ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমান - পাকিস্তানের যে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন 'লায়ন অব নওশেরা'

ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমান - পাকিস্তানের যে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন 'লায়ন অব নওশেরা'

১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ভারত-পাকিস্তানের রক্তক্ষয়ী বিভাজনের ইতিহাস কেবল সীমানা নির্ধারণের ইতিহাস ছিল না; তা ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের আবেগ, আদর্শ এবং আনুগত্যের এক মহা অগ্নিপরীক্ষা। সেই অগ্নিপরীক্ষায় যেসব মহাপ্রাণ ব্যক্তিত্ব নিজেদের আদর্শ, সততা এবং অকৃত্রিম দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়ে অমর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয় ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমান (মহাবীর চক্র)-এর নাম।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সরাসরি সেনা প্রধান (Army Chief) হওয়ার মতো স্বপ্নের মতো লোভনীয় প্রস্তাব পকেটে রেখেও যিনি অবলীলায় তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও সার্বভৌম ভারতের জন্য রণাঙ্গনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনিই ইতিহাসের সেই কিংবদন্তি নায়ক, যাঁকে বিশ্ব চেনে ‘লায়ন অব নওশেরা’ (নওশেরার সিংহ) নামে।

১৯৪৭-৪৮ সালের জম্মু-কাশ্মীর যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদাত বরণ করা তিনি আজ পর্যন্ত সবচেয়ে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মাটি ও পতাকাকে ভালোবাসার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা ভারতীয় উপমহাদেশের সামরিক ইতিহাসের পাতায় এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা মহাকাব্য।

আজকের বিস্তৃত আলোচনায় আমরা এই মহান বীরের জন্ম, ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান, দেশভাগের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব, জিন্নাহর লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, নওশেরা ও ঝাঙ্গরের রক্তক্ষয়ী রণাঙ্গনের রণকৌশল এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত তাঁর বীরত্বের অবিস্মরণীয় রূপকথা উন্মোচন করব।

প্রারম্ভিক জীবন ও রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্টে যাত্রা

১৯১২ সালের ১৫ জুলাই উত্তরপ্রদেশের আজমগড় জেলার বিবিপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ উসমান। তাঁর পিতা মোহাম্মদ ফারুক ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় পুলিশের একজন সম্মানিত কর্মকর্তা। পারিবারিক ঐতিহ্য ও সুশাসনের পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলা থেকেই উসমানের মধ্যে ন্যায়নীতি, আত্মমর্যাদা এবং দেশপ্রেমের প্রবল উন্মেষ ঘটেছিল।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি, স্যান্ডহার্স্ট (১৯৩২): তরুণ উসমানের স্বপ্ন ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করে দেশের সেবা করা। ১৯৩০-এর দশকে যখন একজন ভারতীয় হিসেবে স্যান্ডহার্স্টের মতো অভিজাত প্রতিষ্ঠানে স্থান পাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন, তখন তিনি তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তা, শারীরিক সক্ষমতা ও যোগ্যতার শক্তিতে ১৯৩২ সালে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত 'রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি, স্যান্ডহার্স্ট' (Royal Military Academy Sandhurst)-এ ভর্তির সুযোগ পান।

কমিশন লাভ ও ১০ম বালুচ রেজিমেন্ট (১৯৩৪): ১৯৩৪ সালে সফলভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে একজন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। পরবর্তীতে তাঁকে প্রখ্যাত ১০ম বালুচ রেজিমেন্টে (10th Baluch Regiment) পদায়ন করা হয়। সেনাদলে তাঁর শৃঙ্খলা, সহযোদ্ধাদের প্রতি মমত্ববোধ এবং কঠোর রণকৌশলগত দক্ষতার জন্য খুব অল্প সময়েই তিনি সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রিয়পাত্রে পরিণত হন।

১৯৪৭ এর দেশভাগ ও জিন্নাহর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে যখন ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হচ্ছিল, তখন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীকেও ধর্ম ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে দুই টুকরো করে ফেলা হয়। সেনাসদস্য ও কর্মকর্তাদের নিজস্ব পছন্দের ভিত্তিতে ভারত নাকি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। মুসলিম কর্মকর্তাদের স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছিল।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যক্তিগত অফার: উসমান যে বালুচ রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন, সেই রেজিমেন্টটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অংশে পড়ে। উসমানের অসাধারণ সামরিক প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ খুব ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। নবগঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য একজন দক্ষ কমান্ডারের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে জিন্নাহ ব্যক্তিগতভাবে মোহাম্মদ উসমানকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জোর অনুরোধ জানান।

শুধু সাধারণ অনুরোধই নয়, উসমানকে প্রলুব্ধ করতে জিন্নাহ এক অভাবনীয় প্রস্তাব দেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে সরাসরি 'সেনাপ্রধান' (Army Chief) বা তৎকালীন শীর্ষ সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হবে।

ক্ষমতার মোহ হেলায় প্রত্যাখ্যান: একজন ৩৫ বছর বয়সী সামরিক কর্মকর্তার জন্য একটি দেশের সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদ পাওয়ার প্রস্তাব ছিল রূপকথার মতো। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার উসমানের কাছে ক্ষমতার পদের চেয়ে বহু গুণ বড় ছিল তাঁর জন্মভূমির প্রতি সততা এবং ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের আদর্শ।

তিনি জিন্নাহর লোভনীয় প্রস্তাব এক মুহূর্তে বিনাবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেন এবং স্পট জানিয়ে দেন:

“আমি ভারতের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছি, ভারতের বাতাসেই বেড়ে উঠেছি। কোনো পদ বা ক্ষমতার লোভ আমাকে আমার মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। আমি ভারতীয় সেনাবাহিনীতেই থাকব এবং দেশের জন্যই লড়ব।”

তিনি পাকিস্তান না গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীতেই অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন। বালুচ রেজিমেন্ট পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় উসমানকে পরবর্তীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ডোগরা রেজিমেন্টে (Dogra Regiment) স্থানান্তর করা হয়।

১৯৪৭-৪৮ এর কাশ্মীর যুদ্ধ: রণাঙ্গনে 'নওশেরার সিংহ'

১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজনের পরপরই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের মদদপুষ্ট হাজার হাজার উপজাতীয় কাবিলা (Tribal Lashkars) 'অপারেশন গুলমার্গ'-এর অধীনে জম্মু-কাশ্মীরে এক নজিরবিহীন ও বর্বর আক্রমণ চালায়। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাশ্মীর উপত্যকা দখলের উদ্দেশ্যে শত্রু বাহিনী দ্রুত সামনে এগোতে থাকে।

পরিস্থিতির আকস্মিকতায় জম্মু ও কাশ্মীরের তৎকালীন রাজা হরি সিং ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭ তারিখে ভারতে অন্তর্ভুক্তির দলিলে (Instrument of Accession) স্বাক্ষর করেন। এর পরপরই ভারতীয় সেনাবাহিনী আকাশপথে শ্রীনগরে অবতরণ করে কাশ্মীরের মূল অংশ রক্ষা করতে সমর্থ হলেও, পশ্চিম জম্মু খাতের নওশেরা, পুঞ্চ এবং মীরপুর এলাকায় তীব্র যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

৫০ প্যারাশুট ব্রিগেডের দায়িত্ব ও ব্রিগেডিয়ার উসমান: পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ নিলে ভারতীয় সেনাবাহিনী ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমানকে জম্মু ও কাশ্মীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল '৫০ প্যারাশুট ব্রিগেড' (50th Parachute Brigade)-এর কমান্ডারের দায়িত্ব দেয়।

দেশভাগের সময় ব্রিগেডিয়ার উসমানকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য চরম প্রলোভন দেখানো হয় এবং এমনকি তাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রধান করারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে থেকে যাওয়াকেই নিজের নৈতিক দায়িত্ব মনে করেন। ১৯১২ সালে উত্তরপ্রদেশে জন্মগ্রহণকারী এবং ব্রিটেনের বিখ্যাত স্যান্ডহার্স্ট সামরিক একাডেমির এই গ্র্যাজুয়েটকে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে নওশেরা এবং সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা সুরক্ষার দায়িত্ব দিয়ে রণাঙ্গনে পাঠানো হয়।

ঝাঙ্গর পতন ও উসমানের ঐতিহাসিক কঠিন প্রতিজ্ঞা: ১৯৪৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনা ও উপজাতীয় আক্রমণকারীরা বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আকস্মিক হামলা চালিয়ে ঝাঙ্গর (Jhangar) দখল করে নেয়। ঝাঙ্গর ছিল এমন একটি স্থান যা শ্রীনগর, পুঞ্চ এবং মীরপুরের মধ্যবর্তী যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তাই এর পতন ভারতীয় বাহিনীর জন্য এক বিশাল কৌশলগত বিপর্যয় তৈরি করে।

এই ব্যর্থতায় সামরিক অধিনায়ক হিসেবে ব্রিগেডিয়ার উসমান গভীরভাবে ব্যথিত হন এবং এক নজিরবিহীন আবেগীয় ও সামরিক প্রতিজ্ঞা করেন:

“যতক্ষণ না আমি ঝাঙ্গর পুনরুদ্ধার করতে পারছি এবং সেখানে শত্রুকে তাড়িয়ে ভারতের পতাকা পুনরায় উত্তোলন করছি, ততক্ষণ আমি কোনো খাটে ঘুমাবো না; চটের তৈরি সাধারণ মাদুরে মাটিতে ঘুমাবো!”

একজন উচ্চপদস্থ সেনাপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি হাড় কাঁপানো কনকনে শীতের মধ্যেও খাটে না শুয়ে সৈন্যদের সাথে মাটিতে চটের বস্তা বিছিয়ে ঘুমাতেন। এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ত্যাগ ছিল না, বরং পুরো বাহিনীর মনোবলকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

নওশেরার যুদ্ধ (৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮)

১৯৪৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নওশেরা খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। নওশেরা দখলের শেষ চেষ্টা হিসেবে প্রায় ১৫,০০০ পাকিস্তানি সেনা ও কাবিলা আক্রমণকারী একসাথে ভারতীয় অবস্থানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

ট্যাইন ধার প্রতিরোধ: নওশেরা রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অবস্থান ছিল 'ট্যাইন ধার' (Tain Dhar) পাহাড়। সেখানে সংখ্যায় অত্যন্ত কম হলেও রাজপুত রেজিমেন্টের সেনাদল বীরত্বের সাথে লড়াই করে। এই যুদ্ধেই নায়েক যদুনাথ সিং একাই মারাত্মক আহত অবস্থায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করে শত্রুর ৩টি বড় হামলা প্রতিহত করেন এবং শাহাদাত বরণ করে ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান 'পরমবীর চক্র' (মরণোত্তর) লাভ করেন।

কৌশলগত বিজয়: ব্রিগেডিয়ার উসমানের নিখুঁত ডিফেন্সিভ কৌশল, কামানের সঠিক প্রয়োগ এবং নিজের জীবন বাজি রেখে একদম সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৫,০০০ শত্রুর বিশাল বহর ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

ক্ষয়ক্ষতি: একদিনের এ ভয়াবহ যুদ্ধে প্রায় ২,০০০ শত্রুসেনা নিহত হয় এবং শত শত আহত হয়, যা ছিল ১৯৪৭-৪৮ যুদ্ধের একক কোনো দিনে শত্রুপক্ষের সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি।

উসমানের এই বাঘের মতো বীরত্ব, উপস্থিত বুদ্ধি এবং সেনাসুলভ অকুতোভয় নেতৃত্বের জন্য ভারতীয় বাহিনী এবং সাধারণ মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধায় ও ভালোবেসে ‘লায়ন অব নওশেরা’ (Lion of Naushera) বা ‘নওশেরার সিংহ’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৪৮ সালের মার্চ: 'অপারেশন বিজয়' ও ঝাঙ্গর পুনর্দখল

১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে জম্মু ও কাশ্মীরের অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঝাঙ্গর পতন ঘটেছিল পাকিস্তানি সমর্থিত হানাদার ও উপজাতি বাহিনীর হাতে। ঝাঙ্গরের এই হাতছাড়া হওয়ার ঘটনায় ব্যথিত হয়ে ৫০ প্যারাশুট ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমান এক কঠোর প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছিলেন যতদিন না পর্যন্ত ঝাঙ্গর পুনর্দখল করে ভারতের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততদিন তিনি কোনো সাধারণ আরামদায়ক বিছানায় শয়ন করবেন না এবং কেবল মাটিতে চটাই পেতে ঘুমাবেন।

নওশেরার ঐতিহাসিক যুদ্ধে শত্রুপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর, ব্রিগেডিয়ার উসমানের মূল দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় ঝাঙ্গর পুনরুদ্ধারের দিকে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ঝাঙ্গর মুক্ত করার লক্ষ্যে পরিচালনা করে সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযান ‘অপারেশন বিজয়’

সামরিক কৌশল ও জোরালো আক্রমণ: ব্রিগেডিয়ার উসমানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় ও দক্ষ নেতৃত্বে ৫০ প্যারাশুট ব্রিগেডের সাথে ১৯ ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড এবং আর্মার্ড রেজিমেন্ট একযোগে আক্রমণ শুরু করে। দুর্গম পাহাড়ি পথ, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং পাহাড়ের চূড়ায় শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসা পাকিস্তানি বাহিনীর তীব্র প্রতিরোধ অতিক্রম করে ভারতীয় বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয়।

চূড়ান্ত প্রতিরোধ ও সাফল্য: উসমানের দূরদর্শী দিকনির্দেশনা ও সুনির্দিষ্ট আর্টিলারি সহায়তায় ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী লড়াই চরম রূপ নেয়। ভারতীয় সেনাদলের অদম্য সাহসিকতার মুখে পাকিস্তানি বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৮ মার্চ ১৯৪৮ সালে ঝাঙ্গর সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয় এবং সেখানে পুনরায় সগর্বে উড়িয়ে দেওয়া হয় স্বাধীন ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা।

প্রতিজ্ঞা পূরণ ও সেনাদলের মনোবল: ঝাঙ্গর পুনর্দখলের সাথে সাথেই বীর সেনাপতি উসমান দীর্ঘ দিন পর ভূমিতল ছেড়ে সাধারণ শয্যায় ফিরে আসেন এবং বীরের মতো তাঁর প্রতিজ্ঞা পূরণ করেন। ঝাঙ্গরের এই অভাবনীয় জয় ভারতীয় সেনাদলের আত্মবিশ্বাস ও রণকৌশলগত অবস্থান বহুগুণ শক্তিশালী করে তোলে।

পাকিস্তানি বাহিনীর আতঙ্ক ও ৫০,০০০ টাকার মাথার দাম

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সহ উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তারা ব্রিগেডিয়ার উসমানকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে বড় পদের লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু উসমান সমস্ত প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে ভারতে থেকে যান। পরবর্তীতে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর সামরিক মেধা এবং একের পর এক বিজয় পাকিস্তানি সামরিক হাই কমান্ডকে পুরোপুরি স্তম্ভিত করে দেয়।

বিশেষ করে নওশেরার যুদ্ধে প্রায় ২,০০০ শত্রুসেনা নিহত হওয়া এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঝাঙ্গর হাতছাড়া হওয়ার পর পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব চরম ভীত, ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে পড়ে।

মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ও পুরস্কারের ঘোষণা: উসমানের একের পর এক নিখুঁত সামরিক পদক্ষেপে বিভ্রান্ত পাকিস্তানি বাহিনী বুঝতে পেরেছিল যে সম্মুখ সমরে তাঁকে পরাজিত করা প্রায় অসম্ভব। এই মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ঢেকে রাখতে এবং তাঁকে যেকোনো মূল্যে সরিয়ে দিতে তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাকমান্ড ব্রিগেডিয়ার উসমানের মাথার দাম ঘোষণা করেছিল ৫০,০০০ টাকা

অর্থের ঐতিহাসিক মূল্য ও উসমানের অবিচলতা: ১৯৪৮ সালের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ৫০,০০০ টাকা ছিল এক বিশাল অংকের অর্থ। শত্রুপক্ষ ভেবেছিল এই বিপুল অর্থের লোভ বা প্রাণভয় উসমানকে পিছু হটতে বাধ্য করবে। কিন্তু কোনো মনস্তাত্ত্বিক চাপ, মৃত্যুঝুঁকি বা শত্রুর মাথার দামের ঘোষণা ‘নওশেরার সিংহ’ ব্রিগেডিয়ার উসমানকে সামান্যতমও দমাতে পারেনি; বরং তিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দেশের সীমানা রক্ষায় সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।

৩ জুলাই ১৯৪৮: রক্তভেজা রণাঙ্গনে মহাপ্রায়ণ ও শেষ বার্তা

ঝাঙ্গর পুনরুদ্ধারের পর থেকে পাকিস্তানি বাহিনী অঞ্চলটি পুনরায় দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে এবং ভারতীয় অবস্থান লক্ষ্য করে অবিরাম পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। সীমান্তসমূহ এবং কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ব্রিগেডিয়ার উসমান নিজে একদম সামনের সারিতে থেকে বাহিনীর সার্বিক তদারকি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

৩ জুলাইয়ের করুণ অপরাহ্ন

১৯৪৮ সালের ৩ জুলাই, বিকেল ঠিক ৫:৪৫ মিনিট। ঝাঙ্গরের ফরওয়ার্ড অবজারভেশন পোস্টে (Forward Observation Post) দাঁড়িয়ে শত্রুর গতিবিধি ও সীমান্ত পরিস্থিতি তদারকি করছিলেন ব্রিগেডিয়ার উসমান। ঠিক সেই সময় নিয়ন্ত্রণরেখার ওপার থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর দিক থেকে বিরামহীন ও প্রচণ্ড কামানের গোলাবর্ষণ শুরু হয়।

পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণের জন্য ২৬ ও ২৫-পাউন্ডার ক্যালিবারের ভারী কামান ব্যবহার করছিল। হঠাৎ একটি ২৫-পাউন্ডার ক্যালিবারের কামানের গোলা ব্রিগেডিয়ার উসমানের একদম কাছাকাছি এসে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। গোলার তীব্র অভিঘাত ও উত্তপ্ত ধাতব স্প্লিন্টারে (Splinter) শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলে এই মহাবীর রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক শেষ বার্তা

শরীরে প্রচণ্ড ক্ষত, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং জীবনপ্রদীপ নিভে আসার চূড়ান্ত মুহূর্তেও উসমানের মনজুড়ে ছিল কেবল মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর অধীনস্থ সৈন্যদের নিরাপত্তা। রক্তে ভেসে যাওয়া অবস্থায় সহযোদ্ধাদের কোলে মাথা রেখে, মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক অন্তিম বার্তা:

“আমি মারা যাচ্ছি, কিন্তু যে মাটির জন্য আমরা রক্ত দিয়ে লড়ছি, সেই মাটি যেন কোনো অবস্থাতেই শত্রুর হাতে না যায়!”

মাত্র ৩৫ বছর বয়সে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করেন ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমান। তিনি ছিলেন ১৯৪৭-৪৮ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে শহীদ হওয়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদমর্যাদার সেনা কর্মকর্তা।

একনজরে ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমানের প্রামাণিক সংক্ষিপ্ত তথ্যমালা

ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমানের গৌরবময় জীবন, সামরিক অর্জন, মহাকাব্যিক সিদ্ধান্ত এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের পূর্ণাঙ্গ সারসংক্ষেপ নিচে একটি প্রামাণিক টেবিলে তুলে ধরা হলো:

বিষয় ও মানদণ্ড

ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমান (মহাবীর চক্র)-এর ঐতিহাসিক বিবরণ

পূর্ণ নাম

ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমান (Brigadier Mohammad Usman)।

জন্ম ও জন্মস্থান

১৫ জুলাই ১৯১২; আজমগড়, উত্তর প্রদেশ, ভারত।

সামরিক একাডেমি

রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট (যুক্তরাজ্য), ১৯৩২।

কমিশন ও রেজিমেন্ট

১৯৩৪ সালে কমিশন; ১০ম বালুচ রেজিমেন্ট (পরে ডোগরা রেজিমেন্ট ও ৫০ প্যারা ব্রিগেড)।

জিন্নাহর ঐতিহাসিক প্রস্তাব

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সেনাপ্রধান (Army Chief) হওয়ার সরাসরি অফার প্রত্যাখ্যান।

ঐতিহাসিক খেতাব

‘লায়ন অব নওশেরা’ (Lion of Naushera) বা নওশেরার সিংহ।

বিখ্যাত প্রতিজ্ঞা

ঝাঙ্গর উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত খাটে না শুয়ে মাটিতে শয়নের কঠোর ব্রত।

শত্রুর ঘোষিত মাথার দাম

১৯৪৮ সালে পাকিস্তানি কমান্ড কর্তৃক ঘোষিত ৫০,০০০ টাকা পুরস্কার।

শাহাদাতের তারিখ ও বয়স

৩ জুলাই ১৯৪৮ (বয়স: মাত্র ৩৫ বছর); ঝাঙ্গর সেক্টর, জম্মু ও কাশ্মীর।

ঐতিহাসিক শেষ বাণী

"আমি মরে যাচ্ছি, কিন্তু যে মাটির জন্য লড়ছি তা যেন শত্রুর হাতে না যায়।"

সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা

মহাবীর চক্র (Maha Vir Chakra - মরণোত্তর)

সমাধিস্থল

জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, নতুন দিল্লি (পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়)।

রাষ্ট্রীয় সম্মান, জানাজা ও নেহরুর উপস্থিতি: এক স্বাধীন ভারতের অশ্রুসজল বিদায়

১৯৪৮ সালের ৩ জুলাই কাশ্মীর যুদ্ধে ঝাংগার (Jhangar) পুনর্দখলের অন্তিম পর্যায়ে ২৫-পাউন্ডার একটি কামানের গোলার আঘাতে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে শাহাদাতবরণ করেন ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমান। তিনি ছিলেন ১৯৪৭-৪৮ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে শহীদ হওয়া সর্বোচ্চ সামরিক পদমর্যাদার সেনাকর্তা। তাঁর শাহাদাতের সংবাদ দিল্লিতে পৌঁছালে গোটা দেশজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। ভারত বিভাগের ঠিক পরপরই দুই দেশের মধ্যে এক তীব্র উত্তেজনা ও অস্থিরতা বিরাজ করছিল; সেই মুহূর্তে তাঁর এই বীরত্ব ও মহাজাগতিক আত্মত্যাগ ভারতীয় সেনাদলের মনোবল যেমন দৃঢ় করেছিল, তেমনি দেশবাসীর হৃদয়ে এক গভীর বেদনার জন্ম দিয়েছিল।

জানাজায় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও মন্ত্রিসভা: ব্রিগেডিয়ার উসমানের পার্থিব দেহ বিশেষ সামরিক বিমানে করে শ্রীনগর থেকে রাজধানী দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়। স্বাধীনতার পর স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এত বড় আবেগঘন, সর্বজনীন এবং অশ্রুসজল রাষ্ট্রীয় জানাজা বা শেষকৃত্য আর দেখা যায়নি। বিমানবন্দরে বিমান অবতরণ থেকে শুরু করে পুরো অন্তিম যাত্রা পথজুড়ে শত শত সাধারণ মানুষ পুষ্পবৃষ্টি করে এই বীরকে অশ্রুভেজা শ্রদ্ধা জানান।

তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, স্বাধীন ভারতের প্রথম ভারতীয় গভর্নর জেনারেল সি. রাজাগোপালাচারী, তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী মওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং কাশ্মীরের প্রভাবশালী নেতা শেখ আব্দুল্লাহ সহ পুরো কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বিমানবন্দর ও জানাজাস্থলে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নেহরু নিজেই কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশ করেন এবং শেখ আব্দুল্লাহ কাশ্মীরের প্রতি উসমানের অবিস্মরণীয় অবদান স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় সমাধি: দিল্লির ঐতিহাসিক জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া (Jamia Millia Islamia) বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের কবরস্থানে পূর্ণ সামরিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় বীরত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর কফিনে পরম শ্রদ্ধায় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল স্বাধীন ভারতের ত্রিবর্ণ জাতীয় পতাকা।

দাফনকার্য সম্পন্ন করার সময় প্রথা অনুযায়ী সেনাসদস্যদের বিউগলে বেজে ওঠে শেষ করুণ সুর এবং চারপাশ থেকে মুহুর্মুহু তোপধ্বনির মাধ্যমে তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক 'গান স্যালুট' প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে যুদ্ধক্ষেত্রে এই অসামান্য সাহসিকতা, অদম্য নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা 'মহাবীর চক্র' (Maha Vir Chakra)-এ ভূষিত করে।

মহাবীর চক্র ও ভারতীয় সামরিক ইতিহাসে তাঁর চিরস্থায়ী আসন

দেশ ও জাতির প্রতি অসামান্য বীরত্ব, অতুলনীয় কৌশলগত নেতৃত্ব এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমানকে মরণোত্তর ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক সামরিক পদক ‘মহাবীর চক্র’ (Maha Vir Chakra) প্রদান করে।

সর্বোচ্চ পদে আত্মত্যাগের রেকর্ড: ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে শহীদ হওয়া সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার উসমানই ছিলেন সবচেয়ে সিনিয়র বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আজও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে তাঁর নাম পরম শ্রদ্ধা ও গাম্ভীর্যের সাথে উচ্চারণ করা হয়।

ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের আদর্শ প্রতীক: আজকের পৃথিবীতে যখন ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে নানা মেরুকরণ ঘটে, তখন ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমানের জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে প্রকৃত দেশপ্রেম কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ফ্রেমে বন্দি থাকে না।

তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম, কিন্তু একই সাথে তিনি ছিলেন ভারতমাতার একনিষ্ঠ ও সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান। জিন্নাহর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, নীতি ও আদর্শ ক্ষমতার চেয়েও বহু গুণ শক্তিশালী।

ইতিহাস যাঁর নাম সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করবে

‘লায়ন অব নওশেরা’ ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমানের জীবন ইতিহাস কেবল একটি সামরিক জীবনের গল্প নয়; এটি সততা, অকুতোভয় সাহস, ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা এবং অকৃত্রিম দেশপ্রেমের এক পরম মহাকাব্য।

পাক সেনাপ্রধান হওয়ার লোভনীয় রাজমুকুট যিনি এক তুড়িতে পায়ে ঠেলে দিয়েছিলেন, দেশের জন্য সাধারণ সৈনিকের মতো চটের মাদুরে ঘুমিয়েছিলেন এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কেবল মাতৃভূমির সুরক্ষার কথা ভেবেছিলেন সেই বীর সন্তানকে ইতিহাস কখনো ভুলবে না।

আজও যখন কাশ্মীরের নওশেরা বা ঝাঙ্গরের পাহাড়ে বাতাস দোলা দেয়, যেন আজও সেখানে ভেসে আসে ব্রিগেডিয়ার উসমানের সেই বজ্রনির্ঘোষ বাণী:

“যে মাটির জন্য আমরা রক্ত দিচ্ছি, সেই মাটি যেন কখনো শত্রুর হাতে না যায়।”

বীর শহীদ ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ উসমান (মহাবীর চক্র)-এর অমর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি ছিলেন, আছেন এবং চিরকাল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক অশ্বমেধ প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.