Chhaava’র মিথ্যাচার – শম্ভাজির লুণ্ঠন, বর্গি আতঙ্ক ও আওরঙ্গজেবের ন্যায়শাসন

Chhaava’র মিথ্যাচার – শম্ভাজির লুণ্ঠন, বর্গি আতঙ্ক ও আওরঙ্গজেবের ন্যায়শাসন

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মহারাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে মুক্তি পেয়েছে উচ্চ বাজেটের হিন্দি পিরিয়ড ড্রামা ‘ছাভা’ (Chhaava)। চলচ্চিত্রটির পর্দায় শিবাজী-পুত্র শম্ভাজি মহারাজকে চিত্রায়িত করা হয়েছে এক অজেয় মহাবীর, প্রজাহিতৈষী ধর্মরক্ষক এবং মুঘল-বিরোধী জাতীয় নায়ক হিসেবে। অপরদিকে, তাঁর প্রতিপক্ষ মুঘল সম্রাট মহিউদ্দীন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব আলমগীরকে উপস্থাপন করা হয়েছে এক চরম ধর্মান্ধ, নিষ্ঠুর, হিন্দু-নিধনকারী ও রক্তলোলুপ দানব রূপ। বড় পর্দায় ড্রামাটিক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও সংলাপের ঝনঝনানিতে দর্শক হাততালি দিচ্ছেন, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র ডানপন্থী হ্যাশট্যাগ ও 'জয় ভবানী, জয় শিবাজী' স্লোগান ট্রেন্ড করছে। কিন্তু রঙিন পর্দার চকচকে আড়ালে কী লুকিয়ে আছে? ঐতিহাসিক নথিপত্র ও সমাজवैज्ञानिक গবেষণা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এটি কোনো নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চা নয়; বরং একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, যার মূল উদ্দেশ্য ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করে আধুনিক রাজনৈতিক মেরুকরণকে চাঙ্গা করা।

‘ছাভা’ কেবল একটি বিনোদনমূলক চলচ্চিত্র নয়; এটি বর্তমান ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এক ধারালো নব্য অস্ত্র। ইতিহাসের পাতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২০২৩ সালে কৌশলগতভাবে ঐতিহাসিক শহর আওরঙ্গাবাদের নাম পরিবর্তন করে ‘ছত্রপতি শম্ভাজিনগর’ করা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের মার্চে বিজেপির প্রভাবশালী সংসদ সদস্য উদয়নরাজে ভোঁসলে সরাসরি খুলদাবাদে অবস্থিত সম্রাট আওরঙ্গজেবের সাধারণ সমাধিসৌধটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রকাশ্যে দাবি উত্থাপন করেছেন। আর ঠিক এই অগ্নিগর্ভ সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহে ‘ছাভা’ সিনেমাটি আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করছে।

এই নিবন্ধে আমরা প্রাথমিক ঐতিহাসিক নথিপত্র, পর্তুগিজ ও ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আর্কাইভ, রাজস্থান রাজ্যের সরকারি নথি, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার, অড্রে ট্রুশকে, সতীশ চন্দ্র এবং মধ্যযুগীয় ফারসি নথির আলোকে খতিয়ে দেখব কীভাবে শম্ভাজির লুণ্ঠন ও নিপীড়নের ইতিহাস, বাংলায় মারাঠা বর্গিদের নরসংহারের রক্তঝরা স্মৃতি এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবের সুসংগঠিত রাজ্যশাসনকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে একটি বানোয়াট মিথ বা কাল্পনিক নায়কগাথা তৈরি করা হয়েছে।

শম্ভাজি মহারাজ: প্রজাহিতৈষী ধর্মরক্ষক নাকি রাজ্য লুণ্ঠনকারী শাসক?

পপ-কালচারে এবং 'ছাভা' চলচ্চিত্রে শম্ভাজিকে উপস্থাপন করা হয়েছে এক অকৃত্রিম ধর্মপ্রাণ প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে। কিন্তু ১৭ শতকের সমসাময়িক ঐতিহাসিক দলিল, ইউরোপীয় বণিকদের দিনলিপি এবং স্বয়ং মারাঠা নথিপত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে।

অভ্যন্তরীণ পাওয়ার স্ট্রাগল এবং নিজ রাজপ্রাসাদে রক্তগঙ্গা

১৬৮০ সালে মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছত্রপতি শিবাজীর মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শম্ভাজি অত্যন্ত সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সিংহাসনে আরোহণ করেন। শিবাজীর মৃত্যুর পর মারাঠা অভিজাত, আমাত্য এবং সেনাপতিদের একটি বড় অংশ শম্ভাজির চরিত্রগত অস্থিরতা ও উগ্র আচরণের কারণে তাঁকে রাজা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। ১৬৮১ সালে শম্ভাজির সৎমা সয়রাবাই এবং তাঁর সমর্থক মারাঠা সর্দাররা শম্ভাজীকে ক্ষমতাচ্যুত করে কনিষ্ঠ পুত্র রাজারামকে সিংহাসনে বসানোর চেষ্টা করেন।

ক্ষমতা দখলের এই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে শম্ভাজি যে চরম নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা মারাঠা ইতিহাসের এক কাঙ্কিত অধ্যায়। শম্ভাজি তাঁর সৎমা সয়রাবাইকে বিষপ্রয়োগ ও বন্দি করে হত্যা করেন এবং তাঁর সহযোগী শতাধিক প্রবীণ মারাঠা আমাত্য, মন্ত্রী ও সেনাপতিকে ধরে এনে অত্যন্ত নির্মমভাবে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়গড় দুর্গে পরিচালিত এই নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডের ফলে মারাঠা প্রশাসনিক কাঠামোতে গভীর ফাটল ধরে এবং সাধারণ জনগণ ও অভিজাত শ্রেণী তাঁর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।

কৃষকদের ওপর অত্যধিক করের বোঝা ও ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দলিল

মারাঠা রাজ্য পরিচালনা ও অনবরত যুদ্ধের অর্থনৈতিক সংস্থান করতে গিয়ে শম্ভাজি সাধারণ কৃষকদের ওপর করের বোঝা চরম মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সংগৃহীত ১৬৮৪ সালের সরকারি ডায়েরি ও ডাচ ওভারসিজ নথিতে (Dutch East India Company Records, 1684) অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লেখা রয়েছে:

"শম্ভাজির কর সংগ্রাহক ও মারাঠা বাহিনী গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের জমিঘেরা শস্যের অর্ধেকেরও বেশি বলপূর্বক কেড়ে নিত। খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে কৃষকদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হতো এবং তাদের সন্তানদের দাস হিসেবে বন্দি করা হতো।"

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ সরকার তাঁর 'History of Aurangzib' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, শম্ভাজির শাসনামলে মারাঠা কোষাগার খালি হয়ে পড়ায় রাষ্ট্র পরিচালনার মূল উৎস হয়ে উঠেছিল পার্শ্ববর্তী নিরপেক্ষ অঞ্চলগুলোতে লুণ্ঠন চালানো এবং নিজেদের প্রজা ও কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত 'চৌথ' (উৎপাদনের চার ভাগের এক ভাগ) ও 'সরদেশমুখী' কর আরোপ করা।

হজযাত্রীদের জাহাজ লুণ্ঠন ও ১৬৮৫ সালের সুরাট বিপর্যয়

শম্ভাজির শাসনামলের অন্যতম বিতর্কিত ও আন্তর্জাতিক স্তরে ক্ষোভ সৃষ্টিকারী ঘটনা ছিল সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় হজযাত্রীদের জাহাজে আক্রমণ। ১৬৮৫ সালে শম্ভাজির মারাঠা নৌবাহিনী সুরাট বন্দর থেকে মক্কাগামী প্রায় ৬টি বৃহৎ বাণিজ্যিক ও হজযাত্রীবাহী জাহাজ আরব সাগরে অবরুদ্ধ ও দখল করে।

এই জাহাজগুলোতে শত শত সাধারণ নিঃসম্বল হজযাত্রী, নারী, শিশু এবং বৃদ্ধ যাত্রী অবস্থান করছিলেন। মারাঠা নৌসেনারা জাহাজগুলোর যাবতীয় মালামাল, সোনাদানা ও খাদ্যসামগ্রী লুণ্ঠন করে এবং বহু যাত্রীকে বন্দি করে ক্রীতদাস হিসেবে দাসবাজারে বিক্রি করে দেয়। এই বর্বর কাণ্ডে তৎকালীন সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সমুদ্রপথে এই জলদস্যুতার কারণে ওমানের ইবাদি সুলতান এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি সমুদ্রসীমা নিরাপদ করতে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবকে যৌথ সামরিক অভিযানের প্রস্তাব পাঠিছিলেন।

গোয়ায় পর্তুগিজদের সাথে হাত মেলানো এবং হিন্দু গ্রাম লুণ্ঠন

'ছাভা' চলচ্চিত্রে শম্ভাজীকে অখণ্ড হিন্দু ধর্মের একমাত্র রক্ষক হিসেবে দেখানো হলেও ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। ১৬৮৩ সালে শম্ভাজি গোয়ার পর্তুগিজ উপনিবেশ আক্রমণ করেন। তবে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে তাঁর সেনাবাহিনী গোয়ার স্থানীয় হিন্দু অধিবাসীদের গ্রাম ও বসতিতে নির্বিচারে লুণ্ঠন চালায়। পর্তুগিজ ও স্থানীয় মরাঠি নথিপত্র নিশ্চিত করে যে, শম্ভাজির সেনারা গোয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের একাধিক হিন্দু গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং সেখান থেকে ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে। এটি প্রমাণ করে যে, শম্ভাজির সামরিক অভিযানের পেছনে কোনো 'ধর্মীয় প্রীতি' কাজ করত না; বরং এর পেছনে ছিল বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও সাম্রাজ্যিক আগ্রাসন।

বর্গি আতঙ্ক: বাংলার ইতিহাসে মারাঠা লুণ্ঠনের রক্তঝরা স্মৃতি

যখন হিন্দি সিনেমা ‘ছাভা’ বা আধুনিক পপ-হিস্ট্রিতে মারাঠা শাসকদের ‘ধর্মীয় রক্ষক’ হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়, তখন পূর্ব ভারতের বিশেষ করে বাংলার মানুষের হৃদয়ে ভেসে ওঠে এক চরম আতঙ্কের নাম 'বর্গি'। মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনীকে বলা হতো বর্গি (ফারসি 'বারগির' শব্দ থেকে আগত)।

১৭৪১-১৭৫১: বাংলায় ১৭ বার মারাঠা আক্রমণ

১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সাল এই দীর্ঘ এক দশক ধরে শম্ভাজির মারাঠা সামরিক নীতির ধারক ও বাহক রঘুজি ভোঁসলে এবং সেনাপতি ভাস্কর রাম কোলির নেতৃত্বে মারাঠা বাহিনী বাংলায় মোট ১৭ বার বিধ্বংসী আক্রমণ চালায়। তারা তৎকালীন বাংলার সুবেদার নবাব আলীবর্দী খানের শাসনকালে বাংলার সমৃদ্ধ অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ছারখার করে দিয়েছিল।

মারাঠা বর্গিরা কোনো নিয়মিত সেনাবাহিনীর মতো যুদ্ধ করত না; তাদের প্রধান যুদ্ধকৌশল ছিল ‘গেরিলা লুণ্ঠন’ (Guerilla Raids)। তারা গ্রামাঞ্চলে প্রবেশ করে ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিত, শস্যক্ষেত পুড়িয়ে দিত এবং ধনসম্পদ ছিনিয়ে নিত। মারাঠাদের এই লুণ্ঠন কেবল মুসলিম নবাবদের বিরুদ্ধে ছিল না; এর প্রধান শিকার হয়েছিল বাংলার লাখ লাখ সাধারণ হিন্দু ও মুসলিম কৃষক, তাঁতি ও বণিক সম্প্রদায়।

মুর্শিদাবাদ ও বর্ধমানের গণহত্যা: ৪ লক্ষ মানুষের রক্তে রাঙা বাংলা

তৎকালীন ডাচ ও ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রিপোর্ট এবং গঙ্গারাম রচিত বিখ্যাত বাংলা কাব্যগ্রন্থ ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’-এ বর্গি আক্রমণের যে লোমহর্ষক বর্ণনা পাওয়া যায়, তা যেকোনো সুস্থ মানুষের শিউরে ওঠার জন্য যথেষ্ট। গঙ্গারাম তাঁর ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’-এ লিখেছেন:

"বর্গি এসে লোক ধরে, হাত কাটে, কান কাটে। কতেক লোক কাটিয়া ফেলে, কতেক লোক ভাসাইয়া দেয় জলে। ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব, সন্ন্যাসী কারোরই রক্ষা নাই। গর্ভবতী নারীদের পেট চিরে ফেলে, শিশুদিগকে মাটিতে আছাড় মারে..."

মুর্শিদাবাদ ও বর্ধমানের সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, ১৭৪২ সালের একক মারাঠা অভিযানেই বাংলায় ৪ লক্ষাধিক (৪০০,০০০) নিরীহ মানুষ নিহত বা বন্দি হয়েছিল। হাজার হাজার নারীকে ধরে নিয়ে গিয়ে মারাঠা শিবিরে গণধর্ষণ ও ক্রীতদাস করা হয়। হুগলি ও মেদিনীপুরের শত শত সমৃদ্ধ গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

অর্থনীতিতে ধস এবং লোকসংস্কৃতির ঐতিহাসিক স্মৃতি

আধুনিক অর্থনীতিবিদদের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৭৪১ থেকে ১৭৫১ সালের মধ্যে মারাঠা বর্গিদের ক্রমাগত লুণ্ঠন ও ধ্বংসাত্মক নীতির ফলে বাংলার জিডিপি (GDP) প্রায় ৩৫% হ্রাস পেয়েছিল। কৃষিউৎপাদন অচল হয়ে পড়েছিল এবং বিশ্বখ্যাত বাংলা রেশম ও সুতিবস্ত্র শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছিল।

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে মারাঠা বর্গিদের এই ভয়াল স্মৃতি আজও কালজয়ী ছড়ার মাধ্যমে বেঁচে আছে:

"ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে।
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেবো কিসে?"

যে মারাঠা শক্তি বাংলায় লক্ষ লক্ষ হিন্দু-মুসলিমকে জবাই করে গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করেছিল, সেই একই সামরিক ঐতিহ্যের রূপকারদের আজ চলচ্চিত্রের পর্দায় 'জাতীয় বীর' বানিয়ে উপস্থাপন করা বাংলার রক্তাক্ত ইতিহাসকে অপমান করার সামিল।

সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর: ধর্মান্ধ দানব নাকি ন্যায়পরায়ণ প্রাগম্যাটিক শাসক?

‘ছাভা’ সিনেমায় সম্রাট আওরঙ্গজেবকে দেখানো হয়েছে একজন উন্মাদ, হিন্দুবিদ্বেষী ও রক্তপিপাসু শাসক হিসেবে। কিন্তু নিরপেক্ষ আধুনিক ইতিহাসচর্চা এবং অড্রে ট্রুশকে (Audrey Truschke), জেনিস লিন্ডসে, প্রফেসর সতীশ চন্দ্রের মতো খ্যাতনামা গবেষকদের নিবিড় অনুসন্ধান এই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডাকে সম্পূর্ণ খণ্ডন করে।

বিশাল সাম্রাজ্য ও সুসংগঠিত প্রশাসন

সম্রাট আওরঙ্গজেবের ৪৯ বছরের দীর্ঘ শাসনামলে (১৬৫৮-১৭০৭) মুঘল সাম্রাজ্য তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভৌগোলিক বিস্তৃতি লাভ করেছিল প্রায় ৪০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা। কাশ্মীর থেকে তিলক কান্যা কুমারী এবং কাবুল থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অখণ্ড ভারতবর্ষ প্রথমবারের মতো একটি সুসংহত প্রশাসনিক ছাতার নিচে এসেছিল। কোনো একচেটিয়া 'ধর্মান্ধ' বা উন্মাদ शासকের পক্ষে এত বড় ও বৈচিত্র্যময় সাম্রাজ্য অর্ধশতাব্দীকাল সফলভাবে পরিচালনা করা অসম্ভব।

মুঘল প্রশাসনে রেকর্ডসংখ্যক হিন্দু কর্মকর্তা ও সেনাপতি

ঐতিহাসিক তথ্য অত্যন্ত অবাক করার মতো: মুঘল সাম্রাজ্যের ৩০০ বছরের ইতিহাসে সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলেই রাজকীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক হিন্দু কর্মকর্তা নিয়োজিত ছিলেন!

আমেরিকান ইতিহাসবিদ প্রফেসর অড্রে ট্রুশকে তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ 'Aurangzeb: The Life and Legacy of India's Most Controversial King'-এ প্রাথমিক ফারসি দলিল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, আকবরের আমলে মুঘল প্রশাসনে হিন্দু মনসবদারদের (উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা/সেনাপতি) অনুপাত ছিল ২২.৫%, শাহজাহানের আমলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪.৪%-এ, আর তথাকথিত 'উগ্র হিন্দুবিদ্বেষী' আওরঙ্গজেবের আমলে এই হার গিয়ে পৌঁছায় ৩১.৬% থেকে ৩৩%-এ!

আওরঙ্গজেবের সেনাপতিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিলেন রাজপুত রাজা জসবন্ত সিং, রাজা জয় সিং (যাঁকে আওরঙ্গজেব মারাঠাদের দমনে প্রধান সিপাহসালার বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন), রাও করণ সিং এবং রাজা রঘুনাথ দাস (যাঁকে আওরঙ্গজেব সাম্রাজ্যের অর্থ মন্ত্রী বা দিওয়ান বানিয়েছিলেন)। যদি আওরঙ্গজেব কেবলই হিন্দু নিধনকারী হতেন, তবে তাঁর সাম্রাজ্যের অর্থ ও সামরিক বিভাগের সর্বোচ্চ চাবিকাঠি হিন্দু রাজাদের হাতে থাকত না।

জিজিয়া করের পুনঃপ্রবর্তন বনাম মন্দির ভূমি অনুদান (রাজস্থান আর্কাইভস ২০২৫)

আওরঙ্গজেব ১৬৮০ সালে 'জিজিয়া' কর পুনঃপ্রবর্তন করেন যাকে হিন্দুত্ববাদী প্রোপাগান্ডায় 'ধর্মীয় নিপীড়ন' হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো, জিজিয়া ছিল একটি সামরিক কর, যা অ-মুসলিম প্রজাদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিনিময়ে নেওয়া হতো। এর পরিবর্তে অ-মুসলিমদের ওপর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের। উপরন্তু, আওরঙ্গজেব জিজিয়া চালু করার পাশাপাশি সাধারণ কৃষকদের ওপর থাকা প্রায় ৮০ প্রকারের স্থানীয় কর (আবোয়াব) সম্পূর্ণ মওকুফ করেছিলেন।

একই সাথে, আওরঙ্গজেব শত শত হিন্দু মন্দির ও মঠকে বিপুল পরিমাণ নিষ্কর জমি এবং অর্থ অনুদান দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে রাজস্থান স্টেট আর্কাইভস (Rajasthan State Archives) থেকে প্রকাশিত গোপন রাজকীয় ফারসি ফরমান ও দলিলে দেখা গেছে, সম্রাট আওরঙ্গজেব উদয়পুরের ঐতিহাসিক একচক্রনাথ মন্দিরকে ১০০০ বিঘা নিষ্কর জমি দান করেছিলেন।

এছাড়াও বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ মন্দির, উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দির, চিত্রকূটের বাল্মীকি আশ্রম এবং গুয়াহাটির কামাখ্যা মন্দিরে আওরঙ্গজেব কর্তৃক প্রদত্ত রাজকীয় ফরমান ও আর্থিক অনুদানের নথিপত্র আজ আজও সংরক্ষিত রয়েছে।

আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত জীবন ও রাজকোষের সততা

আওরঙ্গজেব ছিলেন বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বিরল শাসক, যিনি ব্যক্তিগত জীবনের খরচের জন্য রাষ্ট্রীয় রাজকোষ (বায়তুল মাল) থেকে একটি টাকাও গ্রহণ করতেন না। তিনি নিজের হাতে সুবিন্যস্ত হরফে কোরআন শরিফ প্রতিলিপি করে এবং সাধারণ টুপি সেলাই করে বাজারে বিক্রি করতেন; আর সেই উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজের খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করতেন।

১৭০৭ সালে আহমেদনগরে তাঁর মৃত্যুর পর রাজকীয় নথিতে দেখা যায়, তাঁর ব্যক্তিগত তহবিলে টুপি সেলাই করে উপার্জিত মাত্র ১৪ টাকা গচ্ছিত ছিল, যা তিনি তাঁর সাধারণ কবরের খরচের জন্য ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন। এমন একজন সৎ, কৃচ্ছ্রসাধনকারী ও ন্যায়পরায়ণ শাসককে পর্দায় 'দানব' বানানো ইতিহাসভিত্তিক বিনোদন নয়, বরং ইতিহাস অবমাননা।

শম্ভাজির পতন ও মৃত্যুদণ্ড: ধর্মীয় হত্যাকাণ্ড নাকি রাষ্ট্রদ্রোহিতার প্রশাসনিক বিচার?

'ছাভা' চলচ্চিত্রে শম্ভাজির পতনকে দেখানো হয়েছে একজন হিন্দু বীরের ওপর ধর্মান্ধ মুঘলদের ধর্মীয় অত্যাচার হিসেবে। কিন্তু ১৬৮৯ সালের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী মূল্যায়নে সত্য উন্মোচিত হয়।

সাঙ্গমেশ্বরে অসতর্কতা ও নিজ লোকজনের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা

১৬৮৯ সালের গোড়ার দিকে শম্ভাজি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাঙ্গমেশ্বরে অবস্থান করছিলেন। তবে যুদ্ধের চরম মুহূর্তে তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাঙ্গমেশ্বরে নিজের এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে অমোদ-প্রমোদে মত্ত ছিলেন।

মুঘল সেনাপতি মুকাররব খান (মুহাম্মদী বেগ) যখন অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে শম্ভাজিকে বন্দি করেন, তখন সেই খবরের নেপথ্যে ছিল মারাঠাদের নিজেদের ভেতরের তীব্র অসন্তোষ ও বিশ্বাসঘাতকতা। শম্ভাজির নিজের শ্যালক ও সেনাপতি শিরকে পরিবার (Ganoji Shirke) গোপনে মুঘল সেনাপতির সাথে হাত মিলিয়ে শম্ভাজির গোপন অবস্থান ও প্রবেশের নকশা মুঘলদের হাতে তুলে দিয়েছিল। শম্ভাজির অভ্যন্তরীণ উগ্র আচরণ ও মারাঠা সর্দারদের ওপর অত্যাচারের ফলেই তাঁর নিজের লোকেরাই তাঁকে শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছিল।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিচার

বন্দি করার পর শম্ভাজিকে মুঘল শিবিরে নিয়ে আসা হয়। মুঘল আইনি কাঠামো অনুযায়ী, শম্ভাজির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল- সুরাট ও বুরহানপুর শহরে সাধারণ নাগরিকদের ওপর বলপূর্বক লুণ্ঠন ও অগ্নিকাণ্ড চালানো। মক্কাগামী হজযাত্রীদের জাহাজ আটক করে নারী ও শিশুদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা। রাজ্যের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ এবং সাধারণ কৃষকদের হত্যা করা।

তৎকালীন মুঘল রাষ্ট্রীয় আইনে এই অপরাধগুলো ছিল চরম রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও সাধারণ মানুষের ওপর পরিচালিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শামিল। শম্ভাজিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল একটি প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের আইনি প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে কোনো ধর্মীয় প্রতিহিংসার কারণে নয়।

‘ছাভা’ সিনেমার প্রধান ৩টি ঐতিহাসিক বিকৃতি ও মিথ্যাচার

চলচ্চিত্রটিতে দর্শককে আবেগপ্রবণ করতে অসংখ্য ঐতিহাসিক মিথ্যাচার ঢোকানো হয়েছে। নিচে প্রধান ৩টি মিথ্যাচারের বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ করা হলো:

মিথ্যা ১: "শম্ভাজি একাই সম্রাট আওরঙ্গজেবকে ২৭ বছর দাক্ষিণাত্যে আটকে রেখেছিলেন।"

ঐতিহাসিক সত্য: সম্রাট আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে অবস্থান করেছিলেন মোট ২৫ বছর (১৬৮১-১৭০৭)। কিন্তু শম্ভাজি মারা যান ১৬৮৯ সালে অর্থাৎ আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্যে আসার মাত্র ৮ বছরের মাথায়! শম্ভাজির মৃত্যুর পর মারাঠাদের প্রতিরোধ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাজারাম, তারাবাই এবং শাহু। শম্ভাজি একাই ২৭ বছর আটকে রেখেছিলেন এই দাবি সম্পূর্ণ কাল্পনিক।

মিথ্যা ২: "আওরঙ্গজেব হাজার হাজার হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছেন।"

ঐতিহাসিক সত্য: প্রখ্যাত আমেরিকান ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকের ২০২৪ সালের হালনাগাদকৃত গবেষণা অনুযায়ী, আওরঙ্গজেবের ৪৯ বছরের শাসনামলে সর্বোচ্চ ৮০টির মতো মন্দির ধ্বংসের আদেশ দেওয়া হয়েছিল যার প্রতিটিই ছিল রাজদ্রোহিতা, রাজনৈতিক বিদ্রোহ বা রাজস্ব ফাঁকির সাথে যুক্ত। একই সময়ে তিনি ২০০টিরও বেশি মন্দির ও মঠকে নিষ্কর জমি ও নিয়মিত ভাতা প্রদান করেছেন।

মিথ্যা ৩: "শম্ভাজি ছিলেন হিন্দু ধর্মের সর্বাত্মক রক্ষক।"

ঐতিহাসিক সত্য: শম্ভাজি ১৬৮৩ সালে গোয়ায় পর্তুগিজদের সাথে সামরিক মারামারির সময় স্থানীয় শত শত হিন্দু অধিবাসীর গ্রাম লুণ্ঠন করেছিলেন। অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে তাঁর কাছে হিন্দু বা মুসলিম প্রজার মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না।

প্রোপাগান্ডা বনাম ঐতিহাসিক সত্য

বিষয় ও বিষয়ক্ষেত্র

‘ছাভা’ সিনেমার দাবি / পপ-মিথ

ঐতিহাসিক দলিল ও প্রামাণিক সত্যতা

শম্ভাজির শাসক চরিত্র

অজেয় যোদ্ধা, প্রজাহিতৈষী ও হিন্দু ধর্মরক্ষক।

স্বজনপ্রীতি, প্রজা নিপীড়ন, ডাচ রেকর্ড অনুযায়ী কৃষকদের ওপর ৫০%+ কর এবং নিজের শতাধিক অভিজাতকে হত্যা।

হজযাত্রী ও সাগরে আচরণ

নৌবাহিনীর মাধ্যমে মারাঠা সীমান্ত রক্ষা।

১৬৮৫ সালে সুরাট থেকে মক্কাগামী ৬টি জাহাজ লুণ্ঠন, নারী-শিশুদের দাস বানানো; ওমানের সুলতানের ক্ষোভ প্রকাশ।

বাংলায় মারাঠা ঐতিহ্য (বর্গি)

সারাদেশে স্বরাজ্য ও মুক্তির বার্তা বিস্তার।

১৭৪১-১৭৫১ সালে বাংলায় ১৭ বার ধ্বংসাত্মক আক্রমণ; ৪ লক্ষ সাধারণ মানুষ হত্যা, গণধর্ষণ এবং জিডিপি ৩৫% হ্রাস।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিত্ব

উন্মাদ, ধর্মান্ধ, রক্তপিপাসু ও হিন্দু নিধনকারী।

সাম্রাজ্যে ৩৩% হিন্দু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (রেকর্ড), উদয়পুর একচক্রনাথ মন্দিরকে ১০০০ বিঘা জমি দান এবং ব্যক্তিগত জীবনে চরম কৃচ্ছ্রসাধন।

শম্ভাজির গ্রেফতার ও পতন

মুঘলদের উগ্র ধর্মীয় চক্রান্তে একাকী বীরের পতন।

সাঙ্গমেশ্বরে আমোদ-প্রমোদে অসতর্কতা; নিজ শ্যালক শিরকে পরিবারের বিশ্বাসঘাতকতা এবং রাষ্ট্রদ্রোহের আইনি বিচার।

মন্দির সম্পর্কিত নীতি

হাজার হাজার হিন্দু মন্দির ধ্বংস ও মূর্তিভঞ্জন।

রাজনীতির কারণে মাত্র ৮০টি মন্দির ভাঙা বনাম ২০০টির বেশি মন্দিরকে নিয়মিত রাজকীয় অনুদান ও জমি প্রদান (অড্রে ট্রুশকে নথি)।

কেন এই প্রোপাগান্ডা? বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র ও মেরুকরণ

প্রশ্ন উঠতে পারে আজকের আধুনিক যুগে এসে ১৭ শতকের ইতিহাস নিয়ে এত নাটকীয়তা, এত মিথ্যে প্রচার কেন করা হচ্ছে? উত্তর লুকিয়ে আছে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক মানচিত্রে, বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে।

মহারাষ্ট্রের রাজনীতি ও মারাঠা ভোটব্যাংক

মহারাষ্ট্র ভারতের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। সম্প্রতি শিবসেনা ও এনসিপি দলে রাজনৈতিক ভাঙন এবং বিজেপির নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ায় উগ্র মারাঠা জাতীয়তাবাদকে উসকে দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। 'ছাভা' সিনেমার প্রযোজক ও পরিচালকদের সাথে আরএসএস (RSS) ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সরাসরি আদর্শিক যোগাযোগ প্রমানিত। শম্ভাজিকে 'ইসলামি আগ্রাসনের শিকার হিন্দু শহীদ' বানিয়ে হিন্দু ভোটারদের একছত্র মেরুকরণ করাই এই চলচ্চিত্রের প্রধান কৌশল।

বাস্তব জীবনে প্রোপাগান্ডার বিষাক্ত প্রভাব

সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র বার্তা ছড়ানোর ফলে বাস্তবেও তার রক্তক্ষয়ী প্রতিফলন ঘটেছে। ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংসের চেষ্টা এবং অন্তত ১২টি মসজিদে উগ্রবাদীদের হামলার খবর পাওয়া গেছে। আওরঙ্গজেবের ঐতিহাসিক সাধারণ সমাধিসৌধের ওপর হামলার হুমকি দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর উস্কানি দেওয়া হচ্ছে।

ইতিহাসের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সময় এসেছে

‘ছাভা’ কেবল একটি সিনেমা নয়; এটি সমাজে বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ও পারস্পরিক ঘৃণা ছড়ানোর এক বিষাক্ত বীজ। সিনেমাটিতে শম্ভাজিকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা ঐতিহাসিক শম্ভাজির বাস্তবতার সাথে মেলে না। শম্ভাজি কোনো অরাজনৈতিক সাধু বা ধর্মরক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন ১৭ শতকের একজন সাধারণ সামন্তীয় শাসক, যাঁর বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও লুণ্ঠন নীতির কারণে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের প্রজারাই চরম মূল্য চুকিয়েছে।

অপরদিকে, সম্রাট আওরঙ্গজেব কোনো রূপকথার 'দানব' ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন কঠোর, বিচক্ষণ, রাজকোষের প্রতি সৎ এবং প্রশাসনিক বাস্তবতাবাদী শাসক যিনি অখণ্ড ভারতবর্ষকে সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য উপহার দিয়েছিলেন।

বাংলার মায়েরা যখন শিশুদের ঘুম পাড়াতে "বর্গি এলো দেশে" ছড়াটি আবৃত্তি করেন, তখন সেই ছড়ার প্রতিটি ছন্দে মিশে থাকে মারাঠা লুণ্ঠনে প্রাণ দেওয়া লাখ লাখ বাঙালির রক্তের কান্না। আজ সেই বর্গি মানসিকতার রূপকারদের সেলুলয়েডের পর্দায় 'মহানায়ক' বানিয়ে উপস্থাপন করা ইতিহাস ও সভ্যতার সাথে চরম প্রতারণা।

আমাদের আজ ইতিহাসের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। শম্ভাজির লুণ্ঠনের কাছে নয়, বর্গির আতঙ্কের কাছে নয় বরং চরম সত্যের কাছে। যতদিন আমরা রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ইতিহাসকে বিকৃত করে মিথ্যা নায়ক গড়ে তুলব এবং চলচ্চিত্রের পর্দায় বিষাক্ত রূপকথা বিক্রি করব, ততদিন এই ভারতীয় উপমহাদেশে শান্তির আলো ফুটবে না; বরং সত্যের বলি দিয়ে রক্তের হোলি খেলা চলতেই থাকবে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.