ভারতের সবচেয়ে বেশি দরিদ্র যে ১০টি প্রদেশ - আঞ্চলিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা

বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে ভারত আজ এক উদীয়মান পরাশক্তি। জিডিপির (GDP) আকৃতির বিচারে বিশ্বমঞ্চে দ্রুত ধাবমান ভারতের একদিকে যেমন রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, সামরিক সক্ষমতা ও দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে তীব্র আঞ্চলিক বৈষম্য ও দারিদ্র্যের রূঢ় বাস্তব রূপ।

ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামোকে বুঝতে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন সংবিধানগতভাবে ভারতে 'প্রদেশ' শব্দটির পরিবর্তে 'রাজ্য' (States) এবং 'কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল' (Union Territories) ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ভারতে ২৮টি রাজ্য এবং ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে মোট ৩৬টি প্রশাসনিক ইউনিট রয়েছে।

ভারত সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারক সংস্থা 'নীতি আয়োগ' (NITI Aayog) প্রকাশিত 'জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক' (National Multidimensional Poverty Index - MPI), রাজ্যগুলোর মাথাপিছু আয় (Per Capita Income) ও জিএসডিপি (GSDP)-র সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশটির সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সব রাজ্যে সমানভাবে পৌঁছায়নি। ভৌগোলিক দুর্গমতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিম্ন শিল্পায়ন, অবকাঠামোগত সংকট ও জনসংখ্যার চাপের কারণে বেশ কিছু রাজ্য এখনও দারিদ্র্যের বৃত্তে বন্দী।

এই প্রবন্ধে ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র ১০টি রাজ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ, তথ্যভিত্তিক ও বিস্তৃত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।

বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (MPI) কী এবং কীভাবে এটি পরিমাপ করা হয়?

ঐতিহ্যগতভাবে কোনো দেশ বা সমাজে দারিদ্র্য পরিমাপ করা হতো কেবল মানুষের দৈনিক আয় বা ভোগের সক্ষমতার (Income or Consumption Level) ওপর ভিত্তি করে যেমন দৈনিক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ (যেমন ১.৯০ বা ২.১৫ মার্কিন ডলার) আয় করতে না পারলে তাকে 'দরিদ্র' হিসেবে গণ্য করা হতো। তবে আয়ই মানুষের জীবনযাত্রার একমাত্র মানদণ্ড নয়। একজন মানুষের পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকলেও তিনি স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্ন পানীয় জল কিংবা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে ২০১০ সালে অক্সফোর্ড পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (OPHI) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) যৌথভাবে বিশ্বব্যাপী বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (Multidimensional Poverty Index - MPI) প্রবর্তন করে। আন্তর্জাতিক এই মডেলের ওপর ভিত্তি করে ভারত সরকারের নীতি আয়োগ (NITI Aayog) দেশীয় প্রেক্ষাপটকে প্রাধান্য দিয়ে 'জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক' চালু করে।

বহুমাত্রিক দারিদ্র্য বলতে বোঝায় কেবল আর্থিক সচ্ছলতার অভাব নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনে একজন মানুষ মৌলিক অধিকার, সুস্থ জীবনযাপন এবং আত্মউন্নয়নের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে কতটা বঞ্চিত (Deprived)।

সহজ কথায়, একজন ব্যক্তি যদি একই সাথে অপুষ্টিতে ভোগেন, তার সন্তান স্কুলে যেতে না পারে এবং ঘরে নিরাপদ খাবার পানি বা বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকে, তবে তিনি আপাতদৃষ্টিতে আয়ভিত্তিক দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও "বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের" শিকার।

মূল পার্থক্য: আয়ভিত্তিক দারিদ্র্য দেখায় মানুষের কাছে কত টাকা আছে, আর বহুমাত্রিক দারিদ্র্য দেখায় মানুষ প্রকৃতপক্ষে কী কী মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত

নীতি আয়োগের জাতীয় MPI-এর ৩টি মাত্রা ও ১২টি নির্দেশক

জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক পরিমাপ করতে নীতি আয়োগ আলকায়ার-ফোস্টার (Alkire-Foster) পদ্ধতি অনুসরণ করে। এই সূচকে মূলত ৩টি প্রধান মাত্রা (Dimensions) এবং মোট ১২টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশক (Indicators) ব্যবহার করা হয়।

স্বাস্থ্য (Health): পুষ্টি, শিশু ও কিশোর মৃত্যুহার এবং মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যসেবা।
শিক্ষা (Education): বিদ্যালয়ে শিক্ষার বয়স/বছর এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার।
জীবনযাত্রার মান (Standard of Living): রান্নার জ্বালানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানীয় জল, বিদ্যুৎ সুবিধা, উপযুক্ত আবাসন, গৃহস্থালি সম্পদ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রাপ্যতা।

যে পরিবারের মানুষ এই ১২টি নির্দেশকের এক-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি সুবিধা থেকে বঞ্চিত, তাদেরই সরকারি গণনায় 'বহুমাত্রিক দরিদ্র' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

১০টি দরিদ্রতম রাজ্যের বিস্তারিত ও গভীর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

১. বিহার (Bihar): দারিদ্র্যের শীর্ষস্থান ও কাঠামোগত সংকট

নীতি আয়োগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৩.৭৬% বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার নিয়ে বিহার ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিহারের এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে যেমন রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তেমনই রয়েছে ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।

"বিহারের অর্থনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একটি চরম ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার রাজ্য। উত্তর বিহারের 'কোশী নদী' প্রতি বছর যে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করে, তা রাজ্যের হাজার হাজার কোটি টাকার গ্রামীণ সম্পদ ধ্বংস করে দেয়।"

ঐতিহাসিক নীতিগত বঞ্চনা (Freight Equalisation Policy): ১৯৫২ সালে ভারত সরকার 'পণ্য পরিবহন সমতা নীতি' চালু করে। এর অধীনে পুরো ভারতে খনিজ পণ্যের পরিবহন ব্যয় সমান করে দেওয়া হয়। ফলে বিহার থেকে খনিজ পরিবহন সহজ হলেও স্থানীয়ভাবে ভারী শিল্প গড়ে তোলার যে প্রাকৃতিক সুযোগ বিহারের ছিল, তা হাতছাড়া হয়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও 'বিহারের দুঃখ': উত্তর বিহার মূলত কোশী, গণ্ডক ও বাগমতী নদীর প্লাবনভূমিতে অবস্থিত। হিমালয় থেকে নেমে আসা কোশী নদীকে 'বিহারের দুঃখ' (Sorrow of Bihar) বলা হয়। প্রতি বছর বর্ষায় পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে গতিপথ পরিবর্তন করে নদীটি হাজার হাজার একর ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও গ্রামীণ অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

ঝাড়খণ্ড পৃথকীকরণ ও শিল্প শূন্যতা: ২০০০ সালে বিহার ভেঙে নতুন রাজ্য 'ঝাড়খণ্ড' গঠিত হয়। বিহারের মোট খনিজ সম্পদের বড় অংশ এবং জামশেদপুর, ধানবাদের মতো শিল্পনগরীগুলো ঝাড়খণ্ডের অধীনে চলে যায়। এর ফলে বিহার মূলত খনিজবিহীন, নিম্ন-উৎপাদনশীল কৃষিভিত্তিক রাজ্যে পরিণত হয়।

জনসংখ্যার চাপ ও শ্রম অভিবাসন (Labor Migration): বিহার ভারতের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল (প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,১০০ জনের বেশি)। স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পায়নের অভাব এবং কৃষিতে নিম্ন আয়ের কারণে কোটি কোটি তরুণ দিনমজুর ও শ্রমিক হিসেবে দিল্লি, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র বা গুজরাটে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। এর ফলে রাজ্যের ভেতরের অর্থনীতি প্রধানত বাইরের পাঠানো অর্থের (Remittances) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

২. ঝাড়খণ্ড (Jharkhand): 'সম্পদের অভিশাপ' ও সুশাসনের অভাব

ভারতের মোট খনিজ সম্পদের প্রায় ৪০% একাই সরবরাহ করে ঝাড়খণ্ড। কয়লা, আকরিক লোহা, তামা, ইউরেনিয়াম ও অভ্রের মতো মূল্যবান সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও রাজ্যটির ২৮.৮১% মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

সম্পদের অভিশাপ (Resource Curse / Dutch Disease): অর্থনীতিতে 'সম্পদের অভিশাপ' বলতে এমন এক পরিস্থিতিকে বোঝায় যেখানে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কোনো অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় না। খনি খাত থেকে সংগৃহীত বিপুল রাজস্ব জাতীয় বাজেটে যোগ হলেও স্থানীয় আদিবাসী (Adivasi) জনগণের অবকাঠামো উন্নয়ন বা কল্যাণে ব্যয় হয় না।

উচ্ছেদ ও পরিবেশগত ধস: খনি প্রকল্পের জন্য ব্যাপকভাবে জঙ্গল কাটা এবং জমি অধিগ্রহণের কারণে হাজার হাজার আদিবাসী পরিবার ভিটেমাটিহীন হয়েছে। পরিবেশ দূষণ ও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট তাঁদের কৃষিভিত্তিক জীবিকাকেও ধ্বংস করেছে।

অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যায়নের অভাব: ঝাড়খণ্ডের অর্থনীতি অতিরিক্ত মাত্রায় খনি ও ভারী ধাতব শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME), তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা কৃষি খাতের কোনো বিকাশ ঘটেনি।

প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: ২০০০ সালে রাজ্যটি গঠিত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন এবং স্থানীয় দুর্নীতি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নমূলক নীতি বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩. মেঘালয় (Meghalaya): পাহাড়ি ভূখণ্ড ও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা

উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম সুন্দর এই রাজ্যটিতে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ২৭.৭৯%। বাহ্যিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্ত্বেও মেঘালয়ের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামো অত্যন্ত ভঙ্গুর।

দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও চিকেনস নেক: ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ রক্ষাকারী সরু পথ 'চিকেনস নেক' বা শিলিগুড়ি করিডোর অত্যন্ত সংবেদনশীল। দুর্গম পাহাড় ও ঘন বনের কারণে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বড় মাপের কারখানা গড়ে তোলা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

বাজার সংযোগের অভাব (Market Linkage Issue): মেঘালয়ে উৎপাদিত অর্গানিক কৃষিপণ্য, যেমন আদা, হলুদ, আনারস ও সিট্রাস ফল অত্যন্ত উচ্চমানের। তবে আধুনিক কোল্ড-স্টোরেজ, পরিবহন ও অভ্যন্তরীণ বাজারের সাথে যোগাযোগের অভাবের কারণে স্থানীয় কৃষকরা সঠিক মূল্য পান না।

ঐতিহ্যবাহী ভূমি ব্যবস্থা ও শিল্পায়নে বাধা: মেঘালয়ের তিন প্রধান উপজাতি খাসি, জয়ন্তিয়া ও গারোদের নিজস্ব মাতৃতান্ত্রিক ও সমাজভিত্তিক ভূমি ব্যবস্থা রয়েছে। বাইরের বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে জমি কেনা বা দীর্ঘমেয়াদে ইজারা নেওয়ার ওপর আইনি বিধিনিষেধ থাকায় বড় কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করতে সাহস পায় না।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ঘাটতি: প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামগুলোতে পাকা রাস্তা না থাকায় জরুরী চিকিৎসাসেবা ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটতে পারেনি, যা মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

৪. উত্তর প্রদেশ (Uttar Pradesh): বিশাল অর্থনীতি বনাম বিশাল জনসংখ্যা

উত্তর প্রদেশ ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য, যার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ২৪ কোটিরও বেশি। ভারতের সামগ্রিক মোট রাজ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (GSDP) উত্তর প্রদেশের অবস্থান অন্যতম শীর্ষ সারিতে এবং রাজ্য সরকার ইতোমধ্যেই এটিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। তবে, এই বিশাল জিডিপির সুফল বিপুল জনসংখ্যার কারণে মাথাপিছু আয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় প্রতিফলিত হয় না। নীতি আয়োগের বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (MPI) অনুযায়ী, রাজ্যটিতে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২২.৯৩%।

মারাত্মক আঞ্চলিক বৈষম্য: উত্তর প্রদেশের অর্থনীতি মূলত তিনটি ভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিভক্ত:

পশ্চিম উত্তর প্রদেশ (Western UP): নয়ডা, গাজিয়াবাদ, মিরাট ও আগ্রা অঞ্চল শিল্পের দিক থেকে অত্যন্ত উন্নত। এছাড়া হরিত বিপ্লবের সুফল পাওয়ায় এখানকার কৃষিব্যবস্থাও বেশ আধুনিক ও সমৃদ্ধ।

পূর্বাঞ্চল (Purvanchal): গোরখপুর ও বারাণসী সংলগ্ন এই অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, কিন্তু আধুনিক শিল্পের বিস্তার পর্যাপ্ত নয়। ফলে এখানকার একটি বড় অংশ শ্রমভিত্তিক কাজের ওপর নির্ভরশীল।

বুন্দেলখণ্ড (Bundelkhand): এটি একটি চরম খরাপ্রবণ ও ভৌগোলিকভাবে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল। সেচ ব্যবস্থার ঘাটতি ও শিল্পহীনতার কারণে এখানকার পরিবারগুলো অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে থাকে।

কৃষি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা: রাজ্যের সিংহভাগ মানুষের জীবিকা কৃষিনির্ভর। তবে জমি উত্তরাধিকার সূত্রে ক্রমাগত খণ্ডবিখণ্ড হওয়ায় প্রায় ৯০%-এরও বেশি কৃষক এখন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক (১ থেকে ২ হেক্টরের কম জমি)। সারের উচ্চ মূল্য, প্রযুক্তিগত সীমানাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় ছোট জমি থেকে লাভজনক উৎপাদন করা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক ইতিবাচক পরিবর্তন ও অবকাঠামোগত গতি: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর প্রদেশে অভূতপূর্ব পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে:

এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক: যমুনা, আগ্রা, পূর্বাচল ও বুন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে এবং নির্মাণাধীন গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে রাজ্যের লজিস্টিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দ্রুতগতির করেছে।

ওডিঅপ (ODOP) স্কিম: 'ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট' উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিটি জেলার স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও শিল্পপণ্যকে বিশ্ববাজারে প্রসার দেওয়া হচ্ছে।

দারিদ্র্য বিমোচন: মেগা অবকাঠামো প্রকল্প এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রসারের ফলে গত কয়েক বছরে ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ উত্তর প্রদেশেই দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে এসেছে।

৫. মধ্যপ্রদেশ (Madhya Pradesh): প্রথাগত কৃষি ও গ্রামীণ বৈষম্য

ভারতের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত এই বিশাল আয়তনের রাজ্যটিতে বর্তমানে প্রায় ২০.৬৩% মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। ঐতিহাসিকভাবে ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখা তথাকথিত BIMARU (Bihar, Madhya Pradesh, Rajasthan, Uttar Pradesh) রাজ্যগুলোর তালিকায় মধ্যপ্রদেশ দীর্ঘদিন ধরে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাত-নির্ভর প্রথাগত কৃষি: মধ্যপ্রদেশ গম, সয়াবিন ও ডাল উৎপাদনে ভারতের শীর্ষ স্থানীয় রাজ্যগুলোর একটি। তবে রাজ্যের কৃষি খাতের বড় অংশই ভূগর্ভস্থ পানি এবং সঠিক সময়ে মৌসুমি বায়ুর আগমনের ওপর অত্যন্ত সংবেদনশীল।

সেচ ব্যবস্থার কভারেজ বৃদ্ধি পেলেও, অনাবৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে গ্রামীণ অর্থনীতি চরম সংকটে পড়ে। কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াকরণ (Agro-processing) শিল্পের পর্যাপ্ত অভাব থাকায় কৃষকরা ফসলের সঠিক যোগসাজশ পান না।

উপজাতীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অনগ্রসরতা: মধ্যপ্রদেশে ভারতের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আদিবাসী/উপজাতীয় জনগোষ্ঠী (যেমন- ভিল, গোন্ড) বসবাস করে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১%। পর্যাপ্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আধুনিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সংকুচিত থাকায় এই জনগোষ্ঠী সামাজিক সূচকে পিছিয়ে।

আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে অপুষ্টির হার, শিশুমৃত্যু (IMR) ও মাতৃমৃত্যুর হার (MMR) জাতীয় গড়ের চেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।

তীব্র শহর-গ্রাম বিভাজন: রাজ্যটিতে নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সমানভাবে বণ্টিত হয়নি:

ইন্দোর ও ভোপাল: ইন্দোর ভারতের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহরের স্বীকৃতি ধরে রাখার পাশাপাশি রাজ্যটির বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ভোপাল প্রশাসনিক ও প্রযুক্তির দিক থেকে এগোচ্ছে।

গ্রামীণ মধ্যপ্রদেশ: মালব, বুন্দেলখণ্ড বা মহাকোশল অঞ্চলের গ্রামীণ সমাজ এখনও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও যোগাযোগের মতো মৌলিক সামাজিক পরিকাঠামোর দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

৬. অসাম (Assam): নদী ভাঙন ও ভঙ্গুর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি

কৌশলগতভাবে অসামকে উত্তর-পূর্ব ভারতের 'গেটওয়ে' বলা হলেও রাজ্যটির নিজস্ব গ্রামীণ অর্থনীতি নানা প্রাকৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতায় জর্জরিত। রাজ্যটিতে দারিদ্র্যের হার আনুমানিক ১৯% থেকে ২০%-এর কাছাকাছি।

ব্রহ্মপুত্র ও সুরমার প্রলয়ংকরী বন্যা: প্রতি বছর বার্ষিক বর্ষা মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র এবং সুরমা (বরাক) নদীর অতিরিক্ত প্লাবন অসামের অর্থনীতিতে মারাত্মক আঘাত হানে:

বন্যার ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার পরিকাঠামো, সড়ক এবং শত শত একর আবাদি জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। এতে প্রতি বছর সরকারকে ত্রাণ ও জরুরি পুনর্বাসনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা মূল পরিকাঠামো উন্নয়নের বাজেট কমিয়ে দেয়।

নদী ভাঙন ও 'জলবায়ু শরণার্থী' সংকট: বন্যার চেয়েও নদী ভাঙন অসামের জন্য একটি নীরব ও দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়ে দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদী নদী ভাঙনে প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

রাতারাতি আবাদি জমি হারিয়ে অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এরা স্থায়ীভাবে 'জলবায়ু বা বাস্তুচ্যুত উদ্বাস্তুতে' পরিণত হয়ে নদীবাঁধ বা বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, যা দারিদ্র্যের স্থায়ী চক্র তৈরি করে।

শিল্পায়নের একমুখীতা ও বৈচিত্র্যের অভাব: অসামের অর্থনৈতিক ভিত্তি বহু বছর ধরেই কয়েকটি প্রথাগত খাতের ওপর সীমাবদ্ধ।

প্রথাগত খাত: চা শিল্প, খনিজ তেল (ডিগবয়, গুয়াহাটি রিফাইনারি) এবং প্লাইউড/কাঠ শিল্প।

বিনিয়োগের অভাব: তথ্যপ্রযুক্তি, বৃহৎ উৎপাদন খাত বা আধুনিক সেবা খাতে আশানুরূপ বড় অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক বিনিয়োগ আসেনি।

এছাড়া চা বাগান এলাকার শ্রমিক পরিবারগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থান এখনও বেশ নড়বড়ে, যা সামগ্রিক সামাজিক সূচককে প্রভাবিত করে।

৭. ছত্তিশগড় (Chhattisgarh): বিদ্যুতের প্রাচুর্য বনাম সাধারণের দারিদ্র্য

আপনার প্রদত্ত খসড়াটির তথ্য ও বিশ্লেষণ আরও সমৃদ্ধ করে একটি বিস্তারিত, তথ্যভিত্তিক ও প্রাঞ্জল নিবন্ধ নিচে তৈরি করে দেওয়া হলো:

ভারতের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য: সম্পদ, ভূগোল ও দারিদ্র্যের নানা রূপ

ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে রাজ্যগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো রাজ্য প্রভূত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হয়েও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার, আবার কোনো রাজ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার সাথে লড়াই করে টিকে রয়েছে। নিচে ছত্তিশগড়, ওড়িশা, নাগাল্যান্ড এবং মণিপুর—এই চার রাজ্যের অর্থনৈতিক সংকট, বহুমাত্রিক দারিদ্র্য এবং সম্ভাবনার বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

৭. ছত্তিশগড় (Chhattisgarh): বিদ্যুতের প্রাচুর্য বনাম সাধারণের দারিদ্র্য

২০০০ সালে মধ্যপ্রদেশ রাজ্য ভেঙে গঠিত হওয়া ছত্তিশগড় রাজ্যটি ভারতের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চল। কয়লা, লোহা, বক্সাইট, ডোলোমাইট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে রাজ্যটি ভারতের শীর্ষস্থানীয় সারিতে অবস্থান করছে। একে প্রায়শই ‘মধ্য ভারতের বিদ্যুতের কেন্দ্র’ (Power Hub) এবং ‘ধানের গোলা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবুও বৈcontradiction বা বৈপরীত্যের বিষয় হলো—রাজ্যটির প্রায় ১৫% থেকে ১৭% মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের (Multidimensional Poverty Index - MPI) নিচে বসবাস করছেন

একমুখী খনিভিত্তিক বিকাশ ও ‘রিসোর্স কার্স’ (Resource Curse): ছত্তিশগড়ের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত ক্যাপিটাল-ইনটেনসিভ বা মূলধন-নিবিড় খনি ও ভারী শিল্পের (যেমন: ভিলনিয় স্টিল প্ল্যান্ট, কোরবা পাওয়ার গ্রিড) ওপর নির্ভরশীল। খনি শিল্প বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব আয় করলেও স্থানীয় সাধারণ মানুষের জন্য ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে স্থানীয় আদিবাসী ও গ্রীন সমাজ কেবল স্বল্পবেতনের শ্রমিক হিসেবে কাজ পান, ফলে সম্পদের মূল সুবিধা কর্পোরেট ও রাজ্য কোষাগারেই সীমাবদ্ধ থাকে।

সেবা খাতের দুর্বলতা ও দক্ষতা ঘাটতি: তথ্যপ্রযুক্তি (IT), ব্যাংকিং, উচ্চশিক্ষা, পর্যটন বা আর্থিক সেবা খাতের মতো উচ্চ-বেতনের আধুনিক সেবা খাতের বিকাশ এখানে অত্যন্ত ধীরগতির। এর ফলে রাজ্যের গ্রামীণ যুবসমাজ আধুনিক কর্মসংস্থানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন না এবং বাধ্য হয়ে স্বল্প বেতনের কৃষিকাজ বা দিনমজুরিতে আটকে থাকছেন।

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও মাওবাদী প্রভাব: বস্তার, দান্তেওয়াড়া এবং হাসদেও আরান্দ বনাঞ্চলের মতো উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা মাওবাদী (নকশাল) অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা রাজ্যটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে এসব অঞ্চলে রাস্তাঘাট, সেতু, স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ ব্যাহত হয়েছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।

কৃষিতে প্রযুক্তি ও সেচের অভাব: ধান উৎপাদনে ঐতিহ্য থাকলেও রাজ্যের অধিকাংশ কৃষক বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। সেচ ব্যবস্থার সঠিক বিস্তার না হওয়ায় এবং আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে থাকায় কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা আশানুরূপ বৃদ্ধি পায়নি।

৮. ওড়িশা (Odisha): প্রাকৃতিক দুর্যোগ বনাম স্থিতিস্থাপকতার লড়াই

অতীতে ওড়িশা ভারতের অন্যতম পিছিয়ে পড়া ও দারিদ্র্যপীড়িত রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক দশকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিল্প বিনিয়োগে (বিশেষ করে স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও বন্দরকেন্দ্রিক শিল্প) ওড়িশা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও রাজ্যের ১৫% থেকে ১৬% মানুষ এখনো বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের সীমার নিচে বাস করেন

উপকূলীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতি: বঙ্গোপসাগরের দীর্ঘ উপকূলজুড়ে অবস্থানের কারণে ওড়িশাকে প্রায় প্রতি বছরই শক্তিশালী সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় (যেমন: ফাইলিন, ফণি, আমফান) ও জলোচ্ছ্বাসের মোকাবিলা করতে হয়। এসব দুর্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমি, চিংড়ি ঘের, গৃহস্থালি এবং ভৌত অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পুনর্গঠনে রাজ্য সরকারকে প্রতি বছর প্রচুর বাজেট বরাদ্দ করতে হয়।

উপকূলীয় বনাম অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক বৈষম্য: ওড়িশার অর্থনীতিতে একটি স্পষ্ট ভৌগোলিক বিভাজন দেখা যায়:

উন্নত উপকূলীয় অঞ্চল: ভুবনেশ্বর, কটক, পুরী ও পারাদ্বীপের মতো শহরগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন, বন্দর এবং ভারী শিল্পের কারণে দ্রুত উন্নয়ন ঘটেছে।

পিছিয়ে থাকা অভ্যন্তরীণ অঞ্চল (KBK বেল্ট): কোরাপুট, বলঙ্গীর ও কালাহান্ডি (KBK অঞ্চল হিসেবে পরিচিত) সহ অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় জেলাগুলোতে তীব্র খরা, পুষ্টিহীনতা, অবকাঠামোর অভাব এবং চরম দারিদ্র্যের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এখনো বিদ্যমান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার রোল মডেল ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও ওড়িশা জাতিসংঘের প্রশংসা পেয়েছে তাদের শূন্য-মৃত্যু (Zero Casualty) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতি এবং উন্নত সাইক্লোন শেল্টার ব্যবস্থার জন্য। তবে অবকাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা বাড়লেও প্রাকৃতিক আঘাতের পর সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটি এখনো ধীরগতির।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: পারাদ্বীপ ও ধামরা বন্দরের সম্প্রসারণ, বিশাল খনিজ সম্পদ (লোহা ও খনিজ বালি) এবং সমৃদ্ধ কোণার্ক-পুরী পর্যটন সার্কিটকে কাজে লাগিয়ে ওড়িশা টেকসই প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

৯. নাগাল্যান্ড (Nagaland): পার্বত্য বিচ্ছিন্নতা ও সীমিত অর্থনীতি

উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি রাজ্য নাগাল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান ও জটিল পার্বত্য পরিবেশ এখানকার অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে কঠিন করে তুলেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অত্যন্ত বেশি, অথচ সাধারণ মানুষের টেকসই আয়ের উৎস অত্যন্ত সীমিত। রাজ্যে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার প্রায় ১৫% থেকে ১৭%

শিল্প ও উৎপাদন খাতের অনুপস্থিতি: দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, কাঁচামাল পরিবহনের উচ্চ খরচ এবং মূল ভারতের বাজার থেকে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে নাগাল্যান্ডে কোনো মাঝারি বা ভারী উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।

প্রথাগত জুম চাষ ও কৃষি সংকট: রাজ্যের সিংহভাগ মানুষ এখনো প্রথাগত ‘জুম চাষ’ (Jhum Cultivation / Slash-and-Burn)-এর ওপর নির্ভরশীল। জুম চাষের কারণে পাহাড়ে মৃত্তিকা ক্ষয় হয় এবং এর উৎপাদনশীলতা অনেক কম। আধুনিক বাণিজ্যিক কৃষি বা উদ্যানপালনের (Horticulture) সুসংগঠিত বাজার গড়ে না ওঠায় কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে না।

কর্মসংস্থানের বৈচিত্র্যহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্ভরতা: রাজ্যে বেসরকারি খাতের উপস্থিতি নগণ্য হওয়ায় শিক্ষিত যুবসমাজের সিংহভাগই সরকারি চাকরির ওপর নির্ভরশীল। ফলে রাজ্য সরকারের ওপর বেতনের বিশাল চাপ তৈরি হয় এবং মূল অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বাজেটে অতিরিক্ত তহবিল অবশিষ্ট থাকে না।

বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা ও অবকাঠামো সংকট: ভারতীয় সংবিধানের ৩৭১(এ) অনুচ্ছেদ (Article 371A) নাগাল্যান্ডের জমি ও সম্পদের ওপর স্থানীয় উপজাতিদের বিশেষ অধিকার সুনিশ্চিত করেছে। এটি তাদের সংস্কৃতি রক্ষায় সহায়ক হলেও, শিল্প স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং বাইরে থেকে বড় ধরনের কর্পোরেট বিনিয়োগ টানার ক্ষেত্রে এটি কখনো কখনো জটিলতা তৈরি করে। তবে 'হর্নবিল উৎসব'-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে রাজ্যটি বর্তমানে ইকো-ট্যুরিজমে সম্ভাবনার আলো দেখাচ্ছে।

১০. মণিপুর (Manipur): পরিবহন ব্যয় ও বাজার বিচ্ছিন্নতা

উত্তর-পূর্বের অপর দৃষ্টিনন্দন রাজ্য মণিপুরে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার প্রায় ৯% থেকে ১০% যা অন্যান্য অনেক রাজ্যের তুলনায় কম হলেও, অঞ্চলটির অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও প্রবৃদ্ধি প্রতিনিয়ত বড় ধরনের ঝুঁকিতে থাকে।

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও চড়া পরিবহন খরচ: মণিপুর মূল ভারতের সাথে মূলত মাত্র দুটি জাতীয় সড়ক (NH-2 এবং NH-37)-এর মাধ্যমে যুক্ত। পাহাড়ি পথ, ভূমিধস এবং দীর্ঘ দূরত্বের কারণে রাজ্যে খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি থাকে। শিল্প কারখানার কাঁচামাল আনার খরচ অতিরিক্ত হওয়ায় স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক বা জাতীয় বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না।

উপত্যকা বনাম পাহাড়ের বৈষম্য (Valley vs Hill Divide): মণিপুরের ভৌগোলিক কাঠামো দুই ভাগে বিভক্ত কেন্দ্রীয় ইম্ফল উপত্যকা (Imphal Valley) এবং তাকে ঘিরে থাকা পার্বত্য অঞ্চল। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক সুবিধা ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা মূলত উপত্যকা কেন্দ্রিক হওয়ায় পাহাড়ি উপজাতীয় অঞ্চলগুলোতে (যেমন: উখ্রুল, চুরাচাঁদপুর) যোগাযোগের অভাব ও দারিদ্র্যের প্রভাব বেশি।

জাতিগত অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অবরোধ (Blockades): সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘদিনের জাতিগত ও সামাজিক সংঘাত, ঘন ঘন অর্থনৈতিক অবরোধ (Economic Blockade) এবং হরতালের কারণে মণিপুরের ব্যবসা-বাণিজ্য বারবার থমকে গেছে। সড়ক অবরোধের ফলে দিনের পর দিন পণ্যবাহী ট্রাক আটকে থাকে, যা মূল্যস্ফীতি ঘটায় এবং নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চরমভাবে নিরুৎসাহিত করে।

‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’ ও ক্রীড়া সম্ভাবনার আলো: মণিপুরকে বলা হয় ভারতের ‘Act East Policy’-এর প্রবেশদ্বার। রাজ্যের ‘মোরে’ (Moreh) সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া হস্তশিল্প, রেশম শিল্প (Silk) এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে মণিপুরের সাফল্য (যাকে ‘Sports Hub of India’ বলা হয়) রাজ্যটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ইতিবাচক দিক।

ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র ১০টি রাজ্য

রাজ্যের নাম

বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার (MPI)

দারিদ্র্যের প্রধান কারণ ও অর্থনৈতিক পটভূমি

প্রধান অর্থনৈতিক খাত

বিহার (Bihar)

৩৩.৭৬%

বার্ষিক বিধ্বংসী বন্যা (কোশী নদী), শিল্পায়নের অভাব, উচ্চ জনঘনত্ব ও ব্যাপক কর্মসংস্থানহীনতা।

প্রথাগত কৃষি ও দিনমজুরি

ঝাড়খণ্ড (Jharkhand)

২৮.৮১%

খনিজ সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাব, উপজাতীয় অঞ্চলের অবহেলা ও শিল্প বৈচিত্র্যের অভাব।

খনি খাত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমাঞ্চল

মেঘালয় (Meghalaya)

২৭.৭৯%

পাহাড়ি দুর্গম ভূখণ্ড, অবকাঠামোগত অনগ্রসরতা, ভারী শিল্পের অনুপস্থিতি ও বাজার সংযোগের অভাব।

পাহাড়ি কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা

উত্তর প্রদেশ (Uttar Pradesh)

২২.৯৩%

বিশাল জনসংখ্যার চাপ, চরম আঞ্চলিক বৈষম্য (পূর্বাঞ্চল ও বুন্দেলখণ্ড) ও কৃষি খাতের নিম্ন উৎপাদনশীলতা।

কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও সেবা খাত

মধ্যপ্রদেশ (Madhya Pradesh)

২০.৬৩%

প্রথাগত বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল কৃষি, গ্রামীণ ও শহরের মধ্যকার বিশাল বৈষম্য এবং আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের অনগ্রসরতা।

কৃষি ও গবাদিপশু পালন

অসাম (Assam)

১৯% - ২০%

ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় মারাত্মক নদী ভাঙন ও বার্ষিক বন্যা, অপর্যাপ্ত শিল্পায়ন ও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা।

চা শিল্প, কৃষি ও বনজ সম্পদ

ছত্তিশগড় (Chhattisgarh)

১৫% - ১৭%

খনিজ উত্তোলনকেন্দ্রিক অর্থনীতি, সেবা ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতের ধীরগতি এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সংকট।

খনি, বিদ্যুৎ ও কৃষি

ওড়িশা (Odisha)

১৫% - ১৬%

বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী হওয়ায় বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস) ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা।

খনি, উপকূলীয় সামুদ্রিক বাণিজ্য ও কৃষি

নাগাল্যান্ড (Nagaland)

১৫% - ১৭%

পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতা, পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থার উচ্চ ব্যয়, বড় শিল্পকারখানার অভাব ও সীমিত কর্মসংস্থান।

জুম চাষ ও স্থানীয় হস্তশিল্প

মণিপুর (Manipur)

৯% - ১০%

মূল ভূখণ্ডের সাথে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, উচ্চ পরিবহন খরচ, অবকাঠামোর ঘাটতি ও আঞ্চলিক অস্থিরতা।

কৃষি, তাঁত ও ক্ষুদ্র অর্থনীতি

ভারতে রাজ্যভিত্তিক দারিদ্র্যের মূল কাঠামোগত কারণসমূহ

ভারতের দরিদ্রতম রাজ্যগুলোর (যেমন: বিহার, উত্তর প্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা ও অসম) অর্থনৈতিক চিত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে কয়েকটি অভিন্ন এবং সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত কারণ (Structural Factors) চোখে পড়ে:

প্রথাগত কৃষি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ও নিম্ন উৎপাদনশীলতা: দরিদ্র রাজ্যগুলোর প্রায় ৬০% থেকে ৭০% মানুষ এখনও জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, ক্ষুদ্র ও বিভক্ত জমি (Land Fragmentation) এবং অপর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থার কারণে কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা অত্যন্ত কম। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরা কৃষকদের বারবার দেনার দায়ে ফেলে দেয়, যা দারিদ্র্যের চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়: বিহার ও অসমের বার্ষিক বন্যা, ওড়িশার ধারাবাহিক ঘূর্ণিঝড় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মূল বাধা। অর্জিত জাতীয় ও সামাজিক মূলধনের এক বড় অংশ প্রতি বছর অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও ত্রাণ প্রদানে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে নতুন বিনিয়োগ ও সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

শিল্পায়নের আঞ্চলিক অসমতা ও ঐতিহাসিক নীতিগত বৈষম্য: স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকা 'ফ্রেট ইকুয়ালাইজেশন পলিসি' (Freight Equalization Policy)-র কারণে পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলো তাদের খনিজ সম্পদের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের (Liberalization) পর বেসরকারি ও বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) প্রধানত সমুদ্র উপকূলীয় ও উন্নত অবকাঠামোর রাজ্যগুলোতে যেমন তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে পুঞ্জীভূত হয়। এর ফলে উত্তর ও পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলো صنعتی বিকাশ ও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়ে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংকট: মানসম্মত শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাবে এই অঞ্চলগুলোর উদ্বৃত্ত যুবসমাজ বিশ্বমানের আইটি, ফাইন্যান্স কিংবা উচ্চ-উৎপাদনশীল ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে যুক্ত হতে পারছে না। মানসম্মত সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির কারণে দরিদ্র পরিবারগুলোকে চিকিৎসার বড় খরচ পকেট থেকে (Out-of-Pocket Expenditure) বহন করতে হয়, যা অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দেয়। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কম বেতনের দিনমজুর বা অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত।

প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা: অনেক পিছিয়ে পড়া রাজ্যে স্থানীয় শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নিচু স্তরের রাজস্ব আদায় ক্ষমতা এবং সরকারি স্কিম বাস্তবায়নে শ্লথগতি দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিগুলোর গতি কমিয়ে দিয়েছে।

'বিমারু' (BIMARU) ধারণার জন্ম ও বিবর্তন

১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের প্রখ্যাত ডেমোগ্রাফার ও অর্থনীতিবিদ আশিস বোস (Ashish Bose) একটি বিশেষ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শব্দ উদ্ভাবন করেন 'BIMARU'। এটি মূলত চারটি রাজ্যকে নির্দেশ করত:

BI: Bihar (বিহার)
MA: Madhya Pradesh (মধ্যপ্রদেশ)
R: Rajasthan (রাজস্থান)
U: Uttar Pradesh (উত্তর প্রদেশ)

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: আশিস বোস তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে বুঝিয়েছিলেন যে, ভারতের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যসেবা ও দারিদ্র্য বিমোচনের সব জাতীয় পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে যদি না এই চারটি রাজ্যের অনুন্নত অবস্থা দূর করা যায়।

বর্তমান চিত্র: গত চার দশকে এই ধারণায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। রাজস্থান এবং মধ্যপ্রদেশ প্রথাগত কৃষি ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে উন্নতি করে নিজেদের অবস্থা কিছুটা শুধরে নিয়েছে। তবে বিহার এবং উত্তর প্রদেশের পূর্ব অংশ এখনও তাদের বিশাল জনসংখ্যার কারণে দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

গত এক দশকের অভাবনীয় সাফল্য: ২৪.৮ কোটি মানুষের দারিদ্র্যমুক্তি

বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার বেশি থাকা সত্ত্বেও ভারত গত এক দশকে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম দারিদ্র্য বিমোচন রেকর্ড করেছে। নীতি আয়োগ এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-র যৌথ ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

যেসব রাজ্য সবচেয়ে বেশি সাফল্য দেখিয়েছে:

উত্তর প্রদেশ: গত ৯ বছরে সর্বোচ্চ ৫.৯৪ কোটি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে এসেছেন।

বিহার: দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩.৭৭ কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছেন।

মধ্যপ্রদেশ: প্রায় ২.৩ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে এসেছেন।

কেন এই পরিবর্তন সম্ভব হলো?

সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর (DBT): 'জন ধন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট', 'আধার' এবং 'মোবাইল' (JAM Trinity)-এর মাধ্যমে সরকারি অনুদান সরাসরি মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে দরিদ্রদের কাছে পৌঁছানো।

মৌলিক অবকাঠামো সরবরাহ: 'প্রধানমন্ত্রী আওয়াশ যোজনা'র মাধ্যমে পাকা ঘর, 'উজ্জ্বলা যোজনা'র মাধ্যমে বিনামূল্যে রান্নার গ্যাস এবং 'জল জীবন মিশন'-এর মাধ্যমে ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছানোয় সূচকের মান দ্রুত উন্নত হয়েছে।

শহর বনাম গ্রাম: দারিদ্র্যের ভৌগোলিক বিভাজন

ভারতে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের রূপটি শহরে ও গ্রামে সম্পূর্ণ ভিন্ন:

গ্রামীণ দারিদ্র্য (Rural Poverty): ভারতের গ্রামাঞ্চলে এখনও দারিদ্র্যের হার প্রায় ১৯.২৮%। কৃষিতে অনিয়মিত আয়, মৌসুমী বেকারত্ব এবং স্বাস্থ্যসেবার দুর্বল কাঠামোর কারণে গ্রামের মানুষ মৌলিক সুবিধা থেকে বেশি বঞ্চিত।

নগর দারিদ্র্য (Urban Poverty): শহরের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫.২৭%। শহরে কাজের সুযোগ ও মৌলিক অবকাঠামো ভালো হলেও সেখানে নতুন সংকট তৈরি করছে 'বস্তি এলাকা' (Slums) এবং জীবনযাত্রার অতিরিক্ত খরচ।

আয়ের চরম বৈষম্য: দারিদ্র্য কমলেও বাড়ছে ব্যবধান

বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক (যা মূলত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গৃহস্থালি সুবিধার ওপর নির্ভর করে) কমলেও ভারতে আর্থিক বৈষম্য তীব্র আকার ধারণ করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা 'ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব' (World Inequality Lab) এবং অক্সফ্যাম (Oxfam)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী:

ভারতের শীর্ষ ১% ধনকুবেরের হাতে দেশের মোট সম্পদের ৪০%-এরও বেশি পুঞ্জীভূত। দেশের নিচের সারির ৫০% মানুষের হাতে রয়েছে মোট জাতীয় সম্পদের মাত্র ৬% থেকে ৭%।

অর্থাৎ, সরকার মানুষের প্রাথমিক মৌলিক চাহিদা (বাড়ি, পানি, বিদ্যুৎ) পূরণ করতে সফল হলেও ভালো বেতনের কর্মসংস্থান তৈরির অভাব এবং সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যবর্তী সামাজিক ব্যবধান কমছে না।

সামাজিক কাঠামো ও লিঙ্গভিত্তিক প্রভাব

ভারতের দারিদ্র্যের ধরণ সামাজিক কাঠামোর সাথেও গভীরভাবে যুক্ত:

সামাজিক শ্রেণী বিভাগ: পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের আদিবাসী (Scheduled Tribes - ST) এবং দলিত (Scheduled Castes - SC) জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি।

নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য সংকট: দারিদ্র্য কমার পরেও বিহার, ঝাড়খণ্ড ও মেঘালয়ের মতো রাজ্যগুলোতে নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা (Anemia) এবং কোপোশনের (Stunting/Wasting) হার এখনও আশঙ্কাজনকভাবে বেশি, যা ভবিষ্যতে শ্রমশক্তির সক্ষমতাকে ব্যাহত করে।

কেন্দ্র-রাজ্য রাজস্ব সংঘাত

ভারতের দরিদ্র রাজ্যগুলোর এই পরিস্থিতি একটি বড় রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে- ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ কমিশন (Finance Commission) যখন বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে করের টাকা ভাগ করে দেয়, তখন দারিদ্র্য ও জনসংখ্যাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফলে বিহার বা উত্তর প্রদেশের মতো দরিদ্র রাজ্যগুলো কেন্দ্রীয় ফান্ড থেকে বেশি অর্থ সহায়তা পায়। এতে তামিলনাড়ু, কর্ণাটক ও কেরালার মতো অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, কারণ তাদের করের টাকায় দরিদ্র রাজ্যগুলোকে দীর্ঘ মেয়াদে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

দারিদ্র্য বিমোচনে ভারত সরকারের গ্রহণ করা প্রধান পদক্ষেপসমূহ

দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে ভারত সরকার বেশ কিছু ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প পরিচালনা করছে:

আকাঙ্ক্ষী জেলা কর্মসূচি (Aspirational Districts Programme): ভারতের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া ১১২টি জেলাকে চিহ্নিত করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে সরাসরি কেন্দ্রীয় তদারকির মাধ্যমে দ্রুত উন্নয়ন ঘটানো হচ্ছে।

মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন (MGNREGA): গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র পরিবারগুলোকে বছরে অন্তত ১০০ দিনের কাজের আইনি নিশ্চয়তা প্রদান।

প্রধানমন্ত্রী আবাসন যোজনা (PMAY): দরিদ্র গৃহহীন পরিবারগুলোকে পাকা বাড়ি নির্মাণের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া।

জল জীবন মিশন (Jal Jeevan Mission): ভারতের প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারে নল দিয়ে নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার প্রকল্প।

প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি (PM-KISAN): প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বাৎসরিক আর্থিক সহায়তা প্রদান।

উত্তরণের পথ: কী করণীয়?

ভারতকে ২০৪৭ সালের মধ্যে একটি উন্নত রাষ্ট্র (Viksit Bharat) হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এই দরিদ্র রাজ্যগুলোকে মূল অর্থনৈতিক ধারায় শক্তিশালীভাবে ফিরিয়ে আনতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন:

কৃষি-ভিত্তিক শিল্পায়ন (Agro-processing Hubs): বিহার, উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশে সরাসরি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন করা।

দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো: অসাম, বিহার ও ওড়িশায় স্থায়ী বাঁধ, আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং শক্তপোক্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা।

লজিস্টিকস ও ডিজিটাল কানেক্টিভিটি: উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সাথে রেল, বিমান ও স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থার মান আরও বৃদ্ধি করা।

দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থানীয় কর্মসংস্থান: তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক আইটি, টেক্সটাইল ও কারিগরি ট্রেনিং দিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে তোলা।

উপসংহার

ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র ১০টি রাজ্যের বর্তমান চিত্রটি কেবল অনুন্নয়নের গল্প নয়; বরং এটি সম্ভাবনারও এক বিশাল ক্ষেত্র। সঠিক নীতি গ্রহণ, স্বচ্ছ প্রশাসন, আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে এই রাজ্যগুলোই ভারতের আগামী দিনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ইঞ্জিনে পরিণত হতে পারে। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য দূরীকরণে নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক উদ্যোগ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ যেভাবে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসছে, তা ভবিষ্যতে এক ভারসাম্যপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভারতের আশা জাগায়।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.