কলকাতার পতন ও মুম্বাইয়ের উত্থান - বণিক থেকে ভারতের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য

আজকের একাবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কেউ যদি প্রশ্ন করেন ভারতের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক রাজধানী কোনটি? উত্তর দিতে এক মুহূর্তও সময় নেবেন না কেউ। একবাক্যে সবাই বলবেন ‘মুম্বাই’ (তৎকালীন বোম্বে)। দালাল স্ট্রিট, বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার প্রধান কার্যালয়, বহুজাতিক কর্পোরেট হাউজের সদর দপ্তর কিংবা দেশের ধনকুবেরদের বাসস্থান সব মিলিয়ে মুম্বাই হলো ভারতের অর্থপ্রবাহের অবিসংবাদিত হৃতপিন্ড। অপরদিকে বর্তমান কলকাতাকে দেখা হয় একটি সংস্কৃতিবান, ঐতিহাসিক, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে খানিকটা ধীরগতির শহর হিসেবে।
আজকের এই ভিন্ন চিত্র দেখে অনেকের কাছেই হয়তো অবিশ্বাস্য, অবান্তর কিংবা রসিকতা বলে মনে হতে পারে যে একসময় এই ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য পরিচালিত হতো কলকাতা শহর থেকে! মুম্বাই যখন কেবলই সামুদ্রিক বাণিজ্যের ছোট একটি কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের গোড়াপত্তন করছিল, কলকাতা তখন ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের 'দ্বিতীয় শহর' (Second City of the British Empire) এবং গোটা এশিয়ার বাণিজ্যের মূল অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।
তাহলে ইতিহাসের কোন বাঁকে এসে তিল তিল করে গড়ে ওঠা কলকাতার এই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য ধসে পড়ল? কীভাবে একটি সমৃদ্ধশালী বন্দরনগরী ও ব্যাংকিংয়ের সূতিকাগার নিজ মসনদ হারিয়ে ফেলল এবং বোম্বে কীভাবে ভারতের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল? এটি কেবল দুটি শহরের লড়াইয়ের গল্প নয়; এটি হলো ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা, উদাসীন উদ্যোক্তা মানসিকতা, বৈশ্বিক যুদ্ধ এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার মহা-ধসের এক ঐতিহাসিক দলিল। চলুন, ইতিহাসের পাতায় গভীর ডুব দিয়ে জেনে নেওয়া যাক কলকাতার পতন ও বোম্বাইয়ের উত্থানের সেই রোমাঞ্চকর ও বেদনাদায়ক ইতিহাস।
কলকাতার সুবর্ণ জয়যাত্রা: যখন বাংলা ছিল ভারতের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র
১৮ শতকের শেষভাগ থেকে শুরু করে ২০ শতকের প্রথম প্রথমার্ধ পর্যন্ত ভারতের বাণিজ্যের দিকনির্ণায়ক ছিল কলকাতা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ভারতবর্ষে নিজেদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তখন প্রশাসনিক সুবিধার পাশাপাশি বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র হিসেবে তারা বেছে নিয়েছিল কলকাতাকে। ১৭৭২ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা ছিল অবিভক্ত ভারতের রাজধানী। কিন্তু রাজধানী হওয়ার অনেক আগেই হুগলি নদীর তীরের এই শহরটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।
অর্থনৈতিক ইতিহাসের প্রখ্যাত গবেষক চার্লস কিন্ডলবার্জার (Charles Kindleberger) ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত নিবন্ধ 'The Formation of Financial Centers: A Study in Comparative Economic History'-এ তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে, ১৮৭১ থেকে ১৯৩৯ সালের দীর্ঘ সময়কালের অধিকাংশ সময়েই কলকাতার বাণিজ্যের মোট পরিমাণ বোম্বাইয়ের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
বাণিজ্যিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক 'জয়েন্ট স্টক ব্যাংকিং' (Joint Stock Banking) বা যৌথ মূলধনী ব্যাংকিং শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রথম পছন্দ ছিল কলকাতা।
১৮০৬ সাল: যুক্তরাষ্ট্রে বা ইউরোপের অনেক দেশে ব্যাংক ব্যবস্থা গুছিয়ে ওঠার আগেই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় 'ব্যাংক অব ক্যালকাটা' (যা পরবর্তীতে ১৮০৯ সালে 'ব্যাংক অব বেঙ্গল' নামে পরিচিতি পায়)।
১৮৪০ সাল: কলকাতার এই সুবর্ণ সূচনার প্রায় ৩৪ বছর পর বোম্বেতে প্রতিষ্ঠিত হয় 'ব্যাংক অব বোম্বে'।
১৮৪৩ সাল: মাদ্রাজে প্রতিষ্ঠিত হয় 'ব্যাংক অব মাদ্রাজ'।
অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরিতে কলকাতা বোম্বাইয়ের চেয়ে তিন দশকেরও বেশি সময় এগিয়ে ছিল। এই সুদীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগামিতাই কলকাতাকে ভারতের অবিসংবাদিত বাণিজ্যিক রাজধানীতে পরিণত করেছিল।
ব্যাংকিং ও কর্পোরেট সাম্রাজ্যে কলকাতার অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্ব
১৮০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক অব বেঙ্গল কেবল ভারতের প্রথম প্রেসিডেন্সি ব্যাংকই ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতের অর্থপ্রবাহের মূল নিয়ন্ত্রক। অন্যান্য প্রেসিডেন্সি ব্যাংক যেমন ব্যাংক অব বোম্বে বা ব্যাংক অব মাদ্রাজের তুলনায় ব্যাংক অব বেঙ্গলের মূলধন, গচ্ছিত আমানত এবং ঋণের পরিমাণ ছিল বহুগুণ বেশি।
গচ্ছিত অর্থের প্রবাহ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা
এর প্রধান কারণ ছিল বিশাল জনসংখ্যা এবং উর্বর বঙ্গভূমির বিপুল কৃষি ও শিল্প উৎপাদন। তৎকালীন বাংলা প্রেসিডেন্সি (যার মধ্যে আজকের পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার ও ওড়িশা অন্তর্ভুক্ত ছিল) ছিল ভারতের সবচেয়ে জনবহুল ও সম্পদশালী অঞ্চল। ফলে ব্যাংক অব বেঙ্গলের আমানতকারীর সংখ্যা অনুমিতভাবেই বোম্বাইয়ের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
তাছাড়া, ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা ভারতের রাজনৈতিক রাজধানী থাকায় ব্রিটিশ ভারত সরকারের যাবতীয় রাজস্ব, কর ও সরকারি গচ্ছিত অর্থ জমা হতো ব্যাংক অব বেঙ্গলেই। সরকার তাদের সমস্ত বড় বড় আর্থিক লেনদেন ও যুদ্ধ সংক্রান্ত খরচ এই ব্যাংকের মাধ্যমেই পরিচালনা করত। সরকারি এই বিশাল অর্থপ্রবাহের কারণে কলকাতার ব্যাংকিং খাত অন্য যেকোনো শহরের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এই আধিপত্য ১৯১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় একচ্ছত্রভাবে বজায় ছিল।
কোম্পানি নিবন্ধনের জোয়ার: স্টার্লিং ও রুপি কোম্পানি
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা যৌথ মূলধনী কোম্পানি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও অবিভক্ত বাংলা পুরো ভারতের নেতৃত্ব দিত। ১৯ শতকের শেষভাগে এবং ২০ শতকের শুরুতে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে চালুদ হওয়া বড় বড় যৌথ মূলধনী কোম্পানিগুলোর প্রায় ৪৫% থেকে ৫০%-ই নিবন্ধিত হতো বাংলায়! এর বিপরীতে বোম্বেতে নিবন্ধিত কোম্পানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১৩% থেকে ১৫%।
তৎকালীন অর্থনৈতিক কাঠামোকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হতো-
স্টার্লিং কোম্পানি (Sterling Companies): যেগুলো ব্রিটিশ মূলধনে পরিচালিত হতো এবং যাদের শেয়ারের মূল্য পাউন্ড বা স্টার্লিংয়ে নির্ধারিত হতো।
রুপি কোম্পানি (Rupee Companies): যেগুলো স্থানীয় বা ভারতীয় মুদ্রায় (রুপি) নিবন্ধিত হতো।
সমগ্র ভারতের নিবন্ধিত কর্পোরেট মূলধন (২০ শতকের প্রারম্ভ)
├─ বাংলা / কলকাতা (৪৫% - ৫০%) ─► স্টার্লিং কোম্পানি ৭৩%, প্রধানত চা, পাট, কয়লা
└─ বোম্বে / মুম্বাই (১৩% - ১৫%) ─► রুপি কোম্পানি ৪০%, প্রধানত বস্ত্র ও সুতা শিল্প
চা বাগান, পাটকল ও কয়লা খনির ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাপী গড়ে ওঠা বিশাল বাণিজ্যের কারণে স্টার্লিং কোম্পানির ক্ষেত্রে কলকাতার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। ১৯১৮ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভারতে বিদ্যমান মোট স্টার্লিং কোম্পানির ৭৩% ছিল কলকাতায়, যেখানে বোম্বাইয়ের ভাগ ছিল মাত্র ১৯%!
তবে দেশীয় বা স্থানীয় মূলধনে পরিচালিত 'রুপি কোম্পানি'র ক্ষেত্রে ১৯১৮ সাল নাগাদ বোম্বে (৪০%) অনেকটাই কলকাতার (৪৩%) কাছাকাছি চলে আসে। তা সত্ত্বেও, সার্বিক বাণিজ্যিক মূলধনের বিচারে কলকাতা ছিল ভারতের তৎকালীন করপোরেট জগতের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট।
বোম্বাইয়ের নীরব উত্থান: মাথাপিছু সমৃদ্ধি ও কাঠামোগত সুবিধা
বাইরে থেকে যখন মনে হচ্ছিল কলকাতা ভারতের অর্থনীতির মসনদে চিরস্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসেছে, তখন ভেতরে ভেতরে বোম্বে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত নিখুঁত ও মজবুতভাবে গড়ে তুলছিল। আপাতদৃষ্টিতে কলকাতার সার্বিক বাণিজ্যের আকার বড় হলেও, বোম্বাইয়ের অভ্যন্তরে একটি ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছিল যাকে বলা যায় "মাথাপিছু সমৃদ্ধি" (Per-Capita Prosperity)।
মাথাপিছু গচ্ছিত অর্থ ও কোম্পানি মূলধনের চিত্র
যদিও ব্যাংক অব বেঙ্গলের মোট আমানত বেশি ছিল, কিন্তু যদি জনপ্রতি বা মাথাপিছু আমানত হিসেব করা হয়, তবে দেখা যেত ব্যাংক অব বেঙ্গলের চেয়ে ব্যাংক অব বোম্বেতে সাধারণ মানুষের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল অন্তত চারগুণ বেশি!
এর স্পষ্ট অর্থ হলো- কলকাতায় ধনের কেন্দ্রীভবন ঘটেছিল প্রধানত ব্রিটিশ শাসক, বড় জমিদারি প্রথা এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট বহুজাতিক এজেন্সির হাতে। এর বিপরীতে বোম্বাইয়ের সাধারণ ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও গচ্ছিত সম্পদের পরিমাণ কলকাতার সাধারণ অধিবাসীদের তুলনায় অনেক বেশি সচ্ছল ছিল।
গড় অর্থনৈতিক সূচক (২০ শতকের প্রারম্ভিক তুলনা)
├─ কলকাতার মডেল: বিশাল মোট আয় + বিশাল জনসংখ্যা = নিম্ন মাথাপিছু গচ্ছিত আমানত
└─ বোম্বাইয়ের মডেল: সুসংহত বাণিজ্যিক আয় + ব্যবসায়ী সমাজ = ৪ গুণ বেশি মাথাপিছু আমানত
একইভাবে, বোম্বেতে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা কলকাতার চেয়ে কম হলেও, বোম্বাইয়ের কোম্পানিগুলোর গড় ব্যবসায়িক মূলধন ছিল কলকাতার কোম্পানিগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ বোম্বাইয়ের উদ্যোক্তারা যে কোম্পানিগুলো খুলতেন, সেগুলোর আর্থিক ভিত্তি ছিল অনেক বেশি মজবুত ও দীর্ঘমেয়াদী। তারা নিছক কাঁচামাল রপ্তানির ওপর নির্ভর না করে শিল্পপণ্য উৎপাদন এবং মূলধনী বাণিজ্যে অর্থ বিনিয়োগ করছিলেন।
টার্নিং পয়েন্ট ও পতনরেখা: ক্লিয়ারিং হাউজের পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে- ঠিক কবে এবং কোন সময়টাতে বোম্বে সব ধরনের হিসাব-নিকাশে কলকাতাকে পরিষ্কারভাবে পেছনে ফেলে দিতে সক্ষম হয়েছিল? এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক ও নিখুঁত উত্তর পাওয়া যায় আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ‘ক্লিয়ারিং হাউজ’ (Clearing House) বা নিকাশ ঘরের ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে।
প্রেসিডেন্সি ব্যাংক এবং অন্যান্য স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিদিন যে চেক ও আর্থিক দলিল আদান-প্রদান এবং লেনদেন নিষ্পত্তি হতো, তা পরিচালিত হতো এই ক্লিয়ারিং হাউজগুলোর মাধ্যমে। একটি শহরের ক্লিয়ারিং হাউজে লেনদেনের পরিমাণ যত বেশি হবে, বুঝতে হবে সেই শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ততটাই গতিশীল।
১৯১৩ থেকে ১৯৫০: নিকাশ ঘরের ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান
১৯১৩ সালে ভারতে বিদ্যমান ক্লিয়ারিং হাউজগুলোতে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬৫,০৩৫ লক্ষ রুপি। এর আঞ্চলিক বণ্টন ছিল নিম্নরূপ:
কলকাতা: ৫১% (ভারতের মোট ব্যাংকিং লেনদেনের অর্ধেকেরও বেশি!)
বোম্বে: ৩৩.৭%
মাদ্রাজ: ৩.৬%
দিল্লি ও অন্যান্য: অবশিষ্ট নগণ্য অংশ।
পরবর্তী তিন দশকে এই ব্যবধান দ্রুত কমতে শুরু করে। একদিকে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা, অন্যদিকে বোম্বাইয়ের শিল্পায়ন কলকাতার এগিয়ে থাকার ব্যবধানকে প্রতিনিয়ত সংকুচিত করে আনে।
১৯৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীন হয়, তখন দেখা যায় কলকাতা ও বোম্বাইয়ের নিকাশ ঘরের লেনদেনের পরিমাণ প্রায় সমান-সমান পর্যায়ে চলে এসেছে।
অবশেষে ১৯৫০ সালের মধ্যেই বোম্বে ইতিহাস সৃষ্টি করে কলকাতাকে চূড়ান্তভাবে পেছনে ফেলে দেয়! ১৯৫০ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়:
বোম্বাইয়ের হিস্যা: বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫%-এ।
কলকাতার হিস্যা: দ্রুত হ্রাস পেয়ে নেমে আসে ২৮%-এ।
১৯৪৭ সালের পর থেকে দিল্লির হিস্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে। এর অন্যতম কারণ ছিল দেশভাগের পর পাকিস্তান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আসা 'পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক' (PNB) এবং 'ওরিয়েন্টাল ব্যাংক অব কমার্স' (OBC) তাদের প্রধান কার্যালয় দিল্লিতে স্থাপন করে।
পাশাপাশি স্বাধীন ভারতে অপেক্ষাকৃত ছোট শহরগুলোতেও ক্লিয়ারিং হাউজ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ফলে কলকাতার একক আধিপত্য চিরতরে ধূলিস্যাৎ হয়ে যায় এবং বোম্বে ভারতের অবিসংবাদিত নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে।
কলকাতার পতনে বহুমাত্রিক অনুঘটক: কাঠামোগত ও ভূ-রাজনৈতিক কারণসমূহ
কেন এবং কোন কোন কারণে কলকাতা নিজের অর্থনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে পারল না? ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত বিমল সি ঘোষের বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ 'A Study of Indian Money Market' এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক নথি পর্যালোচনা করলে এর পেছনে একাধিক গভীর ও স্পর্শকাতর কারণ উন্মোচিত হয়।
বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয় ও কলকাতা বন্দরের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা
প্রথম ও বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কলকাতার স্থানীয় অর্থনীতি ও অর্থ-বাজারের ওপর এক অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডি নিয়ে এসেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বিমান আক্রমণের আশঙ্কায় এবং মিত্রবাহিনীর সামরিক তৎপরতার কারণে কলকাতা বন্দর দীর্ঘ সময়ের জন্য সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় বা আংশিক সচল রাখা হয়। এর ফলে কলকাতার স্থানীয় অর্থ-বাজার ও ব্যাংকিং খাত ভয়াবহ ধাক্কা খায়।
কলকাতা বন্দরের দুরবস্থার সুযোগটি পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগায় বোম্বে। ভৌগোলিক বিচারে বোম্বে ছিল প্রাকৃতিক বন্দর বা ‘ন্যাচারাল ডিপ-ওয়াটার হারবার’ হওয়ার জন্য শতভাগ উপযুক্ত। পর্তুগিজ শব্দ ‘বোম বাহিয়া’ (Bom Bahia) থেকেই বোম্বে নামের উৎপত্তি, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ভালো উপসাগর’।
এর বিপরীতে কলকাতা বন্দর ছিল বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৮০ মাইল অভ্যন্তরে হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে জাহাজ চালানো, নদীতে পলি জমে যাওয়া এবং পলির জন্য সার্বিক নাব্যতা কমে যাওয়ার কারণে বড় কার্গো জাহাজগুলোর পক্ষে কলকাতা বন্দরে আসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
তদুপরি, ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হওয়ার পর ইউরোপ থেকে আসা সমস্ত জাহাজগুলোর জন্য কলকাতার চেয়ে বোম্বে বন্দরে পৌঁছানো অনেক বেশি সময় ও খরচ সাশ্রয়ী ছিল। ফলে শিপিং ও লজিস্টিকসের খরচ কলকাতায় বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বোম্বাইয়ের দিকে মোড় নেয়।
কৌশলগত রেল সংযোগ ও বিশাল হিলল্যান্ড বা ট্রানজিট বাজার
বোম্বাইয়ের রেল যোগাযোগ কেবল দক্ষিণ বা পশ্চিম ভারতের সাথেই গড়ে ওঠেনি, বরং সেন্ট্রাল ইন্ডিয়া হয়ে ভারতের প্রধান কৃষি উৎপাদনকারী অঞ্চল পাঞ্জাবের সাথেও চমৎকারভাবে যুক্ত হয়েছিল।
পাঞ্জাব থেকে করাচি বন্দর ভৌগোলিকভাবে কাছে হওয়া সত্ত্বেও, বোম্বাইয়ের চমৎকার রেল যোগাযোগ ও সুগঠিত বন্দর ব্যবস্থার কারণে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের সিংহভাগ ব্যবসায়ী তাদের পণ্য পরিবহনের জন্য বোম্বে বন্দরকেই প্রাধান্য দিতেন। কলকাতার রেল যোগাযোগ মূলত পূর্ব ভারতের চা, পাট ও কয়লা বলয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
বাজারের বৈচিত্র্য (Diversification) বনাম একক পণ্যের ওপর নির্ভরতা
যেকোনো টেকসই অর্থনীতির মূল শর্ত হলো পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ বা ডাইভারসিফিকেশন। বোম্বে এই নীতির চমৎকার প্রয়োগ ঘটিয়েছিল। বোম্বেতে গড়ে উঠেছিল তিনটি বিশাল ও অতি গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র বাজার:
স্টক এক্সচেঞ্জ: ১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE) ছিল এশিয়ার প্রাচীনতম শেয়ার বাজার।
তুলা ও কাপড় বাজার: বোম্বাইয়ের সুতি বস্ত্র শিল্প (Textile Mills) ভারতের অভ্যন্তরীণ বস্ত্রের চাহিদা মেটাত।
স্বর্ণ ও বুলিয়ন বাজার: সোনা ও মূল্যবান ধাতুর বিশাল বাণিজ্য কেন্দ্র।
এর বিপরীতে কলকাতার পুরো অর্থনীতি ছিল মূলত একক পণ্য- পাট (Jute) এবং কিছুটা চা ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল। এই পাটের সিংহভাগই আবার প্রক্রিয়াজাত না করে অপরিশোধিত কাঁচামাল হিসেবে বিদেশে রপ্তানি করা হতো।
ফলে বৈশ্বিক বাজারে যখনই পাটের চাহিদা কমে যেত বা মন্দা দেখা দিত, কলকাতার পুরো অর্থনীতি ও মানি মার্কেট তাতেই কেঁপে উঠত। বৈচিত্র্যের অভাব কলকাতার পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
মহাজনী ও স্বদেশী ব্যাংকিং ব্যবস্থার পার্থক্য
বোম্বাইয়ের দেশীয় ব্যাংকার, মহাজন ও প্রথাগত অর্থলগ্নিকারীরা (যেমন: পার্সি, গুজরাটি, মারওয়াড়ি ও ভাটিয়া সম্প্রদায়) প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের সাথে সাথে অত্যন্ত উদার ও নমনীয় মনোভাব পোষণ করতেন। তারা স্থানীয় উদীয়মান ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে পুঁজি সরবরাহ করতেন, ক্রেডিট সুবিধা দিতেন এবং ব্যবসায় ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করতেন।
অপরদিকে, কলকাতার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং পরিচালিত হতো অত্যন্ত আমলাতান্ত্রিক ও ব্রিটিশদের তৈরি করা কঠোর রক্ষণশীল নিয়মে। ফলে কলকাতার স্থানীয় বাঙালি ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় সময়ে পুঁজি ও ব্যাংক ঋণ পেতে ব্যর্থ হতেন, যা তাদের অর্থনৈতিক বিকাশকে স্তব্ধ করে দেয়।
মনস্তাত্ত্বিক ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতির সংকট: মারকোভিটসের তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ
প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক কারণের বাইরে গিয়ে কলকাতার পতনের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক কারণগুলোকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন প্রখ্যাত ফরাসি ঐতিহাসিক ও গবেষক ক্লডি মারকোভিটস (Claude Markovits)। ২০১১ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণা গ্রন্থ 'Premier Industrial Centres: Bombay and Calcutta' গ্রন্থে তিনি দুটি শহরের উদ্যোক্তাদের মানসিকতার এক চমৎকার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন।
মারকোভিটসের মতে, কলকাতার স্থানীয় বাঙালি উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যবসায়ে স্থিতিশীলতা ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার অভাব ছিল। কোনো ব্যবসায় একবার বা দুবার লোকসান হলে কিংবা কোনো উদ্যোগ ব্যর্থ হলে তারা খুব দ্রুতই হাল ছেড়ে দিতেন এবং অর্জিত বাকি মূলধন দিয়ে জমিজমা কেনা বা নিরাপদ ব্যাংকিং আমানতের দিকে ঝুঁকে পড়তেন। ১৯ শতকের 'বাঙালি ভদ্রলোক' সমাজ ব্যবসার চেয়ে চাকরি, আইনচর্চা, শিক্ষকতা, সাহিত্য কিংবা চিকিৎসাসেবার মতো পেশাকে বেশি সম্মানজনক মনে করতে শুরু করে।
মারকোভিটসের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ: বোম্বাইয়ের উদ্যোক্তারা ছিলেন এক অদম্য সহনশীলতার প্রতীক। পার্সি, গুজরাটি, জৈন ও মারওয়াড়ি সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীরা কোনো একটি ব্যবসায় লোকসান করলে হাল ছাড়তেন না। তারা সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুততম সময়ে নতুন আরেকটি ব্যবসায় মূলধন বিনিয়োগ করতেন। ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সম্ভাবনাময় নতুন নতুন শিল্পে অর্থ ঢালতে তাদের কোনো দ্বিধা ছিল না।
বাঙালি উদ্যোক্তাদের এই হাল ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা এবং অন্যদিকে বোম্বাইয়ের ব্যবসায়ীদের অসীম ধৈর্য, পেশাদারিত্ব ও ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাই শেষ পর্যন্ত বোম্বাইকে বাণিজ্যের শীর্ষে নিয়ে যায় এবং কলকাতাকে অর্থনৈতিক দৌড়ে বহুদূরে ফেলে দেয়।
ব্যাংকিং ব্যবস্থার মহা-ধস: ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা
১৯১৫ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যবর্তী সময়কালটি ছিল সমগ্র ভারতের ব্যাংকিং ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকারময় অধ্যায়। এই ৫০ বছরের মধ্যে ভারতে প্রায় ১,৫০০টি ছোট-বড় ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে যায়! কিন্তু এই ব্যাংকিং বিপর্যয়ের সবচেয়ে করুণ ও ভয়াবহ শিকার হয়েছিল তৎকালীন বাংলা।
বাংলায় ব্যাংক বিপর্যয়ের পরিসংখ্যান
সমগ্র ভারতের ১,৫০০টি ব্যাংক বন্ধের মধ্যে কেবল বাংলাতেই দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ৩৬০টি ব্যাংক! যার বিপরীতে একই সময়ে বোম্বেতে বন্ধ হওয়া ব্যাংকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১২৬টি।
এই ব্যাংকিং বিপর্যয় সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৫- এই ১৮ বছরের পরিসংখ্যানে চোখ বুলালে শিউরে উঠতে হয়:
বোম্বেতে বন্ধ হওয়া ব্যাংক: মাত্র ১৩টি।
বাংলায় বন্ধ হওয়া ব্যাংক: অবিশ্বাস্য ১৬৮টি!
কেন ঘটল এই মহা-ধস?
দেশভাগের মারাত্মক প্রভাব: ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্ত হওয়ার পর পূর্ব বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) বিশাল কৃষি অর্থনীতি, পাটের জমি এবং লাখ লাখ আমানতকারী রাতারাতি কলকাতাভিত্তিক ব্যাংকগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কলকাতাভিত্তিক ব্যাংকগুলোর দেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ পূর্ব পাকিস্তানে আটকা পড়ে অনাদায়ী (NPL) হয়ে যায়।
ভুল ব্যবস্থাপনা ও অপেশাদারিত্ব: বোম্বাইয়ের ব্যাংকাররা ছিলেন অত্যন্ত চৌকস, পেশাদার এবং আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ। এর বিপরীতে বাংলার তৎকালীন ব্যাংকাররা সঠিক ক্রেডিট অ্যাসেসমেন্ট ছাড়াই পরিচিতি ও আবেগের ওপর ভিত্তি করে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ করতেন।
আমানতকারীদের আস্থা হারানো: একের পর এক ব্যাংকের দরজায় তালা ঝুলে যাওয়ায় বাংলার সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে চিরতরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। ফলে ব্যাংকে সঞ্চয় জমা হওয়ার বদলে সাধারণ মানুষ টাকা ঘরে জমিয়ে রাখা শুরু করে, যা কলকাতার আর্থিক বাজারের তারল্য বা 'লিকুইডিটি' একবারে শূন্যে নামিয়ে আনে।
কফিনে শেষ পেরেক: রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (RBI) বোম্বাই যাত্রা
কলকাতা থেকে বোম্বেতে অর্থনৈতিক ক্ষমতার চূড়ান্ত স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় এবং প্রাণঘাতী আঘাতটি এসেছিল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক- রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI)-এর প্রধান কার্যালয় বোম্বেতে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে।
১৯১৪-১৯৩৫: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা ও বোম্বাইয়ের প্রবেশ
১৯১৪ সালে বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কিনেস (John Maynard Keynes) এবং স্যার ই. ক্যাবল ভারতে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ঐতিহাসিক মেমোর্যান্ডাম তৈরি করেন। অবাক করা বিষয় হলো, সেই ১৯১৪ সালের প্রস্তাবনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার স্থান হিসেবে দুটি শহরের নাম ভাবা হয়েছিল- ১. কলকাতা এবং ২. দিল্লি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, শুরুতে বোম্বাইয়ের নাম বিবেচকের তালিকাতেই রাখা হয়নি! দিল্লিকে ভাবার কারণ ছিল প্রেসিডেন্সি ব্যাংকগুলোর মধ্যে দিল্লির শাখাটি বেশ স্বাধীনভাবে কাজ করত।
কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৩৫ সালে যখন রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI) গঠনের আইন চূড়ান্ত হয়, তখন বোম্বে অলৌকিকভাবে আবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ফিরে আসে। নীতিনির্ধারকদের কাছে তখন:
কলকাতা বিবেচিত হচ্ছিল ভারতের 'সোনালী অতীত'-এর প্রতীক হিসেবে।
বোম্বে বিবেচিত হচ্ছিল দেশটির সর্বাপেক্ষা 'সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ'-এর প্রতীক হিসেবে।
অবশেষে একটি মধ্যপন্থা অবলম্বন করা হয়। সিদ্ধান্ত হয় কলকাতা এবং বোম্বে- দুই শহর থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যৌথ প্রধান কার্যালয় পরিচালিত হবে। ১৯৩৫ সালের ১ এপ্রিল আরবিআই কাজ শুরু করে এবং যৌথ প্রথার কারণে সেন্ট্রাল বোর্ডের প্রথম ঐতিহাসিক মিটিংটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতাতেই। তৎকালীন আরবিআই গভর্নরদের জন্য কলকাতা ও বোম্বে দুই শহরেই দুটি সুবিশাল সরকারি বাসভবন বরাদ্দ রাখা হয় এবং গভর্নররা দুই শহরে সমান সময় কাটাতেন।
১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্ত এবং ১৯৪৯-এর চূড়ান্ত সমাপ্তি
কিন্তু দুই শহর থেকে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালানো অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৩৭ সালে রিজার্ভ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর স্যার জেমস টেইলর (Sir James Taylor) বোর্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানান যে, প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি কেবল বোম্বেতে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত করা হোক।
তিনি যুক্তি দেখান, দুটি শাখা থাকায় কর্মকর্তা ও ফাইল আদান-প্রদান করতে প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব ঘটছে। টেইলরের পরামর্শ মেনে নিয়ে ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে রিজার্ভ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থায়ীভাবে বোম্বেতে স্থানান্তর করা হয়।
যদিও এরপরও গভর্নররা মাঝেমধ্যে কলকাতায় এসে থাকতেন, কিন্তু ১৯৪৯ সালে তৎকালীন আরবিআই গভর্নর বি. রামা রাউ (B. Rama Rau)-এর অনুরোধে কলকাতার আরবিআই গভর্নরের ঐতিহাসিক বাসভবন 'ক্যালকাটা হাউস' স্থায়ীভাবে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আর এর সাথেই কলকাতার অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের শেষ সামান্যতম আশাটিও চিরতরে ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়।
ঐতিহাসিক তুলনামূলক সারসংক্ষেপ
নিচে একটিমাত্র সমন্বিত সারণীর (Table) মাধ্যমে কলকাতার পতন এবং বোম্বাইয়ের উত্থানের মূল ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত পরামিতিগুলো তুলে ধরা হলো:
ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক পরামিতি | কলকাতা (ক্যালকাটা) | বোম্বে (মুম্বাই) | চূড়ান্ত বিজয়ী ও অর্থনৈতিক প্রভাব |
প্রেসিডেন্সি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠা | ১৮০৬ সাল (ব্যাংক অব বেঙ্গল) | ১৮৪০ সাল (ব্যাংক অব বোম্বে) | প্রাথমিক সূচনায় কলকাতা ৩৪ বছর এগিয়ে ছিল। |
১৯১৩ সালের ক্লিয়ারিং শেয়ার | ৫১% (ভারতের নিকাশ ঘরের অর্ধেকের বেশি) | ৩৩.৭% | ১৯১৩ সাল পর্যন্ত কলকাতা ছিল ব্যাংকিংয়ের প্রধান কেন্দ্র। |
১৯৫০ সালের ক্লিয়ারিং শেয়ার | ২৮%-এ অবমন | ৩৫%-এ উন্নীত | ১৯৫০ সালে বোম্বে প্রথমবার কলকাতাকে টপকে শীর্ষে যায়। |
কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ (১৯১৮) | স্টার্লিং কোম্পানির ৭৩% হস্তগত | স্টার্লিং কোম্পানি মাত্র ১৯% | বিদেশী চা, পাট ও কয়লা শিল্পে কলকাতা এগিয়ে ছিল। |
মাথাপিছু গচ্ছিত আমানত | নিম্ন (জনসংখ্যা বেশি, আমানতকারী বেশি হলেও আয় কম) | ৪ গুণ বেশি (ব্যাংক অব বেঙ্গলের তুলনায়) | সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতায় বোম্বে সেরা ছিল। |
বন্দর ও লজিস্টিক সুবিধা | নদী বন্দর (হুগলি নদীর ৮০ মাইল ভেতরে, নাব্যতা সংকট) | প্রাকৃতিক গভীর উপসাগর (সুয়েজ খালের কাছে, সাশ্রয়ী) | আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে বোম্বেতে স্থানান্তরিত হয়। |
শিল্পের বৈচিত্র্যকরণ | একক পণ্য নির্ভর (প্রধানত পাট, কিছুটা চা ও কয়লা) | বহুমুখী (সুতি বস্ত্র, স্বর্ণ/বুলিয়ন ও শেয়ার বাজার) | বাজার মন্দায় বোম্বাইয়ের অর্থনীতি নিরাপদ ও সুরক্ষিত ছিল। |
উদ্যোক্তা সংস্কৃতি | ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা, ব্যর্থতায় দ্রুত হাল ছেড়ে দেওয়া | অসীম ধৈর্য, নতুন বিনিয়োগে উচ্চ ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা | বোম্বাইয়ের ব্যবসায়ীরা কর্পোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। |
ব্যাংক বিপর্যয় (১৯১৫-৬৫) | ৩৬০টি ব্যাংক দেউলিয়া (দেশভাগের পর ১৬৮টি) | ১২৬টি ব্যাংক দেউলিয়া (দেশভাগের পর মাত্র ১৩টি) | বাংলার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর জনগণ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। |
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI) | ১৯৩৫ সালে যৌথ সদর দপ্তর; ১৯৪৯-এ বাসস্থান বিক্রি | ১৯৩৭ সালে স্থায়ী প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরিত | বোম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের একমাত্র অর্থনৈতিক রাজধানী হয়। |
'ফ্রেইট ইকুয়ালাইজেশন পলিসি' (১৯৫২): নীতিগত সিদ্ধান্তে পূর্ব ভারতের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়া
স্বাধীনতার পর ১৯৫২ সালে ভারত সরকার 'ফ্রেইট ইকুয়ালাইজেশন পলিসি' (Freight Equalization Policy) বা পণ্য পরিবহন মাশুল সমতাকরণ নীতি চালু করে। কলকাতার তথা সমগ্র পূর্ব ভারতের (পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড) অর্থনৈতিক পতনের পেছনে এই নীতিটিকে সবচেয়ে ক্ষতিকর ও আত্মঘাতী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নীতিটি কী ছিল? এই নীতির আওতায় পুরো ভারতে লোহা, ইস্পাত, কয়লা ও সিমেন্টের মতো প্রাথমিক শিল্প কাঁচামালের পরিবহন মাশুল সরকার সমতাভিত্তিক করে দেয়। এর অর্থ দাঁড়ায় কয়লা বা লোহা খনি থেকে ১০০০ কিলোমিটার দূরে বোম্বে বা চেন্নাইতে যে দামে পৌঁছাবে, খনির একেবারে পাশে অবস্থিত কলকাতাতেও একই দামে পাওয়া যাবে!
পূর্ব ভারতের প্রাকৃতিক সুবিধা হরণ: পূর্ব ভারতের প্রাকৃতিক সুবিধা ছিল এর অঢেল খনিজ সম্পদ। এই নীতির ফলে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের শিল্পপতিরা খনির কাছাকাছি কারখানা স্থাপন না করেই সস্তায় লোহা ও কয়লা পেতে শুরু করেন।
একতরফা বৈষম্য: বিস্ময়কর বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় সরকার লোহা ও কয়লার পরিবহন ভাড়ায় সমতা আনলেও, পশ্চিম ভারতের তুলা বা বস্ত্রের (Cotton) ওপর কিন্তু কোনো পরিবহন সমতা নীতি চালু করেনি! ফলে বোম্বাইয়ের বস্ত্র শিল্প যেমন সুরক্ষিত থাকে, তেমনি পূর্ব ভারতের ভারী প্রকৌশল শিল্প তার প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারায়। এর সরাসরি সুফল পায় বোম্বে ও গুজরাট অঞ্চল।
দেশভাগ ও পাট শিল্পের আত্মঘাতী 'র মেটেরিয়াল ক্রাইসিস'
১৯৪৭ সালের দেশভাগ কেবল বাংলা ভূখণ্ডকে দুই ভাগ করেনি, বরং কলকাতার শিল্পের মূল চালিকাশক্তি পাট শিল্পকে (Jute Industry) এক অভূতপূর্ব সংকটে ফেলে দিয়েছিল।
উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিচ্ছিন্নতা: অবিভক্ত ভারতের মোট পাটচাষের প্রায় ৮০% জমি পড়ে যায় তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ)। কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ১০০% পাটকল রয়ে যায় কলকাতার হুগলি নদীর দুই তীরে।
বাণিজ্যে অচলাবস্থা: দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে কাঁচাপাট সীমান্তে আটকে যায়। কলকাতা বন্দর ও পাটকলগুলো কাঁচামালের তীব্র সংকটে পড়ে। পাটকলগুলোতে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারান এবং কলকাতার মূল মূলধনী আয় এক ধাক্কায় বহু নিচে নেমে যায়। এর বিপরীতে বোম্বাইয়ের বস্ত্র শিল্প ছিল সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ তুলা উৎপাদনের ওপর নির্ভর, যার ফলে সেখানে কোনো কাঁচামাল সংকট তৈরি হয়নি।
‘ক্যাপিটাল ফ্লাইট’ (Capital Flight) ও কর্পোরেট সদর দপ্তরের গণপ্রস্থান
১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৭০ ও ৮০-এর দশক পর্যন্ত কলকাতায় যে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা, নকশালবাড়ি আন্দোলন এবং উগ্র ট্রেড ইউনিয়নবাদ বা ‘ঘেরাও’ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা শহরের অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপর্যয় ডেকে আনে।
প্রধান কর্পোরেট হাউজের প্রস্থান
একসময় ভারতের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী- যেমন টাটা (Tata Group), বিড়লা (Birla Group), গোয়েঙ্কা (RPG), আইসিআই (ICI), ডানলপ (Dunlop) এবং ব্রুক বন্ড (Brooke Bond)-এর মূল কর্পোরেট দপ্তর ছিল কলকাতায়।
কিন্তু ঘন ঘন স্ট্রাইক, কারখানা বন্ধ (Lockout) এবং শিল্পপতি ও ম্যানেজারদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপের কারণে কোম্পানিগুলো তাদের হেডকোয়ার্টার কলকাতা থেকে সরিয়ে বোম্বে, দিল্লি বা ব্যাঙ্গালোরে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
টাটা গ্রুপের স্থানান্তর: টাটা আয়রন অ্যান্ড স্টিল (TISCO) এবং টাটা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রধান বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্থান কলকাতা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে যায় মুম্বাইয়ের 'বোম্বে হাউসে'।
কর রাজস্বের ক্ষতি: একটি বড় কোম্পানির সদর দপ্তর যেখানে থাকে, সেই শহর কোম্পানি কর (Corporate Tax) এবং অর্থনৈতিক পরিষেবার প্রধান লাভবান হয়। কর্পোরেট সদর দপ্তরগুলোর মুম্বাইযাত্রার ফলে কলকাতা প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাতে থাকে।
আধুনিক অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর বোম্বে কেন্দ্রিকতা
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI) ১৯৩৭ সালে স্থায়ীভাবে বোম্বেতে স্থানান্তরিত হওয়ার পর, ভারতের নতুন ও আধুনিক আর্থিক বাজার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রাকৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বোম্বেকেই বেছে নেওয়া হয়।
জাতীয় অর্থবাজারের আধুনিক কেন্দ্রবিন্দু (মুম্বাই)
├─ SEBI (Securities and Exchange Board of India) - ১৯৮৮/১৯৯২
├─ NSE (National Stock Exchange) - ১৯৯২
├─ NABARD & UTI - ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের শীর্ষ ভবনসমূহ
└─ DII / Foreign Institutional Investors (FII) - বৈশ্বিক বিনিয়োগের কেন্দ্র
ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE): ১৯৯২ সালে যখন আধুনিক, কম্পিউটারভিত্তিক ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তা গড়ে ওঠে মুম্বাইয়ে। কলকাতার ‘ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ’ (CSE) আধুনিক প্রযুক্তির সাথে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হয়ে ধীরে ধীরে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।
সেবি (SEBI): ভারতের পুঁজিবাজারের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা 'সেবি'-র সদর দপ্তর মুম্বাইয়ে স্থাপন করা হয়।
বিদেশী সংস্থাগত বিনিয়োগকারী (FII): ১৯৯০-এর দশকে ভারতের অর্থনীতি যখন মুক্ত বাজারের দিকে পা বাড়ায় (Liberalization), তখন সমস্ত বৈশ্বিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (যেমন: Goldman Sachs, Morgan Stanley, J.P. Morgan) তাদের ভারতীয় অফিস গড়ে তোলে মুম্বাইয়ে। কলকাতা আন্তর্জাতিক ফিনান্সের এই নতুন ধারায় কোনো পজিশনই নিতে পারেনি।
আইটি ও সার্ভিস সেক্টর বিপ্লব: যুগের পরিবর্তনের মোড় ধরতে ব্যর্থতা
১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে যখন বিশ্বে প্রযুক্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তখন ভারতের অর্থনীতিতে আরেকটি নতুন মোড় আসে। তা হলো- পরিষেবা খাত (Service Sector) এবং তথ্যপ্রযুক্তি (IT Boom)।
নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের গতিপথ
├─ বোম্বে / ব্যাঙ্গালোর / হায়দ্রাবাদ ─► প্রযুক্তিবান্ধব নীতি ─► বিপুল বৈশ্বিক পুঁজি ও কর্মসংস্থান
└─ কলকাতা / পশ্চিমবঙ্গ ─► প্রযুক্তির প্রাথমিক বিরোধিতা ─► আইটি বিপ্লব থেকে ছিটকে পড়া
কম্পিউটারাইজেশনের প্রাথমিক বিরোধিতা: ১৯৮০-এর দশকে কলকাতায় ব্যাংকিং ও সরকারি দপ্তরে কম্পিউটার চালুর বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও ধর্মঘট সংগঠিত হয়েছিল। এর মূল যুক্তি ছিল- কম্পিউটার এলে মানুষের চাকরি চলে যাবে।
ভুল সিগন্যাল: এই অটোমেশন-বিরোধী মানসিকতা বৈশ্বিক আইটি ও সার্ভিস খাতের জায়ান্টদের কাছে অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা পাঠায়।
অন্যান্য শহরের উত্থান: যখন ব্যাঙ্গালোর, হায়দ্রাবাদ, পুনে এবং বোম্বে-পুনে বেল্ট বিশ্বমানের আইটি পার্ক গড়ে তুলে বিদেশী আইটি ফার্মগুলোকে আকর্ষণ করছিল, কলকাতা তখন সেই ট্রেনটি মিস করে। পরবর্তীকালে সল্টলেক সেক্টর ফাইভ বা রাজারহাটে আইটি হাব গড়ে তোলা হলেও, ততদিনে মুম্বাই ও দক্ষিণ ভারত অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিল।
মুম্বাইয়ের সাম্রাজ্য বনাম কলকাতার পুনরুজ্জীবনের লড়াই
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বোম্বে (মুম্বাই) কেবল ভারতের আর্থিক রাজধানীই নয়, এটি বিশ্বের উদীয়মান ফিনান্সিয়াল হাবগুলোর একটি।
বিষয় | মুম্বাই (বর্তমান) | কলকাতা (বর্তমান) |
জিডিপি অবদান (GDP) | ভারতের শহরগুলোর মধ্যে ১ম (প্রায় ৩১০+ বিলিয়ন ডলার) | ভারতের মধ্যে ৩য়/৪র্থ স্থান (প্রায় ১৫০+ বিলিয়ন ডলার) |
প্রধান শিল্প ভিত্তি | ফাইন্যান্স, শেয়ার বাজার, মিডিয়া, অটোমোবাইল, আইটি, বহুজাতিক করপোরেট | আইটি/আইটিইএস, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME), চামড়া, চা ও টেক্সটাইল |
ভবিষ্যত পরিকল্পনা | মুম্বাই ট্রান্স হারবার লিংক, গিফ্ট সিটি কানেক্টিভিটি, আধুনিক ফিনটেক হাব | ইস্টার্ন ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডোর, লজিস্টিকস ও স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেম |
কলকাতার পুনরুত্থানের সম্ভাবনা
যদিও কলকাতা তার পুরানো অর্থনৈতিক মসনদ পুরোপুরি ফেরত পাবে না, কিন্তু গত এক দশকে শহরের অবকাঠামো ও কৌশলে কিছু পরিবর্তন এসেছে:
লজিস্টিকস হাব: ভারতের 'অ্যাক্ট ইস্ট' (Act East) নীতির কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (ASEAN) এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বাণিজ্যের জন্য কলকাতা আবার একটি গুরুত্বপূর্ণGateway বা প্রবেশদ্বার হয়ে উঠছে।
এমএসএমই (MSME) খাত: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংযোগ ও হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে ভারতের অন্যতম শীর্ষ রাজ্য।
স্টার্ট-আপ ইকোসিস্টেম: ফিনটেক ও তথ্যপ্রযুক্তিতে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা কলকাতায় আবার কম খরচে কাজ করার সুযোগ খুঁজে পাচ্ছেন।
ইতিহাসের শিক্ষা ও কলকাতার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের ভাবনা
কলকাতা থেকে ভারতের রাজনৈতিক রাজধানী নয়া দিল্লিতে স্থানান্তরের ঘটনাটি (১৯১১ সাল) ছিল কলকাতার প্রশাসনিক ক্ষমতার জন্য এক বড় ধাক্কা। তবে ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক রাজধানী হারানোর চেয়েও কলকাতার জন্য শতগুণ বেশি মারাত্মক ও ক্ষতিকারক আঘাত ছিল বোম্বাইয়ের কাছে নিজেদের অর্থনৈতিক আধিপত্য ও বাণিজ্যিক একচ্ছত্র অধিকার হারিয়ে ফেলা।
কলকাতার এই ঐতিহাসিক পতন আমাদের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার কিছু চিরন্তন সত্য শেখায়- যে ধাক্কা ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে কলকাতা খেয়েছিল, গত সাত-আট দশকেও তা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি শহরটি। পাটের বাজারের বিশ্বব্যাপী পতন, দেশভাগের আঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক অসন্তোষ এবং সর্বোপরি ব্যাংকিং কাঠামোর দেউলিয়াত্ব শহরটির সম্ভাবনাকে দীর্ঘদিন বন্দি করে রেখেছিল।
তবে ইতিহাস কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না; ইতিহাসের চাকা সর্বদা ঘূর্ণায়মান। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তি, বিশ্বমানের পরিকাঠামো নির্মাণ, স্টার্ট-আপ সংস্কৃতি এবং সঠিক বাণিজ্যিক নীতি গ্রহণ করতে পারলে কলকাতা হয়তো তাঁর হারানো রাজমুকুট পুরোপুরি ফেরত পাবে না, কিন্তু ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্রে আবারও নিজেদের এক অনিবার্য ও শক্তিশালী পরাশক্তি হিসেবে পুনপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার সেই আশাই বেঁচে থাক প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।




















