ধানমন্ডি ৩২ ট্রাজেডি - মব ভায়োলেন্স সন্ত্রাস ইসলাম কি এগুলো সমর্থন করে?

ছবিতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর আবারো ভাঙছেন এক হুজুর। তাকে হয়তো বলা হয়েছে প্রতিটি ইট ভাঙার জন্য ১০টি করে নেকী পাওয়া যাবে বা একজন করে হুরের সাক্ষাত পাওয়া যাবে! একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য থাকে জুলুমের অবসান ঘটিয়ে ইনসাফ, ন্যায়বিচার এবং সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আইন ও শাসনের এমন এক সংস্কার, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত হবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, স্বৈরাচারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার শিথিলতাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি আত্মপ্রকাশ করেছে যার নাম ‘মব ভায়োলেন্স’ বা ‘গণ-উন্মত্ততা’।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে নিরপরাধ তোফাজ্জলকে ভাত খাইয়ে পিটিয়ে হত্যা করা থেকে শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা, খাগড়াছড়ির পাহাড়ী অঞ্চলে গণপিটুনি ও অগ্নিসংযোগ, কিংবা দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনায় একদল মানুষের উন্মত্ত ভাঙচুর প্রতিটি ঘটনাই আমাদের জাতীয় বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাল হওয়া একটি চিত্রে দেখা যায়, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক ভবনের প্রতিটি ইট সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। গুজব বা ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, এই ধরনের স্থাপনা ভাঙলে নাকি অজস্র সওয়াব মিলবে, মিলবে জান্নাতের হুর!

যখন এই পৈশাচিক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সাথে ধর্মীয় স্লোগান, লেবাস কিংবা পরকালের পুরস্কারের মতো অলীক ব্যাখ্যা যুক্ত করা হয়, তখন তা আর কেবল সাধারণ অপরাধ থাকে না; বরং তা এক চরম দ্বীনী গোমরাহী ও ঈমানী বিপর্যয়ে রূপ নেয়। প্রশ্ন জাগে, শান্তি, শৃঙ্খলা ও পরম ইনসাফের ধর্ম ইসলাম কি আদৌ এই ‘জঙ্গল আইন’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে সমর্থন করে? এই প্রবন্ধে আমরা কুরআন, সুন্নাহ, ইসলামী ফিকহ, ইতিহাস এবং ভূ-রাজনীতির আলোতে মব কালচারের অসারতা, এর ধর্মীয় অপব্যাখ্যা এবং জাতীয় জীবনে এর ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করব।
'মব জাস্টিস' নাকি 'মব টেররিজম'?
আমাদের দৈনন্দিন অভিধানে ‘জাস্টিস’ বা ন্যায়বিচার একটি অত্যন্ত পবিত্র ও বরকতময় শব্দ। কিন্তু যখন এই শব্দের পূর্বে ‘মব’ (Mob) শব্দটি যুক্ত করে ‘মব জাস্টিস’ বলা হয়, তখন এটি মূলত এক ধরণের ভাষাগত প্রতারণা তৈরি করে।
মব জাস্টিস বনাম প্রকৃত ন্যায়বিচার: সোসিওলজি বা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, 'মব' হলো একটি অনিয়ন্ত্রিত, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ও সাময়িক আবেগে অন্ধ একদল মানুষের জমায়েত। এই উন্মত্ত জনতার নিজস্ব কোনো মস্তিষ্ক থাকে না; সেখানে কাজ করে একটি 'সম্মিলিত অন্ধ উন্মাদনা' (Deindividuation)। যখন কোনো মব বা জনতা বিচারকের ভূমিকা গ্রহণ করে, তখন সেখানে তথ্য-প্রমাণ, যুক্তি, সাক্ষ্য বা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ থাকে না। সেখানে বিচার হয় না, বরং সেখানে ঘটে সংগঠিত সহিংসতা বা 'মব টেররিজম' (Mob Terrorism)।
মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও ছদ্ম-বীরত্ব: বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দীর্ঘদিনের অপশাসন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং বিচারবিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা মব সংস্কৃতির জন্ম দেয়। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর যখন বিচারবিভাগ ও প্রশাসন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, তখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া মূলত বিপ্লবের মূল চেতনাকেই অস্বীকার করার শামিল। যখন একদল মানুষ একটি একা মানুষকে ঘিরে ধরে লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিংবা কোনো নীরব স্থাপনায় গিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তখন তারা মনে করে তারা কোনো বীরত্বপূর্ণ কাজ করছে। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলে, এটি আসলে কাপুরুষতা ও সাময়িক ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ মাত্র।
ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও অন্ধ আবেগ: উন্মত্ততা কি কখনো ইবাদত হতে পারে?
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক মব ভায়োলেন্সের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর সাথে ধর্মীয় লেবাস বা স্লোগানের অপব্যবহার। কিছু বিভ্রান্ত ব্যক্তি নিজেদের অন্যায় কর্মকাণ্ডকে ‘নিল্ফাসলাহ’ বা ধর্মের সেবা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করছে।
"প্রতিটি ইট ভাঙলে ১০টি সওয়াব!"
সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত গুজব বা অজ্ঞতার কারণে অনেকেই মনে করেন, নির্দিষ্ট কোনো নেতার বাড়ি, কোনো মাজারে আঘাত করলে বা কোনো অভিযুক্তকে পিটিয়ে মেরে ফেললে বেহেশতের পথ সুগম হবে। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এই ধারণাটি কেবল ভ্রান্তই নয়, বরং এক চরম কুফর ও কবিরা গুনাহ।
ইসলামী ফিকহের মূলনীতি অনুসারে, “কোনো ওয়াজিব বা সুন্নত আদায় করতে গিয়ে যদি কোনো হারাম বা ফাসাদ সৃষ্টি হয়, তবে সেই কাজ ত্যাগ করা আবশ্যক।” অপরাধীর বিচার করার অধিকার ইসলামী শরীয়ত সাধারণ নাগরিককে দেয়নি; এই অধিকার একমাত্র রাষ্ট্র ও বিচারালয়ের (القضاء / Al-Qada)। সুতরাং, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কোনো স্থাপনা ভাঙচুর করা বা কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা 'সওয়াব' তো দূরের কথা, বরং তা আল্লাহর গজব ডেকে আনার মতো মারাত্মক অপরাধ।
'আমর বিল মারুফ' (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)-এর ভুল ব্যাখ্যা
অনেকে মব ভায়োলেন্সকে বৈধতা দিতে গিয়ে কুরআন-হাদিসের ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ’ সংক্রান্ত নির্দেশনার চরম অপব্যাখ্যা করে। রাসূলে কারীম (সা.) বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় দেখতে পায়, সে যেন তা হাত দিয়ে বাধা দেয়। যদি সে তাতে অক্ষম হয়, তবে জবান দিয়ে বাধা দেবে। আর যদি তাতেও অক্ষম হয়, তবে অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করবে আর এটি ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (সহীহ মুসলিম: ৪৯)
মুফাসসিরিন ও ফুকাহায়ে কেরাম (যেমন: ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা, ইমাম আল-কুরতুবী, ইমাম আল-গাজালী) সর্বসম্মতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, ‘হাত দিয়ে অন্যায় সংশোধন করার দায়িত্ব একমাত্র রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের (حكام / Ruler & Law Enforcement)।’ সাধারণ নাগরিক যদি নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে অন্যায় থামাতে যায়, তবে তার ফলে আরও বড় অন্যায়, বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত ঘটে। আর যে কাজের ফলে সমাজে আরও বড় ফাসাদ তৈরি হয়, ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী সেই কাজ করা কঠোরভাবে হারাম।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজীবনের পবিত্রতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
ইসলামে একজন নিরপরাধ তো বটেই, এমনকি কোনো অপরাধী মানুষের জীবনের মূল্য ও অধিকারকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বিনা বিচারে কেবল সন্দেহের বশে বা ক্ষোভের বশে কোনো মানুষকে হত্যা করাকে মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির ওপর আক্রমণের সমতুল্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
কুরআনুল কারীমের কঠোর হুশিয়ারি
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
“যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল অন্য কাউকে হত্যার অপরাধে কিংবা পৃথিবীতে কোনো বিশৃঙ্খলা (ফাসাদ) সৃষ্টির অপরাধে ব্যতীত সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারও প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে জীবিত করল।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩২)
এই আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া, কেবল উন্মত্ততার বশে বা সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে কোনো মানুষকে হত্যা করা হলে, সেই ঘাতকদল আল্লাহর দরবারে সমগ্র মানবজাতির হত্যাকারী হিসেবে গণ্য হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চুরি বা অপরাজনীতির অভিযোগে তোফাজ্জলকে যেভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, কিংবা খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি যুবকদের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে তা শরীয়তের পরিভাষায় সরাসরি ‘ক্বাতলু নফসিন বিগায়রি হাক্কিন’ (অন্যায়ভাবে প্রাণসংহার), যা জাহান্নামের চিরস্থায়ী আজাবের কারণ।
প্রকৃত মুসলিমের সংজ্ঞা
রাসূলে কারীম (সা.) একজন মুসলিমের অত্যন্ত সহজ কিন্তু গভীর সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
“প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জবান (জিহ্বা) এবং হাত থেকে অন্য মুসলিম (ও সাধারণ মানুষ) নিরাপদ থাকে।” (সহীহ বুখারী: ১০, সহীহ মুসলিম: ৪১)
আজ যারা নিজেদের মুসলিম দাবি করে মব গঠন করছে, মুখে ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে মানুষকে পিটিয়ে রক্তাপ্লুত করছে, তারা কি আল্লাহর রাসূলের (সা.) এই হাদিসটিকে স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করছে না? যার হাত ও জবান থেকে সাধারণ মানুষ নিরাপদ নয়, তার ঈমানের দাবি কতটুকু খাঁটি তা গভীরভাবে অনুধাবনের সময় এসেছে।
বিদায় হজের ঐতিহাসিক মানবাধিকার সনদের অবমাননা
খ্রিষ্টীয় ৬৩২ অব্দে আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতির সার্বজনীন মানবাধিকারের যে ঐতিহাসিক আদেশ জারি করেছিলেন, তাতে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন:
فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا
“নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ এবং তোমাদের মান-সম্মান একে অপরের জন্য পরম পবিত্র ও হারাম যেমন হারাম (পবিত্র) তোমাদের এই আজকের দিনটি, এই পবিত্র মাসটি এবং এই পবিত্র শহরটি (মক্কা)।” (সহীহ মুসলিম: ১২১৮)
আজ বাংলাদেশে যখন কোনো মানুষকে প্রকাশ্য রাজপথে উলঙ্গ করে পেটানো হয়, মাথা ন্যাড়া করে অপমান করা হয়, কিংবা পিটিয়ে মেরে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়, তখন রাসূলে আকরামের (সা.) বিদায় হজের সেই পবিত্র ঘোষণাকেই বুলেটের মতো আঘাত করা হয়।
ইসলামী আইনি কাঠামো ও শরিয়তের সুশৃঙ্খল বিচারব্যবস্থা
ইসলাম কোনো বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্যের ধর্ম নয়; এটি এক নিখুঁত এবং প্রাতিষ্ঠানিক জীবনবিধান। প্রাক-ইসলামী যুগ বা 'জাহেলিয়াতের যুগে' নিয়ম ছিল কোনো গোত্রের একজন মানুষ মার খেলে অন্য গোত্রের যেকোনো মানুষকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেওয়া হতো। ইসলাম এসে সেই কাবিলা বা গোত্রীয় মব কালচার সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে সুশৃঙ্খল আইনকানুন প্রতিষ্ঠা করেছে।
বিচারিক ব্যবস্থার ৪টি অপরিহার্য শর্ত
ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী একটি ন্যায়সংগত বিচারের জন্য চারটি মৌলিক উপাদান নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক:
১. প্রমাণ পেশের বাধ্যবাধকতা (Burden of Proof): রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “অভিযোগকারীকে অবশ্যই তথ্য ও সাক্ষী পেশ করতে হবে, অন্যথায় কেবল দাবির ওপর ভিত্তি করে কাউকে সাজা দেওয়া যাবে না।”
২. সাক্ষীর আমানতদারিতা (Adalah of Witnesses): যে কেউ এসে সাক্ষী দিলেই হবে না; সাক্ষীকে সমাজে সৎ, চরিত্রবান ও নিরপেক্ষ হতে হবে।
৩. আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ (Right to Defense): কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তার বক্তব্য ব্যাখ্যা করার সুযোগ না দিয়ে দণ্ডাদেশ দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম।
৪. বিচারকের দায়িত্ব (Authority of the Judge): সাধারণ জনগণ বা বাদী নিজেই বিচারক হতে পারবে না। বিচার কেবল রাষ্ট্র নিযুক্ত কাজী বা আদালতই প্রদান করতে পারবে।
মব জাস্টিসে ইসলামী বিধির লঙ্ঘন
মব ভায়োলেন্সে উপরোক্ত চারটি শর্তের প্রতিটিকেই বুটজুতো দিয়ে দলে দেওয়া হয়। এখানে অভিযোগকারীই বিচারক, এখানে উসকানিদাতাই সাক্ষী, এবং এখানে ক্ষুব্ধ জনতাই জল্লাদ! ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এই ধরণের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ‘বাতিল’ এবং একে পরিচালনা করা মারাত্মক ফাসাদের শামিল।
শত্রুর প্রতিও ন্যায়বিচার: তাকওয়া ও ইনসাফের সর্বোচ্চ কুরআনী মানদণ্ড
রাজনীতি বা ব্যক্তিগত শত্রুতার অজুহাতে আমাদের দেশে প্রায়ই প্রতিপক্ষকে মব আক্রমণের শিকার হতে দেখা যায়। আমরা মনে করি, যেহেতু অমুক ব্যক্তি অতীতে কোনো অন্যায় করেছিল বা ভিন্ন মতাদর্শের, তাই তার ওপর হামলা চালানো জায়েজ। কিন্তু পবিত্র কুরআন এই নীচ মানসিকতাকে কঠোর ভাষায় নিষেধ করেছে।
ইসলামের ইনসাফ মানদণ্ড ─► ব্যক্তিগত/রাজনৈতিক শত্রুতা থাকলেও জুলুম করা হারাম
│
▼
সূরা আল-মায়িদাহ: ৮ অনুযায়ী বিচার
│
▼
অন্ধ ক্ষোভ নয়, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত
শত্রুর প্রতি ইনসাফের কড়া নির্দেশ
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের উদ্দেশে এক অমোঘ নির্দেশ জারি করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়বিচারে দৃঢ়প্রতিনিধি হিসেবে জাগ্রত থাকো এবং সত্যের সাক্ষী হও। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ বা শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ইনসাফ না করার দিকে প্ররোচিত না করে। তোমরা ইনসাফ করো, এটিই তাকওয়ার নিকটতর। আর আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর ওয়াস্তে সত্য সাক্ষ্য দাও যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে যায় কিংবা পিতা-মাতা ও নিকট আত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়।” (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
এই আয়াতগুলোর বার্তা স্ফটিকের মতো পরিষ্কার। আপনি যাকে ঘৃণা করেন, সে যদি অপরাধীও হয়, তবুও তার সাথে অন্যায় করা যাবে না। তাকে ধরে পিটিয়ে মারার বা তার বাড়ি ভাঙচুর করার অধিকার আল্লাহ আপনাকে দেননি। তার অপরাধের বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে দেশের আইনে। যদি কোনো ব্যক্তি শত্রুর প্রতি ক্ষোভের বশে বেইনসাফি করে, তবে সে আল্লাহর কাছে ‘তাকওয়াহীন’ হিসেবে গণ্য হবে।
মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক ক্ষমা
রাসূলে কারীম (সা.) মক্কা বিজয়ের দিনে কী করেছিলেন? কুরাইশরা তাঁকে দীর্ঘ ১৩ বছর শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেছিল, তাঁর সাহাবিদের শহীদ করেছিল, তাঁকে নিজের প্রিয় জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিল। কিন্তু বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করার পর রাসূল (সা.) কোনো ‘মব আক্রমণ’ পরিচালনা করেননি; তিনি কোনো প্রতিবেশীর বাড়ি ভাঙচুর করতে দেননি। বরং তিনি কুরাইশদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন:
“আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা সবাই স্বাধীন ও মুক্ত!”
এটিই হলো সত্যিকারে বিশ্বনবীর (সা.) আদর্শ। যারা নবুওয়াত ও সুন্নাহর অনুসারী বলে দাবি করে, তারা কখনো প্রতিশোধের উন্মাদনায় বাড়িঘর ভাঙতে বা মানুষকে পিটিয়ে মারতে পারে না।
ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস: 'ফাসাদ ফিল আরদ্ব' ও শরিয়তের হুকুম
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ভাস্কর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতিচিহ্ন, ঐতিহাসিক ভবন (যেমন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর), জাদুঘর এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে তা নিয়ে একটি বড় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে মূর্খতাবশত দাবি করছেন যে এসব স্থাপনা ধ্বংস করলে নাকি সওয়াব মিলবে।
'ফাসাদ ফিল আরদ্ব' বা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা
ইসলামে অন্যের সম্পদ, ব্যক্তিগত বাড়িঘর বা রাষ্ট্রের জাতীয় অবকাঠামো ধ্বংস করাকে 'ফাসাদ ফিল আরদ্ব' (পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি) বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ
“আর এই ফিতনা (বিৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য) সৃষ্টি করা হত্যাকাণ্ড অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ।” (সূরা আল-বাকারা: ১৯ই)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও নির্দেশ দিয়েছেন:
وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا
“তোমরা পৃথিবীতে শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপিত হওয়ার পর সেখানে বিপর্যয় বা ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করো না।” (সূরা আল-আরাফ: ৫৬)
সাহাবায়ে কেরামের কালজয়ী দৃষ্টান্ত
সাহাবায়ে কেরাম যখন পারস্য (ইরান), রোমান সাম্রাজ্য (সিরিয়া, জর্ডান), মিসর ও ইরাক জয় করেছিলেন, তখন সেসব দেশে বহু হাজার বছরের পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, বিভিন্ন ধর্মানুসারীদের উপাসনালয়, পিরামিড এবং সুউচ্চ মূর্তি ও রাজপ্রাসাদ বিদ্যমান ছিল।
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কিংবা হজরত আমুর ইবনুল আস (রা.) কি মিসরের পিরামিড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন? হজরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) কি পারস্যের ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ তছনছ করেছিলেন? কখনোই না! কারণ তারা জানতেন জাতীয় ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের সাথে শিরক বা কুফরের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই, যতক্ষণ না সেগুলোকে উপাসনা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সভ্যতার ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষা করা দায়িত্বশীল মুসলিমদের কাজ, তা ধ্বংস করা নয়।
সামাজিক মাধ্যম, গুজব ও উসকানি: মব সন্ত্রাসের আসল জ্বালানি
বর্তমান যুগে মব ভায়োলেন্স ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বিপজ্জনক ভূমিকা পালন করছে প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যম (Facebook, YouTube, TikTok)। একটি ভুয়া পোস্ট, একটা এডিটেড ভিডিও বা উসকানিমূলক স্ট্যাটাস মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে উত্তেজিত করে তোলে।
সোশ্যাল মিডিয়া গুজব ─► অন্ধ উত্তেজনা ─► মব গঠন ─► হত্যা ও ভাঙচুর
│
▼
কুরআনী সমাধান: 'তাতাব্বু' বা তথ্য যাচাই
তথ্য যাচাইয়ের কুরআনী নির্দেশ
হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে কোনো গুজব শুনেই ঝাঁপিয়ে পড়ার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বিশেষ নির্দেশনা অবতীর্ণ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ
“হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো ফাসিক (অবিশ্বস্ত/পাপাচারী) ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করো। যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো, যার ফলে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরকে পরবর্তীতে অনুতপ্ত হতে হয়।” (সূরা আল-হুজুরাত: ৬)
তকফীর বা ঢালাওভাবে কাফের/মুনাফিক ফতোয়া দেওয়ার বিপদ
সামাজিক মাধ্যমে কাউকে ‘ইবলিস’, ‘কাফের’, ‘ভারতের দালাল’ বা ‘মুনাফিক’ ট্যাগ দিয়ে তার ওপর আক্রমণ চালানোকে জায়েজ মনে করা হচ্ছে। রাসূলে কারীম (সা.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন:
“যদি কোনো ব্যক্তি তার কোনো ভাইকে বলে ‘হে কাফের!’, তবে দুজনের যেকোনো একজনের ওপর তা নিশ্চিতভাবে পতিত হয়।” (সহীহ বুখারী: ৬০৪৫)
কাউকে জাজমেন্ট না করে, সত্যতা না জেনে তার ওপর হামলা চালানো চরম মূর্খতা ও জাহেলিয়াতের চিহ্ন। সোশ্যাল মিডিয়ায় আসা যেকোনো সংবাদের সত্যতা যাচাই করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানানোই হলো একজন প্রকৃত সচেতন নাগরিক ও মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব।
ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও সার্বভৌমত্বের হুমকি: 'কাশ্মীর মডেল' ও প্রক্সি ওয়ারের আশঙ্কা
মব ভায়োলেন্স কেবল একটি আইনশৃঙ্খলা বা সামাজিক সমস্যা নয়; এটি একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এক মহাবিপর্যয়। যখন একটি দেশে আইনের শাসন ভেঙে পড়ে এবং মব কালচার প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে দেশটি একটি ‘অকার্যকর রাষ্ট্র’ (Failed State) হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে।
অরাজকতার সুযোগে ভৌগোলিক ফাটল
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন পার্বত্য খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাত বা মব সহিংসতা ঘটে, কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলার গুজব ও ঘটনা ঘটে, তখন বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। বিদেশি গণমাধ্যম ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো অত্যন্ত সুচতুরভাবে এই চিত্রগুলোকে ব্যবহার করে প্রমাণ করতে চায় যে বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে বর্তমান সরকার ও জনগণ ব্যর্থ।
'কাশ্মীর বা সিরিয়া মডেল'-এর বাস্তব আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কার কথা বলছেন। যদি বাংলাদেশে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকে, তবে তা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর জন্য একটি 'উর্বর জমিন' তৈরি করবে।
প্রক্সি ওয়ার (Proxy War): দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভারত, পাকিস্তান, চীন কিংবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো বাংলাদেশকে নিজেদের দাবা খেলার ছক বানাতে চাইতে পারে।
কাশ্মীরীকরণ: যেমনটি আমরা কাশ্মীরে দেখি যেখানে দুটি পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধে পিষ্ট হয় সাধারণ জনগণ এবং থমকে যায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশে যদি ধর্মীয় উন্মাদনা ও মব সন্ত্রাসকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব চরম হুমকির মুখে পড়বে এবং দেশটি গৃহযুদ্ধ বা প্রক্সি যুদ্ধের খপ্পরে পড়তে পারে।
মব ভায়োলেন্স বনাম ইসলামী আইনি প্রক্রিয়া
নিচে মব ভায়োলেন্স এবং ইসলামী শরিয়তের আইনি বিচার ব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ, তথ্যভিত্তিক ও কাঠামোগত তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা হলো:
বিচারিক/সামাজিক মানদণ্ড | মব ভায়োলেন্স / গণ-উন্মত্ততা (Mob Violence) | ইসলামী ইনসাফ ও শরিয়তী আইনি প্রক্রিয়া (Islamic Law) |
সিদ্ধান্তগ্রহণের ভিত্তি | অন্ধ গুজব, সাময়িক ক্ষোভ, আবেগ ও ভিড়ের উন্মাদনা | নিরপেক্ষ তথ্য, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও শরীয়াহ আইনি পরীক্ষা |
বিচারিক কর্তৃপক্ষ | অনিয়ন্ত্রিত রাস্তাঘাটের জনতা (আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া) | রাষ্ট্র নিযুক্ত আদালত, বিচারক (কাজী) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী |
প্রমাণের বাধ্যবাধকতা | কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই; ধারণাই এখানে চূড়ান্ত প্রমাণ | 'আল-বায়্যিনাহ' (অভিযোগকারীর প্রমাণ পেশের বাধ্যবাধকতা) |
আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার | সম্পূর্ণ অনুপস্থিত; অভিযুক্তকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয় না | অভিযুক্তকে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের পূর্ণ আইনি অধিকার |
মানবাধিকারের অবস্থান | মানব মর্যাদা, সম্মান ও জীবনের অধিকার সম্পূর্ণ পদদলিত | 'হুরমাতুল ইনসান' বা মানব মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা ফরজ |
শত্রুর প্রতি আচরণ | শত্রুর ওপর নির্মম নির্যাতন, হত্যা ও অপমানের অন্ধ মানসিকতা | শত্রুর প্রতিও ন্যায়বিচারের কুরআনী আদেশ (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮) |
স্থাপনা ও সম্পদের সুরক্ষা | ঘরবাড়ি, জাতীয় সম্পদ ও ঐতিহাসিক ইমারত ধ্বংস ও অগ্নিসংযোগ | সম্পদ ও স্থাপত্য ধ্বংস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; একে 'ফাসাদ ফিল আরদ্ব' বলা হয় |
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি | জাহেলিয়াতের গোত্রীয় উন্মাদনা; চরম গুনাহ ও অপব্যাখ্যা | ন্যায়বিচারের পরম প্রতীক; রাষ্ট্রের সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্তম্ভ |
সামাজিক ফলাফল | নৈরাজ্য, পারিবারিক ধ্বংস, অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা | সামাজিক শান্তি, অপরাধ দমন, স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ |
জাতীয় নিরাপত্তার প্রভাব | রাষ্ট্রকে অকার্যকর করে প্রক্সি ওয়ার ও বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করে | জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রীয় অবস্থান সুদৃঢ় করে |
উত্তরণের রাজপথ: নাগরিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় সমাজের দায়িত্ব
মব সন্ত্রাসের অন্ধকার গহ্বর থেকে মুক্ত হয়ে বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের তিনটি স্তরে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করতে হবে:
ওলামায়ে কেরাম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা
সঠিক শিক্ষার প্রচার: দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমসমাজ, ইমাম ও খতিবদের জুমার খুতবায় এবং ওয়াজ মাহফিলে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া শরিয়তবিরোধী এবং মব গঠন করে মানুষ মারা বা স্থাপনা ভাঙচুর করা কবিরা গুনাহ।
ফতোয়া জারি: জাতীয় স্তরে সম্মিলিত ফতোয়া বোর্ডের মাধ্যমে মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে স্পষ্ট শরীয়তী অবস্থান ঘোষণা করতে হবে, যাতে কোনো বিভ্রান্ত তরুণ ধর্মের নামে অপরাধ করার সাহস না পায়।
রাষ্ট্র ও বিচারবিভাগের দায়িত্ব
জিরো টলারেন্স নীতি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, খাগড়াছড়িসহ সারাদেশে যারা মব হত্যা ও ভাঙচুরে অংশ নিয়েছে, তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রততম সময়ে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা: পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুনর্গঠিত করে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ আদালতের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।
সাধারণ নাগরিক ও যুবসমাজের করণীয়
সচেতনতা ও প্রতিরোধ: তরুণ প্রজন্মকে উপলব্ধি করতে হবে যে, বিপ্লব মানে নৈরাজ্য নয়। কোনো অপরাধীকে দেখলে তাকে ধরে মারধর না করে নিরাপদে নিকটস্থ থানায় বা সেনাবাহিনীর হাতে সোপর্দ করাই হলো দায়িত্বশীল নাগরিকের কাজ।
গুজবে কান না দেওয়া: সামাজিক মাধ্যমে কোনো স্পর্শকাতর পোস্ট দেখলেই প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আগে মূলধারার গণমাধ্যম থেকে সংবাদের সত্যতা যাচাই করতে হবে।
ইনসাফ বনাম নৈরাজ্যের চূড়ান্ত নির্বাচন
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আমাদের সামনে রয়েছে ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার বিশাল সুযোগ; অন্যদিকে রয়েছে মব সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও অন্ধ উন্মাদনার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার ভয়াবহ আশঙ্কা।
আমরা যদি নিজেদের ক্ষোভ, রাজনীতি আর ব্যক্তিগত রাগকে ‘দ্বীন’ বা ধর্ম মনে করতে শুরু করি, তবে আমরা কেবল নিজেদের ধ্বংসই সুনিশ্চিত করব। যে সমাজ অপরাধীর বিচারের জন্য মবের ওপর নির্ভর করে, সে সমাজ বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। মনে রাখতে হবে, আজ আপনি উন্মত্ত জনতার ভিড়ে থেকে অন্যকে আঘাত করছেন, কিন্তু কাল যদি আইনি শৃঙ্খলা না থাকে, তবে আপনিও সেই একই উন্মাদ ভিড়ের সামনে শিকার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন!
ইসলাম কোনো তলোয়ারের উন্মাদনা নয়, ইসলাম ইনসাফের নাম। ইসলাম কোনো স্থাপনা ভাঙার কুসংস্কার নয়, ইসলাম নির্মাণের আলো। আসুন, ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা ও উসকানিমূলক অন্ধ আবেগকে প্রত্যাখ্যান করে আমরা মহান আল্লাহর নির্দেশিত ইনসাফ, বিশ্বনবীর (সা.) প্রদর্শিত রহমত এবং আইনের শাসনের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করি। মব সন্ত্রাসকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে ন্যায় ও শৃঙ্খলার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলি আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ।





















