ঈদে মিলাদুন্নবী - শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিশ্লেষণ

ঈদে মিলাদুন্নবী - শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিশ্লেষণ

"বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর রহমতে সুতরাং এতে যেন তারা আনন্দিত হয়। এটি তারা যা জমা করে তা অপেক্ষা উত্তম।" (সূরা ইউনুস, ১০:৫৮)

বিশ্বমানবতার পরম কান্ডারী, সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাঁর শুভ আগমন অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত বিশ্বকে হেদায়েত ও আলোর দিশা দিয়েছিল। তাই বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর কাছে মহানবী (সা.)-এর ব্যক্তিত্ব, তাঁর জীবন ও আদর্শ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও আবেগপূর্ণ বিষয়।

প্রতি বছর হিজরি রবিউল আউয়াল মাস এলেই মুসলিম বিশ্বে একটি আলোচনা ব্যাপকভাবে স্থান পায়, তা হলো 'ঈদে মিলাদুন্নবী' বা 'মিলাদুন্নবী' উদযাপন। মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ অত্যন্ত শ্রদ্ধা, উৎসব ও আবেগের সাথে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে এই দিনটি পালন করে থাকেন। অন্যদিকে, আলিম ও ফকীহদের একটি বিরাট অংশ কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনের (সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন) আমলের আলোকে এটিকে দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন বা 'বিদআত' হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন।

এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে প্রায়শই বিভ্রান্তি ও বিভেদের সৃষ্টি হয়। এই নিবন্ধটির মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো আবেগপ্রবণতা বা পক্ষপাতিত্ব ছাড়া, বিশুদ্ধ দলিল-প্রমাণ, ফিকহী নীতিমালা, ঐতিহাসিক তথ্য এবং প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহদের মতামতের ভিত্তিতে ঈদে মিলাদুন্নবীর বাস্তব রূপ, শরয়ী অবস্থান এবং এর ঐতিহাসিক রূপরেখা বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা।

'ঈদে মিলাদুন্নবী': শাব্দিক ও পারিভাষিক বিশ্লেষণ

বিষয়টির শরয়ী হুকুম পর্যালোচনার পূর্বে এর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ স্পষ্ট হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

ঈদ (عيد): আরবি 'ঈদ' শব্দের মূলধাতু 'উদ' (عود), যার অর্থ বারবার ফিরে আসা বা পুনরাবৃত্ত হওয়া। শরীয়তের পরিভাষায় যে দিনটি আনন্দ ও উৎসবের সাথে প্রতি বছর পুনরায় আবর্তিত হয়, তাকে 'ঈদ' বলা হয়।

মিলাদ (ميلاد): 'মিলাদ' (বা মাওলিদ) শব্দটির অর্থ জন্মসময়, জন্মকাল, জন্মমুহূর্ত বা জন্মবৃত্তান্ত। সাহিত্যিক পরিভাষায় মহানবীর জন্ম উপলক্ষে রচিত কবিতা, গদ্য বা আবৃত্তি পাঠকেও 'মাওলিদ' বলা হয়ে থাকে।

আন-নবী (النبي): এখানে উদ্দেশ্য হলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল হযরত মুহাম্মাদ (সা.)।

সমন্বিত অর্থ: শাব্দিক বিচারে 'ঈদে মিলাদুন্নবী' বলতে বোঝায় "মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর শুভ জন্ম উপলক্ষে বার্ষিক উৎসব বা আনন্দের দিন"।

পারিভাষিক রূপ ও বর্তমান উদযাপন প্রক্রিয়া

সাধারণত হিজরি তৃতীয় মাস রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ উপলক্ষে যে সকল সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়, সেগুলোর মধ্যে প্রধানত স্থান পায়:

জশনে জুলুস ও আলোকসজ্জা: কাবার আদলে বা মসজিদের গম্বুজ-মিনারের নকশায় তৈরি প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল বা শোভাযাত্রা (যাকে 'জশনে জুলুস' বলা হয়) এবং ভবন, সড়ক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে বর্ণিল আলোকসজ্জা।

দরূদ, সালাম ও কিয়াম: সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতায় নবিজি (সা.)-এর ওপর দরূদ ও সালাম পেশ করা এবং মাহফিলে ভক্তিভরে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোর প্রথা (কিয়াম করা)।

সীরাত আলোচনা ও মাহফিল: মহানবী (সা.)-এর জন্মবৃত্তান্ত, অলৌকিক ঘটনাবলী, আদর্শ ও সীরাত নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা সভা বা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন।

তাবাররুক ও খাবার বিতরণ: অনুষ্ঠান শেষে মিষ্টি, জিলাপি বা উন্নত মানের খাবার বিতরণ ও তাবাররুক বন্টন।

সুন্নাহভিত্তিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: অন্যদিকে সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি সোমবারে সিয়াম (রোজা) পালনের মাধ্যমে নিজের জন্মদিনের জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতেন। সোমবারে রোজা রাখার কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, "এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর আসমানি কিতাব (ওহী) অবতীর্ণ হয়েছে"।

ঐতিহাসিক উৎপত্তি ও উৎসবের ক্রমবিকাশ

ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় কিংবা সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের যুগে এই নামে কোনো নির্দিষ্ট বার্ষিক রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক উৎসব পালনের প্রচলন ছিল না। পরবর্তীতে ইতিহাসজুড়ে এর পর্যায়ক্রমিক বিকাশ ঘটে:

ফাতেমীয় শিয়া শাসনামল: হিজরি চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি সময়ে (৩৬৫ হিজরি / ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দ) মিসরের ফাতেমীয় শিয়া খলিফা আল-মুইজ লিদ্বীনিল্লাহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিলাদুন্নবীসহ পাঁচটি বিশেষ জন্মদিবস (রাসুলুল্লাহ সা., হযরত আলী রা., ফাতেমা রা., হাসান রা. ও হুসাইন রা.-এর জন্মদিবস) উদযাপন শুরু করেন। এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণ পাওয়া যাবে উইকিপিডিয়া-এর ঈদে মিলাদুন্নবী নিবন্ধে

সুলতান মুজাফফরউদ্দীন কুকুবুরির উদ্যোগ: হিজরি ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকের মাঝামাঝি সময়ে (প্রায় ৬০৪ হিজরি) বর্তমান ইরাকের এরবিল (Erbil) অঞ্চলের শাসক সুলতান আবু সাঈদ মুজাফফরউদ্দীন কুকুবুরি বৃহৎ পরিসরে ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে সুন্নি জনপদে এই উৎসব উদযাপনের আনুষ্ঠানিক প্রসার ঘটান।

প্রথম মিলাদ গ্রন্থ সংকলন: এই সময়ে আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে হাসান ইবনে দেহিয়া আল-কালবী 'কিতাবুত তানবীর ফি মাওলিদিস সিরাজিল মুনীর' নামে মিলাদুন্নবীর ওপর ইতিহাসভিত্তিক প্রথম স্বতন্ত্র গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঐতিহাসিক জন্মতারিখ সংক্রান্ত ফিকহী ও ঐতিহাসিক মতভেদ

অনেকের সাধারণ ধারণা রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখই সর্বসম্মতিক্রমে মহানবী (সা.)-এর জন্মতারিখ। কিন্তু মুহাদ্দিসীন, সীরাত বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদদের গবেষণায় এতে একাধিক বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে:

ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামের মত: প্রাচীন সীরাতকার ইবনে ইসহাক ও ইবনে হিশামের বর্ণনানুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) 'আমুল ফিল' বা হস্তীবর্ষের ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। সাধারণ অনুসারীদের মাঝে এই তারিখটি সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ লাভ করেছে।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক গবেষণা: প্রখ্যাত সীরাত বিশেষজ্ঞ আল্লামা শায়খ সাফিয়্যুর রহমান মুবারকপুরী (বিশ্বখ্যাত 'আর-রাহীকুল মাখতুম' গ্রন্থ প্রণেতা) এবং মিশরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ মাহমুদ পাশা ফালকীর গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী, মহানবী (সা.)-এর প্রকৃত জন্মতারিখ ছিল ৯ই রবিউল আউয়াল (পঞ্জিকানুসারে ২০শে এপ্রিল, ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ) সোমবার ভোরে।

অন্যান্য সাহাবা ও তাবেয়ীনদের সূত্রের মতভেদ:

৮ই রবিউল আউয়াল: ইমাম মালিক, ইবনে হাযম ও আকিল ইবনে খালেদের অভিমত। সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ও জুবেইর ইবনে মুতইম (রা.) থেকেও এই তারিখটি বর্ণিত এবং বহু মুহাদ্দিসের মতে এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ সনদসম্পন্ন।

১০ই রবিউল আউয়াল: ইমাম বাকির ও তাবেয়ি আল-শা'বীর মতামত।

১৭ই রবিউল আউয়াল: শিয়া ইমামিয়া সম্প্রদায়ের গৃহীত মত।

অন্যান্য তারিখ: ২রা রবিউল আউয়াল (আবু মাশার আল-সিনদির মত) এবং রমজান মাসের মতামতও কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে উদ্ধৃত রয়েছে।

ওফাত ও ঐতিহাসিক দ্বিমুখী প্রশ্ন: অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত বা ইন্তেকাল হয়েছিল হিজরি ১১ সনের ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার। ফলে একই তারিখে প্রিয় নবীর বিয়োগের শোক এবং আনন্দ উৎসব পালন করা নিয়ে শরয়ী ও যুক্তিভিত্তিক দ্বিমুখী প্রশ্ন থেকে যায়।

শরয়ী হুকুম ও প্রখ্যাত আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি

ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদ ও ফকীহগণের মধ্যে দুটি প্রধান ধারার দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়:

উৎসব উদযাপনের সমর্থক আলেমদের মত: ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী (তাঁর 'হুসনুল মাকসিদ ফি আমালিল মাওলিদ' গ্রন্থে) এবং হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী প্রমুখ আলেম মনে করেন, যদি এই আয়োজনে শরীয়ত-বিরোধী কোনো কাজ (যেমন বাদ্যযন্ত্র, অপচয় বা গান-বাজনা) না থাকে, তবে নবিজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ ও সীরাত চর্চার উদ্দেশ্যে এটি পালন করা 'বিদআতে হাসানাহ' বা উত্তম প্রশংসনীয় কাজ।

আপত্তিকারী ও নিষেধকারী আলেমদের মত: ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইমাম শাতিবী এবং সমসাময়িক অধিকাংশ সালাফি ও দেওবন্দি আলেমদের মতে, যেহেতু রাসুল (সা.), খোলাফায়ে রাশেদীন কিংবা শ্রেষ্ঠ তিন যুগের (খাইরুল কুরুন) কোনো বুজুর্গ এটি উদযাপন করেননি, তাই দ্বীনের মধ্যে নতুন অনুষ্ঠান যুক্ত করা 'বিদআত' (ধর্মীয় নবউদ্ভাবন)-এর অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের মতে, নবিজি (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশ পায় তাঁর সুন্নাহর সঠিক অনুসরন, সোমবারে রোজা পালন এবং দৈনন্দিন জীবনে তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

ঈদে মিলাদুন্নবীর ঐতিহাসিক উৎপত্তি ও বিকাশ

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের স্বর্ণযুগ অর্থাৎ খাইরুল কুরুনে (সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনদের জামানায়) 'মিলাদুন্নবী' নামে কোনো সুনির্দিষ্ট দিন বা উৎসব পালনের অস্তিত্ব ছিল না।

খাইরুল কুরুন বা ইসলামের প্রাথমিক তিন যুগ (হিজরি ১ম-৩য় শতক)

ইসলামের স্বর্ণযুগ অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনদশা এবং তাঁর ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনদের সময়কালে যাকে হাদিসের পরিভাষায় 'খাইরুল কুরুন' (সর্বোত্তম যুগ) বলা হয় 'মিলাদুন্নবী' বা 'ঈদে মিলাদুন্নবী' নামে কোনো সুনির্দিষ্ট বাৎসরিক দিন বা উৎসব উদযাপনের অস্তিত্ব ছিল না। সাহাবাগণ মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করলেও বাৎসরিক জন্মোৎসব পালন করার কোনো রীতিনীতি তাঁদের মধ্যে প্রচলিত ছিল না। এমনকি ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতো চার মাযহাবের প্রখ্যাত ইমামগণের যুগেও শরীয়তের অংশ বা ধর্মীয় আচার হিসেবে মিলাদ উদযাপনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

ফাতেমীয় খিলাফতের আমলে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সূচনা (হিজরি ৪র্থ-৫ম শতক)

ইতিহাসবিদদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হিজরি চতুর্থ শতকের শেষভাগে এবং পঞ্চম শতকের শুরুতে (খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতক) উত্তর আফ্রিকা ও মিসরে শাসনক্ষমতায় আসীন ফাতেমীয় শিয়া (ইসমাঈলী) রাজবংশ সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে মিলাদ উৎসবের প্রবর্তন করে।

মিশরীয় প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইমাম তাকীউদ্দীন আল-মাকরীজী (রহ.) তাঁর আকরগ্রন্থ 'আল-মাওয়ায়িজ ওয়াল ইতিবার বি জিকরিল খিতাত ওয়াল আছার' (সংক্ষেপে 'আল-খিতাত')-এ উল্লেখ করেছেন যে, ফাতেমীয় খলীফারা বছরে প্রধানত ছয়টি 'মিলাদ' উদযাপিত করতেন:

মহানবী (সা.)-এর মিলাদ
হযরত আলী (রা.)-এর মিলাদ
হযরত ফাতিমা (রা.)-এর মিলাদ
হযরত হাসান (রা.)-এর মিলাদ
হযরত হুসাইন (রা.)-এর মিলাদ
তৎকালীন ফাতেমীয় খলীফার নিজস্ব মিলাদ

এই উৎসবগুলো সাধারণ জনগণের চেয়ে রাষ্ট্রীয় রাজপ্রাসাদ কেন্দ্রিক এলিটদের আনুষ্ঠানিকতা ছিল, যেখানে মিষ্টি বিতরণ, সরকারি অনুদান প্রদান এবং কাসিদা আবৃত্তির ব্যবস্থা করা হতো। পরবর্তীতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী কর্তৃক ফাতেমীয় খিলাফতের পতনের পর (হিজরি ৫৬৭ / ১১৭১ খ্রিস্টাব্দ) এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনগুলো স্থবির হয়ে পড়ে।

সুন্নি সমাজে প্রকাশ ও এরবিলের অবদান (হিজরি ৭ম শতক)

সপ্তম হিজরি শতকের শুরুতে (প্রায় ৬০৪ হিজরি / ১২০৭ খ্রিস্টাব্দ) ইরাকের 'এরবিল' (Erbil) অঞ্চলের সুন্নি শাসক সুলতান আবু সাঈদ মুজাফফরউদ্দীন গোকবোরী (মৃত্যু: ৬৩০ হিজরি) বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিশাল সামাজিক ও উদ্দীপনাময় আয়োজনে সুন্নি সমাজে মিলাদুন্নবী উদযাপনের সূচনা করেন।

ইতিহাসবিদ ইমাম ইবনে কাছীর (রহ.) তাঁর 'আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া' গ্রন্থে এবং হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী ও ইবনে খাল্লিকান উল্লেখ করেছেন যে, সুলতান মুজাফফর প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসে জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিশাল অর্থ ব্যয় করে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করতেন। সুফি, আলেম, কবি ও দূর-দূরান্তের হাজার হাজার মানুষকে তিনি আমন্ত্রণ জানাতেন, বিশাল তাবু খাটিয়ে গবাদিপশু জবাই করে সাধারণ মানুষের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতেন।

আন্দালুসিয়ার প্রখ্যাত আলেম আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে দাহিয়া আল-আন্দালুসী (মৃত্যু: ৬৩৩ হিজরি) এরবিলে আগমন করে সুলতানের এই আয়োজন দেখে তাঁর সমর্থনে 'আল-তানবীর ফি মাওলিদ আল-বাশীর আল-নাযীর' নামে মিলাদের ওপর একটি বই রচনা করেন। বিনিময়ে সুলতান তাঁকে এক হাজার দিনার উপহার প্রদান করেন।

উসমানীয় সাম্রাজ্য ও বৈশ্বিক রাজকীয় রূপ লাভ (১৬শ শতক)

ষোড়শ শতাব্দীতে উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যের সুলতান মুরাদ ৩য় (Murad III) ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে (৯৯৬ হিজরি) 'মাওলিদ আন-নবী'কে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সরকারি ও রাষ্ট্রীয় উৎসব হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদ মসজিদসহ প্রধান প্রধান মসজিদে আলোকসজ্জা, কুরআন তিলাওয়াত ও মিলাদ পাঠের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হতে থাকে। এর ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ জুড়ে মিলাদ উদযাপনের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রশাসনিক স্বীকৃতি বৃদ্ধি পায়।

ভারতীয় উপমহাদেশে বিস্তার ও ফিকহী বিতর্ক (১৯শ-২০শ শতক)

উপমহাদেশে সুফিসাধকদের প্রভাবে মিলাদ প্রথা জনপ্রিয়তা লাভ করলেও উনিশ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ধর্মীয় পুনর্জাগরণের যুগে এটি ব্যাপক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ১৯শ ও ২০শ শতাব্দীতে দেওবন্দী ও বারেলভী ঘরানার ধর্মীয় চিন্তাচর্চার বিকাশের সাথে সাথে এই বিষয়টি একটি অন্যতম প্রধান ফিকহী বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

বারেলভী অবস্থান: ইমাম আহমদ রেজা খান বারেলভী (রহ.) ও তাঁর অনুসারীগণ মিলাদ ও কিয়ামকে (সম্মানার্থে দাঁড়ানো) মুস্তাহাব, সাওয়াবের কাজ এবং মহানবীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং একে 'জশনে জুলুস' বা আনন্দ মিছিলের মাধ্যমে উদযাপন করাকে প্রাতঃস্মরণীয় আমল হিসেবে গুরুত্ব দেন।

দেওবন্দী অবস্থান: অপরদিকে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা ও আলেমগণ (যেমন রশিদ আহমদ গাঙ্গোহী, আশরাফ আলী থানভী) রাসুল (সা.)-এর সীরাত আলোচনা ও স্মরককে যেকোনো সময় বৈধ মনে করলেও নির্দিষ্ট দিন-তারিখ নির্ধারণ, কিয়াম করা ও ঈদ হিসেবে উৎসবের রূপ দেওয়াকে 'বিদআত' বা ধর্মে নতুন সংযোজন বলে চিহ্নিত করেন।

বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক সুফি সাধক আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাইয়্যব শাহ (রহ.)-এর মাধ্যমে 'জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী' নামে বিশাল শোভাযাত্রা ও মহাসমাবেশের বহুল প্রচলন ঘটে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার ১২ই রবিউল আউয়ালকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করে এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে সীরাত ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন শুরু হয়।

ঈদে মিলাদুন্নবীর শরয়ী ভিত্তি: পক্ষে ও বিপক্ষে আয়াত এবং হাদীসের বিশ্লেষণ

ইসলামী শরীয়তের যে কোনো বিষয়ের বৈধতা বা অবৈধতা নির্ধারিত হয় প্রধান চার উৎস (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস)-এর ভিত্তিতে। ঈদে মিলাদুন্নবীর পক্ষের ও বিপক্ষের আলিমগণ যেসব দলিল উপস্থাপন করেন, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

পক্ষে উপস্থাপনকৃত দলিলসমূহ এবং তার ব্যাখ্যা

১. কুরআনের আয়াত ও রহমত স্মরণ

সূরা ইউনুস (আয়াত: ৫৮): "বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর রহমতে সুতরাং এতে যেন তারা আনন্দিত হয়। এটি তারা যা সঞ্চয় করে তা অপেক্ষা উত্তম।"

তাফসীর ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা: ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র.) তাঁর 'আল-হাভী লিল-ফাতাওয়া' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সমগ্র মানবজাতির জন্য মহানবী (সা.)-কে প্রেরণের চেয়ে বড় রহমত ও নেয়ামত আর কিছু হতে পারে না, যেমনটি সূরা আল-আনবিয়া-র ১০৭ নম্বর আয়াতে ঘোষিত হয়েছে: "আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।" হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর তাফসীর উদ্ধৃত করে পক্ষের আলেমগণ যুক্তি দেন যে, মহানবীর শুভাগমন সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত হওয়ায় তাঁর জন্ম উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করা কুরআনের এই সাধারণ নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।

সূরা আল-ইমরান (আয়াত: ১৬৪) ও সূরা ইব্রাহিম (আয়াত: ৫): আল্লাহ তাআলা বলেন, "অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মধ্য থেকেই একজন রসূল পাঠিয়েছেন।" এছাড়া সূরা ইব্রাহিমে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন: "তাদেরকে আল্লাহর দিনসমূহ (আইয়ামুল্লাহ) স্মরণ করাও।" পক্ষের আলিমদের মতে, যে দিনে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল জগতে আগমন করে অন্ধকার দূর করেছেন, সেই দিনটি নিঃসন্দেহে 'আইয়ামুল্লাহ' বা আল্লাহর বিশেষ স্মরণীয় দিনসমূহের অন্যতম।

পূর্ববর্তী নবীদের জন্মকাহিনীর কুরআনীয় বর্ণনা: সূরা মারইয়ামে হযরত ইয়াহিয়া (আ.)-এর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে: "তার প্রতি শান্তি যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছে..." (আয়াত ১৫)। একইভাবে হযরত ঈসা (আ.) নিজের জন্মদিনের শান্তির কথা উল্লেখ করেছেন: "আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি..." (আয়াত ৩৩)। পক্ষের আলিমগণ দাবি করেন, কুরআন যেখানে পূর্ববর্তী নবীদের জন্মদিবসকে বিশেষ মর্যাদা ও শান্তির দিন হিসেবে উল্লেখ করেছে, সেখানে শেষ নবীর জন্মদিবস স্মরণে মাহফিল বা আলোচনা আয়োজন করা শরীয়তসঙ্গত।

২. সহীহ হাদীস ও ঐতিহাসিক বর্ণনা

সোমবারে সিয়াম পালন (সহীহ মুসলিম: ১১৬২): রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবারে রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এর কারণ হিসেবে বলেন: "এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনে আমার ওপর ওহী অবতীর্ণ হয়েছে।"

বিস্তৃত ব্যাখ্যা: এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় জন্মদিবসকে ইবাদতের (সিয়াম) মাধ্যমে স্মরণ করেছেন এবং তাকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সুতরাং, তাঁর জন্মদিবসকে কেন্দ্র করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় ও শুভকাজ করা সুন্নাহভিত্তিক চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আবু লাহাব সংক্রান্ত বুখারীর বর্ণনার প্রয়োগ: সহীহ বুখারীর কিতাবুন নিকাহ-এ বর্ণিত রয়েছে, আবু লাহাবের মৃত্যুর পর তাকে স্বপ্নে দেখা গেলে সে জানায় যে, সোমবার দিনে তার শাস্তি হালকা করা হয় এবং আঙুল থেকে পানীয় নিঃসরিত হয়, কারণ সে দাসী থুয়াইবাহকে রাসূল (সা.)-এর জন্মের শুভসংবাদ দেওয়ার কারণে আজাদ করেছিল। হাফেজ ইবনে কাছীর (র.) ও অন্যান্য মুহাদ্দিসীনগণ উল্লেখ করেছেন, একজন কাফের হয়েও যদি নবীজীর জন্মের সংবাদে আনন্দ প্রকাশের কারণে আংশিক প্রতিদান লাভ করতে পারে, তবে একজন তাওহীদবাদী মুমিন রাসূল (সা.)-এর ভালোবাসায় আনন্দ প্রকাশ করলে অবশ্যই বিপুল সাওয়াব অর্জন করবে।

৩. ফিকহী দৃষ্টিকোণ: 'বিদআতে হাসানাহ' বা উত্তম কাজের নীতি

ইমাম শাফেয়ী (র.) সহ বহু ফিকহবিদ বিদআতকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: বিদআতে দলালাহ (ভ্রষ্টতামূলক নতুন কাজ) এবং বিদআতে হাসানাহ (উত্তম প্রথা)। উসূলে ফিকহের মূলনীতি অনুসারে, যে নতুন কাজ বা প্রথা কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নীতি (যেমন: দরূদ পাঠ, সীরাত আলোচনা, দান-ছদকা, খাদ্য দান)-এর সাথে সংগতিপূর্ণ এবং কোনো সুন্নাহকে বাতিল করে না, তা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য ও সাওয়াবের মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয়।

বিপক্ষে উপস্থাপনকৃত দলিলসমূহ এবং তার ব্যাখ্যা

১. দ্বীনে নতুন সংযোজন বা বিদআত সম্পর্কিত কড়া নিষেধাজ্ঞা

সহীহ বুখারী (২৬৯৭) ও সহীহ মুসলিম (১৭১৮): উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন: "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে নতুন কিছু সংযোজন করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।"

সহীহ মুসলিম (৮৬৭) ও সুনানে নাসাঈ: জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) তাঁর খুতবায় পুনরাবৃত্তি করে বলতেন: "সর্বোত্তম বাণী হলো আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম হেদায়েত হলো মুহাম্মাদ (সা.)-এর হেদায়েত। আর নিকৃষ্টতম বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন প্রথা তৈরি করা; এবং প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা (কুল্লাহু বিদআতিন দলালাহ)।"

বিপক্ষের ফিকহী বিশ্লেষণ: সালাফী ও আহলে হাদীস ফিকহবিদদের মতে, ইবাদতের ক্ষেত্রে মূল নীতি হলো "আল-আছলু ফিল ইবাদাতি আল-হাজর" (আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দিষ্ট নির্দেশ ছাড়া নতুন কোনো ইবাদত তৈরি করা যাবে না)। ধর্মীয় অনুভূতির নাম দিয়ে বার্ষিক দিন নির্ধারণ করে উদযাপনী অনুষ্ঠান বানানো দ্বীনের মধ্যে নতুন প্রথা বা ইবাদত প্রবর্তনের সামিল, যা হাদীসের পরিভাষায় বিদআত।

২. সাহাবায়ে কেরাম ও খায়রুল কুরুনের আমলের অনুপস্থিতি

সাহাবীদের ভালোবাসা ও অনুকরণ: সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। অথচ খোলাফায়ে রাশেদীন (হযরত আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী রা.) কিংবা আশারায়ে মুবাশশারাহর কেউ কখনো ১২ই রবিউল আউয়াল উপলক্ষে মিলাদ অনুষ্ঠান বা শোভাযাত্রার আয়োজন করেননি।

শ্রেষ্ঠ যুগের নীরবতা: সহীহ বুখারীর হাদীস অনুযায়ী "সর্বোত্তম যুগ হলো আমার (নবীজীর) যুগ, অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ (তাবেয়ীন), অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ (তাবে-তাবেয়ীন)।" ইসলামের শ্রেষ্ঠ এই তিন যুগে মিলাদুন্নবীর কোনো আনুষ্ঠানিক রূপ ছিল না। হিজরী ষষ্ঠ শতকের পূর্বে (ফাতেমী বংশীয় শাসকদের আমলে ও পরবর্তীতে রাজা মুজাফফরউদ্দীন কোকবরীর যুগে) এর রূপায়নের সূচনা ঘটে। বিপক্ষের আলিমদের মতে, সাহাবী ও তাবেয়ীনদের সার্বিক নীরবতাই প্রমাণ করে যে এটি শরীয়তসিদ্ধ দ্বীনী আমল নয়; কারণ যা তাঁদের যুগে দ্বীন ছিল না, তা পরবর্তী কোনো যুগেও দ্বীন হতে পারে না।

৩. নির্দিষ্ট ঈদের সংখ্যা ও তারিখগত অস্পষ্টতা

বার্ষিক উৎসবের সীমাবদ্ধতা (সুনানে আবু দাউদ: ১১৩৪): রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর ঘোষণা করেন: "আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জাহিলী যুগের দুটি উৎসবের পরিপূরক হিসেবে দুটি উত্তম দিন দান করেছেন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।"

ফিকহী পর্যালোচনা: ফিকহবিদদের একাংশের মতে, ইসলামী শরীয়তে বাৎসরিক ইবাদতমুখী উৎসবের দিন নির্ধারিতভাবে দুটিই। তৃতীয় কোনো দিনকে শরীয়তের পরিভাষায় 'ঈদ' আখ্যানে ইবাদতের মর্যাদায় রূপ দেওয়া সুন্নাহর মৌলিক কাঠামোর বিরোধী।

সোমবারে সিয়ামের সুন্নাহ ও বার্ষিক অনুষ্ঠানের বৈপরীত্য: সহীহ মুসলিমের ১১৬২ নম্বর হাদীসে বর্ণিত সোমবারে রোজার আমলটি প্রতি সপ্তাহের নিয়মিত সুন্নাহ। বিপক্ষের আলেমদের যুক্তি, নবীজী (সা.) বছরান্তে একদিন খানা-পিনা ও উৎসবের মাধ্যমে জন্মদিবস উদযাপন না করে প্রতি সপ্তাহে সোমবার সিয়াম পালনের মাধ্যমে আল্লাহর শোকর আদায় করেছেন। সুন্নাহ অনুসরণ করতে হলে সাপ্তাহিক রোজা রাখাই প্রকৃত আমল, বার্ষিক উৎসব নয়।

ঐতিহাসিক তারিখ ও শোকের দিন: ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিসীনদের সিংহভাগের মতে, ১২ই রবিউল আউয়াল মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকাল বা ওফাত দিবস হওয়া সুনিশ্চিত, অথচ তাঁর সঠিক জন্মতারিখ (৯, ১০ নাকি ১২ রবিউল আউয়াল) নিয়ে ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে। বিপক্ষের আলেমগণের মতে, যে দিনটিতে সর্বসম্মতভাবে উম্মত তাঁর বিচ্ছেদ লাভ করেছিল, সেই দিনকে আনন্দের দিন বা ঈদ হিসেবে উদযাপন করা যৌক্তিক ও শরীয়তসিদ্ধ নয়।

ফিকহী দৃষ্টিকোণে ‘বিদআত’ ও ‘বিদআতে হাসানা’ তত্ত্বের বিশ্লেষণ

মিলাদুন্নবী (সা.) পালনের বৈধতা ও অবৈধতা সংক্রান্ত শরয়ী বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো 'বিদআত' (Bid'ah) ধারণার সংজ্ঞায়ন এবং উসূলে ফিকহের নীতিমালার আলোকে এর প্রয়োগ। ইসলামি শরিয়তে বিদআতের সীমারেখা নির্ধারণ নিয়ে ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণের মধ্যে দুটি প্রধান ধারা পরিলক্ষিত হয়।

বিদআতের ভাষাগত ও শরয়ী সংজ্ঞায়ন

ভাষাগত বিচারে 'বিদআত' (البدعة) অর্থ হলো পূর্বদৃষ্টান্ত ব্যতিরেক কোনো কিছু উদ্ভাবন করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলাকে 'বাদীউস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ' (আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর উদ্ভাবক) বলা হয়েছে, যার অর্থ তিনি কোনো পূর্বনমুনা ছাড়াই এগুলো সৃষ্টি করেছেন।

তবে শরয়ী পরিভাষায় বিদআতের প্রয়োগ নিয়ে আলেমদের ব্যাখ্যা ভিন্ন:

প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি (ব্যাপক বা ভাষাগত প্রসারতা): একদল ফকীহের মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর দ্বীনের প্রয়োজনে বা দৈনন্দিন জীবনে নতুন যা কিছু উদ্ভাবিত হয়েছে, সবই ভাষাগতভাবে বিদআত। এর মধ্যে যেগুলো শরীয়তের মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা ‘বিদআতে হাসানা’ (উত্তম বিদআত) এবং যেগুলো শরীয়তের পরিপন্থী তা ‘বিদআতে সাইয়্যিআ’ (মন্দ বিদআত)।

দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি (সংীর্ণ ও সুনির্দিষ্ট শরয়ী সংজ্ঞা): অপর দলের মতে, বিদআত কেবল ইবাদতের সাথেই সম্পৃক্ত। দ্বীনের মধ্যে সওয়াবের নিয়তে নতুন কোনো ইবাদত বা পদ্ধতি প্রবর্তন করাই হলো শরয়ী বিদআত, যার কোনো প্রকারভেদ হয় না এবং এর প্রতিটিই প্রত্যাখ্যাত।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রখ্যাত হাদীস "কুল্লু বিদ'আতীন দালালাহ" (প্রতিটি বিদআতই পথভ্রষ্টতা)-এর ব্যাখ্যায় এই দুটি ধারা স্পষ্ট হয়। প্রথম ধারা এটিকে 'আম মখসুস' (ব্যাপক বাক্য যা বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত) হিসেবে গ্রহণ করে, অর্থাৎ যে বিদআত সুন্নাহর বিরোধী কেবল সেটাই দালালাহ। দ্বিতীয় ধারা এটিকে 'আম মুতলাক' (নিরঙ্কুশ ব্যাপক) ধরে নিয়ে ইবাদতের ক্ষেত্রে নতুন সকল সংযোজনকেই পথভ্রষ্টতা হিসেবে গণ্য করে।

‘বিদআতে হাসানা’র পক্ষে ফকীহগণের তাত্ত্বিক ভিত্তি

ইমাম عز الدين بن عبد السلام (ইযযুদ্দীন ইবনে আব্দুস সালাম) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ 'কওয়ায়েদ আল-আহকাম ফি মাসালিহিল আনাম' (قواعد الأحكام في مصالح الأنام)-এ বিদআতকে শরীয়তের পঞ্চবিধান বা 'আহকামে খামসাহ'-এর আলোকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেছেন:

১. বিদআতে ওয়াজিব: যে নতুন কাজ শরীয়তের কোনো ওয়াজিব বিধান রক্ষার জন্য অপরিহার্য। যেমন: কুরআনের নুফতা ও হরকত প্রদান, ইলমে নাহু (আরবি ব্যাকরণ) সংকলন এবং অনৈসলামিক মতবাদ খণ্ডনে যুক্তিবিদ্যার ব্যবহার।
২. বিদআতে হারাম: যে নতুন বিষয় সুন্নাহর স্পষ্ট বিরোধী এবং আকিদাগত বিভ্রান্তি তৈরি করে। যেমন: কাদরিয়া বা জাবরিয়া মতবাদের উদ্ভব।
৩. বিদআতে مندوب বা মুস্তাহাব (বিদআতে হাসানা): যে কাজ শরীয়তের সাধারণ নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত কিন্তু রাসুল (সা.)-এর যুগে নির্দিষ্ট আকারে ছিল না। যেমন: তারাবীহ নামাজ জামাতে ২০ রাকাত সুনির্দিষ্ট করা, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা এবং মিলাদুন্নবী পালন।
৪. বিদআতে মাকরুহ: শরীয়তে স্পষ্ট নিষেধ না থাকলেও যা সুন্নাহর বরখেলাফ।
৫. বিদআতে মুবাহ: দৈনন্দিন জীবনের নতুন নতুন বস্তুগত সুবিধা, যেমন উন্নত পোশাক বা খাবার।

ইমাম নববী (রহ.) তাঁর 'তহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত' এবং 'শারহে সহীহ মুসলিম'-এ ইবনে আব্দুস সালামের এই শ্রেণীবিন্যাসকে সমর্থন করেছেন।

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ.) তাঁর বিশেষ ফতোয়াগ্রন্থ 'হাসনুল মাকসিদ ফি আমালিল মাওলিদ' (حسن المقصد في عمل المولد)-এ লিখেছেন:

"মিলাদের মূল ভিত্তি অর্থাৎ মানুষের সমবেত হওয়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, নবীজী (সা.)-এর সীরাত আলোচনা করা এবং খাবার বিতরণ করা একটি বিদআতে হাসানা বা ভালো কাজ। যে এটি করবে সে সওয়াব পাবে, কারণ এতে নবীজী (সা.)-এর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা রয়েছে।"

তবে ইমাম সুয়ুতী (রহ.) কঠোর শর্ত আরোপ করে বলেছেন যে, এই আয়োজনে কোনো অনৈসলামিক কাজ, অপচয়, ঢোল-তবলা, গান-বাজনা কিংবা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা থাকলে তা আর বিদআতে হাসানা থাকবে না, বরং হারামে পরিণত হবে।

বিদআতের শ্রেণীবিন্যাস প্রত্যাখ্যানকারীদের যুক্তিকাঠামো

ইমাম শাতেবী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-ই'তিসাম' (الاعتصام)-এ বিদআতের এক নিখুঁত ফিকহী সংজ্ঞা প্রদান করেছেন:

"বিদআত হলো দ্বীনের মধ্যে নবউদ্ভাবিত এমন এক তরীকা বা পদ্ধতি, যা শরীয়তের সমতুল্য মনে করে অনুসরণ করা হয় এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদতে আধিক্য বা তাকিদ অর্জন করাই মূল উদ্দেশ্য হয়।"

ইমাম শাতেবী (রহ.) ইবনে আব্দুস সালামের ৫টি বিভাগের সমালোচনা করে বলেন, ওয়াজিব বা মুস্তাহাব বিষয়গুলোকে বিদআত বলা কেবল ভাষাগত (লুগাভী) অর্থে হতে পারে, শরয়ী অর্থে নয়। যেসব নতুন কাজ দ্বীন সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে (যেমন কুরআন সংকলন), সেগুলো বিদআত নয়; বরং তা 'মাসালিহে মুরসালা' (জনকল্যাণমূলক ও শরীয়তের সাধারণ উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত) এর নীতির অধীন। ইবাদতের ক্ষেত্রে বিদআতে হাসানা বলে কিছু হতে পারে না।

ইমাম মালিক (রহ.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তি এখানে স্মরণীয়:

"যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো নতুন প্রথা প্রবর্তন করলো এবং তাকে ভালো (বিদআতে হাসানা) মনে করলো, সে যেন দাবি করলো যে মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর ওপর অর্পিত নবুয়তের দায়িত্ব পালনে خیانت (ত্রুটি) করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। কারণ আল্লাহ বলেছেন: 'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম' (সূরা আল-মায়িদা: ৩)। অতএব, সেদিন যা দ্বীন ছিল না, আজ তা দ্বীন হতে পারে না।" (আল-ই'তিসাম, ইমাম শাতেবী)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) যুক্তি দেন যে, কোনো কাজ ভালো মনে করলেই তা ইবাদত হতে পারে না, যতক্ষণ না তার পক্ষে শরীয়তের নির্দিষ্ট বা সাধারণ দলীল থাকে।

প্রখ্যাত আলেম ও ফকীহগণের দৃষ্টিভঙ্গি: পক্ষে ও বিপক্ষে

মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন যুগের ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ মিলাদুন্নবী (সা.) পালনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট শরয়ী বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন:

পক্ষে বা শর্তসাপেক্ষে অনুমোদনকারী আলেমগণ

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.): তিনি মিলাদ অনুষ্ঠানকে মূলগতভাবে বিদআত হিসেবে স্বীকার করলেও সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদীস থেকে এর শরয়ী ভিত্তি (আসল) আবিষ্কার করেন। হাদীসটিতে এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা.) মদীনায় হিজরতের পর ইহুদিদের ১০ই আশূরায় রোজা রাখতে দেখে কারণ জিজ্ঞাসা করেন। তারা জানায়, এ দিনে আল্লাহ মুসা (আ.)-কে ফেরআউনের হাত থেকে নাজাত দিয়েছিলেন, তাই তারা শুকরিয়া হিসেবে রোজা রাখে।

রাসুল (সা.) বলেন, "মুসার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমাদের অধিকার বেশি" এবং তিনি নিজে রোজা রাখেন ও নির্দেশ দেন। ইবনে হাজার (রহ.) এই হাদীস থেকে উসূল প্রয়োগ করে বলেন: নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর কোনো বিশেষ নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করা বৈধ। রাসুল (সা.)-এর ধরায় আগমন অপেক্ষা বড় নেয়ামত আর কী হতে পারে? তবে তিনি শর্ত দেন যে, এই শুকরিয়া হতে হবে কেবল সেজদা, রোজা, দান-ছদকা ও কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে।

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ.): তিনি বায়হাকীতে বর্ণিত একটি হাদীসের ওপর ভিত্তি করে যুক্তি দেন, যেখানে উল্লেখ আছে রাসুল (সা.) নবুয়ত প্রাপ্তির পর নিজের আকীকাহ নিজে করেছিলেন (যদিও তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব বাল্যকালেই তা করেছিলেন)। সুয়ুতী (রহ.) বলেন, এটি ছিল মূলত রাসুল (সা.)-এর নিজের আগমনের জন্য আল্লাহর প্রতি শুকরিয়ার বহিপ্রকাশ, যা উম্মতের জন্য জন্মোৎসব পালনের অনুপ্রেরণা।

মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.): তাঁর রচিত গ্রন্থ 'আল-মাওরিদুর রাবী ফি মাওলিদিন নাবী'-তে উল্লেখ করেন, যদি মিলাদ মাহফিলে গীবত, অনর্থক গোলযোগ, অপচয় ও হারাম কাজ না থাকে, তবে সীরাতুন্নবী আলোচনার মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর প্রতি মুহাব্বত বৃদ্ধি করা প্রশংসনীয় ও সওয়াবের কাজ।

সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও বিদআত মনেকারী আলেমগণ

ইমাম তাজউদ্দীন ফাকাহানী (রহ.): মালিকী মাযহাবের এই প্রখ্যাত ফকীহ তাঁর গ্রন্থ 'কিতাবুল আমাল ফিল কালাম আলা আমালিল মাওলিদ' (الـمَوْرِدُ فِي الْكَلَامِ عَلَى عَمَلِ الْمَوْلِدِ)-এ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে বলেন:

"আমি কুরআন ও হাদীসে এই মিলাদের কোনো ভিত্তি খুঁজে পাইনি। সাহাবা, তাবেয়ীন বা তাবে-তাবেয়ীনদের থেকেও এটি বর্ণিত হয়নি। হিজরী ষষ্ঠ শতকে ফাতেমী বা পরবর্তী শাসকদের যুগে এটি উদ্ভূত হয়েছে। এটি যদি ইবাদতের নিয়তে করা হয় তবে তা বিদআত, আর যদি সাধারণ বিনোদন বা মেলা হিসেবে করা হয় তবে তা অনর্থক সময় ও অর্থ অপচয়।"

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.): তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম' (اقتضاء الصراط المستقيم)-এ লেখেন:

"খ্রিষ্টানরা যেমন ঈসা (আ.)-এর জন্মাদিনকে উৎসব (ক্রিসমাস) বানিয়েছে, অনেকে নবীজী (সা.)-এর সাথে অনুরূপ আচরণ করে। অনেকেই ভালোবাসা থেকে এটি করে এবং এর জন্য সওয়াব পেতে পারে, কিন্তু সালাফে সালেহীন (সাহাবী ও তাবেয়ীনগণ) রাসুল (সা.)-কে সর্বাধিক ভালোবাসতেন এবং তাঁদের সামর্থ্যও ছিল, তবুও তাঁরা এটি করেননি। কারণ দ্বীনের ক্ষেত্রে সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণেই প্রকৃত কল্যাণ নিহিত।"

শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) ও দেওবন্দী আলেমগণ: শাহ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর 'ফুয়ুজুল হারামাইন'-এ রাসুল (সা.)-এর জন্মবৃত্তান্ত আলোচনার বরকতের কথা উল্লেখ করলেও, ভারতীয় উপমহাদেশের পরবর্তী ফকীহগণ (যেমন মাওলানা রশীদ আহমদ গাংগোহী, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) মিলাদুন্নবীকে সুনির্দিষ্ট প্রথা, ১২ই রবীউল আউয়াল তারিখ নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক দাঁড়িয়ে 'কিয়াম' করা এবং না এলে গোনাহগার মনে করার মানসিকতাকে কঠিন বিদআত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তাঁদের মতে, যেকোনো সময় রাসুল (সা.)-এর সীরাত, শামায়েল ও সুন্নাহ নিয়ে আলোচনা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ, কিন্তু তা নির্দিষ্ট তারিখ ও রীতিনীতিতে আবদ্ধ করে উৎসবের রূপ দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়। তাই তাঁরা আনুষ্ঠানিক মিলাদের পরিবর্তে সার্বক্ষণিক 'সীরাতুন্নবী (সা.)' চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.): একটি সুবিন্যস্ত তথ্য সারণী

নিচে ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কিত সকল প্রয়োজনীয় তথ্য, ঐতিহাসিক পটভূমি এবং ফিকহী মতভেদের একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:

মূল বিষয়

পক্ষে বক্তব্য ও যুক্তি

বিপক্ষে বক্তব্য ও যুক্তি

চূড়ান্ত শরয়ী সারসংক্ষেপ

শব্দগত পরিচয়

মিলাদ = জন্মবৃত্তান্ত; ঈদে মিলাদুন্নবী = নবীজীর জন্মোৎসব।

ইসলামে বাৎসরিক 'ঈদ' দুটি (ফিতর ও আজহা)। ৩য় ঈদ প্রবর্তন অনুচিত।

এটি একটি পারিভাষিক নাম। মূল বিচার হবে কাজের ধরনের ওপর।

ঐতিহাসিক উৎপত্তি

৭ম হিজরিতে সুলতান মুজাফফর কর্তৃক সুন্নি সমাজে ব্যাপক প্রসার।

১ম ৩ হিজরি শতকে (স্বর্ণযুগে) অনুপস্থিত। ৪র্থ হিজরিতে ফাতেমীয় শিয়াদের দ্বারা প্রবর্তিত।

খাইরুল কুরুনে বা সাহাবীদের যুগে এই উৎসবের অস্তিত্ব ছিল না।

কুরআনের স্থানাঙ্ক

সূরা ইউনুস (১০:৫৮) অনুযায়ী আল্লাহর রহমতে আনন্দ প্রকাশ করা জায়েজ।

আয়াতে 'রহমত' বলতে কুরআন/ঈমান উদ্দেশ্য; বার্ষিক উৎসব নয়।

আয়াতটি সাধারণ আনন্দ প্রকাশের দলিল, সুনির্দিষ্ট উৎসবের নয়।

হাদীসের ভিত্তি

সোমবারে রোজা রাখার হাদীস (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)।

রাসুল (সা.) রোজা রেখেছিলেন, বাৎসরিক উৎসব বা উৎসবের খানা বানাননি।

সুন্নাহ হলো সোমবারে রোজা রাখা, জশনে জুলুস বা আনন্দ মিছিল নয়।

ফিকহী শ্রেণীবিভাগ

এটিকে 'বিদআতে হাসানা' বা ভালো উদ্ভাবন বলা হয় (ইমাম সুয়ুতী)।

ইবাদতে নতুন কিছু সংযোজনই বিদআতে দ্বালালাহ (ইমাম শাতেবী ও মালিক)।

ইবাদতের নিয়তে নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা থেকে বেঁচে থাকাই নিরাপদ।

সাংস্কৃতিক রূপ

সীরাত আলোচনা, দরূদ পাঠ ও খাবার বিতরণ উত্তম কাজ।

অপচয়, নারী-পুরুষের অবাধ মিশ্রণ, আলোকসজ্জা ও গানবাজনা হারাম।

অনৈসলামিক কার্যকলাপ যুক্ত হলে তা সর্বসম্মতিক্রমে অবৈধ।

বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সামাজিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালন কেবল একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দীর্ঘ সামাজিক ও ধর্মীয়-সাংশ্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। হিজরি রবিউল আউয়াল মাস শুরু হওয়ার সাথে সাথেই দেশের বিভিন্ন শহর, গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় এক ধরনের উৎসবমুখর ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়। সাধারণ জনগণ ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো নিজেদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা এবং খানকাহগুলো রঙিন পতাকা, ব্যানার ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করে। এই উপলক্ষে সীরাত পাঠের আসর, মিলাদ মাহফিল, দরূদ পাঠের বিশেষ অনুষ্ঠান এবং তাবাররুক বিতরণের সামাজিক রীতি গড়ে উঠেছে, যা মুসলিম সমাজের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

সরকারি ও সামাজিক স্বীকৃতি

বাংলাদেশে ১২ই রবিউল আউয়াল রাষ্ট্রীয়ভাবে সাধারণ ছুটি হিসেবে পালিত হয়। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা পৃথক বাণী প্রদান করেন এবং সরকারি ভবনগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে পক্ষকালব্যাপী ইসলামী বইমেলা, সীরাতুন্নবী (সা.) প্রদর্শনী, ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতা ও ধর্মীয় সেমিনারের আয়োজন করা হয়। জাতীয় পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে এবং সরকারি ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচারিত হয়।

সামাজিক পরিসরে এর অন্যতম বড় আয়োজন হলো 'জশনে জুলুস' বা আনন্দ মিছিলে বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় আঞ্জুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট এবং আঞ্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়া-র মতো সুফি অনুসারী সামাজিক-ধর্মীয় সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে যে জুলুস বের হয়, তাতে বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষ উপস্থিত থেকে নাত-এ-রাসূল ও দরূদ পাঠের মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করেন।

মতাদর্শগত অবস্থান

সুন্নি/বারেলভী ও সুফি অনুসারীগণ: তাঁরা ১২ই রবিউল আউয়াল মহানবী (সা.)-এর পৃথিবীতে আগমনকে সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত মনে করেন। পবিত্র কোরআনের সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতের ("বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের কারণে তারা যেন আনন্দিত হয়") ওপর ভিত্তি করে তাঁরা এই দিনকে সর্বশ্রেষ্ঠ 'ঈদ' বা আনন্দের দিন হিসেবে উদযাপন করেন। তাঁদের মতে, প্রিয় নবীজী (সা.)-এর বিলাদত (শুভ আগমন) উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল, জশনে জুলুস ও কিয়াম করা নবীপ্রেমের প্রকাশ এবং ইবাদতেরই অংশ।

দেওবন্দী, আহলে হাদীস ও সালাফী অনুসারীগণ: তাঁরা ১২ই রবিউল আউয়াল নির্দিষ্ট কোনো দিনকে বা আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রাকে 'ঈদ' হিসেবে উদযাপন করাকে ইসলামে শরীয়তভিত্তিক প্রমাণহীন নতুন সংযোজন বা 'বিদআত' মনে করেন। তাঁদের মতে, সাহাবায়ে কেরাম বা তাবেঈদের যুগে এমন প্রথা ছিল না। তাই তাঁরা নির্দিষ্ট একটি দিনের উদযাপনের পরিবর্তে বছরব্যাপী বা রবিউল আউয়াল মাসে 'সীরাতুন্নবী (সা.) সম্মেলন'-এর আয়োজন করেন, যেখানে নবীজী (সা.)-এর জীবনী আলোচনা, শিক্ষা ও সুন্নাহর বাস্তবিক অনুসরণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

উম্মাহর ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতি

বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন বা না পালনকে কেন্দ্র করে প্রায়শই বিভিন্ন মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে বিতর্ক ও বাকবিতণ্ডার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। ইসলামী চিন্তাবিদ ও নিরপেক্ষ গবেষকদের মতে, এটি ইসলামের একটি গৌণ বা ইজতিহাদী (গবেষণালব্ধ মতপার্থক্যমূলক) বিষয়। এক পক্ষকে অপর পক্ষ কর্তৃক চরমপন্থী বা দ্বীনবিমুখ আখ্যা দেওয়া উম্মাহর ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর। নবী কারীম (সা.)-এর ভালোবাসার মূল চেতনাকে ধারণ করে ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা জানানো, কাদা ছোঁড়াছুড়ি বন্ধ করা এবং সমাজ জীবনে উম্মাহর সম্প্রীতি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশের সুন্নাহসম্মত উপায়

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানের অন্যতম মূল ভিত্তি। সহীহ বুখারীর ১৫ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: "তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সব মানুষের চেয়ে প্রিয় হব"। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাঁদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই ভালোবাসার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। শরীয়তের আলোকে মহানবীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের প্রধান সুন্নাহসম্মত উপায়গুলো হলো:

ইত্তেবা বা পূর্ণ আনুগত্য: ভালোবাসার প্রধান দাবি হলো তাঁর আদেশ-নিষেধ মান্য করা এবং ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ (ইত্তেবা) করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন" (সূরা আল-ইমরান, ৩:৩১)

অধিক পরিমাণে দরূদ ও সালাম পাঠ: দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ছাড়াও সার্বক্ষণিক জিকিরে দরূদ ও সালাম জারি রাখা। বিশেষ করে জুমার দিনে বেশি বেশি দরূদ পাঠের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ হাদিসে এসেছে।

সীরাতুন্নবী (সা.) নিয়মিত অধ্যয়ন ও চর্চা: কেবল বছরের একটি নির্দিষ্ট মাসে নয়, বরং সারা বছর জুড়ে প্রিয় নবীজী (সা.)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী (সীরাত) অধ্যয়ন করা, পরিবারে সন্তানদের কাছে তাঁর অনুপম জীবনী শিক্ষা দেওয়া এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।

সাপ্তাহিক নফল সিয়াম (সোমবারে রোজা রাখা): রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, "এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনে আমার ওপর ওহী নাজিল হয়েছে" (সহীহ মুসলিম)। ফলে প্রতি সোমবারে রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে তাঁর আগমনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায়।

আখলাক ও চরিত্রের পরিবর্তন: মহানবী (সা.) এসেছিলেন বিশ্ববাসীর জন্য উত্তম চরিত্র অর্জনের পূর্ণতা দিতে। তাঁর অর্জিত ক্ষমাশীলতা, সততা, আমানতদারী, দয়া, পরমতসহিষ্ণুতা ও ন্যায়ের গুণাবলী নিজের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন করাই হলো ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

উপসংহার ও সমন্বিত মূল্যায়ন

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) কেন্দ্রিক আলোচনাটি উম্মাহর একটি সুদীর্ঘ ফিকহী মতভেদের অংশ। কুরআন, সহীহ হাদীস, ঐতিহাসিক তথ্য এবং উলামায়ে কেরামের ফতোয়া বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি:

সুন্নাহর অনুগামিতা: রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনের যুগে ১২ই রবিউল আউয়াল নির্দিষ্ট করে বাৎসরিক 'ঈদ' বা উৎসব পালনের কোনো প্রমাণ নেই। সুতরাং, এটিকে দ্বীনের অপরিহার্য অঙ্গ বা সুন্নাত-ফরজের মতো ইবাদত মনে করা শরীয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।

সীরাত আলোচনার গুরুত্ব: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সীরাত, জীবনাদর্শ, অলৌকিক গুণাবলী ও শিক্ষা আলোচনা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। যদি কোনো মাহফিলে শিরক, বিদআত, অপচয়, গান-বাজনা ও অনৈসলামিক কার্যকলাপ না থাকে এবং কেবল সীরাত আলোচনা ও দরূদ পাঠ হয় তবে তা সাধারণ ওয়াজ মাহফিলের মতো জায়েজ।

চরমপন্থা বর্জন ও সম্প্রীতি: যারা মিলাদুন্নবী পালন করেন না, তাদের 'নবী-প্রেমহীন' বলে গালি দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি যারা বিশুদ্ধ নিয়তে কোনো শিরক-মুক্ত সীরাত মাহফিল করেন, তাদের ঢালাওভাবে 'কাফের' বা 'পথভ্রষ্ট' আখ্যা দেওয়াও ইসলামি শিষ্টাচার পরিপন্থী।

চূড়ান্ত কথা হলো উৎসবের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে মহানবী (সা.)-এর রেখে যাওয়া কুরআন ও সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণই হলো তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের প্রকৃত ও সর্বোত্তম মাধ্যম। উম্মাহর উচিত গৌণ বিভেদ ভুলে গিয়ে মহানবী (সা.)-এর সার্বিক আদর্শকে নিজেদের জীবনে পুনরুজ্জীবিত করা।

"আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।" (সূরা আল-হাশর, ৫৯:৭)

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.