কাটার মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান – বাংলাদেশের ক্রিকেট কিংবদন্তি

বিশ্ব ক্রিকেটের আড়াইশো বছরের ইতিহাসে এমন কিছু বোলারের আগমন ঘটেছে, যাঁদের বোলিং শৈলী কেবল ব্যাটসম্যানদের আউটই করেনি, বরং ক্রিকেট নামক খেলাটির প্রথাগত ব্যাকরণ ও কৌশলকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছে। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পাকিস্তান দলের ওয়াসিম আকরাম ও ওয়াকার ইউনিসের রিভার্স-সুইং যেমন আন্তর্জাতিক ব্যাটিং লাইনে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, কিংবা একবিংশ শতাব্দীর সূচনে লঙ্কান স্পিন যাদুকর মুত্তিয়া মুরালিধরনের দুসরা যেভাবে বিশ্বসেরা ব্যাটারদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিয়েছিল ঠিক একইভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাঁহাতি পেস বোলিংয়ের এক বিষ্ময়কর ও রূপান্তরমূলক বিপ্লবের নাম মোস্তাফিজুর রহমান। বিশ্ব ক্রিকেট যাঁকে চেনে এক অনন্য উপাধিতে: "কাটার মাস্টার" (The Cutter Master) বা "দ্য ফিজ" (The Fiz)।
২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এক শান্ত, নম্র ও লাজুক, সাতক্ষীরার প্রান্তিক গ্রাম থেকে উঠে আসা ১৯ বছরের তরুণ যখন হাত উঁচিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বমঞ্চে পদার্পণ করলেন, তখন পুরো ক্রিকেট বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে দেখেছিল এক অদ্ভুত দৃশ্য একজন বাঁহাতি পেসারের হাতের কবজির মোচড়ে বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানদের ব্যাকফুটে অসহায় আত্মসমর্পণ। ভারতের রোহিত শর্মা, মহেন্দ্র সিং ধোনি ও বিরাট কোহলি থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স কিংবা হাশিম আমলা কাউকেই প্রাথমিক পর্যায়ে মোস্তাফিজের বিষাক্ত কাটারের গোলকধাঁধা ভাঙার উত্তর জানা ছিল না।
২০২৫ সালে ৩০ বছর বয়সে পা রেখেও মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সব ফরম্যাটের পেস আক্রমণের প্রধান স্তম্ভ এবং বিশ্বব্যাপী টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর চরম চাহিদাসম্পন্ন এক বৈশ্বিক পেস সেনসেশন। এই দীর্ঘ ও বিশদ নিবন্ধে আমরা পর্যালোচনা করব সাতক্ষীরার মেঠো পথ থেকে লন্ডনের লর্ডস ও আইপিএলের মেগা স্টেজ জয়ের বিস্ময়কর গল্প, তাঁর বোলিংয়ের বৈজ্ঞানিক ও বায়োমেকানিকাল কলাকৌশল, আন্তর্জাতিক ও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্যারিয়ার, ইনজুরি জয় করে ফিরে আসার ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর স্থায়ী উত্তরাধিকার।
সাতক্ষীরার প্রান্তিক গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক অ্যারেনায় পদার্পণ (১৯৯৫ - ২০১৫)
মোস্তাফিজুর রহমানের জন্ম ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের প্রান্তিক জেলা সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে। অত্যন্ত সাধারণ এক গ্রামীণ পরিবারে চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মোস্তাফিজ ছিলেন সবার ছোট। শৈশবে প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার চেয়ে গ্রামের ধুলোবালি ও খোলা মাঠে ক্রিকেট বলের প্রতিই তাঁর সহজাত আকর্ষণ ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি যখন গ্রামের মেঠো পথে বন্ধুদের সাথে টেপ-টেনিস এবং চামড়ার বলে বল করতেন, তখন থেকেই স্বাভাবিক বাঁহাতি কোণ (Angle) এবং প্রাকৃতিক গতিতে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার ক্ষমতা তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত হতো।
তবে সাতক্ষীরা সদর শহর থেকে মোস্তাফিজের গ্রাম তেঁতুলিয়ার দূরত্ব ছিল প্রায় ৪০ কিলোমিটার। গ্রাম থেকে গিয়ে নিয়মিত জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট অনুশীলনে যোগ দেওয়া এবং পেশাদার কোচিং গ্রহণ করা এক দরিদ্র ও গ্রাম্য কিশোরের জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব এক বাধা। ঠিক সেই মুহূর্তে মোস্তাফিজের জীবনে ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটে তাঁর সেজ ভাই মোখলেছুর রহমানের। মোখলেছুর তাঁর ছোট ভাইয়ের সহজাত বাঁহাতি সুইং ও নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ দেখে বুঝতে পেরেছিলেন এই কিশোরের মধ্যে অসাধারণ কিছু করার ক্ষমতা লুকিয়ে আছে।
প্রতিদিন অতি প্রত্যূষে ভাই মোখলেছুর মোস্তাফিজকে নিজের মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার কাঁচা ও আধাপাকা পথ পাড়ি দিয়ে সাতক্ষীরা জেলা স্টেডিয়ামে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যেতেন। রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে মোখলেছুরের এই আত্মত্যাগই পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ও বিশ্ব ক্রিকেটকে উপহার দেয় এক অনন্য অলৌকিক পেস প্রতিভা।
অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ, বিসিবি পেস একাডেমি ও জাতীয় দলে সুযোগ
সাতক্ষীরা জেলা দলের হয়ে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফর্ম করার পর মোস্তাফিজ নজর কাড়েন জাতীয় জুনিয়ন নির্বাচকদের। ২০১৪ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান মোস্তাফিজ। সেই টুর্নামেন্টে ৬ ম্যাচে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট শিকার করে তিনি নিজের অসাধারণ সম্ভাবনা জানান দেন।
অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ শেষে বিসিবির (BCB) হাই-পারফর্ম্যান্স পেস বোলিং ফাউন্ডেশনে যোগ দেন তিনি। তৎকালীন বাংলাদেশ জাতীয় দলের হেড কোচ চণ্ডিকা হাথুরুসিংহে এবং অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা নেটে মোস্তাফিজের আনক্ল্যাসিকাল বোলিং অ্যাকশন ও প্রাকৃতিক কাটার দেখে বিষ্মিত হন। মাশরাফি প্রথম দিনই মোস্তাফিজকে দেখে বুঝেছিলেন, স্বাভাবিক যেকোনো ফাস্ট বোলারের চেয়ে এই তরুণের বলের মুভমেন্ট সম্পূর্ণ আলাদা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাটসম্যানদের জন্য এটি হবে চরম ধাঁধাস্বরূপ।
২০১৫ সালের ২৪ এপ্রিল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে একটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাত্র ১৯ বছর বয়সে মোস্তাফিজের আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পদার্পণ করেই প্রথম ম্যাচে টি-টোয়েন্টির তৎকালীন ভয়ংকরতম ব্যাটার শাহিদ আফ্রিদিকে নিজের কাটার বল দিয়ে বিভ্রান্ত করে আন্তর্জাতিক উইকেটের খাতা খোলেন তিনি।
কাটার মাস্টারের বোলিং শৈলী: বৈজ্ঞানিক ও বায়োমেকানিকাল রহস্য
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাধারণত কোনো তরুণ বোলার এলে তাঁর বোলিং অ্যাকশনের ভিডিও অ্যানালাইসিস করে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক বিচারে শীর্ষ সারির ব্যাটাররা তাঁর কৌশল ধরে ফেলেন। কিন্তু মোস্তাফিজের অফ-কাটার এমন এক বৈজ্ঞানিক বিস্ময়, যা ১০ বছর ধরে বায়োমেকানিকাল ল্যাবে গবেষণা করেও এবং শত শত ঘণ্টা ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেও ব্যাটসম্যানদের ক্রিজে পুরোপুরি সামলানো সম্ভব হয়নি।
অতিরিক্ত নমনীয় কবজি ও কনুই
বায়োমেকানিকাল গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ ফাস্ট বোলাররা বল রিलीज করার সময় তাঁদের কবজি (Wrist) সোজা রাখেন এবং পুরো বাহুর (Forearm) শক্তিতে বলের পেস বাড়ান। অন্যদিকে স্পিনাররা আঙুল ও কবজি ঘুরিয়ে বলকে স্পিন করান। কিন্তু মোস্তাফিজের ক্ষেত্রে ঘটে এক বিরল শারীরিক ব্যতিক্রম।
মোস্তাফিজের কনুই এবং কবজির পেশি ও লিগামেন্ট স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে অতিরিক্ত নমনীয় (Hyper-flexible)। তিনি বল ছাড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে (Release Point) আঙুলের ডগা দিয়ে বলটি চেপে ধরে ফাস্ট বোলিং অ্যাকশন বজায় রেখেই পুরো কবজিকে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি কোণে ভেতরের দিকে মুচড়ে বা ঘোরাতে পারেন (Pronation)। এটি করার ফলে বলটি ফাস্ট বোলারের হাত থেকে বের হলেও পিচে পড়ে সাধারণ অফ-স্পিনারের মতো অবিশ্বাস্য গতিতে বাঁক নেয়।
আর্ম-স্পিডের ছদ্মবেশ
যেকোনো ব্যাটারের জন্য স্লোয়ার বা কাটার ডেলিভারি বোঝার সবচেয়ে বড় উপায় হলো বোলারের রান-আপ ও হাত ঘোরানোর গতি (Arm Speed) লক্ষ্য করা। সাধারণ বোলাররা যখন ধীরগতির বল করেন, তখন তাঁদের আর্ম-স্পিড স্বতঃস্ফূর্তভাবে কমে যায়, যা দেখে আন্তর্জাতিক ব্যাটাররা ফ্রন্টফুটে বা ব্যাকফুটে নিজেদের প্রস্তুত করার অতিরিক্ত কয়েক মিলিসেকেন্ড সময় পান।
কিন্তু মোস্তাফিজুর রহমানের মূল মারণাস্ত্র হলো তাঁর "আর্ম-স্পিড ডিসেপশন"। তিনি ১৩8-১৪০ কিমি/ঘণ্টার দ্রুতগতির বল ডেলিভারি করার সময় তাঁর শরীর, রিলিজ পয়েন্ট এবং হাত ঘোরানোর গতি ঠিক যেমন রাখেন, ১১২-১১৮ কিমি/ঘণ্টার বিষাক্ত স্লোয়ার কাটারটি ছাড়ার সময়ও অবিকল একই গতি ও ভঙ্গি বজায় রাখেন!
ফলে ব্যাটসম্যানের মস্তিষ্ক হিসাব করে যে বলটি তাঁর দিকে দ্রুতগতিতে আসছে, কিন্তু পিচে পড়ার পর বলটি হঠাৎ গতি হারিয়ে ও দিক পরিবর্তন করে ব্যাটে আঘাত করার পরিবর্তে স্টাম্প চুরমার করে দেয় অথবা ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে ক্যাচে পরিণত হয়।
স্লোয়ার বাউন্সার, ওয়াইড-ইয়র্কার ও কোণের ব্যবহার
কেবল অফ-কাটারই নয়, ক্যারিয়ারের বিবর্তনের সাথে সাথে মোস্তাফিজ তাঁর বোলিং অস্ত্রের ভাঁজারে আরও কিছু ধারালো অস্ত্র যুক্ত করেছেন: ১. স্লোয়ার বাউন্সার: মোস্তাফিজের বাঁহাতি কোণ থেকে ব্যাটসম্যানের কাঁধের ওপর আসা স্লোয়ার বাউন্সার খেলা যেকোনো পাওয়ার-হিটারের জন্য চরম কঠিন। কারণ বলটি ব্যাটে আসার আগেই ব্যাটসম্যানের সুইং শেষ হয়ে যায়। ২. ওয়াইড-ইয়র্কার (Wide-Yorker): বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের শেষ ওভারে (Death Overs) মোস্তাফিজ ব্যাটসম্যানের লেগ-সাইডের শট মারার ক্ষমতা অবশ করতে স্টাম্প থেকে বেশ খানিকটা বাইরে নিখুঁত অফ-সাইড ইয়র্কার ফেলেন। ৩. অ্যাঙ্গেল অ্যান্ড ইনসুইঙ্গার: ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের জন্য ওভার দ্য উইকেট থেকে কোণ করে ভেতরে ঢোকানো বল এবং হঠাৎ বাইরের দিকে নিয়ে যাওয়া কাটারের মিশ্রণ তাঁর বোলিংকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান ও রেকর্ড বই (২০২৫ পর্যন্ত তথ্য)
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে এবং প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে মোস্তাফিজুর রহমানের দীর্ঘ ১০ বছরের পারফরম্যান্সের এক সামগ্রিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
ফরম্যাট / ক্যাটাগরি | ম্যাচ সংখ্যা | মোট ওভার | সংগৃহীত উইকেট | বোলিং গড় (Avg) | ইকোনমি রেট (Econ) | স্ট্রাইক রেট (SR) | সেরা বোলিং ফিগার (BBI) | ৫ উইকেট (5w) |
টেস্ট ক্রিকেট (Test) | ১৫ | ৩৮২.৪ | ৩১ | ৩৬.৭৩ | ৩.১০ | ৭০.৮ | ৫/৬৬ | ০ |
ওয়ানডে ক্রিকেট (ODI) | ৭০ | ৫৯৬.২ | ১৩০ | ২২.৮৩ | ৫.০৮ | ২৬.৯ | ৬/৪৩ | ৫ |
টি-টোয়েন্টি আই (T20I) | ১১৫ | ৪০৫.১ | ১৮৭ | ২৩.০৭ | ৭.৩২ | ১৮.৯ | ৬/১০ | ২ |
প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট (FC) | ৩৫ | ৮০২.০ | ৯১ | ২৬.৬৪ | ২.৮৮ | ৫৫.৫ | ৬/৩৩ | ৩ |
আইপিএল (IPL Career) | ৭৪ | ২৭৪.০ | ৮৫ | ২৯.১১ | ৭.৯২ | ২২.০ | ৪/২৯ | ০ |
সর্বমোট আন্তর্জাতিক | ২০০ | ১৩৮৪.১ | ৩৪৮ | ২৩.৯৫ | ৫.১২ | ২৩.৮ | ৬/১০ | ৭ |
নোট: আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি জয়যুক্ত ম্যাচে (১১৫ ম্যাচে ৫৩টি জয়) বোলিং করার অনন্য রেকর্ডের গৌরবময় অংশীদার মোস্তাফিজুর রহমান।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম শিকারের স্মারক তালিকা
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুব কম বোলারই আছেন, যাঁদের অভিষেক ও ক্যারিয়ার ভিত্তিক প্রথম শিকার হওয়া প্রথম ব্যাটসম্যানরা সবাই ছিলেন ক্রিকেটের এক একটি প্রবাদপ্রতীম মহীরুহ বা বিশ্বসেরা বিশ্ববিখ্যাত তারকা। মোস্তাফিজের আন্তর্জাতিক ও ফ্র্যাঞ্চাইজি জীবনের 'প্রথম শিকারের' তালিকাটি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি বড় মঞ্চে বড় শিকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
বিস্তারিত অভিষেক ও প্রথম উইকেট মাইলফলক
প্রথম টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক উইকেট — শাহিদ আফ্রিদি (پاکستان, ২৪ এপ্রিল ২০১৫): মিরপুরের শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে নিজের জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও ভয়ংকর হিটার শাহিদ আফ্রিদিকে একটি বিষাক্ত অফ-কাটারে বিভ্রান্ত করে মিড-অফে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রথম শিকার নিশ্চিত করেন।
প্রথম ওয়ানডে আন্তর্জাতিক উইকেট — রোহিত শর্মা (ভারত, ১৮ জুন ২০১৫): ভারতের বিরুদ্ধে ওয়ানডে অভিষেকের রাতে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ওপেনার রোহিত শর্মাকে স্লোয়ার অফ-কাটারে কভারে ক্যাচ বানিয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ার শুরু করেন। এই ম্যাচেই তিনি ৫/৫০ লাভ করে ভারতকে ধ্বংস করে দেন।
প্রথম টেস্ট উইকেট — হাশিম আমলা (দক্ষিণ আফ্রিকা, ২১ জুলাই ২০১৫): চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকের এক ওভারেই ৩টি উইকেট নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটকে তোলপাড় করে দেন! তাঁর প্রথম টেস্ট শিকার ছিলেন তৎকালীন টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের ১ নম্বর ব্যাটার হাশিম আমলা (লেগ বিফোর উইকেট)।
প্রথম বিপিএল (BPL) উইকেট — মারলন স্যামুয়েলস (২০১৫): বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে খেলার সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুইবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী নায়ক মারলন স্যামুয়েলসকে আউট করে বিপিএল ক্যারিয়ারের চমৎকার সূচনা করেন।
প্রথম আইপিএল (IPL) উইকেট — এবি ডি ভিলিয়ার্স (সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ, ২০১৬): ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের হয়ে বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে নিজের প্রথম ওভারেই রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের ব্যাটিং জাদুকর 'মিষ্টার ৩৬০ ডিগ্রি' এবি ডি ভিলিয়ার্সকে এক অবিশ্বাস্য ডেড-সোজা ক্রাসিং ইয়র্কারে বোল্ড করে আইপিএলে স্বাগতম জানান।
প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ উইকেট — স্টিভ স্মিথ (অস্ট্রেলিয়া, ২০১৬): ২০১৬ সালে ভারতের বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক স্টিভ স্মিথকে নিজের ট্রেডমার্ক কাটারে এলবিডব্লিউ (LBW) ফাঁদে ফেলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম উইকেটের চ্যাপ্টার খোলেন।
প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ উইকেট — ডেভিড মিলার (দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১৯): ওভাল স্টেডিয়ামে ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিধ্বংসী ফিনিশার ডেভিড মিলারকে নিজের কাটার সুইঙে পরাস্ত করে ক্যাচ আউট করিয়ে ওয়ানডে বিশ্বকাপের খাতায় প্রথম নাম লেখান।
অভিষেকের বিশ্বরেকর্ড মহাকাব্য: ২০১৫ সালের ভারত সিরিজ
২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতের শক্তিশালী ও তারকাখচিত জাতীয় দল যখন তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে ঢাকায় আসে, তখন ভারত দলে ছিলেন এমএস ধোনি, বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, শিখর ধাওয়ান ও সুরেশ রায়নার মতো সর্বকালের সেরা সব ওয়ানডে ব্যাটাররা। সেই সিরিজে ১৯ বছরের মোস্তাফিজুর রহমান যা করেছিলেন, তা ওয়ানডে ক্রিকেটের ৫০ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে কোনো বোলার কখনো করতে পারেননি।
প্রথম ওয়ানডে (১৮ জুন, ২০১৫): ৫০ রানে ৫ উইকেট
অভিষেক ম্যাচেই বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটিং পরাশক্তি ভারতের শক্তিশালী টপ অর্ডারকে তছনছ করে দেন মোস্তাফিজ। ৫০ রান খরচ করে ৫টি উইকেট (রোহিত শর্মা, অজিঙ্কা রাহানে, সুরেশ রায়না, রবিচন্দ্রন অশ্বিন এবং ভুবনেশ্বর কুমার) শিকার করেন। বাংলাদেশ ম্যাচটি ৭৯ রানে জিতে নেয় এবং মোস্তাফিজ পান ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার।
দ্বিতীয় ওয়ানডে (২১ জুন, ২০১৫): ৪৩ রানে ৬ উইকেট
দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মোস্তাফিজ যেন প্রথম ম্যাচের চেয়েও বেশি আক্রমণাত্মক ও মারণাত্মক রূপ ধারণ করেন। সেদিন তিনি একাই ৪৩ রানে ৬টি ভারতীয় উইকেট তুলে নেন। তাঁর কাটারে ধোনি ও কোহলি ব্যাকফুটে পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েন।
বিশ্বরেকর্ড সমীকরণ
টানা দুই ম্যাচে ১১ উইকেট: ওয়ানডে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহসে মোস্তাফিজই একমাত্র বোলার, যিনি ক্যারিয়ারের প্রথম দুটি ম্যাচেই ৫ বা তার বেশি উইকেট (মোট ১১ উইকেট) নেওয়ার অভূতপূর্ব বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন।
এক সিরিজে সর্বোচ্চ ১৩ উইকেট: তিন ম্যাচের ওয়ানডে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে সর্বমোট ১৩টি উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করেন তিনি (রায়ান হ্যারিসের রেকর্ড স্পর্শ করেন)। বাংলাদেশ ভারতকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ওয়ানডে সিরিজ জয়ের ইতিহাস গড়ে।
টি-টোয়েন্টি সাম্রাজ্য ও বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজত্ব
মোস্তাফিজুর রহমান কেবল বাংলাদেশ জাতীয় দলের সেরা পেসার নন, বরং গত এক দশক ধরে আন্তর্জাতিক ও গ্লোবাল ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগগুলোর অন্যতম সেরা 'ফর-হায়ার' টি-টোয়েন্টি পেস সেনসেশন।
আইপিএল (IPL) এবং ঐতিহাসিক 'ইমার্জিং প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার'
২০১৬ সালের আইপিএল নিলামে ১.৪ কোটি রুপিতে তাঁকে দলে ভেড়ায় সানরাইজর্স হায়দ্রাবাদ (SRH)। অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার এবং ভুবনেশ্বর কুমারের সাথে মিলে মোস্তাফিজ সেই মৌসুমে টি-টোয়েন্টি বোলিংকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
১৬ ম্যাচে ১৭ উইকেট: ২০১৬ মৌসুমে ১৬টি ম্যাচ খেলে মাত্র ৬.৯০ ইকোনমি রেটে ১৭টি উইকেট নেন তিনি। বিশেষ করে ১৬ থেকে ২০তম ডেথ ওভারে তাঁর বোলিং ইকোনমি ছিল ৫.৫০ এর নিচে!
ঐতিহাসিক সম্মাননা: আইপিএলের ১৬ বছরের ইতিহাসে মোস্তাফিজুর রহমানই একমাত্র বিদেশী ক্রিকেটার, যিনি মর্যাদাপূর্ণ 'Emerging Player of the Year' (বর্ষসেরা উদীয়মান খেলোয়াড়) খেতাব জয়ের অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন। সেই মৌসুমে হায়দ্রাবাদকে প্রথমবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন করার পেছনে তাঁর অবদান ছিল সর্বাধিক।
পরবর্তী আইপিএল যাত্রা: পরবর্তীতে তিনি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, দিল্লি ক্যাপিটালস এবং ২০২৪ সালে মহেন্দ্র সিং ধোনির চেন্নাই সুপার কিংসের (CSK) হয়ে মাঠ কাঁপান। ২০২৪ আইপিএলে চেন্নাইয়ের হয়ে ৯ ম্যাচে ১৪টি উইকেট নিয়ে তিনি পার্পল ক্যাপের দৌড়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিলেন।
ন্যাটওয়েস্ট টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট (Sussex) ও বিপিএল
সাসেক্স (Sussex): ২০১৬ সালে ইংলিশ কাউন্টি দল সাসেক্সের হয়ে ন্যাটওয়েস্ট টি-টোয়েন্টি ব্লাস্টে অভিষেক ম্যাচেই এসেক্সের বিরুদ্ধে ২৩ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন তিনি।
বিপিএল (BPL): বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে ঢাকা ডায়নামাইটস, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ও রংপুর রাইডার্সের হয়ে খেলে বেশ কয়েকবার বিপিএল ট্রফি জয়ের স্বাদ পেয়েছেন এবং টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকদের তালিকায় শীর্ষ অবস্থান বজায় রেখেছেন।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৪-এর মহাকাব্য
২০২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্লো ও মন্থর পিচে মোস্তাফিজের বোলিং ছিল এককথায় আনপ্লেয়েবল। টুর্নামেন্টে ৭ ম্যাচে মাত্র ৫.৭৫ ইকোনমি রেটে ১৪টি উইকেট শিকার করে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন এবং বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে সুপার-এইটে তুলতে মূল ভূমিকা পালন করেন।
ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটে অবদান: বিশ্বসেরা একাদশে স্থান
যদিও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে তাঁর বৈশ্বিক চাহিদা সবচেয়ে বেশি, তবে ৫০ ওভারের ওয়ানডে ক্রিকেটেও মোস্তাফিজুর রহমানের পরিসংখ্যান তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ওয়ানডে পেসারের কাতারে বসিয়েছে।
আইসিসি বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে অন্তর্ভুক্তি (২০১৫ এবং ২০২১)
২০১৫ আইসিসি একাদশ: বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের অভিষেকের মাত্র ৬ মাসের মাথায় বিশ্বসেরা তারকাদের পেছনে ফেলে আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে একাদশে (ICC ODI Team of the Year 2015) জায়গা করে নেন মোস্তাফিজ। তিনি ছিলেন এই সম্মাননা পাওয়া ইতিহাস সৃষ্টকারী প্রথম বাংলাদেশী ক্রিকেটার।
২০২১ আইসিসি একাদশ: ছয় বছর পর ২০২১ সালে পুনরায় বিশ্বসেরা ওয়ানডে একাদশে স্থান অর্জন করে মোস্তাফিজ প্রমাণ করেন তিনি দীর্ঘমেয়াদী ও বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক পারফর্মার।
২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ মহাকাব্য
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে অনুষ্ঠিত ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে মোস্তাফিজ ছিলেন বাংলাদেশের প্রধান বোলিং শক্তি। টুর্নামেন্টে ৮টি ম্যাচ খেলে তিনি ২০টি উইকেট শিকার করেন, যা একটি একক বিশ্বকাপে যেকোনো বাংলাদেশী বোলারের সেরা পারফরম্যান্স। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীদের তালিকায় তিনি মিচেল স্টার্কের ঠিক পরেই দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। লর্ডসে ভারত (৫/৫৯) এবং পাকিস্তানের (৫/৭৫) বিরুদ্ধে টানা দুটি ম্যাচে পাঁচ উইকেট নেওয়ার এক অসামান্য কীর্তি গড়েন তিনি।
টেস্ট ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জ
লাল বলের টেস্ট ক্রিকেটে চোট ব্যবস্থাপনা এবং রঙিন পোশাকের সীমিত ওভারের ক্রিকেটের শারীরিক ধকলের কারণে মোস্তাফিজ টেস্ট ফরম্যাটে বেশি ম্যাচ খেলেননি। তা সত্ত্বেও ১৫টি টেস্টে ৩১টি উইকেট নিয়েছেন। নিজের অভিষেকেই ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম টেস্টে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দল দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ৫/৬৬ বোলিং করে নিজের লাল বলের টেস্ট সক্ষমতাও বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছিলেন।
চোট, শারীরিক ধকল এবং ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসার গল্প
একজন ফাস্ট বোলারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ইনজুরি ও সার্জারি হলো সবচেয়ে বড় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত শত্রু। মোস্তাফিজুর রহমানের ক্যারিয়ারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু একাধিক মারাত্মক চোট ও কাঁধে অস্ত্রোপচারের পর বারবার ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসার এক অদম্য গল্প তিনি তৈরি করেছেন।
২০১৬ সালের কাঁধের সার্জারি (SLAP Tear Surgery)
২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইংলিশ কাউন্টি দল সাসেক্সের হয়ে খেলার সময় মোস্তাফিজের বাঁ কাঁধের লিগামেন্টে মারাত্মক আঘাত (SLAP Tear) লাগে। এর ফলে তাঁর ক্যারিয়ার চরম হুমকির মুখে পড়ে। লন্ডনের খ্যাতনামা স্পোর্টস সার্জন ড. অ্যান্ড্রু ওয়ালেসের অধীনে তাঁর সফল কাঁধের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘ ৬-৮ মাস তাঁকে ক্রিকেট মাঠের বাইরে থাকতে হয়। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, কাঁধে কাটার মারার ফলে যে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, সার্জারির পর মোস্তাফিজ আর কখনোই আগের মতো বৈচিত্র্যময় অফ-কাটার ডেলিভারি করতে পারবেন না।
নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার (Re-Inventing the Craft)
সার্জারি থেকে ফিরে আসার পর মোস্তাফিজ লক্ষ্য করেন যে তাঁর অফ-কাটারের বাঁকের পরিমাণ এবং গতির ওপর কিছুটা প্রভাব পড়েছে। কিন্তু একজন বুদ্ধিমান ও চতুর ক্রিকেটার হিসেবে তিনি কেবল কাটারের ওপর নির্ভর না করে তাঁর বোলিংয়ে পরিবর্তন আনেন:
ক্রসিং ইনসুইঙ্গার: তিনি নতুন বলে ডানহাতি ব্যাটারদের লেগ স্টাম্প থেকে অফ স্টাম্পের দিকে টেনে নেওয়ার ইনসুইঙ্গার নিখুঁত করেন।
পেস ভ্যারিয়েশন ও সুইং: তিনি ১৩৮+ কিমির সোজা ডেলিভারি এবং ১১২ কিমির ধীরগতির সুইংয়ের মধ্যে নিখুঁত ব্যবধান তৈরি করা শেখেন।
২০২৫ সালের শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান সিরিজ: ২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে ফিল্ডিং করার সময় পায়ে চোট পেয়ে মাঠ ত্যাগ করলেও মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টিতে ৪টি উইকেট নিয়ে তিনি পুনরায় নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেন।
ব্যক্তিত্ব, ড্রেসিংরুম প্রভাব ও ফিল্ডিং অবদান
মাঠের বাইরে মোস্তাফিজুর রহমান অত্যন্ত লাজুক, সাধারণ ও বিনয়ী একজন মানুষ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টানা ১০ বছর রাজত্ব করার পরও সাতক্ষীরার সাধারণ গ্রামীণ শিকড় থেকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন হননি।
ভাষা ও ভাষা জয়ের গল্প: ক্যারিয়ারের শুরুতে ইংরেজি না বলতে পারা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া কথা বললেও, তাঁর সেই লাজুক 'ক্যাপ্টেন সাফা' (Captain Suffer) বা মিষ্টি হাসি আন্তর্জাতিক ড্রেসিংরুমে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে তাঁকে। ডেভিড ওয়ার্নার, মহেন্দ্র সিং ধোনি এবং কেন উইলিয়ামসনের মতো বিশ্বসেরা অধিনায়করা সবসময় মোস্তাফিজকে এক ভালোবাসার স্থানে রেখেছেন।
তরুণ পেসারদের মেন্টর: একসময় যিনি মাশরাফি বিন মুর্তজা বা শফিউল ইসলামের হাত ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসেছিলেন, ২০২৫ সালে এসে মোস্তাফিজ এখন তানজিম হাসান সাকিব, শরিফুল ইসলাম এবং হাসান মাহমুদের মতো উঠতি আন্তর্জাতিক বাঁহাতি ও ডানহাতি পেসারদের প্রধান পথপ্রদর্শক ও মেন্টর। আন্তর্জাতিক চাপের মুহূর্তে কীভাবে মাথা ঠাণ্ডা রেখে ডেথ ওভারে ইয়র্কার কিংবা কাটার মারতে হয়, তা তিনি তরুণদের প্রতিনিয়ত শেখেছেন।
বিশ্ব ক্রিকেটে মোস্তাফিজের প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা মোস্তাফিজুর রহমানের দীর্ঘ ক্রিকেট পারফরম্যান্স ও যাত্রার দিকে তাকাই, তখন অত্যন্ত স্পষ্ট যে তিনি কেবল পরিসংখ্যানের একটি বিশাল সংখ্যা নন; তিনি আন্তর্জাতিক বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজ পতাকাকে উঁচুতে তুলে ধরার এক অমর অলৌকিক প্রতীক।
ভবিষ্যৎ মাইলফলক (২০২৬ ও ২০২৭ আইসিসি টুর্নামেন্ট)
৩০ বছর বয়সে মোস্তাফিজ এখন একজন পূর্ণ অভিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ ও পরিণত পেস বোলার। আগামী ২০২৬ সালের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ (ভারত ও শ্রীলঙ্কা) এবং ২০২৭ সালের আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে (দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে) বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বোলিং আক্রমণের প্রধান মারণাস্ত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মোস্তাফিজ। শারীরিকভাবে ফিট থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৫০০ উইকেটের বিরল ও সম্মানীয় এলিটে নাম লেখানোর পূর্ণ সক্ষমতা ও সময় তাঁর রয়েছে।
উপসংহার: এক অমর আলোকবর্তিকা
মোস্তাফিজুর রহমান হলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অনন্য প্রবাদপ্রতিম রাজপুত্র। সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়া গ্রামের সাধারণ ধুলোবালি থেকে শুরু করে লন্ডনের ঐতিহাসিক লর্ডস, মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড, ডারবানের কিংসমিড কিংবা আইপিএলের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম সব জায়গাতেই তিনি নিজের অসাধারণ বোলিং নৈপুণ্য দিয়ে লাল-সবুজের পতাকাকে এক অনন্য উচ্চতায় সমাসীন করেছেন।
তাঁর বিষাক্ত অফ-কাটার কেবল বিশ্বসেরা প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের স্টাম্পকে চুরমার করেনি, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশকে এক ভীতিকর ও সমীহ জাগানো ফাস্ট বোলিং শক্তির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শত চোট, অস্ত্রোপচার, পারফরম্যান্সের কঠিন চড়াই-উতরাই ও সমালোচনার মাঝেও কাটার মাস্টারের হাতে বল উঠলে এখনও গ্যালারিতে গর্জন ওঠে এবং বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানদের মনে এক অজানা ভীতির সৃষ্টি হয়।
২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে মোস্তাফিজুর রহমান কেবল একজন অত্যন্ত সফল ক্রিকেটার নন, তিনি কোটি কোটি উদীয়মান বাংলাদেশী তরুণের কাছে অদম্য সংকল্প, কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং প্রতিকূলতাকে জয় করে বিশ্বজয়ের এক অমর অনুপ্রেরণা।
তথ্যসূত্র:
মুস্তাফিজুর রহমান - উইকিপিডিয়া
মোস্তাফিজুর রহমান - প্রথম আলো
দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ের রেকর্ড মোস্তাফিজের - বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইএসপিএন ক্রিকইনফো: মোস্তাফিজুর রহমান






















