হিউ জ্যাকম্যানের সংগ্রামী জীবন - 'বাজে ক্লাউন' থেকে হলিউডের 'উলভারিন'

হিউ জ্যাকম্যানের সংগ্রামী জীবন - 'বাজে ক্লাউন' থেকে হলিউডের 'উলভারিন'

হলিউডের রূপালী জগতের দিকে যখন আমরা তাকাই, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোটি কোটি ডলারের ঝলমলে জীবন, লাল গালিচায় তারকাদের হাঁটাচলা, আর বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের উন্মাদের মতো ভালোবাসা। কিন্তু এই জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের অন্তরালে ঢাকা পড়ে থাকে এমন কিছু গল্প, যা সাধারণ যেকোনো মানুষের সংগ্রামকেও হার মানায়। আমরা যাদের আজ 'সুপারস্টার' বলে মাথায় তুলে রাখি, তাঁদের অনেকেই কিন্তু এক রাতে তারকা হয়ে ওঠেননি। তাঁদের সাফল্যের অট্টালিকাটি গড়ে উঠেছে বহু বছরের ব্যর্থতা, অপমান, দারিদ্র্য এবং কঠোর পরিশ্রমের ইটের ওপর।

এমনই এক মহাকাব্যিক রূপকথার জ্যান্ত উদাহরণ হলেন অস্ট্রেলীয় অভিনেতা হিউ জ্যাকম্যান

হলিউড বলতেই যাদের কথা প্রথম সারিতে আসে যার এক হুঙ্কারে প্রেক্ষাগৃহের কোটি দর্শক শিহরিত হয়ে ওঠে, যিনি মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সে 'আডামান্টিয়াম' ধাতুর ধারালো নখ বের করে 'উলভারিন' (Wolverine) রূপে কাঁপিয়েছেন রূপালী পর্দা সেই হিউ জ্যাকম্যানের অতীত জীবন কিন্তু এত রোমাঞ্চকর বা সুখকর ছিল না। বিশ্বজুড়ে অসামান্য তারকাখ্যাতি পাওয়ার আগে জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁকে করতে হয়েছে নানা ধরনের অদ্ভুত, বিচিত্র ও পরিশ্রমের কাজ।

এর মধ্যে সবচেয়ে মজার, আশ্চর্যজনক এবং অনুপ্রেরণাদায়ক তথ্যটি হলো: একসময় তিনি শিশুদের জন্মদিনের পার্টিতে জোকার বা ক্লাউন সেজে পারফর্ম করতেন! আজ যে মানুষটির সিনেমা দেখার জন্য বক্স অফিসে শত শত মিলিয়ন ডলারের টিকিট বিক্রি হয়, সেই মানুষটিই একদিন মাত্র ৫০ ডলারের বিনিময়ে বাচ্চাদের হাসানোর চেষ্টা করে কপালে জুটিয়েছিলেন চরম অপমান।

সিডনির সাধারণ তরুণ থেকে জীবনের কঠোর সংগ্রাম

হিউ মাইকেল জ্যাকম্যান ১৯৬৮ সালের ১২ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা-মা দুজনেই ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক, যারা ‘টেন পাউন্ড পমস’ স্কিমের অধীনে যুক্তরাজ্য থেকে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসিত হয়েছিলেন। কিন্তু হিউয়ের বয়স যখন মাত্র আট বছর, তখন তাঁর পরিবারে এক বড় ঝড় নেমে আসে। তাঁর বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে এবং তাঁর মা তাঁকে ও তাঁর ভাইদের অস্ট্রেলিয়ায় বাবার কাছে রেখে যুক্তরাজ্যে ফিরে যান।

শৈশবের মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি: মা ছাড়া পাঁচ ভাইবোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মোটেও সহজ ছিল না। বাবা ক্রিস জ্যাকম্যান ছিলেন একজন পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্ট। অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ বাবা একা হাতে সন্তানদের বড় করে তোলেন। শৈশবের সেই একাকীত্ব, মায়ের অনুপস্থিতি এবং পারিবারিক অস্থিরতা হিউয়ের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু এই প্রতিকূলতাই তাঁকে ভেতর থেকে ইস্পাতকঠিন করে তোলে।

হিউ বুঝতে পেরেছিলেন, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। সিডনির নক্স গ্রামার স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি খেলাধুলা এবং নাটকের প্রতি আকৃষ্ট হন। তবে অভিনয়কে তখনও পেশা হিসেবে নেওয়ার সাহস তাঁর ছিল না।

রাতের পেট্রোল পাম্প থেকে জিমের ট্রেনার: ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, সিডনি (UTS) থেকে কমিউনিকেশনে (সাংবাদিকতা) ব্যাচেলর ডিগ্রি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন হিউ। পড়াশোনার খরচ চালানো এবং পকেটের খরচের জন্য তাঁকে অল্প বয়স থেকেই বিভিন্ন পার্ট-টাইম চাকরিতে ঢুকতে হয়।

পেট্রোল পাম্পের কর্মী: গভীর রাতে 'শেল' (Shell) পেট্রোল পাম্পে ক্যাশিয়ার ও নাইট শিফটের দায়িত্ব পালন করতেন।

শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক (PE Teacher): ১৯৮৭ সালে এক বছরের 'গ্যাপ ইয়ার'-এ যুক্তরাজ্যে যান এবং সেখানকার বিখ্যাত উপিংহাম স্কুলে (Uppingham School) পিই শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।

জিমের ফিটনেস ট্রেনার: সিডনিতে ফিরে এসে জিমে ফিটনেস ট্রেনার হিসেবেও কাজ করেছেন, যেখানে মানুষকে কসরত শেখাতেন।

কিন্তু এই সবকটি কাজের মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় ও অদ্ভুত অভিজ্ঞতাটি ছিল শিশুদের জন্মদিনের পার্টিতে ‘ক্ল্যাউন’ বা জোকার সাজা।

'কোকো দ্য ক্লাউন' এবং ৫০ ডলারের জীবনের সেই হাস্যকর লড়াই

জীবন ধারণের জন্য মানুষ কত কিছুই না করে! তরুণ বয়সে হিউ জ্যাকম্যানও বাধ্য হয়ে ঢুকে পড়েছিলেন শিশু বিনোদনের জগতে। তিনি নাম নিয়েছিলেন ‘কোকো দ্য ক্লাউন’ (Coco the Clown)

যাদুবিদ্যা ছাড়া ক্লাউন! একটি পেশাদার জোকারের প্রধান কাজ হলো নানাবিধ ম্যাজিক ট্রিক, ভেলকি এবং নিখুঁত কৌতুক দিয়ে শিশুদের আনন্দ দেওয়া। কিন্তু হিউ জ্যাকম্যানের ক্লাউন হওয়ার পেছনের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত! বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে হিউ নিজেই হেসে স্বীকার করেছেন:

"আমার কোনো বিশেষ জাদুকরি দক্ষতা বা ম্যাজিক ট্রিকস জানা ছিল না। আমি মাত্র ৩টি বল দিয়ে সাধারণ ভেলকি দেখানোর চেষ্টা করতাম, যা পাঁচ বছরের বাচ্চারাও আমার চেয়ে ভালো পারতো! আমার কাছে ক্লাউনিং ছিল স্রেফ জীবনের তাগিদে টাকা উপার্জনের একটা মাধ্যম।"

তিনি মুখের মধ্যে লাল-সাদা রঙ মেখে, লাল রঙের কৃত্রিম গোল নাক লাগিয়ে, অদ্ভূত পোশাক পরে ঘুরে বেড়াতেন চড়া রোদে। তিন বছর ধরে তিনি প্রতি জন্মদিনের পার্টিতে ক্লাউন সেজে পারফর্ম করেছিলেন।

"মা, এই ক্লাউনটি একদম বাজে!" ৮ বছরের শিশুর সেই নির্মম সত্যভাষণ

হিউ জ্যাকম্যানের জীবনের সবচেয়ে হাস্যকর কিন্তু শিক্ষণীয় ঘটনাটি ঘটেছিল এক আট বছরের শিশুর জন্মদিনের পার্টিতে।

সেদিন পার্টিতে উপস্থিত সব বাচ্চারা আশা করেছিল ক্লাউন এসে তাদের দুর্দান্ত সব জাদু দেখাবে। কিন্তু 'কোকো দ্য ক্লাউন' অর্থাৎ হিউ জ্যাকম্যানের কাছে তো দেখানোর মতো কোনো ট্রিক ছিল না! তিনি যখন একের পর এক ফালতু ভেলকি দেখাচ্ছিলেন এবং বল দিয়ে ভেলকি দেখাতে গিয়ে বল নিচে ফেলে দিচ্ছিলেন, তখন সেই আট বছরের শিশুটি আর সহ্য করতে পারেনি।

পার্টিতে উপস্থিত সবার সামনে শিশুটি চেঁচিয়ে তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে:

“মা! এই ক্লাউনটি একদম বাজে! ও কোনো জাদুই জানে না!”

চিন্তা করুন, একটি পূর্ণবয়স্ক তরুণের জন্য একদল শিশুর সামনে এমন অপমানজনক কথা শোনা কতটা লজ্জার হতে পারে! কিন্তু এখানেই শেষ নয়, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় যখন হিউ শিশুদের মন জয় করার জন্য এক চরম বোকামি করে বসেন।

মাথায় ডিম ফাটার ট্র্যাজেডি: শিশুদের আক্রোশ ও বিরক্তি থেকে বাঁচতে এবং তাদের হাসাতে হিউ সিদ্ধান্ত নেন তিনি নিজের মাথায় ডিম ভাঙার ম্যাজিক দেখাবেন। তিনি ভেবেছিলেন এতে বাচ্চারা অন্তত মজা পাবে।

কিন্তু ঘটনা ঘটে উল্টো! তিনি নিজের কপালে ও মাথায় একটার পর একটা ডিম ভেঙে সিক্ত হয়ে পড়েন। ডিমের কুসুম ও সাদা অংশ তাঁর মেকআপ ও ক্লাউনের পোশাক বেয়ে নিচে পড়তে থাকে। বাচ্চারা হাসার বদলে চরম বিরক্ত হয়ে তাঁর দিকে জিনিসপত্র ছুঁড়ে মারতে শুরু করে!

সেই দিনের স্মৃতির কথা মনে করে হিউ পরবর্তীতে এক টকশোতে বলেছিলেন:

"বাচ্চারা আমাকে ডিম আর আইসক্রিম ছুঁড়ে মারছিল। ছয় থেকে আট বছরের বাচ্চারা আমাকে ধরে কেলিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি ছিল! আর সেই নরক যন্ত্রণার জন্য দিনশেষে আমার পকেটে জমা হয়েছিল মাত্র ৫০ ডলার।"

হ্যাঁ, প্রতি ঘণ্টার এই বিভীষিকাময় পারফরম্যান্সের জন্য তখনকার দিনে তাঁকে দেওয়া হতো মাত্র ৫০ ডলার। কিন্তু আজ পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেই ৫০ ডলারের অপমানই কিন্তু হিউ জ্যাকম্যানের ভেতরের ভেজালহীন চরিত্রটিকে শক্ত করেছিল। যে মানুষটি আট বছরের বাচ্চার অপমান সহ্য করে ক্লাউনের পোশাক গুটিয়ে নিতে পেরেছিলেন, তাঁকে তো পৃথিবীর কোনো ব্যর্থতাই আর দমাতে পারবে না!

অভিনয়ের প্রতি প্রেম ও থিয়েটারের কঠিন প্রশিক্ষণ

কমিউনিকেশনে ডিগ্রি অর্জনের শেষ বর্ষে এসে হিউ জ্যাকম্যান একটি ঐচ্ছিক নাটক কোর্সে (Drama course) ভর্তি হন। সেখানে কাজ করার সময় তিনি হঠাৎ অনুভব করেন, এই মঞ্চটাই তাঁর আসল বাড়ি! জীবনের এতগুলো বছর যে শান্তির খোঁজ তিনি করছিলেন, তা যেন থিয়েটারের চার দেয়ালের মাঝে এসে ধরা দিল।

কোর্সের শেষ দিন নাটক করার পর হিউ অনুধাবন করেছিলেন:

"আমি যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমার মনে হয়েছিল আমি জীবনের সঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছি। আমার মনে হয়েছিল, সাংবাদিকতা বা অন্য কিছু নয় অভিনয়ই আমার একমাত্র ঠিকানা।"

ডাব্লিউএএপিএ (WAAPA)-তে প্রশিক্ষণ: সাংবাদিকতার নিশ্চিত ক্যারিয়ার ছেড়ে তিনি নাটকে পূর্ণাঙ্গ ক্যারিয়ার গড়ার ঝুঁকি নেন। ১৯৯১ সালে তিনি পার্থের বিখ্যাত 'ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অব পারফর্মিং আর্টস' (WAAPA)-তে ভর্তি হন। সেখানে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিন বছর টানা কঠোর ক্লাসিক্যাল অভিনয়, নাচ, গান ও শারীরচর্চার প্রশিক্ষণ নেন।

তিনি জানতেন, কোনো পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড বা গডফাদার ছাড়া হলিউড বা অস্ট্রেলিয়ান ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকতে হলে নিজের ঝুলিতে সর্বোচ্চ মানের দক্ষতা থাকতে হবে।

টেলিভিশন মেগা ও জীবনসঙ্গীর সাথে সাক্ষাৎকার

১৯৯৪ সালে একাডেমি থেকে বের হওয়ার রাতেই হিউ একটি বড় সুযোগ পান। অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশন ড্রামা 'Correlli'-তে মূল খলনায়কের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ মেলে তাঁর। এই সিরিজের সেটে তাঁর পরিচয় হয় অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী দেবোরা-লি ফার্নেস (Deborra-Lee Furness)-এর সাথে।

পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দেবোরা ছিলেন হিউয়ের জীবনের এক বড় অনুপ্রেরণা, যিনি হিউয়ের কঠিন সময়ে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন।

লন্ডন রাজকীয় মঞ্চে 'ওকলাহোমা!': ১৯৯৮ সালে লন্ডনের বিখ্যাত রয়্যাল ন্যাশনাল থিয়েটারে ওয়েস্ট এন্ড প্রোডাকশনের 'Oklahoma!' মিউজিক্যালে কার্লি ম্যাকক্লেন চরিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক থিয়েটার অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেন হিউ। এই চরিত্রে তাঁর অসামান্য গায়কী ও অভিনয়ের জন্য তিনি ঐতিহ্যবাহী ‘অলিভিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ (Olivier Award)-এর জন্য মনোনীত হন।

মঞ্চ কাঁপানো এই তরুণ অভিনেতার দিকে তখন হলিউডের বড় বড় পরিচালকদের নজর পড়তে শুরু করেছে।

'উলভারিন' ও হলিউডের শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ

২০০০ সাল। হলিউডের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বছর। কারণ এই বছরই বড় পর্দায় পা রাখতে যাচ্ছিল মার্ভেল কমিকসের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র ‘এক্স-মেন’ (X-Men)।

তবে আপনারা কি জানেন, 'উলভারিন' চরিত্রের জন্য হিউ জ্যাকম্যান কিন্তু পরিচালকের প্রথম বা দ্বিতীয় পছন্দ ছিলেন না!

ভাগ্যের অলৌকিক খেলা

রাসেল ক্রোর অবদান: পরিচালক ব্রায়ান সিঙ্গার প্রথমে 'উলভারিন' বা 'লোগান' চরিত্রের জন্য অস্কারজয়ী অস্ট্রেলীয় অভিনেতা রাসেল ক্রো-কে প্রস্তাব দেন। কিন্তু রাসেল তা ফিরিয়ে দেন এবং হিউ জ্যাকম্যানের নামটি পরিচালকের কাছে সুপারিশ করেন।

ডুগরে স্কটের কপাল পোড়া: ব্রায়ান সিঙ্গার তবুও স্কটিশ অভিনেতা ডুগরে স্কটকে (Dougray Scott) নির্বাচন করেন। কিন্তু ডুগরে স্কট তখন ‘Mission: Impossible 2’ সিনেমার শুটিং করছিলেন। টম ক্রুজের সেই ছবির শুটিং পিছিয়ে যাওয়ায় ডুগরে স্কট এক্স-মেনের শুটিংয়ের জন্য সময় দিতে পারেননি।

শেষ মুহূর্তের অডিশন: শুটিং শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে হিউ জ্যাকম্যানকে জরুরি ভিত্তিতে অডিশনের জন্য ডাকা হয়। কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই তিনি অডিশনে এমন এক রাগী, বুনো অথচ আবেগঘন 'লোগান' ফুটিয়ে তোলেন যে পরিচালক সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে চড়ান্ত করেন।

কমিক বইয়ের ৯ জঞ্চের উলভারিন বনাম ৬ ফুট ২ ইঞ্চির হিউ

কমিক বইতে উলভারিন চরিত্রটি ছিল মাত্র ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার এক খর্বাকৃতির, হিংস্র পশুর মতো চরিত্র। অন্যদিকে হিউ জ্যাকম্যানের উচ্চতা ছিল ৬ ফুট ২ ইঞ্চি! কমিক অনুরাগীরা প্রথমে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, "এত লম্বা ও চকোলেট বয় মার্কা একটা ছেলে কীভাবে উলভারিন হবে?"

কিন্তু সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পর সব সমালোচনার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। হিউ জ্যাকম্যান তাঁর শরীরচর্চা, হিংস্র চাহনি, তীক্ষ্ণ স্বর এবং স্ক্রিন প্রেজেন্স দিয়ে 'উলভারিন' চরিত্রটিকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যান যা হলিউডের ইতিহাসে বিরল।

১৭ বছরের দীর্ঘ সফর ও বিশ্বরেকর্ড

২০০০ সালের X-Men থেকে শুরু করে ২০১৭ সালের অস্কার মনোনীত মাস্টারপিস Logan পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে 'উলভারিন' চরিত্রে অভিনয় করেছেন হিউ। এটি কোনো লাইভ-অ্যাকশন মার্ভেল সুপরাহিরো হিসেবে সবচেয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের একটি বিশ্বরেকর্ড (গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস)।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিশ্ব কাঁপানো ব্লকবাস্টার সিনেমা 'Deadpool & Wolverine'-এ বন্ধু রায়ান রেনোল্ডসের অনুরোধে তিনি আবার তাঁর বিখ্যাত হলুদ কমিকস্যুট পরে 'লোগান' রূপে প্রত্যাবর্তন করেন, যা বিশ্বজুড়ে বক্স অফিসে বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যবসা করে।

হিউ জ্যাকম্যান কেবল একজন অ্যাকশন স্টার নন

অনেক অভিনেতা কোনো একটি বিশেষ চরিত্রে বিখ্যাত হওয়ার পর সেই চরিত্রের গণ্ডিতেই বন্দি হয়ে যান। কিন্তু হিউ জ্যাকম্যান প্রমাণ করেছেন তিনি কেবল পেশীবহুল সুপারহিরোই নন; তিনি হলিউডের ইতিহাসের অন্যতম বহুমুখী (Versatile) একজন অভিনয়শিল্পী।

'লে মিজারেবল' (Les Misérables - 2012)

ভিক্টর হুগোর কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত মিউজিক্যাল ড্রামা ফিল্ম 'লে মিজারেবল'-এ জিন ভালজিন (Jean Valjean) চরিত্রে অভিনয় করে তিনি সেরা অভিনেতা হিসেবে অস্কার (Academy Award) মনোনয়ন পান এবং গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড জয় করেন। এই ছবিতে সব গান তিনি সেটে লাইভ গেয়েছিলেন, যা তাঁর ভোকাল রেঞ্জ ও দক্ষতার চূড়ান্ত প্রমাণ দেয়।

'দ্য গ্রেটেস্ট শোম্যান' (The Greatest Showman - 2017)

সার্কাসের জনক পি. টি. বারনামের জীবন নিয়ে নির্মিত এই মিউজিক্যাল বায়োপিকটি বিশ্বজুড়ে ৪৩৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যবসা করে। ছবির গানগুলো বিশ্বজুড়ে রেকর্ড সৃষ্টি করে এবং এর অ্যালবামের জন্য হিউ একটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড (Grammy Award) লাভ করেন।

থিয়েটার ও টনি অ্যাওয়ার্ড

ব্রডওয়ে থিয়েটারে 'The Boy from Oz' নাটকে অভিনয় করে তিনি সেরা প্রধান অভিনেতা হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ টনি অ্যাওয়ার্ড (Tony Award) জয় করেন। ফলে তিনি একই সাথে অস্কার মনোনীত, গ্র্যামি ও টনি বিজয়ী এক অনন্য উচ্চতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

হিউ জ্যাকম্যানের জীবন ও ক্যারিয়ারের প্রামাণ্য মাইলফলকসমূহ

হিউ জ্যাকম্যানের জীবন, সংগ্রাম এবং অর্জনের একনজরে সারসংক্ষেপ নিচে একটি মাত্র একক টেবিলে তুলে ধরা হলো:

সময়কাল / বছর

পেশা / ভূমিকা

অবস্থান ও ঘটনা

অর্জন ও ঐতিহাসিক প্রভাব

১৯৬৮

জন্মগ্রহণ

সিডনি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।

বিচ্ছেদপ্রাপ্ত পরিবারে একা বাবার কাছে বেড়ে ওঠা।

১৯৮০-এর দশক

পার্ট-টাইমার

পাম্প অ্যাটেনডেন্ট, পিই টিচার, জিম ট্রেনার।

জীবিকা নির্বাহ এবং আত্মনির্ভরশীলতার শিক্ষা গ্রহণ।

১৯৯০-১৯৯৩

'কোকো দ্য ক্লাউন'

শিশুদের জন্মদিনের পার্টিতে জোকার পারফর্মার।

প্রতি পার্টিতে ৫০ ডলার আয়; ব্যর্থতা ও অপমান সহ্য করার শিক্ষা।

১৯৯৪

গ্র্যাজুয়েট অভিনেতা

ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অব পারফর্মিং আর্টস (WAAPA)।

৩ বছরের ক্লাসিক্যাল অভিনয় প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণকরণ।

১৯৯৫

'Correlli' মেগা সিরিজ

প্রথম প্রধান টিভি সিরিজ ড্রামা।

জীবনসঙ্গী দেবোরা-লি ফার্নেসের সাথে সাক্ষাৎ ও বিয়ে (১৯৯৬)।

১৯৯৮

'Oklahoma!' মিউজিক্যাল

রয়্যাল ন্যাশনাল থিয়েটার, লন্ডন।

স্যার লরেন্স অলিভিয়ার অ্যাওয়ার্ডের জন্য প্রথম আন্তর্জাতিক মনোনয়ন।

২০০০

'উলভারিন' (X-Men)

শেষ মুহূর্তে প্রধান সুপারহিরো চরিত্রে নির্বাচিন।

হলিউডে আত্মপ্রকাশ এবং রাতারাতি গ্লোবাল মেগাস্টার হিসেবে খ্যাতি।

২০০৪

ব্রডওয়ে পারফর্মার

'The Boy from Oz' থিয়েটার নাটক।

সেরা প্রধান অভিনেতা হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ টনি অ্যাওয়ার্ড জয়।

২০১২

'Les Misérables'

'জিন ভালজিন' চরিত্রে ঐতিহাসিক অভিনয়।

গোল্ডেন গ্লোব জয় এবং প্রথম অস্কার (Academy Award) মনোনয়ন।

২০১৭

'Logan' ও 'Showman'

উলভারিন হিসেবে বিদায় ও পিটি বারনাম রূপায়ণ।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এবং গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড অর্জন।

২০২৪

'Deadpool & Wolverine'

মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন।

বিশ্বজুড়ে $১.৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বক্স অফিস ইতিহাস সৃষ্টি।

ত্বকের ক্যানসারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ও অবিচল লড়াই

পর্দায় যাকে কোনো বুলেট বা তলোয়ার স্পর্শ করতে পারে না, সেই হিউ জ্যাকম্যানকে বাস্তব জীবনে বারবার লড়াই করতে হয়েছে মরণব্যাধি ক্যানসারের বিরুদ্ধে।

বাসাল সেল কার্সিনোমা (BCC): ২০১৩ সালে তাঁর নাকে একটি ছোট লাল দাগ দেখা যায়। তাঁর তৎকালীন স্ত্রী দেবোরা-লি ফার্নেসের চাপে তিনি চিকিৎসকের কাছে যান এবং পরীক্ষা শেষে ধরা পড়ে তিনি ‘বাসাল সেল কার্সিনোমা’ (ত্বকের এক ধরনের ক্যানসার)-এ আক্রান্ত।

বারবার অস্ত্রোপচার: গত এক দশকে অন্তত ৬ থেকে ৭ বার তাঁর ত্বক থেকে ক্যানসার আক্রান্ত কোষ অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার বা বায়োপসি করাতে হয়েছে।

সামাজিক সচেতনতা: রোগ গোপন না করে তিনি নিয়মিত ব্যান্ডেজ পরা অবস্থায় নিজের ছবি সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন। অস্ট্রেলিয়ার চড়া রোদে শৈশব কাটানো এই তারকা বিশ্ববাসীকে বারবার একটিই বার্তা দেন: “অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন এবং নিয়মিত ত্বক পরীক্ষা করান।”

'উলভারিন' বডি ট্র্যান্সফরমেশন: পানিশূন্যতা ও চরম শারীরিক সাধনা

৫৪ বছর বয়সেও ‘দেডপুল অ্যান্ড উলভারিন’ (২০২৪) সিনেমার জন্য হিউ যে পেশীবহুল শরীর ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তার পেছনে রয়েছে চরম কায়িক সাধনা ও জীবনের ঝুঁকি নেওয়া কিছু নিয়মাবলী:

বিপজ্জনক ‘ডিহাইড্রেশন প্রসেস’: পর্দায় উলভারিনের শার্ট ছাড়া দৃশ্যে মাংসপেশি এবং হাতের শিরা-উপশিরাগুলো যেন চরম ধারালো দেখায়, সেজন্য তিনি এক মারাত্মক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতেন। শুটিংয়ের বেশ কয়েকদিন আগে থেকে তিনি দৈনিক প্রায় ৪ থেকে ৮ লিটার পানি পান করতেন।

তবে শুটিংয়ের ঠিক ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা আগে পুরোপুরি পানি পান বন্ধ করে দিতেন। চিকিৎসকদের মতে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হলেও হিউ নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানান, এর ফলে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি শুকিয়ে চামড়া একদম পেশির সাথে লেগে যেত। তবে এতে চরম মাথাঘোরা ও দুর্বলতা তৈরি হতো।

জনকল্যাণ ও সামাজিক ব্যবসা: 'লাফিং ম্যান কফি'

হিউ জ্যাকম্যান কেবল একজন অভিনেতাই নন, তিনি একজন সফল সামাজিক উদ্যোক্তাও।

ইথিওপিয়া সফর ও প্রতিশ্রুতি: ২০০৯ সালে 'ওয়ার্ল্ড ভিশন'-এর পরাামর্শক হিসেবে তিনি আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া সফরে যান। সেখানে ‘ডুকালে’ (Dukale) নামে এক অতি দরিদ্র কফি কৃষকের সাথে তাঁর দেখা হয়। ডুকালের কঠোর পরিশ্রম কিন্তু ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কষ্ট হিউকে গভীরভাবে ব্যথিত করে।

ব্যবসার সূচনা: ২০১১ সালে তিনি নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠা করেন 'Laughing Man Coffee'

১০০% লভ্যাংশ দান: এই কফি কোম্পানির মূল শর্ত হলো, অর্জিত লভ্যাংশের শতভাগ (100%) ব্যয় করা হয় 'Laughing Man Foundation'-এর মাধ্যমে। এই অর্থ দিয়ে বিশ্বজুড়ে ছোট কফি কৃষকদের উন্নয়ন, তরুণদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা করা হয়।

'অল-রাউন্ডার' হোস্ট: অস্কার ও টনি অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চ জয়

অভিনয় ও অ্যাকশনের বাইরে হিউ একজন দুর্দান্ত গায়ক, নৃত্যশিল্পী ও মঞ্চ উপস্থাপক।

২০০৯ সালের অস্কার উপস্থাপন: ২০০৯ সালে ৮১তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস (অস্কার)-এর একক উপস্থাপক ছিলেন হিউ জ্যাকম্যান। অভিনেত্রী অ্যান হ্যাথাওয়ের সাথে তাঁর উদ্বোধনী মিউজিক্যাল পারফরম্যান্সটি আজও অস্কার ইতিহাসের অন্যতম সেরা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়।

৪ বার টনি অ্যাওয়ার্ড ও এমি জয়: থিয়েটার জগতের সবচেয়ে বড় সম্মাননা 'টনি অ্যাওয়ার্ডস' তিনি ৪ বার সফলভাবে উপস্থাপনা করেছেন। অস্কারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অসামান্য উপস্থাপনার জন্য তিনি একটি 'এমি অ্যাওয়ার্ড' (Emmy Award) লাভ করেন।

'উলভারিন' ছাড়াও হিউ জ্যাকম্যানের ৫টি কালজয়ী সিনেমা

মার্ভেল ইউনিভার্সের বাইরেও অভিনেতা হিসেবে নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন হিউ। তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা ৫টি সিনেমা নিচে দেওয়া হলো:

দ্য প্রেস্টিজ (The Prestige - 2006): ক্রিস্টোফার নোলানের এই রহস্যময় মাস্টারপিসে জাদুকর 'রবার্ট অ্যাঞ্জিয়ার' চরিত্রে ক্রিশ্চিয়ান বেলের বিপরীতে তাঁর দ্বৈরথ আজও দর্শকের চোখে লেগে আছে।

প্রিজনার্স (Prisoners - 2013): দেনি ভিলনভে পরিচালিত এই মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারে নিখোঁজ মেয়ের এক অসহায় ও ব্যাকুল বাবার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ান।

লে মিজারেবল (Les Misérables - 2012): জিন ভালজিন চরিত্রে অভিনয় ও লাইভ গায়কীর জন্য তিনি ক্যারিয়ারে প্রথমবার অস্কারের সেরা অভিনেতার মনোনয়ন এবং গোল্ডেন গ্লোব লাভ করেন।

রিয়েল স্টিল (Real Steel - 2011): রোবট বক্সিংয়ের পটভূমিতে তৈরি এই কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রে বাবা ও ছেলের সুসম্পর্কের এক আবেগঘন রূপায়ণ ফুটিয়ে তোলেন তিনি।

দ্য গ্রেটেস্ট শোম্যান (The Greatest Showman - 2017): পি. টি. বারনামের বায়োপিকে তাঁর অসাধারণ নাচ ও গান সিনেমাটিকে বিশ্বজুড়ে ব্লকবাস্টার হিট বানায় এবং অ্যালবামের জন্য তিনি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পান।

ব্যক্তিগত জীবন: দীর্ঘ ২৭ বছরের সংসার ও আকস্মিক বিচ্ছেদ

হলিউডের চাকচিক্যময় দুনিয়ায় যেখানে তারকাদের প্রেম ও বিয়ে কয়েক মাসের মধ্যে ভেঙে যায়, সেখানে হিউ জ্যাকম্যান ও দেবোরা-লি ফার্নেসের দাম্পত্য জীবন ছিল ভালোবাসার এক বিরল দৃষ্টান্ত।

দেবোরা হিউয়ের চেয়ে ১৩ বছরের বড় ছিলেন। তবে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই বিখ্যাত দম্পতি যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাঁদের ২৭ বছরের বৈবাহিক জীবনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন, যা বিশ্বজুড়ে তাঁদের কোটি ভক্তকে ব্যথিত করেছিল।

একনজরে হিউ জ্যাকম্যান সম্পর্কিত ১০টি অজানা তথ্য

বিষয় / ক্ষেত্র

অজানা বা মজার তথ্য

১. সত্যিকারের উলভারিন চিনতেন না!

'X-Men' সিনেমায় কাজ পাওয়ার আগে হিউ জানতেনই না যে 'Wolverine' নামে কোনো বাস্তব প্রাণী আছে! তিনি ভেবেছিলেন উলভারিন কেবলই কোনো নেকড়ে (Wolf)-এর রূপক নাম।

২. পেশাদার কুস্তিগীর হওয়ার প্রস্তাব

তাঁর শারীরিক গঠন ও 'উলভারিন' খ্যাতির কারণে বিখ্যাত রেসলিং প্রমোশন WWE তাঁকে বেশ কয়েকবার রিংয়ে রেসলিং করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।

৩. দৃষ্টিশক্তির সমস্যা

তিনি ভীষণ মাত্রায় ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন (Short-sighted)। চশমা বা কন্টাক্ট লেন্স ছাড়া তিনি কোনো লেখা পড়তে পারেন না। এমনকি অস্কার উপস্থাপনার সময়ও তাঁকে বিশেষ লেন্স পরতে হয়েছিল।

৪. সংগীতপ্রেমী ও বাদ্যযন্ত্র

তিনি ক্লাসিক্যাল পিয়ানো, গিটার এবং বাঁশি বাজাতে পারেন।

৫. গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড

লাইভ-অ্যাকশন মার্ভেল সুপারহিরো হিসেবে সবচেয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ার (২০০০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত) বজায় রাখার জন্য তাঁর নাম গিনেস বুকে নিবন্ধিত।

৬. সুগন্ধি আসক্তি

তিনি সুগন্ধি বা পারফিউম খুব পছন্দ করেন। নিজের তৈরি কোনো ব্র্যান্ড না থাকলেও তিনি নিজ উদ্যোগে পারফিউমের নোট মিক্স করতে পছন্দ করেন।

৭. রাগ নিয়ন্ত্রণে 'ট্রানসেন্ডেন্টাল মেডিটেশন'

শৈশবে মায়ের চলে যাওয়া এবং পারিবারিক মানসিক চাপ কাটাতে তিনি নিয়মিত 'ট্রানসেন্ডেন্টাল মেডিটেশন' (TM) অনুশীলন করেন।

৮. প্যানকেক ভালোবাসেন

ফিটনেসের জন্য কঠোর ডায়েট করলেও তাঁর সবচেয়ে প্রিয় চিট-মিল (Cheat Meal) হলো প্রচুর ম্যাপেল সিরাপ দেওয়া প্যানকেক।

৯. জেমস বন্ডের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া

'ক্যাসিনো রয়্যাল' (২০০৬) সিনেমার জন্য ড্যানিয়েল ক্রেগের আগে হিউকে জেমস বন্ডের রোলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু 'এক্স-মেন'-এর ব্যস্ততার জন্য তিনি তা ফিরিয়ে দেন।

১০. সুশীল তারকার তকমা

হলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে যেকোনো কাজের কলাকুশলীদের সাথে অত্যন্ত সদ্ব্যবহার করার জন্য তাঁকে "The Nicest Guy in Hollywood" উপাধি দেওয়া হয়েছে।

হিউ জ্যাকম্যানের জীবন আমাদের শেখায় যে প্রতিকূলতা, অসুস্থতা কিংবা ব্যর্থতা যতই বড় হোক না কেন কঠোর পরিশ্রম, ইতিবাচক মনোভাব এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে যেকোনো মানুষ নিজের জীবনের সত্যিকারের 'সুপারহিরো' হয়ে উঠতে পারে।

ব্যর্থতা কীভাবে সফলতার সিঁড়ি হয়: জীবন থেকে শেখা পাঠ

হিউ জ্যাকম্যানের ৫০ ডলারের 'বাজে ক্লাউন' থেকে হলিউডের মেগাস্টার হয়ে ওঠার গল্পটি কেবল সিনেমা অনুরাগী নয়, বরং জীবনের মোড়ে মোড়ে হতাশ হয়ে পড়া প্রতিটি সাধারণ মানুষের জন্য এক মহামূল্যবান জীবনপাঠ।

ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে হাসিমুখে গ্রহণ করা: হিউ যদি ৮ বছরের বাচ্চার সেই নির্মম সত্যভাষণ এবং ডিম ছুঁড়ে মারার ঘটনায় লজ্জা পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিতেন, তবে আজ বিশ্ব একজন 'উলভারিন'-কে পেত না। জীবনে ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে নিয়ে হাসতে পারা এবং পরবর্তী সুযোগের জন্য নিজেকে তৈরি করাই আসল জয়ের লক্ষণ।

প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই: হিউ যখন ২০০০ সালে এক্স-মেনের অডিশন দেন, তিনি শেষ মুহূর্তে ডাক পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আগে থেকেই থিয়েটারে নাচ, গান, শরীরচর্চা ও অভিনয়ের যে কঠিন ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, সেটাই তাঁকে ওই ১০ মিনিটের অডিশনে বাজিমাত করতে সাহায্য করেছিল। সুযোগ হঠাৎ আসতে পারে, কিন্তু প্রস্তুতি না থাকলে সেই সুযোগ হাতছাড়া হতে বাধ্য।

"হলিউডের সবচেয়ে ভদ্র মানুষ" (The Nicest Guy in Hollywood): হলিউডে একটি কথা প্রচলিত আছে:

"হিউ জ্যাকম্যান হলেন এই ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বিনয়ী ও মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষ।"

কোটি কোটি ডলারের মালিক হয়েও তিনি তাঁর স্পট বয়, সেটের সাধারণ কলাকুশলী এবং ভক্তদের সাথে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও বিনয়ের সাথে মিশে যান, তা বিরল। ক্লাউন হিসেবে ৫০ ডলারের কষ্ট করেছিলেন বলেই তিনি টাকার বা খ্যাতির অহংকারে অন্ধ হননি।

আপনি যদি চেষ্টা না ছাড়েন, তবেই আপনি বিজয়ী

আজ যখন হিউ জ্যাকম্যান কোনো রেড কার্পেটে হাঁটেন কিংবা যখন বিশ্বজুড়ে কোনো সিনেমার প্রিমিয়ারে তাঁর নামে হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে ওঠে, তখন হয়তো কেউ ভাবতেও পারে না এই মানুষটিকে একসময় মুখের রঙিন মেকআপ মুছে চোখের জল ফেলতে হয়েছিল।

হিউ জ্যাকম্যানের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়:

আপনার শুরুটা কোথায় ছিল বা কতখানি লজ্জাজনক ছিল, তা কখনোই আপনার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে না। আপনার পরিণতি নির্ধারণ করে আপনার পরিশ্রম, জেদ এবং কখনোই হাল না ছাড়ার মানসিকতা।

যদি কখনো জীবনে মনে হয় আপনার কাজকে কেউ মূল্যায়ন করছে না, যদি মনে হয় আপনি আপনার যোগ্যতার সঠিক মূল্য পাচ্ছেন না তবে 'কোকো দ্য ক্লাউন'-এর কথা মনে করবেন। যিনি কপালে ডিম ভেঙে ৫০ ডলার আয় করতেন, তিনিই কিন্তু আজ শত কোটি মানুষের হৃদয়ের রাজা!

তাই নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে থাকুন। কারণ আজকের এই বাজে পারফর্ম করা ক্লাউনটিই হয়তো আগামী দিনের বিশ্বজয়ী 'উলভারিন'!

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.