ইনকিলাব জিন্দাবাদ - ঔপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান

রাজনীতি ও গণসংগ্রামের ইতিহাসে স্লোগান কেবল কতিপয় শব্দের সমাহার নয়; এটি একটি যুগের স্পন্দন, শোষিতের ক্ষোভ এবং পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষার বাহক। একটি সফল স্লোগান সাধারণ মানুষকে একক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহস জোগায়।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার যে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, তার রাজপথ থেকে উঠে আসা অন্যতম প্রধান ও ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত শব্দগুচ্ছ ছিল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’

দীর্ঘদিন ধাপাছাপা পড়ে থাকা বা রাজনৈতিক ব্যাকবেঞ্চে আটকে থাকা এই স্লোগানটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাতারাতি তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। রাজপথের মিছিলে, দেয়ালে লেখা গ্রাফিতিতে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল দেওয়ালে এই স্লোগানের প্রকম্পন দেখা যায়। আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিকেও তাদের অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে ‘ইনকিলাব’ শব্দটির ব্যবহারে সংহতি জানাতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্ব যখন নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ ঘটায়, তখনও তাদের মঞ্চের প্রধান স্লোগান হিসেবে উচ্চারিত হয় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’

তবে স্লোগানটির বিপুল জনপ্রিয়তার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে একটি তীব্র বিতর্ক ও আপত্তির সুরও ধ্বনিত হয়েছে। কিছু সমালোচকদের দাবি ‘ইনকিলাব’ কোনো বাংলা শব্দ নয়, এটিকে বাংলা ভাষায় জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।এটি মূলত বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের একচেটিয়া স্লোগান, যা বাংলাদেশের মূলধারার সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কিন্তু প্রকৃত সত্য কী? কীভাবে একটি শব্দ শতবর্ষের ইতিহাস পেরিয়ে, বিভিন্ন মতাদর্শ ও ভূগোল অতিক্রম করে আজকের বাংলাদেশের উদীয়মান রাজনীতি ও তরুণ প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠলো? এই প্রশ্নের বস্তুনিষ্ঠ উত্তর খুঁজতে আমাদের অবগাহন করতে হবে ভাষা, সাহিত্য, উপমহাদেশীয় রাজনীতি এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের গভীর বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত দর্শনে।

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শব্দের ব্যুৎপত্তি ও বাংলা ভাষায় এর মেলবন্ধন

স্লোগানটির বিরোধিতা বা সমর্থন বোঝার আগে এর শাব্দিক ও ব্যুৎপত্তিগত কাঠামোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বাক্যটি দুটি ভিন্ন ভাষার সমন্বয়ে গঠিত একটি ঐতিহাসিক পরিভাষা:

ইনকিলাব (انقلاب): এটি একটি মূল আরবি শব্দ। আরবি 'ক্বাল্ব' (Qalb - যার অর্থ পরিবর্তন বা উল্টে দেওয়া) ধাতু থেকে এর উৎপত্তি। শাব্দিক অর্থে 'ইনকিলাব' বলতে বোঝায়—আমূল পরিবর্তন, রূপান্তর, প্রথাগত ব্যবস্থার উৎখাত বা বিপ্লব (Revolution)

জিন্দাবাদ (زندہ باد): এটি একটি ফারসি শব্দগুচ্ছ। 'জিন্দা' (জীবিত) এবং 'বাদ' (হউক/থাকুক) মিলে এর অর্থ দাঁড়ায়—অমর হোক, চিরজীবী হোক বা দীর্ঘজীবী হোক (Long Live)

অতএব, দুটি শব্দ মিলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর সরল ও প্রাঞ্জল অনুবাদ দাঁড়ায়: “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক”

বাংলা ভাষায় বিদেশাগত শব্দের অনুপ্রবেশ নাকি আত্মীকরণ?

যারা দাবি করেন ‘ইনকিলাব’ বাংলা শব্দ নয়, তাই এটি ব্যবহারযোগ্য নয় তাদের এই যুক্তি ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বেশ দুর্বল। বাংলা কোনো বদ্ধ বা নিশ্চল ভাষা নয়; এটি শত শত বছর ধরে হাজারো বৈদেশিয় শব্দকে নিজের পেটে জায়গা দিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে।

আইন, আদালত, কাগজ, কলম, ইনসাফ, জমানো, দুনিয়া, সরকার, জিন্দাবাদ এসবই আরবি, ফারসি ও তুর্কি থেকে বাংলায় এসে স্থান পাওয়া দৈনন্দিন শব্দ। বাংলা সাহিত্যের মহাকবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় অকাতরে আরবি ও ফারসি শব্দ ব্যবহার করে পরাধীন ভারতের মুক্তিকামী মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। নজরুলের ‘রক্তাম্বর-ধারিণী মা’ বা ‘কামাল পাশা’ কবিতায় বৈপ্লবিক চেতনার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, তার মূল রসদই ছিল বিদেশি শব্দের এই নিজস্বকরণ।

এমনকি ১৯৪৭-পূর্ব ও পরবর্তী বাংলায় ‘ইনকিলাব’ শব্দটি পত্রিকার নাম (যেমন ঐতিহাসিক দৈনিক ইনকিলাব), সাহিত্য এবং দৈনন্দিন রাজনৈতিক আলোচনায় 'আমূল সামাজিক পরিবর্তন' বোঝাতে নিয়মিত ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে একে বাংলা ভাষার ওপর 'জোরপূর্বক চাপানো শব্দ' বলার যুক্তিটি ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্যের পরিপন্থী।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও মাওলানা হাসরাত মোহানি: স্লোগানের প্রথম উচ্চারণ

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি কোনো আকস্মিক আধুনিক উদ্ভাবন নয়। এর পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস।

১৯২১ সাল: মাওলানা হাসরাত মোহানির রাজনৈতিক বিস্ফোরণ

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই স্লোগানটি সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেন মাওলানা হাসরাত মোহানি। ১৯২১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে তিনি প্রথম এই স্লোগানটি উত্থাপন করেন।

মাওলানা হাসরাত মোহানি ছিলেন এক অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত উর্দু কবি ও সাহিত্যিক। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগামী নেতা। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (CPI) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। একজন অনুশীলনকারী মুসলিম ও ইসলামী চিন্তাবিদ।

১৯২১ সালে যখন অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ব্রিটিশদের অধীনে 'স্বায়ত্ত্বশাসন' বা 'ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস' চাওয়ার কথা ভাবছিল, তখন হাসরাত মোহানিই প্রথম ব্রিটিশদের কাছে থেকে কোনো শর্ত ছাড়া ‘পূর্ণ স্বরাজ’ (স্বাচ্ছন্দে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা) দাবি করেছিলেন। এই বিপ্লবী দাবির সাথেই তিনি রাজপথে ও রাজনৈতিক মঞ্চে স্লোগান তুলেছিলেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’

হাসরাত মোহানির কাছে ‘ইনকিলাব’ কেবল একটি শব্দ ছিল না; এটি ছিল ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ এবং সামাজিক অসমতার বিরুদ্ধে এক ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ।

ভগত সিং ও সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলির বোমা হামলা: গণমানুষের হৃদয়ে প্রকম্পন

মাওলানা হাসরাত মোহানি স্লোগানটি তৈরি করলেও, একে উপমহাদেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেওয়া এবং সর্বজনীন বিপ্লবের প্রতীকে পরিণত করার পুরো কৃতিত্ব মহান বিপ্লবী ভগত সিং এবং তাঁর সংগঠন ‘হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ (HSRA)-এর।

১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল: ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ

১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল। দিল্লির সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে (বর্তমান ভারতের পার্লামেন্ট) ব্রিটিশ সরকার দুটি শ্রমিকবিরোধী বিল ‘পাবলিক সেফটি বিল’ এবং ‘ট্রেড ডিসপিউটস বিল’ পাস করার ষড়যন্ত্র করছিল।

শ্রমিকদের অধিকার হরণকারী এই আইনের প্রতিবাদে ভগত সিং এবং তাঁর সাথী বটুকেশ্বর দত্ত অ্যাসেম্বলির ফাঁকা স্থানে দুটি সশব্দ বোমা নিক্ষেপ করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য কাউকে হত্যা করা ছিল না, বরং কালা কানুনের বিরুদ্ধে "বধির ব্রিটিশদের কানে আওয়াজ পৌঁছানো"। বোমা নিক্ষেপের পরই তাঁরা পালিয়ে যাননি; বরং পুলিশের কাছে ধরা দিয়ে অ্যাসেম্বলি হল কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠেন:

“ইনকিলাব জিন্দাবাদ! সাম্রাজ্যবাদ মুর্দাবাদ!”

আদালতের ঐতিহাসিক জবানবন্দি ও ‘ইনকিলাব’-এর নতুন সংজ্ঞা

গ্রেফতারের পর ভগত সিং ও তাঁর সহযোগীদের বিচার শুরু হয়। রাজপথ থেকে সংবাদপত্র সব জায়গায় ভগত সিংয়ের এই স্লোগান দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

১৯২৯ সালে আদালতে প্রদত্ত এক ঐতিহাসিক বিবৃতিতে ভগত সিং ‘ইনকিলাব’ বা বিপ্লবের যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, তা আজ শতবর্ষ পরেও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন:

"বিপ্লব (ইনকিলাব) মানে কেবল রক্তক্ষয়ী সংঘাত বা বোমা-পিস্তলের সংস্কৃতি নয়। আমাদের কাছে ইনকিলাব বা বিপ্লবের অর্থ হলো যে বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রকাশ্য অন্যায় ও শোষণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাকে মূলসহ উপড়ে ফেলে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া। অন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকা পঁচাগলা রাষ্ট্রকাঠামোকে বদলে জনকল্যাণমূলক ও সমতাভিত্তিক নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হলো ইনকিলাব।"

১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ যখন ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয়, তখনও তাঁদের মুখে শেষ বাক্য ছিল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। এই আত্মত্যাগ স্লোগানটিকে ভারতের প্রতিটি তরুণের রক্তে মিশিয়ে দেয়।

এটি কি কেবলই কমিউনিস্টদের নিজস্ব সম্পদ?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায়শই একটি অভিযোগ ওঠে যে, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ মূলত বামপন্থী কমিউনিস্টদের স্লোগান, তাই সাধারণ বা ডানপন্থী রাজনীতিতে এর স্থান থাকা উচিত নয়। এই ধারণা কতটা সঠিক?

বৈশ্বিক ও উপমহাদেশের প্রেক্ষাপট

এটি সত্য যে স্লোগানটির স্রষ্টা মাওলানা হাসরাত মোহানি এবং জনপ্রিয়কারী ভগত সিং—উভয়েই বামপন্থী ও মার্কসবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কোনো মহৎ স্লোগান দীর্ঘকাল কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের গণ্ডিতে আটকে থাকে না।

যেমনটি ঘটেছিল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর ক্ষেত্রেও:

সর্বজনীন প্রতিরোধ: এটি সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরাচার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা যেকোনো দল বা গোষ্ঠীর জন্য সাধারণ সম্পদে পরিণত হয়।

কাজী নজরুলের ব্যবহার: বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি কোনো সুনির্দিষ্ট দলের ক্যাডার ছিলেন না, তিনি ভারতীয় পরাধীনতার বিরুদ্ধে এই বৈপ্লবিক চেতনাকে নিজের সাহিত্য ও কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন।

বিপ্লবী চেতনার প্রতীক: এটি কেবল অর্থনৈতিক সাম্যবাদের কথা বলে না; এটি যেকোনো পচে যাওয়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর একটি সার্বজনীন মনস্তাত্ত্বিক শক্তি।

অতএব, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-কে কেবল একটি নির্দিষ্ট গোত্র বা ভাবধারার একচ্ছত্র সম্পত্তি মনে করা ইতিহাস না জানারই শামিল।

২০২৪ জুলাই গণঅভ্যুত্থান: বাংলাদেশে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর পুনর্জন্ম

দীর্ঘ বহু দশক পর বাংলাদেশে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি নতুন করে প্রাণ পায় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের চরম ফ্যাসিবাদী শাসন, ভোটাধিকার হরণ, ব্যাংক লুটপাট এবং কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন করতে গিয়ে নির্বিচারে ছাত্র-জনতার ওপর চালানো গণহত্যার বিরুদ্ধে যখন বাংলাদেশ অগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে ওঠে তখনই স্লোগানটি রাজপথে ফিরে আসে।

কেন তরুণরা এই স্লোগানটি বেছে নিলো?

ব্যবস্থা পরিবর্তনের আকুলতা: জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতা কেবল একটি সরকারের পতন চায়নি; তারা চেয়েছিল বিগত ৫০ বছর ধরে গড়ে ওঠা বৈষম্যমূলক ‘ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর’ আমূল রূপান্তর। আর এই আমূল রূপান্তরের সবচেয়ে সঠিক শাব্দিক প্রকাশ হলো ‘ইনকিলাব’।

অনলাইন এক্টিভিজমের প্রভাব: আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রখ্যাত ইনফ্লুয়েন্সার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচার্য তাঁর অগণিত জনপ্রিয় ভিডিও বার্তায় নিয়মিত ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ উচ্চারণ করে আন্দোলনকারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। এটি দ্রুত তরুণদের মাঝে এক নতুন সাইকোলজিক্যাল ট্রেন্ড তৈরি করে।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ: শাসকগোষ্ঠীর বয়ান ও চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম রাজনৈতিক ভাষার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তরুণরা এমন একটি ভাষা ব্যবহার করতে চেয়েছিল, যা সরাসরি রাজপথের বিদ্রোহ প্রকাশ করে।

এমনকি আন্দোলনের মূলপর্বে বিএনপির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলকেও তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজে ‘ইনকিলাব’ শব্দটির ব্যবহার করতে দেখা যায়, যা প্রমাণ করে স্লোগানটি মতাদর্শের প্রাচীর ভেঙে সাধারণ মানুষের গণদাবিতে পরিণত হয়েছিল।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং 'ইনকিলাব'-এর নতুন রাজনৈতিক অর্থ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম হয়, তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ ঘটে তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (National Citizen Party - NCP)

এনসিপির দৃষ্টিভঙ্গিতে 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ'

এনসিপির প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে দলের শীর্ষ নেতা যাঁরা জুলাই আন্দোলনের মূল কারিগর ছিলেন সবাই সমস্বরে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন। তাঁদের এই স্লোগান দেওয়ার পেছনে রয়েছে এক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা:

অভ্যুত্থান নয়, এটি একটি বিপ্লব: তরুণ নেতারা ২০২৪-এর ঘটনাকে কেবল একটি সাধারণ ‘সরকার পতন আন্দোলন’ বা ‘গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে দেখেন না। তারা এটাকে মনে করেন একটি ‘বিপ্লব’ (Revolution/Inquilab)

ধারাবাহিক পরিবর্তনের শপথ: ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ (বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক) অর্থ হলো সরকার বদল হলেও পরিবর্তনের এই তেজ ও স্পিরিট যেন থেমে না যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধের চেতনাকে টিকিয়ে রাখে।

পুরোনো ব্যবস্থার বিলোপ: ভগত সিং যেমন ১৯২৯ সালে বলেছিলেন পঁচাগলা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে মূলসহ বদলে দেওয়াই ইনকিলাব; ঠিক তেমনই ২০২৫-এর বাংলাদেশের তরুণদের কাছে ইনকিলাব মানে হলো ৫০ বছরের দুর্নীতি, প্রশাসনিক দলীয়করণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির আমূল সংস্কার।

সমালোচনা ও আপত্তির বস্তুনিষ্ঠ নিরসন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ নিয়ে যে দুটি প্রধান আপত্তি তোলা হয়, সেগুলোর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

আপত্তি ১: “এটি বাংলা শব্দ নয়, জোর করে বাংলায় ঢুকানো হচ্ছে।”

উত্তর: ভাষা একটি প্রবাহমান নদীর মতো। বাংলায় হাজার হাজার বিদেশি শব্দ যেভাবে স্থান করে নিয়েছে, ‘ইনকিলাব’ও একইভাবে বহুল ব্যবহৃত ও সমাদৃত একটি শব্দ। উপরন্তু, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে প্রাক-স্বাধীনতা ও উত্তর-স্বাধীনতা পর্বের সাহিত্য এবং সংবাদপত্রে ‘ইনকিলাব’ শব্দের ভুরিভুরি ব্যবহার রয়েছে। একে অপ্রাসঙ্গিক বলা ভাষার স্বাভাবিক বিকাশকে অস্বীকার করার নামান্তর।

আপত্তি ২: “এটি কমিউনিস্ট বা বামপন্থীদের স্লোগান, তাই সাধারণের নয়।”

উত্তর: স্লোগানের উৎপত্তি ইতিহাস থেকে হলেও এর প্রয়োগ নির্ধারিত হয় বর্তমান যুগের প্রয়োজনে। হাসরাত মোহানি বা ভগত সিং বামপন্থী ধারার হলেও, তাঁদের মূল লড়াই ছিল ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে ও সার্বজনীন সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পক্ষে। আজ ২০২৪-২৫ সালের বাংলাদেশে যখন তরুণরা এই স্লোগান দেয়, তারা কোনো নির্দিষ্ট কমিউনিস্ট ইশতেহার বাস্তবায়ন করছে না; বরং তারা ‘বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার সার্বজনীন আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করছে।

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানের ঐতিহাসিক পথপরিক্রমা

নিচে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানের ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা বিবর্তন ও ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলোর একটি সার্বিক সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:

সময়কাল/ঘটনা

ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব/সংস্থা

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মূল তাৎপর্য

১৯২১ সাল

মাওলানা হাসরাত মোহানি

ভারতের আহমেদাবাদ কংগ্রেস অধিবেশনে প্রথম 'পূর্ণ স্বরাজ'-এর দাবির সাথে স্লোগানটির রাজনৈতিক সূচনা।

১৯২৯ (৮ এপ্রিল)

ভগত সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত

দিল্লির সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপ করে স্লোগানটির রাজপথ ও সর্বজনীন গণবিস্ফোরণ ঘটান।

১৯২৯ (বিচার পর্ব)

ভগত সিং (আদালতে জবানবন্দি)

‘ইনকিলাব’-এর প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞা দান: "পঁচাগলা ও অন্যায্য রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সমূলে বদলে দেওয়াই হলো ইনকিলাব।"

১৯৩১ (২৩ মার্চ)

ভগত সিং, রাজগুরু ও সুখদেব

ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলার পূর্বে শেষ উচ্চারণের মাধ্যমে স্লোগানটিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর প্রতীকে পরিণত করেন।

১৯২০–১৯৫০ এর দশক

কাজী নজরুল ইসলাম ও অন্যান্য সাহিত্যিক

বাংলা সাহিত্য, কবিতা ও প্রাক-স্বাধীনতা সাংবাদিকতায় ‘ইনকিলাব’ ও বৈপ্লবিক চেতনার ব্যাপক আত্মীকরণ।

২০২৪ (জুলাই)

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা ও পিনাকী ভট্টাচার্য

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান প্রতিরোধ স্লোগান হিসেবে বাংলাদেশে পুনর্জন্ম।

২০২৫ (২৮ ফেব্রুয়ারি)

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)

নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশের প্রধান স্লোগান; বৈষম্যহীন নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার নতুন শপথ।

বাংলা সাহিত্য ও কাজী নজরুল ইসলামের ‘ইনকিলাব’ ভাবনা

অনেকের ধারণা স্লোগানটি কেবল আধুনিক রাজনৈতিক ময়দানেই এসেছে, কিন্তু বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ‘ইনকিলাব’ বা বিপ্লবের রূপক আড়াই শতক আগেই গেঁথে দিয়েছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

‘ধূমকেতু’ পত্রিকা ও বৈপ্লবিক আহ্বান: ১৯২২ সালে নজরুল যখন ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, তখন তাঁর লেখার মূল সুরই ছিল পূর্ণ স্বরাজ ও সামাজিক বিপ্লব। নজরুল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পচনশীল কাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি ‘প্রলয়’ ও ‘ইনকিলাব’-এর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

আরবি-ফারসি ও বাংলার মেলবন্ধন: নজরুল তাঁর কবিতায় অকাতরে আরবি ও ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মুক্তিকামী তরুণদের মাঝে এক নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছিল। ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় “তোরা সব জয়ধ্বনি কর!” বা ‘কামাল পাশা’ কবিতায় যে মুক্তির হুঙ্কার তার পেছনেও ‘ইনকিলাব’-এর সমান দর্শনের প্রতিফলন ছিল।

নজরুলের সেই বিখ্যাত সুর:

"ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? - প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন! / আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশায় নৃত্য-পাগন।"

অর্থাৎ, পুরাতন অন্যায্য ব্যবস্থাকে ধ্বংস না করলে নতুন সৃষ্টি বা 'ইনকিলাব' সম্ভব নয়।

মাওলানা হাসরাত মোহানি: এক বিরল বৈপ্লবিক জীবন

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানের জনক মাওলানা হাসরাত মোহানির জীবন নিজেই এক বিরাট ইতিহাস, যা স্লোগানটির পেছনের আদর্শ বুঝতে সাহায্য করে:

সুফি ও কমিউনিস্টের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন: হাসরাত মোহানি ছিলেন একই সাথে পরম ধার্মিক মুসলিম, উর্দু সাহিত্যের প্রখ্যাত গজল রচয়িতা এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির (CPI) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সাম্যবাদ পরস্পর বিরোধী নয়; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর তাগিদ উভয় জায়গা থেকেই আসতে পারে।

ভারতের সংবিধানে স্বাক্ষর না করার বিরল সাহসিকতা: ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর হাসরাত মোহানি ভারত ত্যাগ করেননি এবং ভারতীয় সংবিধান সভার (Constituent Assembly) সদস্য ছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সংবিধানে ভারত কমনওয়েলথের অধীনে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা না থাকায়, তিনি ভারতীয় সংবিধানে স্বাক্ষর করতে স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানান

এইচএসআরএ (HSRA) ও স্লোগানের বাঁক বদল

ভগত সিং যে বিপ্লবী সংগঠনের অংশ ছিলেন, তার নাম ছিল ‘হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ (HSRA)। এই সংগঠনের মাধ্যমে স্লোগানটি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের গতিপথ বদলে দেয়।

‘বন্দে মাতরম’ থেকে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’: বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মূল স্লোগান ছিল ‘বন্দে মাতরম’ বা ‘ভারত মাতা কি জয়’। কিন্তু ভগত সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, রামপ্রসাদ বিসমিল ও আশফাকউল্লা খানের মতো তরুণ বিপ্লবীরা অনুভব করেছিলেন যে, কেবল জাতীয়তাবাদী আবেগে স্বাধীনতা আসবে না; প্রয়োজন শ্রেণি-বৈষম্য ও সামাজিক অন্যায়ের অবসান।

সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িক রূপ: তাঁরা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-কে বেছে নিয়েছিলেন যেন ধর্ম, বর্ণ বা অঞ্চল নির্বিশেষে ভারতের হিন্দু, মুসলিম, শিখ, দলিত ও শ্রমজীবী মানুষ একটি একক পতাকার নিচে এসে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্বজুড়ে 'ইনকিলাব'-এর সমতুল্য বৈপ্লবিক স্লোগান

বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশে জনমানুষের মুক্তির লড়াইয়ে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’-এর মতো সমতুল্য কিছু কালজয়ী স্লোগান তৈরি হয়েছে, যা প্রমাণ করে শোষিতের ভাষা বিশ্বজুড়ে একই রকম:

বিপ্লব / আন্দোলন

স্লোগান

মূল ভাষা ও অর্থ

রাজনৈতিক তাৎপর্য

ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯)

Liberté, égalité, fraternité

ফরাসি (স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব)

রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদের পতন ঘটিয়ে আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন।

রুশ বিপ্লব (১৯১৭)

вся власть советам!

রুশ (সব ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে!)

জারের শাসনের অবসান ঘটিয়ে শ্রমিক-কৃষকদের শাসনের আহ্বান।

কিউবান বিপ্লব (১৯৫৯)

¡Hasta la Victoria Siempre!

স্প্যানিশ (সর্বদা বিজয়ের দিকে!)

চে গুয়েভারা ও ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই।

দক্ষিণ আফ্রিকা (বর্ণবাদ বিরোধী)

Amandla Awethu!

জুলু/জোসা (ক্ষমতা জনগণের হাতে!)

নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন।

উপমহাদেশ (১৯২৯ - ২০২৪)

ইনকিলাব জিন্দাবাদ!

আরবি-ফারসি (বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!)

ঔপনিবেশিকতা, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বাতিলের আহ্বান।

স্লোগান থেকে রাষ্ট্রগঠন: আন্দোলনকারীদের সামনের আসল চ্যালেঞ্জ

যেকোনো বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজপথে স্লোগান দেওয়া যত সহজ, সেই স্লোগানের দর্শনকে একটি রাষ্ট্রের নীতিতে রূপান্তর করা তার চেয়ে বহুগুণ কঠিন।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো নতুন শক্তির জন্য আসল পরীক্ষাটি এখানেই:

প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা: 'ইনকিলাব' বা বিপ্লব যেন কেবল রাগের বহিঃপ্রকাশে আটকে না থাকে; এটি যেন স্বাধীন বিচার বিভাগ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতো টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

সহিংসতা বনাম গঠনমূলক রাজনীতি: অন্যায়ের ধ্বংসের পর যদি নতুন ও সুন্দর কিছু তৈরি না করা যায়, তবে সেই ইনকিলাব বা বিপ্লব অরাজকতায় রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ মূলত কোনো স্থির বা মৃত শব্দ নয়; এটি একটি জীবন্ত চেতনা। যখনই কোনো সমাজে শাসনব্যবস্থা সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায় চাপিয়ে দেয়, তখনই রাজপথ এই স্লোগানের মাধ্যমে আবার জাগ্রত হয়ে ওঠে।

পরিবর্তনের চিরন্তন মশাল

শব্দ বা স্লোগান কেবল বর্ণমালার সমষ্টি নয়; এটি হলো সময়ের দাবি। আজ যখন বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান তোলে, তখন তারা মূলত ইতিহাস ও ভবিষ্যতের মাঝে একটি সেতুর নির্মাণ করে।

উপমহাদেশে এটি যেভাবে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের শক্ত ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালে এটি বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের হিংস্র অহংকারকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করতে উদ্দীপনা জুগিয়েছে।

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বা ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ এই বাক্যাংশের প্রকৃত গূঢ় অর্থ হলো: অন্যায়, জুলুম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধের স্পিরিট কখনো মরতে পারে না। একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক এবং সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদরা রক্ত দিয়েছেন, সেই স্বপ্নকে টিকিয়ে রাখতে হলে 'ইনকিলাব'-এর এই অবিনাশী চেতনাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জিইয়ে রাখতেই হবে।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.