চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী এক কালো অধ্যায়

চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী এক কালো অধ্যায়

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সংগ্রাম। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সেই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, সামরিক-সামরিক বাহিনীর সদস্য ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইতিহাস কখনো সরলরৈখিক নয়; এর বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকে নানা জটিল রাজনৈতিক মেরুকরণ, রাজপরিবারের স্বার্থরক্ষা এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দোলাচল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের একটি অন্যতম বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর অধ্যায় হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ চাকমা সম্প্রদায় এবং তাদের ৫০তম বৃত্তাধিপতি রাজা ত্রিদিব রায়-এর (Raja Tridiv Roy) ভূমিকা। একদিকে সাধারণ চাকমা জনগণের এক বড় অংশের সরাসরি মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ ও সহায়তা, অন্যদিকে তাদের সর্বোচ্চ ঐতিহ্যবাহী প্রধান বা রাজা ত্রিদিব রায়ের প্রকাশ্য পাকিস্তান প্রীতি এবং স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান এই দুই বিপরীতমুখী স্রোত ১৯৭১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।

লন্ডন-ভিত্তিক ভারতীয় রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জীত দেবসরকার (Priyajit Debsarkar) তাঁর ২০১৫ সালে প্রকাশিত আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ 'দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান' (The Last Raja of West Pakistan) বইয়ে রাজা ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানপন্থী সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ, মনস্তাত্ত্বিক কারণ এবং এর পরবর্তী ঐতিহাসিক পরিণতি অত্যন্ত চুলচেরাভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এই নিবন্ধে আমরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চাকমা সম্প্রদায়ের দ্বিমুখী অবস্থান, রাজা ত্রিদিব রায়ের বিতর্কিত পদক্ষেপ, তাঁর জাতিসংঘ সফর ও পাকিস্তানপ্রীতি, দেবসরকারের বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদে পার্বত্য রাজনীতিতে এর দূরগামী প্রভাব নিয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ ও বিস্তারিত আলোচনা করব।

ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও চাকমা বৃত্ত

ব্যাবিলন বা মেসোপটেমিয়ার মতো দূরপ্রাচ্যের সাম্রাজ্যের ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজস্ব স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রেখে আসছিল। ব্রিটিশ আমলে ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক জেলা ঘোষণা করা হয় এবং ১৯০০ সালের 'পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি' (C.H.T. Regulation, 1900) অনুযায়ী অঞ্চলটিকে তিনটি রাজকীয় সার্কেল বা বৃত্তে ভাগ করা হয় চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল। এর মধ্যে সর্ববৃহৎ ও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল চাকমা সার্কেল।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের ট্র্যাজেডি

১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ যখন ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশেরই বেশি ছিল অমুসলিম (প্রধানত বৌদ্ধ, হিন্দু ও ট্রাইবাল বিশ্বাসী)। ফলে চাকমা ও অন্যান্য পাহাড়ি নেতারা যুক্তিসঙ্গতভাবেই ভারতের (বা একটি স্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত সত্তা) সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে ছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট রাঙামাটিতে চাকমা নেতা স্নেহকুমার চাকমার নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।

কিন্তু র‌্যাডক্লিফ কমিশনের সীমানা নির্ধারণে এক ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক চালে কৌশলগত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২১শে আগস্ট পাকিস্তানি পাঞ্জাব রেজিমেন্ট রাঙামাটিতে প্রবেশ করে ভারতীয় পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা তোলে। শুরু থেকেই পাহাড়ি মনস্তত্ত্বে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের ভীতি, ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবোধ জন্ম নেয়।

৫০তম রাজাসনে ত্রিদিব রায়

১৯৫৩ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে রাজা নলিনাক্ষ রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ত্রিদিব রায় চাকমা রাজবংশের ৫০তম বৃত্তাধিপতি হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে চাকমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী প্রধান, অন্যদিকে একজন উচ্চশিক্ষিত, ধূর্ত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৩ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি চাকমা সার্কেলের রাজা হিসেবে রাজস্ব আদায় এবং সামাজিক-ঐতিহ্যবাহী বিচার ব্যবস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিলেন।

পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০): কাপ্তাই বাঁধের ক্ষ ক্ষত ও স্বায়ত্তশাসনের সংকট

১৯৫০০ ও ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তান সরকারের চরম অদূরদর্শী ও জনবিরোধী নীতি পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়।

কাপ্তাই বাঁধের মানবিক বিপর্যয়

১৯৬২ সালে ইউফ্রেটিস নদীর ওপর বিশালাকার বাঁধের মতো কর্ণফুলী নদীতে মার্কিন অর্থায়নে তৈরি হয় কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এই বাঁধের ফলে গঠিত কাপ্তাই হ্রদ পার্বত্য চট্টগ্রামের ৫৪,০০০ একর প্রথম শ্রেণীর উর্বর প্লাবনভূমি চাষজমি পানির নিচে তলিয়ে দেয় যা ছিল সমগ্র চাকমা সার্কেলের মোট কৃষিজমির প্রায় ৪০ শতাংশ।

বাস্তুচ্যুতি: প্রায় এক লাখ পাহাড়ি মানুষ (যার ৮০% ছিল চাকমা) ভিটামাটি ও জমি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়ে। এই মানবিক বিপর্যয়কে চাকমা ভাষায় বলা হয় 'বোর পরবা' বা 'মহাপ্রস্থান'।

ক্ষতিপূরণ হীনতা: পাকিস্তান সরকার বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। এর ফলে হাজার হাজার চাকমা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম ও ত্রিপুরায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

রাষ্ট্রীয় নীতির বিপরীতে ত্রিদিব রায়ের অবস্থান

কাপ্তাই বাঁধের ফলে নিজের প্রজারা যখন গৃহহীন ও সর্বস্বান্ত হচ্ছিল, ঠিক তখনও রাজা ত্রিদিব রায় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এবং সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের সাথে ব্যক্তিগত সখ্য বজায় রাখেন। সাধারণ চাকমা জনগণ যখন পাকিস্তান সরকারের ওপর আস্থা হারাচ্ছিল, রাজা তখন রাজপরিবারের সুযোগ-সুবিধা এবং নিজস্ব রাজত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ইসলামাবাদ ও করাচির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজের প্রভাব বজায় রাখাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাব ও ত্রিদিব রায়ের ভুল হিসাব

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বাঁক। আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার নিশ্চিত করতে অখণ্ড জনমত গঠনে ব্রতী হয়েছিলেন।

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন


├─► বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রস্তাব ──► আওয়ামী লীগের প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি

└─► রাজা ত্রিদিব রায়ের প্রত্যাখ্যান ──► স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী, ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতার ওপর অন্ধ বিশ্বাস

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক প্রস্তাব

নির্বাচনের পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং রাঙামাটি সফর করেন এবং রাজা ত্রিদিব রায়ের সাথে বৈঠক করেন। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দূরদর্শিতা থেকে ত্রিদিব রায়কে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক (নৌকা) নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন।

বঙ্গবন্ধু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে কাপ্তাই বাঁধের ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা হবে এবং অঞ্চলটির অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা দূর করতে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে।

ত্রিদিব রায়ের প্রত্যাখ্যান ও রাজনৈতিক ভুল হিসাব

অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে রাজা ত্রিদিব রায় বঙ্গবন্ধুর এই উদার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে না লড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

নির্বাচনী ফলাফল: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে মাত্র দুটি আসনে অ-আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন একটি ছিলেন ময়মনসিংহ থেকে নুরুল আমীন, এবং অন্যটি পার্বত্য চট্টগ্রাম (ময়মনসিংহ-পার্বত্য চট্টগ্রাম আসন) থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী রাজা ত্রিদিব রায়।

কৌশলগত ভুল ধারণা: প্রিয়জীত দেবসরকার তাঁর 'দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ত্রিদিব রায় বিশ্বাস করতেন যে শেখ মুজিবুর রহমান বা আওয়ামী লীগ যতই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাক না কেন, পশ্চিম পাকিস্তানের জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট কখনো বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। ত্রিদিব রায় ধরে নিয়েছিলেন, সামরিক শক্তির জোরে শেষ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানই টিকে থাকবে। রাজত্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি পাকিস্তানের সামরিক জান্তার সাথে বাজি ধরাই নিরাপদ মনে করেছিলেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ: রাজা ত্রিদিব রায় বনাম সাধারণ চাকমা জনগোষ্ঠী

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মাধ্যমে বাঙালি নিধন শুরু করলে সারাদেশে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে ওঠে। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী চিত্র দেখা যায়।

ত্রিদিব রায়ের দেশবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী ভূমিকা

২৫শে মার্চের পর যখন চট্টগ্রাম থেকে প্রতিরোধ যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নিতে শুরু করে, তখন রাজা ত্রিদিব রায় প্রকাশ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগীতে পরিণত হন।

রাজাকার ও শান্তি কমিটি গঠন: তিনি তাঁর আঞ্চলিক প্রভাব ব্যবহার করে চাকমা হেডম্যান (মৌজা প্রধান) ও কারবারিদের (গ্রাম প্রধান) ডেকে পাঠান এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আদেশে 'শান্তি কমিটি' (Peace Committee) গঠন করেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য প্রদান: পাহাড়ি এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের গতিবিধি এবং তাদের গোপন আস্তানার তথ্য পাকিস্তানি সামরিক কমান্ডারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর ও তাঁর অনুগতদের বিরুদ্ধে।

বিচ্ছিন্নতাবাদী অপপ্রচার: তিনি প্রচার করতে থাকেন যে, 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ' সফল হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের জাতিগত সত্তা ও জমিজমা সম্পূর্ণ হারাবে।

সাধারণ চাকমা ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ

রাজা ত্রিদিব রায়ের বিতর্কিত ভূমিকার বিপরীতে সাধারণ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্য পাহাড়ি জনগণের একটি বিরাট অংশ স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়।

১ নম্বর সেক্টরে অংশগ্রহণ: চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে গঠিত ১ নম্বর সেক্টরে (কমান্ডার রফিকুল ইসলাম) বহু চাকমা যুবক সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ ও আশ্রয়: গহীন অরণ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর নজর এড়িয়ে কীভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়, সে ক্ষেত্রে সাধারণ চাকমা গ্রামবাসীরা মুক্তিযোদ্ধাদের পথপ্রদর্শক (Guides) হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছেন।

স্মরণীয় অবদান: হেমন্ত বিক্রম চাকমা, কুমার প্রদীপ কিশোর দেওয়ানসহ বহু চাকমা সন্তান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে লড়াই করেছেন। এছাড়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে মারমা সম্প্রদায়ের ইউকে চিং মারমা মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য 'বীর বিক্রম' খেতাবে ভূষিত হন।

তবে ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানপন্থী অবস্থানের কারণে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পুরো চাকমা সমাজকে এক ধরনের মানসিক দায়ভার ও রাজনৈতিক সন্দেহের মুখোমুখি হতে হয়েছিল যা সাধারণ চাকমাদের জন্য ছিল এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি।

পাকিস্তান গমন, কূটনৈতিক চাল ও জাতিসংঘে বাংলাদেশ বিরোধিতা

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে যখন মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় আসন্ন হয়ে ওঠে, তখন রাজা ত্রিদিব রায় বুঝতে পারেন যে পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর অবস্থান আর নিরাপদ নয়।

করাচি পলায়ন ও ভুট্টোর সান্নিধ্য

১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজা ত্রিদিব রায় ঢাকা ছেড়ে মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কা হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকাতে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর পশ্চিম পাকিস্তানে ক্ষমতার রদবদল ঘটে এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ভুট্টো দ্রুত ত্রিদিব রায়কে তাঁর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় 'সংখ্যালঘু ও পর্যটন বিষয়ক মন্ত্রী' হিসেবে নিয়োগ দেন।

১৯৭২ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও নাটকীয় কূটনীতি

১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ যখন জাতিসংঘে (UN) সদস্যপদ পাওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জানায়, তখন পাকিস্তান তা আন্তর্জাতিকভাবে ঠেকানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। বিশ্ববাসীকে এটি দেখানোর জন্য যে "পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এখনো পাকিস্তানের সাথেই থাকতে চায় এবং বাঙালি বা অ-বাঙালি প্রতিনিধিরা এখনো পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করছে" ভুট্টো চতুরতার সাথে রাজা ত্রিদিব রায়কে পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতা (Head of Delegation) করে জাতিসংঘে পাঠান।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দাঁড়িয়ে রাজা ত্রিদিব রায় চরম বাংলাদেশ-বিরোধী বক্তব্য দেন এবং চীনের ভেটো শক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ আটকে দেওয়ার কূটনৈতিক ষড়যন্ত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।

রাজমাতা বিনীতা রায় ও শেখ মুজিবের কূটনৈতিক চাল

পাকিস্তান যখন রাজা ত্রিদিব রায়কে তাদের ঘুটি হিসেবে ব্যবহার করছিল, তখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অসাধারণ কাউন্টার-ডিপ্লোম্যাটিক পদক্ষেপ নেন।

বঙ্গবন্ধু রাজা ত্রিদিব রায়ের মাতা রাজমাতা বিনীতা রায়কে (Rajmata Benita Roy) বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে পাঠান। বঙ্গবন্ধু রাজমাতা বিনীতা রায়কে বলেছিলেন:

"ত্রিদিব রায়কে পাকিস্তানে ভয় দেখিয়ে বা বিভ্রান্ত করে আটকে রাখা হয়েছে। আপনি নিউইয়র্কে গিয়ে তাকে বলুন দেশে ফিরে আসতে। সে যদি ফিরে আসে, আমরা তাকে সমস্ত সম্মান দিয়ে বীরের মতো গ্রহণ করব।"

নিউইয়র্কে এক চরম নাটকীয় মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। মা বিনীতা রায় ছেলে ত্রিদিব রায়ের সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেন এবং নিজ জন্মভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসার আকুল আবেদন জানান। কিন্তু ত্রিদিব রায় রাজমাতার সেই আবেদন নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের আনুগত্য বজায় রাখাকেই শ্রেয় মনে করেন এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন।

পাকিস্তানে রাজনৈতিক জীবন, রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব ও মৃত্যু (১৯৭৩–২০১২)

বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকার পুরষ্কার হিসেবে পাকিস্তান সরকার রাজা ত্রিদিব রায়কে রাজকীয় মর্যাদায় ভূষিত করে।

পাকিস্তানে ত্রিদিব রায়ের দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন


├─► ১৯৭৩: রাষ্ট্রপতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ──► ইসলাম ধর্ম গ্রহণের শর্ত মানতে অস্বীকৃতি (বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বস্ত)

├─► ১৯৮১-১৯৯৫: রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব ──► আর্জেন্টিনায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক মিশন

└─► ২০১২ (১৭ সেপ্টেম্বর): সপরিবারে নির্বাসনে মৃত্যু ──► ইসলামাবাদে ৭৮ বছর বয়সে প্রয়াণ (বাংলাদেশে আর ফেরেননি)

রাষ্ট্রপতির প্রস্তাব ও ধর্মীয় শর্ত

১৯৭৩ সালে পাকিস্তানের নতুন সংবিধান প্রণীত হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো রাজা ত্রিদিব রায়কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী দেশটির প্রধান বা রাষ্ট্রপতি হতে হলে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে 'মুসলিম' হতে হতো।

ভুট্টো ত্রিদিব রায়কে নামমাত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণের অনুরোধ জানান। কিন্তু ত্রিদিব রায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি নিজের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করতে রাজি হননি। ফলে তিনি রাষ্ট্রপতি হতে পারেননি, তবে তাঁকে আজীবন ফেডারেল মন্ত্রীর মর্যাদায় সম্মানিত করা হয়।

আর্জেন্টিনায় রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক জীবন

পরবর্তীকালে সামরিক শাসক জিয়াউল হকের আমলে ১৯৮১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ বছর রাজা ত্রিদিব রায় দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি চিলি, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়েতেও পাকিস্তানের কূটনৈতিক দায়িত্ব সামলান। তিনি বিশ্ব বৌদ্ধ ভাবুক ও আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ কাউন্সিলের প্রধান হিসেবেও বিভিন্ন সময় প্রতিনিধিত্ব করেন।

দালাল আইন ও নির্বাসনে মৃত্যু

এদিকে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার 'দালাল আইন' (Collaborators Act, 1972) জারি করলে স্বাধীনতাবিরোধী ও দেশদ্রোহী অপরাধে রাজদ্রোহীদের তালিকায় রাজা ত্রিদিব রায়ের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি আর কোনোদিন বাংলাদেশে পা রাখতে পারেননি। ২০১২ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে নিজের বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

প্রিয়জীত দেবসরকারের বিশ্লেষণ: 'দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান'

লন্ডনভিত্তিক ভারতীয় গবেষণা সংস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জীত দেবসরকার তাঁর ২০১৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ 'The Last Raja of West Pakistan'-এ রাজা ত্রিদিব রায়ের রাজনৈতিক জীবন ও সিদ্ধান্তের চুলচেরা ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

দেবসরকারের প্রধান পর্যবেক্ষণসমূহ

আত্মস্বার্থ ও সামন্তবাদী মনস্তত্ত্ব: দেবসরকারের মতে, ত্রিদিব রায়ের সিদ্ধান্ত কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক বা জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে চালিত হয়নি; বরং এটি ছিল নিখাদ সামন্তবাদী রাজত্ব ও নিজস্ব ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এক মরিয়া চেষ্টা। তিনি ভেবেছিলেন পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো টিকলে তাঁর বংশানুক্রমিক রাজকীয় ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকবে।

সামরিক শক্তির অতিমূল্যায়ন: ত্রিদিব রায় ভেবেছিলেন বিশ্বরাজনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সমর্থনধন্য পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে। তিনি উদীয়মান বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সামরিক সহায়তার বিশালতাকে পরিমাপ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

প্রজাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা: প্রিয়জীত দেবসরকার যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ত্রিদিব রায় নিজের রাজত্ব বাঁচাতে গিয়ে তাঁর হাজার হাজার চাকমা প্রজাকে এক দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ঝুঁকি ও অবিশ্বাসের মুখে ফেলে রেখে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

গ্রন্থের সমালোচনা ও 'দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর পর্যালোচনা

যদিও দেবসরকারের বইটি এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, তবে ভারতের বিখ্যাত পত্রিকা 'The Indian Express' তাদের এক পুস্তক আলোচনায় (Review) দেবসরকারের কাজের কিছু সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।

গৌণ উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা: সমালোচকদের মতে, বইটি মূলত বিভিন্ন প্রকাশিত নিবন্ধ, দ্বিতীয় পর্যায়ের নথিপত্র এবং মৌখিক সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে লিখিত। রাজা ত্রিদিব রায়ের নিজস্ব কোনো অপ্রকাশিত ডায়েরি বা মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার প্রাথমিক দলিল এতে কম ব্যবহৃত হয়েছে।

একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি: অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু বৌদ্ধ ও পাহাড়িরা যেভাবে নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে ভুগছিল, সেই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটকে কিছুটা হালকাভাবে দেখে কেবল ত্রিদিব রায়ের 'স্বার্থপরতা' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এর দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

রাজা ত্রিদিব রায়ের ১৯৭১ সালের একক সিদ্ধান্ত পরবর্তী চার দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতির গতিপথকে অত্যন্ত জটিল ও সংঘাতময় করে তুলেছিল।

অবিশ্বাসের সংস্কৃতি ও মেজোরিটেরিয়ান নীতি

স্বাধীনতার পর বিজয়ী বাঙালি জাতীয়তাবাদের সামনে ত্রিদিব রায়ের ভূমিকার কারণে সামগ্রিক পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এক ধরনের 'রাজনৈতিক সন্দেহের' শিকার হয়। ১৯৭২ সালে যখন বাংলাদেশের নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, তখন তৎকালীন সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জনপ্রিয় নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর আলাদা সংবিধানিক আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও পরিচয়ের দাবি তোলেন। কিন্তু তৎকালীন সরকার সকল নাগরিককে 'বাঙালি' হিসেবে অভিহিত করলে পাহাড়ি নেতারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।

শান্তিবাহিনী গঠন ও দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ

পাহাড়িদের রাজনৈতিক দাবি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পার্বত্য এলাকায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ফলে এম এন লারমার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (PCJSS) এবং এর সশস্ত্র শাখা 'শান্তিবাহিনী'। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে শুরু হয় প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ।

রাজা দেবাশীষ রায়ের দায়িত্ব গ্রহণ ও পুনর্মিলনের চেষ্টা

ত্রিদিব রায় পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র দেবাশীষ রায় (Debashish Roy) ১৯৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চাকমা সার্কেলের ৫১তম রাজা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাজা দেবাশীষ রায় তাঁর বাবার বিপরীত কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতামূলক ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিশেষ উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন।

১৯৯৭ সালে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির ঐতিহাসিক 'পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি' (C.H.T. Peace Accord, 1997) স্বাক্ষরে রাজা দেবাশীষ রায় সেতু বন্ধন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

স্বসংগঠিত সারণী: রাজা ত্রিদিব রায়, চাকমা সম্প্রদায় ও ১৯৭১ সম্পর্কিত মূল তথ্যকথা

পাঠকদের সুবিধার্থে রাজা ত্রিদিব রায়ের জীবন, সিদ্ধান্ত এবং ১৯৭১ সালের ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ নিচের ছকে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয় / পরিমিতি

ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরন

ব্যক্তিত্ব ও পরিচয়

রাজা ত্রিদিব রায় (১৯৩৩–২০১২); চাকমা সার্কেলের ৫০তম রাজাকুল প্রধান (১৯৫৩-১৯৭১)।

১৯৪৭ সালের প্রেক্ষাপট

অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৬২ কাপ্তাই বাঁধের প্রভাব

৪০% চাষজমি নিমজ্জিত, ১ লাখ পাহাড়ি বাস্তুচ্যুত ("বোর পরবা"); রাজা পাকিস্তান সরকারের সমর্থক থাকেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচন

বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের টিকিট প্রত্যাখ্যান করে স্বতন্ত্র নির্বাচন; জয় লাভ ও ইয়াহিয়ার শক্তির ওপর আস্থা।

১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা

পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান, রাজাকার ও 'শান্তি কমিটি' গঠন, মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য পাক সেনাকে প্রদান।

সাধারণ চাকমাদের ভূমিকা

১ নম্বর সেক্টরে সক্রিয় অংশগ্রহণ, মুক্তিযোদ্ধাদের পথপ্রদর্শন, খাদ্য ও আশ্রয় প্রদান (উদা. ইউকে চিং মারমা-বীর বিক্রম)।

করাচি ও জাতিসংঘ মিশন (১৯৭২)

নভেম্বরে পাকিস্তানে পলায়ন; ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ আটকে দেওয়া।

রাজমাতা বিনীতা রায়ের ভূমিকা

শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক নিউইয়র্কে প্রেরণ; ছেলেকে বাংলাদেশে ফেরার মা-সুলভ আকুল আবেদন (ত্রিদিব কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত)।

পাকিস্তানে রাজনৈতিক পদবী

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী (সংখ্যালঘু বিষয়ক), আজীবন ফেডারেল মন্ত্রীর মর্যাদা, আর্জেন্টিনায় রাষ্ট্রদূত (১৯৮১-১৯৯৫)।

১৯৭৩ সালের রাষ্ট্রপতি প্রস্তাব

ভুট্টো কর্তৃক পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি পদের প্রস্তাব; ইসলাম ধর্ম গ্রহণের শর্ত থাকায় ত্রিদিব রায় কর্তৃক প্রত্যাখ্যান।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ গ্রন্থ

'The Last Raja of West Pakistan' (২০১৫), লেখক: প্রিয়জীত দেবসরকার।

পরবর্তী উত্তরাধিকার

পুত্র রাজা দেবাশীষ রায় (৫১তম রাজা); বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ও ১৯৯৭ শান্তি চুক্তিতে ভূমিকা।

প্রয়াণ ও পরিণতি

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২, ইসলামাবাদে মৃত্যু; 'দালাল আইন ১৯৭২'-এর অধীন অভিযুক্ত হয়ে চিরনির্বাসিত জীবনাবসান।

উপসংহার

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজা ত্রিদিব রায় এবং চাকমা সম্প্রদায়ের ভূমিকা বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক অত্যন্ত জটিল, বেদনাদায়ক এবং বিশ্লেষণধর্মী অধ্যায়। ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতির বা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী প্রধানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সেই সমগ্র জনগোষ্ঠীর চেতনা সবসময় এক হয় না। রাজা ত্রিদিব রায় নিজের সামন্ততান্ত্রিক আভিজাত্য, ব্যক্তিগত রাজত্ব এবং ক্ষমতা রক্ষার রাজনৈতিক মোহে পড়ে যে পাকিস্তানপন্থী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে সাধারণ চাকমা ও সমগ্র পাহাড়ি জাতির ওপর এক দীর্ঘমেয়াদী অবিশ্বাসের ছায়া ফেলেছিল।

প্রিয়জীত দেবসরকারের 'দ্য লাস্ট রাজা অফ ওয়েস্ট পাকিস্তান' গ্রন্থটি সেই সময়ের এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দলিল হিসেবে কাজ করে। সেখানে পরিষ্কার দেখা যায় কীভাবে একজন আঞ্চলিক রাজা ক্ষমতার আন্তর্জাতিক খেলায় ভুল বাজি ধরে নিজ দেশ ও প্রজা থেকে চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন।

তবে আশার কথা হলো, আধুনিক বাংলাদেশ অতীত ইতিহাসের সেই তিক্ততাকে পেছনে ফেলে পাহাড়ি ও সমতলের মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। সাধারণ চাকমা যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগ এবং পরবর্তীতে রাজা দেবাশীষ রায়ের ইতিবাচক ভূমিকা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও প্রগতির সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালের ইতিহাস আমাদের এটিই শিক্ষা দেয় যে, সামন্ততান্ত্রিক আত্মস্বার্থের চেয়ে জনগণের মুক্তির আকাক্সক্ষা এবং ন্যায়বিচারের সামাজিক আন্দোলনই ইতিহাসের শেষ বিচারে বিজয়ী হয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা
গ্রন্থ: বেলা-অবেলা (বাংলাদেশ ১৯৭২-১৯৭৫) পৃ. ১৬০-১৬১

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.