কাঁটাতারে ঝুলন্ত ফেলানী - সীমান্ত হত্যা, আগ্রাসন ও এক দশকের বিচারহীনতা

কাঁটাতারে ঝুলন্ত ফেলানী - সীমান্ত হত্যা, আগ্রাসন ও এক দশকের বিচারহীনতা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ৪,১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে রক্তের দাগ কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে ২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি ভোরবেলা কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্তে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা পুরো পৃথিবীর বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৫ বছর বয়সী এক অবুঝ বাঙালি কিশোরী ফেলানী খাতুন। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া তাঁর নিথর দেহটি সীমান্ত বেড়ার খাঁজকাটা কাঁটাতারে ঝুলছিল দীর্ঘ চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। সেই ঝুলন্ত মরদেহের ছবি যখন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তখন তা কেবল একটি রাজনৈতিক বা সীমান্ত হত্যা হিসেবে থাকেনি; তা পরিণত হয়েছিল ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার এক চিরন্তন ও রক্তাক্ত স্মারকে।

একজন ১৫ বছরের কিশোরীর রক্তে ভেজা জামা কাঁটাতারে আটকে থাকার সেই মর্মান্তিক দৃশ্য কেবল বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়কেই ক্ষতোবিক্ষত করেনি, বরং তা ভারতের তথাকথিত ‘বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী নীতি’ এবং তাদের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থার চরম দেউলিয়াগ্রস্ততাকে বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করেছিল। ঘটনার পর দেড় দশকের কাছাকাছি সময় পার হতে চললেও আজ পর্যন্ত ফেলানীর পরিবার সুবিচার পায়নি। আজ আমরা পর্যালোচনা করব ফেলানীর সংক্ষিপ্ত জীবন, সেই বিভীষিকাময় ভোরের ঘটাক্রম, বিএসএফের অমানবিকতা, প্রহসনের বিচার প্রক্রিয়া এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অবিরাম রক্তপাতের রাজনীতি।

ফেলানী খাতুনের পরিচয় ও দীর্ঘদিনের প্রবাস জীবন

ফেলানী খাতুন কেবল কোনো পরিসংখ্যানের সংখ্যা ছিলেন না; তিনি ছিলেন অভাবের তাড়নায় ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হওয়া এক সাধারণ বাঙালি পরিবারের জ্যেষ্ঠ কন্যা।

পূর্ণ নাম: ফেলানী খাতুন (মৃত্যুকালীন বয়স: ১৫ বছর)।
পিতা-মাতা: বাবা নূরুল ইসলাম এবং মা জাহানারা বেগম।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: দক্ষিণ রামখানা (নওদা পাড়া), ইউনিয়ন: রামখানা, উপজেলা: নাগেশ্বরী, জেলা: কুড়িগ্রাম।

কেন তাঁরা ভারতে গিয়েছিলেন এবং কেন ফিরছিলেন?

ফেলানীর জন্ম ও বেড়ে ওঠার পেছনে ছিল দারিদ্র্যের এক চরম কষাঘাত। কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নদীভাঙন ও কর্মসংস্থানহীন এলাকায় জীবন ধারণ করা যখন কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম জীবিকার সন্ধানে অনিয়মিত পথে ভারতে পাড়ি জমান। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গিয়ে তিনি ইটের ভাঁটায় শ্রমিক হিসেবে এবং পরবর্তীতে রাস্তায় ফেরিওয়ালার কাজ শুরু করেন। সামান্য উপার্জন দিয়ে পরিবার চালানোর উদ্দেশ্যে পরবর্তীতে তিনি স্ত্রী জাহানারা বেগম এবং সন্তানদেরও নয়াদিল্লিতে নিয়ে যান।

নয়াদিল্লির বস্তিতে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে নূরুল ইসলাম কিছু সঞ্চয় করেন। ২০১১ সালের গোড়ার দিকে ফেলানীর বয়স যখন ১৫ ছুঁইছুঁই, তখন নিজ গ্রাম নাগেশ্বরীতে তাঁর দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের সাথে বিয়ে ঠিক হয়। বাঙালি সংস্কৃতির রীতি অনুযায়ী নিজ জন্মভূমিতে ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন বাবা নূরুল ইসলাম।

যেহেতু তাঁরা অতিদরিদ্র ছিলেন এবং বৈধ পাসপোর্ট-ভিসা করার আইনি জটিলতা ও আর্থিক সামর্থ্য তাঁদের ছিল না, তাই সীমান্ত দালালের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে ভারতে অর্জিত সামান্য সহায়-সম্বল নিয়ে নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। তাঁরা ভারতে অনুপ্রবেশ করছিলেন না; বরং দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরছিলেন।

৭ই জানুয়ারি ২০১১: অনন্তপুর সীমান্তে সেই বিভীষিকাময় ভোর

২০১১ সালের ৬ই জানুয়ারি রাতে নূরুল ইসলাম তাঁর কিশোরী মেয়ে ফেলানীকে নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলার চৌধুরীহাট সীমান্তের দিকে রওনা হন। ওপারের চৌধুরীহাট আর এপাশের কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত ছিল তাঁদের পারাপারের নির্ধারিত রুট। পারাপারের দায়িত্বে ছিল ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত পারাপারকারী দালালচক্র।

কাঁটাতারে আটকে যাওয়া ও বিএসএফের ট্রিগার-হ্যাপি মানসিকতা

৭ই জানুয়ারি শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যবর্তী সময়। চারদিকে হালকা কুয়াশা। ৯৪৭/৩-এস নম্বর আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারের কাছে দালালরা বাঁশের মই লাগিয়ে দেয় কাঁটাতারের দুই পাশে। কৌশল অনুযায়ী ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম প্রথমে মই বেয়ে কাঁটাতারের ওপর উঠে ওপারের বেড়া ডিঙিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে নিরাপদে নেমে পড়েন।

এরপর নামার পালা ছিল ১৫ বছরের ফেলানীর। মই দিয়ে কাঁটাতারের ওপর ওঠার পর নিচে নামার মুহূর্তে ফেলানীর পরনের প্লাজো/সেলওয়ার-কামিজের অংশ কাঁটাতারের ধারালো খাঁজে শক্তভাবে আটকে যায়। হঠাৎ আটকে গিয়ে ভয়ে কিশোরী ফেলানী কান্নাকাটি ও চিৎকার শুরু করেন।

শব্দ শুনেই টহলরত বিএসএফের ১৮১ ব্যাটালিয়নের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বন্দুকধারী জওয়ান অমিয় ঘোষ দৌড়ে আসে। কোনো ধরনের সতর্কবার্তা না দিয়ে, কিংবা কোনো নিরস্ত্র ১৫ বছরের মেয়েকে গ্রেফতারের চেষ্টা না করে, অমিয় ঘোষ অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় খুব কাছ থেকে রাইফেল উঁচিয়ে ফেলানীকে লক্ষ্য করে গুলি চলায়।

মৃত্যুর কোণে ঢলে পড়া ও পানির আকুতি

বুলেটের তীব্র আঘাতে ফেলানীর বুক ও পাঁজর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। কিন্তু গুলি লাগার পর তাঁর শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়েনি, কারণ তাঁর পোশাকটি কাঁটাতারে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছিল। ফলে নিথর ও রক্তভেজা দেহটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের বেড়ার ওপর ঝুলন্ত অবস্থায় থেকে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী এবং কাছেই লুকিয়ে থাকা ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী, গুলি লাগার পর ফেলানী সাথে সাথে মারা যাননি। প্রায় আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা তিনি কাঁটাতারে ঝুলন্ত অবস্থায় জীবিত ছিলেন। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিনি বারবার বলছিলেন: "বাবা, আমাকে পানি দাও... আমি মরে যাচ্ছি..."

ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা ভারতীয় বিএসএফ জওয়ানরা দূর থেকে এই দৃশ্য দেখেছে, কিন্তু কোনো মানবিকতার খাতিরেও ফেলানীকে নিচে নামিয়ে আনা বা প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার কোনো চেষ্টা করেনি। এমনকি বাংলাদেশের সীমানায় থাকা তাঁর অসহায় বাবাও বিএসএফের বুলেটের ভয়ে মেয়ের কাছে গিয়ে এক ফোঁটা পানি দিতে পারেননি। রক্তক্ষরণ হতে হতে কাঁটাতারেই চিরতরে চোখ বোজেন ১৫ বছরের ফেলানী।

৪-৫ ঘণ্টার ঝুলন্ত মরদেহ এবং বাঁশে বাঁধা বিএসএফের নিষ্ঠুরতা

একটি মৃতদেহের প্রতি ন্যূনতম যে সম্মান প্রদর্শন করা সভ্য সমাজের রীতি, তা সেদিন বিএসএফ পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।

ঝুলন্ত বধ্যভূমি: সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা ফেলানীর নিথর দেহটি অবহেলার সাথে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ওপাশের ভারতীয় সীমান্তরক্ষী এবং এপাশের হাজার হাজার বাংলাদেশি নাগরিক দূর থেকে সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন।

পশুর মতো লাশ অপসারণ: বেলা ১১টার দিকে বিএসএফের জোয়ানরা একটি দীর্ঘ বাঁশ নিয়ে আসে। তারা ফেলানীর দুই হাত ও দুই পা রশি দিয়ে বাঁশের সাথে শক্ত করে বাঁধে যেভাবে শিকার করা পশুকে বন থেকে বহন করে আনা হয়। এরপর সেই পশুর মতো ঝুলিয়ে তাঁর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে।

লাশ হস্তান্তর: ঘটনার ৩০ ঘণ্টা পর, ৮ই জানুয়ারি শনিবার সন্ধ্যায় বিএসএফ ভারতের পুলিশ প্রশাসন ও বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ)-এর উপস্থিতিতে ফেলানীর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। ৯ই জানুয়ারি নিজ গ্রাম কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে চোখের জলে তাঁকে দাফন করা হয়।

ফেলানীর মরদেহের সেই ঝুলন্ত ছবি বাংলাদেশি সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের মাধ্যমে বিশ্ব গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন, ঢাকা থেকে দিল্লি সব জায়গায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভারতের সীমান্ত নীতিকে ‘ট্রিগার-হ্যাপি’ (Trigger-happy) এবং ‘অবৈধ হত্যা’ বলে আখ্যা দেয়।

বিএসএফের নিজস্ব আদালত (GPFC) ও অমিয় ঘোষের খালাস

বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চাপের মুখে ভারত সরকার বাধ্য হয়ে ঘটনার তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দেয়। তবে এই বিচার প্রক্রিয়াটি শুরু থেকেই ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রহসন।

বিএসএফের নিজস্ব আদালত

বিএসএফ তাদের নিজস্ব আইনে গঠন করে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্ট (GPFC)। কোনো স্বাধীন বা নিরপেক্ষ দেওয়ানি আদালতে বিচার না করে, বিএসএফের নিজস্ব কর্মকর্তাদের দিয়ে এই আদালত পরিচালিত হয়, যেখানে আসামিও বিএসএফ, বিচারকও বিএসএফ!

বিচারে সাক্ষ্যদান: ২০১৩ সালে ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম এবং মামা নোমান মিয়া বিএসএফের বিশেষ আদালতে হাজির হয়ে অমিয় ঘোষের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষ্য দেন।

প্রথম রায়ের প্রহসন (২০১৩): ২০১৩ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর বিএসএফের বিশেষ আদালত রায় ঘোষণা করে। রায়ে বলা হয়, বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি, তাই তাঁকে "নির্দোষ" খালাস দেওয়া হলো!

পুনর্বিচারের প্রহসন (২০১৫): বিশ্বব্যাপী এই রায়ের তীব্র সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে বিএসএফের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পুনর্বিচারের (Re-trial) নির্দেশ দেয়। ২০১৫ সালের ২রা জুলাই পুনর্বিচারের রায় প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয়বারও সেই বিএসএফ আদালত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে চূড়ান্তভাবে "অপ্রমাণিত অপরাধী" হিসেবে খালাস ঘোষণা করে।

বিএসএফের দাবি ছিল, অমিয় ঘোষ 'আত্মরক্ষার্থে' এবং 'সীমান্তে অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিহত করতে' গুলি চালিয়েছিলেন। অথচ একটি ১৫ বছরের নিরস্ত্র কিশোরী, যে কাঁটাতারে আটকে কান্নাকাটি করছিল, সে কীভাবে সশস্ত্র বিএসএফ জওয়ানের জীবনের জন্য হুমকি হতে পারে তার কোনো উত্তর বিএসএফ দিতে পারেনি।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে রিট ও এক দশকের দীর্ঘ বিচারহীনতা

বিএসএফের নিজস্ব আদালতে ন্যক্কারজনক খালাসের পর ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (MASUM)-এর প্রধান কিরীটী রায় এবং ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম ২০১৫ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করেন।

রিটের মূল দাবি

১. বিএসএফের নিজস্ব ক্যাঙ্গারু কোর্টের রায় বাতিল করে মামলাটি ভারতের কোনো নিরপেক্ষ সিভিল কোর্টে অথবা সিবিআই (CBI)-এর হাতে হস্তান্তর করা।

২. বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে অভিযুক্ত করে ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী হত্যা মামলা চালানো।

৩. ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক ফেলানীর পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।

সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন দীর্ঘ স্থবিরতা

২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট রিটটি গ্রহণ করলেও গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মামলাটি কেবল 'তালিকায়' রয়েছে। বারবার শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও কোনো না কোনো অযুহাতে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। কখনো জাজ বেঞ্চ পরিবর্তন, কখনো ভারতীয় সরকারের সময় প্রার্থনা, আবার কখনো প্রশাসনিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে মামলাটি আজ হিমাগারে পড়ে আছে।

ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম আজও ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন:

"আমার চোখের সামনে আমার মেয়েটাকে বিএসএফ গুলি করে মারল। কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখল। আমি ভারতের কোর্টে গিয়ে সাক্ষ্য দিয়ে এলাম। কিন্তু ওরা খুনিকে নির্দোষ বানিয়ে দিল। আমি আর কত দিন বাঁচব জানি না, কিন্তু মৃত্যুর আগে দেখে যেতে চাই আমার মেয়ের হত্যাকারীর সাজা হয়েছে।"

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত: এক রক্তাক্ত উপাখ্যান ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি

ফেলানী হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নিয়মিতভাবে পরিচালিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের (Lethal Force) একটি ভয়াবহ উদাহরণ।

বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সীমান্ত

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ' (HRW) ২০১১ সালে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে একটি বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল: 'Trigger-Happy: Excessive Use of Force by Indian Troops at the Bangladesh Border' (ট্রিগার-হ্যাপি: বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ)

উক্ত রিপোর্টে এইচআরডব্লিউ উল্লেখ করে যে, বিশ্বজুড়ে যেসব সীমান্তকে সবচেয়ে বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী মনে করা হয়, তার মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অন্যতম। ২০০০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে প্রায় ১,৫০০-এরও বেশি আইনি ও অনিয়মিত বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন।

‘নন-লেথাল’ অস্ত্রের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি

বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্র ও সীমান্ত স্তরের একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ভারত সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা সীমান্তে ‘নন-লেথাল’ বা প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র (যেমন: রবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড) ব্যবহার করবে। কিন্তু বাস্তবে বিএসএফ নিয়মিতভাবে ৭.৬২ মিমি ও ৫.৫৬ মিমি ক্যালিবারের মারাত্মক রাইফেল ব্যবহার করে নিরীহ ও নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের হত্যা করে চলেছে।

ফেলানী খাতুন সম্পর্কিত মূল তথ্যচিত্র

ফেলানী খাতুন হত্যাকাণ্ড, এর ভৌগোলিক অবস্থান, বিচার প্রক্রিয়ার ধাপ এবং সামগ্রিক তথ্যের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে প্রদান করা হলো:

বিষয় / ক্ষেত্র

বিস্তারিত তথ্য ও বিবরণ

ভিকটিমের নাম ও বয়স

ফেলানী খাতুন (১৫ বছর)।

পিতা ও মাতা

পিতা: নূরুল ইসলাম, মাতা: জাহানারা বেগম।

স্থায়ী ঠিকানা

গ্রাম: দক্ষিণ রামখানা (নওদা পাড়া), ইউনিয়ন: রামখানা, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম।

ঘটনার তারিখ ও সময়

৭ই জানুয়ারি ২০১১, শুক্রবার ভোর আনুমানিক ৬:০০ টা।

ঘটনা স্থান

আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ৯৪৭/৩-এস, অনন্তপুর সীমান্ত, ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম।

অভিযুক্ত ঘাতক ও বাহিনী

রাইফেলম্যান অমিয় ঘোষ (১৮১ ব্যাটালিয়ন, চৌধুরীহাট ক্যাম্প, বিএসএফ, ভারত)।

ঘটনার ধরণ

বাঁশের মই দিয়ে কাঁটাতার ডিঙানোর সময় গুলি বর্ষণ এবং ৪-৫ ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলন্ত রাখা।

মরদেহ হস্তান্তর

ঘটনার ৩০ ঘণ্টা পর (৮ই জানুয়ারি ২০১১) বিজিবি-পুলিশের কাছে বিএসএফ কর্তৃক হস্তান্তর।

বিএসএফ ক্যাঙ্গারু কোর্টের রায়

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে এবং ২০১৫ সালের জুলাইয়ে বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে "নির্দোষ" খালাস।

সুপ্রিম কোর্টে মামলা (ভারত)

২০১৫ সালে মানবাধিকার সংগঠন 'মাসুম' ও ফেলানীর বাবার রিট; বর্তমানে বিচারাধীন/স্থগিত।

ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনি মারপ্যাঁচ

ফেলানী হত্যা মামলাটি ভারতের বিচারব্যবস্থায় একটি অভূতপূর্ব আইনি নজির তৈরি করেছে, কারণ এটি কেবল একটি অপরাধমূলক হত্যাকাণ্ড ছিল না; এর সাথে আন্তর্জাতিক আইন ও ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন যুক্ত রয়েছে।

অনুচ্ছেদ ২১-এর সার্বজনীনতা: ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "আইনানুগ প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে তাঁর জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।" ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একাধিক ঐতিহাসিক রায়ে (যেমন: National Human Rights Commission v. State of Arunachal Pradesh) স্পষ্ট করা হয়েছে যে, অনুচ্ছেদ ২১-এর আওতায় 'জীবন ধারণের অধিকার' কেবল ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নয়, ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থানরত যেকোনো বিদেশী নাগরিক বা অনিয়মিত অনুপ্রবেশকারীর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (MASUM)-এর ভূমিকা: পশ্চিমবঙ্গের অধিকারভিত্তিক সংগঠন 'মাসুম' (Human Rights Protection Manabadhikar Suraksha Mancha)-এর নির্বাহী পরিচালক কিরীটী রায় প্রথম থেকেই ফেলানী হত্যার আইনি লড়াই পরিচালনা করছেন। মাসুম এবং ফেলানীর বাবা যৌথভাবে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন (Criminal Writ Petition No. 105/2015) দায়ের করেন।

আইনি লড়াইয়ের মূল যুক্তি: পিটিশনে যুক্তি দেওয়া হয় যে, ফেলানী ভারতের ভূখণ্ডে বিএসএফের গুলিতে নিহত হওয়ায় তাঁর জীবন ধারণের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। বিএসএফের নিজস্ব আদালতের (GPFC) রায় নিরপেক্ষ ছিল না, কারণ সেখানে একজন অভিযুক্ত সেনাকে তাঁরই বাহিনীর অফিসাররা বিচার করে খালাস দিয়েছেন। তাই মামলাটি একটি স্বাধীন দেওয়ানি আদালত অথবা ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (CBI)-র কাছে হস্তান্তর করা এবং পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

বিএসএফ আদালত (GPFC)-এর গঠনগত ত্রুটি ও ‘দায়মুক্তি’র সংস্কৃতি

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থা ‘জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্ট’ (GPFC) মূলত ১৮১ ব্যাটালিয়নের সদস্য অমিয় ঘোষকে সুরক্ষা দিতে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই আদালতের বিচার পদ্ধতি এবং তার আইনগত সীমাবদ্ধতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কেন ফেলানীর পরিবার সেখান থেকে বিচার পায়নি:

বিএসএফ আইন ১৯৬৮ (BSF Act 1968): এই আইনের আওতায় বিএসএফের সদস্যদের সীমান্ত টহলকালে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সাধারণ ফৌজদারি আদালতে বিচার না করে তাদের নিজস্ব সামরিক ধাঁচের আদালতে বিচারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

দায়মুক্তির বিধান (Section 47): বিএসএফ আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী, সীমান্ত রক্ষা বা সীমান্তে কর্তব্য পালনকালে যদি কোনো জওয়ান কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায় এবং সে যদি দাবি করে যে তা ‘দায়িত্ব পালন’ বা ‘আত্মরক্ষা’র স্বার্থে করা হয়েছে, তবে তাকে সিভিল ট্রাইব্যুনালে সোপর্দ না করে অভ্যন্তরীণ বিচারে ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকে।

স্বচ্ছতার অভাব: বিএসএফের নিজস্ব আদালতের শুনানি প্রক্রিয়ার নথিপত্র সাধারণ নাগরিক বা গণমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে কীভাবে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং কেন প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য সত্ত্বেও অমিয় ঘোষকে খালাস দেওয়া হলো, তার আইনি ব্যাখ্যা কখনোই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও কূটনৈতিক চুক্তি: সিবিএমপি (CBMP)-র বাস্তব রূপ

ফেলানী হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে বেশ কিছু কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ২০১১ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশ রাইফেলস (বর্তমান বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর তৎকালীন মহাপরিচালক পর্যায়ে ‘সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ (Coordinated Border Management Plan - CBMP) স্বাক্ষরিত হয়।

সিবিএমপি (CBMP)-র মূল প্রতিশ্রুতিসমূহ

১. মারাত্মক অস্ত্রের ব্যবহার কমানো: সীমান্তে অনিয়মিত যাতায়াত বা চোরাচালানের ক্ষেত্রে অবিলম্বে গুলি না চালিয়ে নন-লেথাল (Non-lethal) বা অ-প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা।
২. যৌথ টহল ব্যবস্থা: ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে বিজিবি ও বিএসএফের রাতে যৌথ টহলের ব্যবস্থা করা।
৩. তথ্য আদান-প্রদান: সীমান্ত অতিক্রমের কোনো ঘটনা ঘটলে গুলি চালানোর আগে অন্য পক্ষকে সতর্ক করা এবং হটলাইনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা।

বাস্তবতার সাথে প্রতিশ্রুতির বৈপরীত্য

সিবিএমপি স্বাক্ষরের পরও সীমান্তে বিএসএফের মারাত্মক মারণাস্ত্র ব্যবহারের হার কমেনি। বাংলাদেশের অধিকারভিত্তিক সংগঠন 'অধিকার' (Odhikar) এবং 'আইন ও সালিশ কেন্দ্র' (ASK)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে পরবর্তী এক দশকে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ও নির্যাতনে ৪০০-র বেশি বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

বিএসএফ প্রায়ই দাবি করে যে তারা ‘গরু চোরাচালানকারী’ বা ‘সীমান্ত অপরাধীদের’ ওপর গুলি চালায়। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিহতদের একটি বড় অংশই ছিলেন নিরীহ কৃষক, রাখাল বা ফেলানীর মতো অনিয়মিত পারাপারকারী, যাদের কাছে কোনো ধরনের মারণাস্ত্র বা আক্রমণের সরঞ্জাম ছিল না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রিপোর্ট ও বৈশ্বিক প্রভাব

ফেলানী হত্যা বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দিকে আকর্ষণ করে। এর মধ্যে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার নিরপেক্ষ প্রতিবেদন সীমান্ত সহিংসতাকে বৈশ্বিক দরবারে তুলে ধরে:

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch): এইচআরডব্লিউ তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্তে যে বলপ্রয়োগ করে, তা আন্তর্জাতিক মানবধিকার আইনের ‘আনুপাতিক বলপ্রয়োগ নীতি’ (Principle of Proportionality)-র চরম লঙ্ঘন। জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের দ্বারা বল ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মৌলিক নীতি’ (Basic Principles on the Use of Force and Firearms by Law Enforcement Officials) অনুযায়ী, জীবন বাঁচানোর চরম তাগিদ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International): অ্যামনেস্টি তাদের বার্ষিক রিপোর্টে ফেলানী হত্যাকে "সীমান্তে বেআইনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড" হিসেবে আখ্যা দেয়। সংস্থাটি ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে বিএসএফের অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থা সংস্কার করে সাধারণ দেওয়ানি আদালতে তাঁদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করার আহ্বান জানায়।

জাতীয় চেতনা, সংস্কৃতি ও সামাজিক স্মৃতিতে ফেলানী

ফেলানী খাতুন কেবল আইনি নথিপত্রে সীমাবদ্ধ কোনো নাম নয়; তিনি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি, সীমান্ত সচেতনতা এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

সাহিত্য ও শিল্পকলায় ফেলানী

ফেলানীর লাশ কাঁটাতারে ঝুলন্ত থাকার ছবিটি তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের কবি, লেখক ও শিল্পীদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদসহ অনেকেই ফেলানীকে নিয়ে কবিতা রচনা করেন। নাট্যদলগুলো এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একাধিক মঞ্চনাটক তৈরি করেছে, যেখানে কাঁটাতারকে আন্তর্জাতিক অন্যায় ও নিপীড়নের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।

‘৭ই জানুয়ারি’ ও নাগরিক সমাজ

বাংলাদেশের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, সামাজিক আন্দোলন ও মানবাধিকার গোষ্ঠী প্রতি বছর ৭ই জানুয়ারিকে ‘সীমান্ত হত্যাবিরোধী দিবস’ বা ‘ফেলানী দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে। ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশন এবং সীমান্তে বিএসএফের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্মারকলিপি প্রদান, প্রতিবাদী পদযাত্রা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীর মতো কর্মসূচি নিয়মিত আয়োজিত হয়।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নে ফেলানীর নিজ গ্রামে তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য স্থানীয় সামাজিক উদ্যোগ এবং পরিবারের পক্ষ থেকে একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও একটি ছোট পাঠাগার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। ফেলানীর জন্মস্থান নাগেশ্বরীর মানুষ এবং বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ আজও এই ৭ই জানুয়ারিকে শোক ও প্রতিবাদের দিন হিসেবে স্মরণ করে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো অভিভাবককে কাঁটাতারে ঝুলন্ত নিজের সন্তানের লাশ দেখতে না হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আলোকে মূল্যায়ন

আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার সনদ এবং জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ফেলানী হত্যা একটি সুস্পষ্ট অপরাধ।

আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তি (ICCPR): আর্টিকেলের ৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের বাঁচার অধিকার বা 'Right to Life' একটি মৌলিক অধিকার। কোনো ব্যক্তি সীমান্ত অতিক্রম করার চেষ্টা করলেও যদি সে সশস্ত্র না হয়, তাকে গুলি করে হত্যা করা যাবে না। তাকে আটক করে আইনের আওতায় আনাই ছিল আইনি পথ।

মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR): অনুচ্ছেদ ৩ এবং ৫ অনুযায়ী, কাউকে নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা অবমাননাকর শাস্তি দেওয়া যাবে না। ফেলানীর মরদেহ ৪-৫ ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা এবং পরবর্তীতে পশুর মতো বাঁশে বেঁধে পরিবহন করা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বের অসাড়তা: ভারত-বাংলাদেশকে 'কৌশলগত বন্ধু' এবং 'উন্নয়ন অংশীদার' হিসেবে দাবি করলেও, সীমান্তে সাধারণ বাঙালিদের প্রতি বিএসএফের দৃষ্টিভঙ্গি কোনো বন্ধুসুলভ রাষ্ট্রের মতো নয়। ফেলানী হত্যার বিচারে ভারতের এই গড়িমসি দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি করেছে।

৭ই জানুয়ারি: ‘সীমান্ত হত্যাবিরোধী দিবস’ ও ফেলানীর স্মৃতির অমরতা

ফেলানীর আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। তিনি আজ আর কেবল একটি পরিবারের মৃত কন্যা নন, তিনি পরিণত হয়েছেন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের আগ্রাসন ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরে।

‘সীমান্ত হত্যাবিরোধী দিবস’ দাবি: বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংগঠন ৭ই জানুয়ারিকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘সীমান্ত হত্যাবিরোধী দিবস’ হিসেবে পালনের দাবি জানিয়ে আসছে।

সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে ফেলানী: কবি, সাহিত্যিক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতারা ফেলানীকে নিয়ে কবিতা, গান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর ছবি আজ সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সীমান্ত সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যমান হাতিয়ার।

মানবাধিকার সচেতনতা: ফেলানী ট্র্যাজেডির পর থেকেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো (যেমন: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ) ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখা শুরু করে।

উপসংহার

ফেলানী খাতুনের রক্তে ভেজা কাপড় আজ আর সেই কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে নেই, কিন্তু সেই রক্তের দাগ লেগে আছে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাতায় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের খাতায়। ১৫ বছরের একটি নিষ্পাপ কিশোরী, যে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরছিল বিয়ের পিঁড়িতে বসার স্বপ্নে, তাকে বিএসএফের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে কাঁটাতারে ঝুলে থাকতে হয়েছিল এই দৃশ্য পৃথিবীর যেকোনো সভ্য দেশের জন্য চরম লজ্জার।

বিএসএফের নিজস্ব ক্যাঙ্গারু কোর্ট অমিয় ঘোষকে খালাস দিয়ে কেবল একজন খুনিকে বাঁচায়নি, বরং তারা প্রমাণ করেছে যে ভারতের সীমান্তরক্ষীদের কাছে একজন বাংলাদেশির জীবনের কোনো মূল্য নেই। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফেলানী হত্যা মামলার শুনানি ঝুলে থাকা প্রমাণ করে যে, আইনি ব্যবস্থার ভেতরেও রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ কতটা গভীরভাবে গেঁথে আছে।

তবে ইতিহাস কখনো কোনো অন্যায়কে চিরতরে ভুলে যায় না। যত দিন সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হবে, যত দিন ভারতের বিএসএফ সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ বন্ধ না করবে, তত দিন ফেলানী খাতুন হয়ে থাকবেন অদম্য প্রতিবাদের প্রতীক। ফেলানীর আত্মা তখনই শান্তি পাবে, যখন বিএসএফের খুনি জওয়ান অমিয় ঘোষের প্রকৃত সাজা হবে, ভারতের সীমান্ত নীতির আমূল পরিবর্তন ঘটবে এবং আর কোনো ফেলানীকে কাঁটাতারের ফাঁদে পড়ে প্রাণ দিতে হবে না।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.