীমিত নয়, বরং রাজধানীর সুরক্ষিত অঞ্চলে হামলা চালানোর ক্ষমতা রাখে।

২০১৫: বাগা গণহত্যা (Baga Massacre)

বোকো হারামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যার একটি ঘটে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বোরনো রাজ্যের বাগা (Baga) শহরে। সেখানে থাকা বহুজাতিক সামরিক ঘাটি দখল করার পর সন্ত্রাসীরা টানা কয়েকদিন ধরে পুরো শহরে তাণ্ডব চালায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, এই ঘটনায় প্রায় ২,০০০ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন এবং পুরো শহরটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

২০১৮: ডাপচি অপহরণ ও লিয়া শারিবু (Leah Sharibu)

চিবক ঘটনার চার বছর পর, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইয়োবে রাজ্যের ডাপচি (Dapchi) শহরের একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১১০ জন ছাত্রীকে অপহরণ করে ISWAP গোষ্ঠী। পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে বেশিরভাগ মেয়েকে মুক্তি দেওয়া হলেও, লিয়া শারিবু নামের এক খ্রিস্টান তরুণীকে মুক্তি দেওয়া হয়নি কারণ সে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ত্যাগ করতে অস্বীকার করেছিল। লিয়া শারিবু আন্তর্জাতিকভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাহসিকতার এক প্রতীকে পরিণত হন।

‘তাকফির’ (Takfir) বিতর্ক: বিশ্ব সন্ত্রাসবাদে নতুন বিতর্ক

বোকো হারামের আদর্শিক কাঠামোর সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি ছিল 'তাকফির' (অন্য কোনো মুসলিমকে অমুসলিম বা কাফের ঘোষণা করা)।

শেকাওয়ের উগ্র ব্যাখ্যা: আবুবকর শেকাও দাবি করতেন, যেসব মুসলিম নাইজেরিয়া সরকারের অধীনে চাকরি করে, সরকারি স্কুলে পড়ে, ভোট দেয় বা বোকো হারামের বিরুদ্ধে কথা বলে তারা আর মুসলিম থাকে না। ফলে তাদের সম্পদ লুণ্ঠন এবং তাদের হত্যা করা সম্পূর্ণ বৈধ।

আল-কায়েদা ও আইএসের ক্ষোভ: সাধারণত আল-কায়েদা ও আইএসআইএস-এর মতো উগ্র সংগঠনগুলোও নিজেদের ‘মুসলিম’ দাবি করা সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি পাইকারি হামলা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয় (যেন জনসমর্থন না হারায়)। শেকাওয়ের এই উগ্র দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের মূলধারার চরমপন্থী দলগুলো বোকো হারাম থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছিল।

নাইজেরীয় সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ও দুর্নীতি

বোকো হারামকে গত দুই দশকে পুরোপুরি নির্মূল না করতে পারার পেছনে নাইজেরিয়ার সামরিক বাহিনীর নিজস্ব কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ও দুর্নীতি মারাত্মক ভূমিকা রেখেছে:

‘ভুতুড়ে সৈনিক’ (Ghost Soldiers) কেলেঙ্কারি: নাইজেরীয় সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তারা কাগজে-কলমে হাজার হাজার কাল্পনিক সেনার নাম দেখিয়ে কোটি কোটি সামরিক বাজেট আত্মসাৎ করেছেন। অথচ যুদ্ধের ময়দানে সেনা সংখ্যা ছিল অপর্যাপ্ত।

অস্ত্রের ঘাটতি ও নিম্ন মান: বহুকাল ধরে ফ্রন্টলাইনের নাইজেরীয় সৈনিকরা অভিযোগ করে এসেছেন যে বোকো হারামের সন্ত্রাসীদের কাছে সেনাবাহিনীর চেয়েও উন্নত এবং আধুনিক অস্ত্র (যেমন: রকেট লঞ্চার, ড্রোন, অত্যাধুনিক নাইট-ভিশন গগলস) বিদ্যমান ছিল।

মানবাধিকার লঙ্ঘন: নাইজেরীয় সামরিক বাহিনী বোকো হারাম দমনের নামে 'বোরনো' ও আশপাশের অঞ্চলে নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে নির্যাতন ও আটক করেছে। ফলে সাধারণ জনগণের সাথে সামরিক বাহিনীর একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়, যা বোকো হারামকে স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ করে দেয়।

নারীদের কৌশলগত ব্যবহার: ভিক্টিম থেকে ‘অস্ত্র’

সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসে বোকো হারামই প্রথম গোষ্ঠী, যারা নারীদের একটি সামরিক ‘কৌশলগত অস্ত্র’ হিসেবে বড় আকারে ব্যবহার করেছে।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: নিরাপত্তা বাহিনী সাধারণত নারীদের তল্লাশি করতে সংবেদনশীল বোধ করত। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বোকো হারাম শত শত অপহৃত নারী ও কিশোরীর শরীরে বোমার ভেস্ট বেঁধে সামরিক ঘাটি, মসজিদ ও বাজারে পাঠিয়ে দিত। গবেষণায় দেখা গেছে, বোকো হারামের চালানো আত্মঘাতী হামলাগুলোর ৪০%-এরও বেশি পরিচালিত হয়েছিল নারী ও শিশুদের দ্বারা

বর্তমান পরিস্থিতি ও সাহেল অঞ্চলের নতুন ঝুঁকি

২০২১ সালে শেকাওয়ের মৃত্যুর পর বোকো হারামের হাজার হাজার সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে নাইজেরিয়া সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে। তবে এতে সংঘাতের সমাপ্তি ঘটেনি, বরং রূপ পরিবর্তিত হয়েছে:

ISWAP-এর প্রাধান্য: বর্তমানে লেক চাদ ও সাহেল অঞ্চলে ISWAP সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা নিজেদের একটি সুসংগঠিত ‘ছায়া সরকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, যারা স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে নিয়মিত কর আদায় করে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

সাহেল অঞ্চলের অস্থিরতা: মালি, বুর্কিনা ফাসো এবং নাইজারে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে আফ্রিকায় পশ্চিমা শক্তিগুলোর (যেমন: ফ্রান্স ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি) বিদায় ঘটেছে। ফলে পুরো সাহেল অঞ্চলে আইএসআইএস এবং আল-কায়েদা জোটবদ্ধ হয়ে নতুন করে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট ও বোকো হারাম দমনের চ্যালেঞ্জ

বোকো হারাম কেবল নাইজেরিয়ার সীমানার ভেতরেই থেমে থাকেনি; এটি দ্রুত প্রতিবেশী রাষ্ট্র ক্যামেরুন, চাদ এবং নাইজারে ছড়িয়ে পড়ে। লেক চাদ অববাহিকা (Lake Chad Basin) একটি ভৌগোলিক ক্রসরোড হওয়ায় বোকো হারামের সন্ত্রাসীরা এক দেশে আক্রমণ চালিয়ে অন্য দেশের দুর্গম সীমান্ত এলাকায় গিয়ে সহজে আত্মগোপন করত।

বহুজাতিক যৌথ টাস্কফোর্স (MNJTF)

বোকো হারামের সীমান্ত অতিক্রমকারী সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় নাইজেরিয়া, চাদ, ক্যামেরুন, নাইজার ও বেনিন মিলে গঠিত হয় Multinational Joint Task Force (MNJTF)। এই যৌথ বাহিনী বোকো হারামের হাত থেকে বেশ কিছু অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হলেও, সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, রসদের অভাব এবং নাইজেরীয় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চরম দুর্নীতির কারণে বোকো হারামকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।

অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আবুবকর শেকাওয়ের মৃত্যু

বোকো হারামের ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো এর অভ্যন্তরীণ কোন্দল। আবুবকর শেকাওয়ের মাত্রাতিরিক্ত বর্বরতা (সাধারণ মুসলিমদের আত্মঘাতী বোমায় হত্যা করা) পছন্দ করেনি সংগঠনের অনেক উচ্চপদস্থ অধিনায়ক।

ফলে ২০১৬ সালে আইএসআইএস-এর সমর্থনে সংগঠনটি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। আবু মুসাব আল-বারনাভির নেতৃত্বে গঠিত হয় ISWAP। ২০২১ সালের মে মাসে ISWAP এবং বোকো হারামের শেকাও উপদলের মধ্যে এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এবং ISWAP-এর হাতে বন্দি হওয়া এড়াতে আবুবকর শেকাও নিজ শরীরে থাকা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মহত্যা করেন।

শেকাওয়ের মৃত্যুর পর বোকো হারাম কিছুটা দুর্বল হলেও ISWAP-এর ব্যানারে এই সন্ত্রাসবাদের ছাঁচ পশ্চিম আফ্রিকায় এখনও বহাল রয়েছে।

সমাধান কোন পথে?

বোকো হারামের উত্থান ও বিগত দুই দশকের ইতিহাস আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট সত্য তুলে ধরে শুধুমাত্র বন্দুকের গুলি বা সামরিক অভিযান দিয়ে সন্ত্রাসবাদ চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব নয়। বোকো হারাম ছিল নাইজেরিয়ার দীর্ঘদিনের সামাজিক ব্যাধি, রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব, চরম আয়বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় অপশাসনের একটি রক্তক্ষয়ী উপসর্গ মাত্র।

যদি নাইজেরিয়া এবং তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো বোকো হারাম বা এই ধরনের চরমপন্থী সংগঠনের পুনরাবৃত্তি থামাতে চায়, তবে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি নিচের মৌলিক কাজগুলো সম্পাদন করা জরুরি:

উত্তর-দক্ষিণের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দূরীকরণ: তেল সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে উত্তর নাইজেরিয়ার ১১ কোটি মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান: বোকো হারাম যেসব স্কুল ধ্বংস করেছে তা পুনঃনির্মাণ করা এবং তরুণ সমাজকে আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করা, যাতে তারা দৈনিক ৩০ ডলারের লোভে সন্ত্রাসী খাতায় নাম না লেখায়।

সুশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কার: পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর দুর্নীতি বন্ধ করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ করে সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা।

ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক চর্চা: চরমপন্থী ও উগ্র সালাফি জিহাদিবাদী মতাদর্শের বিপরীতে শান্তির ইসলামি শিক্ষার বার্তা প্রচার করা এবং সালাফি-জিহাদিদের অর্থায়নের পথ চিরতরে বন্ধ করা।

বোকো হারাম আফ্রিকাকে যে রক্তস্নাত অভিজ্ঞতা দিয়েছে, তা একবিংশ শতাব্দীর মানবজাতির জন্য একটি বিরাট শিক্ষা। রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের নিরাপত্তা, অন্ন ও ন্যায়বিচার দিতে ব্যর্থ হয়, তবে চরমপন্থার কালো ছায়া কতটা ভয়ংকর ও বর্বর রূপ নিতে পারে বোকো হারামের ইতিহাস তার এক নির্মম দস্তাবেজ।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.