ভারতের সবচেয়ে কম মুসলিম যে ১০টি প্রদেশে - ভারতের প্রান্তিক সংখ্যালঘুদের বাস্তবতা

ভারতের ধর্মীয় জনমিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনসংখ্যার বিচারে দেশটির সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমদের ভৌগোলিক উপস্থিতি অত্যন্ত অসম। বিশাল এই উপমহাদেশসম দেশে উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম কিংবা কেরালার মতো রাজ্যে যেখানে মুসলিমদের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য ও রাজনৈতিকভাবে নির্ণায়ক, সেখানে এমন অনেক রাজ্য রয়েছে যেখানে তারা অতি-ক্ষুদ্র এক সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। ২০১১ সালের সরকারি আদমশুমারি (Census 2011) অনুযায়ী, ভারতের এমন ১০টি রাজ্য রয়েছে যেখানে মোট জনসংখ্যার অনুপাতে মুসলিমদের উপস্থিতি ১.৩৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫.৮৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় যখন অতি-ক্ষুদ্র সংখ্যায় পরিণত হয়, তখন তাদের অস্তিত্ব কেবল গাণিতিক পরিসংখ্যানেই সীমিত থাকে না; বরং তা তাদের সামাজিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, মানবাধিকার এবং অর্থনৈতিক টিকে থাকার লড়াইকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ভারতের প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী পাহাড়ি রাজ্য, আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল এবং নির্দিষ্ট কিছু সমতল রাজ্যে মুসলিমদের জনসংখ্যা কম হওয়ার পেছনে রয়েছে জটিল ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণ। একই সাথে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের সামগ্রিক রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে এই ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু গোষ্ঠী কীভাবে বহুমুখী বৈষম্য, 'বহিরাগত' তকমা এবং ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তা অনুধাবন করা জরুরি।
ভারতের সবচেয়ে কম মুসলিম বাস করে যে ১০টি প্রদেশে
যে ১০টি রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা সবচেয়ে কম, সেগুলির প্রতিটিতে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং প্রতিদিনের জীবনযাত্রার চিত্র ভিন্ন। রাজ্যভিত্তিক সুগভীর পর্যবেক্ষণ নিচে উপস্থাপন করা হলো:
১. মিজোরাম (১.৩৫%)
২০১১ সালের ভারতের রাজ্যভিত্তিক আদমশুমারি অনুযায়ী মিজোরামে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১.৩৫ শতাংশ (১৪,৮৩২ জন) মুসলিম। খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ (প্রায় ৮৭%) এই পাহাড়ি রাজ্যে মুসলিম জনগোষ্ঠীর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি বা স্থানীয় আদিবাসী পরিচয় নেই।
মিজোরামে বসবাসকারী মুসলিমদের বড় অংশই রাজধানী আইজল, উত্তর সীমান্ত সংলগ্ন কোলাশিব এবং দক্ষিণের লংতলাই ও লুংলেই জেলার শহরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। এই জনসংখ্যার সিংহভাগই পরিযায়ী শ্রমজীবী, যাদের মূল উৎপত্তি পার্শ্ববর্তী আসামের বরাক উপত্যকা (বিশেষ করে কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জেলা), ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহার।
মিজোরাম সংবিধানের ষষ্ঠ তপশিলের আওতাভুক্ত এবং এখানে ১৮৭৩ সালের 'বেঙ্গল ইস্টার্ন ফ্রন্টায়ার রেগুলেশন' অনুযায়ী 'ইনার লাইন পারমিট' (ILP) ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকর। এর ফলে অ-উপজাতীয় যেকোনো ভারতীয় নাগরিককে রাজ্যটিতে প্রবেশ ও অবস্থানের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের পারমিট নিতে হয়। অ-উপজাতীয় হওয়ার কারণে তাদের স্থায়ী স্থাবর সম্পত্তি বা জমি ক্রয়ের কোনো আইনি অধিকার নেই। এমনকি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ বা স্থানীয় নির্বাচনে ভোটদানের অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত।
রাজ্যটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় এরা মূলত অসংগঠিত খাতের চালিকাশক্তি। ক্ষুদ্র ব্যবসা, গাড়ি মেরামত, সেলুন, দর্জির কাজ, রাজমিস্ত্রি, মাংস বিক্রয় এবং দৈনিক মজুরিভিত্তিক নির্মাণশ্রমিক হিসেবে এরা কাজ করেন।
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা মিজোরামে অত্যন্ত সীমিত। রাজধানী আইজলের জামে মসজিদ এবং দু-একটি নির্দিষ্ট প্রার্থনা কেন্দ্র ছাড়া রাজ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক মাদরাসা বোর্ড বা স্থায়ী ধর্মীয় ওয়াকফ সম্পত্তি নেই। ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে এই গোষ্ঠীটি পুরোপুরি ভাসমান এবং স্থায়ী নাগরিক সুযোগ-সুবিধাহীন অবস্থায় দিনযাপন করে।
২. সিকিম (১.৬২%)
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে সিকিমের মোট ৬,১০,৫৭৭ জন জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিমদের হার ১.৬২ শতাংশ (৯,৮৬৭ জন)। ভুটিয়া, লেপচা এবং নেপালি সংস্কৃতিভিত্তিক এই রাজ্যে ইসলাম ধর্মের কোনো সামাজিক বা ঐতিহাসিক সুফি ঐতিহ্যের বিকাশ ঘটেনি।
সিকিমের মুসলিম জনবসতি প্রধানত রাজধানী গ্যাংটক, রানিপুল, রংপো, জোরথাং, নামচি এবং তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে সীমাবদ্ধ। এরা মূলত রাজস্থান, বিহার, উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে জীবিকার তাগিদে সিকিমে আসা পরিযায়ী জনগোষ্ঠী। যদিও ঐতিহাসিক রেশম পথ (Old Silk Route) ধরে একসময় লাদাখি ও কাশ্মীরি মুসলিম ব্যবসায়ীদের সিকিম হয়ে তিব্বতে যাতায়াত ছিল, তবে বর্তমান মুসলিম সমাজের সাথে সেই ইতিহাসের কোনো সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা নেই।
ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭১এফ (Article 371F) অনুযায়ী সিকিমকে বিশেষ প্রশাসনিক ও আইনগত সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ১৯৭৫ সালে ভারতের সাথে অঙ্গীভূত হওয়ার সময় নির্ধারিত 'সিকিম সাবজেক্টস সার্টিফিকেট' (Sikkim Subject Certificate) বা স্থায়ী অধিবাসী সনদপত্র ছাড়া রাজ্যে জমি ক্রয় বা স্থায়ী সরকারি চাকরি লাভ অসম্ভব। এর ফলে দশকের পর দশক বসবাস করলেও অ-সিকিমিজ মুসলিমরা আইনি ও সামাজিকভাবে 'অস্থায়ী অর্থনৈতিক শ্রেণি' হিসেবে চিহ্নিত হন।
স্থানীয় পাহাড়ি অর্থনীতিতে তারা নির্দিষ্ট কিছু কারিগরি ও সেবামূলক খাতের ঘাটতি পূরণ করেন। গ্যাংটক ও অন্যান্য শহরের মূল বাজারে দর্জি, চর্মশিল্পী, মাংস বিক্রেতা, হোটেল-রেস্তোরাঁর রাঁধুনি, অটোমোবাইল মেকানিক এবং ক্ষুদ্র খুচরা ব্যবসায়ী হিসেবে তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
গ্যাংটক জামে মসজিদসহ হাতে গোনা কয়েকটি উপাসনালয়কে কেন্দ্র করে এদের ধর্মীয় জীবন পরিচালিত হয়। সিকিমে পর্যটন মৌসুম এবং নির্মাণকাজের তেজ অনুযায়ী এই জনগোষ্ঠীর আকার হ্রাস-বৃদ্ধি পায়। শীতকালে বা কাজের মন্দার সময় এদের অনেকেই নিজ নিজ মূল রাজ্যে ফিরে যান, ফলে স্থানীয় রাজনীতি ও নীতি-নির্ধারণে এদের কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা থাকে না।
৩. পাঞ্জাব (১.৯৩%)
১৯৪৭ সালের দেশভাগের ট্র্যাজেডি ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার গভীরতম ক্ষত বহনে বাধ্য হয়েছিল পাঞ্জাবের মুসলিম সমাজ। দেশভাগের পূর্বে (১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী) অবিভক্ত পূর্ব পাঞ্জাবে মুসলিমদের অনুপাত ছিল প্রায় ৩৮.৪%। তবে দেশভাগের সময় লক্ষ লক্ষ মানুষের গণ-স্থানান্তর ও ধ্বংসযজ্ঞের ফলে এই অঞ্চল থেকে অধিকাংশ মুসলিম পাকিস্তানে পাড়ি জমান। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষ ৩৫ হাজার (মোট জনসংখ্যার ১.৯৩%) মুসলিম বসবাস করেন।
দেশভাগের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ে পাঞ্জাবের একমাত্র ব্যতিক্রমী ও শান্তিময় স্থান ছিল মালেরকোটলা (Malerkotla)। ঐতিহাসিক এই রাজকীয় শহরটি তৎকালীন রক্তপাতের মধ্যেও শিখ-মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রীতির এক অনন্য দ্বীপে পরিণত হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক সৌহার্দ্যের মূল উৎস ১৭০৫ সালের একটি সিদ্ধান্ত; যখন সিরহিন্দের মুঘল গভর্নর দ্বারা দশম শিখ গুরু গোবিন্দ সিং-এর দুই কনিষ্ঠ পুত্রকে জীবিত প্রাচীরভেদে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তখন মালেরকোটলার তৎকালীন নবাব শের মুহাম্মদ খান এর তীব্র প্রতিবাদ জানান (যা ইতিহাস ও শিখ ঐতিহ্য 'হা কা যারা' বা 'হাক দা নারা' নামে পরিচিত)। এই প্রতিবাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধের কারণে ১৯৪৭-এর চরম সহিংসতায়ও শিখ সম্প্রদায় মালেরকোটলার মুসলিমদের ওপর কোনো আঘাত হানেনি এবং শহরটিতে একজন মুসলিমও প্রাণ হারাননি। ২০২১ সালে পাঞ্জাব সরকার মালেরকোটলাকে রাজ্যের ২৩তম জেলা হিসেবে ঘোষণা করে। এছাড়া স্থানীয় সুফি সাধক হায়দার শাইখের মাজারে শিখ, হিন্দু ও মুসলিমদের যৌথ উপস্থিতি আজও এই শহরের বহুধর্মীয় সহাবস্থানের পরিচয় বহন করে।
মালেরকোটলা এবং কাদিয়ান (গুরুদাসপুর জেলার একটি শহর, যা আহমাদিয়া মুসলিমদের প্রধান কেন্দ্র) ছাড়া পাঞ্জাবের বাকি অঞ্চলে বসবাসকারী স্থায়ী মুসলিমের সংখ্যা অতি নগণ্য। বর্তমান পাঞ্জাবের সিংহভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় অংশই উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান ও জম্মু-কাশ্মীর থেকে আগত পরিযায়ী শ্রমিক। পাঞ্জাবের কৃষি খাতে (যেমন ধান রোপণ ও ফসল কাটার মৌসুমে) এবং লুধিয়ানা, জলন্ধর, অমৃতসরের মতো শিল্পভিত্তিক শহরগুলোতে কায়িক শ্রমিকের বিপুল চাহিদাই এদের প্রধান আকর্ষণ।
সম্প্রতি এই পরিযায়ী শ্রমিকদের স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদী বসতি স্থাপনের সাথে সম্পর্কিত সামাজিক প্রেক্ষাপট কিছু পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছে। লুধিয়ানা বা পাটিয়ালার মতো শিল্পাঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে স্থানীয়ভাবে নতুন মসজিদ নির্মাণ, অস্থায়ী প্রার্থনা স্থান তৈরি এবং স্থানীয় শিখ গুরুদ্বারা বা হিন্দু মন্দিরের কাছাকাছি জমি ক্রয় নিয়ে মৃদু সামাজিক টানাপোড়েন ও প্রশাসনিক নজরদারি পরিলক্ষিত হয়।
৪. অরুণাচল প্রদেশ (১.৯৫%)
ভারতের সুদূর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সীমান্তবর্তী পার্বত্য রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে মুসলিমদের জনসংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, রাজ্যে মুসলিমদের মোট সংখ্যা প্রায় ২৭,০৪৫ জন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ১.৯৫%। অরুণাচল প্রদেশ ভারতের সর্বনিম্ন জনঘনত্ববিশিষ্ট রাজ্য (প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র ১৭ জন)। এখানে মুসলিম জনসংখ্যার বড় অংশই রাজধানী কমপ্লেক্স ইটানগর ও নাহারলাগুন এবং আসাম সীমান্তবর্তী নিচু জেলাগুলো, যেমন: পাপুম পারে, চ্যাংলাং, তিরপ, নামসাই ও লোহিত জেলায় কেন্দ্রীভূত।
অরুণাচল প্রদেশ একটি উপজাতি-শাসিত ও সংবেদনশীল সীমান্ত রাজ্য। রাজ্যটিতে নিশি, আদি, অপাতানি, মনপা, মিসমি ও তাংসার মতো ২৬টিরও বেশি প্রধান উপজাতীয় গোষ্ঠী বাস করে, যাদের নিজস্ব আইন, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। সমগ্র রাজ্যে 'বেঙ্গল ইস্টান ফ্রন্টিয়ার রেগুলেশন, ১৮৭৩'-এর অধীনে ইনার লাইন পারমিট (ILP) ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকর। এর ফলে অ-উপজাতীয় নাগরিকদের রাজ্যে প্রবেশ, বসবাস ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রশাসনিক অনুমতি নিতে হয় এবং তারা সেখানে স্থায়ীভাবে কোনো জমির মালিক হতে পারেন না।
অরুণাচল প্রদেশে বসবাসকারী মুসলিমদের প্রায় সকলেই অ-উপজাতীয় এবং তাদের একটি বড় অংশ প্রতিবেশী আসাম ও অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নির্মাণ শ্রমিক, কাঠের মিস্ত্রি, দিনমজুর ও কৃষি শ্রমিক। স্থানীয় উপজাতীয় সংস্থাসমূহ এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর কঠোর নজরদারির কারণে এদের নিয়মিত আইনি কাগজপত্র (আইএলপি) পরীক্ষা ও সামাজিক পর্যবেক্ষণের সম্মুখীন হতে হয়।
পার্বত্য এই রাজ্যে সীমান্ত সংবেদনশীলতা এবং আসাম বা কেন্দ্রস্তরের রাজনীতিতে সামান্য অস্থিতিশীলতা তৈরি হলেই বহিরাগত জনসংখ্যার প্রতি নিরাপত্তা সংক্রান্ত শঙ্কা বেড়ে যায়। ফলে যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক উত্তেজনার সময় অ-উপজাতীয় মুসলিম শ্রমিকদের প্রায়শই 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' বা 'মিয়া মুসলিম' হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রবণতা দেখা যায়। প্রশাসনিক পর্যায়ে নিয়মিত আইএলপি তল্লাশি অভিযান ও স্থায়ী বাসিন্দা সনদ (PRC) সংক্রান্ত কড়াকড়ি এই জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনকে এক ধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তার মুখে রাখে।
৫. ছত্তিশগড় (২.০২%)
ছত্তিশগড়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২.০২ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, যাদের সিংহভাগ রাজ্যের শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোতে কেন্দ্রীভূত। রায়পুর, বিলাসপুর, দুর্গ-ভিলাই শিল্পাঞ্চল এবং কোরবা ছাড়াও দক্ষিণ ছত্তিশগড়ের বস্তার ও উত্তর ছত্তিশগড়ের সুরগুজা বিভাগের জেলা সদরগুলোতে তাদের লক্ষণীয় উপস্থিতি রয়েছে। ঐতিহাসিক দিক থেকে এই অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মধ্য ভারতের প্রাচীন বাণিজ্য পথ ও পরিবহন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হয়ে বসতি স্থাপন করেছিল।
রাজ্যের অসংগঠিত ও ক্ষুদ্র অর্থনীতিতে এই সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ট্রাক ও আন্তঃরাজ্য পণ্য পরিবহন ব্যবসা, ভারী যানবাহনের মেকানিক ও গ্যারেজ পরিচালনা, লোহার স্ক্র্যাপের ব্যবসা, অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কশপ এবং ফল ও সবজির পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যে তাদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে।
বিগত এক দশকে রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে বস্তার, জশপুর ও কঙ্কেরের মতো আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ধর্মীয় ধর্মান্তরবিরোধী প্রচারণা এবং উগ্র ডানপন্থী সংগঠনগুলোর সামাজিক প্রভাব বৃদ্ধির ফলে এক ধরণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় স্তরে ভুয়া তথ্য ও গুজবের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গ্যারেজ মালিক ও পরিবহন শ্রমিকদের হয়রানি এবং কৌশলগত অর্থনৈতিক বয়কটের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা তাদের জীবনযাত্রার সামাজিক নিরাপত্তাকে সংকুচিত করে তুলছে।
৬. ওড়িশা (২.১৭%)
ওড়িশার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২.১৭ শতাংশ অংশ গঠনকারী মুসলিম সম্প্রদায় রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। কটক, ভদ্রক, কেন্দ্রাপড়া, পুরী এবং খুরদা জেলায় তাদের সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক বসতি রয়েছে। বিশেষ করে মুঘল ও নবাবী শাসনামল থেকে কটক শহর ও উপকূলীয় ওড়িশায় তাদের সমাজ-সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। ভাষা ও জীবনযাত্রার দিক থেকে তারা স্থানীয় ওড়িয়া সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ভাষার সাথে গভীরভাবে একীভূত; তাদের একটি বড় অংশের মাতৃভাষাও ওড়িয়া।
অর্থনৈতিক দিক থেকে ওড়িশার মুসলিম সম্প্রদায়ের অবদান বিভিন্ন ধারায় বিস্তৃত। কটকের ঐতিহ্যবাহী রুপার তারাকাসি শিল্প, কাপড়ের ব্যবসা, হ্যান্ডলুম ও জারি কাজ, চামড়া ও প্রক্রিয়াজাত মাংসের ব্যবসা, উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য ব্যবসা এবং স্থানীয় গণপরিবহন ব্যবস্থায় তাদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজ্যের উপকূলীয় এবং শিল্পাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে সামাজিক সম্প্রীতি নতুন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। জাতীয় ও রাজ্য মহাসড়কগুলোতে পশু পরিবহনের অভিযোগে প্রান্তিক গাড়িচালক ও ব্যবসায়ীদের ওপর গো-রক্ষা কেন্দ্রিক সহিংসতা ও গণপিটুনির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ভদ্রকের মতো ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোতে ধর্মীয় মিছিলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা স্থানীয় সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীদের সামাজিক স্থায়িত্বকে ব্যাহত করেছে। অন্যদিকে সুন্দরগড়, ময়ূরভঞ্জ ও কয়নঝড়ের মতো আদিবাসী ও খনিজ সমৃদ্ধ জেলাগুলোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্বল্পসংখ্যাক মুসলিম পরিবারগুলো স্থানীয় পর্যায়ে যেকোনো সামাজিক উত্তেজনার সময় আইনগত ও সামাজিকভাবে চরম সুরক্ষাহীনতায় ভোগে।
৭. হিমাচল প্রদেশ (২.১৮%)
হিমাচল প্রদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ অনুযায়ী মুসলিম সম্প্রদায়ের উপস্থিতি মূলত দুটি স্বতন্ত্র ধারায় বিভক্ত। প্রথমত, চম্বা, সিরমৌর ও কাংড়া জেলার পাহাড়ি ও গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী আদিবাসী ও স্থায়ী মুসলিম জনগোষ্ঠী। এদের মধ্যে পশুপালক 'গুজ্জর' সম্প্রদায় অন্যতম, যারা ঐতিহ্যগতভাবে গবাদিপশু পালন ও দুগ্ধ ব্যবসার সাথে যুক্ত এবং ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করে। এছাড়া সিরমৌরের নাহান ও চম্বার মতো ঐতিহাসিক শহরগুলোতে বহু প্রজন্ম ধরে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী মুসলিম পরিবার রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, রাজ্যের পর্যটন শিল্প, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নগর সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে শিমলা, সোলান, কুল্লু, মানালি ও ধর্মশালায় কাজ করতে আসা সাময়িক বা পরিযায়ী শ্রমজীবী মুসলিম জনগোষ্ঠী। এরা মূলত জম্মু-কাশ্মীর, উত্তর প্রদেশ ও বিহার থেকে আসা নির্মাণ শ্রমিক, কারিগর, ফল ও সবজি বিক্রেতা, ফলকাটাই শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র হকার।
সম্প্রতি শিমলার সাঞ্জৌলি এলাকার একটি মসজিদের বহুতল অবৈধ সম্প্রসারণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজ্যে তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের সৃষ্টি হয়। হিন্দু জাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের উদ্যোগে শুরু হওয়া প্রতিবাদ আন্দোলন দ্রুত 'বহিরাগত শ্রমিক' যাচাইকরণ ও পরিচয় নিবন্ধনের দাবিতে মোড় নেয়। অনেক জায়গায় স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতি ও নাগরিক সংগঠনগুলো পরিচয়পত্র ছাড়া ব্যবসা করতে না দেওয়ার নিয়ম চালু করে এবং অ-স্থানীয় মুসলিম ব্যবসায়ীদের বয়কটের ডাক দেয়। এর ফলে রাজ্যটিতে পরিযায়ী সংখ্যালঘু শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সামাজিক সুরক্ষা চরম সংকটে পড়ে এবং বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনি পর্যালোচনার অধীন রয়েছে।
৮. নাগাল্যান্ড (২.৪৭%)
উত্তর-পূর্ব ভারতের আদিবাসী অধ্যুষিত রাজ্য নাগাল্যান্ডে ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২.৪৭%, যার সিংহভাগই রাজ্যের প্রধান বাণিজ্যিক হাব ডিমাপুর এবং আসাম সীমান্ত সংলগ্ন চুমুকেদিমা, নিউল্যান্ড ও কোহিমা অঞ্চলে ঘনীভূত। রাজ্যের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও খুচরা ব্যবসা পরিচালনা করতে এই সম্প্রদায়ের অবদান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শহরের পাইকারি ও খুচরা সবজি বাজার, শুঁটকি ও মাংসের ব্যবসা, তৈরি পোশাকের দোকান, সেলুন, পরিবহন চালক এবং নির্মাণ খাতের কায়িক শ্রমে তারা অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
তবে ভারতের সংবিধানের ৩৭১(এ) অনুচ্ছেদ এবং ইনার লাইন পারমিট (ILP) ব্যবস্থার অধীনে বিশেষ মর্যাদা প্রাপ্ত নাগাল্যান্ডে স্থানীয় আদিবাসী নাগা ও অ-নাগা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। নাগাল্যান্ডের জাতীয়তাবাদী নাগা সংগঠন, স্থানীয় যুব সমিতি ও ছাত্র ইউনিয়নগুলো সীমান্ত পেরিয়ে আসা অ-নাগা মুসলিমদের ঢলকে জনসংখ্যাগত হুমকি হিসেবে দেখে। তাদেরকে প্রায়শই ঢালাওভাবে 'মিয়া' (Miya) কিংবা 'অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' (IBI) হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
সংবিধান অনুযায়ী নাগাল্যান্ডে অ-আদিবাসীদের জমি কেনার ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকায় অ-নাগা মুসলিমদের কোনো স্থায়ী ভূম্যাধিকার নেই। স্থানীয় নাগা নারীদের সাথে অ-নাগা মুসলিম পুরুষদের বিবাহ এবং তার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে জমি বা ব্যবসার অধিকার পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময় স্থানীয় সংগঠনগুলো ডিমাপুরসহ আশেপাশের এলাকায় ইনার লাইন পারমিট কঠোরভাবে কার্যকর করা, অবৈধ বহিরাগত চিহ্নিতকরণ অভিযান এবং ব্যবসায়িক বয়কটের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।
৯. মেঘালয় (৪.৪০%)
মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের সমতল নিম্নাঞ্চল (যেমন ফুলবাড়ি, রাজাবালা, টিক্রিকিল্লা যা আসামের ধুবড়ি জেলা সংলগ্ন) এবং রাজধানী শিলং ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রধানত মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৪০% মুসলিম।
ব্রিটিশ আমলে আসামের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে শিলং গড়ে ওঠার সময় থেকেই এখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের আগমন ঘটে। বর্তমানে শিলংয়ের বড়বাজার (Iewduh), পুলিশ বাজার এবং সংলগ্ন এলাকায় তারা মূলত পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, পোশাক তৈরি, কসাইখানা, পরিবহন ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রশাসনিক চাকরির সাথে যুক্ত। অন্যদিকে, পশ্চিম গারো পাহাড়ের নিম্নাঞ্চলের মুসলিমরা প্রধানত কৃষি, মৎস্য চাষ এবং আসাম-মেঘালয় সীমান্ত কেন্দ্রিক আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল।
মেঘালয় ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত (Sixth Schedule) রাজ্য হওয়ায় এখানে উপজাতীয় স্বায়ত্তশাসন অত্যন্ত প্রবল। খাসি (Khasi Students' Union বা KSU) এবং গারো ছাত্র সংগঠনগুলোর (Garo Students' Union বা GSU) দীর্ঘদিনের 'ভূমিপুত্র বনাম বহিরাগত' (Tribal vs Non-Tribal) রাজনৈতিক সমীকরণে অ-উপজাতীয় মুসলিমরা প্রায়শই সংকটের মুখে পড়েন।
ইনার লাইন পারমিট (ILP) চালুর দাবি, জমি কেনাবেচায় আইনি নিষেধাজ্ঞা এবং আসামের এনআরসি (NRC) ইস্যুকে কেন্দ্র করে অ-উপজাতীয় ব্যবসায়ীদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে। সামান্য কোনো ঘটনা বা স্থানীয় অস্থিরতা তৈরি হলেই বড়বাজারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক অঞ্চলে দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া, অ-উপজাতীয়দের ওপর হামলা এবং ব্যবসায়িক লাইসেন্স বাতিলের মতো ঘটনা ঘটে থাকে।
১০. তামিলনাড়ু (৫.৮৬%)
তামিলনাড়ুতে বসবাসকারী ৪২ লক্ষাধিক (মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫.৮৬%) মুসলিম সমাজ ভারতের অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে সামাজিকভাবে ভিন্ন। এরা মূলধারার তামিল সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে সমন্বিত এবং প্রধানত তামিলভাষী মুসলিম।
তামিল মুসলিম সমাজ মূলত কয়েকটি প্রধান সামাজিক উপগোষ্ঠীতে বিভক্ত যেমন লাব্বাই (শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ী), মারাক্কার বা মারাইকায়ার (ঐতিহাসিক সামুদ্রিক ব্যবসায়ী), রাউথার (ঐতিহাসিক অশ্ব ব্যবসায়ী ও ভূস্বামী) এবং কায়ালার (উপকূলীয় বাণিজ্য ও রত্ন ব্যবসায়ী)। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কা) 'চুলিয়া' নামে পরিচিত তামিল মুসলিম বণিকদের ঐতিহাসিকভাবে ব্যাপক বাণিজ্যিক প্রভাব ছিল।
তামিল সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এই সম্প্রদায়ের শত শত বছরের ইতিহাস রয়েছে। সপ্তদশ শতকে কবি উমরু পুলাভার রচিত মহানবী (স.)-এর জীবনীকাব্য সিরাপুরানাম তামিল সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য হিসেবে স্বীকৃত। নাগোর দরগাহর মতো স্থানগুলো শতাব্দী ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সমন্বিত ভাবধারার নিদর্শন বহন করে আসছে।
আম্বুর, ভানিয়ামবাড়ি ও রানিপেটে চামড়া শিল্পের প্রধান কারিগর ও ব্যবসায়ী হিসেবে এবং কিলকারাই, কায়ালপত্তনম, মেলাপালায়ম ও চেন্নাইয়ে প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের অবস্থান সুদৃঢ়। রাজনৈতিকভাবে এরা ভারতীয় ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (IUML) ও মনিথানেয়া মাক্কাল কাচি (MMK)-র মাধ্যমে দ্রাবিড় রাজনীতিতে (DMK ও AIADMK) সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় তামিল ও দ্রাবিড়ীয় অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য সত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ (যেমন ১৯৯৮ সালের কোয়েম্বাটুর হামলা) থেকে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তিত হয়। ডানপন্থী রাজনীতির প্রসার ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুর, কন্যাকুমারী, রামনাথপুরম ও তিরুনেলভেলি জেলায় ধর্মীয় মেরুকরণ দেখা দিয়েছে, যা স্থানীয় অসাম্প্রদায়িক সামাজিক কাঠামোয় টানাপোড়েন তৈরি করছে।
সরকারি তথ্যসূত্র: সবচেয়ে কম মুসলিম জনসংখ্যা বিশিষ্ট ১০টি রাজ্য
ভারতের ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী যেসব রাজ্যে মোট জনসংখ্যার তুলনায় মুসলিম অধিবাসীদের অনুপাত সবচেয়ে কম, সেগুলির পরিসংখ্যান ও সামাজিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
রাজ্য / প্রদেশ | মোট জনসংখ্যা (২০১১) | মুসলিম জনসংখ্যা | মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত (%) | প্রধান ধর্মীয় ও জনমিতিক চালিকাশক্তি |
মিজোরাম | ১০,৯৭,২০৬ | ১৪,৮৩২ | ১.৩৫% | খ্রিস্টান ও আদিবাসী উপজাতি অধ্যুষিত পাহাড়ি অঞ্চল |
সিকিম | ৬,১০,৫৭৭ | ৯,৮৬৭১ | ১.৬২% | হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী প্রধান পাহাড়ি রাজ্য |
পাঞ্জাব | ২,৭৭,৪৩,৩৩৮ | ৫,৩৫,৪৮৯ | ১.৯৩% | শিখ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য; ১৯৪৭-এর দেশভাগে গণ-হিজরত |
অরুণাচল প্রদেশ | ১৩,৮৩,৭২৭ | ২৭,০৪৫ | ১.৯৫% | খ্রিস্টান, হিন্দু ও স্থানীয় উপজাতীয় সংস্কৃতি প্রধান |
ছত্তিশগড় | ২,৫৫,৪৫,১৯৮ | ৫,১৪,৯৯৮ | ২.০২% | হিন্দু ও বিশাল আদিবাসী (তপশিলি উপজাতি) জনসংখ্যা |
ওড়িশা | ৪,১৯,৭৪,২১৮ | ৯,১১,৬৭০ | ২.১৭% | হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় রাজ্য |
হিমাচল প্রদেশ | ৬৮,৬৪,৬০২ | ১,৪৯,৮৮১ | ২.১৮% | চরম হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিমালয় পার্বত্যাঞ্চল |
নাগাল্যান্ড | ১৯,৭৮,৫০২ | ৪৮,৯৬৩ | ২.৪৭% | খ্রিস্টান উপজাতীয় প্রধান পার্বত্য সীমান্ত রাজ্য |
মেঘালয় | ২৯,৬৬,৮৮৯ | ১,৩০,৩৯৯ | ৪.৪০% | খাসি, গারো ও জাইন্তিয়া উপজাতি এবং খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ |
তামিলনাড়ু | ৭,২১,৪৭,০৩০ | ৪২,২৯,৪৭৯ | ৫.৮৬% | দ্রাবিড় সংস্কৃতি ও প্রাচীন উপকূলীয় বাণিজ্যকেন্দ্র |
জনমিতিক ও ঐতিহাসিক কারণ: কেন এই রাজ্যগুলোতে মুসলিম সংখ্যা এত কম?
ভারতের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল বা রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যার এই চরম স্বল্পতার পেছনে কোনো একটি একক কারণ কাজ করেনি। এর পেছনে রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক ভূ-রাজনীতি, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, মহাদেশীয় অভিবাসনের ইতিহাস এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের গভীর ক্ষত।
সাম্রাজ্যিক সীমানা ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান: মধ্যযুগীয় দিল্লি সালতানাত, মুঘল সাম্রাজ্য কিংবা পরবর্তীকালের আঞ্চলিক মুসলিম রাজবংশগুলোর শাসন মূলত উত্তর ভারতের সমতল অঞ্চল, গাঙ্গেয় অববাহিকা, দাক্ষিণাত্য এবং উপকূলীয় বাণিজ্যপথগুলোতে বিস্তৃত ছিল। হিমালয় পার্বত্যাঞ্চল (যেমন হিমাচল প্রদেশ ও সিকিম) এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের দুর্গম, ঘন জঙ্গল ও পাহাড়ঘেরা উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে (মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ) দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন কোনোদিনই প্রত্যক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে এসব অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রচারক, সুফি সাধক বা বণিকদের যাতায়াতও ছিল অত্যন্ত সীমিত। ফলস্বরূপ, ঐতিহাসিকভাবেই এসব অঞ্চলে স্থায়ী মুসলিম বসতি গড়ে ওঠেনি।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও রক্তক্ষয়ী জনসংখ্যা স্থানান্তর: ভারতের উত্তর-পশ্চিমের রাজ্যগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যার হ্রাস পাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ। তৎকালীন অবিভক্ত পাঞ্জাব অঞ্চল (যার মধ্যে বর্তমান ভারতের পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ ও হরিয়ানার বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল) ছিল অন্যতম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা। কিন্তু দেশভাগের সময় চরম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সীমান্ত নির্ধারণের ফলে তৎকালীন পূর্ব পাঞ্জাব থেকে লাখ লাখ মুসলিম পরিবার জীবন বাঁচাতে বর্তমান পাকিস্তানে হিজরত করতে বাধ্য হন। বিপরীতে, পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে লাখ লাখ শিখ ও হিন্দু পরিবার ভারতীয় পাঞ্জাবে চলে আসেন। এই অভূতপূর্ব ও ট্র্যাজিক জনসংখ্যা স্থানান্তরের ফলে পাঞ্জাব ও হিমাচল প্রদেশে মুসলিম জনমিতি রাতারাতি ধসে পড়ে এবং তারা নগণ্য সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়।
স্থানীয় নৃগোষ্ঠী, উপজাতীয় ঐতিহ্য ও খ্রিস্টান মিশন: উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি রাজ্যগুলোতে (যেমন মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়) ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয় উপজাতীয় সংস্কৃতি ও অ্যানিমিস্ট (প্রকৃতিপূজারী) বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। উনিশ ও বিশ শতকে ব্রিটিশ উপনিবেশকালে খ্রিস্টান মিশনারিদের ব্যাপক তৎপরতার ফলে এসব উপজাতি জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। ফলে সেখানে প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় স্তম্ভ হিসেবে খ্রিস্টধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে, মধ্য ভারতের ছত্তিশগড় ও ওড়িশার মতো রাজ্যগুলোতে আদিবাসী বা তপশিলি উপজাতি (Scheduled Tribes) এবং বৈদিক সনাতন সংস্কৃতির মানুষের সংখ্যা ছিল নিরঙ্কুশ। বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রধান শহরের বাইরে এসব রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গ্রামীণ এলাকায় বাইরের কোনো জনগোষ্ঠীর অভিবাসনের সুযোগ অত্যন্ত কম ছিল।
এসব প্রদেশে মুসলিমদের সামাজিক, আইনি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
যেসব রাজ্যে কোনো সম্প্রদায় ২ থেকে ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করে, সেখানে সামাজিক ও প্রশাসনিক স্তরে তাদের অস্তিত্ব চরম প্রান্তিকতার মুখোমুখি হয়। এই ১০টি রাজ্যে মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবনে যে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
রাজনৈতিক শূন্যতা ও প্রতিনিধিত্বহীনতা: জনসংখ্যার চরম স্বল্পতার কারণে এই রাজ্যগুলোতে মুসলিমদের কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি বা প্রভাব সৃষ্টি করার ক্ষমতা নেই। পাঞ্জাব বা তামিলনাড়ুর সামান্য কিছু পকেট বাদ দিলে মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল বা হিমাচল প্রদেশে মুসলিমদের মধ্য থেকে কোনো বিধায়ক (MLA) বা সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হওয়া বলতে গেলে অসম্ভব। কোনো ভোটব্যাংক না থাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সমস্যা, নাগরিক দাবি কিংবা নিরাপত্তার বিষয়টি প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। ফলে সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনা, সংখ্যালঘু তহবিল বরাদ্দ বা প্রতিনিধিত্বশীল নীতি নির্ধারণে তারা নীতিগতভাবে অদৃশ্য হয়ে থাকেন।
'বহিরাগত' তকমা ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আতঙ্ক: বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে (মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, অরুণাচল) মুসলিমদের অস্তিত্ব মানেই 'বহিরাগত' (Outsider) হিসেবে চিহ্নিত হওয়া। স্থানীয় পাহাড়ি সংস্কৃতি ও উপজাতীয় স্বাধিকারের রাজনীতিতে যেকোনো অ-উপজাতীয় মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, যার চরম আঘাত পড়ে বাংলাভাষী বা অন্য রাজ্য থেকে আসা মুসলিমদের ওপর। আসামের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (CAA) প্রভাবে এসব রাজ্যের ক্ষুদ্র মুসলিম ব্যবসায়ীদের সার্বক্ষণিক নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে দিন কাটাতে হয়। কথায় কথায় তাদের 'অবৈধ বাংলাদেশি' বলে চিহ্নিত করে আইনি ও প্রশাসনিক হয়রানি করা হয়।
প্রশাসনিক বাধা ও ধর্মীয় আচার পালনে বিধিনিষেধ: যেসব এলাকায় মুসলিমদের সংখ্যা অতিক্ষুদ্র, সেখানে সাধারণ ধর্মীয় অধিকার চর্চাও দূরহ হয়ে ওঠে। হিমাচল প্রদেশ, ছত্তিশগড় বা ওড়িশার অনেক গ্রামীণ এলাকায় নতুন মসজিদ নির্মাণ, পুরানো মসজিদ সংস্কার কিংবা কবরস্থানের (Burial Ground) জন্য সরকারি জমি অধিগ্রহণ করতে গেলে চরম প্রশাসনিক বাধা এবং স্থানীয় উগ্র ধর্মীয় সংগঠনগুলোর প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ঈদের সময় কোরবানির পশুবলি বা মাইকে আজান দেওয়া নিয়ে অহেতুক পুলিশি হস্তক্ষেপ ও আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
ধর্মীয় নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক বয়কট
সামাজিক ডোমেইনে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে থাকার কারণে যেসব রাজ্যে ১ থেকে ৩ শতাংশ মুসলিম বাস করেন, সেখানে উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ও উস্কানিমূলক রাজনীতির সহজে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন তারা।
গো-রক্ষা কেন্দ্রিক সহিংসতা ও লিঞ্চিং: ওড়িশা, ছত্তিশগড়, হিমাচল প্রদেশ এবং পাঞ্জাবের গ্রামগুলোতে গো-রক্ষা সংক্রান্ত উগ্র জাতীয়তাবাদী আইনের সুযোগ নিয়ে ক্ষুদ্র মুসলিম ব্যবসায়ী, গবাদি পশু পরিবহনকারী চালক ও কসাইদের লক্ষ্য করে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ভুয়ো গুজবের ওপর ভিত্তি করে জনতা কর্তৃক পিটিয়ে হত্যা (Mob Lynching) বা শারীরিকভাবে চরম লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটলেও এসব রাজ্যে মুসলিমদের কোনো আইনি বা সামাজিক সুরক্ষার সংগঠন না থাকায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
অর্থনৈতিক বয়কট ও উচ্ছেদ অভিযান: সাম্প্রতিক সময়ে হিমাচল প্রদেশ, ছত্তিশগড় ও উত্তর-পূর্বের কিছু এলাকায় এক নতুন ধরণের বৈষম্যমূলক কৌশল দেখা যাচ্ছে তা হলো মুসলিমদের বিরুদ্ধে 'অর্থনৈতিক বয়কট' (Economic Boycott)। উগ্র সামাজিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে স্থানীয় অধিবাসীদের আহ্বান জানানো হয় যাতে তারা মুসলিম ফল বিক্রেতা, ছোট দোকানদার, দর্জি কিংবা রাজমিস্ত্রিদের কাছ থেকে কোনো সেবা না নেন। হিমাচল প্রদেশের সিমলা ও কুল্লুতে 'যাচাইকরণ' (Verification)-এর নামে বহিরাগত মুসলিম হকারদের দোকানপাট জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া এবং শহর থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: কোনো এলাকায় যখন একটি সম্প্রদায়ের সংখ্যা অত্যন্ত কম থাকে, তখন সেখানে তারা গভীর মনস্তাত্ত্বিক আস্থাহীনতায় ভোগেন। ছত্তিশগড় বা ওড়িশার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোনো স্থানে ধর্মীয় মেরুকরণ হলে বা রাজনৈতিক দাঙ্গা উস্কে দেওয়া হলে এই ক্ষুদ্র মুসলিম পরিবারগুলো জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে বড় শহরের ঘিঞ্জি বস্তি বা মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় পালিয়ে যান। একে বলা হয় 'স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক বিচ্ছিন্নতা' বা গোটোলাইজেশন (Ghettoization)। এটি তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্থায়ীভাবে অনগ্রসরতার দিকে ঠেলে দেয়।
সাংবিধানিক সুরক্ষা ও উত্তরণের পথরেখা
ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৫ থেকে ৩০ পর্যন্ত প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালন, প্রচার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিচালনার স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে। তবে যে ১০টি রাজ্যে মুসলিমরা চরম সংখ্যালঘু, সেখানে সংবিধানের এই গণতান্ত্রিক আদর্শগুলোর প্রয়োগ প্রায়শই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:
আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ: রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে ক্ষুদ্র সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গো-রক্ষা বা 'বহিরাগত' ইস্যুতে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সহিংসতা চালানো গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।
প্রশাসনিক পরিচয়পত্র ও হয়রানি বন্ধ: উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি রাজ্যগুলোতে কাজের প্রয়োজনে যাওয়া বৈধ ভারতীয় নাগরিকদের 'অবৈধ অভিবাসী' নামে ডাকার চর্চা বন্ধ করতে হবে এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য একটি স্বচ্ছ, হয়রানিমুক্ত সরকারি নিবন্ধনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।
আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও সামাজিক সম্প্রীতি: যেসব এলাকায় হিন্দু বা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর আধিপত্য রয়েছে এবং মুসলিমদের সংখ্যা অত্যন্ত কম, সেখানে স্থানীয় সিভিল সোসাইটি, চার্চ, গুরুদ্বারা ও স্থানীয় ক্লাবের উদ্যোগে আন্তঃধর্মীয় সামাজিক মেলবন্ধনের ব্যবস্থা করা উচিত। এটি পারস্পরিক ভয় ও গুজব কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনা: ভারতের নীতি আয়োগ ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব অতি-ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু অধ্যুষিত পকেটগুলোকে চিহ্নিত করে বিশেষ শিক্ষা ও স্বনির্ভরতামূলক স্কিম (যেমন হুনার হাটের মতো প্ল্যাটফর্ম) বরাদ্দ করা উচিত, যাতে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন।
ভারতবর্ষের মহান গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি হলো 'বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য'। যখন কোনো বিশাল দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে ক্ষুদ্রতম সংখ্যালঘু গোষ্ঠীও নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাবান মনে করতে পারবে, কেবল তখনই একটি প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।






















