যেভাবে ইরানি পারসিয়ানরা ভারতের সংখ্যালঘু ধনী সম্প্রদায় হলো

ভারতে যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় এমন একটি সম্প্রদায়ের নাম বলতে, যাদের জনসংখ্যা একটি মাঝারি আকারের ফুটবল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ধরিয়ে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু দেশের অর্থনীতি, শিল্প, বিজ্ঞান, সামরিক বাহিনী এবং সংস্কৃতির চালিকাশক্তি তাদের হাতে তবে উত্তর হবে একটিই: ভারতের পারসি সম্প্রদায়

ভারতের মোট জনসংখ্যার হিসাব করলে দেখা যাবে পারসিদের অনুপাত মাত্র ০.০০৬ শতাংশ। ২০১১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতে পারসিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৭,২৬৪ জন। অথচ ভারতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের যেকোনো অধ্যায় উন্মোচন করলে এই ক্ষুদ্রতম জনগোষ্ঠীর অবদানকে কোনোভাবেই পাশ কাটানো সম্ভব নয়।

শিল্প বিপ্লব ও অর্থনীতি: জামসেটজি টাটা (ভারতীয় শিল্পায়নের জনক), আরদেশীর গোদরেজ, নুসলী ওয়াদিয়া।

বিজ্ঞান ও গবেষণা: ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচির জনক হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা।

সামরিক ইতিহাস: ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ঐতিহাসিক নেতৃত্বের কাণ্ডারি ফিল্ড মার্শাল শ্যাম মানেকশ।

রাজনীতি ও সমাজ: ভারতের স্বায়ত্বশাসনের আদি রূপকার দাদাভাবাই নওরোজি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ফিরোজ গান্ধী।

সংস্কৃতি ও বিনোদন: চলচ্চিত্র অভিনেতা বোমান ইরানি, প্রযোজক রনি স্ক্রুভালা, কৌতুকশিল্পী সাইরাস ব্রোয়াচা, ডেইজি ইরানি এবং অরুনা ইরানি।

একটি উদ্বাস্তু সম্প্রদায় হাজার বছর আগে ভিন্ন দেশ থেকে এসে কীভাবে কোনো রক্তের ফোটা না ফেলে, রাজশক্তি না ছিনিয়ে নিয়েও একটি বিশাল উপমহাদেশের সবচেয়ে ধনবান, প্রগতিশীল এবং শ্রদ্ধেয় শ্রেণীতে পরিণত হলো? সেই রোমাঞ্চকর ও বিস্ময়কর ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদই এই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য।

পারস্যের অতীত, জরথুস্ত্রবাদ এবং ইসলামি পারস্য বিজয়

পারসিদের ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে প্রাচীন পারস্যে (বর্তমান ইরান)। প্রায় চার হাজার বছর আগে মহান দার্শনিক ও ধর্মপ্রবর্তক জরথুস্ত্র (Zoroaster) এক ঈশ্বরভিত্তিক ধর্ম প্রচার করেন, যা ‘জরথুস্ত্রবাদ’ (Zoroastrianism) বা পারসিক ধর্ম নামে পরিচিত।

জরথুস্ত্রবাদের মৌলিক দর্শন: জরথুস্ত্রবাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থের নাম ‘আবেস্তা’ বা ‘জেন্দাবেস্তা’। এই ধর্মের মূল দর্শন গড়ে উঠেছে তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর:

১. হুমাতা (Humata): সৎ চিন্তা।

২. হুক্তা (Hukhta): সৎ বাক্য।

৩. হভারшта (Hvarshta): সৎ কর্ম।

জরথুস্ত্রবাদকে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পারস্যের বিখ্যাত হখামনীশীয় ও পরবর্তীতে সাসানীয় সাম্রাজ্যের (Sasanian Empire) রাষ্ট্রধর্ম ছিল এই জরথুস্ত্রবাদ।

কেন পারসিকরা দেশত্যাগ করেছিল?

৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসন আমলে এবং পরবর্তী খিলাফতের সময় পারস্যে সাসানীয় সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। পারস্যে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। পারসিকদের সামনে তখন দুটি পথ খোলা ছিল স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় মিশে যাওয়া অথবা স্বীয় ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রাচীন সংস্কৃতি ও জীবনধারা রক্ষায় দেশ ত্যাগ করা। নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ও অর্থনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে তাদের ছোট ছোট দল পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী হয়ে সমুদ্রপথে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

সাঞ্জানের ঐতিহাসিক রূপকথা: দুধে চিনির মিশ্রণ

হাজার বছর আগে পারসিকদের ভারত আগমন নিয়ে ঐতিহাসিক নথিপত্র খুব বেশি সুরক্ষিত না থাকলেও, ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত ফারসি গ্রন্থ ‘কিসসা-এ-সাঞ্জান’ (Qissa-i Sanjan)-এ তাদের ভারতে পদার্পণের এক মনোরম রূপকথা লিপিবদ্ধ রয়েছে।

সম্রাট জাদি রানা ও পুরোহিতের বুদ্ধি

পারসিকদের বহনকারী কাঠের জাহাজটি যখন ভারতের গুজরাট রাজ্যের সাঞ্জান উপকূলে এসে নোঙ্গর করে, তখন সেখানকার শাসক ছিলেন স্থানীয় হিন্দু রাজা সম্রাট জাদি রানা। অজানা, অচেনা ও সম্পূর্ণ ভিন্ন পোশাকের একটি জনগোষ্ঠীকে দেখে রাজা কিছুটা শঙ্কিত ও সংশয়ে পড়ে যান। তিনি পারসিকদের প্রতিনিধি হিসেবে আসা জরথুস্ত্রীয় পুরোহিতকে ডেকে পাঠান।

রাজা জাদি রানা একটি কানায় কানায় দুধে পূর্ণ বাটি পুরোহিতের সামনে এগিয়ে দিয়ে রূপক অর্থে বোঝালেন:

"আমার রাজ্য এই দুধের বাটির মতোই কানায় কানায় পূর্ণ। এখানে নতুন কোনো জনগোষ্ঠীর থাকার জায়গা নেই; অতিরিক্ত লোক এলে রাজ্য উপচে পড়বে।"

জরথুস্ত্রীয় পুরোহিত ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী। তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে রাজার কাছ থেকে একমুঠো চিনি চেয়ে নিলেন। এরপর অত্যন্ত সযত্নে সেই চিনিটুকু দুধের বাটিতে মিশিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বললেন:

"মহারাজ, আমরা আপনার রাজ্যে ঠিক এই চিনির মতোই মিশে যাব। দুধের পরিমাণ একবিন্দুও বাড়বে না, কিন্তু পুরো দুধের স্বাদ মিষ্টতায় ভরে উঠবে। আমরা রাজত্বের অধিকার চাই না, আমরা কেবল আপনার প্রজা হয়ে অবদান রাখতে চাই।"

পুরোহিতের এই উপস্থিত বুদ্ধি ও নমনীয়তায় মুগ্ধ হয়ে রাজা জাদি রানা তাদের সাঞ্জানে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন। পারসিরা রাজার সবকটি শর্ত মেনে নেয়। তারা নিজেদের পারস্যের পোশাক বদলে গুজরাটি শাড়ি ও পোশাক পরা শুরু করে এবং গুজরাটি ভাষাকে নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে আপন করে নেয়। সাঞ্জানে তাদের এই ঐতিহাসিক আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯২০ সালে সেখানে ‘সাঞ্জান স্তম্ভ’ নামে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।

সাঞ্জান থেকে মুম্বাই: বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক মোড়

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গুজরাটের কৃষি ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে যুক্ত থাকার পর, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে পারসি সম্প্রদায়ের ভাগ্যরেখা আমূল বদলে যায়। এর মূল অনুঘটক ছিল মুম্বাই (তৎকালীন বম্বে) শহরের বিকাশ এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন।

ব্রিটিশদের সহযোগী ও বৈশ্বিক বাণিজ্য

ব্রিটিশরা যখন মুম্বাইকে একটি আন্তর্জাতিক বন্দর ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল, তখন তাদের প্রয়োজন ছিল স্থানীয় নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়ী ও কারিগর। তৎকালীন ভারতীয় সমাজের কট্টর জাতিভেদ প্রথা বা সমুদ্রযাত্রার ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা পারসিদের মাঝে ছিল না। ফলে তারা দ্রুত সুযোগটি লুফে নেয় এবং গুজরাট থেকে বম্বেতে পাড়ি জমায়।

পারসিদের ধনকুবের হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল ১৮ শতক ও ১৯ শতকের তুলা ও আফিমের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য:

চীন ও আফিম বাণিজ্য: পারসি বণিকরা ব্রিটিশদের সাথে যৌথভাবে চীনে আফিম রপ্তানি করা শুরু করে। সেসময়ে চীনে আফিমের বিপুল চাহিদা ছিল।

সিল্ক ও 'গারা' শাড়ির জন্ম: বাণিজ্য সূত্রে পারসি পুরুষরা ঘন ঘন চীন সফর করতেন। তারা সেখান থেকে ফেরার সময় পরিবারের নারীদের জন্য সূক্ষ্ম চীনা সিল্কের কাপড় ও হস্তশিল্প নিয়ে আসতেন। চীনের এই ঐতিহ্যবাহী কারুকাজ করা সিল্কের কাপড় ভারতীয় শাড়ির ঢঙে রূপান্তরিত হয়ে ‘গারা’ (Gara) নামে এক বিখ্যাত পারসি পোশাকে পরিণত হয়, যা আজও পারসি অভিজাত্যের প্রতীক।

আফিম নিষেধাজ্ঞা ও তুলার বাজার: ১৮৩০-এর দশকে চীনা সরকার আফিম আমদানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে চতুর পারসি ব্যবসায়ীরা দ্রুত ব্যবসায় পরিবর্তন আনেন। তারা কাঁচাতুলা উৎপাদনে নজর দেন। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে ভারতীয় তুলার চাহিদা আকাশচুম্বী হলে পারসি ব্যবসায়ীরা রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান।

স্যার জামসেটজি জেজিভয়: দানশীলতার আলোকবর্তিকা

আফিম ও তুলার বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ অর্জন করেছিলেন স্যার জামসেটজি জেজিভয় (Jamsetjee Jeejeebhoy)। তিনি তৎকালীন ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের ছিলেন। তবে তাঁর পরিচয় কেবল ধনসম্পদে নয়, বরং তাঁর অতুলনীয় দানশীলতায়।

জরথুস্ত্রবাদের প্রধান নীতি হলো সৎ কাজের মাধ্যমে সমাজকল্যাণ করা। স্যার জামসেটজি জেজিভয় তাঁর অর্জিত সম্পদের এক বিশাল অংশ জনকল্যাণে ব্যয় করেন:

পানীয় জল প্রকল্প: তৎকালীন পুনে শহরে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট নিরসনে তিনি সিংহভাগ খরচ বহন করেন।

হাসপাতাল স্থাপন: ১৮৪৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Jamsetjee Jeejeebhoy Hospital (JJ Hospital), যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও আধুনিক হাসপাতাল হিসেবে গড়ে ওঠে।

শিল্প শিক্ষা: ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মুম্বাইয়ের বিখ্যাত Sir JJ School of Art তাঁর অনুদানেই নির্মিত হয়।

তাঁর এই জনকল্যাণমূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইটহুড ও পরবর্তীতে বারোনেট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাঁর স্মরণে বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

আধুনিক ভারতের রূপকার: বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও সামরিক ক্ষেত্রে পারসি অবদান

ভারতে পারসিদের ইতিহাস কেবল অর্থ উপার্জন বা ব্যবসায়িক সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি একটি ক্ষুদ্র অভিবাসী জনগোষ্ঠীর হাত ধরে একটি অনুন্নত ও উপনিবেশশাসিত দেশকে আধুনিক, স্বাবলম্বী এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার মহাকাব্য। পারস্য (বর্তমান ইরান) থেকে অষ্টম শতকে ধর্মীয় নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে ভারতে আসা এই জরোঅস্ট্রিয়ান (Zoroastrian) সম্প্রদায় জনসংখ্যার দিক থেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র (ভারতের মোট জনসংখ্যার ০.০০৫%-এরও কম) হলেও, তাঁদের অবদান আধুনিক ভারতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।

শিল্পায়নের দিশারী জামসেটজি টাটা ও টাটা পরিবারের কালজয়ী অবদান

আজকের বৈশ্বিক পরাশক্তি ‘টাটা গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা জামসেটজি নাসেরওয়ানজি টাটা (১৮৩৯–১৯০৪)-কে যথার্থভাবেই "ভারতীয় শিল্পায়নের জনক" বলা হয়। তিনি এমন এক সময়ে ভারতে ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছিলেন যখন ব্রিটিশরা ভারতকে কেবল কাঁচামাল সরবরাহের উৎস হিসেবে ব্যবহার করত। জামসেটজির জীবন ও স্বপ্নের চারটি প্রধান লক্ষ্য ছিল: একটি সমন্বিত ইস্পাত কারখানা, একটি বিশ্বমানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, একটি আন্তর্জাতিকমানের বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং একটি বিলাসবহুল হোটেল।

টিস্কো (TISCO) ও জামশেদপুর নগরী: ভারতের শিল্পায়নের প্রথম ও প্রধান মাইলফলক ছিল ১৯০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘টাটা আইরন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি’ (বর্তমানে টাটা স্টিল)। জামসেটজি টাটার পরিকল্পনানুযায়ী ঝাড়খণ্ডের এক আদিবাসী অধ্যুষিত বনাঞ্চলে ভারতের প্রথম সমন্বিত আধুনিক ইস্পাত কারখানা গড়ে ওঠে। তাঁর নামানুসারেই এই শহরের নাম রাখা হয় জামশেদপুর। জামসেটজি কেবল কারখানাই গড়েননি, শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় তিনি ইউরোপ-আমেরিকার বহু আগেই ৮ ঘণ্টার কর্মদিবস, অবৈতনিক চিকিৎসা, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো যুগান্তকারী সুবিধা চালু করেছিলেন।

বর্ণবাদের জবাবে হোটেল তাজমহল প্যালেস (১৯০৩): ব্রিটিশ আমলে মুম্বাইয়ের তৎকালীন অভিজাত ‘ওয়াটসন হোটেলে’ বর্ণবাদী নীতির কারণে ভারতীয়দের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। স্বয়ং জামসেটজি টাটা এই বর্ণ বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। এই অপমানকে তিনি জাতীয় আত্মসম্মানে রূপ দেন এবং ১৯০৩ সালে মুম্বাইয়ের সমুদ্রতীরে নির্মাণ করেন বিশ্ববিখ্যাত ‘তাজমহল প্যালেস হোটেল’। এটি কেবল স্থাপত্যের দিক থেকেই অনন্য ছিল না, বরং এটিই ছিল তৎকালীন ভারতের প্রথম বিদ্যুৎচালিত ও সব ধরনের আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন হোটেল।

জে.আর.ডি টাটা ও আধুনিক শিল্পসাম্রাজ্য: জামসেটজির আদর্শকে এগিয়ে নেন জাহাঙ্গীর রতনজি দাদাভয় (জে.আর.ডি) টাটা। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত বৈমানিক। ১৯৩২ সালে তিনি ‘টাটা এয়ারলাইন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে দেশের জাতীয় বিমান সংস্থা ‘এয়ার ইন্ডিয়া’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তাঁর ৫ দশকেরও বেশি সময়ের নেতৃত্বে টাটা গ্রুপ অটোমোবাইল (টাটা মোটরস), তথ্যপ্রযুক্তি (টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস বা TCS) এবং ঘড়ি-অলঙ্কার (টাইটান)-এর মতো ক্ষেত্রগুলোতে বিপ্লব ঘটায়। উল্লেখ্য, টাটা ট্রাস্টের মাধ্যমে এই শিল্পগোষ্ঠীর লাভের একটি বিশাল অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণে ব্যয় করার ধারাও পারসি সংস্কৃতির দান।

পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা

ভারতের পারমাণবিক গবেষণার জনক ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা (১৯০৯–১৯৬৬) ছিলেন একাধারে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এবং দূরদর্শী দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দূরদ্রষ্টা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরমাণু বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণা শেষে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং উপলব্ধি করেন যে, একটি স্বাধীন ও নতুন ভারতের শক্তি নিরাপত্তা ও সামরিক সুরক্ষার জন্য পারমাণবিক বিজ্ঞান চর্চা অপরিহার্য।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন (TIFR ও BARC): ১৯৪৫ সালে স্যর দোরাবজি টাটা ট্রাস্টের আর্থিক সহায়তায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Tata Institute of Fundamental Research (TIFR), যা ভারতে মৌলিক বিজ্ঞানের চর্চাকে ত্বরান্বিত করে। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে ট্রম্বেতে তিনি গড়ে তোলেন পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র, যা তাঁর অকালপ্রয়াণের পর Bhabha Atomic Research Centre (BARC) নামে নামকরণ করা হয়।

তিন-ধাপের পরমাণু কর্মসূচি: ভারতের থোরিয়াম আকরিকের প্রচুর মজুদকে কাজে লাগিয়ে দেশের শক্তির চাহিদা মেটাতে ড. ভাবা ‘তিন-ধাপের পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচির’ (Three-Stage Nuclear Power Programme) নকশা করেন। আজও ভারতের পারমাণবিক নীতির মূল ভিত্তি এটিই। এছাড়া ভারতের মহাকাশ গবেষণার প্রাথমিক অবকাঠামো (INCOSPAR) তৈরিতেও ড. ভাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, যা পরবর্তীতে ‘ইসরো’ (ISRO)-তে রূপান্তরিত হয়।

১৯৭১ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের নায়ক ফিল্ড মার্শাল শ্যাম মানেকশ

ভারতের সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ (Sam Manekshaw) ছিলেন একজন গর্বিত পারসি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে ৯৩ হাজার সৈন্যের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করার নেপথ্যে প্রধান সামরিক পরিকল্পনাকারী ছিলেন ভারতের ৮ম সেনাপ্রধান এই বীর সেনানী।

ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ কেবল ভারতের সামরিক ইতিহাসের প্রথম ফিল্ড মার্শালই ছিলেন না, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যৌথবাহিনীর কৌশলগত বিজয়ের অন্যতম মূল স্থপতিও ছিলেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও নিখুঁত সামরিক পরিকল্পনা ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে মিত্রবাহিনীর দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৭১ সালের এপ্রিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অবিলম্বে সেনা অভিযানের কথা ভাবছিলেন। কিন্তু মানেকশ সাহসের সাথে জানান যে, বর্ষাকালে পূর্ব পাকিস্তানের নদীমাতৃক ভৌগোলিক পরিবেশে যুদ্ধ করা ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি সৈন্য প্রস্তুতি, রসদ সরবরাহ এবং শীতকালে চীন সীমান্তের পাহাড়ি পথ বরফাবৃত থাকার সুবিধা হিসেব করে ডিসেম্বরে যুদ্ধের প্রস্তাব দেন যা পরবর্তীতে সঠিক প্রমাণিত হয়।

যুদ্ধের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে মুক্তিবাহিনীকে সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তার মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত ও দূরন্ত গেরিলা বাহিনীতে রূপান্তরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

শিল্প, সংস্কৃতি, বিনোদন ও রাজনীতিতে পারসিদের স্পর্শ

ভারতে পারসিদের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম হলেও, দেশের আধুনিকায়ন ও বিকাশমান সাংস্কৃতিক মানচিত্রে তাঁদের অবদান অসামান্য। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিজ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিনোদন শিল্পের প্রসারে তাঁরা যে গভীর ছাপ রেখে গেছেন, তা নিচে সবিস্তারে আলোচনা করা হলো:

রাজনীতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে পারসি নেতৃত্ব

ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে শুরু করে আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ প্রতিটি ধাপে পারসি ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা ছিল পথপ্রদর্শকের মতো।

দাদাভাবাই নওরোজি (Grand Old Man of India): ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম এই প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ভারতীয়দের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের চেতনার জনক। ১৮৯২ সালে তিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের 'হাউজ অফ কমন্সের' সদস্য (MP) নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ রাজ কীভাবে ভারতের সম্পদ শোষণ করে তা প্রমাণ করতে তিনি তাঁর বিখ্যাত 'ড্রেন অফ ওয়েলথ' (Drain of Wealth) তত্ত্ব প্রকাশ করেন, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

ফিরোজ গান্ধী: ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর জামাতা এবং ইন্দিরা গান্ধীর স্বামী হিসেবে পরিচয়ের বাইরেও তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা ছিল অত্যন্ত জোরালো। তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান স্বাধীনতা সংগ্রামী, প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং ভারতের লোকসভার একজন নিরপেক্ষ সদস্য। সংসদে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তিনি একজন স্বাধীনচেতা আইন প্রণেতা হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন।

অন্যান্য স্মরণীয় নাম: ভারতের বাইরে প্রথম ভারতীয় হিসেবে জাতীয় পতাকা উত্তোলনকারী মাদাম ভিকাজি কামা এবং বোম্বে মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের স্থপতি স্যার ফিরোজশাহ মেহতা-ও ছিলেন এই সম্প্রদায়ের উজ্জ্বল রত্ন।

ভারতীয় নাট্যচর্চা ও চলচ্চিত্রের ভিত্তিপ্রস্তর

বলিউড বা আধুনিক হিন্দি সিনেমা গড়ে ওঠার বহু আগেই ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পারসিরা সূচনা করেছিলেন 'পারসি থিয়েটার'। তৎকালীন বোম্বেতে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যিক থিয়েটারগুলোই ভারতীয় বিনোদন জগতে প্রথম পেশাদারিত্ব, আলো-ছায়ার আধুনিক ব্যবহার, সঙ্গীত নির্ভর দৃশ্যপট এবং বিশাল সেট নির্মাণের প্রচলন করে। পরবর্তীতে হিন্দি সিনেমার চিত্রনাট্য, অভিনয়রীতি ও কাঠামোর ওপর এই পারসি থিয়েটারের সরাসরি প্রভাব পড়েছিল।

বিনোদন ও আধুনিক বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে পারসিদের অবদান

বলিউডের অভিনয়, পরিচালনা, প্রযোজনা ও কৌতুক অভিনয়ে পারসি শিল্পীরা তাঁদের সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে আসছেন।

বোমান ইরানি: মধ্য বয়সে অভিনয় জগতে পা রেখেও যিনি নিজের অনন্য প্রতিভায় নিজেকে বলিউডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চরিত্রে রূপদানকারী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। 'মুন্নাভাই এমবিবিএস', 'থ্রি ইডিয়টস', কিংবা 'খোসলা কা ঘোসলা' তাঁর বহুমুখী অভিনয় যেকোনো চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলে।

রনি স্ক্রুভালা: ইউটিভি (UTV) মোশন পিকচার্সের প্রতিষ্ঠাতা রনি স্ক্রুভালা ভারতের বিনোদন খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক রূপ দিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন। 'রং দে বাসন্তী', 'স্বদেশ', 'উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক'-এর মতো বহু কালজয়ী সিনেমা তাঁর প্রযোজনায় নির্মিত।

সাইরাস ব্রোয়াচা: ভারতের টেলিভিশন জগতে রসবোধ ও স্যাটায়ার (ব্যঙ্গাত্মক কৌতুক) প্রচারের ক্ষেত্রে সাইরাস একজন পথিকৃৎ। 'MTV Bakra' শোর মাধ্যমে তিনি নব্বইয়ের দশকে কৌতুক বিনোদনের ধরণই বদলে দিয়েছিলেন।

অরুনা ইরানি ও ডেইজি ইরানি: শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে বিগত কয়েক দশক ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন ডেইজি ইরানি। অন্যদিকে অরুনা ইরানি ৫০০-রও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে খলনায়িকা থেকে শুরু করে চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে নিজের স্থান শক্ত করেছেন।

যৌথ ঐতিহ্য বা মাতা/পিতার সূত্রে পারসি বংশোদ্ভূত

ফারহান আখতার ও ফারাহ খান: প্রখ্যাত পারসি চিত্রনাট্যকার হানি ইরানির সন্তান ফারহান ও ফারাহ দুজনেই আধুনিক ভারতীয় চলচ্চিত্রের শক্তিশালী ভিত্তি। ফারহান একজন সফল পরিচালক ('দিল চাহতা হ্যায়'), প্রযোজক, গায়ক ও অভিনেতা ('ভাগ মিলখা ভাগ')। অন্যদিকে ফারাহ খান বলিউডের অন্যতম সফল কোরিওগ্রাফার এবং মূলধারার হিট বাণিজ্যিক সিনেমার সফল পরিচালক ('ম্যায় হু না', 'ওম শান্তি ওম')।

জন আব্রাহাম: মায়ের সূত্রে পারসি বংশোদ্ভূত জন আব্রাহাম বলিউডের অন্যতম সফল অ্যাকশন তারকা ও প্রযোজক। তাঁর প্রযোজিত সিনেমা ('ভিকি ডোনার', 'মাদ্রাজ ক্যাফে') ভারতীয় সিনেমায় ভিন্নধর্মী কনটেন্টের পথ উন্মোচন করেছে।

জিম শরভ: পারসি পরিবারের এই তরুণ অভিনেতা থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের পর্দায় অত্যন্ত ধারালো ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিনয়শৈলীর জন্য পরিচিত। 'পদ্মাবত', 'নেরজা' সিনেমা কিংবা 'রকেট বয়েজ' ওয়েব সিরিজে বিজ্ঞানী হোমি ভাবার চরিত্রে তাঁর অভিনয় সর্বজনীন প্রশংসা পেয়েছে।

আফতাব শিবদাসানি: মায়ের সূত্রে পারসি ঐতিহ্য বহনকারী আফতাব শিশুশিল্পী হিসেবে ('মি. ইন্ডিয়া') যাত্রা শুরু করে পরবর্তীতে মূলধারার নায়ক হিসেবে একাধিক সফল ছবিতে কাজ করেছেন।

পারসি বনাম ইরানি: সূক্ষ্ম সামাজিক পার্থক্য

ভারতের জরথুস্ত্রীয়দের কথা বলতে গেলে দুটি পরিভাষা সামনে আসে ‘পারসি’ এবং ‘ইরানি’। সাধারণ দৃষ্টিতে দুটোকে এক মনে হলেও এদের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সামাজিক পার্থক্য বিদ্যমান।

পারসি (Parsi): যারা ৮ম থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে গুজরাটে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। এরা শত শত বছর ধরে গুজরাটি ভাষা ও সংস্কৃতি আপন করে নিয়েছে।

ইরানি (Irani): যারা ১৯ শতক বা ২০ শতকের শুরুতে ইরানের কাজার (Qajar) রাজবংশের অত্যাচার থেকে বাঁচতে ভারতে পালিয়ে আসে।

ইরানিরা মুম্বাই ও পুনেতে আসার পর অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘ইরানি ক্যাফে’ (Irani Cafe) সংস্কৃতি গড়ে তোলে। ভিনটেজ কাঠের চেয়ার, মার্বেলের টেবিল, বন-মাস্কা এবং ইরানি চায়ের এই ক্যাফেগুলো মুম্বাইয়ের ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

একনজরে ভারতের পারসি সম্প্রদায়

পারসি সম্প্রদায়ের সার্বিক ঐতিহাসিক রূপান্তর, সামাজিক ভিত্তি এবং বর্তমান অবস্থাকে একটি সারণীর মাধ্যমে নিচে তুলে ধরা হলো:

মূল বিষয়াবলি

সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও ঐতিহাসিক তথ্য

উৎপত্তি ও ধর্ম

প্রাচীন পারস্য (ইরান); ধর্ম: জরথুস্ত্রবাদ (Zoroastrianism); ধর্মগ্রন্থ: জেন্দাবেস্তা।

ভারতে আগমন কাল

১ম তরঙ্গ: ৮ম-১০ম শতাব্দী (পারসি); ২য় তরঙ্গ: ১৯শ-২০শ শতাব্দী (ইরানি)।

প্রথম বসতি ও চুক্তি

গুজরাটের সাঞ্জান বন্দর; রাজা জাদি রানার সাথে বিখ্যাত ‘দুধে চিনি’ মেশানোর ঐতিহাসিক চুক্তি।

ভাষা ও পোশাক

স্থানীয় গুজরাটি ভাষা গ্রহণ; নারীদের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি ও 'গারা' (Gara) সিল্কের পোশাক।

অর্থনৈতিক ভিত্তি

১৮-১৯ শতকে চীন ও ব্রিটিশদের সাথে তুলা ও আফিম বাণিজ্য; পরবর্তীতে ইস্পাত, বিমান ও টেক্সটাইল।

দানশীলতার দর্শন

জরথুস্ত্রবাদের নীতি অনুযায়ী আর্ট স্কুল, হাসপাতাল (JJ Hospital), ট্রাস্ট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন।

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

জামসেটজি টাটা, হোমি ভাবা, স্যাম মানেকশ, দাদাভাবাই নওরোজি, স্যার জেজে, বোমান ইরানি।

বর্তমান জনসংখ্যা

২০১১ আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতে ৫৭,২৬৪ জন (মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.০০৬%)।

পিতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার বিধি ও লিঙ্গবৈষম্য বিতর্ক

পারসিদের সংখ্যা কমার পেছনে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কঠোর নিয়মাবলী অনেকাংশে দায়ী। জরথুস্ত্রীয় সমাজ তাদের রক্ত ও বংশের বিশুদ্ধতা রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর।

পারসি সমাজের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী:

১. পারসি বাবা + অ-পারসি মা = সন্তান পারসি বলে গণ্য হবে।

২. অ-পারসি বাবা + পারসি মা = সন্তান পারসি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না।

যদি কোনো পারসি নারী অ-পারসি পুরুষকে বিয়ে করেন, তবে তিনি এবং তাঁর সন্তানেরা পারসিদের উপাসনালয় ‘ফায়ার টেম্পল’ (Agiyari) এবং সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। আধুনিক পারসি নারীরা এই নিয়মকে চরম লিঙ্গবৈষম্যমূলক ও অন্যায্য বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে গোঁড়া পুরোহিত শ্রেণী নিজেদের সাংস্কৃতিক অবক্ষয় রোধের দোহাই দিয়ে এই নিয়ম আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া ও ‘টাওয়ার অফ সাইলেন্স’ (Dokhmenashini)

জরথুস্ত্রবাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও আলোচিত বিষয় হলো তাদের অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া বা মৃতদেহ সৎকারের বিশেষ পদ্ধতি, যা ‘দখমেনশিনি’ (Dokhmenashini) নামে পরিচিত।

দখমা (Dakhma) বা টাওয়ার অফ সাইলেন্সের কার্যাবলি

পদ্ধতি: পারসিরা মৃতদেহ পোড়ান না কিংবা মাটিতে দাফনও করেন না। তারা মৃতদেহকে একটি উঁচু গোলাকার খোলা টাওয়ারে (যাকে ‘দখমা’ বা ‘Tower of Silence’ বলা হয়) রেখে আসেন। সেখানে শকুন ও অন্যান্য মাংসাশী পাখি এসে মৃতদেহ খেয়ে হাড় পরিষ্কার করে ফেলে। পরবর্তীতে রোদে শুকানো হাড়গুলো টাওয়ারের ভেতরের বিশেষ কূপে ফেলে দেওয়া হয়।

আধুনিক সংকট ও উদ্ভাবন: মুম্বাইয়ের মালাবার হিলে অবস্থিত ‘দুঙ্গারওয়াড়ি’ (Doongerwadi) হলো পারসিদের প্রধান দখমা এলাকা। তবে বিগত দুই দশকে ভারতে শকুনের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাায় (পশু চিকিৎসায় ‘ডাইক্লোফেনাক’ ওষুধের ব্যবহারের কারণে)। ফলে এই প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দিলে পারসি সমাজ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে টাওয়ারের ওপর বিশেষ ‘সোলাই কনসেনট্রেটর’ (Solar Concentrators) বা সৌর প্যানেল স্থাপন করেছে, যা তীব্র উত্তাপ তৈরি করে দ্রুত সৎকার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাহায্য করে।

অগ্নিকুণ্ডের পবিত্রতা: আতাস বেহরাম (Atash Behram) ও উডভাডার অলৌকিক ইতিহাস

জরথুস্ত্রবাদে আগুনকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব, আলো এবং সত্যের (Asha) প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। পারসিদের উপাসনালয়কে বলা হয় ‘আগিয়ারী’ (Agiyari) বা ফায়ার টেম্পল। পারসি ফায়ার টেম্পলে সংরক্ষিত আগুনকে উৎস ও পবিত্রতা অনুযায়ী ৩টি স্তরে ভাগ করা হয়:

১. আতাস দাদগাহ (Atash Dadgah): সাধারণ গৃহস্থালি বা ছোট প্রার্থনাকক্ষের আগুন।

২. আতাস আদারান (Atash Adaran): মাঝারি স্তরের পবিত্র আগুন, যা ৪টি ভিন্ন পেশার মানুষের গৃহের আগুন একত্রিত করে তৈরি হয়।

৩. আতাস বেহরাম (Atash Behram): এটি সর্বোচ্চ ও পরম পবিত্রতম আগুন। এটি তৈরি করতে ১৬টি ভিন্ন উৎস (যার মধ্যে বজ্রপাতের আগুন, কামারের চুল্লির আগুন, শ্মশানের আগুন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত) থেকে আগুন সংগ্রহ করে ১ বছরেরও বেশি সময় ধরে টানা ১,১২৪টি বিশেষ প্রক্রিয়ায় পবিত্র করা হয়।

উডভাডার 'ইরানশাহ': পুরো বিশ্বে মাত্র ৯টি ‘আতাস বেহরাম’ রয়েছে (যার ৮টিই ভারতে এবং ১টি ইরানে)। এর মধ্যে গুজরাটের উডভাডায় (Udvada) অবস্থিত ‘ইরানশাহ আতাস বেহরাম’ হলো সবচেয়ে প্রাচীন। ১,২০০ বছর আগে পারস্য থেকে পালিয়ে আসার সময় পারসিরা যে পবিত্র আগুন সাথে নিয়ে এসেছিল, তা উডভাডায় আজও একটানা জ্বলে আসছে। এটি পারসিদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র তীর্থস্থান।

বোম্বে পারসি পঞ্চায়েত (BPP) ও মুম্বাইয়ের 'বাউগ' (Baug) সংস্কৃতি

পারসি সম্প্রদায় নিজেদের সমাজকে সুসংগঠিত রাখতে ১৬৮০-র দশকে গঠন করে ‘বোম্বে পারসি পঞ্চায়েত’ (Bombay Parsi Punchayet - BPP)। এটি ভারতের প্রাচীনতম ও অন্যতম ধনী ট্রাস্ট বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

'বাউগ' (Baug) বা পারসি আবাসন ব্যবস্থা: মুম্বাইয়ের মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল শহরের পারসিরা কীভাবে তাদের প্রথাগত সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে, তার মূল চাবিকাঠি হলো ‘বাউগ’ (Baug)

কী এই বাউগ?: বাউগ হলো পারসি ট্রাস্টের তৈরি সম্পূর্ণ নিজস্ব সুরক্ষিত হাউজিং কলোনি। মুম্বাইয়ের সব রাজকীয় ও অত্যন্ত দামি এলাকায় (যেমন: কোলাবা, তারদেও, জহু, জোগেশ্বরী) এসব বাউগ অবস্থিত। উদাহরণস্বরূপ: Cusrow Baug, Rustom Baug, Jer Baug, Malcolm Baug

সহজ শর্তে বাসস্থান: কেবলমাত্র পারসিদের জন্য সংরক্ষিত এই অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে সদস্যরা নামমাত্র খরচে বা অত্যন্ত সাশ্রয়ী ভাড়ায় আজীবন থাকার সুযোগ পান। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বা মধ্যবিত্ত পারসিরা যেন ভিটেমাটিহীন না হয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে একত্র হয়ে বসবাস করতে পারে।

ভারতে ক্রিকেটের প্রথম পথিকৃৎ: পারসিদের ক্রীড়া অবদান

আজ ভারতে যে ক্রিকেট ধর্মীয় উন্মাদনায় পরিণত হয়েছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল পারসি সম্প্রদায়। ইংরেজদের কাছ থেকে ক্রিকেট খেলা আয়ত্ত করা প্রথম ভারতীয় জাতি ছিল পারসিরা।

ওরিয়েন্টাল ক্রিকেট ক্লাব (১৮৪৮): ভারতে কোনো ভারতীয়দের দ্বারা গঠিত প্রথম ক্রিকেট ক্লাব ছিল পারসিদের তৈরি ‘ওরিয়েন্টাল ক্রিকেট ক্লাব’।

ইংল্যান্ড সফর (১৮৮৬ ও ১৮৮৮): ইতিহাসের প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে যারা ক্রিকেট খেলতে ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিল, সেটি কোনো জাতীয় দল ছিল না; সেটি ছিল পুরোপুরি পারসি ক্রিকেটারদের একটি দল।

কিংবদন্তি ক্রিকেটারগণ: ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে পল পলি উমরিগর (Polly Umrigar), নারী কন্ট্রাক্টর (Nari Contractor) এবং ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার (Farokh Engineer)-এর মতো প্রখ্যাত ক্রিকেট ব্যক্তিত্বরা পারসি সম্প্রদায় থেকেই উঠে এসেছেন। মুম্বাইয়ের ঐতিহ্যবাহী মেরিন লাইন্সে অবস্থিত ‘পারসি জিমখানা’ ভারতীয় ক্রিকেটের এক ঐতিহাসিক সাক্ষী।

রসনা বিলাস ও পারসি খাদ্যসংস্কৃতি (Parsi Cuisine)

পারসিদের রন্ধনশৈলী হলো ফারসি (পারস্যের মাংস, বাদাম, মেওয়া) এবং গুজরাটি (মিষ্টি ও টক মশলা, সামুদ্রিক মাছ) স্বাদের এক অপূর্ব কন্টিনেন্টাল সংমিশ্রণ।

ধানশাক (Dhansak): পারসিদের সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার। ডাল, কষানো মাংস এবং বিভিন্ন সবজি একসাথে সেদ্ধ করে বিশেষ ধানশাক মশলা দিয়ে তৈরি করা হয় এবং এটি ব্রাউন রাইসের সাথে পরিবেশন করা হয়। সাধারণত রবিবারে বা কোনো স্বজন বিয়োগের শোকপর্ব শেষে এটি পরিবারের সবাই একসাথে খেয়ে থাকেন।

ডিম বা 'ইডু' প্রীতি: পারসিদের খাবার টেবিলে ডিমের আধিপত্য চোখে পড়ার মতো। তাদের একটি প্রচলিত রসাত্মক নীতি হলো: "সবজিতে সমস্যা? তার ওপর একটা ডিম ভেঙে দাও!" (যেমন: ‘ভিন্দী পার ইডু’ অর্থাৎ ঢ্যাঁড়শের ওপর ডিম, বা ‘টমেটো পার ইডু’)।

লগন নু কাস্টার্ড (Lagan nu Custard): পারসি বিয়ের অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় ডেজার্ট বা মিষ্টান্ন, যা দুধ, ডিম ও শুকনো ফল দিয়ে তৈরি বেকড কাস্টার্ড।

নবজ্যোত (Navjote): পারসি শিশুর ধর্মীয় দীক্ষাদান

কোনো পারসি শিশু জন্মানোর সাথে সাথেই পূর্ণাঙ্গ জরথুস্ত্রীয় হিসেবে বিবেচিত হয় না। ৭ থেকে ১১ বছর বয়সের মধ্যে শিশুর জন্য একটি বিশেষ সামাজিক ও ধর্মীয় আচার পালন করা হয়, যাকে ‘নবজ্যোত’ (Navjote) বলা হয়।

সুদরেহ ও কূস্তি (Sudreh & Kusti): এই অনুষ্ঠানে শিশুকে প্রথমবার বিশেষ পবিত্র সাদা সুতির জামা ‘সুদরেহ’ (Sudreh) এবং মেষের পশম দিয়ে বোনা একটি পবিত্র সুতা ‘কূস্তি’ (Kusti) পরিধান করানো হয়।

ধর্মীয় দায়িত্ব: এই সুতাটি কোমরে তিন প্যাঁচ দিয়ে বাঁধা হয়, যা তাদের মূল তিন বার্তা হুমাতা, হুক্তা ও হভারшта (সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ কাজ)-কে নির্দেশ করে। নবজ্যোত অনুষ্ঠানের পর থেকে শিশুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জরথুস্ত্রবাদের অনুসারী হিসেবে গণ্য করা হয় এবং সে নিজের সমস্ত ভালো-মন্দ কাজের জন্য আধ্যাত্মিকভাবে দায়ী হয়।

পারসি আইন ও অনন্য জুরি ব্যবস্থা (Parsi Personal Law)

ভারতে বিবাহ, তালাক ও উত্তরাধিকারের জন্য পারসিদের নিজস্ব বিশেষ আইন রয়েছে, যা ‘Parsi Marriage and Divorce Act, 1936’ নামে পরিচিত।

দেওয়ানি জুরি প্রথা

ভারতে ১৯৬০-এর দশকে সাধারণ আদালতের ক্ষেত্রে ‘জুরি প্রথা’ (Jury Trial) তুলে দেওয়া হলেও, পারসি পারিবারিক আদালতের (Parsi Matrimonial Courts) ক্ষেত্রে এই প্রথা আজও এক ব্যতিক্রমী রূপ নিয়ে টিকে রয়েছে।

তালাক বা বৈবাহিক বিরোধের ক্ষেত্রে বিচারককে সহায়তা করার জন্য পারসি সম্প্রদায় থেকে কয়েকজন বিশিষ্ট সদস্যকে ‘জুরি’ বা ‘ডেডিকেট’ (Delegates) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

পারিবারিক বা সামাজিক কাঠামোর জটিলতা বুঝে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত দিতে বিচারককে এই জুরি সদস্যরা সাহায্য করে থাকেন।

পারসি ভাষা ও 'পারসি গুজরাটি' উপভাষা

পারসিরা হাজার বছর আগে ভারতে আসার পর ধীরে ধীরে তাদের মূল ফারসি ভাষা ভুলে গুজরাটি ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করে। তবে তাদের উচ্চারিত গুজরাটি সাধারণ গুজরাটি ভাষা থেকে কিছুটা আলাদা।

পারসি গুজরাটি (Parsi Gujarati): এই উপভাষায় প্রচুর ফারসি, ইংরেজি এবং পুরোনো বম্বাই শব্দ মিশ্রিত রয়েছে।

উচ্চারণ ও রসবোধ: পারসি গুজরাটি উচ্চারণে এক ধরণের বিশেষ ছন্দ ও মিষ্টতা রয়েছে। নাটক, সাহিত্য এবং বম্বাইয়ের থিয়েটারে পারসি গুজরাটি ভাষার কৌতুকপূর্ণ সংলাপ ভারতের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বেশ জনপ্রিয়।

সংক্ষেপে পারসি সংস্কৃতির অন্যান্য মৌলিক দিকসমূহ

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র

বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও বিবরণ

নওরোজ (Navroz)

পারসিদের নববর্ষ উৎসব। প্রতি বছর ২১শে মার্চ (বসন্ত বিষুব) অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে ‘জ্যামশেদী নওরোজ’ পালন করা হয়।

পারসি থিয়েটার

১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুম্বাই ও গুজরাটে আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের ভিত্তি তৈরি করে পারসি নাটক নির্দেশকেরা।

সংগীত ও ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল

ভারতীয়দের মধ্যে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিক (যেমন: সিমফনি, পিয়ানো) চর্চায় পারসিদের অবদান শীর্ষস্থানীয় (যেমন: বিখ্যাত সঙ্গীত পরিদর্শক জুবিন মেহতা)।

প্রটেস্টে্যান্ট কাজেন প্রথা

পারসিদের ক্ষুদ্র জনসংখ্যার কারণে তাদের মধ্যে রক্তসম্পর্কের আত্মীয়দের মাঝে বিয়ের (Consanguineous marriage) প্রবণতা বেশি ছিল, যা বংশগতি রোগের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

অস্তিত্বের সংকটে পারসি সম্প্রদায়: বিলুপ্তির পথে এক ঐতিহ্য?

বাণিজ্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য সাফল্য থাকলেও, ডেমোগ্রাফিক বা জনসংখ্যার বিচারে পারসিরা আজ এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৪১ সালের পর থেকে প্রতি ১০ বছরে পারসি জনসংখ্যা প্রায় ১২% করে হ্রাস পাচ্ছে। ২০০১ সালে ভারতে পারসি জনসংখ্যা ছিল ৬৯,০০১ জন, যা ২০১১ সালে নেমে এসেছে ৫৭,২৬৪ জনে। জনসংখ্যা হ্রাসের প্রধান কারণসমূহ:

নিম্ন প্রজনন হার (Low Fertility Rate): পারসিদের মধ্যে প্রজনন হার ভারতের গড় হারের চেয়ে অনেক নিচে।

দেরিতে বিয়ে ও অবিবাহিত থাকা: উচ্চ শিক্ষা ও ক্যারিয়ার সচেতনতার কারণে পারসি তরুণ-তরুণীদের একটি বিশাল অংশ দেরিতে বিয়ে করেন অথবা আজীবন অবিবাহিত থাকেন (প্রায় ৩০% পারসি অবিবাহিত থাকেন)।

বহির্গমন (Emigration): একটি বিশাল সংখ্যক পারসি তরুণ শিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় পাড়ি জমিয়ে সেখানে স্থায়ী হচ্ছেন।

কঠোর ধর্মীয় রক্ষণশীলতা: অ-পারসিদের ধর্মান্তরিত করে পারসি করার কোনো সুযোগ নেই। উপরন্তু, অ-পারসিকে বিয়ে করা নারীদের সন্তানদের পারসি হিসেবে গ্রহণ না করায় নতুন প্রজন্ম সমাজ থেকে ছিটকে যাচ্ছে।

এই সংকট সামাল দিতে ভারত সরকার এবং পারসি জিরো ট্রাস্ট যৌথভাবে ‘জিও পারসি’ (Jiyo Parsi) নামক বিশেষ প্রকল্প চালু করেছে, যার মাধ্যমে তরুণ পারসি দম্পতিদের সন্তান গ্রহণে আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা হয়।

ভারতীয় সভ্যতায় একমুঠো চিনির চিরন্তন মিষ্টি

আজ থেকে এক হাজার বছর আগে সাঞ্জানের সৈকতে দাঁড়ানো সেই প্রাচীন পুরোহিত রাজা জাদি রানা কে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পারসিরা গত এক সহস্রাব্দ ধরে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। তারা ভারতীয় সমাজের দুধে নিজেদের এমনভাবে চিনির মতো মিশিয়ে দিয়েছে যে, দুধের পাত্র উপচে পড়েনি, অথচ পুরো ভারতীয় সভ্যতার স্বাদ মিষ্টি হয়ে উঠেছে।

তারা ভারতের জমি দখল করতে আসেনি, এসেছে অবদান রাখতে। তারা ভারতকে উপহার দিয়েছে শিল্প কারখানা, বিমান সংস্থা, পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় আর অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তারা প্রমাণ করেছে যে কোনো দেশে সংখ্যাগুরু হওয়াটা বড় কথা নয়; অবদান ও দৃষ্টিভঙ্গিই একটি সম্প্রদায়কে মহৎ করে তোলে।

আজ জনসংখ্যার সংকটে পারসিদের অস্তিত্ব হয়তো ঝুঁকির মুখে, কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস ও অর্থনীতিতে তাদের যে ভূমিকা তা চিরকালের জন্য অবিনশ্বর। পারসিদের এই রাজকীয় ও ইতিবাচক ইতিহাস পৃথিবীর সমস্ত উদ্বাস্তু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণার উৎস।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.