সবচেয়ে বেশি প্রবাসী যে ১০ জেলায় - যারা টিকিয়ে রেখেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি

বাংলাদেশের সমসাময়িক জাতীয় অর্থনীতির দিকে চোখ বুলালে একটি বৈপরিত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে যখন ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা, ব্যাপক অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলে, ঠিক অন্যদিকে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি উদীয়মান ও সহনশীল অর্থনীতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। এই আপাত অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার নেপথ্যে যে মূল চালিকাশক্তিটি অদম্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তা হলো আমাদের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশ্লেষকরা স্পষ্টভাষায় স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান জ্বালানি হলো এই রেমিটেন্স। যদি টানা কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক বা কৌশলগত কারণে বাংলাদেশে রেমিটেন্স আসা বন্ধ হয়ে যায়, তবে দেশের আমদানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধসে পড়বে, তৈরি হবে চরম অনাহার ও দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতি।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন আনুমানিক ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশী। প্রবাসে কাটানো তাঁদের প্রতিটি ফোঁটা ঘাম আর অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে উপার্জিত অর্থ সচল রাখছে এ দেশের শতশত গ্রামীণ বাজার, শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই অবদানের ব্যাপ্তি আরও স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়। ২০২৫ সালে দেশে রেকর্ড ৩২.৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স রিজার্ভে যোগ হয়েছে। বৈশ্বিক মন্দা ও নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ২০২৬ সালের বর্তমান সময়সীমায় রেমিটেন্স আসার পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ২২% বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বিশালাকার রেমিটেন্সের সিংহভাগই কিন্তু সুনির্দিষ্ট কিছু জেলা থেকে আসা প্রবাসী যোদ্ধাদের অবদান। আঞ্চলিক ভিত্তিতে যে জেলাগুলো এককভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই শীর্ষ ১০টি প্রবাসীবহুল জেলার সার্বিক চিত্রে চোখ রাখা যাক।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রবাসী শ্রমবাজারের বিন্যাস

বাংলাদেশের প্রবাসীরা বিশ্বের এক এক প্রান্তে এক এক ধরনের পেশা ও শিল্পখাতে নিজেদের কাজের ক্ষেত্র গড়ে তুলেছেন। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে এই অভিবাসনের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করলে প্রধান ৪টি ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়:

মধ্যপ্রাচ্য (Gulf Cooperation Council - GCC): সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত। তাঁরা মূলত নির্মাণ খাত, জ্বালানি খাত, সেবা খাত এবং কৃষি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে নিয়োজিত।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মী প্রস্তুতকারক শিল্প (Manufacturing), শিপইয়ার্ড এবং মেগা কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টগুলোতে দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিক হিসেবে অবদান রাখছেন।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা: যুক্তরাজ্য, ইতালি, গ্রিস, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় একাধারে ক্যাটারিং/রেস্তোরাঁ ব্যবসা, খুচরা বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিভিন্ন পেশাদার উচ্চশিক্ষিত খাতে বাংলাদেশীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

পূর্ব এশিয়া (দক্ষ ও পেশাদার কর্মসংস্থান): দক্ষিণ কোরিয়ার 'ইপিএস' (EPS) সিস্টেম এবং জাপানের স্কিলড ওয়ার্কার প্রোগ্রামের মাধ্যমে নতুনের ন্যায় বহু দক্ষ প্রযুক্তিবিদ ও মেকানিক পাড়ি জমাচ্ছেন।

রেমিটেন্সের সামাজিক প্রভাব: রেমিটেন্স কেবল জাতীয় উদৃত্ত বাড়ায় না, এটি প্রবাসীদের মূল গ্রামের পরিবারগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং উন্নত গৃহনির্মাণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। ফলে গ্রামীণ অর্থব্যবস্থায় 'মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট' (Multiplier Effect) তৈরি হয়।

জাতীয় অর্থনীতি রক্ষা ও রেমিটেন্সের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব

যদি প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ বন্ধ হয়ে যেত, তবে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি তিনটি প্রধান সংকটের মুখে পড়ত:

মুদ্রাস্ফীতি ও আমদানির স্থবিরতা: খাদ্যশস্য, ক্রুড অয়েল ও ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য যে পরিমাণ ডলার প্রয়োজন, তা মেটাতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হতো।

টাকার মান পতন: ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী টাকার অভূতপূর্ব অবমূল্যায়ন ঘটত।

গ্রামীণ ব্যাংকিং খাতের ধস: দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্যাংকিং শাখাগুলোর প্রধান আমানত ও লেনদেনের মাধ্যমই হলো প্রবাসীদের পাঠানো পরিবারিক রেমিটেন্স।

এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে জাতিকে রক্ষায় যে জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি প্রবাসী শ্রমিক ও পেশাজীবীদের বিদেশে পাঠিয়েছে, সেগুলোর অবস্থান নিচে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হলো।

রেমিটেন্সের অর্থনীতি: সবচেয়ে বেশি প্রবাসী যে ১০ জেলায়

কুমিল্লা (বাংলাদেশের 'প্রবাসী রাজধানী')

রেমিটেন্স আয়ের দিক থেকে এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানে লোক পাঠানোর নিরিখে শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে কুমিল্লা। ঐতিহ্যগতভাবেই এই জেলার মানুষের রক্তে ও মনস্তত্ত্বে যেন প্রবাসে গিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের অদম্য তাগিদ মিশে আছে।

প্রবাসী সংখ্যা: কুমিল্লার প্রায় ৭ থেকে ৮ লক্ষাধিক মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছেন। জেলার প্রায় প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন বা একাধিক সদস্য বিদেশে থাকেন।

অভিবাসনের ইতিহাস: বিএমইটি (BMET)-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত ১০ বছরে কেবল বৈধভাবে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমেই এই জেলা থেকে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৬৬ই জন কর্মী প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন।

প্রধান গন্তব্য দেশ: মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়ায় কুমিল্লার অধিবাসীদের শক্তিশালী আধিপত্য রয়েছে। এছাড়া ইতালি ও যুক্তরাজ্যেও বড় সামাজিক নেটওয়ার্ক রয়েছে।

অর্থনৈতিক অবদান: ২০২৫ সালে এককভাবে এই জেলায় আনুমানিক ১৬,০০০ থেকে ১৮,০০০ কোটি টাকার বেশি রেমিটেন্স এসেছে। এই অর্থ দিয়ে জেলাটির গ্রামীণ অবকাঠামো, বহুতল ভবন এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে।

চট্টগ্রাম (বাণিজ্যিক রাজধানী ও সামুদ্রিক ঐতিহ্যের ধারক)

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম রেমিটেন্স অর্জনে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে প্রাচীনকাল থেকেই যুক্ত থাকায় এ জেলার মানুষের বিদেশে যাওয়ার ঐতিহ্য বেশ পুরনো।

প্রবাসী সংখ্যা: চট্টগ্রামের প্রায় ৪ থেকে ৫ লক্ষাধিক নাগরিক বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছেন।

পেশাগত বৈচিত্র্য: বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় বন্দরের শিপিং লাইন, আন্তর্জাতিক নাবিক (Seafarers) পেশা, ক্যাটারিং ও মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এ জেলার মানুষ কর্মরত।

প্রধান গন্তব্য দেশ: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর (বিশেষ করে আবুধাবি, দুবাই ও ওমান) পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চট্টগ্রামের শক্তিশালী ব্যবসায়ী ও প্রবাসী কমিউনিটি রয়েছে।

অর্থনৈতিক অবদান: সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১১ মাসেই চট্টগ্রামের প্রবাসীরা আনুমানিক ৬.৩৬ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ নিজ জেলায় পাঠিয়েছেন, যা স্থানীয় ব্যাংকিং খাতকে অত্যন্ত শক্তিশালী করেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া (শিল্প-সংস্কৃতি ও প্রবাসী আয়ের মেলবন্ধন)

তিতাস গ্যাসের দেশ নামে খ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেবল শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেই এগিয়ে নেই; বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও এটি দেশের অন্যতম শীর্ষ জেলা।

প্রবাসী সংখ্যা: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রায় ৩ থেকে ৪ লক্ষাধিক লোক প্রবাসে কর্মরত।

প্রধান গন্তব্য দেশ: মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার ও মালয়েশিয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করেন। তাছাড়া যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও বার্মিংহামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশেষ পরিচিতি ও বিশাল কমিউনিটি রয়েছে।

অর্থনৈতিক অবদান: ২০২৫ সালে এই জেলায় আনুমানিক ১০,০০০ কোটি টাকা রেমিটেন্স প্রবেশ করেছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্ধেকের বেশি টাকা জমি ক্রয়, আধুনিক বাড়ি নির্মাণ এবং স্থানীয় কৃষিসংশ্লিষ্ট শিল্পে বিনিয়োগ হচ্ছে।

টাঙ্গাইল (দক্ষ শ্রমিক ও সার্ভিস সেক্টরের চালিকাশক্তি)

ঢাকা বিভাগের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম ও উন্নত এই জেলাটি গত দুই দশকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে।

প্রবাসী সংখ্যা: টাঙ্গাইলের আনুমানিক ২ থেকে ৩ লক্ষাধিক কর্মী বর্তমানে বিদেশের মাটিতে কর্মরত।

পেশাগত বৈচিত্র্য: মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রজেক্টে টাঙ্গাইলের শ্রমিকেরা তাঁদের দক্ষতা ও কর্মঠ স্বভাবের জন্য সুপরিচিত। বিশেষ করে কনস্ট্রাকশন, ভারী যানবাহন চালনা এবং সার্ভিস সেক্টরে টাঙ্গাইলের মানুষের বিশাল চাহিদা রয়েছে।

অর্থনৈতিক অবস্থান: প্রতি বছরই এ জেলায় প্রবাসী পরিবারের সংখ্যা আশাতীত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সালে হাজার হাজার কোটি টাকার রেমিটেন্সের ওপর ভর করে এ জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে।

ঢাকা (দক্ষ পেশাজীবী, মাইগ্রেশন হাব ও রেমিটেন্স জমার কেন্দ্র)

রাজধানী ও প্রশাসনিক জেলা হওয়ায় ঢাকার তথ্য বিশ্লেষণ করা কিছুটা ব্যতিক্রমী। একদিকে ঢাকার আদি বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ উন্নত বিশ্বে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, অন্যদিকে সারা দেশের প্রবাসী পরিবারের একটি বিশাল অংশ বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করায় রেমিটেন্স গ্রহণে জেলাটির পরিসংখ্যান সবচেয়ে বেশি দেখায়।

প্রবাসী সংখ্যা: ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে আনুমানিক ২ থেকে ৩ লক্ষাধিক মানুষ প্রবাসে থাকেন।

ব্রেইন ড্রেন ও দক্ষ পেশাজীবী: অন্যান্য জেলার সাথে ঢাকার মূল পার্থক্য হলো এখান থেকে উচ্চশিক্ষিত প্রকৌশলী, চিকিৎসক, আইটি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান।

অর্থনৈতিক অবদান: ২০২৫ সালে ঢাকার ব্যাংক শাখাগুলোতে আনুমানিক ১ থেকে ১.৫ লাখ কোটি টাকার বেশি রেমিটেন্স জমা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো ঢাকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান শাখা এবং অন্যান্য জেলার প্রবাসীদের পরিবারদের অধিকাংশের বর্তমান বাসস্থান ঢাকা মহানগরীতে হওয়া।

চাঁদপুর (মেঘনা পাড়ের সামুদ্রিক ঐতিহ্য ও শ্রম শক্তি)

মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত চাঁদপুরের রূপালী ইলিশের পাশাপাশি এই জেলার মানুষের মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিই হলো প্রবাসীদের উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা।

প্রবাসী সংখ্যা: চাঁদপুরের আনুমানিক ১.৫ থেকে ২ লক্ষাধিক প্রবাসী বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছেন।

ভৌগোলিক ঐতিহ্য: নৌ ও সামুদ্রিক যোগাযোগের ঐতিহ্য থাকায় চাঁদপুরের মানুষ সাহসের সাথে বিদেশ পাড়ি জমান।

প্রধান গন্তব্য দেশ: মধ্যপ্রাচ্য (সৌদি আরব, কাতার) ও মালয়েশিয়ায় চাঁদপুরের কর্মীদের বিশাল উপস্থিতি দেখা যায়।

অর্থনৈতিক অবদান: ২০২৫ সালে চাঁদপুর জেলায় প্রায় ৯৪৮ কোটি টাকার বেশি অফিসিয়াল রেমিটেন্স এসেছে, যা স্থানীয় কৃষি ও খুচরা ব্যবসা খাতকে গতিশীল রাখছে।

নোয়াখালী (শ্রমিকদের অধ্যবসায় ও মধ্যপ্রাচ্যের দুর্গ)

উপকূলীয় জেলা নোয়াখালীর মানুষের শারীরিক পরিশ্রম করার ক্ষমতা এবং ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার কারণে তারা প্রবাসে বেশ সফল।

প্রবাসী সংখ্যা: নোয়াখালীর প্রায় ১.৫ থেকে ২ লক্ষাধিক মানুষ প্রবাসে কর্মরত।

প্রধান গন্তব্য দেশ: সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে নোয়াখালীর মানুষের শক্তিশালী এবং সংগঠিত আঞ্চলিক সমিতি ও কমিউনিটি রয়েছে।

জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন: নোয়াখালীর চরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকার অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূলে রয়েছে রেমিটেন্স। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের নেপথ্যে কাজ করেছে প্রবাসী স্বজনদের পাঠানো অর্থ।

মুন্সীগঞ্জ (ছোট ভূখণ্ড, কিন্তু রেমিটেন্সের বড় কারখানা)

ভৌগোলিক আয়তনে ছোট হলেও প্রবাসী আয়ের অনুপাতে মুন্সীগঞ্জ জেলাটি জাতীয় অর্থনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী।

প্রবাসী সংখ্যা: মুন্সীগঞ্জের আনুমানিক ১ থেকে ১.৫ লক্ষাধিক মানুষ বিদেশে থাকেন।

প্রধান গন্তব্য দেশ: বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে মুন্সীগঞ্জের কর্মীদের শক্তিশালী পদচারণা রয়েছে। তাঁরা ম্যানুফ্যাকচারিং, কনস্ট্রাকশন ও শিপইয়ার্ড শিল্পে কাজ করেন।

অর্থনৈতিক সাফল্য: প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দিয়ে চালিত মুন্সীগঞ্জের কোল্ড স্টোরেজ শিল্প, আলু চাষাবাদ ও আবাসন ব্যবসা এ অঞ্চলকে জাতীয় পর্যায়ে এক অর্থনৈতিক হাবে পরিণত করেছে।

নরসিংদী (টেক্সটাইল হাব থেকে দূরপ্রাচ্যের প্রযুক্তিনির্ভর অভিবাসন)

তাত ও বস্ত্রশিল্পের জন্য বিখ্যাত নরসিংদী জেলা আধুনিক প্রযুক্তিগত ও দক্ষ শ্রম অভিবাসনে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রবাসী সংখ্যা: নরসিংদীর আনুমানিক ১ থেকে ১.৫ লক্ষাধিক মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন।

দক্ষতার নতুন ক্ষেত্র: প্রথাগত মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের পাশাপাশি নরসিংদীর তরুণ সমাজ সরকারি চ্যানেল (EPS)-এর মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে টেকনিশিয়ান ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্মী হিসেবে যোগ দিচ্ছেন, যেখানে আয়ের পরিমাণ তুলনামূলক অনেক বেশি।

ফেনী (ইউরোপীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসা ও প্রবাসীদের সাফল্য)

ছোট জেলা ফেনীর প্রবাসীরা ইউরোপীয় অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে নিজেদের একটি আলাদা ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রবাসী সংখ্যা: ফেনীর প্রায় ১ লক্ষাধিক নাগরিক বিভিন্ন দেশে কর্মরত।

ব্যবসায়িক আধিপত্য: ফেনীর মানুষ কেবল সাধারণ শ্রম প্রদান করেন না; যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং ফ্রান্সের বাংলাদেশী ক্যাটারিং ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার একটি বড় অংশ ফেনীর প্রবাসীদের নিয়ন্ত্রণে।

অন্যান্য গন্তব্য: সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াতেও ফেনীর তরুণরা প্রচুর পরিমাণে কর্মরত আছেন।

এক নজরে শীর্ষ ১০ প্রবাসীপ্রবণ জেলার অর্থনৈতিক তথ্যচিত্র

নিচে সারা বাংলাদেশের রেমিটেন্স বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা শীর্ষ ১০টি জেলার তথ্যচিত্র একটি সারণীর মাধ্যমে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

জেলার নাম

আনুমানিক প্রবাসী সংখ্যা

প্রধান গন্তব্য দেশসমূহ

প্রাথমিক কাজের ক্ষেত্র / অর্থনৈতিক গতিশীলতা

২০২৫-২৬ বার্ষিক রেমিটেন্সের চিত্র

১. কুমিল্লা

৭ - ৮ লাখ+

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কুয়েত

নির্মাণ খাত, সেবা, বাণিজ্য ও স্বকর্মসংস্থান।

১৬,০০০ - ১৮,০০০+ কোটি টাকা (শীর্ষ রেমিটেন্স অর্জনকারী)

২. চট্টগ্রাম

৪ - ৫ লাখ+

ইউএই, ওমান, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য

মেরিটাইম, বন্দর বাণিজ্য, হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রজেক্ট।

৬.৩৬ বিলিয়ন ডলার (গত ১১ মাসের গড় চিত্র)

৩. ব্রাহ্মণবাড়িয়া

৩ - ৪ লাখ+

সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, যুক্তরাজ্য

নির্মাণ শিল্প, জেনারেল লেবার, রেস্তোরাঁ ব্যবসা।

১০,০০০+ কোটি টাকা

৪. টাঙ্গাইল

২ - ৩ লাখ+

মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

সার্ভিস সেক্টর, পরিবহন ও মেগা প্রজেক্ট নির্মাণ।

হাজার হাজার কোটি টাকা (দ্রুত বর্ধনশীল এলাকা)

৫. ঢাকা

২ - ৩ লাখ (আদি)

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ

আইটি, প্রকৌশল, চিকিৎসাসেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা।

১ - ১.৫ লাখ কোটি টাকা (কেন্দ্রীয় বিতরণ ও সঞ্চয় কেন্দ্র)

৬. চাঁদপুর

১.৫ - ২ লাখ

সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়া

ড্রাইভিং, রেস্তোরাঁ কর্মী ও কৃষি ব্যবসা।

৯৪৮+ কোটি টাকা

৭. নোয়াখালী

১.৫ - ২ লাখ

সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন

ছোট ব্যবসা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্মাণ খাত।

গ্রামীণ অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান উৎস

৮. মুন্সীগঞ্জ

১ - ১.৫ লাখ

মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর

কনস্ট্রাকশন, ম্যানুফ্যাকচারিং ও শিপইয়ার্ড।

স্থানীয় কোল্ড স্টোরেজ ও কৃষিশিল্পে বড় মূলধন যোগায়

৯. নরসিংদী

১ - ১.৫ লাখ

দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য

ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনিশিয়ান, টেক্সটাইল ও সাধারণ শ্রমিক।

ইএসপি স্কিমের মাধ্যমে উচ্চ আয়ের রেমিটেন্স

১০. ফেনী

১ লাখ+

যুক্তরাজ্য, ইতালি, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া

ইউরোপে ক্যাটারিং/ফুড বিজনেস ও জেনারেল ওয়ার্কার।

ইউরোপ থেকে আসা মোট রেমিটেন্সে শীর্ষ ভাগীদার

বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের ঐতিহাসিক বিবর্তন (১৯৭৬–বর্তমান)

বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ার সূচনা এবং বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছানোর ইতিহাস প্রধানত চারটি স্পষ্ট ধাপে বিভক্ত:

সূচনালগ্ন ও মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধি (১৯৭৬–১৯৯০)

১৯৭৬ সালে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকারিভাবে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে (যেমন: সৌদি আরব, কুয়েত, ইউএই) দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হয়। বিশাল এই নির্মাণযজ্ঞে অংশ নিতে বাংলাদেশে হাজার হাজার অদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিক পাড়ি জমান।

এশীয় টাইগার ও শ্রমবাজারের বিস্তার (১৯৯১–২০১০)

নব্বইয়ের দশকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, বাহরাইন ও ওমানে বাংলাদেশী শ্রমিকের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এ সময় তৈরি পোশাক খাত, নির্মাণ খাত এবং শিপইয়ার্ড শিল্পে বাংলাদেশীদের দক্ষতা প্রশংসিত হয়। পাশাপাশি ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে নারী গৃহকর্মী প্রেরণের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বৈচিত্র্যায়ন ও দূরপ্রাচ্যের নতুন দিগন্ত (২০১১–বর্তমান)

দক্ষিণ কোরিয়ার ইপিএস (EPS) স্কিম, জাপানের টেকনিক্যাল ইন্টার্ন প্রসেস এবং ইউরোপের (বিশেষ করে ইতালি, রোমানিয়া, গ্রিস) শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মীদের অনুপ্রবেশ ঘটে। এই সময়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর (TTC) ভূমিকা বৃদ্ধি পায় এবং রেমিটেন্স পাঠাতে ব্যাংকিং প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ঘটে।

রেমিটেন্সের দ্বিমুখী অর্থনৈতিক প্রভাব: সামষ্টিক ও ব্যাষ্টিক সমীকরণ

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics) এবং ব্যাষ্টিক অর্থনীতি (Microeconomics) উভয় ক্ষেত্রেই রেমিটেন্সের প্রভাব অপরিসীম।

সামষ্টিক প্রভাব (Macroeconomic Impact)

রিজার্ভের ব্যাকআপ ও ইম্পোর্ট কভার (Import Cover): বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল, খনিজ তেল, মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং খাদ্যশস্য আমদানির জন্য যে বিপুল পরিমাণ মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হয়, তার বড় অংশ যোগায় রেমিটেন্স।

চলতি হিসাবের ভারসাম্য (Current Account Balance): বাণিজ্য ঘাটতি (Trade Deficit) কমানোর ক্ষেত্রে রেমিটেন্স একমাত্র রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।

টাকার মান রক্ষা: বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বজায় রেখে এটি মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা 'টাকা'র অতি-অবমূল্যায়ন রোধ করে।

ব্যাষ্টিক প্রভাব (Microeconomic Impact)

দারিদ্র্য বিমোচন: আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, রেমিটেন্সপ্রাপ্ত পরিবারগুলোর দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি অন্যান্য পরিবারের চেয়ে অন্তত ৬০% কম।

মানবসম্পদ উন্নয়ন: প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দিয়ে তাঁদের সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা এবং আধুনিক জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ হয়।

স্থানীয় অর্থনীতিতে 'মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট': রেমিটেন্সের টাকা কেবল পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা স্থানীয় মুদি দোকান, নির্মাণ সামগ্রী, পরিবহন ও কৃষিখাতে প্রবাহ তৈরি করে পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে।

উৎসভিত্তিক বৈশ্বিক শ্রমবাজারের বিশ্লেষণ: কোথায় কত বাংলাদেশী?

প্রবাসীদের রেমিটেন্স প্রবাহকে বুঝতে হলে বিশ্বজুড়ে তাঁদের কাজের ধরণ ও অবস্থান জানা আবশ্যক। প্রধান শ্রমবাজারগুলোকে নিচে বিস্তৃতভাবে ভাগ করা হলো:

মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল (GCC Countries)

সৌদি আরব: একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী (প্রায় ৩০-৩৫ লাখ) অবস্থান করেন এখানে। অধিকাংশ কর্মী নির্মাণ, ক্লিনিং, ড্রাইভিং ও খুচরা বিক্রয় খাতে কাজ করেন। এটি রেমিটেন্সের সর্ববৃহৎ উৎস।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE): দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহতে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা শ্রমিকের পাশাপাশি প্রচুর ছোট ও মাঝারি ব্যবস্থার (SME) সাথে যুক্ত।

কুয়েত ও কাতার: কুয়েতে ফ্রি ভিসা ও সরকারি প্রজেক্টে দক্ষ টেকনিশিয়ানরা কর্মরত। কাতারে বিশ্বকাপ ফুটবল পরবর্তী সময়ে নির্মাণ খাত কিছুটা কমলেও সেবা খাতে বাংলাদেশী কর্মীরা টিকিয়ে রেখেছেন অবস্থান।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

মালয়েশিয়া: প্ল্যান্টেশন (পাম অয়েল), ম্যানুফ্যাকচারিং ও কনস্ট্রাকশন খাতে লক্ষাধিক বাংলাদেশী কাজ করছেন।

সিঙ্গাপুর: শিপইয়ার্ড ও মেগা কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টে দক্ষ এবং সনদপ্রাপ্ত বাংলাদেশী টেকনিশিয়ানরা সুনামের সাথে কর্মরত।

পশ্চিম ও ইউরোপীয় অঞ্চল

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য: মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে এখানকার পরিসংখ্যান ভিন্ন। এখান থেকে উচ্চশিক্ষিত ও স্থায়ী বাসিন্দা পেশাজীবীরা (আইটি, ডক্টর, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী) বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স পাঠান। প্রথাগত শ্রমিকের চেয়ে এখানকার মাথাপিছু রেমিটেন্স পাঠানোর পরিমাণ অনেক বেশি।

ইতালি, গ্রিস ও রোমানিয়া: ইতালির কৃষিখাত, কেয়ারগিভার এবং রেস্তোরাঁ শিল্পে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী কর্মরত। সম্প্রতি রোমানিয়া ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে নির্মাণ খাতের জন্য নতুন বাজার তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকিং চ্যানেল বনাম হুন্ডি: রেমিটেন্সের অদৃশ্য লড়াই

বাংলাদেশের রেমিটেন্স অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো 'হুন্ডি' বা ইনফরমাল চ্যানেলের বিস্তার। অফিসিয়াল ব্যাংকিং চ্যানেলকে পাশ কাটিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত এই অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা জাতীয় রিজার্ভের জন্য চরম হুমকি।

কেন প্রবাসীরা হুন্ডির দিকে ঝুঁকছেন?

বিনিময় হারের পার্থাক্য (Exchange Rate Gap): সরকারি ব্যাংকগুলোর ঘোষিত ডলার রেটের চেয়ে খোলা বাজারে বা হুন্ডি চক্রে প্রতি ডলারে ৩ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত বেশি পাওয়া যায়।

সহজ সেবা ও সময় বাঁচানো: দূরদূরান্তের কফি শপ বা কর্মক্ষেত্র থেকে ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর চেয়ে মোবাইল অ্যাপে বা পরিচিত এজেন্টের মাধ্যমে মিনিটের মধ্যে বাড়ি টাকা পাঠানো সুবিধাজনক।

সার্ভিস চার্জ ও কাগুজে প্রক্রিয়া: প্রথাগত ব্যাংকিংয়ে সার্ভিস চার্জ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত শ্রমিকরা হুন্ডি ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

হুন্ডির সুদূরপ্রসারী ক্ষতি

হুন্ডির মাধ্যমে টাকা দেশে প্রবাসীর পরিবারের হাতে পৌঁছালেও, আসল বৈদেশিক মুদ্রা (ডলার/রিয়াল/দিরহাম) বাংলাদেশে প্রবেশ করে না। তা বিদেশে অবস্থানরত অর্থপাচারকারী বা চোরাচালানকারীদের হাতে আটকে যায়। ফলে দেশের জাতীয় ব্যাংকিং রিজার্ভ খালি থেকে যায় এবং বাজারে কৃত্রিম ডলার সংকট তৈরি হয়।

অভিবাসন খাতের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জসমূহ

বাংলাদেশের প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির ত্রাণকর্তা হলেও, প্রবাসে যাত্রা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত তাঁরা অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন:

বিশ্বের সর্বোচ্চ অভিবাসন খরচ (High Migration Cost)

ভারতে বা ফিলিপাইনে যেখানে একজন কর্মী নামমাত্র খরচে বিদেশে যান, সেখানে একজন বাংলাদেশী শ্রমিককে প্রবাসে যেতে মধ্যস্থতাকারী (দালাল) ও রিক্রুটিং এজেন্সিকে ৩ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। এই অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অধিকাংশ শ্রমিক জমি বিক্রি করেন বা চড়া সুদে এনজিও/মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নেন। ফলে বিদেশে গিয়ে প্রথম ২-৩ বছর কেবল সেই ঋণ পরিশোধ করতেই কেটে যায়।

দালাল চক্র ও 'ফ্রি ভিসা'র প্রতারণা

'ফ্রি ভিসা' বলতে প্রকৃতপক্ষে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই। দালালরা আকামা বা কাজের নিশ্চয়তা না দিয়েই কর্মীদের বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। ফলে হাজার হাজার প্রবাসী বিদেশে গিয়ে আইনি নথি না থাকায় অনাহারে কিংবা আত্মগোপনকারী হিসেবে জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।

অদক্ষতার অভিশাপ (Skill Deficit)

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের বড় অংশই 'অদক্ষ' (Unskilled)।উদাহরণস্বরূপ: ফিলিপাইনের একজন কর্মী ইংরেজি ভাষাজ্ঞান ও কেয়ারগিভিং বা টেকনিক্যাল ট্রেনিং নিয়ে বিদেশে গিয়ে যে বেতন পান, একজন অদক্ষ বাংলাদেশী কর্মী তাঁর তিনভাগের একভাগ বেতন পান।

কারিগরি শিক্ষার অভাবের কারণে আমাদের শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হলেও সামগ্রিক রেমিটেন্সের পরিমাণ প্রার্থীর সংখ্যার অনুপাতে কম।

বিমানবন্দরে হয়রানি ও অবহেলা

নিজ দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসীরা চরম অবহেলার শিকার হন। ব্যাগেজ ট্র্যাকিং বিলম্ব, কাস্টমস কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহার এবং সাধারণ মৌলিক সুবিধার অভাব তাঁদের মানসিক কষ্টের প্রধান কারণ।

শ্রম অভিবাসন ও রেমিটেন্সের ভবিষ্যৎ রূপরেখা: ১০-দফা কৌশলগত সুপারিশ

বাংলাদেশের রেমিটেন্স প্রবাহকে টেকসই করতে এবং প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় নিচে ১০টি বাস্তবসম্মত সুপারিশ তুলে ধরা হলো:

১. হুন্ডি রোধে ডাইনামিক এক্সচেঞ্জ রেট: ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের জন্য বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক ডলার রেট নিশ্চিত করতে হবে, যাতে হুন্ডি চক্র সুবিধা না পায়।

২. টিটিসি (TTC) ব্যবস্থার সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেট: দেশের জেলাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে আধুনিক সরঞ্জাম যুক্ত করতে হবে এবং প্রদত্ত সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি (যেমন: NVQ বা City & Guilds) নিশ্চিত করতে হবে।

৩. অভিবাসন খরচ শূন্যে নামিয়ে আনা: সরকারি সংস্থাগুলোর (যেমন: BOESL) মাধ্যমে সরাসরি কম খরচে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া জোরদার করা এবং সিন্ডিকেটভিত্তিক রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

৪. ডিজিটাল রিক্রুটিং ও অনলাইন ট্র্যাকিং: বিএমইটি নিবন্ধনের পর দালালদের হস্তক্ষেপ বন্ধে অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থী ও বিদেশী নিয়োগকর্তার সংযোগ ঘটানো।

৫. প্রবাসীদের জন্য ইউনিভার্সাল পেনশন স্কিম: প্রবাসীদের বার্ধক্য ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ঘোষিত 'প্রবাস পেনশন স্কিম'-কে আরও বেশি আকর্ষনীয় ও সহজতর করা।

৬. দূতাবাসগুলোর লেবার উইং শক্তিশালীকরণ: বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে লেবার উইংয়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা বাড়ানো, যাতে বিপদে পড়া প্রবাসীরা দ্রুত আইনি ও মানবিক সহায়তা পান।

৭. 'কেয়ারগিভার' ও উচ্চ প্রযুক্তির বাজার দখল: ইউরোপ, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর পরিচর্যার জন্য 'কেয়ারগিভার' এবং আইটি টেকনিশিয়ানদের জন্য বিশেষায়িত ভাষার কোর্স চালু করা।

৮. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ডিজিটাল আধুনিকায়ন: প্রবাসীদের জামানতহীন ও স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা, যাতে তাদের ভিটেমাটি বিক্রি করতে না হয়।

৯. বিশেষ রেমিটেন্স বন্ড ও বিনিয়োগ ক্ষেত্র: প্রবাসীরা যাতে দেশে ফেরত এসে ক্যাপিটাল ফ্রড বা প্রতারণার শিকার না হন, সে জন্য তাঁদের জন্য আকর্ষনীয় 'প্রবাসী সেভিংস বন্ড' ও বিশেষ শিল্প জোন নির্ধারণ করা।

১০. বিমানবন্দরে গ্রিন চ্যানেল ও সম্মাননা: দেশের প্রতিটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র হেল্পডেস্ক, ই-গেট এবং দ্রুততম সময়ে ব্যাগেজ খালাসের প্রোটোকল নিশ্চিত করা।

প্রবাসীদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয় সরকারি নীতিমালা

যদিও এই ১০টি জেলাসহ পুরো দেশ রেমিটেন্সের ওপর ভর করে টিকে আছে, কিন্তু প্রবাসীদের জীবনযাত্রা ও বিদেশ যাত্রার প্রক্রিয়া এখনো নানা বাধা-বিপত্তিতে পূর্ণ। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই বাধাগুলো দূর করতে অবিলম্বে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

অবৈধ চ্যানেল 'হুন্ডি' বন্ধ ও বৈধ ব্যাংকিং প্রণোদনা বৃদ্ধি

ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের মূল্যের সাথে খোলা বাজারের পার্থক্যের কারণে একটি বড় অংশ অবৈধ 'হুন্ডি' প্রক্রিয়ায় টাকা পাঠায়। হুন্ডি বন্ধ করতে হলে ব্যাংকিং প্রণোদনা (Incentive) বাড়িয়ে অন্তত ৪-৫% এ উন্নীত করা। প্রবাসীদের জন্য ডিজিটাল ওয়ালেট ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ও বিনা খরচে টাকা পাঠানোর সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

অদক্ষ শ্রমিক থেকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর

বাংলাদেশ থেকে এখনো সিংহভাগ শ্রমিক 'অদক্ষ' (Unskilled) হিসেবে বিদেশে যান, ফলে তাঁদের মাসিক বেতন অত্যন্ত কম হয়। অন্যদিকে ভারত, ফিলিপাইন বা শ্রীলঙ্কার শ্রমিকেরা একই দেশে গিয়ে দক্ষ বা কারিগরি পদে কাজ করে বহুগুণ বেশি অর্থ আয় করেন।

প্রতিটি জেলায় থাকা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (TTC) গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন প্রদানের উপযোগী করা। আইটি, অটোমোবাইল, কেয়ারগিভার, কুকিং, প্লাম্বিং ও ইলেক্ট্রিক্যাল টেকনিশিয়ান হিসেবে যুবসমাজকে গড়ে তোলা।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হয়রানি ও সেবা সংকট দূরীকরণ

যে প্রবাসীরা দেশের রিজার্ভ ধরে রেখেছেন, তাঁরা যখন নিজ দেশে পা রাখেন (বিশেষ করে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে), তখন কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনে নানা হয়রানির শিকার হন।

বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসীদের জন্য 'ভিআইপি সেবা' ও আলাদা দ্রুতগামী বুথ চালু করা। লাগেজ ডেলিভারিতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব বন্ধ করা।

প্রবাসীদের জন্য টেকসই বিনিয়োগ সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তা

বিদেশে বছরের পর বছর কাজ করার পর দেশে ফিরে বহু প্রবাসী নিঃস্ব হয়ে পড়েন।প্রবাসীদের অর্জিত অর্থ দেশে লাভজনক খাতে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ 'রেমিটেন্স বন্ড' বা প্রবাসী সঞ্চয়পত্র চালু রাখা। রাষ্ট্রীয় পেনসন স্কিমে প্রবাসীদের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি তৈরি করে তাঁদের বার্ধক্যের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

সূর্যসন্তানদের ঘামে নির্মিত সোনার বাংলা

দিনশেষে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি একটি সুবিশাল অট্টালিকা হয়, তবে তার শক্ত ভিত্তিপ্রস্তর হলো আমাদের লাখো-কোটি প্রবাসীদের রক্তজল করা ঘাম। দুর্নীতির বিষবাষ্প, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম এবং নানা অর্থনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের মাঝেও যে কোটি কোটি সাধারণ পরিবার প্রতিদিন সকালে নতুন আশায় বুক বাঁধে, স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করে এবং দেশের বাজার সচল রাখে, তার নেপথ্যে রয়েছেন কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সারা দেশের ৬৪টি জেলার এই বীর সূর্যসন্তানেরা।

তাঁরা কেবল অর্থ পাঠান না, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্বস্ততার সাথে বহন করেন। প্রবাসী ভাইবোনদের এই ত্যাগের মর্যাদা দেওয়া এবং তাঁদের উপার্জিত অর্থ সঠিক ও নিরাপদ পথে দেশের কল্যাণে ব্যবহার করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

রেমিটেন্সের এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং প্রবাসীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলে বাংলাদেশ বিশ্বের যেকোনো অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছাবে এ কথা নিদ্বির্ধায় বলা যায়।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক (bb.org.bd), জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET), IOM ডিটিএম রেমিটেন্স স্ন্যাপশট ২০২৪-২৫, ট্রেডিং ইকোনমিক্স, বিএসএস নিউজ। জেলাভিত্তিক রেমিটেন্স বাংলাদেশ ব্যাংকের জেলাভিত্তিক অনুপাত ও ২০২৫-এর জাতীয় মোটের ভিত্তিতে আনুমানিক। সর্বশেষ আপডেট: এপ্রিল ২০২৬।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.