দাউদ ইব্রাহিম 'ডি-কোম্পানি' - বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সর্বকালের ছায়া সম্রাট

দাউদ ইব্রাহিম 'ডি-কোম্পানি' - বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সর্বকালের ছায়া সম্রাট

বিশ্ব অপরাধের ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্রের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা কেবল একটি নির্দিষ্ট শহর বা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি হয়ে থাকেনি; বরং নিজেদের অপরাধ সাম্রাজ্যকে এক বৈশ্বিক বহুজাতিক কর্পোরেশনে রূপান্তর করে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ডে সেই কুখ্যাত তালিকার শীর্ষে যে নামটি উচ্চারিত হয়, তা হলো দাউদ ইব্রাহিম কাসকার

মুম্বাইয়ের ডোংরি এলাকার এক পুলিশ কনস্টেবল পরিবারের সন্তান থেকে শুরু করে ভারতের 'মোস্ট ওয়ান্টেড' অপরাধী, আন্তর্জাতিক সোনা ও মাদক পাচারকারী এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের তালিকায় চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে দাউদ ইব্রাহিমের রূপান্তর এক অন্ধকার ও ভীতিকর মহাকাব্য।

তার হাত ধরে বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সনাতনী রাস্তার মারামারি ও চাদাবাজি রূপ নেয় এক সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটে, যার পরিচিতি ঘটে 'ডি-কোম্পানি' (D-Company) নামে। আশির দশকে মুম্বাই শহরকে নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে আনা, নব্বইয়ের দশকে বলিউড ও ভারতের অর্থনীতিকে ব্ল্যাকমেইল করা এবং ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ মুম্বাইয়ে নজিরবিহীন ধারাবাহিক বোমা হামলা চালিয়ে শত শত নিরীহ মানুষকে হত্যার পর আন্তর্জাতিক পলাতক আসামি হিসেবে করাচিতে আশ্রয় গ্রহণ দাউদ ইব্রাহিমের পুরো জীবনকাহিনী অপরাধ, রাজনীতি, উগ্রবাদ ও গোয়েন্দা পর্যালোচনার এক জটিল সামাজিক দলিল। নিচে দাউদ ইব্রাহিমের জীবন, উত্থান, 'ডি-কোম্পানি'র নেটওয়ার্ক, গণহত্যা এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার এক পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো।

পারিবারিক পরিচয়, শৈশব ও ডোংরির গলি থেকে অপরাধে হাতেখড়ি (১৯৫৫–১৯৭০ দশক)

দাউদ ইব্রাহিম কাসকারের জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি জেলার খেদ এলাকার এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত মারাঠি-মুসলিম পরিবারে। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটে দক্ষিণ মুম্বাইয়ের জনবহুল ও অপরাধপ্রবণ এলাকা 'ডোংরি' (Dongri)-তে।

সৎ পুলিশ বাবার বিপরীতে পথচলা

দাউদের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য ছিল তাঁর পারিবারিক পরিচিতি। তাঁর বাবা ইব্রাহিম কাসকার ছিলেন বোম্বে পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের একজন অত্যন্ত সৎ, দায়িত্বশীল ও নীতিবান কনস্টেবল। দিনরাত সততার সাথে চাকরি করেও পরিবারকে আর্থিক স্বচ্ছলতা দিতে হিমশিম খেতেন ইব্রাহিম কাসকার। বাবার এই স্বল্প আয় এবং দারিদ্র্য তরুণ দাউদের মনে এক গভীর অসন্তোষ তৈরি করে। তিনি বাবার সৎ পথকে প্রত্যাখ্যান করে দ্রুত এবং যে কোনো উপায়ে ধনী হওয়ার বিপজ্জনক স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ও অপরাধে প্রবেশ

দাউদকে ভর্তি করানো হয়েছিল দক্ষিণ মুম্বাইয়ের 'আহমেদ সাইলানি হাই স্কুলে'। কিন্তু পড়ালেখায় কোনো আগ্রহ না থাকায় তিনি স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই পড়ালেখা ছেড়ে দেন। স্কুলের পাঠ চুকিয়ে তিনি ডোংরি ও ভেন্ডি বাজার এলাকার ছোটখাটো অপরাধীদের সাথে মিশতে শুরু করেন।

শুরুতে তিনি পকেটমারি, রিকশা ও দোকানদারদের থেকে তোলা আদায়, স্থানীয় মারামারি এবং অবৈধ মদের ঠেকের কুলি হিসেবে কাজ শুরু করেন। বোম্বে ডকইয়ার্ড দিয়ে আসা শুল্ক ফাঁকি দেওয়া জামাকাপড় ও ঘড়ি বাজারে বিক্রি করতে করতেই তিনি বোম্বাইয়ের অন্ধকার জগতের ভেতরের খবর পেতে শুরু করেন।

'বাইচুলা গ্যাং' (Byculla Gang) গঠন

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে দাউদ ইব্রাহিম তাঁর বড় ভাই সাবির কাসকার-কে সাথে নিয়ে স্থানীয় কিছু বেকার ও দুর্ধর্ষ তরুণকে সংগঠিত করে গড়ে তোলেন নিজস্ব দল, যা আন্ডারওয়ার্ল্ডে 'বাইচুলা গ্যাং' নামে পরিচিতি পায়। এই দলের কাজ ছিল বোম্বাইয়ের স্থানীয় জুয়ার আড্ডা চালানো, পাচারকারীদের মালামাল পাহারা দেওয়া এবং ব্যবসায়ীদের ভয় দেখিয়ে নিরাপত্তা কর বা তোলা আদায় করা।

পাঠান গ্যাংয়ের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও 'ডি-কোম্পানি'র প্রতিষ্ঠা (১৯৮০ দশক)

১৯৭০-এর দশক এবং ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) শহরের অপরাধ জগতে রাজত্ব করত তিনটি প্রধান গোষ্ঠী হাজী মাস্তান, বরদরাজন মুদালিয়ার এবং করিম লালা। এর মধ্যে আফগানিস্তান থেকে আসা আব্দুল করিম শের খান ওরফে করিম লালার নেতৃত্বাধীন 'পাঠান গ্যাং' ছিল সবচেয়ে সহিংস ও মারমুখী। করিম লালার পাশাপাশি এই গ্যাংয়ের অপারেশনের মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন তাঁর ভাইপো আমীর জাদা খান এবং সহযোগী আলমজেব। এই চক্রটি মূলত দক্ষিণ বোম্বের ডংরি, ভেন্ডি বাজার এবং ক্রফোর্ড মার্কেট এলাকায় সোনা ও রূপা চোরাচালান, মাদক ব্যবসা, কাস্টমস পাচার এবং জুয়ার আড্ডা (মটকা) নিয়ন্ত্রণ করত। তাদের নিষ্ঠুরতা এবং শারীরিক শক্তির সামনে অন্য কোনো ছোট গ্যাং মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত না।

কাসকার ভাইদের উত্থান ও দ্বন্দ্বের সূচনা

ঠিক এই সময়েই বোম্বে পুলিশের হেড কনস্টেবল ইব্রাহিম কাসকারের দুই ছেলে সাবির কাসকার এবং দাউদ ইব্রাহিম অপরাধ জগতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেন। ডংরি এলাকায় বেড়ে ওঠা এই দুই ভাই নিজেদের অনুগামীদের নিয়ে 'বাইচুলা গ্যাং' বা 'ইয়ং কোম্পানি' নামে একটি উঠতি দল গঠন করেন। শুরুতে তাঁরা হাজী মাস্তান ও বরদরাজনের সাথে কাজ করলেও ধীরে ধীরে চোরাচালানের নিজস্ব পথ তৈরি করেন। পাঠান গ্যাংয়ের একক আধিপত্যে কাসকার ভাইয়েরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। বিশেষ করে কাস্টমস পাচারের বখরা, ডংরি এলাকার গ্যাংস্টার ট্যাক্স আদায় এবং সোনা চোরাচালানের রুট দখল নিয়ে উভয় দলের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষ ঘটে।

১৯৮১ সালের সাবির হত্যাকাণ্ড

পাঠান গ্যাং বুঝতে পেরেছিল যে কাসকার ভাইদের থামানো না গেলে পুরো বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ড তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। ফলে তারা দাউদের বড় ভাই এবং বাইচুলা গ্যাংয়ের মূল চালিকাশক্তি সাবির কাসকারকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। এই উদ্দেশ্যে তারা মারাঠি গ্যাংস্টার মানিয়া সুর্ভেকেও নিজেদের সাথে যুক্ত করে। ১৯৮১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে মুম্বাইয়ের প্রভাদেবী এলাকার একটি পেট্রোল পাম্পে সাবির কাসকার তাঁর ফিয়াট গাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা আমীর জাদা, আলমজেব, মানিয়া সুর্ভে এবং তাদের সহযোগীরা সাবিরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে অবিরত গুলি চালিয়ে সাবিরকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড় পরিবর্তনকারী মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

প্রতিশোধের অগ্নিপরীক্ষা ও রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ার

বড় ভাইয়ের এই বীভৎস হত্যাকাণ্ড দাউদ ইব্রাহিমকে এক নির্মম প্রতিশোধপরায়ণ সংগঠকে পরিণত করে। এতদিন বোম্বের গ্যাংওয়ারগুলো লাঠি, ছোরা বা রিভলবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, দাউদ এই যুদ্ধে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং পরিকল্পিত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের ব্যবহার শুরু করেন। ভাই হত্যার বদলা নিতে দাউদ তাঁর বাহিনীকে পুনর্গঠিত করেন এবং মুম্বাইয়ের অপর দুই উদীয়মান অপরাধী 'ছোট রাজন' (রাজেন্দ্র সদাশিব নিকালজে) ও 'ছোট শাকিল'-এর সাথে কৌশলগত জোট গড়ে তোলেন।

পাঠান গ্যাংয়ের পর্যায়ক্রমিক পতন

দাউদের সুনির্দিষ্ট টার্গেট কিলিং এবং পুলিশ নেটওয়ার্কের ব্যবহারে পাঠান গ্যাং একের পর এক ধাক্কা খেতে থাকে:

মানিয়া সুর্ভের পতন (১৯৮২): সাবির হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী মানিয়া সুর্ভেকে দাউদের অনুগামীদের দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে ওয়াদালা এলাকায় মুম্বাই পুলিশ এনকাউন্টারে হত্যা করে। এটি ছিল মুম্বাই পুলিশের ইতিহাসের প্রথম আনুষ্ঠানিক এনকাউন্টার।

আমীর জাদা হত্যা (১৯৮৩): ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে দাউদ এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নেন। মুম্বাই সেশন কোর্টের ২৮ নম্বর কক্ষে বিচার চলাকালীন, কঠোর পুলিশ নিরাপত্তার মধ্যেই ভাড়াটে শুটার ডেভিড পারদেশিকে দিয়ে আমীর জাদা খানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুটারকে আইনজীবী ও লিটিগ্যান্টের ছদ্মবেশে আদালতে পাঠানো হয়েছিল।

আলমজেব হত্যা (১৯৮৫): আমীর জাদার মৃত্যুর পর আলমজেব আত্মগোপনে চলে যান এবং গুজরাটে পালিয়ে যান। দাউদের তথ্যসংগ্রহকারী দল তাঁকে গুজরাটের ভাদোদরায় ট্র্যাক করে। দাউদের সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৮৫ সালে গুজরাট পুলিশ আলমজেবকে এনকাউন্টারে খতম করে।

করিম লালার পিছু হটা: একে একে প্রধান সহযোগীদের হারিয়ে এবং দাউদের আধুনিক নেটওয়ার্কের সামনে টিকতে না পেরে বয়োবৃদ্ধ ডন করিম লালা ব্যাকফুটে চলে যান। অবশেষে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রবীণ নেতা হাজী মাস্তানের মধ্যস্থতায় ১৯৮৬ সালে মক্কায় একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে করিম লালা দাউদের কাছে নিষ্ক্রিয় হওয়ার সম্মতি জানান এবং বোম্বের নিয়ন্ত্রণ দাউদের হাতে ছেড়ে দেন।

ডি-কোম্পানির আত্মপ্রকাশ ও করপোরেট মাফিয়া

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাঠান গ্যাংকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দাউদ ইব্রাহিম বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। তবে দাউদ প্রথাগত মাফিয়াদের মতো শুধু পেশিশক্তির ওপর নির্ভর না করে অপরাধ জগতকে একটি আধুনিক বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের রূপ দেন। তাঁর এই সুসংগঠিত নেটওয়ার্কটি বিশ্বজুড়ে 'ডি-কোম্পানি' (D-Company) নামে আত্মপ্রকাশ করে।

ডি-কোম্পানি তাদের কার্যক্রমকে বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করে পরিচালনা করতে শুরু করে যেমন হুন্ডি বা হাওয়ালা অর্থ পাচার, রিয়েল এস্টেট দখল ও বিনিয়োগ, বলিউড প্রযোজকদের কাছ থেকে তোলাবাজি ও সিনেমা অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান এবং ক্রিকেট ম্যাচ ফিক্সিং ও অবৈধ জুয়া। ১৯৮৬ সালে ভারতীয় আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে দাউদ দুবাইয়ে তাঁর নতুন সদর দফতর স্থাপন করেন এবং সেখান থেকেই বিশ্বজুড়ে প্রসারিত এক বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা শুরু করেন।

'ডি-কোম্পানি'র কর্পোরেট রূপ: এক বহুজাতিক অপরাধ সাম্রাজ্য

মুম্বাইয়ের ডোংরি এলাকা থেকে উঠে আসা দাউদ ইব্রাহিম আশির দশকে অপরাধ জগতের সনাতন ধরণ ভেঙে এটিকে সম্পূর্ণ এক পেশাদার বহুজাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেন। তিনি তার অপরাধ নেটওয়ার্ককে 'ডি-কোম্পানি' নামে একটি সুসংগঠিত কাঠামোতে নিয়ে আসেন, যেখানে প্রতিটি বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট প্রধান বা 'হেড অফ ডিপার্টমেন্ট' নির্ধারিত ছিল। ফাইন্যান্স, অপারেশনস, লজিস্টিকস, লিগ্যাল অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট ইত্যাদি বিভাগে দক্ষ ম্যানেজার, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, এবং প্রশিক্ষিত শুটারদের বেতনভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হতো।

তার প্রধান সহযোগী ছোট শাকিল পরিচালনা করতেন অপারেশনস ও এনফোর্সমেন্ট শাখা, ছোট ভাই আনিস ইব্রাহিম সামলাতেন ফাইন্যান্স ও বলিউড বিনিয়োগ, এবং টাইগার মেমন পরিচালনা করতেন লজিস্টিকস ও সমুদ্রপথের চোরাচালান। এই অপরাধ সাম্রাজ্যের অর্জিত অর্থ নিছক অবৈধ কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দুবাই, করাচি, লন্ডন এবং ব্যাংককের রিয়েল এস্টেট, শিপিং লাইন, নির্মাণ শিল্প, এবং শেয়ার বাজারে সাদা টাকা হিসেবে বিনিয়োগ করে এটিকে একটি বৈধ ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের রূপ দেওয়া হয়।

মাদক ও আন্তর্জাতিক অস্ত্র পাচার

ডি-কোম্পানির আয়ের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে আন্তর্জাতিক মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা। দাউদ ইব্রাহিম আফগানিস্তান ও পাকিস্তানভিত্তিক 'গোল্ডেন ক্রিসেন্ট' (Golden Crescent) রুটের প্রধান মাদক সরবরাহকারীদের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। আফগানিস্তানের আফিম খেত থেকে উৎপাদিত উচ্চমানের হেরোইন এবং সিন্থেটিক ড্রাগস 'মানড্রাক্স' (Mandrax) পাকিস্তান ও ভারতের সমুদ্রসীমা ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে পৌঁছানো হতো। করাচি ও মুম্বাই বন্দরকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব আফ্রিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোতে কোটি কোটি ডলারের মাদক চালান করা হতো।

নব্বইয়ের দশকে তালেবান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংগঠনের সাথে হাত মিলিয়ে ডি-কোম্পানি ভারী অস্ত্র চোরাচালানের একক আধিপত্য গড়ে তোলে। এ কে-৪৭ rifle, আরডিএক্স (RDX) বিস্ফোরক, এবং গ্রেনেডের মতো মারণাস্ত্র দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন বিদ্রোহী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করত দাউদের লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক, যা ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণেও ব্যবহৃত হয়েছিল।

হাওলা নেটওয়ার্ক ও ভারতীয় জাল নোট (FICN)

আন্তর্জাতিক মুদ্রা লেনদেনের সনাতন ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা এড়িয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে অর্থ এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরের জন্য দাউদ গড়ে তোলেন এশিয়ার সবচেয়ে বড় 'হাওলা' (Hawala) নেটওয়ার্ক। সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, ভারত এবং ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি কোটি ডলারের লেনদেন হতো কোনো প্রকার লিখিত নথি বা ব্যাংকিং ট্রেইল ছাড়া।

পাশাপাশি, ভারতের অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর সহায়তায় প্রস্তুতকৃত উচ্চমানের ভারতীয় জাল নোট (Fake Indian Currency Notes - FICN) ভারতীয় বাজারে ছড়ানোর মূল বিতরণকারী (Distributor) হিসেবে কাজ করেছে ডি-কোম্পানি। নেপাল, বাংলাদেশ এবং থাইল্যান্ড সীমান্তকে ট্রানজিট পথ হিসেবে ব্যবহার করে কয়েক হাজার কোটি টাকার জাল রুপি ভারতীয় অর্থনীতিতে প্রবেশ করানো হয়।

বলিউডে রাজত্ব ও তোলাবাজি (Extortion)

আশির দশকের শেষ থেকে শুরু করে পুরো নব্বইয়ের দশক জুড়ে ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্প 'বলিউড'-এর ওপর ডি-কোম্পানির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিল।

ফাইনান্সিং ও ক্যাস্টিং: অপ্রদর্শিত কালো টাকা সাদা করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দাউদ সিনেমা অর্থায়নকে বেছে নেন। আনিস ইব্রাহিম ও ছোট শাকিল সরাসরি করাচি বা দুবাই থেকে মুম্বাইয়ের প্রথম সারির প্রযোজক, পরিচালক ও তারকাদের কল করে নির্দিষ্ট সিনেমায় ডি-কোম্পানির টাকা খাটাতে বাধ্য করত। তাদের কথা না শুনলে বা নির্দিষ্ট নায়িকাকে কাস্ট না করলে দেওয়া হতো প্রাণনাশের হুমকি। ২০০০ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা রাকেশ রোশনকে গুলি করার ঘটনা ছিল এমনই এক আতঙ্কের দৃষ্টান্ত।

বিদেশের ওভারসিজ রাইটস: আন্তর্জাতিক বাজারে হিন্দি সিনেমার ব্যাপক চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ডি-কোম্পানি সিনেমার ওভারসিজ ডিস্ট্রিবিউশন রাইটস নামমাত্র মূল্যে নিজেদের বেনামি কোম্পানির নামে হাতিয়ে নিত এবং তা থেকে বিপুল লাভ করত।

গুলশান কুমার হত্যা (১৯৯৭): ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে টি-সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা ও 'ক্যাসেট কিং' গুলশান কুমার ডি-কোম্পানির কাছ থেকে আসা মোটা অঙ্কের তোলা বা প্রোটেকশন মানি দিতে অস্বীকৃতি জানান। এর পরিণতিতে মুম্বাইয়ের এক মন্দিরের বাইরে প্রকাশ্য দিবালোকে আবু সালেমের শুটাররা তাঁকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে, যা পুরো বলিউড এবং ভারতীয় ব্যবসায়ী সমাজকে চরম ভীতির মুখে ঠেলে দেয়।

ক্রিকেট ম্যাচ ফিক্সিং ও আন্তর্জাতিক বেটিং

নব্বইয়ের দশকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে ডি-কোম্পানির অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক আস্তানা। দাউদ ইব্রাহিম ও তার সহযোগীরা শারজাহর ভিআইপি বক্স থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ পর্যবেক্ষণ করত এবং বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত এক স্পট ফিক্সিং ও ম্যাচ ফিক্সিং সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। বড় বড় জুয়াড়ি ও বুকিদের নিয়ন্ত্রণ করা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের দামী উপহার ও নারী দিয়ে মধুচক্রে (Honeytrap) ফেলা এবং ম্যাচের ফলাফল বা নির্দিষ্ট ওভারের রান আগে থেকেই নির্ধারণ করে কোটি কোটি ডলারের বেটিং ব্যবসা পরিচালনা করা হতো। এই সিন্ডিকেটের হাত ধরেই এশিয়ার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের বিশাল কেলেঙ্কারির উন্মোচন ঘটে, যার সাথে তৎকালীন ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারের নাম জড়িয়ে পড়েছিল।

১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা হামলা: সুফি ডন থেকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীতে রূপান্তর

দাউদ ইব্রাহিমের জীবনকে যদি দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, তবে প্রথম ভাগ ছিল কেবল একজন অপরাধী ডনের, আর দ্বিতীয় ভাগটি এক নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীর। ১৯৯২-১৯৯৩ সালের ঘটনাপ্রবাহ দাউদকে অপরাধের অন্ধকার থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের দিকে ঠেলে দেয়।

বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও ১৯৯২-৯৩ সালের মুম্বাই দাঙ্গা

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর পুরো ভারতজুড়ে তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে তৎকালীন বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) শহরে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর এবং ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি এই দুই দফায় মুম্বাইয়ে যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত হয়, তাতে ৮০০-রও বেশি মানুষ প্রাণ হারান, যাদের একটি বড় অংশ ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের।

দাঙ্গার সময় শিবসেনার ভূমিকা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা বোম্বাইয়ের সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম সুরক্ষাহীনতা তৈরি করে। দাঙ্গায় দাউদ ইব্রাহিমের ডান হাত বলে পরিচিত ইব্রাহিম মুশতাক আব্দুল রাজ্জাক মেমন ওরফে 'টাইগার মেমন'-এর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও আল-হুসাইনি বিল্ডিংয়ের অফিসে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এই ক্ষয়ক্ষতি ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে দাউদ ইব্রাহিম ও টাইগার মেমন তাদের নিজস্ব অপরাধমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়নে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের 'রক্ষক' হিসেবে নিজেদের জাহির করতে ব্যবহার করে।

আইএসআই-এর কলকাঠি ও 'অপারেশন কে-টু'

দাউদ ইব্রাহিম ও টাইগার মেমনের প্রতিশোধস্পৃহাকে কাজে লাগাতে মুহূর্তকাল দেরি করেনি পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)। ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইকে অচল করে দেওয়া এবং ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় স্থায়ী ফাটল ধরানোর লক্ষ্যে আইএসআই এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে ইন্ধন দেয়।

চোরাচালান ও অস্ত্র সরবরাহ: পূর্বের স্বর্ণ চোরাচালানের সমুদ্রপথ ব্যবহার করে ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার শেখাডি ও দিঘি বন্দরের নির্জন উপকূলে বিপুল পরিমাণ সামরিক গ্রেডের আরডিএক্স (RDX) বিস্ফোরক, একে-৪৭ ও একে-৫৬ Rifle, ৯ মিমি পিস্তল এবং হাজার হাজার হ্যান্ড গ্রেনেড পাচার করা হয়।

প্রশাসনিক দুর্নীতি: এই বিপুল পরিমাণ মারাত্মক বিস্ফোরক খালাসের পেছনে কাজ করেছিল ভারতীয় কাস্টমস কর্মকর্তা ও স্থানীয় পুলিশের একদল দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্য, যাদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছিল।

করাচিতে প্রশিক্ষণ: টাইগার মেমন মুম্বাই ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রায় দুই ডজন যুবককে দুবাইয়ের ভুয়া ভিসায় করাচিতে পাঠায়। সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আইএসআই-এর সাবেক কর্মকর্তারা তাদের অত্যাধুনিক আরডিএক্স বোমা তৈরি, টাইমার ডিভাইস সেট করা, ভারী অস্ত্র পরিচালনা ও গেরিলা আক্রমণের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেয়।

১২ মার্চ, ১৯৯৩: 'কালো শুক্রবার' ও ১২টি সমন্বিত বিস্ফোরণ

১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ শুক্রবার দুপুর ১:৩০ টা থেকে ৩:৪০ মিনিটের মধ্যে মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে পুরো মুম্বাই শহর কেঁপে ওঠে ১২টি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে। বিশ্ব ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর এত বিশাল পরিমাণে সামরিক বিস্ফোরক আরডিএক্স ব্যবহার করা হয়েছিল। হামলাকারীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মুম্বাইয়ের আর্থিক, যোগাযোগ ও সামাজিক কেন্দ্রগুলোকে নিশানা করে:

বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE): দুপুর ১:৩০ মিনিটে বিএসই-র বেসমেন্টে রাখা মারুতি ৮০০ গাড়িতে থাকা আরডিএক্স বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতেই অন্তত ৮৪ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হন।

এয়ার ইন্ডিয়া বিল্ডিং: আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও বাণিজ্যের প্রতীক এয়ার ইন্ডিয়ার সদর দপ্তরে হামলা চালিয়ে এর পুরো নিচের অংশ ধসিয়ে দেওয়া হয়।

অভিজাত হোটেলসমূহ: জুহু সেন্টুর, হোটেল সি-রক এবং এয়ারপোর্ট সেন্টুর হোটেলে স্যুটকেস বোমা ও প্লাস্টিক বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের মনে আতঙ্ক তৈরি করা।

জনাকীর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র: জ্যাভেরি বাজার, সেঞ্চুরি বাজার, এবং প্লাজা সিনেমা হলে রাখা গাড়িবোমা ও স্কুটার বোমার বিস্ফোরণে সাধারণ মানুষের দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

শিবসেনা ভবন ও পাসপোর্ট অফিস: শিবসেনার সদর দফতর এবং আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসেও পরপর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

এই নজিরবিহীন ও বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলায় সরকারি হিসাবে ২৫৭ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান এবং ৭১৩ জনেরও বেশি মানুষ হাত-পা হারিয়ে বা গুরুতর জখম হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির ক্ষতিসাধন ছাড়াও ভারতের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে।

তদন্তের মোড়, সঞ্জয় দত্ত এবং 'টাডা' (TADA) আইন

ঘটনার পরেই মুম্বাই পুলিশ ও পরবর্তীতে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (CBI) তদন্তের দায়িত্ব নেয়। দাদারের কাছে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া একটি স্কুটার এবং টাইগার মেমনের পরিবারের নামে নিবন্ধিত একটি মারুতি ৮০০ গাড়ি থেকে তদন্তকারীরা দ্রুত ষড়যন্ত্রের মূল সুতো খুঁজে পান।

বলিউড সংযোগ: তদন্তে উঠে আসে বলিউডের খ্যাতিমান অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের নাম। টাইগার মেমন ও আবু সালেমের ক্যাডারদের কাছ থেকে নিজের বাড়িতে অবৈধ একে-৫৬ রাইফেল ও হ্যান্ড গ্রেনেড রাখার অভিযোগে সঞ্জয় দত্তকে 'সন্ত্রাসবাদী ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম (প্রতিরোধ) আইন' বা টাডা (TADA)-র অধীনে গ্রেপ্তার করা হয়।

আইনি পদক্ষেপ: এই হামলায় যুক্ত থাকার অভিযোগে শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে কাস্টমস কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় চোরাচালানকারীরাও ছিল।

বিচারপ্রক্রিয়া, ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি এবং দাউদের আত্মগোপন

১৯৯৩-এর বিস্ফোরণের পর ভারতের বিচারব্যবস্থা এক দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। বিশেষ টাডা আদালত এই মামলার দীর্ঘ বিচারকার্য পরিচালনা করে।

ইয়াকুব মেমনের বিচার: টাইগার মেমনের ভাই এবং পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ইয়াকুব মেমন ১৯৯৪ সালে কাঠমান্ডু থেকে ভারতে গ্রেফতার হন। এই চক্রান্তের আর্থিক লেনদেন ও লজিস্টিক সমন্বয়ের দায়ে দীর্ঘ বিচার শেষে ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই নাগপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

করাচীর নিরাপদ আশ্রয়: বিস্ফোরণের পরপরই দাউদ ইব্রাহিম, টাইগার মেমন এবং ছোট শাকিল দুবাই হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই দাউদ ইব্রাহিমকে করাচীর অভিজাত ক্লিফটন এলাকায় সম্পূর্ণ সরকারি সুরক্ষায় আশ্রয় দেয় এবং তাকে নতুন পরিচিতি ও পাকিস্তানি পাসপোর্ট প্রদান করে।

ভারত থেকে পলায়ন ও দুবাইয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার

১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ মুম্বাইয়ে ধারাবাহিক বোমা হামলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের ঠিক পূর্বমুহূর্তে পরিস্থিতি আঁচ করতে পারে দাউদ ইব্রাহিম। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র' (RAW) এবং সিবিআইসহ অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে সে ভারতের সীমান্ত অতিক্রম করে দুবাই পালিয়ে যায়।

তার প্রধান সহযোগী টাইগার মেমন এবং ইয়াকুব মেমনকে সাথে নিয়ে সংঘটিত এই বিস্ফোরণের পরিকল্পনা মূল পরিচালনা করা হয় দুবাইয়ের নিরাপদ আস্তানা থেকেই। দুবাইয়ে অবস্থানকালে দাউদ ইব্রাহিম তার অপরাধ সিন্ডিকেট 'ডি-কোম্পানি'কে আন্তর্জাতিক রূপ দেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসে সে সোনা ও হীরা চোরাচালান, আন্তর্জাতিক ড্রাগ ট্রাফিকিং, হাওলা ব্যবস্থা, আবাসন খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ এবং বলিউডের প্রযোজক ও তারকাদের ওপর থেকে জোরপূর্বক তোলাবাজির এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে।

ডি-কোম্পানির ভাঙ্গন ও ছোট রাজানের সাথে রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ার

১৯৯৩ সালের মুম্বাই বোমা হামলার পর ডি-কোম্পানির ভেতরে গভীর ধর্মীয় ও নীতিগত বিভাজন স্পষ্টভাবে দেখা দেয়। দাউদের দীর্ঘদিনের প্রধান সহযোগী ও ডানহাত হিসেবে পরিচিত ছোট রাজান (রাজেন নিখালজে) এই দেশবিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও শত শত নির্দোষ মানুষের হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। রাজান প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলেন যে, দাউদ তার অপরাধী গ্যাংকে একটি উগ্রপন্থী ধর্মীয় সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপান্তরিত করেছে। ফলে রাজান গ্যাং থেকে বের হয়ে নিজের অনুসারীদের নিয়ে 'নানা কোম্পানি' নামে পৃথক সংগঠন গড়ে তোলেন।

এর ফলে শুরু হয় আন্তর্জাতিক আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত গ্যাংওয়ার। ভারত, নেপাল, ব্যাংকক ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দুই পক্ষের শুটারদের মধ্যে একের পর এক টার্গেট কিলিং চলতে থাকে। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে ছোট রাজানের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালায় দাউদের প্রধান অনুগত ছোট শাকিল ও তার শুটার দল (যার নেতৃত্বে ছিল মুনা জিংগাদা)।

হামলায় রাজানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রোহিত ভার্মা নিহত হন এবং রাজান গুরুতর আহত হন। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্যাংককের একটি হাসপাতালের চারতলার জানালা দিয়ে রশি বেয়ে অলৌকিকভাবে পালিয়ে প্রাণ বাঁচান ছোট রাজান। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে দুবাইয়ের এক অভিজাত ক্লাবে দাউদের মূল আর্থিক পরামর্শদাতা শরদ শেঠিকে (আন্না) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে ছোট রাজানের দল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের 'গ্লোবাল টেররিস্ট' ঘোষণা

মুম্বাই হামলার পর ভারত সরকারের ক্রমাগত আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক চাপ এবং দাউদকে প্রত্যর্পণের দাবির মুখে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ দুবাইয়ে তার কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়ায়। ফলে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি তত্ত্বাবধানে সে পাকিস্তানে পাড়ি জমায়।

মার্কিন অর্থ বিভাগ (US Treasury): ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাউদ ইব্রাহিমকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'বিশেষভাবে চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী' (Specially Designated Global Terrorist) হিসেবে ঘোষণা করে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ তার বিশ্বব্যাপী থাকা যাবতীয় আর্থিক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার নির্দেশ দেয় এবং মার্কিন নাগরিকদের তার সাথে যেকোনো লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC Resolution 1267): একই বছর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১২৬৭ স্যাংশন কমিটির তালিকায় দাউদ ইব্রাহিম ও ডি-কোম্পানির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জাতিসংঘ তদন্তে নিশ্চিত করে যে, দাউদ তার অপরাধ সাম্রাজ্য থেকে প্রাপ্ত বিশাল অর্থ আল-কায়েদা এবং লস্কর-ই-তৈয়েবার (LeT) মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর ফান্ডে পাঠাত।

২০০৮ মুম্বাই হামলা (২৬/১১) ও ডি-কোম্পানি সংযোগ

২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ে লস্কর-ই-তৈয়েবার ১০ জন সশস্ত্র সদস্য যে নারকীয় হামলা চালায়, তাতে দাউদ ইব্রাহিমের সুসংগঠিত লোকাল নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হয়েছিল। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত ও পরবর্তীতে আটক করা সন্ত্রাসী আজমল কসাব এবং ডেভিড হেডলির স্বীকারোক্তিতে উন্মোচিত হয় যে, সমুদ্রপথে মুম্বাইয়ে অনুপ্রবেশের জন্য পরিচিত রুট, লজিস্টিক সাপোর্ট, অস্ত্র সরবরাহ এবং ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরির কাজে ডি-কোম্পানির পুরোনো চোরাচালান নেটওয়ার্ক সরাসরি ব্যবহৃত হয়। লস্কর প্রধান হাফিজ সাঈদ ও জাকিরুর রহমান লাখভির সাথে দাউদের নিয়মিত যোগাযোগ ও অর্থিক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আন্তর্জাতিক মহলে উত্থাপন করে ভারত।

করাচির ক্লিফটন ও আইএসআই-এর নিরাপত্তা বলয়

আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ সংস্থা FATF এবং জাতিসংঘের সম্ভাব্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পাকিস্তান সরকার দাউদ ইব্রাহিমের উপস্থিতি বারবার অস্বীকার করে এসেছে। তবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন অনুসন্ধানী নথিপত্রে প্রমাণিত যে, দাউদ ইব্রাহিম বর্তমানে করাচির অতি-অভিজাত এলাকা ক্লিফটনের 'ডি-১৪, ব্লক-৪' নম্বর বাংলোতে (যা আন্ডারওয়ার্ল্ডে 'হোয়াইট হাউস' নামে পরিচিত) বসবাস করছেন। এছাড়াও করাচির ডিফেন্স হাউজিং অথরিটি (DHA) এবং ইসলামাবাদের মারগাল্লা রোড এলাকায় তার আরও একাধিক নিরাপদ বাসা রয়েছে।

পাকিস্তানে সে নিজের পরিচয় গোপন রাখতে নাম পরিবর্তন করে 'হাজী সেঠ' ও 'শেখ ফারুক' নামে পরিচিত। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) তাকে পাঁচ স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয় (Five-tier security cover) প্রদান করে রেখেছে।

শুধু সামরিক সুরক্ষাই নয়, পাকিস্তানের প্রভাবশালী পরিবারের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করেছে; যার বড় প্রমাণ দাউদের মেয়ে মাহরুখ ইব্রাহিমের সাথে পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক জাভেদ মিয়াঁদাদের ছেলে জুনাইদ মিয়াঁদাদের বিয়ে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তভিত্তিক হিরোইন ও আফিম চোরাচালানের লাভজনক বাণিজ্য (Golden Crescent route) নিয়ন্ত্রণ করে দাউদ বর্তমানে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার অন্যতম প্রধান পরোক্ষ অর্থসংস্থানকারী হিসেবে কাজ করছে।

ডি-কোম্পানির বর্তমান অবস্থা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভূ-রাজনীতি

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পলাতক থাকা সত্ত্বেও দাউদ ইব্রাহিমের ডি-কোম্পানি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি; তবে এর কার্যপ্রণালী ও কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯০-এর দশকের মুম্বাইকেন্দ্রিক তোলাবাজি, সোনা চোরাচালান ও বলিউড অর্থায়নের অবয়ব ছেড়ে এটি এখন একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধ চক্র ও বিশ্বব্যাপী ছায়াসংগঠনে রূপান্তরিত হয়েছে।

বর্তমানে তাদের প্রধান আয়ের উৎস ক্রিপ্টোকারেন্সি ও হুণ্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার, আফগান হিরোইন চোরাচালান (গোল্ডেন ক্রিসেন্ট রুট), জাল ভারতীয় রুপি (FICN) সরবরাহ এবং মধ্য আফ্রিকার সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে ডায়মন্ড পাচার। বিশ্বব্যাপী গোয়েন্দা নজরদারি এড়াতে তারা নিজেদের অবৈধ অর্থ মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক ও ইউরোপের বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে এক জটিল ফিন্যান্সিয়াল সিন্ডিকেট তৈরি করেছে।

শীর্ষ নেতৃত্বের বর্তমান কাঠামো

দাউদ ইব্রাহিম: বর্তমানে সত্তোর্ধ্ব বয়সে পদার্পণ করা দাউদ ইব্রাহিম ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছেন বলে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। করাচির ডিফেন্স হাউজিং অথরিটি (DHA) এলাকার চরম সুরক্ষিত বাসভবনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর ছায়াতলে তিনি বসবাস করছেন বলে ভারতীয় ও পশ্চিমা গোয়েন্দা রিপোর্টে বারবার দাবি করা হয়েছে। বার্ধক্যের কারণে সরাসরি অপারেশনাল কাজে তিনি নিয়মিত না থাকলেও এখনও নীতি নির্ধারণে তিনিই সংগঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী।

ছোট শাকিল (Chhota Shakeel): ডি-কোম্পানির দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, তোলাবাজি এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা এখন মূলত করাচি ও থাইল্যান্ডে বসে পরিচালনা করছেন দাউদের প্রধান সেনাপতি ছোট শাকিল। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ এবং মূল অপারেশন পরিচালনায় শাকিলই এখন ডি-কোম্পানির মূল চালিকাশক্তি।

আনিস ইব্রাহিম ও মুস্তাকিম: দাউদের ভাই আনিস ইব্রাহিম ও মুস্তাকিম ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ডি-কোম্পানির শত শত কোটি টাকার বৈধ-অবৈধ রিয়েল এস্টেট, হোটেল ও শিপিং ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। বিশেষ করে দুবাই থেকে কৌশলগত দূরত্ব বজায় রেখে তুরস্কের ইস্তাম্বুল ও যুক্তরাজ্যে তাদের মূলধনের একটি বড় অংশ স্থানান্তর করা হয়েছে।

টাইগার মেমন ও জাভেদ চিকনা: ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা হামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত টাইগার মেমন ও জাভেদ চিকনা এখনও সিন্ডিকেটের সন্ত্রাসী কৌশল ও লজিস্টিক সহায়তা বজায় রাখার মূল দায়িত্বে রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব

ডি-কোম্পানির ইতিহাসে অভ্যন্তরীণ বিভাজন নতুন নয়। ১৯৯৩ সালের মুম্বাই হামলার পর ধর্মীয় মেরুকরণের কারণে ছোট রাজান আলাদা হয়ে যান। পরবর্তীতে ২০০০ সালে ব্যাংককে ছোট রাজানের ওপর ছোট শাকিল বাহিনীর প্রাণঘাতী হামলা মুম্বাই অপরাধ জগতের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

বর্তমানে দাউদ ইব্রাহিমের শারীরিক অবনতির সাথে সাথে 'পরবর্তী নেতা কে হবেন' তা নিয়ে পর্দার অন্তরালে তীব্র অভ্যন্তরীণ বিরোধ তৈরি হয়েছে। একদিকে ছোট শাকিলের নিয়ন্ত্রণাধীন আন্ডারওয়ার্ল্ড ও অস্ত্র উইং, অন্যদিকে দাউদের ভাই আনিস ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা উইংয়ের মধ্যে তীব্র আর্থিক ও কৌশলগত সংঘাত দেখা দিয়েছে। এছাড়া নতুন প্রজন্মের ক্যাডারদের সাথে পুরনো অনুগতদের মতাদর্শগত দূরত্ব এবং মুনাফার বন্টন নিয়ে টানাপোড়েন ডি-কোম্পানির ভেতরের শৃঙ্খলাকে ভঙ্গুর করে তুলছে।

ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা

দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে দাউদ ইব্রাহিম ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এক স্থায়ী অনাস্থা ও বিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ভারত সরকার বহুবার নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণসহ ডোজিয়ার (Dossier) তুলে দিয়ে দাউদকে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে, যা পাকিস্তানের 'ছায়াযুদ্ধ' বা প্রক্সি ওয়ার নীতির কারণে সবসময় প্রত্যাখ্যাত হয়ে এসেছে।

আইএসআই ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সাথে যোগসাজশ: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) এবং মার্কিন অর্থ দফতর দাউদ ইব্রাহিমকে বিশ্বসন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ডি-কোম্পানির বিশাল হুণ্ডি ও চোরাচালান নেটওয়ার্ককে পাকিস্তান সরাসরি ভারতবিরোধী হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারে ব্যবহার করে। লস্কর-ই-তৈয়বা (LeT) এবং জৈশ-ই-মোহাম্মদ (JeM)-এর মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন, লজিস্টিক সাপোর্ট ও অস্ত্র সরবরাহে ডি-কোম্পানির চ্যানেলগুলো ব্যবহৃত হয়।

এফএটিএফ (FATF) ও আন্তর্জাতিক চাপ: ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (FATF)-এর ধূসর তালিকা বা নজরদারি থেকে বাঁচতে পাকিস্তান সরকার বিভিন্ন সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দাউদের উপস্থিতি অস্বীকার করেছে, আবার কখনো আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার কাগুজে নির্দেশ জারি করেছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্র দাউদ ইব্রাহিম ও তার নেটওয়ার্ককে এক ধরনের অঘোষিত 'কৌশলগত সম্পদ' (Strategic Asset) হিসেবে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।

এক নজরে দাউদ ইব্রাহিম ও 'ডি-কোম্পানি'র সার্বিক চিত্র

মূল বিষয় / সূচক

ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্য তথ্য

পূর্ণ নাম

দাউদ ইব্রাহিম কাসকার (Dawood Ibrahim Kaskar)

জন্ম ও বয়স

২৬ ডিসেম্বর, ১৯৫৫; খেদ, রত্নাগিরি জেলা, মহারাষ্ট্র, ভারত।

অন্যান্য নাম / উপাধি

'ভাই' (Bhai), 'বিগ বস', 'ডন', 'হাজী সাহেব'।

পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড

বাবা: ইব্রাহিম কাসকার (বোম্বে পুলিশের সৎ ক্রাইম ব্রাঞ্চ কনস্টেবল)।

অপরাধের প্রধান ক্ষেত্র

সোনা ও অস্ত্র পাচার, মাদক ব্যবসা, হাওলা, জাল নোট (FICN), বেটিং, তোলাবাজি।

সিন্ডিকেটের নাম

'ডি-কোম্পানি' (D-Company)

প্রধান সহযোগীবৃন্দ

সাবির কাসকার (ভাই), ছোট শাকিল, ছোট রাজান (সাবেক), আনিস ইব্রাহিম, টাইগার মেমন।

সবচেয়ে বড় অপরাধ

১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ মুম্বাই ধারাবাহিক আরডিএক্স (RDX) বোমা হামলা (২৫৭ জনের মৃত্যু)।

আন্তর্জাতিক রেড নোটিশ

ইন্টারপোল রেড কর্নার নোটিশ, মার্কিন অর্থ বিভাগ ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC 1267)।

বর্তমান অবস্থান

ক্লিফটন, করাচি, পাকিস্তান (আইএসআই ও পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সুরক্ষায়)।

বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) শহরের অপরাধ ইতিহাস কেবল হাজী মাস্তান কিংবা দাউদ ইব্রাহিমের একচ্ছত্র কাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বহুস্তরবিশিষ্ট ঐতিহাসিক সামাজিক ক্যানভাস, যেখানে একদিকে ছিল আফগান পাঠান গ্যাং, তামিল মাইগ্রেন্ট সিন্ডিকেট, মারাঠি স্থানীয় গ্যাংস্টার এবং অন্যদিকে ছিল মুম্বাই পুলিশের দুর্ধর্ষ 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' টিম।

ত্রিমূর্তি যুগের দুই স্তম্ভ: করিম লালা ও বরদারাজন মুদালিয়ার

সত্তরের দশকে বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডে শাসন করত যে 'পবিত্র ত্রিমূর্তি' (Holy Trinity), হাজী মাস্তান ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক ও গ্ল্যামারাস মুখ। তবে ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি ও রাজপথের শক্তি ধারণ করতেন অপর দুই ডন করিম লালা এবং বরদারাজন মুদালিয়ার

করিম লালা: আফগান পাঠানদের ভয়াল সর্দার

উৎস ও প্রাথমিক জীবন: করিম লালার আসল নাম ছিল আবদুল করিম শের খান। ১৯১১ সালে আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশে জন্ম নেওয়া করিম লালা ১৯২০-এর দশকে কাবুল থেকে কাজের সন্ধানে বোম্বেতে আসেন। প্রায় ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী লালা দক্ষিণ মুম্বাইয়ের ডোংরি ও গ্রান্ট রোড এলাকায় প্রথম আফগান সুদের কারবার (Usury) এবং জুয়ার আড্ডা (Matka Gambling) শুরু করেন।

'পশতুন জিরগা' ও পাঠান গ্যাং: তিনি বোম্বেতে বসবাসকারী আফগান ও পশতুন যুবকদের সংগঠিত করে গড়ে তোলেন দুর্ধর্ষ 'পাঠান গ্যাং'। দক্ষিণ বোম্বাইয়ের যেকোনো জায়গা থেকে তোলা আদায় এবং সোনা চোরাচালানকারীদের মালামাল পাহারা দেওয়ার কাজে পাঠান গ্যাং ছিল অপ্রতিরোধ্য।

হাজী মাস্তানের সাথে সম্পর্ক: শুরুতে মাস্তানের কাস্টমস পাচারের মালের নিরাপত্তায় করিম লালার লোক ব্যবহৃত হতো। পরে দুজনের মধ্যে সমঝোতা হয় মাস্তান পরিচালনা করবেন সমুদ্রবন্দর ও শুল্ক ফাঁকির ব্যবসা, আর করিম লালা পরিচালনা করবেন শহরের ভেতরের জুয়া, সুদের ব্যবসা এবং বেআইনি জমি দখল।

বরদারাজন মুদালিয়ার: ধারাভির 'ভারধা ভাই'

তামিল অভিবাসীদের মসিহা: ১৯sixty-এর দশকে তামিলনাড়ু থেকে কাজ খুঁজতে বোম্বেতে আসা শত শত তামিল পরিবারের প্রধান আশ্রয়স্থল ছিলেন বরদারাজন মুদালিয়ার। তিনি দক্ষিণ মুম্বাইয়ের মাতুঙ্গা, ধারাভি এবং সিয়ন এলাকাকে নিজের সাম্রাজ্যে পরিণত করেন।

অপরাধ নেটওয়ার্ক: বরদারাজনের প্রধান আয় আসত ডকইয়ার্ড থেকে মালামাল চুরি, ধারাভি বস্তিতে অবৈধ মদ প্রস্তুতকরণ এবং জমি দখল থেকে। তামিল সম্প্রদায়ের কাছে তিনি ছিলেন বিচারক বা 'ভারধা ভাই'। যেকোনো সামাজিক বিরোধ তিনি নিজের 'বিচারের দরবারে' সমাধান করতেন।

পতন ও মৃত্যু: ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মুম্বাই পুলিশের সৎ ও দুর্ধর্ষ আইপিএস অফিসার ওয়াই সি পাওয়ার (Y.C. Pawar) বরদারাজনের সাম্রাজ্যে একের পর এক আঘাত হানেন। পুলিশি অভিযানের মুখে টিকতে না পেরে বরদারাজন বোম্বে ছেড়ে চেন্নাইয়ে পালিয়ে যান এবং ১৯৮৮ সালে সেখানেই হৃদরোগে মারা যান। (প্রখ্যাত পরিচালক মনি রথনমের কালজয়ী তামিল চলচ্চিত্র 'নায়কান' (Nayakan) বরদারাজনের জীবনের ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয়েছিল, যেখানে অভিনয় করেছিলেন কামাল হাসান)।

দাউদের ছায়া থেকে আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টার: ছোট রাজান, আবু সালেম ও ছোট শাকিল

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাঠান গ্যাংকে ধ্বংস করে দাউদ ইব্রাহিম যখন 'ডি-কোম্পানি' প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর চারপাশে একঝাঁক ভয়ংকর ডানহাত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বোমা হামলার পর এই সিন্ডিকেটে চরম ভাঙ্গন ধরে।

ছোট রাজান: আনুগত্য থেকে মহাসংগ্রাম

শৈশব ও উত্থান: ছোট রাজানের আসল নাম রাজেন্দ্র সদাশিব নিকালজে। চেম্বুরের তিলক নগর এলাকায় সাহাকার সিনেমা হলের সামনে ব্ল্যাকে টিকিট বিক্রি দিয়ে তাঁর জীবন শুরু হয়। 'বড় রাজান' (রাজান নায়ার)-এর হাত ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডে আসা রাজেন বড় রাজানের মৃত্যুর পর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব নেন এবং দাউদের সাথে হাত মিলিয়ে ডি-কোম্পানির প্রধান কার্যনির্বাহী (COO) হয়ে ওঠেন।

বিচ্ছেদ ও ছায়াযুদ্ধ (১৯৯৩): ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণের পর হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এবং দাউদের সন্ত্রাসী রূপ দেখে ছোট রাজান ডি-কোম্পানি থেকে আলাদা হয়ে যান। নিজেকে 'হিন্দু ডন' বা 'দেশপ্রেমিক গ্যাংস্টার' হিসেবে ঘোষণা করে তিনি দাউদ ও ছোট শাকিলকে মেরে ফেলার প্রতিজ্ঞা করেন।

ব্যাংকক হামলা (২০০০) ও বালি গ্রেফতার (২০১৫): ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ছোট শাকিলের প্রধান সুটার মুন্না জিংগাদা হোটেল রুমে ছোট রাজানের ওপর নির্বিচার গুলি চালায়। রাজানের দেহরক্ষী নিহত হলেও রাজান দোতলা থেকে লাফিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরে অলৌকিকভাবে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। ১৫ বছর পলাতক থাকার পর ২০১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালি থেকে তাঁকে ভারতীয় গোয়েন্দাদের সহায়তায় গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তিনি দিল্লির তিহার জেলে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন।

আবু সালেম: বলিউডের আতঙ্ক ও 'গ্ল্যামার মাফিয়া'

আজমগড় থেকে মুম্বাই: উত্তরপ্রদেশের আজমগড় থেকে আসা চালক আবু সালেম ৯০-এর দশকে ডি-কোম্পানিতে যোগ দেন। তিনি মূলত দাউদের হয়ে অস্ত্র ও টাকা আনা-নেওয়ার কাজ করতেন। ১৯৯৩ সালের মুম্বাই হামলার আগে তিনি প্রখ্যাত বলিউড অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের বাড়িতে গিয়ে আরডিএক্স ও একে-৪৭ রাইফেল পৌঁছে দিয়ে এসেছিলেন।

বলিউডে তাণ্ডব: আবু সালেম ছিলেন বলিউডে তোলাবাজির মাস্টারমাইন্ড। টি-সিরিজের প্রধান গুলশান কুমার হত্যা (১৯৯৭) এবং প্রখ্যাত বিল্ডার প্রদীপ জৈন হত্যাকাণ্ডে সালেমের সরাসরি হাত ছিল। তিনি বলিউড তারকাদের হুমকি দিয়ে বিদেশে কনসার্ট করতে বাধ্য করতেন।

পর্তুগাল থেকে প্রত্যর্পণ: ২০০২ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে মডেল ও অভিনেত্রী মনিকা বেদীর সাথে আবু সালেমকে গ্রেফতার করে ইন্টারপোল। ২০০৫ সালে এক ঐতিহাসিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারত সরকার পর্তুগাল থেকে তাকে প্রত্যর্পণ করে দেশে ফিরিয়ে আনে। বর্তমানে তিনি মুম্বাইয়ের তালোজা জেলে বন্দী।

ছোট শাকিল: ডি-কোম্পানির বর্তমান সিইও

প্রকৃত পরিচয়: মোহাম্মদ শাকিল বাবুমিয়া শেখ, যিনি আন্ডারওয়ার্ল্ডে 'ছোট শাকিল' নামে পরিচিত। মুম্বাইয়ের নাগপাড়া এলাকায় ট্রাভেল এজেন্সি চালানো শাকিল ছিলেন দাউদ ইব্রাহিমের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ও বিশ্বস্ত সেনাপতি।

নেটওয়ার্ক: দাউদ ইব্রাহিম বর্তমানে শারীরিক অসুস্থতার কারণে অনেকটা আড়ালে থাকলেও ডি-কোম্পানির মূল অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, শারজাহ-দুবাই-ব্যাংকক হিট-স্কোয়াড পরিচালনা এবং হাওলা চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ করেন ছোট শাকিলই।

দাগদি চাউলের 'ড্যাডি': অরুণ গাওলি এবং 'বাইচুলা কোম্পানির' সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাত

দাউদের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগে মুম্বাই শহরে কেবল একটি মারাঠি গ্যাংই বুক চিতিয়ে দাউদ ইব্রাহিমের সাথে সম্মুখ সমরে টিকে ছিল তা হলো 'অরুণ গাওলির গ্যাং'

দাগদি চাউল: এক ভেদ্য দুর্গ

দক্ষিণ মুম্বাইয়ের বাইচুলা এলাকায় অবস্থিত 'দাগদি চাউল' (Dagdi Chawl) ছিল অরুণ গাওলির প্রধান আস্তানা। এটি ছিল যেন এক একছত্র কেল্লা। চাউলের ভেতরে গোপন সুড়ঙ্গ, সিসিটিভি ক্যামেরা ও শত শত সশস্ত্র মারাঠি তরুণের পাহারা থাকত। পুলিশ কিংবা দাউদের শুটাররা কখনো দাগদি চাউলের ভেতরে ঢোকার সাহস পেত না। বস্তিবাসী ও স্থানীয় মারাঠি মানুষের কাছে গাওলি পরিচিত ছিলেন 'ড্যাডি' নামে।

রামা নায়েক হত্যাকাণ্ড ও দাউদ-গাওলি যুদ্ধ

গাওলি গ্যাংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রামা নায়েক এবং বাবু রেশিম। ১৯৮৮ সালে রামা নায়েক পুলিশের এনকাউন্টারে নিহত হলে গাওলির সন্দেহ হয় যে দাউদ ইব্রাহিম গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে রামা নায়েককে হত্যা করিয়েছে।

এর পর শুরু হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী মারাঠি বনাম মুসলিম যুদ্ধ। গাওলির শুটাররা দাউদের ভগ্নিপতি ইব্রাহিম পারকার-কে (হাসিনা পারকারের স্বামী) নাগপাড়ায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। এর জবাবে দাউদের লোকেরা জেজে হাসপাতালে ঢুকে গাওলির প্রধান সুটারদের হত্যা করে।

রাজনীতিতে প্রবেশ ও কারাবাস

১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে পুলিশি এনকাউন্টার থেকে বাঁচতে অরুণ গাওলি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি গঠন করেন 'অখিল ভারতীয় সেনা' (ABS) নামক রাজনৈতিক দল। ২০০৪ সালে তিনি মুম্বাইয়ের চিঞ্চপোকলি আসন থেকে মহারাষ্ট্র বিধানসভার সদস্য (MLA) নির্বাচিত হন। তবে ২০০৭ সালে শিবসেনা কর্পোরেটর কামলাকর জামসান্দেকর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হয়ে তিনি গ্রেফতার হন এবং ২০১২ সালে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে।

মুম্বাই পুলিশের 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' যুগ (১৯৮২–২০০৫)

বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডকে নিশ্চিহ্ন করার ক্ষেত্রে ভারতের আইনি আদালতের চেয়েও বড় ভূমিকা পালন করেছিল মুম্বাই পুলিশের ডিরেক্ট একশন টাস্ক ফোর্স—যা ইতিহাসে 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' (Encounter Specialists) নামে খ্যাত।

প্রথম এনকাউন্টার: মানিয়া সুরভে (১৯৮২)

১৯৮২ সালের ১১ জানুয়ারি মুম্বাইয়ের ওয়াদালা এলাকায় ডা. আম্বেদকর কলেজের সামনে দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টার মনোহর অর্জুন সুরভে ওরফে 'মানিয়া সুরভে'-কে গুলি করে হত্যা করে মুম্বাই পুলিশ। ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ান এবং রাজা তাম্বাতে-র পরিচালনায় এটিই ছিল মুম্বাই পুলিশের খাতায় প্রথম অফিসিয়াল 'এনকাউন্টার'। (এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয় বিখ্যাত ছবি Shootout at Wadala)।

এনকাউন্টার স্কোয়াডের প্রধান নায়কগণ

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বোম্বে ক্রাইম ব্রাঞ্চকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের বন্দুকধারীদের সরাসরি গুলি করার জন্য। এই সময়ে মুম্বাই পুলিশের কিছু তরুণ ও সাহসী কর্মকর্তা সাধারণ মানুষের কাছে একশন হিরো হয়ে ওঠেন:

প্রদীপ শর্মা (Pradeep Sharma): ১১২টিরও বেশি এনকাউন্টারে গ্যাংস্টারদের নির্মূল করেন। (প্যারাডাইস সিনেমা এনকাউন্টার, লোখন্ডওয়ালা এনকাউন্টার)।

দয়া নায়ক (Daya Nayak): আশিটিরও বেশি এনকাউন্টার পরিচালনা করেন; বিশেষ করে ডি-কোম্পানির ফিনান্সিয়াল নেটওয়ার্ক ভেঙে দেন।

বিজয় সালাস্কার (Vijay Salaskar): অরুণ গাওলি ও ছোট রাজান গ্যাংয়ের প্রধান সুটারদের নির্মূল করেন। (২০০৮ সালের ২৬/নভেম্বর মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলায় তিনি শহীদ হন)।

শচীন ওয়াজে ও রবীন্দ্রনাথ আঙ্গ্রে: থানে এবং সেন্ট্রাল মুম্বাইয়ের অপরাধীদের ওপর রাজত্ব করেন।

মকোকা (MCOCA) আইন ও গ্যাংগুলোর ব্যাকবোন ভাঙ্গা

১৯৯৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার জারি করে 'মহারাষ্ট্র কন্ট্রোল অব অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যাক্ট' (MCOCA)। এই কঠোর আইনের বলে পুলিশ গ্যাংস্টারদের কনফেশনাল স্টেটমেন্ট আদালতে প্রমাণ হিসেবে জমা দিতে পারত এবং জামিন প্রায় অসম্ভব করে তোলে। এনকাউন্টার স্পেশালিস্টদের বুলেটে ৮০০-র বেশি শুটার নিহত হওয়ায় এবং মকোকা আইনের চাপে ২০০০ সালের মধ্যে বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে পড়ে।

পপ কালচার ও ভারতীয় চলচ্চিত্রে বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব

হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প (বলিউড) এবং বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্পর্ক কেবল অবৈধ অর্থায়ন বা বেনামি লগ্নির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ডনদের জীবনশৈলী, অপরাধসাম্রাজ্যের উত্থান-পতন এবং গ্যাংস্টার সংস্কৃতির বাস্তব ঘটনাই হয়ে উঠেছিল ভারতীয় পপ কালচার ও সিনেমার প্রধান উপাদান। সত্তরের দশক থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই ঘটনাগুলো পর্দায় 'অ্যান্টি-হিরো' চরিত্রের জন্ম দেয়, যা সাধারণ দর্শকের মনস্তত্ত্ব ও ফ্যাশনেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

নায়কান (Nayakan - ১৯৮৭) মনি রথনম পরিচালিত ও কামাল হাসান অভিনীত এই তামিল চলচ্চিত্রটি তামিলনাড়ু থেকে বোম্বেতে আসা রবিনহুড খ্যাত ডন বরদারাজন মুদালিয়ারের জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। ছবিটিতে কেবল অপরাধসাম্রাজ্য নয়, বরং ধারাভি বস্তির তামিল অভিবাসীদের অধিকার ও বোম্বাইয়ের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ফুটে ওঠে। টাইম ম্যাগাজিনের অল-টাইম ১০০ সেরা সিনেমার তালিকায় স্থান পাওয়া এই চলচ্চিত্রে কামাল হাসানের কালজয়ী অভিনয় এবং ইলইয়ারাজার সঙ্গীত বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক মানবিক ও আঞ্চলিক রূপ তুলে ধরে।

সত্যা (Satya - ১৯৯৮) রাম গোপাল ভার্মা পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি বোম্বাইয়ের অপরাধ জগতের কোনো রঙিন গল্প নয়, বরং আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিচুতলার শার্পশুটারদের দৈনন্দিন লড়াই, অনিশ্চয়তা ও অন্ধকার জীবনকে নিষ্ঠুর বাস্তবতায় উপস্থাপন করে। সৌরভ শুক্লা ও অনুরাগ ক্যাশপের চিত্রনাট্যে তৈরি 'সত্যা' ভারতীয় সিনেমায় গ্যাংস্টার ড্রামার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে এবং পপ কালচারে গ্যাংস্টারদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও চরিত্রায়নে এক আমূল পরিবর্তন আনে।

কোম্পানি (Company - ২০০২) রাম গোপাল ভার্মা পরিচালিত 'ডি-কোম্পানি'র অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নির্মিত এটি একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী চলচ্চিত্র। এতে অজয় দেবগন (মালিক / দাউদ ইব্রাহিম) এবং বিবেক ওবেরয় (চান্দু / ছোট রাজান)-এর উত্থান ও পরবর্তীতে তাদের মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ দেখানো হয়। ১৯৯৭ সালে ব্যাংককে ছোট রাজানের ওপর প্রাণঘাতী হামলা এবং তার জের ধরে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক গ্যাং ওয়ারের জটিল সমীকরণ এতে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়।

ব্ল্যাক ফ্রাইডে (Black Friday - ২০০৪) প্রখ্যাত অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিক হুসেন জাইদির একই নামের বইয়ের ওপর ভিত্তি করে অনুরাগ ক্যাশপ নির্মিত এই ডকু-ড্রামা চলচ্চিত্রটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ১৯৯৩ সালের বোম্বে ধারাবাহিক বোমা হামলা, অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী টাইগার মেমন, আরডিএক্স পাচারের রুট, করাচি-দুবাই নেটওয়ার্ক এবং মুম্বাই পুলিশের ঐতিহাসিক তদন্ত প্রক্রিয়ার বাস্তবভিত্তিক বর্ণনা এতে উঠে এসেছে।

শুটআউট এট লোকন্ডওয়ালা (২০০৭) অপূর্ব লাখিয়া পরিচালিত এই ছবিটি ১৯৯১ সালের ১৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ের লোকন্ডওয়ালা কমপ্লেক্সে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক এনকাউন্টারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি মুম্বাই পুলিশ (এডিআইজি এ.এ. খান ও প্রদীপ শর্মার নেতৃত্বাধীন এটিএস) এবং ডি-কোম্পানির দুর্ধর্ষ শুটার মায়া ডোলাস (বিবেক ওবেরয়) ও দিলীপ বুয়ার মধ্যকার টানা চার ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস বন্দুকযুদ্ধ ফুটিয়ে তোলে। এটি পপ কালচারে 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' পুলিশ অফিসারদের চরিত্রায়ন নতুনভাবে জনপ্রিয় করে তোলে।

ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই (২০১০) মিলন লুথরিয়া পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি সত্তরের দশকের চোরাচালানকারী প্রধান হাজী মাস্তান (সুলতান মির্জা চরিত্রে অজয় দেবগন) এবং পরবর্তীতে আশির দশকে নতুন হিংস্র আন্ডারওয়ার্ল্ডের জন্মদাতা দাউদ ইব্রাহিম (শোয়েব খান চরিত্রে এমরান হাশমি)-এর মধ্যকার ক্ষমতার রূপান্তর তুলে ধরে। ছবিটিতে সত্তরের দশকের নীতিভিত্তিক চোরাচালান থেকে আশির দশকের ড্রাগ কাস্টেল ও সহিংসতার যুগসন্ধিক্ষণকে আশি দশকের রঙিন ফ্যাশন ও সংলাপবাজির মাধ্যমে পর্দায় জীবন্ত করা হয়।

অপরাধের রাজত্ব থেকে ইতিহাসের বিষাক্ত অধ্যায়

দাউদ ইব্রাহিম কাসকারের জীবনপঞ্জি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কেবল একজন সাধারণ পথশিশু থেকে মাফিয়া ডন হয়ে ওঠার গল্প নয়; বরং এটি অপরাধের সাথে ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার বিপজ্জনক মিলনের এক চরম ভয়াল চিত্র।

এক সময়ের ডোংরির যে তরুণটি ভেবেছিল অপরাধের মাধ্যমে সে বিশ্ব জয় করবে, আজ সে নিজের মাতৃভূমিতে পা রাখার অধিকার হারিয়েছে। জীবন ধারণের জন্য তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে অন্য একটি দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার পাহারায়, ছদ্মনামে এবং চার দেয়ালের বন্দিদশায়।

দাউদ ইব্রাহিমের গড়ে তোলা 'ডি-কোম্পানি' হয়তো বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিল, কিন্তু সেই অর্থ অর্জিত হয়েছিল রক্ত, ধ্বংস ও হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের কান্নার ওপর ভিত্তি করে। ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বিস্ফোরণের রক্তভেজা ইতিহাস আজও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অপরাধের পথ শেষ পর্যন্ত মানুষকে কেবল সমাজবিচ্ছিন্ন, ঘৃণিত এবং ইতিহাসের এক বিষাক্ত অধ্যায়েই পরিণত করে।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.