ভারতের হায়দ্রাবাদ দখল - রাজাকার, 'অপারেশন পোলো' ও রক্তাক্ত মুসলিম ট্র্যাজেডির দলিল

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাস। ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে তখন এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক উন্মাদনা ও অশ্রুসজল বিদায়ের ক্ষণ। প্রায় দু’শো বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের যবনিকা ঘটিয়ে জন্ম নিচ্ছে দুটি নতুন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। কিন্তু সীমান্ত নির্ধারণের ভৌগোলিক রেখা টেনে দেওয়ার পরও ভারতীয় উপমহাদেশের বুকের ওপর ঝুলছিল এক বিশাল অনিশ্চয়তার খাঁড়া। সেটি ছিল পাঁচ শতাধিক ‘দেশীয় রাজ্য’ বা প্রেন্সলি স্টেটগুলোর (Princely States) ভবিষ্যৎ।
ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭ (Indian Independence Act 1947)-এর মাধ্যমে এই রাজ্যগুলোর ওপর থেকে তাদের সার্বভৌমত্ব (Paramountcy) তুলে নেয় এবং রাজ্যগুলোর প্রধানদের সামনে তিনটি বিকল্প খোলা রাখে:
১. ভারত ডোমিনিয়নে যোগ দেওয়া,
২. পাকিস্তান ডোমিনিয়নে যোগ দেওয়া, অথবা
৩. সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা।
অধিকাংশ ছোট-বড় দেশীয় রাজ্য পরিস্থিতি বুঝে ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিলেও সম্পূর্ণ বিপরীত ও বিপজ্জনক পথ বেছে নিয়েছিল দাক্ষিণাত্যের প্রাণকেন্দ্র হায়দ্রাবাদ রাজ্য। ভৌগোলিকভাবে ভারতের একদম মাঝখানে অবস্থিত, আয়তনে তৎকালীন গ্রেট ব্রিটেনের চেয়েও বড় এবং অর্থনৈতিকভাবে অবিশ্বাস্য সম্পদশালী এই রাজ্যটির শাসক ছিলেন আসাফ জাহি রাজবংশের সপ্তম নিজাম মির ওসমান আলী খান।
হায়দ্রাবাদের এই স্বাধীনতা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত কেবল একটি রাজকীয় জেদ ছিল না; এটি তৎকালীন ভূ-রাজনীতিতে এমন এক আগ্নেয়গিরির জন্ম দিয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছিল রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযান 'অপারেশন পোলো' (Operation Polo) এবং পরবর্তীতে এক ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডির মাধ্যমে। এই নিবন্ধে আমরা ১৯৪৭-১৯৪৮ সালের হায়দ্রাবাদের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ, রাজাকার বাহিনীর উত্থান, সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপট এবং বহু বছর ধরে চেপে রাখা 'পণ্ডিত সুন্দরলাল কমিটি রিপোর্ট'-এর নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ প্রকাশ করব।
রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সমীকরণ: একটি জটিল বিস্ফোরক পরিস্থিতি
১৯৪০-এর দশকের শেষভাগে হায়দ্রাবাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোটি ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং জটিল বৈষম্যে ভরপুর। এই রাজনৈতিক সংকটকে মূলত তিনটি প্রধান কোণ থেকে অনুধাবন করা যায়:
জনসংখ্যা বনাম শাসনতন্ত্রের বৈষম্য
হায়দ্রাবাদ রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত (মূলত তেলেগু, মারাঠি ও কন্নড় ভাষাভাষী)। কিন্তু রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো, পুলিশ, সামরিক বাহিনী এবং ভূম্যাধিকারী অভিজাত শ্রেণী (জমিদার ও দেশমুখ)-এর সিংহভাগই ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের। এই ডেমোগ্রাফিক বৈষম্য সামাজিকভাবে এক সুপ্ত অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল, যাকে স্থানীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব এবং পরবর্তীতে কমিউনিস্টরা নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে।
ভূ-বেষ্টিত রাজ্য (Landlocked State) ও নয়াদিল্লির উদ্বেগ
হায়দ্রাবাদ ছিল চারদিক থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা পরিবেষ্টিত। স্বাধীন ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং 'লৌহমানব' হিসেবে পরিচিত সরদার বল্লভভাই প্যাটেল অনুধাবন করেছিলেন যে, ভারতের পেটের ভেতর একটি স্বাধীন, অসৌহার্দ্যপূর্ণ এবং সম্ভাব্য পাকিস্তানঘেঁষা রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা মানে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে চিরতরে হুমকির মুখে ফেলা। প্যাটেল স্পষ্ট ভাষায় একে "ভারতের পেটের ভেতর এক আলসার (ক্ষত)" বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, যা অপসারণ করা অপরিহার্য ছিল।
তেলেঙ্গানা সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন (Telangana Peasant Rebellion)
একদিকে যখন নিজাম ও ভারত সরকারের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল, ঠিক তখনই হায়দ্রাবাদের তেলেঙ্গানা অঞ্চলে সামন্তবাদী 'জাগীরদারী' ও 'দেশমুখী' প্রথার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে শুরু হয় এক ভয়াবহ কৃষক আন্দোলন। দরিদ্র চাষীরা অস্ত্র তুলে নিয়ে জমিদারদের জমি দখল করতে শুরু করে। অর্থাৎ, নিজামের সামনে কেবল ভারত সরকারের চাপই ছিল না, নিজ রাজ্যের ভেতরে এক বিশাল এলাকা কমিউনিস্টদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।
ডেক্কানি নেতৃত্বের বিবর্তন: নওয়াব বাহাদুর ইয়ার জং থেকে কাশেম রিজভীর উগ্রপন্থা
হায়দ্রাবাদের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সবচেয়ে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল মুসলিমদের রাজনৈতিক সংগঠন 'মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন' (MIM)। তবে এই সংগঠনের ভাবাদর্শ ও নেতৃত্বের পরিবর্তনই রাজ্যটিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
নওয়াব বাহাদুর ইয়ার জং: প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের প্রতীক
১৯৩০ ও ৪০-এর দশকের প্রথমার্ধে ডেক্কানি মুসলিমদের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন নওয়াব বাহাদুর ইয়ার জং। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ বাগমী, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ এবং সমাজ সংস্কারক। তিনি MIM-কে সংগঠিত করেন এবং হায়দ্রাবাদের মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য লড়েন। তবে তিনি একই সাথে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন।
১৯৪৪ সালে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে অত্যন্ত আকস্মিক ও রহস্যজনকভাবে বাহাদুর ইয়ার জং মৃত্যুবরণ করেন (অনেকের মতে তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল)। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই হায়দ্রাবাদের রাজনীতি থেকে প্রজ্ঞা ও সংযমের সমাপ্তি ঘটে।
কাশেম রিজভীর উত্থান ও 'রাজাকার' বাহিনীর গঠন
বাহাদুর ইয়ার জং-এর মৃত্যুর পর MIM-এর চরমপন্থী ও উগ্রবাদী উপদলটির প্রধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কাশেম রিজভী (Kasim Razvi)। পেশায় আইনজীবী রিজভী ছিলেন অত্যন্ত উগ্র বক্তা এবং ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। তিনি বিশ্বাস করতেন যে হায়দ্রাবাদে মুসলিম শাসন চিরস্থায়ী করা কেবল অস্ত্রের মাধ্যমেই সম্ভব।
নিজামের শাসনকে টিকিয়ে রাখতে এবং ভারতের সাথে যেকোনো ধরনের সমঝোতার বিরোধিতা করতে কাশেম রিজভী তৈরি করেন একটি আধা-সামরিক স্বেচ্ছাসেবক মিলিশিয়া বাহিনী, যার নাম দেওয়া হয় 'রাজাকার' (Razakars)।
রাজাকারদের অপকর্ম: অল্প সময়ের মধ্যেই রাজাকার বাহিনীর সদস্য সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। তারা লাঠি, কমাণ্ডো ছুরি এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গ্রামে গ্রামে টহল দিতে শুরু করে। ভারতে যোগদানের সমর্থক, কংগ্রেস কর্মী, বামপন্থী কৃষক এবং সাধারণ হিন্দু নাগরিকদের ওপর তারা চরম নির্যাতন, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালাতে থাকে।
নিজাম সরকারের জিম্মিদশা: কাশেম রিজভীর প্রভাব এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে ৭ম নিজাম মির ওসমান আলী খান কার্যত তাঁর হাতে রাজনৈতিক জিম্মি হয়ে পড়েন। নিজামের নিজস্ব পুলিশ ও প্রশাসন রাজাকারদের তান্ডব থামানো তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরোক্ষ সমর্থন দিতে বাধ্য হয়।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন (১৯৪৭ – ১৯৪৮)
১৯৪৭ সালের আগস্ট থেকে ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর এই ১৩ মাস সময়কাল ছিল ভারত ও হায়দ্রাবাদের ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র কূটনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের অধ্যায়।
'যথাস্থিতি চুক্তি' (Standstill Agreement) - ২৯ নভেম্বর ১৯৪৭
১৫ আগস্ট ১৯৪৭-এ নিজাম হায়দ্রাবাদকে স্বাধীন ঘোষণা করলে ভারত সরকার তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ না নিয়ে আলোচনা শুরু করে। দীর্ঘ দরকষাকষির পর ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ভারত সরকার ও হায়দ্রাবাদ রাজ্যের মধ্যে ১ বছর মেয়াদী 'যথাস্থিতি চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মূল কথা ছিল:
উভয় পক্ষ এক বছরের জন্য ভারতের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী অবস্থা বজায় রাখবে।
বৈদেশিক নীতি, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে ভারত সরকার পরোক্ষ তদারকি করবে, কিন্তু হায়দ্রাবাদের অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ থাকবে।
এই এক বছরের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা হবে।
চুক্তি ভঙ্গ ও অর্থনৈতিক অবরোধ
কিন্তু মাঠপর্যায়ে চুক্তিটি বেশিদিন টেকেনি। ভারত সরকারের অভিযোগ ছিল, নিজাম চুক্তি লঙ্ঘন করে পাকিস্তানকে গোপনে বিপুল অর্থ (প্রায় ২০ কোটি টাকা) ঋণ দিয়েছেন, সেখানে নিজস্ব প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন এবং রাজাকারদের মাধ্যমে সীমান্তে ভারতীয় গ্রামগুলোতে হামলা চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে হায়দ্রাবাদ সরকারের অভিযোগ ছিল, ভারত সরকার চুক্তি ভঙ্গ করে হায়দ্রাবাদের ওপর অনানুষ্ঠানিক চরম অর্থনৈতিক অবরোধ (Economic Blockade) আরোপ করেছে, যার ফলে খাদ্য, ওষুধ, পেট্রোলিয়াম এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
ভারতে নিযুক্ত নিজামের প্রতিনিধি ও তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড মাウントব্যাটেন এবং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর মধ্যে একাধিক বৈঠক হলেও কাশেম রিজভীর উগ্র অবস্থানের কারণে কোনো সমঝোতা চুক্তি বা গণভোটের (Plebiscite) প্রস্তাবে নিজাম সম্মত হতে পারেননি।
সামরিক অভিযান: 'অপারেশন পোলো' বা পুলিশ অ্যাকশন (১৩-১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮)
যখন কূটনৈতিক সমস্ত দুয়ার বন্ধ হয়ে যায় এবং রাজ্যের ভেতর রাজাকারদের নৈরাজ্য ও সীমান্তের সশস্ত্র সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন ভারত সরকার সামরিক পদক্ষেপের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। প্রশাসনিক ভাষায় একে বলা হয়েছিল 'পুলিশ অ্যাকশন' (Police Action), কিন্তু সামরিক কোডনেম ছিল 'অপারেশন পোলো' (কারণ তৎকালীন হায়দ্রাবাদে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ১৭টি পোলো খেলার মাঠ ছিল)।
সামরিক শক্তি ও পরিকল্পনা
অভিযানের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর দক্ষিণ কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজেন্দ্রসিংজি। তবে মূল ফিল্ড কমান্ডারে ছিলেন মেজর জেনারেল জয়ন্ত নাথ চৌধুরী (J.N. Chaudhuri)।
ভারতীয় বাহিনী: ১ম আর্মার্ড ডিভিশন, সাঁজোয়া গাড়ি, কামান ও বিমানবাহিনীর সহায়তায় সুসজ্জিত আধুনিক সেনাবাহিনী।
হায়দ্রাবাদ বাহিনী (Nizam's State Force): সেনাপতি মেজর জেনারেল এ. এ. এল-ইদ্রুসের (A. A. El Edroos) অধীনে প্রায় রাজকীয় ৬,০০০ নিয়মিত সৈন্য এবং ১৮,০০০ অনিয়মিত সৈনিক। এর সাথে যুক্ত ছিল কয়েক হাজার আধাসামরিক 'রাজাকার'।
১০৮ ঘণ্টার যুদ্ধ (১৩ – ১৭ সেপ্টেম্বর)
১৩ সেপ্টেম্বর (১ম দিন): ভোর ৪টায় ভারতীয় বাহিনী প্রধানত দুটি প্রধান অক্ষ (পশ্চিমের সোলাপুর এবং পূর্বের বিজয়ওয়াড়া) সহ মোট ৫টি দিক থেকে হায়দ্রাবাদ সীমান্তে প্রবেশ করে। ভারতীয় সাঁজোয়া বহরের সামনে নিজামের দুর্বল সীমান্ত ফাঁড়িগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
১৪-১৫ সেপ্টেম্বর (২য় ও ৩য় দিন): নলদুর্গ, জহিরাবাদ এবং সুরিয়াপেটে নিজাম স্টেট ফোর্স কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণ এবং আধুনিক কামানের গোলাবর্ষণে তা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রাজাকার বাহিনী প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্রের অভাবে পালিয়ে যেতে শুরু করে।
১৬ সেপ্টেম্বর (৪র্থ দিন): ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দ্রাবাদ শহরের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। সেনাপতি এল-ইদ্রুস উপলব্ধি করেন যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মানে শুধুই সৈন্যদের আত্মাহুতি দেওয়া। তিনি নিজামকে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের পরামর্শ দেন।
১৭ সেপ্টেম্বর (৫ম দিন): বিকেল ৪টায় নিজাম মীর ওসমান আলী খান রেডিও হায়দ্রাবাদে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, রাজাকার বাহিনীকে নিষিদ্ধ করেন এবং কাশেম রিজভীকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন। সন্ধ্যা ৭টায় ভারতীয় জেনারেল জে. এন. চৌধুরীর সামনে সেনাপতি এল-ইদ্রুস আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ নথিতে স্বাক্ষর করেন।
মাত্র ১০৮ ঘণ্টায় শেষ হয় বিশ্বের অন্যতম পরাক্রমশালী রাজ্য হায়দ্রাবাদের স্বাধীন অস্তিত্ব।
সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ ও কালপঞ্জি
হায়দ্রাবাদ সংকট, অপারেশন পোলো এবং এর পরবর্তী ঘটনাবলী সংক্ষেপে এক নজরে নিচে সারণীতে প্রদান করা হলো:
ঘটনাক্রম / ক্ষেত্র | সময়কাল / তারিখ | বিবরণ ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য |
স্বাধীনতার ঘোষণা | ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ | ৭ম নিজাম মির ওসমান আলী খান কর্তৃক হায়দ্রাবাদকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ঘোষণা। |
'যথাস্থিতি চুক্তি' সই | ২৯ নভেম্বর, ১৯৪৭ | ভারত ও হায়দ্রাবাদের মধ্যে ১ বছরের জন্য শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি। |
রাজাকার বাহিনীর তান্ডব | ১৯৪৭ – ১৯৪৮ | কাশেম রিজভীর নেতৃত্বে মিলিশিয়া বাহিনীর সহিংসতা, গণহত্যা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। |
অপারেশন পোলো সূচনা | ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮ | ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক ৫টি দিক থেকে হায়দ্রাবাদে সামরিক অভিযান শুরু। |
নিজামের আত্মসমর্পণ | ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮ | মাত্র ১০৮ ঘণ্টার মাথায় নিজাম বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও ভারতের সাথে আনুষ্ঠানিক সংযুক্তি। |
পণ্ডিত সুন্দরলাল কমিটি | ১ – ২১ নভেম্বর, ১৯৪৮ | প্রধানমন্ত্রী নেহেরু কর্তৃক গঠিত নিরপেক্ষ ৩ সদস্যের তদন্ত দল কর্তৃক গ্রামে গ্রামে সরেজমিন পরিদর্শন। |
রিপোর্টের তথ্য গোপন রাখা | ১৯৪৮ – ২০০১ | সহিংসতার ভয়াবহ তথ্য সম্বলিত রিপোর্ট টানা ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে গোপন রাখা হয়। |
হায়দ্রাবাদ রাজ্যের বিলুপ্তি | ১ নভেম্বর, ১৯৫৬ | 'রাজ্য পুনর্গঠন আইন'-এর অধীনে ভাষাভিত্তিক অন্ধ্রপ্রদেশ, বোম্বে ও মহীশূর রাজ্যে হায়দ্রাবাদের বিভাগ। |
গোপন ক্ষতের উন্মোচন: পণ্ডিত সুন্দরলাল কমিটি রিপোর্ট (১৯৪৮)
অপারেশন পোলোর মাধ্যমে হায়দ্রাবাদ ভারতের মানচিত্রে যুক্ত হলো এবং খবরের কাগজে ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই বিজয়কে উদযাপন করা হলো। কিন্তু সামরিক অভিযানের পরপরই রাজ্যের গ্রাম ও ছোট শহরগুলোতে কী ঘটেছিল, তা ছিল এক ভয়ঙ্কর ও অনুচ্চারিত ট্র্যাজেডি।
কমিটি গঠনের প্রেক্ষাপট
সামরিক অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর কাছে একের পর এক উদ্বেগজনক খবর আসতে শুরু করে। খবর পাওয়া যায় যে, সেনাবাহিনী ও ভারতীয় ইউনিয়নের সমর্থক স্থানীয় জনতা রাজাকারদের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সাধারণ নিরপরাধ মুসলিম নাগরিকদের ওপর ব্যাপক হিংস্রতা চালাচ্ছে।
পরিস্থিতির সত্যতা যাচাই করতে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু ১৯৪৮ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে কংগ্রেস নেতা পণ্ডিত সুন্দরলাল-এর নেতৃত্বে একটি ৩ সদস্যের নিরপেক্ষ তদন্ত দল গঠন করে হায়দ্রাবাদ পাঠান। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন কাজী আবদুল গফফার এবং মাওলানা আবদুস সামাদ মিস্ত্রী।
সরেজমিন তদন্ত ও রিপোর্টের বাস্তব চিত্র
পণ্ডিত সুন্দরলাল কমিটি ১৯৪৮ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত পুরো হায়দ্রাবাদ রাজ্যের ৭টি জেলা, ২১টি প্রধান শহর এবং ৫৯টি গ্রাম নিজে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেন। তারা হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ভুক্তভোগী, স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সেনাকর্তাদের সাথে কথা বলেন।
কমিটির তৈরি গোপন রিপোর্টে যা উঠে এসেছিল, তা স্বাধীন ভারতের তৎকালীন সরকারের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও ভয়াবহ ছিল:
প্রতিশোধমূলক গণহত্যা: অপারেশন পোলো শেষ হওয়ার সাথে সাথে এতদিন ধরে রাজাকারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ থাকা স্থানীয় জনতা, সশস্ত্র গ্যাং এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রতিশোধপরায়ণ দলগুলো গ্রামের পর গ্রামে সাধারণ মুসলিমদের ওপর আক্রমণ চালায়।
হত্যাকাণ্ডের শিকার: রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, হাজার হাজার সাধারণ মুসলিম যাদের সাথে রাজাকার বাহিনী বা রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না তাদের হত্যা করা হয়। উসমানাবাদ, গুলবার্গা, বিদর এবং নান্দেদ জেলায় সহিংসতার মাত্রা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা: রিপোর্টে নিরপেক্ষভাবে উল্লেখ করা হয় যে, ভারতীয় সেনাদলের অনেক কর্মকর্তা ও সদস্য অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শৃঙ্খলা রক্ষা করেছিলেন এবং অনেক স্থানে সাধারণ মানুষকে বাঁচিয়েছিলেন। তবে কয়েকটি অঞ্চলে স্থানীয় ভারতীয় সেনাদল নিরপেক্ষ না থেকে প্রতিশোধপ্রবণ জনতাকে সাহায্য করেছিল অথবা নিস্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল।
গণহত্যার পরিসংখ্যান: সুন্দরলাল কমিটি তাঁদের রিপোর্টে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে হিসাব করে উল্লেখ করেন যে, সামরিক অভিযানের পরবর্তী সহিংসতায় হায়দ্রাবাদ রাজ্যে কমপক্ষে ২৭,০০০ থেকে ৪০,০০০ নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন (বেসরকারি বা অন্যান্য ঐতিহাসিকদের মতে এই সংখ্যা ১ লক্ষ পর্যন্ত হতে পারে)।
রিপোর্ট চাপাচাপি ও অর্ধশতকের গোপনীয়তা
যখন পণ্ডিত সুন্দরলাল তাঁর রিপোর্টটি প্রধানমন্ত্রী নেহেরু ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার প্যাটেলের কাছে জমা দেন, তখন সরকার এক বিরাট ধর্মসংকটে পড়ে। নব্য স্বাধীন ভারতে তখন সবেমাত্র দেশভাগের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কিছুটা থিতিয়ে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে হায়দ্রাবাদের এই গণহত্যার খবর রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে পুনরায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকি ছিল।
ফলে, কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নেহেরু সরকার এই রিপোর্টটিকে 'অত্যন্ত গোপনীয়' (Top Secret) ঘোষণা করে চেপে যায়। সরকারি নথিপত্রে এর কোনো অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়নি। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় জাতীয় আর্কাইভে (National Archives of India) এই রিপোর্ট ধূলিমলিন হয়ে পড়ে থাকে। অবশেষে ২০০১ সালে ইতিহাসবিদদের গবেষণার জন্য এই বিস্ফোরক রিপোর্টটি জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা হয়।
নেপথ্যের কূটনৈতিক যুদ্ধ: মঙ্কটন, কে. এম. মুন্সী ও ছায়া কূটনীতি
১৯৪৭-৪৮ সালে নয়াদিল্লি ও হায়দ্রাবাদের মধ্যকার সংঘাত কেবল রাজপ্রাসাদ বা যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক দাবা খেলায় পরিণত হয়েছিল।
স্যার ওয়াল্টার মঙ্কটন (Sir Walter Monckton): নিজাম মীর ওসমান আলী খানের প্রধান সাংবিধানিক উপদেষ্টা ছিলেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার ওয়াল্টার মঙ্কটন। তিনি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। মঙ্কটন চেষ্টা করেছিলেন যাতে হায়দ্রাবাদ কমনওয়েলথের অধীনে একটি স্বায়ত্বশাসিত 'ডমিনিয়ন' হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কিন্তু সরদার প্যাটেল ও ভিপি মে নন (স্বরাষ্ট্র সচিব) এই প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন।
কে. এম. মুন্সী (K. M. Munshi): 'যথাস্থিতি চুক্তি' (Standstill Agreement)-র অধীনে নয়াদিল্লি থেকে হায়দ্রাবাদে ভারতের ‘এজেন্ট-জেনারেল’ হিসেবে পাঠানো হয় খ্যাতনামা আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ কে. এম. মুন্সীকে। তিনি হায়দ্রাবাদে অবস্থান করে নিজাম সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজরদারি চালান এবং সরদার প্যাটেলের কাছে প্রতিদিন গোপন গোয়েন্দা রিপোর্ট পাঠাতেন। নিজাম সরকার মুন্সীকে কার্যত গৃহবন্দী করে রেখেছিল এবং তাঁর টেলিফোন লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল।
মীর লাইক আলী ও চরমপন্থী মন্ত্রিসভা: ১৯৪৭ সালের নভেম্বরের পর নিজাম উগ্রপন্থী সংগঠন MIM ও কাশেম রিজভীর চাপে অপেক্ষাকৃত নমনীয় প্রধানমন্ত্রী ছাতারীর নবাবকে সরিয়ে মীর লাইক আলী-কে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। মীর লাইক আলীর মন্ত্রিসভার প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল রাজাকারদের হাতে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি: জাতিসংঘ (UN) ও পাকিস্তানের গোপন ভূমিকা
হায়দ্রাবাদ সংকটকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে নিজাম সরকার সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল:
জাতিসংঘে আপিল: ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে মীর লাইক আলীর নির্দেশে মইন নওয়াজ জং-এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল নিউ ইয়র্কের 'লেক সাকসেস'-এ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (UN Security Council) যায়। তারা অভিযোগ করে যে ভারত হায়দ্রাবাদের ওপর অন্যায় অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে এবং আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে।
পাকিস্তানের ঋণ ও সীমান্ত সাহায্য: আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে নিজাম সরকার পাকিস্তানকে গোপনে ২০ কোটি টাকার সরকারি ঋণ (Government Paper) প্রদান করে। তৎকালীন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী জাফরুল্লাহ খান জাতিসংঘে হায়দ্রাবাদের পক্ষে জোরদার সওয়াল করেন এবং হায়দ্রাবাদকে অস্ত্র সরবরাহের জন্য পরোক্ষভাবে সহায়তা করেন।
সিডনি কটন ও অস্ত্র চোরাচালান: অস্ট্রেলীয় দুঃসাহসী বিমানচালক সিডনি কটন (Sidney Cotton) নিজাম সরকারের অর্থায়নে করাচি থেকে রাতে গোপনে বিমান উড়িয়ে নিয়ে হায়দ্রাবাদের হেকিমপেট ও বেগমপেট বিমানবন্দরে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছে দিতেন।
সামরিক অভিযানের আড়াল: 'অপারেশন ক্যাটারপিলার' ও বিমান আক্রমণ
অপারেশন পোলোর সামরিক কৌশল এবং কার্যপ্রণালী সাধারণ পুলিশ অ্যাকশনের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল।
ক্যাটারপিলার থেকে পোলো: ভারতীয় সেনাবাহিনীর নথিপত্রে এই অভিযানের মূল সামরিক ব্লুপ্রিন্টের নাম ছিল 'অপারেশন ক্যাটারপিলার' (Operation Caterpillar)। পরবর্তীতে সাধারণের কাছে এটি 'অপারেশন পোলো' নামে প্রচার পায়।
বিমানবাহিনীর ভূমিকা: ভারতীয় বিমানবাহিনীর (IAF) প্রখ্যাত 'টেম্পেস্ট' (Tempest) স্কোয়াড্রন হায়দ্রাবাদের বেগমপেট বিমানঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে সিডনি কটনের চোরাচালান বন্ধ করে দেয়। এটিই ছিল স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের প্রথম প্রধান সমন্বিত 'এয়ার-ল্যান্ড' সামরিক অভিযান।
ত্রিভুজীয় সংঘাত: তেলেঙ্গানা কৃষক আন্দোলন ও 'চিত্রালা আইলাম্মা'
হায়দ্রাবাদের সংকট কেবল হিন্দু-মুসলিম বা ভারত-নিজামের সংঘাত ছিল না; এতে একটি তৃতীয় প্রধান অনুঘটক ছিল 'তেলেঙ্গানা সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন'।
সামন্তবাদী 'ভেত্তি' প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: হায়দ্রাবাদে 'ভেত্তি' (বিনামূল্যে শ্রম) এবং 'দেশমুখ'দের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামন্তপ্রথাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের প্রতীকী অনুঘটক ছিলেন চিত্রালা আইলাম্মা (Chityala Ailamma), যার জমি স্থানীয় জমিদারের লোকেরা দখল করতে গেলে ধোবি সম্প্রদায়ের এই নারী সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
কমিউনিস্ট বনাম রাজাকার বনাম ভারতীয় বাহিনী: তেলেঙ্গানায় অন্ধ্র মহাসভা ও কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) প্রায় ৩,০০০ গ্রামে নিজেদের শাসন বা 'গ্রাম স্বরাজ' প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেখানে রাজাকারদের সাথে কমিউনিস্টদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। ফলে ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন প্রবেশ করে, তাদের লড়াই করতে হয়েছিল একই সাথে রাজাকার এবং সশস্ত্র কমিউনিস্ট উভয় পক্ষের সাথেই।
পণ্ডিত সুন্দরলাল কমিটির রিপোর্টের গভীরে: জেলাওয়ারী ভয়াবহ চিত্র
পণ্ডিত সুন্দরলাল, কাজী আবদুল গফফার এবং ফারুখ সিয়ার সমন্বয়ে গঠিত ৩ সদস্যের কমিটি যে রিপোর্ট জমা দিয়েছিলেন, তাতে সহিংসতাকে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছিল:
জেলাভিত্তিক তথ্য:
উসমানাবাদ (Osmanabad): রিপোর্টে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছিল উসমানাবাদ ও লাতুর অঞ্চলে। সেখানে পুরো বরসি সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার সশস্ত্র লোক ঢুকে পড়ে শত শত গ্রাম ধ্বংস করে দেয়।
বিদর ও গুলবার্গা (Bidar & Gulbarga): বিদর ও গুলবার্গায় রাজাকারদের প্রধান ঘাঁটিগুলো ধ্বংস হওয়ার পর যে প্রশাসনিক শূন্যতা (Power Vacuum) তৈরি হয়, তার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় ডাকাত দল এবং উগ্রপন্থী গ্রুপগুলো ব্যাপকভাবে লুটপাট ও হত্যালায় মেতে ওঠে।
রিপোর্টে উল্লেখিত সেনা ভূমিকা: রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়, অধিকাংশ অঞ্চলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসাররা কঠোর হাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং বহু মুসলিম পরিবারকে শরণার্থী শিবিরে রক্ষা করেছিলেন। তবে কিছু নিচু স্তরের স্থানীয় ইউনিট এবং সশস্ত্র হোমগার্ড সদস্যরা স্থানে স্থানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল।
উত্তর-১৯৪৮ যুগ: সামরিক শাসন, 'মুলকি' আন্দোলন ও আধুনিক রূপান্তর
অপারেশন পোলোর মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ঘটলেও হায়দ্রাবাদের সাধারণ মানুষের সংকট রাতারাতি শেষ হয়নি।
মিলিটারি গভর্নেন্স (১৯৪৮–১৯৪৯): ১৯৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেজর জেনারেল জে. এন. চৌধুরী হায়দ্রাবাদের সামরিক গভর্নর (Military Governor) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কঠোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং রাজাকারদের বিচার শুরু করেন।
এম. কে. ভেলোডি সরকার (১৯৪৯–১৯৫২): সামরিক শাসনের পর জওহরলাল নেহেরু সিভিলিয়ান সিনিয়র আইসিএস অফিসার এম. কে. ভেলোডি-কে হায়দ্রাবাদের মুখ্যমন্ত্রী করে পাঠান। তিনি প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং সামন্তবাদী 'জাগীরদারী প্রথা' বিলুপ্তির আইন বাস্তবায়ন করেন।
১৯৫২-র প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন: ১৯৫২ সালের ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে হায়দ্রাবাদ রাজ্যের প্রথম এবং শেষ নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হন বুর্গুলা রামকৃষ্ণ রাও (Burgula Ramakrishna Rao)।
মুলকি আন্দোলন (Mulki Agitation - 1952): ১৯৪৮-এর পর মাদ্রাজ এবং বোম্বে থেকে প্রচুর অ-হায়দ্রাবাদী লোক এসে সরকারি চাকরি নেওয়া শুরু করলে স্থানীয় অধিবাসীরা (যাদের 'মুলকি' বলা হতো) আন্দোলন শুরু করে। এই 'মুলকি আন্দোলন'-এর সূত্র ধরেই পরবর্তীতে ১৯৬৯ এবং অবশেষে ২০১৪ সালে জন্ম নেয় পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্য।
ফলাফল, হায়দ্রাবাদ রাজ্যের বিলুপ্তি ও সামাজিক পুনর্গঠন
অপারেশন পোলো এবং পণ্ডিত সুন্দরলাল কমিটির রিপোর্টের ঘটনা প্রবাহ হায়দ্রাবাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির মানচিত্র চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
নিজামের মর্যাদা ও সামন্তবাদের অবসান
অপারেশন পোলোর পর নিজাম মির ওসমান আলী খান তাঁর সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা হারান। তবে ভারত সরকার তাঁর সাথে সম্মানজনক চুক্তি করে। তাঁকে নতুন গঠিত হায়দ্রাবাদ রাজ্যের 'রাজপ্রমুখ' (বর্তমান রাজ্যপালের সমতুল্য পদ) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা তিনি ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ধারণ করেন। নিজামের বিশালাকার সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত তহবিল বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে সাধারণ প্রজা কল্যাণে ব্যবহার করা হয়।
১৯৫৬: রাজ্যের ভৌগোলিক বিলুপ্তি (States Reorganisation Act)
১৯৫৬ সালে ভারত সরকার ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন আইন বাস্তবায়ন করে। এর মাধ্যমে বহু শতাব্দীর পুরনো ঐতিহাসিক 'হায়দ্রাবাদ রাজ্য'-কে ভারতের মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা হয় এবং ভাষার ভিত্তিতে তিন টুকরো করে পাশ্ববর্তী রাজ্যগুলোর সাথে যুক্ত করা হয়:
তেলেগু ভাষী অঞ্চল (তেলেঙ্গানা): অন্ধ্রপ্রদেশের সাথে যুক্ত হয় (পরে ২০১৪ সালে আলাদা তেলেঙ্গানা রাজ্য হয়)।
মারাঠি ভাষী অঞ্চল ( মারাঠওয়াদা): বোম্বে রাজ্য (বর্তমান মহারাষ্ট্র)-এর সাথে যুক্ত হয়।
কন্নড় ভাষী অঞ্চল (কর্নাতক ডেক্কান): মহীশূর রাজ্য (বর্তমান কর্ণাটক)-এর সাথে যুক্ত হয়।
MIM-এর রূপান্তর ও আধুনিক রাজনীতি
১৯৪৮ সালে সামরিক অভিযানের পর কাশেম রিজভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কয়েক বছর কারাদণ্ডের পর ১৯৫৭ সালে তাঁকে এই শর্তে মুক্তি দেওয়া হয় যে তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যাবেন। পাকিস্তানে গিয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই অত্যন্ত দীনহীন অবস্থায় কাশেম রিজভীর মৃত্যু হয়।
পাকিস্তানে যাওয়ার আগে কাশেম রিজভী ধ্বংসপ্রাপ্ত MIM সংগঠনের দায়িত্ব দিয়ে যান এক তরুণ আইনজীবী মাওলানা আবদুল ওয়াহেদ ওয়াইসি-র হাতে। আবদুল ওয়াহেদ ওয়াইসি উগ্রপন্থা ও রাজাকারের কলঙ্কিত ইতিহাস মুছে ফেলে সংগঠনটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন 'অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন' (AIMIM)। তিনি ভারতের সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে ডেক্কানি মুসলিমদের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার আদায়ের গণতান্ত্রিক দল হিসেবে একে পুনর্গঠিত করেন। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র সুলতান সালাউদ্দিন ওয়াইসি এবং বর্তমানে তাঁর পৌত্র আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ইতিহাস, মানবতা ও নিরাময়ের শিক্ষা
১৯৪৮ সালের হায়দ্রাবাদ সংকট, 'অপারেশন পোলো' এবং পরবর্তী ট্র্যাজেডি ভারতীয় উপমহাদেশের আধুনিক ইতিহাস অধ্যয়নে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল অথচ অপরিহার্য অধ্যায়।
একদিকে, ভারত সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ভৌগোলিকভাবে অখণ্ড, সার্বভৌম ও সুরক্ষিত আধুনিক ভারত রাষ্ট্র গঠনে হায়দ্রাবাদের অন্তর্ভুক্তি ছিল একটি ঐতিহাসিক ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রই তার বুকের ভেতর একটি অস্ত্রসজ্জিত, অনিয়ন্ত্রিত আধা-সামরিক বাহিনী এবং ভিন্নভাবাপন্ন রাজতন্ত্র মেনে নিতে পারে না।
অন্যদিকে, মানবাধিকার ও মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে রাজাকারের নৈরাজ্য এবং পরবর্তীতে পণ্ডিত সুন্দরলাল রিপোর্টে উন্মোচিত হাজার হাজার নিরপরাধ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি উভয়ই ছিল গভীর অনুশোচনা ও ট্র্যাজেডির দলিল। চরমপন্থী উগ্র রাজনীতি (যার রূপকার ছিলেন কাশেম রিজভী) কীভাবে একটি গোটা সমৃদ্ধ অঞ্চল এবং তার সাধারণ মানুষকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে, হায়দ্রাবাদের ইতিহাস তার এক জ্যান্ত প্রমাণ।
পণ্ডিত সুন্দরলাল কমিটি রিপোর্ট চেপে রাখার অর্থ ইতিহাসকে অস্বীকার করা নয়; বরং জাতীয় সংহতির স্বার্থে সময়মতো ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা করা। আজ সাড়ে সাত দশক পর, সেই রক্তক্ষয়ী অতীতের কালো মেঘ কেটে গিয়ে হায়দ্রাবাদ আধুনিক ভারত তথা বিশ্বের অন্যতম সেরা সমৃদ্ধ, প্রগতিশীল এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ মেগাসিটিতে পরিণত হয়েছে। তবে ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, চরমপন্থার প্রতিরোধ এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই কেবল একটি চিরস্থায়ী ও শান্তিময় সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।


















