ছোট রাজন - মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের 'দেশপ্রেমিক ডন' ও ডি-কোম্পানি বিভাজন

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বাই) শহর যখন দ্রুত ভারতের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছিল, ঠিক তখনই ছায়ার মতো নগরীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল সংগঠিত অপরাধ চক্র। দক্ষিণ বোম্বাইয়ের পাঠান গ্যাং এবং পরবর্তীতে দাউদ ইব্রাহিমের 'ডি-কোম্পানি'র দাপটে যখন পুরো শহর কাঁপছিল, তখন তিলক নগরের এক মারাঠি তরুণের উত্থান বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমীকরণ চিরতরে বদলে দেয়। তিনি রাজেন্দ্র সদাশিব নিকালজে, যিনি অপরাধ জগতে পরিচিত লাভ করেন 'ছোট রাজন' নামে।
এক সময় বোম্বাই সিনেমাহলের টিকিট কালোবাজারি থেকে শুরু করে ডি-কোম্পানির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হওয়া, আর পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের বিস্ফোরণের পর দাউদের সাথে সম্পর্ক ছেদ করে নিজেকে "দেশপ্রেমিক হিন্দু ডন" হিসেবে উপস্থাপন করা ছোট রাজনের জীবনকাহিনি যেন এক টানটান উত্তেজনাময় রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক থ্রিলার। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অপরাধ নেটওয়ার্ক, ব্যাংককের বহুতল ভবন থেকে নাটকীয় পলায়ন, নিজের সহচরদের প্রতি চরম সন্দেহপ্রবণতা এবং শেষ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ধরা পড়ার মাধ্যমে তাঁর অপরাধ সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে।
ছোট রাজনের প্রারম্ভিক জীবন, ডি-কোম্পানিতে ভূমিকা, দাউদের সাথে ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব, ব্যাংককের প্রাণঘাতী হামলা এবং বর্তমান আইনি পরিণতির এক বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ।
অপরাধ জগতে প্রবেশ: চেম্বুর থেকে তিলক নগর (১৯৬০ – ১৯৮৩)
রাজেন্দ্র সদাশিব নিকালজে ১৯৬০ সালে বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বাই) চেম্বুর এলাকার এক সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত মারাঠি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন বোম্বাইয়ের বস্তি ও শিল্পাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং স্থানীয় মাস্তানদের দাপট ছিল নিত্যদিনের চিত্র।
সিনেমা হলের টিকিট কালোবাজারি: কৈশোরে রাজেন্দ্র পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে দ্রুত অর্থ উপার্জনের পথ খুঁজতে শুরু করেন। সাতটি ভাইবোনের সংসার চালাতে তরুণ রাজেন্দ্র সদাশিব নিকালজে সত্তরের দশকের শেষে মধ্য মুম্বাইয়ের তিলক নগরের 'সহকার' সিনেমা হলের সামনে সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক করা শুরু করেন।
চেম্বুরের বিখ্যাত সাহাকার সিনেমা হলের সামনে অমিতাভ বচ্চন ও তৎকালীন জনপ্রিয় তারকাদের সিনেমার টিকিট কালোবাজারি (Black marketing) করার মাধ্যমে রাজেন্দ্রর অপরাধ জীবনের হাতেখড়ি হয়। টিকিটের কালোবাজারি নিয়ে স্থানীয় অন্যান্য ছোট গ্যাং ও পুলিশের সাথে প্রায়শই তাঁর হাতাহাতি ও সংঘর্ষ হতো। এক সংঘর্ষে রাজেন্দ্র এক পুলিশ কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ চালিয়ে বসেন, যা তাঁকে স্থানীয় অপরাধ জগতে বেশ পরিচিতি এনে দেয়।
'বড় রাজন' এর সান্নিধ্য ও ছোট রাজন নাম
একবার সাহাকার সিনেমা হলের সামনে টিকিট নিয়ে গোলমালের সময় পুলিশের লাঠিচার্জের মুখেও পিছু না হটে রাজেন্দ্রর প্রদর্শন করা মারমুখী ও বেপরোয়া মনোভাব চোখে পড়ে তৎকালীন তিলক নগর ও চেম্বুর এলাকার প্রভাবশালী গ্যাংস্টার রাজন নায়ারের (যাাঁকে সবাই 'বড় রাজন' বলে ডাকত)। বড় রাজন ছিলেন তৎকালীন স্থানীয় ইউনিয়ন রাজনীতি, জমি দখল এবং ছোটখাটো তোলবাজির মূল নিয়ন্ত্রক।
তরুণ রাজেন্দ্রর মানসিক শক্তি ও চতুরতা দেখে বড় রাজন তাঁকে নিজের দলে টেনে নেন এবং নিজের ছায়াতলে রেখে অপরাধ জগতের মূল কৌশলগুলো শেখাতে শুরু করেন। বড় রাজনের তত্ত্বাবধানে রাজেন্দ্র দ্রুতই চাঁদা আদায়, জমি দখল এবং অস্ত্রের ব্যবহার শিখে নেন। বড় রাজনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও অনুগত ডানহাত হিসেবে রাজেন্দ্র অল্প সময়ের মধ্যেই তিলক নগর গ্যাংয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেন। রাজন নায়ারের নামানুসারেই অপরাধ জগতে রাজেন্দ্রর নতুন নামকরণ হয় 'ছোট রাজন'। এর মাধ্যমে গুরু 'বড় রাজন' এবং শিষ্য 'ছোট রাজন' এর জোট মুম্বাইয়ের পূর্ব উপশহরে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে।
১৯৮৩: বড় রাজনের হত্যা ও রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ
১৯৮০-এর দশকের শুরুতে তিলক নগর গ্যাংয়ের সাথে চণ্ডীবালি এলাকার অটো-রিকশা ইউনিয়ন ও স্থানীয় এলাকায় তোলাবাজির আধিপত্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল কুঞ্জু গ্যাংয়ের তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। আব্দুল কুঞ্জু ও বড় রাজনের মধ্যকার এই ক্ষমতার লড়াই দ্রুতই রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। ১৯৮৩ সালে আব্দুল কুঞ্জু বড় রাজনকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেন। কুঞ্জুর ভাড়াটে শুটার চন্দ্রেশ প্যাটেল নৌবাহিনীর পোশাক ছদ্মবেশে এসে মুম্বাই কোর্ট প্রাঙ্গণের কাছে প্রকাশ্য দিবালোকে বড় রাজনকে গুলি করে হত্যা করে।
বড় রাজনের আকস্মিক হত্যাকাণ্ডে তিলক নগর গ্যাং বিপদে পড়লেও গ্যাংয়ের পূর্ণ নেতৃত্ব দ্রুত চলে আসে ছোট রাজনের হাতে। রাজন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে তিনি যেকোনো মূল্যে গুরুর হত্যার প্রতিশোধ নেবেন। বড় রাজনের মৃত্যুর পর ছোট রাজন নিজের বিশ্বস্ত শুটারদের সংগঠিত করেন এবং আব্দুল কুঞ্জুর চলাচলের ওপর নজরদারি বাড়ান।
১৯৮৩ সালের শেষভাগে, দক্ষিণ বোম্বাইয়ের এক খোলা মাঠে আয়োজিত একটি স্থানীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট চলাকালে ছোট রাজন খবর পান যে আব্দুল কুঞ্জু সেখানে দর্শকসারিতে বসে খেলা দেখছেন। ছোট রাজন ও তাঁর দলের সশস্ত্র শুটাররা নিমেষেই মাঠ ঘিরে ফেলে। শত শত সাধারণ দর্শকের চোখ কপালে তুলে ছোট রাজনের দল সরাসরি আব্দুল কুঞ্জুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং জনসমক্ষে তাঁকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে হত্যা করে। এই দুঃসাহসিক ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ছোট রাজন পুরো মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের অবস্থান শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করান, যা পরবর্তীতে তাঁকে দাউদ ইব্রাহিমের 'ডি-কোম্পানি'র অন্যতম প্রধান সহযোগীতে পরিণত হওয়ার পথ সুগম করে দেয়।
ডি-কোম্পানিতে সংযুক্তি ও মুম্বাইয়ের রাজত্ব (১৯৮৩ – ১৯৯২)
বড় রাজনের আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর বিশ্বস্ত অনুসারী রাজেন্দ্র সদাশিব নিকালজে 'ছোট রাজন' নাম গ্রহণ করে তিলক নগর গ্যাংয়ের পূর্ণ নেতৃত্ব হাতে নেন। আব্দুল কুঞ্জুকে হত্যার পর ছোট রাজন পুলিশ ও অন্যান্য প্রতিপক্ষ গ্যাংয়ের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। বড় রাজনের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া, আব্দুল কুঞ্জুর আক্রমণ সামলানো এবং মুম্বাই পুলিশের ক্রমবর্ধমান এনকাউন্টার থেকে রক্ষা পেতে ছোট রাজনের একটি শক্তিশালী মাফিয়া ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
তৎকালীন বোম্বাইয়ে করিম লালার 'পাঠান গ্যাং' এবং দক্ষিণ বোম্বাইয়ের অন্যান্য প্রভাবশালী মাফিয়াদের চাপ সামলাতে ছোট রাজনের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক ছায়ার প্রয়োজন ছিল।
দাউদ ইব্রাহিমের সাথে জোটবদ্ধ হওয়া
এই সংকটময় সময়ে দক্ষিণ মুম্বাইয়ে আধিপত্য বিস্তারকারী উঠতি মাফিয়া দন দাউদ ইব্রাহিম কাস্তাকারের সাথে ছোট রাজনের যোগাযোগ ঘটে। দাউদ অনুধাবন করেছিলেন, করিম লালার 'পাঠান গ্যাং' ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দিতে হলে স্থানীয় মারাঠি ক্যাডারদের ওপর প্রভাব থাকা একজন দুর্ধর্ষ ও সাহসী নেতার প্রয়োজন। ছোট রাজনের সাথে হাত মিলিয়ে দাউদ দক্ষিণ মুম্বাইয়ের পাশাপাশি উত্তর ও পূর্ব বোম্বাইয়ের (বিশেষ করে চেম্বুর, ঘাটকোপার ও কুরলা) বিস্তীর্ণ এলাকা নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ছোট রাজন তাঁর তিলক নগর গ্যাংকে দাউদ ইব্রাহিমের 'ডি-কোম্পানি' (D-Company)-র সাথে একীভূত করেন। এই একীভূতকরণের ফলে ডি-কোম্পানি কেবল একটি মুসলিম মাফিয়া চক্র থেকে বেরিয়ে এসে বোম্বাইয়ের প্রথম সর্বজনীন ও বহু-ধর্মীয় মেগা-সিন্ডিকেটে পরিণত হয়।
১৯৮৬: দাউদের দুবাই পলায়ন ও ছোট রাজনের মুম্বাই অপারেশন
১৯৮৬ সালে পাঠান গ্যাংয়ের শীর্ষ নেতা করিম লালার ভাইপো সামাদ খানের সাথে দাউদ ইব্রাহিমের রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ার চূড়ান্ত রূপ নেয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সামাদ খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেও মুম্বাই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের সাঁড়াশি অভিযান ও এনকাউন্টারের তীব্র আশঙ্কায় দাউদ ইব্রাহিম ভারতে থাকা নিরাপদ মনে করেননি।
আইনি বেড়াজাল ও প্রতিপক্ষের হামলা থেকে বাঁচতে তিনি কৌশলগতভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে আত্মগোপন করেন। দুবাইয়ে বসে একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেট বা 'ডি-কোম্পানি' পরিচালনা করার ভিত্তি স্থাপন করেন তিনি, যা ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একতিয়ারের বাইরে ছিল।
দাউদ ইব্রাহিম দুবাই থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত উপায়ে পরিকল্পনা সাজালেও মুম্বাইয়ের রাজপথে তার সাম্রাজ্য ধরে রাখার দায়িত্ব পড়ে ছোট রাজনের ওপর। ১৯৮৩ সালে বড় রাজনের হত্যাকাণ্ডের পর ছোট রাজন ইতোমধ্যে অপরাধ জগতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। ছোট রাজন হয়ে ওঠেন ডি-কোম্পানির মুম্বাই অপারেশনের প্রধান সেনাপতি (Chief Operating Officer)। মাঠপর্যায়ের শার্পশ্যুটার ক্যাডার বাহিনী নিয়ন্ত্রণ, এলাকা দখল এবং তোলাবাজির পুরো অপারেশন পরিচালনা করার একচ্ছত্র ক্ষমতা চলে আসে ছোট রাজনের হাতে।
অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল খাতসমূহ
রিয়েল এস্টেট ও হাপ্তা আদায়: ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মুম্বাইয়ের আবাসন খাতে বিপুল অর্থের লেনদেন শুরু হয়। ছোট রাজনের নির্দেশে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার, বহুতল ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এবং জাভেরি বাজারের সোনা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক 'হাপ্তা' বা প্রটেকশন মানি আদায় শুরু হয়। নির্ধারিত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা কিংবা নির্মাণাধীন প্রকল্পে হামলা চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হতো।
বলিউডের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ: ডি-কোম্পানি এই সময়ে হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্পে অবৈধ বা কালো টাকা সাদা করার মাধ্যম হিসেবে প্রবেশ করে। প্রভাবশালী প্রযোজক ও পরিচালকদের ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক চলচ্চিত্রে অর্থায়ন করা হতো। এছাড়া চলচ্চিত্রের ওভারসিজ ডিস্ট্রিবিউশন রাইটস (বৈদেশিক প্রদর্শনী স্বত্ব) অত্যন্ত কম দামে বা বিনামূল্যে দখল করে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হতো। কোনো শিল্পী বা প্রযোজক আদেশ অমান্য করলে দুবাই বা মুম্বাই থেকে সরাসরি মৃত্যুর হুমকি যেত।
সোনার চোরাচালান ও উপকূলীয় নেটওয়ার্ক: বোম্বাই বন্দর এবং মহারাষ্ট্রের বিস্তৃত কোঙ্কন উপকূলীয় এলাকা ব্যবহার করে দুবাই থেকে সোনা ও হিরের বিশাল চালানের অবৈধ বাণিজ্য অব্যাহত রাখা হয়। ছোট রাজনের স্থানীয় গ্যাং সদস্যরা কাস্টমস ও স্থানীয় প্রশাসনকে উৎকোচ দিয়ে চোরাই চালানের জন্য নিরাপদ 'ল্যান্ডিং পয়েন্ট' তৈরি করে রাখতো।
অভ্যন্তরীণ তিন স্তম্ভ ও দ্বন্দ্বের সূচনা: এই সময়ে দাউদ ইব্রাহিমের সাম্রাজ্যের প্রধান তিন স্তম্ভ ছিলেন ছোট রাজন, ছোট শাকিল এবং শরদ শেট্টি। শরদ শেট্টি দুবাই কেন্দ্রিক সোনা চোরাচালান ও আন্তর্জাতিক হাওলা নেটওয়ার্ক সামলাতেন। ছোট রাজন ছিলেন সরাসরি মুম্বাইয়ের মাঠপর্যায়ের ক্যাডারদের সর্বাধিনায়ক। অন্যদিকে, ছোট শাকিল ছিলেন দাউদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক উপদেষ্টা ও নীতিনির্ধারক। রাজনের মাঠপর্যায়ের প্রভাবের বিপরীতে দাউদের সাথে ছোট শাকিলের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ডি-কোম্পানির ভেতরে ক্ষমতার সূক্ষ্ম ভারসাম্যহীনতা ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে।
এই সময়ে দাউদের প্রধান তিন স্তম্ভ ছিলেন ছোট রাজন, ছোট শাকিল (Chhota Shakeel) এবং শরদ শেট্টি (Sharad Shetty)। তবে অভ্যন্তরীণ সূক্ষ্ম দ্বন্দ্বে ছোট রাজন সবসময়ই মাঠপর্যায়ের ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণ করতেন, যেখানে ছোট শাকিল ছিলেন দাউদের ব্যক্তিগত অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক পরামর্শদাতা।
১৯৯৩ সালের বোম্বাই বিস্ফোরণ ও "দেশপ্রেমিক হিন্দু ডন"
১৯৯৩ সালের মার্চ মাস ছিল ভারতীয় আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং ছোট রাজনের জীবনের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক মোড়। ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বিস্ফোরণের আগ পর্যন্ত দাউদ ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন ‘ডি-কোম্পানি’ ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে একটি ঐক্যবদ্ধ অপরাধ সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচালিত হতো।
১২ই মার্চ ১৯৯৩ বোম্বাই বিস্ফোরণ
১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বোম্বাইয়ে (বর্তমান মুম্বাই) ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI), আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম এবং তার প্রধান সহযোগী টাইগার মেমন যৌথভাবে ভারতে এক নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলার মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে।
১৯৯৩ সালের ১২ই মার্চ দুপুরে বোম্বাইয়ের ১২টি কৌশলগত স্থানে যেমন বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ, এয়ার ইন্ডিয়া বিল্ডিং, প্লাজা সিনেমা, সেঞ্চুরি বাজার, ঝাভেরি বাজার ও পাসপোর্ট অফিস ধারাবাহিক বোমারু হামলা চালানো হয়। আরডিএক্স (RDX) বিস্ফোরক ব্যবহার করে চালানো এই হামলায় মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ২৫৭ জন নিরীহ নাগরিক প্রাণ হারান এবং ৭০০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন। এটি ছিল ভারতের ইতিহাসে প্রথম ও অন্যতম বিধ্বংসী সংগঠিত সন্ত্রাসী হামলা, যা বোম্বাইয়ের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকে তছনছ করে দেয়।
ডি-কোম্পানি ত্যাগ ও বৈাদাদৃশ্য
এই ঘটনায় ভারতের জাতীয় রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় চরম আঘাত লাগে। ছোট রাজন, যিনি নিজে একজন মারাঠি হিন্দু ছিলেন, এই ধারাবাহিক বিস্ফোরণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন থেকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন। ১৯৯৩ সালের বিস্ফোরণের মূল পরিকল্পনা সম্পূর্ণ গোপনে দাউদ, মেমন ভাইরা এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মুসলিম সহযোগীদের মাধ্যমে সাজানো হয়। বিস্ফোরণের পর যখন স্পষ্ট হয় যে ভারতের বিরুদ্ধে এই রাষ্ট্রবিরোধী হামলায় ডি-কোম্পানি সরাসরি যুক্ত, তখন গ্যাংটির হিন্দু ও মুসলিম সদস্যদের মধ্যে গভীর মেরুকরণ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। ছোট রাজন বুঝতে পারেন যে তাকে ও তার মারাঠি-হিন্দু সহযোগীদের অন্ধকারে রেখে এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
দাউদ ইব্রাহিম ও মেমন ভাইদের এই রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছোট রাজন মেনে নিতে পারেননি। বিস্ফোরণের কয়েক মাসের মধ্যেই ছোট রাজন প্রকাশ্যে দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে বহু বছরের বাণিজ্যিক ও অপরাধমূলক সম্পর্ক বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। তিনি মুম্বাই ছেড়ে চলে যান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ব্যাংকককে কেন্দ্র করে নিজস্ব নতুন অপরাধ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
ছোট রাজনের সঙ্গে ডি-কোম্পানি ত্যাগ করেন তার অনুগত বহু শীর্ষ হিন্দু গ্যাংস্টার যেমন ওপি সিং (OP Singh), রোহিত বর্মা (Rohit Verma), বালু ডোকরে (Balu Dokre), সাধু শেট্টি (Sadhu Shetty) এবং গুরু সাতাম। এই ঐতিহাসিক বিভাজনের মাধ্যমে মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে: দাউদ-ছাওতার সমর্থিত অংশ এবং ছোট রাজনের নেতৃত্বাধীন নতুন দল।
"দেশপ্রেমিক হিন্দু ডন" ভাবমূর্তির প্রতিষ্ঠা
ডি-কোম্পানি ত্যাগের পর ছোট রাজন নিজেকে কেবল একজন সাধারণ অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন না করে "দেশপ্রেমিক হিন্দু ডন" (Patriotic Hindu Don) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি প্রচার শুরু করেন যে তিনি ভারতবিরোধী সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে লড়ছেন এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ও দাউদ ইব্রাহিমের মতো "রাষ্ট্রদ্রোহী" শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা তার মূল লক্ষ্য।
তৎকালীন স্থানীয় রাজনীতি, বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও শিবসেনার সহানুভূতি লাভ করতে এই ভাবমূর্তি তাকে সহায়তা করে। ছোট রাজন নিজেকে ভারতের স্বার্থ রক্ষাকারী এক বিকল্প আন্ডারওয়ার্ল্ড নেতা হিসেবে তুলে ধরেন, যা তাকে দাউদের ভাবমূর্তির ঠিক বিপরীতে অবস্থান নিতে সাহায্য করেছিল।
নিজেদের "দেশপ্রেমিক" প্রমাণের অংশ হিসেবে ছোট রাজনের গ্যাং ১৯৯৩ সালের বোম্বাই বিস্ফোরণের অভিযুক্ত এবং দাউদের সহযোগীদের ওপর একের পর এক হিট স্কোয়াড পাঠাতে শুরু করে। তারা মুম্বাই ও নেপালে বেশ কয়েকজন বিস্ফোরণের অভিযুক্ত ও দাউদ ইব্রাহিমের অনুসারী সলিম কুর্লা, মজিদ খান, হানিফ কাদাওয়ালা এবং মোহাম্মদ জিন্দরানকে রাজনের শুটাররা প্রকাশ্যে হত্যা করে। এর জবাবে দাউদের মূল সহযোগী ছোট শাকিল (Chhota Shakeel) রাজনের ওপর চরম প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে।
২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংককের একটি অ্যাপার্টমেন্টে ছোট শাকিলের হিট স্কোয়াড ছোট রাজনের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানোয় তার প্রধান সহযোগী রোহিত বর্মা নিহত হন। রাজন নিজে গুরুতর আহত হলেও পরবর্তীতে ব্যাংককের হাসপাতাল থেকে নাটকীয়ভাবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এই ঘটনা দুটি গ্যাংয়ের মধ্যে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত জিইয়ে রেখেছিল।
ছোট রাজন ও ডি-কোম্পানির রক্তক্ষয়ী সংঘাত
ছোট রাজনের জীবনের প্রধান প্রধান ঘটনা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, আন্তর্জাতিক পলায়ন এবং আইনি পরিণতি নিচে একটি সারণীর মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
বছর/তারিখ | ঘটনা ও স্থান | প্রতিপক্ষ/সম্পর্কিত চরিত্র | ফলাফল ও ঐতিহাসিক প্রভাব |
১৯৮৩ | চেম্বুরে প্রকাশ্যে হত্যা, মুম্বাই। | আব্দুল কুঞ্জু (প্রতিপক্ষ গ্যাংস্টার) | গুর রাজান নায়ার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ এবং ছোট রাজনের ক্ষমতার প্রকাশ। |
১৯৮৬ | মুম্বাই থেকে দুবাই গমন। | দাউদ ইব্রাহিম ও মুম্বাই পুলিশ | পুলিশের এনকাউন্টার এড়াতে দুবাই গমন এবং ডি-কোম্পানির মুম্বাই প্রধান হওয়া। |
১৯৯৩ | ডি-কোম্পানি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ। | দাউদ ইব্রাহিম ও ছোট শাকিল | বোম্বাই বিস্ফোরণের পর আলাদা গ্যাং গঠন ও নিজেকে "দেশপ্রেমিক ডন" ঘোষণা। |
১৯৯৮ | কাঠমান্ডু বিমানবন্দর ও নেপাল অপারেশন। | মির্জা দিলশাদ বেগ (নেপালি এমপি) | দাউদ ইব্রাহিম ও আইএসআই-র ঘনিষ্ঠ নেপালি রাজনীতিবিদকে গুলি করে হত্যা। |
সেপ্টেম্বর ২০০০ | ব্যাংককের সুকুমভিত রোডে হামলা, থাইল্যান্ড। | মুন্না ঝিংগারা ও ছোট শাকিল (ডি-কোম্পানি) | রাজনের অন্যতম প্রধান রোহিত বর্মা নিহত; রাজন গুলিবিদ্ধ হলেও নাট্যমঞ্চীয় পলায়ন। |
২০০৩ | ব্যাঙ্কক ও দূরপ্রাচ্য অপারেশন। | শরদ শেট্টি (দাউদের অর্থসংসংক্রান্ত প্রধান) | দুবাইয়ের এক ক্লাবে দাউদের ডানহাত শরদ শেট্টিকে রাজন গ্যাংয়ের শুটারদের দ্বারা হত্যা। |
জুন ২০১১ | পাওয়াই, মুম্বাইয়ে প্রকাশ্যে সাংবাদিক হত্যা। | জ্যোতির্ময় দে (জে ডে - অনুসন্ধানী সাংবাদিক) | ক্রাইম রিপোর্টারকে হত্যার দায়ে রাজনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও মুম্বাই পুলিশের চিরুনি অভিযান। |
২৫ অক্টোবর ২০১৫ | বালি বিমানবন্দর, ইন্দোনেশিয়া। | ইন্টারপোল ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (R&AW) | ভুয়া পাসপোর্টে ভ্রমণের সময় গ্রেপ্তার ও নভেম্বরে ভারতে হস্তান্তর। |
মে ২০১৮ | বিশেষ সিবিআই আদালত, মুম্বাই। | ভারত সরকার ও সিবিআই | জে ডে হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। |
(তথ্যসূত্র: মুম্বাই পুলিশ ক্রাইম ব্রাঞ্চ, সিবিআই চার্জশীট ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সংকলন)
ব্যাংকক হত্যাচেষ্টা (২০০০): এক অলৌকিক ও নাট্যময় পলায়ন
ডি-কোম্পানি এবং ছোট রাজনের মধ্যকার দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সবচেয়ে নাটকীয় ও ভয়াবহ অধ্যায়টি রচিত হয় ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে।
হামলা এবং রোহিত বর্মার মৃত্যু: ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে ছোট রাজন তাঁর অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী রোহিত বর্মা (Rohit Verma)-র আমন্ত্রণে ব্যাংককের সুকুমভিত রোডের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থান করছিলেন। ছোট শাকিল তাঁর নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক মারফত রাজনের অবস্থান নিশ্চিত করেন এবং পাকিস্তানের পেশোয়ার ও মুম্বাই থেকে বাছাই করা শুটারদের (যার নেতৃত্বে ছিলেন মুন্না ঝিংগারা) ব্যাংককে পাঠান।
১৬ই সেপ্টেম্বর রাতে, শুটাররা রাজনের ফ্ল্যাটে ঢুকে স্বয়ংসক্রিয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই রাজনের ডানহাত রোহিত বর্মা নিহত হন এবং রোহিতের স্ত্রী গুরুতর আহত হন। ছোট রাজন পেটে ও পায়ে একাধিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। শুটাররা মনে করেছিল রাজন মারা গেছেন, তাই তারা স্থান ত্যাগ করে।
সামিতিভেজ হাসপাতাল ও চার তলার জানালা দিয়ে পলায়ন
গুরুতর আহত অবস্থায় রাজনকে স্থানীয় সামিতিভেজ হাসপাতালে (Samitivej Hospital) ভর্তি করা হয়। থাই পুলিশ হাসপাতালটি কড়া নিরাপত্তায় ঘিরে ফেলে এবং খবর পেয়ে ছোট শাকিলের শুটাররা রাজনকে হাসপাতালে গিয়েই শেষ করে দেওয়ার জন্য হাসপাতালের বাইরে ওঁৎ পেতে থাকে।
এখানেই ঘটে অপরাধ জগতের ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ঘটনা। হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজন বুঝতে পারেন যে থাই পুলিশ তাঁকে ভারতে প্রত্যর্পণ করতে পারে অথবা শাকিলের শুটাররা তাকে হত্যা করবে।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার গোপন সহায়তায় এবং রাজনের অনুগত ক্যাডারদের সাহায্যে, রাজন নিজের জখম শরীর নিয়েই গভীর রাতে হাসপাতালের চার তলার পাইপ ও চাদর পেঁচানো দড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন।
বাইরে অপেক্ষারত একটি গাড়িতে করে তাঁকে দ্রুত ব্যাংককের সীমানা পার করে প্রাইভেট বিমানে এক গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই অলৌকিক বেঁচে যাওয়া আন্ডারওয়ার্ল্ডে রাজনের রূপকথার জন্ম দেয়।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সন্দেহপ্রবণতা ও সাম্রাজ্যের ধস (২০০০ – ২০১৫)
ব্যাংকক হামলা থেকে বেঁচে গেলেও ছোট রাজনের শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক স্থিরতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি অত্যন্ত একা এবং মারাত্মক মাত্রায় সন্দেহপ্রবণ (Paranoid) হয়ে পড়েন। নিজের ছায়াঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও তিনি দাউদের খবরি (ইনফর্মার) বলে সন্দেহ করতে শুরু করেন।
নিজস্ব ক্যাডারদের হত্যা ও সংঘাত
ওপি সিং হত্যা (২০০৩): রাজনের সন্দেহ হয় যে তাঁর সেনাপতি ওপি সিং (OP Singh) নিজেই আলাদা গ্যাং তৈরি করতে চান এবং দাউদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। রাজনের নির্দেশে ২০০৩ সালে জেলখানার ভেতরেই ওপি সিংকে নিজ গ্যাংয়ের শুটার দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
দলছুট হওয়া: ওপি সিংয়ের নির্মম পরিণতি দেখে রাজনের বাকি বিশ্বস্ত সহযোগী ভারত নেপালি (Bharat Nepali), সন্তোষ শেট্টি (Santosh Shetty) এবং বিজয় শেট্টি (Vijay Shetty) রাজনীতি ও নিজেদের জীবন বাঁচাতে রাজন গ্যাং ছেড়ে বেরিয়ে যান এবং পৃথক পৃথক ছোট গ্যাং তৈরি করেন। এর ফলে ছোট রাজনের শক্তি অর্ধেকের নিচে নেমে আসে।
সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দে (জে ডে) হত্যা (২০১১)
২০১১ সালের ১১ই জুন মুম্বাইয়ের পাওয়াই এলাকায় বিখ্যাত ক্রাইম সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দে (J Dey)-কে প্রকাশ্যে চারজন বাইক আরোহী শুটার গুলি করে হত্যা করে।
জে ডে মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের ওপর বেশ কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখছিলেন, যেখানে ছোট রাজনের সাম্রাজ্যের পতন এবং তাঁর দুর্বল শারীরিক অবস্থা নিয়ে তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল।
রাজন মনে করেছিলেন জে ডে তাঁকে হেয় করছেন এবং প্রতিপক্ষ দাউদ গ্যাংয়ের হয়ে তথ্য প্রচার করছেন। এই হত্যাকাণ্ড ছোট রাজনের কথিত "দেশপ্রেমিক" ইমেজের ওপর চরম আঘাত হানে এবং ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাঁর পেছনে পূর্ণ শক্তিতে নেমে পড়ে।
গ্রেপ্তার, ভারতে প্রত্যাবর্তন ও আইনি পরিণতি (২০১৫ – বর্তমান)
ব্যাংকক হামলার পর থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর ছোট রাজন ছদ্মনামে বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেরিয়েছেন। তিনি 'বিজয় কদম' (Vijay Kadam) নামীয় এক ভারতীয় ভুয়া পাসপোর্টে থাইল্যান্ড, নেপাল, জিম্বাবুয়ে, অস্ট্রেলিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় আত্মগোপন করেছিলেন।
২৫শে অক্টোবর ২০১৫-বালিতে গ্রেপ্তার: ২০১৫ সালের অক্টোবরে ছোট রাজন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে ভ্রমণ করছিলেন। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা R&AW এবং ক্যানবেরার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আগাম তথ্য পেয়ে ইন্টারপোল বালির এনগুরহ রাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (Ngurah Rai International Airport) অভিযান চালায়।
২৫শে অক্টোবর ২০১৫ তারিখে বিমানবন্দর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুরুতে নিজেকে বিজয় কদম বলে দাবি করলেও আঙুলের ছাপ ও বায়োমেট্রিক তথ্য মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি মোস্ট ওয়ান্টেড গ্যাংস্টার ছোট রাজন।
ভারতে প্রত্যাবর্তন ও অতি-সুরক্ষিত তিহার জেল: ১৫ই নভেম্বর ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়া সরকার রাজনকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই (CBI)-র হাতে তুলে দেয়। নিরাপত্তার চরম ঝুঁকির কারণে (কারণ ডি-কোম্পানি তাঁকে জেলে বা আদালতে হত্যা করার ছক কষছিল) তাঁকে মুম্বাইয়ে না নিয়ে সরাসরি নয়াদিল্লির অতি-সুরক্ষিত তিহার জেলের (Tihar Jail, Jail No. 2) হাই-সিকিউরিটি সেল-এ বন্দী রাখা হয়।
২০১৮ সালের যাবজ্জীবন সাজা: ২০১৮ সালের ২ই মে, মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ের বিশেষ সিবিআই আদালত ২০১১ সালের সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দে (জে ডে) হত্যা মামলায় ছোট রাজনকে প্রধান দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে (Life Imprisonment) দণ্ডিত করে। বর্তমানে রাজনের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, খুন, সুপারি কিলিং ও গ্যাংওয়ার সংক্রান্ত ৭০টিরও বেশি মামলা বিভিন্ন আদালতে বিচারধীন রয়েছে।
পপ-কালচার ও চলচ্চিত্রে ছোট রাজনের চিত্রায়ন
বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় দুই চরিত্র দাউদ ইব্রাহিম ও ছোট রাজনের দ্বৈরথ ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পকে (বিশেষ করে বলিউড) ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। একাধিক ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্রে ছোট রাজনের জীবন ও ডি-কোম্পানির বিভাজনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
রাম গোপাল বর্মার 'Company' (২০০২)
বলিউডের বিখ্যাত পরিচালক রাম গোপাল বর্মার কালজয়ী ছবি 'কোম্পানি' (Company) সরাসরি দাউদ ইব্রাহিম ও ছোট রাজনের দ্বন্দ্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
ছবিতে অজয় দেবগন অভিনয় করেছিলেন 'মাঝিক ভাই' (দাউদ ইব্রাহিম) চরিত্রে। অভিনেতা বিবেক ওবেরয় তাঁর আত্মপ্রকাশের ছবিতেই 'চান্দু' (Chandu) চরিত্রে অভিনয় করেন, যা সরাসরি ছোট রাজনের চরিত্র ও ডি-কোম্পানি থেকে তাঁর আলাদা হওয়ার পটভূমিকে ফুটিয়ে তোলে।
'Vaastav: The Reality' (১৯৯৯)
মহেশ মাঞ্জরেকর পরিচালিত 'বাস্তব' ছবিতে সঞ্জয় দত্ত অভিনয় করেছিলেন 'রঘুনাথ নামদেব শিবালকর' বা 'রঘু' চরিত্রে। একজন সাধারণ মারাঠি তরুণের দুর্ঘটনাবশত আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রবেশ, টিকে থাকার লড়াই এবং পরবর্তীতে নিজের গ্যাং গঠন করার পেছনের গল্পে ছোট রাজনের প্রাথমিক জীবনের বেশ কিছু ছায়া দেখা যায়।
উপসংহার
রাজেন্দ্র সদাশিব নিকালজে ওরফে ছোট রাজনের অপরাধ জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন সাধারণ অপরাধী ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভারতীয় সংগঠিত অপরাধের এক জটিল অধ্যায়। একদিকে দারিদ্র্য ও পরিবেশের কারণে টিকিটের কালোবাজারি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টার হওয়া, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতার দোহাই দিয়ে নিজেকে "দেশপ্রেমিক ডন" হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কৌশলগত রাজনীতি রাজন নিজেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যান্য ডনদের চেয়ে আলাদা হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন।
তবে ইতিহাসের নির্মম সত্যি হলো, সহিংসতা ও অপরাধের পথ শেষ পর্যন্ত অন্ধকারেই বিলীন হয়। যে ছোট রাজন দুই দশক ধরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা নিজের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছিলেন এবং একাধিক হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন, সেই রাজনের শেষ পরিণতি হয়েছে তিহার জেলের অতি-সুরক্ষিত চার দেয়ালের নির্জন কক্ষে।
ছোট রাজনের পতন ও কারাবাস কেবল একটি অপরাধ চক্রের সমাপ্তিই নির্দেশ করে না, বরং এটি প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের হাত থেকে কোনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের অধিপতিই চিরকাল মুক্ত থাকতে পারে না।






















