ইরম শর্মিলা চানুর অহিংস সংগ্রাম – মণিপুরের লৌহমানবীর ১৬ বছরের অনশনের গল্প

ইরম শর্মিলা চানুর অহিংস সংগ্রাম – মণিপুরের লৌহমানবীর ১৬ বছরের অনশনের গল্প

৫ নভেম্বর ২০০০। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি রাজ্য মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের মালোম বাসস্টপ তখনও ভোরের হালকা আলো ও কুয়াশায় ঢেকে ছিল। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কেউ কাজের সন্ধানে, কেউ স্কুলে, কেউ বা অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সেই শান্ত সকালটি এক বিভীষিকা ও মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়। তৎকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘আসাম রাইফেলস’ এর একটি সামরিক কনভয় কোনো উসকানি ছাড়াই বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ জনতার ওপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে ব্রাশফায়ার শুরু করে।

নিমিষেই ঝরে যায় দশটি তাজা প্রাণ। ইতিহাসের পাতায় এটি ‘মালোম গণহত্যা’ (Malom Massacre) নামে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই নৃশংসতার পরদিন, ৬ নভেম্বর ২০০০, ২৮ বছরের এক শান্ত প্রকৃতির তরুণী ইম্ফলের রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক অভূতপূর্ব ও কঠিন প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হলেন:

“যতদিন না ভারতের এই স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক আইন AFSPA বাতিল করা হচ্ছে, ততদিন আমি কোনো দানা খাদ্য গ্রহণ করব না, এক ফোঁটা পানি পান করব না, এমনকি আমার চুলে চিরুনি পর্যন্ত ছোঁয়াব না।”

সেই তরুণীর নাম ইরম শর্মিলা চানু (Irom Chanu Sharmila)। যিনি পরবর্তীতে বিশ্বমঞ্চে ‘মণিপুরের আয়রন লেডি’ বা ‘মেঙ্গুবি’ (যিনি দয়ালু) নামে পরিচিতি লাভ করেন।

তিনি অনশন শুরু করেছিলেন এবং সেই অনশন কোনো এক বা দুই দিনের জন্য ছিল না; তা স্থায়ী হয়েছিল টানা ১৬ বছর (৫৮০০ দিনেরও বেশি সময়)। এটি মানব ইতিহাসের দীর্ঘতম রাজনৈতিক ও অহিংস অনশন হিসেবে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এবং লিমকা বুক অফ রেকর্ডসে স্থান করে নিয়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা ইরম শর্মিলার জীবন, মালোম গণহত্যার বিভীষিকা, AFSPA-র নিষ্ঠুর আইনি ব্যাখ্যা, ১৬ বছরের বন্দিদশা, রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও বর্তমান জীবনযাত্রার এক পুঙ্খানুপুঙ্খ সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরব।

ইরম শর্মিলা চানু: শৈশবের পরিবেশ ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর

ইরম শর্মিলা ১৯৭২ সালের ১৪ মার্চ মণিপুরের ইম্ফলের এক সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ৯ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী এবং মা গৃহিণী। শৈশব থেকেই শর্মিলা ছিলেন শান্ত, নির্জনপ্রিয় ও স্পর্শকাতর স্বভাবের। তবে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কোনো সাধারণ শান্ত পরিবেশে কাটেনি।

আশির দশকের মণিপুর ও তরুণী শর্মিলার মনস্তত্ত্ব

১৯৮০-এর দশক থেকে মণিপুর ছিল এক উত্তপ্ত অগ্নিগর্ভ রাজ্য। একদিকে বিভিন্ন সশস্ত্র উপজাতীয় ও স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী গোষ্ঠী, অন্যদিকে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পাল্টা দমনপীড়ন। প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সান্ধ্য আইন (Curfews), আকস্মিক অভিযান, ভুয়া এনকাউন্টার এবং সাধারণ তরুণদের রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া।

১৯৯০-এর দশকে কলেজে পড়ার সময় শর্মিলা সংবাদপত্র ও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাথে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর চারপাশের এই সহিংসতা স্বাভাবিক নয়।

কবিতার খাতা থেকে রাজপথ

শর্মিলা নিজের অন্তরের যন্ত্রণা প্রকাশ করতে কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফুলের গন্ধ’ (Fragrance of Peace) প্রকাশিত হয়। কিন্তু শিগগিরই তিনি উপলব্ধি করেন যে কেবল সাহিত্যচর্চা বা কবিতা লিখে এই সামরিক নিপীড়ন ও বন্দুকের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাঁর সেই উপলব্ধি বাস্তবে রূপ নেয় ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে, যখন মালোমের রক্তে ভেজা বাসস্টপ তাঁকে কবি থেকে এক দূরন্ত বিপ্লবীতে রূপান্তরিত করে।

মালোম গণহত্যা: যে রক্তাক্ত ভোর ইতিহাস বদলে দিয়েছিল

২ নভেম্বর ২০০০, সকাল ৮:৩০ মিনিট। ইম্ফল থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত মালোম নামক একটি ছোট্ট গ্রামে প্রতিদিনের মতোই স্বাভাবিক ব্যস্ততা ছিল। বাসস্টপে স্থানীয় মানুষ বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ সেখানে আসাম রাইফেলসের একটি কনভয় এসে থামে। সৈন্যদের দাবি ছিল, কিছু সময় আগে তাদের ওপর বিদ্রোহী গোষ্ঠী থেকে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু তার বদলা নিতে সৈন্যরা যা করল, তা স্বাধীন ভারতের সামরিক ইতিহাসে এক চরম বর্বরতা।

কোনো ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ, তল্লাশি বা আগাম সদ্ব্যবহার ছাড়াই সৈন্যরা সাধারণ জনতার দিকে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি ছুড়তে থাকে। নিমিষেই বাসস্টপটি রক্তে ভেসে যায়।

মালোমে নিহত ১০ জন নিরপরাধ নাগরিকের তালিকা:

লেইশেমবি দেবী (৬২): বয়োবৃদ্ধা নারী, যিনি মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছিলেন।
সিনাম চন্দ্রমণি (১৮): একজন অদম্য মেধাবী তরুণ, যিনি মাত্র কিছুদিন আগেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ‘জাতীয় বীরত্ব পুরস্কার’ (National Bravery Award) লাভ করেছিলেন।
গর্ভবতী নারী: যার পেটে ছিল এক অজন্মা সন্তান, যে সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই বুলেটের আঘাতে মারা যায়।
আরও ৭ জন সাধারণ নাগরিক: যাদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় ছাত্র, দিনমজুর ও সাধারণ চাকরিজীবী।

এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো মণিপুর জুড়ে তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। ৩ নভেম্বর ইরম শর্মিলা নিজে মালোমে যান। সেখানে গিয়ে মাটি থেকে তুলে আনেন রক্তমাখা কাদা, দেখেন সন্তানহারা মায়েদের অঝোর কান্না। সেই দৃশ্য তাঁর মনে এমন এক গভীর রেখাপাত করে যা তাঁকে চিরতরের জন্য অনশনের অভূতপূর্ব রাস্তায় ঠেলে দেয়।

AFSPA (১৯৫৮): একটি আইনি বিশ্লেষণ ও তার ভয়ঙ্কর প্রভাব

ইরম শর্মিলার দীর্ঘ ১৬ বছরের লড়াই ছিল মূলত একটি বিশেষ আইনের বিরুদ্ধে যার নাম Armed Forces (Special Powers) Act, 1958 (AFSPA)

AFSPA-র কালো কালো অধ্যায়সমূহ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ দমন করতে যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, ঠিক সেই কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে ১৯৫৮ সালে স্বাধীন ভারতের সংসদে AFSPA পাস করা হয়। আইনটির মূল ধারাগুলো ছিল অতি নির্মম:

ধারা ৪ (a): কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য (নন-কমিশন্ড অফিসার পর্যন্ত) যদি মনে করেন কোনো ব্যক্তি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছেন বা আইন অমান্য করছেন, তবে তিনি সেই ব্যক্তিকে কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই গুলি করে হত্যা করতে পারেন।

ধারা ৪ (c): বিনা কোনো ওয়ারেন্টে যে কোনো ব্যক্তির বাড়িতে গভীর রাতে প্রবেশ করে তল্লাশি চালানো এবং যে কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করার ক্ষমতা।

ধারা ৬ (সর্বাপেক্ষা বিতর্কিত): এই আইনের অধীনে দায়িত্ব পালনকারী কোনো সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া দেশের কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতে মামলা দায়ের করা যাবে না।

বাস্তব ক্ষেত্রে এই 'ধারা ৬' সেনাসদস্যদের একধরনের 'আইনি অনাক্রম্যতা' (Legal Immunity) প্রদান করে। মালোম গণহত্যায় জড়িত কোনো আসাম রাইফেলস অফিসারের আজ পর্যন্ত কোনো বিচার হয়নি, কারণ কেন্দ্রীয় সরকার কখনো মামলা দায়েরের অনুমোদন দেয়নি। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছিলেন ইরম শর্মিলা।

১৬ বছরের অনশন: জীবন ও মৃত্যুর মুখোমুখি চিকিৎসা প্রক্রিয়া

অনশন শুরুর মাত্র ৩ দিনের মাথায় (৮ নভেম্বর ২০০০) মণিপুর পুলিশ ইরম শর্মিলাকে গ্রেফতার করে। তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৩০৯ ধারায় ‘আত্মহত্যার চেষ্টা’ (Attempt to Commit Suicide)-র অপরাধে মামলা দেওয়া হয়।

আইন অনুযায়ী এই ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ১ বছর। ফলে পুলিশ প্রতি ৩৬৪ দিন পরপর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি দিত এবং তিনি অনশন চালিয়ে গেলে পরদিনই তাঁকে পুনরায় একই ধারায় গ্রেফতার করত। এভাবে টানা ১৬ বছর ধরে ১৬ বার তাঁকে গ্রেফতার ও জামিনের নাটকীয় চক্রের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

ইম্ফলের জেএনআইএমএস (JNIMS) হাসপাতালের সেই ছোট্ট ঘর

শর্মিলাকে রাখা হয়েছিল ইম্ফলের জওহরলাল নেহরু ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেসের (JNIMS) এক নিঃসঙ্গ কেবিনে। ঘরের দরজায় সব সময় তালা ঝুলত, জানালায় ছিল শক্ত লোহার গ্রিল এবং বাইরে ২৪ ঘণ্টা সশস্ত্র পুলিশি পাহারা। এটি হাসপাতাল হলেও বাস্তবে ছিল শর্মিলার এক নির্জন কারাগার।

জোরপূর্বক খাদ্য প্রদান (Force-Feeding)

যেহেতু শর্মিলা স্বেচ্ছায় অন্ন-জল গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন, তাই ভারত সরকার তাঁকে জীবিত রাখতে এক কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক পথ বেছে নেয়। তাঁর নাক দিয়ে একটি প্লাস্টিকের নল (Ryles Tube) প্রবেশ করিয়ে সরাসরি পাকস্থলীতে তরল খাদ্য পৌঁছে দেওয়া হতো।

খাদ্যের উপাদান: দুধ, গ্লুকোজের পানি, জুস ও প্রোটিন পাউডারের বিশেষ মিশ্রণ।

শারীরিক যন্ত্রণা: প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় নাকের নলের ভেতর দিয়ে জোর করে তরল ঢালা হতো। বছরের পর বছর এই নল নাকের ভেতর থাকার কারণে তাঁর নাকের ভেতরে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়, সেপ্টাম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গলার টিস্যু শুকিয়ে যায়।

নল ঢোকানোর সময় শর্মিলার নাক দিয়ে অনবরত রক্ত পড়ত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি কেঁদে বলেছিলেন:

"আমি অনশন করছি আমার জনগণের সুরক্ষার জন্য। কিন্তু সরকার আমার নাক দিয়ে পাইপ ঢুকিয়ে আমাকে এমনভাবে বাঁচিয়ে রাখছে যেন আমি কোনো অপরাধী। এটি বেঁচে থাকা নয়, এটি এক ঝুলন্ত শাস্তি।"

দীর্ঘ অনশনের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

দীর্ঘ ১৬ বছর স্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণ না করায় শর্মিলার শরীরের জৈবিক ক্রিয়ায় ভয়াবহ পরিবর্তন আসে:

ওজন হ্রাস: তাঁর স্বাভাবিক ওজন ৫৫ কেজি থেকে কমে ৩৮ কেজিতে নেমে আসে।

হাড় ও দাঁতের ক্ষয়: প্রাকৃতিকভাবে চিবিয়ে না খাওয়ায় তাঁর দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে যায় এবং হাড় মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়ে (Osteoporosis-এর ঝুঁকি)।

হরমোনাল পরিবর্তন: ১৬ বছর ধরে তাঁর স্বাভাবিক ঋতুস্রাব (Menstruation) পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

মনস্তাত্ত্বিক স্থায়িত্ব: এই শারীরিক নির্যাতনের মাঝেও ডাক্তারদের অবাক করে দিয়ে তাঁর লিভার, কিডনি এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক ছিল। তিনি প্রতিদিন সকালে যোগব্যায়াম করতেন, গীতা ও বাইবেল পড়তেন, এবং হাসপাতালের দেয়ালজুড়ে কবিতা লিখতেন।

বৈশ্বিক স্বীকৃতি: ‘আয়রন লেডি’ থেকে বিশ্ব মানবাধিকারের প্রতীক

ইরম শর্মিলার এই নজিরবিহীন আত্মত্যাগ ও অহিংস সংগ্রাম কেবল উত্তর-পূর্ব ভারতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা দ্রুত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্বমঞ্চে এক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিবেকের বন্দি’ (Prisoner of Conscience) হিসেবে ঘোষণা করে। মণিপুরের সাধারণ মানুষ তাঁকে ভালোবেসে নাম দেয় ‘মেঙ্গুবি’ (যিনি দয়ালু বা সুন্দর)

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার কর্মীরা ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেন এবং শর্মিলার অনশনকে একাবিংশ শতাব্দীর মহাত্মা গান্ধীর ‘সত্যাগ্রহের’ সাথে তুলনা করতে থাকেন।

১৬ বছরের অনশন ভাঙা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও চরম ট্র্যাজেডি

৯ আগস্ট ২০১৬। ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় মোড় ঘটে। দীর্ঘ ১৬ বছর (৫,৮৪৬ দিন) পর ইরম শর্মিলা আদালত কক্ষে দাঁড়িয়ে এক ফোঁটা কাঁচা মধু আঙুলে নিয়ে মুখে দিয়ে অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন।

অনশন ভাঙার কারণ ও নতুন কৌশল

অনশন ভেঙে শর্মিলা পরিষ্কার ভাষায় বলেছিলেন:

"আমি উপলব্ধি করেছি যে ১৬ বছর অনশন করেও সরকারের বধির কানে আওয়াজ পৌঁছানো যায়নি। আমার জীবন উৎসর্গ করেও AFSPA বাতিল হয়নি। তাই আমি এবার কৌশল পরিবর্তন করছি। আমি ব্যবস্থার বাইরে থেকে নয়, ব্যবস্থার ভেতরে গিয়ে জনপ্রতিনিধি হয়ে সংসদে বসে এই আইন উপড়ে ফেলব।"

২০১৭-এর নির্বাচন ও মাত্র ৯০টি ভোট

তিনি গঠন করেন নতুন রাজনৈতিক দল People's Resurgence and Justice Alliance (PRCA)। ২০১৭ সালের মণিপুর বিধানসভা নির্বাচনে তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ওকরাম ইবোবি সিংয়ের বিরুদ্ধে ‘থৌবাল’ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

কিন্তু ফলাফল ছিল নির্মম ও অভাবনীয়। যে মণিপুরের মানুষের জন্য শর্মিলা নিজের যৌবন, রক্ত ও খাদ্য বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেই মণিপুরের মানুষই তাঁকে ব্যালট বাক্সে চরম প্রত্যাখ্যান করল। শর্মিলা পেয়েছিলেন মাত্র ৯০টি ভোট!

সমাজ ও পরিবারের বয়কট

মণিপুরের সমাজ ও বিশেষ করে কট্টরপন্থী সামাজিক সংগঠনগুলো শর্মিলার অনশন ভাঙাকে এক ধরনের 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তারা চেয়েছিল শর্মিলা অনশনরত অবস্থায় মারা যান এবং একজন 'অমর শহীদ' বা দেবীতে পরিণত হন।

কিন্তু শর্মিলা যখন সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে চাইলেন, বিয়ে করে সংসার করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন, তখন সমাজ ও এমনকি তাঁর নিজস্ব পরিবারও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করল। অনশন ভাঙার পর ইম্ফলের কোনো বাড়ি তাঁকে ভাড়া পর্যন্ত দিতে রাজি হয়নি। তিনি হয়ে পড়লেন সম্পূর্ণ একাকী।

বর্তমান জীবন: লৌহমানবী থেকে এক শান্ত মাতৃত্বের সফর

নির্বাচনে চরম পরাজয় ও সমাজ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ইরম শর্মিলা মণিপুর ত্যাগ করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে রাজনৈতিক ক্ষেত্র তাঁর জন্য নয়।

বিবাহ ও পারিবারিক জীবন

শর্মিলা দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর কোডাইকানাল এবং পরবর্তীতে চেন্নাইয়ে স্থানান্তরিত হন। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমিক ও সমর্থক ব্রিটিশ নাগরিক ডেসমন্ড কুটিনহো (Desmond Coutinho)-কে বিয়ে করেন।

২০১৯ সালে, ৪৭ বছর বয়সে শর্মিলা যমজ কন্যাসন্তানের মা হন। তাঁর দুই মেয়ের নাম রাখেন নিক্স শর্মিলা (Nix Sharmila) এবং অটম শর্মিলা (Autumn Sharmila)

'Iron Lady No More' ও বর্তমান অবস্থান

২০২৪ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনী 'Iron Lady No More'-এ শর্মিলা তাঁর জীবনের এই অভূতপূর্ব রূপান্তর সম্পর্কে লিখেছেন:

"জগৎ আমাকে আয়রন লেডি বা লৌহমানবী বানিয়ে একটি বেদীতে বসিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি পাথর নই, আমি রক্তমাংসের মানুষ। আমি ভালোবাসতে চেয়েছি, মা হতে চেয়েছি। আজ আমি আর কোনো লৌহমানবী নই, আমি একজন মা। আর এই পরিচয়েই আমার পরম শান্তি।"

তবে ব্যক্তিগত জীবনে শান্তিতে থাকলেও, ২০২৩-২৪ সালের মণিপুরের ভয়াবহ জাতিগত সহিংসতার সময় শর্মিলা পুনরায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হন।

শর্মিলার ১৭ বছরের সংগ্রামের সার্বিক চিত্র

নিচে ইরম শর্মিলার জীবন, ১৬ বছরের অনশন, আইনি যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক ফলাফলের একটি সংক্ষিপ্ত সারণী দেওয়া হলো:

বিষয় / নির্দেশক

বিস্তারিত ও ঐতিহাসিক তথ্যাবলী

পূর্ণ নাম ও জন্ম

ইরম শর্মিলা চানু; জন্ম: ১৪ মার্চ ১৯৭২ (ইম্ফল, মণিপুর)।

প্রতিবাদের কারণ

২ নভেম্বর ২০০০-এর 'মালোম গণহত্যা' (আসাম রাইফেলস কর্তৃক ১০ নিরপরাধ নাগরিক হত্যা)।

মূল দাবি

আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট (AFSPA, 1958) রাজ্য থেকে পুরোপুরি বাতিল।

অনশনের সময়কাল

৫ নভেম্বর ২০০০ থেকে ৯ আগস্ট ২০১৬ (১৬ বছর বা ৫৮০০+ দিন); বিশ্বের দীর্ঘতম অনশন।

আইনি মামলা ও বন্দিদশা

IPC ৩০৯ ধারা (আত্মহত্যার চেষ্টা); ১৬ বার গ্রেফতার ও জওহরলাল নেহরু হাসপাতালে বন্দিদশা।

চিকিৎসা পদ্ধতি

নাসোগ্যাস্ট্রিক টিউব (Ryles Tube) দিয়ে দিনে ২ বার জোরপূর্বক তরল খাদ্য প্রদান।

রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন

People's Resurgence and Justice Alliance (PRCA); ২০১৭ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট: ৯০।

স্বীকৃতি ও সম্মাননা

গাঙ্গি প্রিমিয়াম শান্তি পুরস্কার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তি পুরস্কার, নোবেল মনোনয়ন (২০১৩)।

বর্তমান অবস্থান

চেন্নাইয়ে স্বামী ডেসমন্ড ও দুই যমজ কন্যাসহ বসবাস এবং লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ।

AFSPA-র বর্তমান পরিস্থিতি: শর্মিলার লড়াই কি ব্যর্থ?

অনেকে প্রশ্ন তোলেন, ইরম শর্মিলা ১৬ বছর অনশন করার পরও কি AFSPA বাতিল হয়েছে? উত্তরটি এক কথায় 'হ্যাঁ' বা 'না' দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। শর্মিলার লড়াই আইনিভাবে তাৎক্ষণিক সফল না হলেও, তা ভারতের সামরিক ও সামাজিক নীতিতে এক ভূকম্পন তৈরি করেছিল।

শর্মিলার সংগ্রামের পরোক্ষ প্রভাবসমূহ

সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় (২০১৬): ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয় যে AFSPA জারি থাকলেও সেনাবাহিনী অনিয়ন্ত্রিত বা বেআইনি ক্ষমতা ভোগ করতে পারে না। ভুয়া এনকাউন্টারের বিরুদ্ধে সেনাসদস্যদের তদন্তের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়।

আইন শিথিলকরণ: ২০১৫ সালে ত্রিপুরা থেকে এবং পরবর্তীতে আসাম, মেঘালয় ও নাগাল্যান্ডের বিস্তৃত অঞ্চল থেকে AFSPA তুলে নেওয়া হয়।

মণিপুরের বর্তমান চিত্র: ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, মণিপুরের উপত্যকা অঞ্চলের ১৯টি থানার আওতাভুক্ত এলাকা থেকে AFSPA প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। তবে পাহাড়ি ও উপজাতীয় সংঘাতময় অঞ্চলগুলোতে এখনও এটি জারি রয়েছে।

সামাজিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা এবং উপসংহার

ইরম শর্মিলা চানুর ১৬ বছরের অনশন এবং তৎপরবর্তী জীবন আমাদের আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে কয়েকটি গভীর শিক্ষা দিয়ে যায়:

অহিংসার পরাকাষ্ঠা: কোনো অস্ত্র না তুলে, কাউকে আঘাত না করে কেবল নিজের শরীরকে বাজি রেখে ১৬ বছর একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করা মানব ইতিহাসের এক বিরল ঘটনা।

সমাজের দ্বিমুখী চরিত্র: সমাজ প্রায়শই বেঁচে থাকা একজন মানুষকে রক্তমাংসের ব্যক্তিত্ব হিসেবে গ্রহণ করার চেয়ে তাঁকে একটি 'প্রতীক' বা 'শহীদ' বানাতে বেশি পছন্দ করে। শর্মিলা যখন শহীদ না হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন, সমাজ তাঁকে ক্ষমা করেনি।

গণতন্ত্র ও আইনি ব্যবস্থার নমনীয়তা: রাষ্ট্রীয় আইন যখন সাধারণ মানুষের সুরক্ষার বদলে নিপীড়নের হাতিয়ার হয়, তখন কোনো অনশনই একা তা উপড়ে ফেলতে পারে না যতক্ষণ না রাজনৈতিক ও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে।

ইরম শর্মিলা আজ আর অনশনে নেই, তাঁর নাকে কোনো প্লাস্টিকের টিউব ঝুলছে না, তিনি আজ একজন শান্ত মা। কিন্তু ইম্ফলের মালোম বাসস্টপের সেই রক্তভেজা মাটি এবং শর্মিলার ১৬ বছরের অনশন মণিপুরের ইতিহাসে এমন এক আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে যা কখনো নিভে যাবে না। তিনি প্রমাণ করেছেন, শরীরের মাংস ক্ষয়ে যেতে পারে, সরকার অত্যাচার চালাতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাসকে কোনো বন্দিশালা বা আইনি নথিতে বন্দি করে রাখা যায় না।

তথ্যসূত্র:

  1. Guinness World Records (Longest Hunger Strike)

  2. “Burning Bright” Documentary – BBC (2024)

  3. The Hindu – Manipur Violence Coverage (2025)

  4. “Iron Lady No More” – Autobiography (2024)

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

আমাদের সাথে থাকুন এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.