বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রথম ডন হাজী মাস্তান - কুলি থেকে অপরাধ সাম্রাজ্যের সম্রাট

বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রথম ডন হাজী মাস্তান - কুলি থেকে অপরাধ সাম্রাজ্যের সম্রাট

চলচ্চিত্রের ক্যানভাসে আমরা যখন সাদা সুতির বা সিল্কের স্যুট পরিহিত, হাতে দামী সিগারেট এবং সাদা মার্সিডিজ গাড়ি থেকে নেমে আসা কোনো গ্ল্যামারাস মাফিয়া ডনকে দেখি, তখন হয়তো অনেকেই ভাবি এটি কোনো চিত্রনাট্যকারের কাল্পনিক সৃজনশীলতা। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) শহরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই কাল্পনিক রূপকের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক রক্তমাংসের মানুষ মাস্তান হায়দার মির্জা, যিনি গোটা উপমহাদেশে একনামে পরিচিত ছিলেন 'হাজী মাস্তান' নামে।

তিনি বন্দুক হাতে নিয়ে গুলি চালাননি, রক্তক্ষয়ী গ্যাংওয়ারে রাস্তায় লাশ ফেলেননি, কিংবা নিজেকে কখনো গ্যাংস্টার হিসেবে দাবিও করেননি। অথচ তিন দশক ধরে ভারতের বাণিজ্য নগরী বোম্বাইয়ের গোটা সমুদ্রবন্দর, শুল্ক বিভাগ, চলচ্চিত্র পাড়া এবং রাজনীতি থরথর করে কেঁপেছে তাঁর ইশারায়। বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রথম 'ডন' হিসেবে খ্যাত হাজী মাস্তান অপরাধ জগতকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও করপোরেট রূপ দিয়েছিলেন।

তামিলনাড়ুর এক হতদরিদ্র সাইকেল মেকানিকের ঘর থেকে শুরু করে বোম্বে ডকইয়ার্ডের সাধারণ কুলি, সেখান থেকে আন্তর্জাতিক সোনা পাচার চক্রের সম্রাট, বলিউডের প্রথম মাফিয়া ফাইনান্সার এবং পরবর্তীতে সামাজিক-রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠার হাজী মাস্তানের এই নাটকীয় জীবন রূপালী সিনেমার যেকোনো ব্লকব্লাস্টার কাহিনীকেও হার মানায়। নিচে হাজী মাস্তানের জীবন, উত্থান, অপরাধ নীতি, বলিউডের সাথে সম্পর্ক, রবিন হুড ভাবমূর্তি এবং জীবনের শেষ অধ্যায়ের এক পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক বিবরণ তুলে ধরা হলো।

শৈশব, দারিদ্র্য ও বোম্বেতে অনিশ্চিত যাত্রা (১৯২৬–১৯৫০)

হাজী মাস্তানের জন্ম ১৯২৬ সালের ১ মার্চ তামিলনাড়ুর কুড্ডালোর জেলার পানরুতি নামক একটি ছোট্ট ও অবহেলিত গ্রামে। তাঁর পরিবার ছিল অত্যন্ত দরিদ্র তামিল মুসলিম পরিবার। বাবা হায়দার মির্জা ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক, যিনি শুষ্ক মৌসুমে জমিতে কাজ করে পরিবারের অন্ন সংস্থান করতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন।

ভাগ্যান্বেষণে বোম্বে আগমন: দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে মাত্র ৮ বছর বয়সে (১৯৩৪ সালে) মাস্তান তাঁর বাবার সাথে নিজের গ্রাম ছেড়ে তৎকালীন 'স্বপ্নের শহর' বোম্বেতে পাড়ি জমান। বোম্বেতে এসে তাঁদের প্রথম ঠিকানা হয় দক্ষিণ বোম্বাইয়ের জনবহুল ক্রফোর্ড মার্কেট এলাকা।

সাইকেল মেরামতের দোকান থেকে ডকইয়ার্ড: বাবার সাথে ক্রফোর্ড মার্কেটের এক চিলতে রাস্তায় একটি ছোট সাইকেল মেরামতের দোকানে কাজ শুরু করেন শিশু মাস্তান। সেখানে দিনভর পরিশ্রম করে যে সামান্য অর্থ উপার্জন হতো, তা দিয়ে বোম্বাইয়ের মতো ব্যয়বহুল শহরে টিকে থাকা ছিল অসম্ভব।

বয়স একটু বাড়লে ১৯forty-এর দশকের শেষের দিকে মাস্তান কাজের সন্ধানে যান বোম্বে পোর্ট ট্রাস্টে (বোম্বে বন্দর বা ডকইয়ার্ড)। সেখানে তিনি একজন সামান্য 'কুলি' হিসেবে জাহাজের মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজ শুরু করেন। আর এই ডকইয়ার্ডই ছিল তাঁর জীবনের মোড় ঘুড়ে যাওয়ার প্রধান ক্ষেত্র।

অপরাধ সাম্রাজ্য: কুলিগিরি থেকে সোনা পাচারের সম্রাট

স্বাধীনতার পর এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারত তীব্র বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়ে। এই সংকট মোকাবিলায় ভারত সরকার বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন (FERA) কঠোর করে এবং স্বর্ণসহ যাবতীয় বিলাসবহুল আমদানিকৃত পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে সোনার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যায়। বাজারে ফরাসি রেয়ন কাপড়, দামী সুইস ঘড়ি, চশমা, সিগারেট ও ট্রানজিস্টর রেডিওর আকাশচুম্বী চাহিদা তৈরি হয়, যা বোম্বাই শহরকে চোরাচালানের এক বিশাল ও লাভজনক কেন্দ্রে পরিণত করে।

তামিলনাড়ু থেকে বোম্বাই ডকইয়ার্ড

১৯২৬ সালে তামিলনাড়ুর পানেইকুলাম গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মস্তান হায়দার মির্জা শৈশবে তাঁর বাবার সাথে বোম্বাইয়ে আসেন। বোম্বাইয়ের ক্রফোর্ড মার্কেটে একটি ক্ষুদ্র সাইকেল মেরামতের দোকানে কাজ করার পর, ১৯৫০-এর দশকে তিনি বোম্বাই বন্দরের (অ্যালেক্সান্দ্রা ডক) কুলি হিসেবে কাজ শুরু করেন। ডকইয়ার্ডের হাড়ভাঙা খাটুনির ফাঁকে মাস্তানের প্রখর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তাঁকে একটি বড় সত্য অনুধাবন করতে সাহায্য করে। তিনি দেখতে পান, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বিশেষ করে দুবাই, কুয়েত ও কাতার থেকে আসা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে করে কাস্টমস কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রচুর পরিমাণ বিদেশী পণ্য ভারতে আনা হচ্ছে।

প্রাথমিক কৌশল ও ঘুষের নেটওয়ার্ক

মাস্তান শুরুতেই কোনো বড় ঝুঁকিতে যাননি। তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাস্টমস অফিসার, পুলিশ ও জাহাজের ক্রু সদস্যদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। প্রথমে তিনি পকেটে, জামার নিচে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে লুকিয়ে ছোটখাটো জিনিস যেমন সুইস ওয়াচ, ফরাসি ফ্যাব্রিক, ট্রানজিস্টর রেডিও ও বিদেশী সিগারেট পাচার করা শুরু করেন। সময়মতো উৎকোচ দেওয়া এবং বিশ্বস্ততা বজায় রাখার কারণে খুব দ্রুত ডকইয়ার্ডের পুরো নেটওয়ার্কে তাঁর প্রভাব বিস্তার লাভ করে।

সুকুর নারায়ণ বাখিয়া ও গালফ সিন্ডিকেটের রুট

১৯৬০-এর দশকের শুরুতে মাস্তানের সাথে পরিচয় ঘটে গুজরাট ও দমন-দিউ অঞ্চলের কুখ্যাত সোনা পাচারকারী সুকুর নারায়ণ বাখিয়ার। বাখিয়ার সমুদ্র উপকূলে নিজস্ব পাচার রুট থাকলেও বোম্বাইয়ের মতো প্রধান বন্দরে মজবুত নেটওয়ার্ক ছিল না। অন্যদিকে বোম্বাই বন্দরে মাস্তানের প্রভাব ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দুই মাফিয়া হাত মিলিয়ে গঠন করেন ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চোরাচালান সিন্ডিকেট। দুবাই ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে দ্রুতগতির শক্তিশালী কাঠের বোটে (Dhows) করে সোনার বিস্কুট বোম্বাই ও গুজরাট উপকূলের কাছে আনা হতো। রাতের অন্ধকারে কাস্টমস ও স্থানীয় পুলিশকে বিপুল পরিমাণ ঘুষ ('হপ্তা') দিয়ে উপকূলের আলো নিভিয়ে খালাস করা হতো কোটি কোটি টাকার সোনা ও ইলেকট্রনিক্স কন্টেইনার।

'হাজী মাস্তান' ও রবিন হুড ভাবমূর্তি

কিছুদিনের মধ্যেই সমগ্র বোম্বাই বন্দরে সোনা ও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া পণ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন মাস্তান। পরবর্তীতে পবিত্র হজ পালন করার পর তিনি 'হাজী মাস্তান' নামে পরিচিত হন। অন্যান্য অপরাধীদের মতো তিনি নিজে সরাসরি সহিংসতা বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের চেয়ে কূটনীতি ও অর্থের প্রভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। বোম্বাইয়ের দোংরি, নাগপাড়া ও ভিন্ডি বাজারের মতো দরিদ্র মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিপুল অর্থ ও খাদ্য দান করে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে এক 'রবিন হুড' ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন।

বলিউড সংযোগ ও বোম্বাইয়ের ত্রিভূজ সাম্রাজ্য

হাজী মাস্তানের রাজত্ব কেবল পাচারকাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরনে ধবধবে সাদা জামা-কাপড়, সাদা মার্সিডিজ গাড়ি এবং হাতে ডানহিল সিগারেট তাঁর এই আভিজাত্যময় লাইফস্টাইল বোম্বাইয়ের পপ-কালচারে জায়গা করে নেয়। তিনি চলচ্চিত্রে অর্থায়ন শুরু করেন এবং দিলীপ কুমার ও রাজ কাপুরের মতো বিখ্যাত অভিনেতাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিখ্যাত হিন্দি সিনেমা 'দিওয়ার'-এ অমিতাভ বচ্চনের 'বিজয়' চরিত্রটি মূলত হাজী মাস্তানের জীবন থেকেই অনুপ্রাণিত। পাঠান গ্যাংস্টার করিম লালা এবং দক্ষিণভারতীয় মাফিয়া বরদারাজন মুদালিয়ারের সাথে একটি অঘোষিত চুক্তি করে হাজী মাস্তান রক্তপাত এড়িয়ে পুরো বোম্বাই শহরকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে রাজত্ব চালিয়েছিলেন।

মাস্তানের স্বতন্ত্র অপরাধ নীতি: সহিংসতাহীন 'ব্যবসায়ী' মানসিকতা

বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের পরবর্তী সময়ের ডনদের (যেমন: দাউদ ইব্রাহিম, ছোট রাজন, অরুণ গাউলি) সাথে হাজী মাস্তানের কাজের স্টাইলে ছিল রাত-দিনের পার্থক্য। তামিলনাড়ুর কুড্ডালোর থেকে বোম্বেতে এসে ডকইয়ার্ডে কুলির কাজ শুরু করা মাস্তান হায়দার মির্জা খুব দ্রুতই সমুদ্রপথের চোরাচালান ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ধরে ফেলেন। হাজী মাস্তান কখনো নিজেকে অপরাধী বা গ্যাংস্টার মনে করতেন না; তিনি নিজেকে বলতেন একজন 'পণ্য সমন্বয়কারী' (Goods Coordinator) বা মুক্ত ব্যবসায়ী। তৎকালীন ভারতে বিদেশি পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক ও কড়াকড়ির সুযোগ নিয়ে তিনি সোনা, রূপা এবং বিলাসবহুল ইলেকট্রনিক পণ্য চোরাচালানের এক বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

অস্ত্রহীন ও রক্তপাতহীন সাম্রাজ্য

হাজী মাস্তানের জীবনকালের সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো তিনি তাঁর পুরো জীবনে কখনো নিজের হাতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র স্পর্শ করেননি। তিনি কখনো কাউকে সরাসরি গুলি করেননি, কাউকে হত্যা করার নির্দেশ দেননি এবং কোনো সহিংস গ্যাংওয়ারে জড়াননি। তাঁর প্রধান দর্শন ছিল: "সহিংসতা ও রক্তপাত ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর।" তিনি বিশ্বাস করতেন, যে সমস্যা অর্থ ও বুদ্ধি দিয়ে সমাধান করা যায়, সেখানে বন্দুকের গুলির কোনো প্রয়োজন নেই। নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র বাহিনী পোষার বদলে প্রতিপক্ষকে অর্থ দিয়ে শান্ত রাখা কিংবা সমঝোতায় আসাই ছিল তাঁর প্রধান কৌশল।

পুলিশ, কাস্টমস ও রাজনৈতিক প্রভাব

হাজী মাস্তান তাঁর পাচার ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালানোর জন্য পুরো বোম্বে পুলিশ প্রশাসন, শুল্ক বিভাগ (Customs) এবং তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদদের মাসোহারা বা ঘুষের জালে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন। কাস্টমসের শীর্ষ কর্মকর্তারা মাস্তানের কাছ থেকে রেগুলার পে-চেক পেতেন, যার ফলে মাস্তানের সোনার জাহাজ বন্দরে নোঙর করলে কাস্টমস কর্মকর্তারা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রাখতেন। রাজনীতিবিদদের বিপুল অঙ্কের নির্বাচনী তহবিল জোগানোর বিনিময়ে তিনি প্রশাসনিক আইনি সুরক্ষা পেতেন। পাশাপাশি বোম্বের গরিব-দুঃখীদের অর্থ সাহায্য করে তিনি নিজের এক 'রবিন হুড' ভাবমূর্তি তৈরি করেন, যা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে এক অনন্য সামাজিক সুরক্ষা দিয়েছিল।

ত্রিভুজ চুক্তি: করিম লালা ও বরদারাজন মুদালিয়ার

১৯৭০-এর দশকে বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তিনজন ডনের উদ্ভব ঘটে দক্ষিণ বোম্বাই ও ডকইয়ার্ডের মালিক হাজী মাস্তান, পাঠান গ্যাংয়ের প্রধান করিম লালা, এবং মাতুঙ্গা ও তামিল অধ্যুষিত এলাকার প্রধান বরদারাজন মুদালিয়ার। এই তিন ডনের মধ্যে যেন কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ না হয়, সে জন্য হাজী মাস্তান উদ্যোগ নিয়ে বোম্বাই শহরকে তিনটি ভাগে ভাগ করে দেন। তাঁদের মধ্যে লিখিত ও মৌখিক চুক্তি হয় যে কেউ কারও এলাকায় হস্তক্ষেপ করবে না এবং একে অপরের ব্যবসায় সহায়তা করবে। এই 'ত্রিভুজ জোট' প্রায় দুই দশক বোম্বেতে নিরঙ্কুশ শান্তি ও অপরাধের আধিপত্য বজায় রেখেছিল।

লাইফস্টাইল ও গ্ল্যামার: রাজকীয় সাদা মার্সিডিজ ও সিল্কের পোশাক

হাজী মাস্তানের ব্যক্তিগত জীবন ও লাইফস্টাইল ছিল চরম বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে তিনি ছিলেন অঢেল সম্পদের মালিক, অন্যদিকে তাঁর বেশভূষা ও চালচলন ছিল অত্যন্ত সচেতন ও আকর্ষণীয়।

আইকনিক পোশাক ও ফ্যাশন সেন্স

হাজী মাস্তান সর্বদা ধবধবে খাঁটি সাদা সিল্কের কুর্তা-পায়জামা অথবা সাদা স্যুট পরিধান করতেন। তাঁর পায়ের জুতোটি হতো খাঁটি চামড়ার তৈরি সাদা রঙের। হাতে সবসময় শোভা পেত দামী 'বেনসন অ্যান্ড হেজেস' (Benson & Hedges) সিগারেটের প্যাকেট। তাঁর হাঁটাচলা ও কথা বলার মধ্যে ছিল এক ধরণের অদ্ভুত আভিজাত্য ও শান্ত সৌম্য ভাব।

রাজকীয় মার্সিডিজ ও পেডার রোডের প্রাসাদ

তিনি চলাচলের জন্য ব্যবহার করতেন একটি বিশেষ আমদানিকৃত সাদা রঙের মার্সিডিজ-বেঞ্জ গাড়ি। তৎকালীন বোম্বেতে সাদা মার্সিডিজ মানেই ছিল হাজী মাস্তানের উপস্থিতি। দক্ষিণ বোম্বাইয়ের অভিজাত এলাকা পেডার রোডে (Pedder Road) তিনি তৈরি করেছিলেন তাঁর বিশাল বাংলো, যার ছাদ থেকে পুরো সমুদ্র দেখা যেত।

তবে এত অঢেল সম্পদের মাঝেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো মদ্যপান করতেন না এবং নিজের শোবার ঘরে অত্যন্ত সাদামাটা একটি তোশকে ঘুমাতে পছন্দ করতেন, যা তাঁর শৈশবের দারিদ্র্যের কথা মনে করিয়ে দিত।

বলিউডের সাথে সম্পর্ক: প্রথম মাফিয়া ফাইনান্সার ও অমিতাভ বচ্চনের 'দিওয়ার'

হাজী মাস্তানই ছিলেন বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রথম ব্যক্তি যিনি হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প বা বলিউডে কাঁচা টাকার প্রবাহ ঘটান। সত্তরের দশকে ব্যাংকগুলো চলচ্চিত্রে অর্থ অর্থায়ন করত না, ফলে প্রযোজকদের চড়া সুদে টাকা নিতে হতো। মাস্তান এই সুযোগটি গ্রহণ করেন।

বলিউড তারকাদের সাথে সখ্যতা

হাজী মাস্তান রিয়েল এস্টেট ও চলচ্চিত্র অর্থায়নে (Film Financing) কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। তৎকালীন হিন্দি সিনেমার শীর্ষ তারকা দিলীপ কুমার, দেব আনন্দ, রাজ কাপুর, এবং সুনীল দত্ত-র সাথে তাঁর অত্যন্ত গভীর ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

তিনি প্রায়শই তাঁর পেডার রোডের বাংলোতে এবং মুম্বাইয়ের পাঁচ তারকা হোটেলে বলিউড তারকাদের নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ পার্টির আয়োজন করতেন। মাস্তান নিজে 'চৌকিদার' (Chowkidar) সহ বেশ কয়েকটি হিন্দি চলচ্চিত্র সরাসরি প্রযোজনা ও ফাইনান্স করেছিলেন। তিনি অভিনেত্রী সোনা-কে বিয়েও করেছিলেন, কারণ তাঁর চেহারা তৎকালীন নামজাদা অভিনেত্রী মধুবালার মতো ছিল।

কালজয়ী 'দিওয়ার' (Deewaar) সিনেমা ও অমিতাভ বচ্চন

১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং যশ চোপড়া পরিচালিত কালজয়ী হিন্দি চলচ্চিত্র 'দিওয়ার' (Deewaar) ছিল সম্পূর্ণভাবে হাজী মাস্তানের জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন প্রখ্যাত সেলিম-জাভেদ (সেলিম খান ও জাভেদ আখতার) জুটি।

বিজয়ের চরিত্র: চলচ্চিত্রে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত 'বিজয়' চরিত্রটি ছিল ডকইয়ার্ডের কুলি থেকে মাফিয়া ডন হয়ে ওঠা হাজী মাস্তানের জীবন কাহিনীর হুবহু প্রতিফলন।

অমিতাভ বচ্চনের প্রস্তুতি: চরিত্রটিতে অভিনয়ের পূর্বে অমিতাভ বচ্চন নিজে হাজী মাস্তানের সাথে একাধিকবার দেখা করেন। মাস্তানের হাঁটার স্টাইল, সিগারেট ধরার ধরন এবং কথা বলার ধীরগতি পর্যবেক্ষণ করে অমিতাভ বচ্চন নিজেকে স্ক্রিনে 'অ্যাংরি ইয়ং ম্যান' হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। চলচ্চিত্রটি বোম্বাইয়ের সিনেমা হলগুলোতে ইতিহাস সৃষ্টি করে।

সামাজিক রবিন হুড ভাবমূর্তি: গরিবের সাহায্যকারী মাস্তান

হাজী মাস্তান নিজেকে কেবল একজন মাফিয়া ডনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তিনি বোম্বাইয়ের সাধারণ মানুষের কাছে নিজেকে এক অলৌকিক 'রবিন হুড' হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

দানশীলতা ও জুমার দিনের সামাজিক সাহায্য

প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর হাজী মাস্তানের বাংলোর সামনে এবং ক্রফোর্ড মার্কেটের রাস্তায় হাজার হাজার দরিদ্র ও বস্তিবাসী মানুষ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকত। মাস্তান নিজে হাত খুলে তাঁদের টাকা, খাবার, পোশাক এবং চিকিৎসার খরচ দান করতেন।

বোম্বাইয়ের ধারাবি বস্তি, নাগপাড়া এবং দাদরের দরিদ্র তামিল ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর যেকোনো বিপদে মেয়ের বিয়ে, হাসপাতালের বিল কিংবা মামলা-মোকদ্দমার খরচ হাজী মাস্তান ছিলেন তাঁদের শেষ ভরসাস্থল।

জনমতের ঢাল

এই দানশীলতার পেছনে মাস্তানের কৌশলগত বুদ্ধিও কাজ করেছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া এই 'রবিন হুড' ভাবমূর্তি তাঁকে পুলিশ ও সরকারের হাত থেকে বাঁচানোর বড় ঢাল হিসেবে কাজ করত। যখনই পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করতে আসত, হাজার হাজার সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে পুলিশের গাড়ি ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করত।

জরুরি অবস্থা, গ্রেফতার ও অপরাধ জগত ত্যাগ (১৯৭৫–১৯৭৭)

১৯৭৫ সালে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে অভ্যন্তরীণ 'জরুরি অবস্থা' (Emergency) জারি করেন। এর ফলে মাফিয়া ও চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে ভারত সরকার এক নজিরবিহীন দমন অভিযান শুরু করে।

মিজোরা (MISA) আইনে বন্দি

জরুরি অবস্থা জারির পরপরই ভারত সরকার বিতর্কিত 'কন্সারভেশন অফ ফরেন এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড প্রিভেনশন অফ স্মাগলিং অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাক্ট' (COFEPOSA) এবং 'মেইনটেনেন্স অফ ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট' (MISA/মিজোরা) আইনের অধীনে হাজী মাস্তান এবং তাঁর সহযোগী সুকুর নারায়ণ বাখিয়াকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়।

রাজনৈতিক বন্দি ও সুফি আদর্শের প্রভাব

কারাগারে থাকাকালীন সময়টি মাস্তানের জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। কারাদণ্ডকালে তিনি ভারতের প্রখ্যাত সমাজসেবক ও রাজনৈতিক নেতা লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ (JP) এবং বেশ কয়েকজন সুফি সাধকের সংস্পর্শে আসেন।

জয়প্রকাশ নারায়ণের অহিংস আন্দোলন এবং সামাজিক সংস্কারের আদর্শে মাস্তান গভীরভাব প্রদ্বিধিত হন। তিনি অনুশোচনা প্রকাশ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে কারামুক্তির পর তিনি আর কখনো কোনো ধরনের অবৈধ বা চোরাচালান ব্যবসার সাথে যুক্ত হবেন না।

১৯৭৭ সালের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ ও ঘোষণা

১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার পর মাস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পান। জেল থেকে বের হয়েই তিনি একটি জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন যে তিনি তাঁর সমস্ত চোরাচালান ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছেন এবং নিজের অবশিষ্টাংশ জীবন সমাজসেবা ও মূলধারার রাজনীতিতে উৎসর্গ করবেন। তিনি সত্যি সত্যিই তাঁর প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আর কখনো কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াননি।

রাজনৈতিক অধ্যায়: দলিত-মুসলিম ঐক্য ও সমাজসেবা (১৯৮৪–১৯৯৪)

অপরাধ জগত থেকে পুরোপুরি অবসর নেওয়ার পর হাজী মাস্তান অনুধাবন করেন যে ভারতে দলিত (নিম্নবর্ণের হিন্দু) এবং মুসলিম সম্প্রদায় সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তিনি এই দুই শক্তিকে একত্রিত করার উদ্যোগ নেন।

দলিত-মুসলিম সুরক্ষা মহাজোট গঠন: ১৯৮৪ সালে হাজী মাস্তান প্রখ্যাত দলিত নেতা হরেন সর্বজ্ঞের সাথে হাত মিলিয়ে গঠন করেন 'দলিত মুসলিম সুরোক্ষা মহাজোট' (Dalit Muslim Suraksha Maha Sangh)। এটি ছিল ভারতে দলিত ও মুসলিমদের অধিকার নিয়ে গঠিত প্রথম দিকের একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।

ভারতীয় মাইনোরিটি সুরক্ষা মহাসংঘ: পরবর্তীতে এই জোটটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়, যার নাম দেওয়া হয় 'ভারতীয় মাইনোরিটি সুরক্ষা মহাসংঘ' (Bharatiya Minority Suraksha Mahasangh)। মাস্তান এই দলের সভাপতি হিসেবে বোম্বাই এবং মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে সভা-সমাবেশ করেন।

তিনি বস্তিবাসী মানুষের পুনর্বাসন, বিনামূল্যে চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন, মাদরাসা ও স্কুলের উন্নয়ন এবং দাঙ্গাপীড়িত মানুষকে পুনর্বাসনে নিজের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে যান।

জীবনের শেষ অধ্যায় ও স্বাভাবিক প্রস্থান (১৯৯৪)

বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেশিরভাগ ডনদের পরিণতি হয়েছিল অত্যন্ত ভয়ংকর কাউকে প্রতিপক্ষ গ্যাংয়ের গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়েছে, কাউকে পুলিশের এনকাউন্টারে মরতে হয়েছে, আবার কাউকে চিরকালের জন্য দেশ ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। কিন্তু হাজী মাস্তানের পরিণতি হয়েছিল এসবের থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

৯ মে, ১৯৯৪ - স্বাভাবিক মৃত্যু: ১৯৯৪ সালের ৯ মে, ৬৮ বছর বয়সে বোম্বাইয়ের বিখ্যাত ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে (Breach Candy Hospital) চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাজী মাস্তান শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

এক ঐতিহাসিক বিদায়: তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে দক্ষিণ বোম্বাইয়ের ক্রফোর্ড মার্কেট, নাগপাড়া ও ধারাবি এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। হাজার হাজার মানুষ যার মধ্যে ছিলেন বস্তিবাসী, রাজনীতিবিদ, বলিউড কলাকুশলী এবং সাধারণ নাগরিক তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁকে দক্ষিণ বোম্বাইয়ের বড় কবরস্থানে পূর্ণ সম্মানের সাথে দাফন করা হয়।

ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্যানভাসে হাজী মাস্তানের স্থান

হাজী মাস্তান কেবল একজন অপরাধী ছিলেন না; তিনি ছিলেন তৎকালীন ভারতীয় অর্থনীতি, শুল্ক নীতির ত্রুটি এবং সামাজিক বৈষম্যের এক জটিল ফসল।

অপরাধের করপোরেট রূপ: তিনি বোম্বেতে অস্ত্রবিহীন অপরাধের সংস্কৃতি চালু করেছিলেন, যা পরবর্তীতে দাউদ ইব্রাহিমের মতো নৃশংস সন্ত্রাসীদের যুগে এসে রক্তাক্ত সহিংসতায় রূপ নেয়।

পপ কালচারের অংশ: হিন্দি সিনেমা ও বিনোদন জগতে মাস্তানের প্রভাব আজও অমলিন। 'দিওয়ার' থেকে শুরু করে অজয় দেবগন অভিনীত 'ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই' (Once Upon a Time in Mumbaai) চলচ্চিত্রেও হাজী মাস্তানের চরিত্রটি বারবার উদযাপিত হয়েছে।

প্রত্যাবর্তনের দৃষ্টান্ত: অপরাধের কালো জগত থেকে বের হয়ে মূলধারার রাজনীতি ও সমাজসেবায় ফিরে এসে কীভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যায়, হাজী মাস্তানের জীবনের শেষ দুই দশক তার এক বিরল ও প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

এক নজরে হাজী মাস্তানের জীবন ও অপরাধ সাম্রাজ্যের বিস্তারিত

মূল বিষয় / সূচক

ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্য তথ্য

পূর্ণ নাম

মাস্তান হায়দার মির্জা (জনপ্রিয় নাম: হাজী মাস্তান)

জীবনকাল

১ মার্চ, ১৯২৬ – ৯ মে, ১৯৯৪ (বয়স: ৬৮ বছর)

জন্মস্থান

পানরুতি, কুড্ডালোর জেলা, তামিলনাড়ু, ভারত।

প্রধান কার্যক্ষেত্র

দক্ষিণ বোম্বে, বোম্বে পোর্ট ট্রাস্ট (ডকইয়ার্ড), ক্রফোর্ড মার্কেট ও দাদর।

অপরাধের ধরণ

সোনা, দুষ্প্রাপ্য ইলেকট্রনিক্স, ঘড়ি ও রেয়ন কাপড় পাচার (Smuggling)।

প্রধান সহযোগী

সুকুর নারায়ণ বাখিয়া (গুজরাটের শীর্ষ পাচারকারী) ও করিম লালা।

আইকন ট্রেডমার্ক / স্টাইল

খাঁটি সাদা সিল্কের পোশাক, সাদা জুতো, বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিগারেট, সাদা মার্সিডিজ।

বলিউডে প্রভাব

প্রথম ডন যিনি ছবি ফাইনান্স করেন; 'দিওয়ার' (১৯৭৫) সিনেমা ও সালতানাত প্রতিষ্ঠা।

রাজনৈতিক দল

দলিত মুসলিম সুরক্ষা মহাজোট (পরে: ভারতীয় মাইনোরিটি সুরক্ষা মহাসংঘ)।

মৃত্যুর কারণ

হৃদরোগ (হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে বোম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে মৃত্যু)।

বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে মাস্তান হায়দার মির্জা ওরফে 'হাজী মাস্তান' কেবল একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের ভারতের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক জটিল রূপকার। ডকইয়ার্ডের সামান্য কুলি থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ সাম্রাজ্যের শীর্ষে আরোহণের নেপথ্যে ছিল তাঁর সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশল, সুসংগঠিত কাজের ধারা এবং অনন্য নেটওয়ার্কিং দক্ষতা।

হাজী মাস্তানের জীবন ও তৎকালীন বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের যে গভীর ও অজানা অধ্যায়গুলো ইতিহাস ও পপ কালচারে তুলনামূলক কম আলোচিত হয়েছে, যেমন তাঁর পাচার অপারেশনের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত প্রক্রিয়া, বোম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের 'ত্রিমূর্তি' (Triumvirate) শক্তির ভারসাম্য, অভিনেত্রী সোনার সাথে তাঁর আলোচিত প্রেমকাহিনি, চলচ্চিত্র জগতে তাঁর প্রভাবের গভীরে থাকা বাস্তবতা এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের উপস্থিতিতে ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ।

আন্তর্জাতিক সোনা পাচার ও 'ল্যান্ডিং' অপারেশনের গোপন কৌশল

১৯sixties ও seventies-এ ভারত সরকারের অত্যন্ত কঠোর আমদানি নীতি (Customs Act, 1962) এবং স্বর্ণ নিয়ন্ত্রণ আইন (Gold Control Act, 1968)-এর কারণে ভারতে সোনার আইনি আমদানি প্রায় অসম্ভব ছিল। দেশে সোনার তীব্র চাহিদা এবং উচ্চ মূল্যের কারণে দুবাই ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সোনা পাচারের এক সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন হাজী মাস্তান।

'ধো' (Dhows) ও জলপথের কৌশল

দুবাই, জেবেল আলী এবং কুয়েত থেকে ৯৯৯.৯ বিশুদ্ধতার সোনার বিস্কুট কাঠের তৈরি মাঝারি আকারের বিশেষ ধরনের বোট বা 'ধো' (Dhows)-তে বোঝাই করা হতো। এই বোটগুলো আরব সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমা অতিক্রম করে ভারতের পশ্চিম উপকূলে পৌঁছাত।

মোড়কীকরণ: সোনার বিস্কুটগুলোকে ওয়াটারপ্রুফ কার্বন পেপার এবং ভারী পাটের বস্তায় মোড়ানো হতো, যাতে সমুদ্রের পানিতে তা নষ্ট না হয় এবং পানিতে সহজে ডুবিয়ে রাখা যায়।

কোড সিগন্যালিং: মাঝরাত্রে বোম্বাই উপকূলের কাছে এলে পাচারকারীরা টর্চলাইটের বিশেষ 'কোড সিগন্যাল' (যেমন: পরপর তিনবার আলো জ্বালানো ও নেভানো) দিত। সংকেত পাওয়ার পর উপকূল থেকে স্থানীয় মৎস্যজীবীদের (কোলি সম্প্রদায়) ছোট ছোট নৌকা গিয়ে সোনার বস্তাগুলো তুলে নিত।

উপকূলীয় ল্যান্ডিং স্পট ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনা

মাস্তান মূলত বোম্বাই শহরের ভেতর মালামাল নামাতেন না, কারণ সেখানে নজরদারি ছিল বেশি। তিনি ব্যবহার করতেন বোম্বাইয়ের চারপাশের নির্জন উপকূলীয় এলাকা:

প্রধান ঘাঁটি: দক্ষিণ বোম্বাইয়ের উল্টোদিকে আলিবাগ (Alibaug), উরান (Uran), ভাসাই (Bassein) এবং দামান ও দিউ

ঘুষের নেটওয়ার্ক: মাস্তানের প্রতিনিধিরা ল্যান্ডিংয়ের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ স্টেশন, কাস্টমস চৌকি এবং কোস্টগার্ড কর্মকর্তাদের কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের 'তোহফা' বা ঘুষ পৌঁছে দিতেন। কাস্টমসের টহল নৌযানগুলো ল্যান্ডিংয়ের সময় অন্য রুটে অবস্থান করত।

বোম্বাইয়ের 'ত্রিমূর্তি' (Triumvirate) ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের শক্তির ভারসাম্য

সত্তরের দশকে বোম্বাই শহরে কোনো একক গ্যাংস্টারের রাজত্ব ছিল না। হাজী মাস্তান উপলব্ধি করেছিলেন যে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পুলিশ সুযোগ নেবে। তাই তিনি তৎকালীন অপর দুই শীর্ষ মাফিয়া ডনের সাথে এক ঐতিহাসিক চুক্তি করেন, যা আন্ডারওয়ার্ল্ডে 'দ্য বিগ থ্রি' বা 'ত্রিমূর্তি' নামে পরিচিত।

করিম লালা ও পঠান গ্যাং

আফগানিস্তান থেকে আসা আব্দুল করিম শের খান ওরফে করিম লালা ছিলেন আফগান পঠান গ্যাংয়ের প্রধান। তাঁর শক্তিকেন্দ্র ছিল দক্ষিণ বোম্বাইয়ের ডোংরি, ভিন্ডি বাজার এবং নাগপাড়া। করিম লালার কাছে ছিল অসীম শারীরিক শক্তি ও অস্ত্রধারী পঠান যোদ্ধা। মাস্তান পাচার ব্যবসা চালাতেন, আর করিম লালা মাস্তানের সোনা পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন এবং প্রতিপক্ষকে ঠান্ডা রাখতেন।

বরদারাজন মুদালিয়ার (বরধা ভাই)

তামিলনাড়ু থেকে আসা বরদারাজন মুদালিয়ার নিয়ন্ত্রণ করতেন ধারাবি, মাতুঙ্গা এবং সায়ন এলাকা। তিনি মূলত চোরাই মদ (Hooch), জুয়া এবং বন্দর থেকে শুল্কবিহীন সাধারণ পণ্য চুরির সিন্ডিকেট চালাতেন। দক্ষিণ ভারতীয় অভিবাসীদের মধ্যে তাঁর ছিল বিশাল একছত্র প্রভাব।

হাজী মাস্তান এই দুই ডনকে এক টেবিলে বসিয়ে পুরো বোম্বাই শহরকে তাদের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ করে ভাগ করে দিয়েছিলেন। ১৯৮০-এর দশকের সূচনালগ্নে দাউদ ইব্রাহিম ও সাবির কাসকরের উত্থানের পূর্ব পর্যন্ত এই ত্রিভুজ জোট বোম্বাইয়ে এক অভূতপূর্ব রক্তাক্তহীন অপরাধ রাজত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

ব্যক্তিগত জীবন: মধুবালা-প্রীতি, সোনা এবং পারিবারিক ট্র্যাজেডি

হাজী মাস্তানের ব্যক্তিগত জীবন ছিল রূপালী পর্দার যেকোনো ড্রামার চেয়েও বেশি চমকপ্রদ। তাঁর জীবনের সবচেয়ে রোমান্টিক এবং আলোচিত অধ্যায় ছিল হিন্দি সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেত্রী মধুবালা-র প্রতি তাঁর অসীম অনুরাগ।

মধুবালা ও সোনা (Sona)

হাজী মাস্তান মধুবালার অভিনয়ের অন্ধ ভক্ত ছিলেন। ১৯৬৯ সালে মধুবালার অকালমৃত্যুর পর মাস্তান ভীষণভাবে ভেঙে পড়েন। এর কিছু বছর পর আন্ডারওয়ার্ল্ড ও চলচ্চিত্র ফাইনান্সিংয়ের সূত্রে মাস্তানের সাথে পরিচয় হয় সোনা (Sona / Shahjahan) নামে এক উদীয়মান অভিনেত্রীর, যাঁর মুখের আদল ও হাসি অবিকল মধুবালার মতো ছিল।

মাস্তান সোনার প্রেমে পড়েন এবং তাঁকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সোনাকে প্রধান নায়িকা করে 'চৌকিদার' (Chowkidar) এবং 'নয়ো জওয়ান' সহ কয়েকটি হিন্দি সিনেমা ফাইনান্স করেন। পরবর্তীতে তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে সোনার সাথে মাস্তানের শেষ জীবন খুব একটা সুখের হয়নি; সম্পত্তি ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

পুত্র সুন্দর শেখর (কামলেশ)

মাস্তানের কোনো আপন পুত্রসন্তান ছিল না, কেবল কন্যা সন্তান ছিল। পরবর্তীতে তিনি কামলেশ নামের এক অনাথ হিন্দু বালককে দত্তক নেন এবং পরম স্নেহে মানুষ করেন। ধর্মান্তরিত হয়ে বা বাবার প্রতি শ্রদ্ধায় তিনি নিজের নাম রাখেন সুন্দর শেখর। বর্তমানে সুন্দর শেখর হাজী মাস্তানের প্রতিষ্ঠিত 'ভারতীয় মাইনোরিটি সুরক্ষা মহাসংঘ' দলের প্রধান হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন।

সিনেমা জগত ও পপ কালচারে হাজী মাস্তানের পূর্ণাঙ্গ পোস্টমর্টেম

হাজী মাস্তান কেবল হিন্দি সিনেমা ফাইনান্স করেননি; তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রের গতিপথ ও খলনায়কের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে বলিউডে জন্ম নেয় 'এন্টি-হিরো' বা অপরাধী নায়কের সংস্কৃতি।

'দিওয়ার' (১৯৭৫) ও অমিতাভ বচ্চনের ৭৮৬ ব্যাজ

যশ চোপড়া পরিচালিত এবং সেলিম-জাভেদ লিখিত 'দিওয়ার' ছবিতে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত 'বিজয়' চরিত্রটি সরাসরি হাজী মাস্তানের জীবন থেকে নেওয়া:

কুলি নম্বর ৭৮৬: ছবিতে বিজয় ডকইয়ার্ডে কুলি হিসেবে কাজ করার সময় বিল্লা বা ব্যাজ নম্বর '৭৮৬' ব্যবহার করে। বাস্তব জীবনে হাজী মাস্তান বোম্বে পোর্ট ট্রাস্টে কাজ করার সময় ইসলামি পবিত্র সংখ্যা ৭৮৬-কে অত্যন্ত অলৌকিক মনে করতেন।

সাদা পোশাক ও মার্সিডিজ: ছবিতে বিজয়ের সাদা পোশাক, হাতে সিগারেট ও মার্সিডিজ গাড়িতে চড়ার দৃশ্যগুলো মাস্তানের বাস্তব জীবনের হুবহু রূপায়ন ছিল।

'ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই' (২০১০)

মিলন লুথরিয়া পরিচালিত ব্লকব্লাস্টার ছবি 'ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই'-এ অজয় দেবগন অভিনীত 'সুলতান মির্জা' চরিত্রটি হাজী মাস্তানের জীবনের ওপর নির্মিত সবচেয়ে নিখুঁত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মূল বার্তা: ছবিতে দেখানো হয় কীভাবে সুলতান মির্জা (হাজী মাস্তান) অহিংস উপায়ে কেবল পাচার ব্যবসা চালাতেন এবং গরিবদের দান করতেন, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মে শোয়েব খান (দাউদ ইব্রাহিম)-এর আগমনের পর সেই আন্ডারওয়ার্ল্ড কীভাবে রক্তপাত, বোমা হামলা ও মাদকের ভয়ংকর জগতে রূপান্তরিত হয়।

১৯৭৭ সালের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ ও জয়প্রকাশ নারায়ণের প্রভাব

১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময় যখন মাস্তানকে 'মিজোরা' (MISA) আইনে গ্রেফতার করে দিল্লির তিহার জেলে পাঠানো হয়, তখন তাঁর জীবনে এক পরম আধ্যাত্মিক পরিবর্তন আসে। জেলে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয় ভারতের বর্ষীয়ান গান্ধীবাদী নেতা লোকনায়ক জয়প্রকাশ নারায়ণ (JP)-এর।

১৭ এপ্রিল, ১৯৭৭: নয়াদিল্লির শপথ গ্রহণ

জেল থেকে মুক্তির পর জয়প্রকাশ নারায়ণের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৭ এপ্রিল, ১৯৭৭ সালে নয়াদিল্লির গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন-এ এক নজিরবিহীন জনসভার আয়োজন করা হয়।

প্রতিজ্ঞা: বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে হাজী মাস্তান, সুকুর নারায়ণ বাখিয়া এবং তৎকালীন ভারতের প্রধান ৪২ জন সোনা পাচারকারী পবিত্র কুরআন ও গীতা ছুঁয়ে শপথ নেন যে তারা আর কখনো চোরাচালান বা কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবেন না।

সম্পত্তি হস্তান্তর: তারা তাদের কাছে থাকা অবৈধ চোরাচালানের মাধ্যম ও নেটওয়ার্ক নিষ্ক্রিয় করার আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ জগতে কোনো ডনের এমন প্রকাশ্যে আত্মসমর্পণ ও সাধু জীবনে ফিরে আসার ঘটনা বিরল।

রাজনীতি, দলিত-মুসলিম ঐক্য ও 'ভারতীয় মাইনোরিটি সুরক্ষা মহাসংঘ'

অপরাধ জগত থেকে বিদায় নেওয়ার পর হাজী মাস্তান অনুধাবন করেন যে ভারত ও বোম্বাই শহরের রাজনীতিতে অনগ্রসর দলিত এবং সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে ব্যবহার করা হলেও তাদের কোনো প্রকৃত নেতৃত্ব নেই।

দলিত-মুসলিম সামাজিক জোট (BMSM)

১৯৮৪ সালে তিনি গঠন করেন 'দলিত মুসলিম সুরোক্ষা মহাজোট', যা পরবর্তীতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল 'ভারতীয় মাইনোরিটি সুরক্ষা মহাসংঘ' (Bharatiya Minority Suraksha Mahasangh - BMSM)-এ রূপ নেয়।

মূল উদ্দেশ্য: বোম্বাইয়ের ধারাভি, নাগপাড়া, গোভান্ডি ও কুরলার মতো বিশাল বস্তি এলাকার নিম্নবর্ণের হিন্দু (দলিত) ও মুসলিমদের শিক্ষার অধিকার, কাজের সুযোগ এবং পুলিশি অত্যাচার থেকে আইনি সুরক্ষা প্রদান করা।

১৯৯২-১৯৯৩ সালের বোম্বাই দাঙ্গা ও মাস্তানের ভূমিকা

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর ১৯৯২ ও ১৯৯৩ সালে বোম্বাই শহরে যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল, সে সময় হাজী মাস্তান এক অনন্য ভূমিকা পালন করেন। নিজের শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বে তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় অধ্যুষিত দাঙ্গাপীড়িত এলাকায় ঘুরে ঘুরে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন এবং শান্তি কমিটি গঠন করেন।

তৎকালীন সময়ের নতুন সহিংস ডনদের (যেমন দাউদ ইব্রাহিম বা গ্যাংস্টাররা) প্রতিক্রিয়াশীল রক্তক্ষয়ী অবস্থান থেকে নিজেকে দূরে রেখে তিনি অহিংস উপায়ে বোম্বাইয়ের সাধারণ মানুষকে পুনর্বাসনে কাজ করেছিলেন।

হাজী মাস্তানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও বিবর্তন

হাজী মাস্তান হায়দার মির্জার জীবনকে একক কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন একাধারে ভারতীয় কর ব্যবস্থার গলদের সুযোগ নেওয়া এক ধুরন্ধর পাচারকারী, অন্যদিকে তিনি ছিলেন তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার শিকার এক প্রান্তিক মানুষ, যিনি অর্জিত অর্থ দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে 'রবিন হুড' হিসেবে স্থান করে নিয়েছিলেন।

স্মৃতির পাতায় এক সাদা স্যুটের কিংবদন্তি

হাজী মাস্তানের জীবন কাহিনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাস নয়; বরং এটি এক প্রান্তিক যুবকের চরম দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে নিজের বুদ্ধিমত্তা ও প্রভাবে একটি বিশালাকার নগরীকে শাসন করার মহাকাব্য।

তিনি অপরাধের পথে হেঁটেছিলেন ঠিকই, কিন্তু রক্তপাত এড়িয়ে চলেছিলেন। তিনি অঢেল সম্পদ উপার্জন করেছিলেন, কিন্তু তার বড় একটি অংশ গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা জীবনের ভুল বুঝতে পেরে তিনি সেই অন্ধকার জগতকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে সমাজসেবার আলোয় ফিরে এসেছিলেন।

দক্ষিণ বোম্বাইয়ের বাতাস থেকে আজ হয়তো পাচারকারীদের সেই পুরনো জাহাজগুলো হারিয়ে গেছে, পেডার রোডের সেই সাদা মার্সিডিজটিও আর চোখে পড়ে না; কিন্তু বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসে সাদা সিল্কের স্যুট পরা, মুখে মিদু হাসি ও হাতে সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা 'হাজী মাস্তান' নামের সেই রবিন হুড ডনের নাম চিরকাল এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.