চট্টগ্রামের একমাত্র জীবিত রাজকন্যা ছবি ধর – চট্টগ্রামের হারানো ঐতিহ্য

চট্টগ্রামের একমাত্র জীবিত রাজকন্যা ছবি ধর – চট্টগ্রামের হারানো ঐতিহ্য

বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ‘জমিদার প্রথা’ এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। আঠারো শতকের শেষভাগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে যেসব জমিদার পরিবারের বিকাশ ঘটেছিল, তারা কেবল ভূমির স্বত্বাধিকারীই ছিলেন না; বরং শিক্ষা, সাহিত্য, ধর্মীয় উন্মেষ এবং পরোপকারে স্থানীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন। পূর্ববঙ্গের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী জনপদ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা রামধন জমিদার বাড়ি (যা স্থানীয়ভাবে সর্বজনবিদিত "ধরের বাড়ি" নামে পরিচিত) ঠিক তেমনই এক সোনালী অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী।

একসময় যে বাড়িটিতে শতেক দাস-দাসী, সোনা-রূপার পাত্রে ভোজন এবং প্রতিদিন শত শত অভ্যাগতদের আপ্যায়নের রাজকীয় কোলাহল ছিল, আজ তা গভীর সুনসান নীরবতায় আচ্ছন্ন। রামধন জমিদার বাড়ির প্রতিটি প্রাচীন ইট, পলেস্তারা-খসে-পড়া দেয়াল, শেওলাযুক্ত মঠ, বিশাল দীঘি এবং অন্দরমহল অতীতের সেই রাজকীয় বিলাসিতা ও সমাজসেবার গল্প কানে কানে ফিসফিস করে বলে যায়।

এই সুবিশাল ইতিহাসের শেষ ধূপশিখা হয়ে আজও প্রাচীন স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন ৮৬ বছর বয়সী ছবি ধর। তিনি কেবল রামধন ধরের উত্তরাধিকারী নন; বরং প্রতাপশালী জমিদারি ঐতিহ্যের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একমাত্র জীবিত রাজকন্যা। পরিবারের সবাই যখন জীবিকার প্রয়োজনে কিংবা কালের নিয়মে ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন শহরের কোলাহলে, তখন অভাব-অনটন, একাকীত্ব ও জীর্ণতার সাথে লড়াই করে এই ঐতিহাসিক বাস্তুভিটা আগলে রেখেছেন তিনি।

রামধন জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠাতা

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ডাবুয়া গ্রামের সমৃদ্ধি ও লোকালয় গঠনের মূলে ছিল এই ‘ধরের বাড়ি’। জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূস্বামী ও মানবদরদী পুরুষ জমিদার রামধন ধর

প্রতিষ্ঠাতা রামধন ধরের প্রারম্ভিক জীবন: জমিদার রামধন ধরের জন্ম, প্রারম্ভিক জীবন ও মূল উৎস সম্পর্কে লিখিত ইতিহাস বেশ দুষ্প্রাপ্য। তবে স্থানীয় জনশ্রুতি, প্রবীণদের মুখে মুখে মুখে ফেরা গল্প এবং প্রাচীন নথি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, আঠারো শতকের শেষভাগে বা উনিশ শতকের শুরুর দিকে তিনি এ অঞ্চলে তাঁর প্রভাব বিস্তার করেন। রামধন ধর কেবল রাজস্ব আদায়কারী কঠোর শাসক ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন দূরদর্শী সমাজ সংগঠক।

উত্তরসূরি নির্ধারণ-কনিষ্ঠ ভাই ও পালক পুত্র: জমিদার রামধন ধর ব্যক্তিগত জীবনে নিঃসন্তান ছিলেন। ফলে নিজের তৈরি বিশাল রাজ্য ও পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারা বজায় রাখতে তিনি তাঁর কনিষ্ঠ ভাই রামগতি ধর-এর পরিবার থেকে কেশব চন্দ্র ধর-কে পালক পুত্র (পোষ্যপুত্র) হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তাঁকেই উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেন।

রামধন ধরের প্রয়াণের পর দুই ভাই কেশব চন্দ্র ধর ও রামগতি ধর যৌথভাবে জমিদারি তদারকি শুরু করেন। পরবর্তীতে কেশব চন্দ্র ধর জমিদারির পূর্ণ দণ্ড হাতে নেন। কেশব চন্দ্র কেবল পিতার ভিটেমাটিই রক্ষা করেননি, বরং চট্টগ্রাম শহর ও রাউজানের বিভিন্ন প্রান্তে জমিদারির সীমানা বহুগুণ প্রসারিত করেন।

লোককল্যাণ ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের মহাকাব্য

রামধন জমিদার পরিবারের অবদান কেবল তাদের নিজস্ব রাজপ্রাসাদের চারদেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাধারণ প্রজা ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে তাদের অকাতরে দান আজ শতবর্ষ পরেও এই অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।

১. ডাবুয়া জগন্নাথ হাট: স্থানীয় অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে জমিদার পরিবার ডাবুয়া গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী ‘জগন্নাথ হাট’। এই হাট তৎকালীন রাউজান ও পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বারের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা কেনাবেচা করতে আসতেন।

২. রাউজান আর আর এসি মডেল হাই স্কুল: রাউজানের শিক্ষার মশাল জ্বালাতে যে কয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল, তার মধ্যে রাউজান আর আর এসি (রামরতন রামধন আবদাল চৌধুরী) মডেল হাই স্কুল অন্যতম। শিক্ষার প্রসারে জমি ও মোটা অঙ্কের আর্থিক অনুদান দিয়ে এই বিদ্যাপীঠ গঠনে রামধন জমিদার পরিবার অগ্রণী অবদান রেখেছিল।

৩. প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা অবকাঠামো: এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে পরিবারটি চিকদাইর পুলিশ ফাঁড়ি প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি দান করে। এছাড়া বর্তমান ডাবুয়া ইউনিয়ন পরিষদ ভবন যে ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাও রামধন জমিদার পরিবারের দানকৃত সম্পত্তি।

৪. ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক স্থাপনা: গ্রামের অধিবাসীদের পানীয় জলের কষ্ট দূর করতে জমিদার বাড়ির আশপাশে একাধিক সুবিশাল দীঘি ও পুকুর খনন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন মঠ, সর্বজনীন নাটমন্দির ও দুর্গা মন্দির নির্মাণ করা হয়, যেখানে দুর্গাপূজা ও বাসন্তী পূজায় হাজার হাজার প্রজার সমাগম হতো।

অতীত জৌলুশ, বিলাসিতা ও কিংবদন্তীতুল্য রাজকীয় জীবন

রামধন জমিদার বাড়ির সোনালী দিনগুলোর গল্প শুনলে মনে হয় যেন কোনো আরব্য রজনীর রূপকথা। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণ ও রাজকন্যা ছবি ধরের বর্ণনা থেকে সে যুগের রাজকীয় বিলাসিতার এক অবিশ্বাস্য চিত্র ফুটে ওঠে।

রাজকীয় অতিথি পরায়নতা ও নিত্যভোজ: জমিদার বাড়িতে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ জন মানুষের রান্না হতো। অতিথি, পথচারী, প্রজাবৃন্দ এবং বাড়ির শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এই বিশাল ভোজের আয়োজন ছিল এক নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনা।

সোনালী ও রূপালী থালা-বাসন: জমিদার পরিবারের সদস্যরা এবং তাদের বিশিষ্ট অতিথিরা সাধারণ মাটির বা পিতলের পাত্রে খাবার খেতেন না। তাঁদের দৈনন্দিন আহার পরিবেশন করা হতো খাঁটি রূপা ও সোনা দিয়ে তৈরি থালা-বাসনে। বাড়ির মূল্যবান আসবাবপত্র, খাট, সিন্দুক ও সোফা আনা হয়েছিল সূদূর বার্মা (মিয়ানমার) ও কলকাতা থেকে, যা ছিল দুর্লভ মূল্যবান কাঠ ও ধাতুর সমন্বয়ে তৈরি।

প্রজাবাৎসল্য ও ব্যতিক্রমী খাজনা আদায় প্রথা: তৎকালীন সময়ে অনেক জমিদার প্রজাদের ওপর অত্যাচার করলেও রামধন ধর ও কেশব চন্দ্র ধরের প্রথা ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দূর-দূরান্ত থেকে যেসব প্রজা বা পাইক-পেয়াদা খাজনা দিতে আসত, তাদের খালি মুখে ফিরিয়ে দেওয়া হতো না। খাজনা পরিশোধের পর জমিদার বাড়ি থেকে তাদের বিদায় বেলায় উপহার হিসেবে দেওয়া হতো:

এক জোড়া তাজা নারকেল
এক বিড়া পান
মিষ্টি ও বাতাসা

অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী: বাড়িটির মূল কাঠামোর মধ্যে ছিল বিশাল বৈঠকখানা, অন্দরমহল, রাজকীয় নহবতখানা (যেখান থেকে প্রতিদিন প্রহরে প্রহরে বাদ্য বাজানো হতো), শানবাঁধানো পুকুরঘাট এবং একাধিক উঠান। ইন্দো-সারাসেনিক ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের মিশ্রণে তৈরি বিশাল বিশাল খিলান ও পিলারে সমৃদ্ধ ছিল এই প্রাসাদ।

জমিদারি প্রথার অবলুপ্তি ও রামধন পরিবারের পতনের কালরেখা

কোনো মহীয়সী স্থাপত্য বা রাজবংশই কালের নিষ্ঠুর নিয়মকে এড়াতে পারে না। রামধন জমিদার বাড়ির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে এই পরিবারের ভাগ্যের চাকা দ্রুত বদলে যেতে থাকে।

জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি আইন (১৯৫০-১৯৫৭)

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫০ সালে 'জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন' (East Bengal State Acquisition and Tenancy Act of 1950) পাস হয়। তবে তা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হতে হতে ১৯৫৭ সাল লেগে যায়। এই আইন পাসের মাধ্যমে শত বছরের পুরনো জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটে। জমিদারদের নিজস্ব জোতজমি বাদে সমস্ত প্রজা-সম্পত্তি সরকারের খাস জমিতে পরিণত হয়।

অভিভাবক কেশব চন্দ্র ধরের মৃত্যু (১৯৫৫)

জমিদারি প্রথা চূড়ান্তভাবে বিলুপ্ত হওয়ার ঠিক দুই বছর আগে, ১৯৫৫ সালে মারা যান জমিদার কেশব চন্দ্র ধর। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে পরিবারটি এক বিশাল অভিভাবকহীনতার মুখে পড়ে। কেশব চন্দ্রের প্রয়াণ এবং জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ—এই দুই ধাক্কা রামধন পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।

চট্টগ্রাম শহরের ৫৪টি বিল্ডিং ও সম্পত্তি হাতছাড়া

ছবি ধরের দেয়া তথ্যমতে, তাঁর পিতা কেশব চন্দ্র ধরের নামে চট্টগ্রাম শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে (যেমন: কোতোয়ালী, আন্দরকিল্লা, চকবাজার) প্রায় ৫৪টি বহুতল ভবন ও মূল্যবান ভূ-সম্পত্তি ছিল। কিন্তু জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর রাজকীয় আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, সঠিক তদারকির অভাব এবং অভ্যন্তরীণ আইনি জটিলতায় এই বিশাল সম্পত্তির প্রায় পুরোটাই হাতছাড়া হয়ে যায়।

কর্মচারীরা একে একে কাজ ছেড়ে চলে যায়, রক্ষীদের পাহারার বদলে বাড়িতে নামে নির্জনতা। এককালের বিপুল প্রতাপশালী রাজপরিবারটি রাতারাতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে পরিণত হয়।

রাজকন্যা ছবি ধর: একা দাঁড়িয়ে থাকা ৮৬ বছরের করুণ রূপকথা

রামধন জমিদার বাড়ির সবচেয়ে করুণ, অথচ সবচেয়ে সহনশীল চরিত্রটির নাম ছবি ধর। ৮৬ বছর বয়সী এই নারী জমিদারি যুগের শেষ জীবন্ত স্মারক, যাঁর রক্তে বইছে তৎকালীন রাজবংশের ঐতিহ্য।

শৈশবের স্মৃতি ও বর্তমানের রুক্ষ বাস্তবতার বৈপরীত্য: ছবি ধর তাঁর বাল্যকালে দেখেছেন জমিদারি প্রথার শেষ জৌলুশ। দেখেছেন রৌপ্যপাত্রে খাবার পরিবেশন, দাস-দাসীর তটস্থ থাকা আর গমগম করা অন্দরমহল। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি দাঁড়িয়েছেন নির্মম এক বাস্তবতার সামনে। যে বাড়িতে একসময় উৎসবের ঢল নামত, আজ সেখানে তিনি জীর্ণ এক কোণে বাস করেন।

চিরকুমারী থাকার সিদ্ধান্ত ও ভিটে আঁকড়ে বেঁচে থাকা: ছবি ধর জীবনে কখনো বিয়ে করেননি। যখন পরিবারের অন্যান্য ভাই ও স্বজনেরা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে জীবন ও জীবিকার সন্ধানে নগরমুখী হতে শুরু করেন এবং একে একে ভিটেমাটি ত্যাগ করেন, তখন ছবি ধর সিদ্ধান্ত নেন তিনি এই পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। তিনি বলেন:

"এখন আর কেউ নেই। সবাই চলে গেছে। শহরের ভিড়ে সবাই নিজেদের মতো গুছিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আমি যদি চলে যাই, তবে আমার বাপদাদাদের তৈরি এই বাড়িকে মনে রাখবে কে? আমি শুধু এই বাড়ির স্মৃতিগুলো পাহারা দিয়ে বেঁচে আছি।"

বর্তমান দৈন্যদশা ও টিকে থাকার সংগ্রাম

বর্তমানে ছবি ধর অভাব-অনটনের মাঝে দিন কাটাচ্ছেন। অতীতের সেই স্বর্ণ-রূপার পাত্র অনেক আগেই সংসারের প্রয়োজনে ও সময়ের পরিক্রমায় হাতছাড়া হয়ে গেছে। বর্তমানে বাড়ির যে অংশটিতে ভাঙা পলেস্তারা ও খসে পড়া কড়িকাঠের নিচে তিনি থাকেন, সেখানে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। তাঁর সঙ্গে পরিবারের কিছু ভাইপো-নাতি বসবাস করলেও মূল জমিদার বাড়ির সিংহভাগই আজ এক নীরব বিষাদময় ভূতুড়ে রূপ ধারণ করেছে।

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে স্থপতি ঐতিহ্য: বর্তমান ভৌতিক অবস্থা

আজকের রামধন জমিদার বাড়ির দিকে তাকালে চোখ ভিজে ওঠে। শতাব্দীর অবহেলা, সংস্কারের অভাব এবং সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের অভাবে এই স্থাপত্যটি আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

কাঠামোগত বিনাশ: প্রাসাদের সুবিশাল দেয়ালগুলোতে ধরেছে দীর্ঘ ফাটল। চুনা-সুরকির পলেস্তারা খসে পড়ে বেরিয়ে এসেছে লাল ইট। প্রাসাদের প্রাচীন কাঠের কড়িকাঠগুলোতে উইপোকা ধরেছে, ছাদ চুয়ে পানি পড়ে মেঝে নষ্ট হচ্ছে।

আগাছা ও প্রকৃতির গ্রাস: বাড়িটির বাইরের দেয়াল ও উঁচু মঠগুলোতে জমেছে ঘন কালো শেওলা। বট ও পাকুড় গাছের শিকড় দেয়ালের গভীরে সেঁধিয়ে গিয়ে মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বৈঠকখানা ও অন্দরমহল যা একসময় কোলাহলপূর্ণ ছিল, তা আজ ঝোপঝাড় ও বুনো লতাপাতায় ঢেকে গেছে।

উদযাপনের কদাচিৎ ক্ষণিক আলো: সারা বছর জনমানবহীন ও ভূতুড়ে পরিবেশ থাকলেও দুর্গাপূজা বা বিশেষ কোনো পারিবারিক সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রবাসী ও শহরে থাকা স্বজনেরা ক্ষণিকের জন্য এই বাড়িতে মিলিত হন। পূজা শেষ হলে আবার নেমে আসে নিস্তব্ধ নীরবতা।

একনজরে রামধন জমিদার বাড়ি ও পরিবারের সামগ্রিক বিবরণী

পাঠকদের সুবিধার্থে রামধন জমিদার বাড়ির সামগ্রিক ইতিহাস, অবদান ও বর্তমান অবস্থা নিচে একটি সংক্ষিপ্ত সারণীর (Table) মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

বিষয়/বিষয়শ্রেণী

বিস্তারিত বিবরণ

স্থাপনার নাম

রামধন জমিদার বাড়ি (স্থানীয় নাম: "ধরের বাড়ি")।

ভৌগোলিক অবস্থান

গ্রাম: ডাবুয়া, ইউনিয়ন: ডাবুয়া, উপজেলা: রাউজান, জেলা: চট্টগ্রাম।

প্রতিষ্ঠাতা ও সময়কাল

জমিদার রামধন ধর (আঠারো শতকের শেষ / উনিশ শতকের শুরু)।

প্রখ্যাত উত্তরসূরি

জমিদার কেশব চন্দ্র ধর (পালক পুত্র) ও রামগতি ধর।

শেষ জীবিত উত্তরাধিকারী

রাজকন্যা ছবি ধর (বয়স: ৮৬ বছর, কেশব চন্দ্রের কন্যা)।

সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদান

ডাবুয়া জগন্নাথ হাট, ডাবুয়া ইউপি ভবন, চিকদাইর পুলিশ ফাঁড়ি, রাউজান আর আর এসি মডেল হাই স্কুল।

অতীত জৌলুশের চিত্র

সোনা-রূপার পাত্রে ভোজন, প্রতিদিন ৩০০-৪০০ মানুষের রান্নাবান্না, শতাধিক কর্মচারী, প্রজাদের নারকেল-পান উপহার।

অফসাইড ভূ-সম্পত্তি

চট্টগ্রাম শহরে পিতা কেশব চন্দ্র ধরের নামে ছিল প্রায় ৫৪টি বহুতল ভবন (বর্তমানে হাতছাড়া)।

পতনের মূল কারণ

১৯৫৫ সালে কেশব চন্দ্রের মৃত্যু এবং ১৯৫৭ সালে 'জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি আইন' কার্যকর হওয়া।

বর্তমান অবস্থা

চরম সংস্কারহীন, শেওলা-আগাছায় পূর্ণ ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক কাঠামো; প্রত্নতাত্ত্বিক সুরক্ষার অভাব।

সংরক্ষণের তাগিদ: ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার আকুল আহ্বান

রাউজানের রামধন জমিদার বাড়িটি কেবল ইট-পাথরের একটি জীর্ণ কঙ্কাল নয়; এটি স্বাধীন পূর্ববঙ্গ তথা আধুনিক বাংলাদেশের সামাজিক রূপান্তরের এক জ্বলন্ত দলিল। এটি এমন এক স্মারক, যা আমাদের অতীত সামন্তবাদী শাসন ব্যবস্থা, জমিদারদের শিল্পরসিকতা এবং একই সাথে জনকল্যাণমূলক মানসিকতার পরিচয় বহন করে।

প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ ও ঐতিহ্য ঘোষণা: বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের (Department of Archaeology) অবিলম্বে এই ঐতিহাসিক বাড়িকে জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। সরকারি অধিগ্রহণ অথবা যৌথ তদারকির মাধ্যমে এটিকে সংস্কার করলে এটি হতে পারে চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান পর্যটন ও গবেষণা কেন্দ্র।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পাঠশালা: বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও স্থাপত্যবিদ্যার গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য এই বাড়িটি এক অনন্য গবেষণার ক্ষেত্র হতে পারে। কীভাবে উনিশ শতকের গ্রামীণ স্থাপত্য গড়ে উঠত, তার স্বচক্ষে পাঠ মিলবে এই ধ্বংসাবশেষে।

শেষ রাজকন্যা ছবি ধরের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: ৮৬ বছর বয়সে যিনি শত অভাব সত্ত্বেও পূর্বপুরুষের ভিটে আগলে বসে আছেন, সেই ছবি ধরের প্রতি রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া উচিত। তাঁর শেষ জীবনের চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

এক রূপকথার শেষ অধ্যায়

"ইতিহাস যদি আমরা ভুলে যাই, তবে আমাদের অস্তিত্বের শিকড়ও একদিন মুছে যাবে।"

রামধন জমিদার বাড়ি আজ সেই নিঃশব্দ সতর্কবার্তা দিচ্ছে। জীর্ণ প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ৮৬ বছরের বৃদ্ধা ছবি ধর যখন দূর দিগন্তের দিকে তাকান, তখন তাঁর চোখে জল থাকে না; থাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও অভিমান। যে জৌলুশ একসময় হাজারো মানুষকে আলোকিত করেছিল, আজ তা এক নিঃসঙ্গ নারীর বুকের ভেতর নিঃশব্দে কেঁদে মরছে।

আমাদের উচিত এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে আগলে রাখা, অতীত ইতিহাসকে সম্মান জানানো এবং রামধন জমিদার বাড়ির মতো কালজয়ী স্মৃতিগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা যাতে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ তার গৌরবময় অতীত শিকড়কে কখনো ভুলে না যায়।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.